MSD
Search This Blog
Wednesday, October 29, 2025
HIST-401 History of Emergence of Bangladesh বাংলাদেশের উত্থানের ইতিহাস
বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
বঙ্গভঙ্গ বলতে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ব্রিটিশ
সরকারের করা বাংলার বিভাজনকে বোঝায়। এটা ছিল ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসের একটা বড় মোড়।
১. কেন বঙ্গভঙ্গ করা হয়?
ব্রিটিশরা বলেছিল প্রশাসনিক সুবিধার জন্য। তখন
অবিভক্ত বাংলা ছিল খুব বড় - প্রায় ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল আর ৭ কোটি
৮০ লাখ মানুষ। কলকাতা থেকে দূরের অঞ্চল শাসন করা কঠিন হচ্ছিল।
আসল কারণ ছিল রাজনৈতিক:
- বাংলায় তখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরালো হচ্ছিল।
কলকাতা ছিল আন্দোলনের কেন্দ্র।
- ব্রিটিশরা "Divide and Rule" নীতি অনুসরণ করে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে বিভাজন
তৈরি করতে চেয়েছিল।
২. কীভাবে ভাগ করা হয়েছিল?
লর্ড কার্জনের পরিকল্পনায় বাংলাকে দুই ভাগ করা
হয়:
- পূর্ববঙ্গ ও আসাম: ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
রাজধানী ঢাকা।
- পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা: হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। রাজধানী কলকাতা।
৩. প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া: সাধারণত সমর্থন। কারণ
পূর্ববঙ্গে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতিতে সুযোগ বাড়বে বলে মনে করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি এ
সময় থেকেই জোরালো হয়।
হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া: তীব্র বিরোধিতা।
কলকাতার বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী শ্রেণি
মনে করেছিল এতে তাদের প্রভাব কমবে। শুরু হয় স্বদেশি আন্দোলন - বিদেশি পণ্য বর্জন,
জাতীয় শিক্ষা, স্বদেশি শিল্পের প্রচার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
"বাংলার মাটি বাংলার জল" গান লিখেন এই আন্দোলনে।
৪. বঙ্গভঙ্গ রদ হয় কেন?
চাপের মুখে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালের ১২
ডিসেম্বর দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করে। বাংলাকে আবার এক করা হয়। একইসাথে
রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেওয়া হয়।
৫. তাৎপর্য কী ছিল?
- মুসলমানদের মধ্যে আলাদা রাজনৈতিক চেতনা জন্ম
নেয়। এটাই পরে মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের পথ তৈরি করে।
- বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। স্বদেশি
আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।
- ঢাকা প্রথমবারের মতো রাজধানী হওয়ার অভিজ্ঞতা
পায়।
সংক্ষেপে, ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ ব্যর্থ হলেও এটা বাংলাদেশের
রাজনৈতিক ইতিহাসে বীজ বুনে দেয়। ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গ আবার ভাগ হয়ে পাকিস্তানের অংশ
হয়, আর ১৯৭১ সালে স্বাধীন
বাংলাদেশ।
সংক্ষেপে:
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ হলো ব্রিটিশ শাসনকালে বড়লর্ট লর্ড কার্জনের নেতৃত্বে বাংলা
প্রেসিডেন্সিকে দুইভাগে বিভক্ত করার ঐতিহাসিক ঘটনা, যা ১৬
অক্টোবর ১৯০৫-এ কার্যকর করা হয়েছিল এবং পরে ১৯১১ সালে তা বাতিল করা হয়েছিল.thedailylearn+1
রূপরেখা —
প্রেক্ষাপট, কারণ, প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব
প্রেক্ষাপট
ও কার্যকরী বিন্যাস
- ১৯০৫ সালের পরিকল্পনায় বাংলা প্রেসিডেন্সি দুটি
প্রদেশে ভাগ করা হয়: “পূর্ববঙ্গ ও আসাম” (ঢাকা-কেন্দ্রিক — ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী
বিভাগ ও আসামের অংশ) এবং “পশ্চিমবঙ্গ” (কলকাতা ও বাকি অংশ, সঙ্গে বিহার–উড়িষ্যার কিছু অংশ)। এই বিভাজন ১৬
অক্টোবর ১৯০৫-এ কার্যকর করা হয়.kofipost+1
- ব্রিটিশ প্রশাসন এটি সরকারি কর্ম ও শাসনকার্য সহজ
করার যুক্তি দেখালে ঐতিহাসিক বিশ্লেষকরা এটিকে রাজনৈতিক কৌশল (Divide
and Rule) হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন.rkraihan+1
বিভাজনের
কারণসমূহ (সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ)
- প্রশাসনিক কারণ: বৃহৎ বাংলা প্রেসিডেন্সি একজান
অফিসার দ্বারা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হওয়ায় প্রশাসনিক পুনর্গঠনের
আভাস দেওয়া হয়েছিল.thedailylearn
- রাজনৈতিক/কৌশলগত কারণ: বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও
স্বদেশী-প্রবণতা বৃদ্ধিকে দুর্বল করতে, হিন্দু
ও মুসলিম-সমাজকে আলাদা করে ব্রিটিশ শাসন শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য দেখায় অনেক
ইতিহাসবিদ—অর্থাৎ “Divide and Rule” তত্ত্ব.kofipost+1
- সামাজিক-আর্থিক কারণ: পূর্ববঙ্গে বৃহত্তর মুসলিম
জনসংখ্যা ছিল এবং সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভাব দেখা যেত; আলাদা প্রদেশ হলে মুসলিম এলিট ও স্থানীয় শ্রেণি
প্রগতি পাবে বলে কিছু মুসলিম নেতার সমর্থনও ছিল.banglapedia+1
প্রতিক্রিয়া
ও আন্দোলন
- স্বদেশী আন্দোলন: হিন্দু-বিভাগ কেন্দ্রিক কংগ্রেস ও
বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ী মহল ব্যাপক প্রতিবাদ করে বর্জ্য (boycott) ও প্রতিরোধ চালায়; পণ্য
বর্জন, নিজস্ব শিল্প ও সামগ্রী উৎসাহিত করার প্রচেষ্টা
তৎকালীন রাজনীতিকে উত্তাল করে তোলে.wikipedia+1
- মুসলিম প্রতিক্রিয়া: অনেক পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ
প্রস্তাবকে অনুকূল দেখেছিল; এটি পরবর্তীতে
মুসলিম রাজনীতির বিভিন্ন সংগঠনের গঠনে ভূমিকা রাখে (উদাহরণ: মুসলিম লীগের
উত্থান সম্পর্কে ইতিহাসগত সংযোগ দেখা যায়).banglapedia+1
- প্রতিবাদ ও সংঘটিত ক্রিয়াকলাপের ফলে ব্রিটিশ সরকার
চাপের সম্মুখীন হয়ে ১৯১১ সালে দিল্লি দরবারে সিদ্ধান্ত বদলে বঙ্গভঙ্গ
রেকর্ডভাবে বাতিল করে এবং পরে ভারতীয় রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে
স্থানান্তর করে.wikipediayoutube
ফলপ্রসূ ও
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
- জাতীয় চেতনার সঞ্চার: বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র
বিচার ও আন্দোলন বাংলায় জাতীয়চেতনার জাগরণ ত্বরান্বিত করে; স্বদেশী আন্দোলন ও সংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া বাংলী
বোধকে প্রগাঢ় করে.educobd+1
- সাম্প্রদায়িক ধারার সূচনা: বিভাজন ও প্রাতিষ্ঠানিক
মানচিত্র পরিবর্তনের ফলে হিন্দু-ইসলাম ভিত্তিক রাজনৈতিক ভেদাভেদ বেড়ে
যায়—কিছু ইতিহাসবিদ এই ঘটনাকে পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের বৃহত্তর দেশভাগের এক
প্রাক-চিহ্ন হিসেবে দেখেন.kofipost+1
- প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং পুনর্গঠন: ১৯১1-এ রদ হওয়া সত্ত্বেও তার প্রভাব — প্রশাসনিক
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর রূপায়ণ ও রাজনীতির নতুন বন্ধন
— দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে.wikipedia+1
প্রাসঙ্গিক
তারিখ ও সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন
- 1903–1905: বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি শুরু;
1905-এ কার্যকর করা হয়.thedailylearn
- 16 অক্টোবর 1905: বিভাজন
কার্যকর হওয়ার তারিখ হিসেবে সাধারণভাবে চিহ্নিত.wikipedia+1
- 1911: দিল্লি দরবারে বিভাজন বাতিল ও বঙ্গ পুনর্মিলন ঘোষিত
হয়.youtubewikipedia
উদাহরণ/চিত্রকল্প
(সংক্ষিপ্ত)
- সহজ ভাষায় বোঝাতে: ব্রিটিশরা প্রশাসনিক কারণ
দেখালেও বাস্তবে বিভাজনটি রাজনৈতিকভাবে হিন্দু-মুসলিম ভেদকে ব্যবহার করে
স্থানীয় জাতীয়তাবাদী শক্তিকে দুর্বল করার কৌশল ছিল—এটি অনেক ইতিহাসবিদের
সাধারণ ব্যাখ্যা.rkraihan+1
আরো পড়ার
উৎস (উপযোগী লিংকগুলি)
- বাংলা উইকিপিডিয়া — বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫).wikipedia
- বাংলাপিডিয়া নিবন্ধ — বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৫.banglapedia
- বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ ও শিক্ষকীয় সারমর্ম — The
Daily Learn এবং Kofipost-র
প্রাসঙ্গিক আর্টিকেলগুলি.thedailylearn+1
বঙ্গভঙ্গ বলতে সাধারণত ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের
কৃত প্রথম বঙ্গভঙ্গকেই বোঝানো হয়, যা ভারতের
ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে দ্বিতীয়বারের
মতো বঙ্গভঙ্গ হয়। এখানে প্রথম বঙ্গভঙ্গ নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
### বঙ্গভঙ্গের পটভূমি ও কারণ
১৯০৫ সালের আগে অবিভক্ত বাংলা ছিল একটি বিশাল
প্রদেশ, যার মধ্যে বর্তমানের
পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা, আসাম ও বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই প্রদেশের
আয়তন ছিল প্রায় ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮ কোটি।
এত বিশাল এলাকা সুশাসনের জন্য প্রশাসনিকভাবে দুরূহ হয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে পূর্ব বাংলার দুর্গম ও নদীবহুল
অঞ্চলগুলি অবহেলিত ছিল।
ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে **প্রশাসনিক
দক্ষতা বৃদ্ধির** কারণ দেখিয়ে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব করে। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড
কার্জন যুক্তি দেন যে, অবিভক্ত বাংলা
একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পক্ষে শাসন করা খুবই কঠিন এবং পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের
জন্য আলাদা প্রদেশ প্রয়োজন। তবে, ভারতীয়
জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এর আসল উদ্দেশ্য ছিল **"ভেদ ও শাসন
নীতি"** (Divide and Rule) প্রয়োগ করা।
তাদের মতে, ব্রিটিশরা
বাংলাকে ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভক্ত করে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য
নষ্ট করতে এবং ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করতে চেয়েছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পূর্ব বাংলা ও
আসাম নিয়ে গঠিত নতুন প্রদেশটি হবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পশ্চিম বাংলা, বিহার ও ওড়িশা নিয়ে গঠিত প্রদেশটি হবে হিন্দু
সংখ্যাগরিষ্ঠ।
### বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়া ও বিরোধিতা
১৯০৫ সালের ১৯ জুলাই বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত
ঘোষিত হয় এবং ১৬ অক্টোবর তা কার্যকর হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় সারা
বাংলায় তীব্র বিরোধিতা দেখা দেয়।
* **হিন্দু
সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া**: পশ্চিম বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী (ভদ্রলোক) ও
হিন্দু জমিদাররা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তারা একে বাংলা মায়ের
"অঙ্গচ্ছেদ" হিসেবে দেখেছিলেন এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক
স্বার্থে আঘাত বলে মনে করেছিলেন।
* **মুসলিম
সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া**: পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি
বড় অংশ এই বিভাজনকে সমর্থন করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, এর ফলে তাদের জন্য শিক্ষা, চাকরি ও রাজনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং একটি
পৃথক প্রদেশে তারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবেন। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ এই
বিভাজনের একজন প্রধান সমর্থক ছিলেন। তবে, কিছু মুসলিম নেতা ও বুদ্ধিজীবী এই বিভাজনের বিরোধিতাও করেছিলেন।
* **প্রতিবাদের
রূপ**: বিরোধিতা দ্রুত আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে এক
বিশাল সভায় ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই আন্দোলন থেকে **স্বদেশী
ও বয়কট আন্দোলনের** সূচনা হয়। মানুষ বিদেশি পণ্য বর্জন করে এবং স্বদেশী শিল্পের
প্রসারে উদ্যোগী হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সময় 'আমার সোনার বাংলা' গানটি রচনা করেন এবং রাখিবন্ধন উপলক্ষে
হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে রাখি বাঁধার প্রস্তাব দেন।
### বঙ্গভঙ্গের ফলাফল ও রদ
বঙ্গভঙ্গ ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এক নতুন
প্রাণ সঞ্চার করে। প্রতিবাদ সারা ভারতেও ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন ক্রমশ সহিংস রূপ
নিতে শুরু করে, যার ফলে ব্রিটিশ
সরকার চাপের মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ এক দরবারে বঙ্গভঙ্গ
রদ করার ঘোষণা দেন এবং ১৯১২ সালে তা কার্যকর হয়।
তবে, এই স্বল্পস্থায়ী বিভাজনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল:
1. **সাম্প্রদায়িক
বিভাজন**: এটি হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীকালে আরও গভীর হয়।
2. **মুসলিম লীগের
জন্ম**: বঙ্গভঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি
পায় এবং ১৯০৬ সালে ঢাকায় **মুসলিম লীগ** প্রতিষ্ঠিত হয়।
3. **ভবিষ্যতের
পথরেখা**: ১৯০৫ সালের এই ঘটনাকে ভারত বিভাগের এক ধরনের মহড়া হিসেবে দেখা হয়। এর
মাধ্যমে যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা হয়, তা শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং
বাংলাদেশের জন্মের পথ তৈরি করে দেয়।
উপসংহারে বলা যায়, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল মূলত ব্রিটিশদের একটি
রাজনৈতিক কৌশল, যা প্রশাসনিক
অজুহাতে চালানো হলেও এর লক্ষ্য ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা। এই ঘটনা
স্বল্পমেয়াদে ব্যর্থ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ও
স্থায়ী সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বীজ বপন করে।
বঙ্গভঙ্গ
(১৯০৫)
পটভূমি
১৯০৫ সালের
বঙ্গভঙ্গ ছিল ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সেসময় বাংলা প্রদেশ
ছিল ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ইউনিট — বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ,
বিহার, ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত।
জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮ কোটি।
কারণ
প্রশাসনিক
যুক্তি (ব্রিটিশ দাবি): ভাইসরয়
লর্ড কার্জন দাবি করেন, এত বড় প্রদেশ দক্ষভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই
বিভক্তি প্রশাসনিক সুবিধার জন্য।
প্রকৃত
উদ্দেশ্য (ঐতিহাসিকদের মত):
- বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা
- হিন্দু ও মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা —
"ভাগ করো ও শাসন করো" নীতি প্রয়োগ
- পূর্ব বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে
রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া
বিভাজনের
রূপরেখা
বাংলাকে
দুটি প্রদেশে ভাগ করা হয়:
পশ্চিম
বাংলা: পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও
উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত; হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ।
পূর্ব বাংলা
ও আসাম: ঢাকাকে রাজধানী করে নতুন প্রদেশ গঠন; মুসলিম
সংখ্যাগরিষ্ঠ।
প্রতিক্রিয়া
ও আন্দোলন
বঙ্গভঙ্গের
বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল তীব্র ও বহুমাত্রিক।
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া —
ব্রিটিশ পণ্য বর্জন এবং দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করা। বিভাজনের দিন, ১৬ অক্টোবর,
রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে রাখীবন্ধন উৎসব পালিত হয় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের
প্রতীক হিসেবে।
বয়কট
আন্দোলনে ম্যানচেস্টারের কাপড় ও লিভারপুলের লবণ
পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাংলাজুড়ে জনসভা ও মিছিল হয়।
বিপ্লবী
আন্দোলনের উদ্ভব — অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর
দলের মতো সংগঠন সশস্ত্র বিপ্লবের পথে যায়। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল
চাকী-র মতো বিপ্লবীরা এই সময় সক্রিয় হন।
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন এবং অনেক
দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন।
মুসলিম
প্রতিক্রিয়া
বঙ্গভঙ্গের
বিষয়টি মুসলিম সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। একদিকে পূর্ব বাংলার অনেক
মুসলিম নেতা এতে সমর্থন দেন, কারণ নতুন প্রদেশে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন এবং ঢাকায়
রাজধানী স্থাপনে তারা রাজনৈতিক সুবিধা দেখেছিলেন। এই পটভূমিতে ১৯০৬ সালে ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত
হয়।
বঙ্গভঙ্গ রদ
(১৯১১)
তীব্র
জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে ১২ ডিসেম্বর ১৯১১ সালে দিল্লি
দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। একই সাথে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী
কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়।
দীর্ঘমেয়াদী
তাৎপর্য
বঙ্গভঙ্গের
ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম:
- এটি ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনকে নতুন গতি দেয় এবং
সাধারণ মানুষকে রাজনীতিমুখী করে তোলে
- স্বদেশী আন্দোলন প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক
জাতীয়তাবাদের ধারণাকে জনপ্রিয় করে
- হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে জটিলতার বীজ বপন হয়,
যা পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ খোলে
- ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও বাংলা বিভক্তির পটভূমি রচনায়
এই ঘটনার প্রভাব ছিল গভীর
- জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে চরমপন্থী (বাল গঙ্গাধর
তিলক) ও নরমপন্থী (গোপালকৃষ্ণ গোখলে) বিভাজন স্পষ্ট হয়
বঙ্গভঙ্গ (Partition
of Bengal) ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা,
যা ১৯০৫ সালে সংঘটিত হয় এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি
বড় মোড় এনে দেয়। নিচে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো—
📌
বঙ্গভঙ্গ কী?
বঙ্গভঙ্গ
বলতে বোঝায় ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাংলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করা—
১. পূর্ববঙ্গ ও আসাম
২. পশ্চিমবঙ্গ (বিহার ও উড়িষ্যা সহ)
এই বিভাজন
কার্যকর হয় ১৬ অক্টোবর,
১৯০৫ সালে,
ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন-এর উদ্যোগে।
📌
বঙ্গভঙ্গের কারণ
১.
প্রশাসনিক কারণ (সরকারি ব্যাখ্যা)
ব্রিটিশ
সরকার দাবি করেছিল—
- বাংলা ছিল অত্যন্ত বৃহৎ প্রদেশ
- জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক চাপ সামলানো কঠিন ছিল
👉 তাই প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ভাগ করা হয়
২. রাজনৈতিক
কারণ (প্রকৃত উদ্দেশ্য)
ইতিহাসবিদদের
মতে প্রকৃত কারণ ছিল—
- বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল
- হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ঐক্য
ভাঙা
👉 অর্থাৎ “Divide and Rule” (ভাগ করো ও শাসন করো) নীতি
📌
বঙ্গভঙ্গের ফলাফল
১. স্বদেশী
আন্দোলনের সূচনা
- বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে শুরু হয় স্বদেশী আন্দোলন
- বিদেশি পণ্য বর্জন ও দেশি পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি
পায়
২. বয়কট
আন্দোলন
- ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করা হয়
- দোকান, পোশাক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রে বয়কট
৩.
জাতীয়তাবাদের উত্থান
- মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়
- স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও শক্তিশালী হয়
৪.
হিন্দু-মুসলিম বিভাজন
- সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়তে শুরু করে
- পরবর্তীতে ভারতের রাজনীতিতে এর গভীর প্রভাব পড়ে
📌
বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)
- তীব্র আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়
সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে
- ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়
- বাংলা আবার একত্রিত হয়
- একই সময়ে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে
স্থানান্তর করা হয়
📌
বঙ্গভঙ্গের গুরুত্ব
- ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ
অধ্যায়
- প্রথমবারের মতো ব্যাপক জনসাধারণ আন্দোলনে যুক্ত হয়
- জাতীয়তাবাদী চেতনা শক্তিশালী হয়
🔚
সংক্ষেপে
বঙ্গভঙ্গ
ছিল শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং
ব্রিটিশদের রাজনৈতিক কৌশল, যার বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ভারতীয়
স্বাধীনতা আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়।
**বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)** বাংলার ইতিহাসে এবং ভারতীয়
স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি প্রথম বঙ্গভঙ্গ নামে
পরিচিত (দ্বিতীয়টি ১৯৪৭ সালে)।
### পটভূমি
ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলা প্রেসিডেন্সি (বাংলা,
বিহার, ওড়িশা ও আসামের কিছু অংশসহ) ছিল বিপুল আয়তনের
(প্রায় ৭৮.৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা) এবং সবচেয়ে বড় প্রদেশ। কলকাতা কেন্দ্র করে
পশ্চিমাঞ্চল উন্নত হলেও পূর্বাঞ্চল (আজকের বাংলাদেশের অধিকাংশ) অবহেলিত ছিল।
প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব, যোগাযোগের সমস্যা
এবং পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের অভাব ছিল প্রধান ইস্যু।
### কারণসমূহ
**১. প্রশাসনিক কারণ (ঘোষিত):**
লর্ড কার্জন (ভাইসরয়, ১৮৯৯-১৯০৫) বলেন, বিশাল প্রদেশ একজন গভর্নরের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে
শাসন করা কঠিন। পূর্ব বাংলাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়।
**২. রাজনৈতিক কারণ (অঘোষিত):**
- বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছিল।
ব্রিটিশরা **"Divide and Rule"** নীতি প্রয়োগ করে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি
করতে চেয়েছিল।
- পূর্ব বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা (প্রায় ১৮
মিলিয়ন মুসলিম vs ১২ মিলিয়ন
হিন্দু) এবং পশ্চিমে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়।
- বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করা এবং কংগ্রেসের
প্রভাব কমানো ছিল লক্ষ্য।
**৩. অর্থনৈতিক কারণ:**
পূর্ব বাংলার কাঁচামাল কলকাতায় গিয়ে শিল্পায়িত
হতো। পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য আলাদা প্রশাসনিক কেন্দ্র প্রয়োজন বলে যুক্তি
দেওয়া হয়।
### বঙ্গভঙ্গের বিবরণ
- **ঘোষণা:** ১৯ জুলাই ১৯০৫।
- **কার্যকর:** ১৬ অক্টোবর ১৯০৫।
- **নতুন প্রদেশ:**
- **পূর্ব বাংলা ও
আসাম** (রাজধানী ঢাকা) — মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
- **পশ্চিম বাংলা**
(বিহার-ওড়িশাসহ, রাজধানী কলকাতা)
— হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ।
নবাব সলিমুল্লাহসহ অনেক মুসলিম নেতা এটাকে
সমর্থন করেন কারণ এতে পূর্বাঞ্চলের মুসলিমদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সুবিধা বাড়বে বলে
মনে করা হয়।
### প্রতিক্রিয়া ও আন্দোলন
হিন্দু সম্প্রদায় (বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু)
এটাকে তীব্রভাবে বিরোধিতা করে। এটি **স্বদেশী আন্দোলন**, **বয়কট** এবং পরবর্তীকালে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদের
জন্ম দেয়।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর **রাখিবন্ধন** উৎসবের
মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের আহ্বান জানান।
- বয়কট আন্দোলন: ব্রিটিশ পণ্য বর্জন, দেশীয় শিল্প প্রচার।
- আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে এবং কংগ্রেসকে
গণ-আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়।
- মুসলিম লীগের (১৯০৬, ঢাকা) গঠন এই ঘটনার প্রভাবে ত্বরান্বিত হয়।
### বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)
প্রবল আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদ করে। দিল্লি দরবারে (কিং জর্জ পঞ্চম) ঘোষণা করা হয়।
**রদের কারণ:**
- হিন্দু আন্দোলনের তীব্রতা।
- স্বদেশী আন্দোলনের সাফল্য।
- বিপ্লবী তৎপরতা বৃদ্ধি।
**ফলাফল:**
- বাংলা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয় (বিহার-ওড়িশা আলাদা
হয়)।
- রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়।
- মুসলিম সম্প্রদায় ক্ষুব্ধ হয় কারণ তারা
পূর্বাঞ্চলের সুবিধা হারায়। এটি হিন্দু-মুসলিম বিভেদকে আরও গভীর করে।
### দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
- **স্বাধীনতা আন্দোলনে:** স্বদেশী আন্দোলন ভারতীয়
জাতীয় কংগ্রেসকে গণভিত্তিক করে তোলে এবং চরমপন্থী-মধ্যপন্থী বিভাজন স্পষ্ট করে।
- **সাম্প্রদায়িক রাজনীতি:** মুসলিম লীগের উত্থান
এবং পৃথক নির্বাচনের দাবি শক্তিশালী হয়। এটি ১৯৪৭-এর দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ ও
ভারত-পাকিস্তান বিভাগের পথ প্রশস্ত করে।
- **বাংলায়:** বাঙালি জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়,
কিন্তু সাম্প্রদায়িক
বিভেদও বাড়ে।
**সারসংক্ষেপ:** বঙ্গভঙ্গ প্রশাসনিক সুবিধার নামে
ব্রিটিশদের রাজনৈতিক চাল ছিল। এটি স্বল্পমেয়াদে ব্যর্থ হয় কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে
ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের গতিপথ বদলে দেয়। এ ঘটনা থেকে
শিক্ষা যে, বিভেদের নীতি
সাময়িক সুবিধা দিলেও শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর ঐক্য ও আন্দোলনকে শক্তিশালী করে।
বঙ্গভঙ্গ (Partition
of Bengal) বাংলার ইতিহাসের তথা অবিভক্ত ভারতের রাজনীতিতে একটি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড
কার্জন প্রশাসনিক সংস্কারের অজুহাতে এই বিভাজন ঘোষণা করেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি
প্রশাসনিক সংস্কার মনে হলেও, এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল।
নিচে
বঙ্গভঙ্গের কারণ, ফলাফল এবং এর হ্রদ বা রদ হওয়ার ঘটনা বিস্তারিত আলোচনা
করা হলো:
১.
বঙ্গভঙ্গের পটভূমি ও কারণ
তৎকালীন 'বেঙ্গল
প্রেসিডেন্সি' বা বাংলা প্রদেশ ছিল বিশাল। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল
আজকের বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার,
ওড়িশা, আসাম এবং ছোটনাগপুর। এই বিশাল অঞ্চলের শাসনভার এককভাবে
পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল, যা
ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে। প্রধান কারণগুলোকে মূলত তিন ভাগে
ভাগ করা যায়:
ক.
প্রশাসনিক কারণ (অফিসিয়াল অজুহাত)
- বিশাল আয়তন: তৎকালীন বাংলার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লাখ।
একজন গভর্নরের পক্ষে এত বড় অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করা
কঠিন ছিল।
- যোগাযোগের অভাব: পূর্ব বাংলা ও আসামের অঞ্চলগুলো কলকাতা (তৎকালীন
রাজধানী) থেকে বেশ দূরে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে পূর্ব বাংলার
প্রশাসনিক তদারকি ঠিকমতো হতো না।
খ. রাজনৈতিক
কারণ (প্রধান ও গোপন উদ্দেশ্য)
- 'ভাগ করো এবং শাসন করো' (Divide and Rule) নীতি: ব্রিটিশরা দেখল যে, ভারতের
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতা এবং এখানকার হিন্দু
মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সমাজ। হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এই
রাজনৈতিক আন্দোলন দুর্বল করাই ছিল ব্রিটিশদের প্রধান লক্ষ্য।
- বাঙালি জাতীয়তাবাদ দমন: তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন এবং স্বরাষ্ট্র সচিব
এইচ. রিজলি মনে করতেন, "অবিভক্ত বাংলা একটি
বড় শক্তি; বিভক্ত হলে এর শক্তি কমে যাবে এবং রাজনৈতিক
আন্দোলনগুলো ভেঙে পড়বে।"
গ.
অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ
- পূর্ব বাংলার অবহেলা: সমস্ত বড় বড় শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালত কলকাতায় গড়ে উঠেছিল।
পূর্ব বাংলা থেকে রাজস্ব আদায় করে তা মূলত কলকাতার উন্নয়নে ব্যয় হতো। ফলে
পূর্ব বাংলার (বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের) অর্থনীতি স্থবির হয়ে
পড়েছিল।
- মুসলিম নেতৃবৃন্দের দাবি: নবাব সলিমুল্লাহ সহ পূর্ব বাংলার তৎকালীন মুসলিম
নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য একটি পৃথক প্রশাসনিক
কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
২. বঙ্গভঙ্গ
বাস্তবায়ন (১৯০৫)
১৯০৫ সালের
১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ আইন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাকে দুটি
প্রদেশে বিভক্ত করা হয়:
১. পূর্ববঙ্গ ও আসাম: এই প্রদেশের
মধ্যে ছিল পূর্ব বাংলা (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ) এবং আসাম। এর রাজধানী করা হয় ঢাকা। এই নতুন প্রদেশটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর প্রথম
গভর্নর ছিলেন স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার।
২. পশ্চিমবঙ্গ: এই প্রদেশের
মধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওড়িশা। এর রাজধানী থাকে কলকাতা। এটি ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল।
৩.
বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল
বঙ্গভঙ্গের
ঘোষণা তৎকালীন সমাজে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যা ভারতকে
স্থায়ীভাবে বদলে দেয়।
ক. মুসলিম
সমাজের প্রতিক্রিয়া (ইতিবাচক)
পূর্ব
বাংলার মুসলিম সমাজ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। তারা মনে করেছিল:
- ঢাকার গৌরব পুনরুজ্জীবিত হবে এবং এখানে নতুন
অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ গড়ে উঠবে।
- চাকুরির ক্ষেত্রে মুসলিমদের সুযোগ বাড়বে।
- এই রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের ফলেই ১৯০৬ সালে ঢাকায় 'আখিল
ভারত মুসলিম লীগ' গঠিত হয়।
খ. হিন্দু
সমাজের প্রতিক্রিয়া (নেতিবাচক)
কলকাতার
হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এবং জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ এই
বিভাজনের তীব্র বিরোধিতা করেন। তারা একে "মাতৃভূমির অঙ্গচ্ছেদ" হিসেবে
গণ্য করেন। এর ফলে দুটি বড় আন্দোলনের সূত্রপাত হয়:
- স্বদেশী আন্দোলন: ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের শপথ
নেওয়া হয়।
- বয়কট আন্দোলন: ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত এবং আইন অমান্য করার আন্দোলন শুরু হয়।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সময় ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে 'রাখীবন্ধন' উৎসবের
ডাক দেন এবং "আমার সোনার বাংলা" (যা বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয়
সঙ্গীত) গানটি রচনা করেন।
উগ্র
জাতীয়তাবাদের উত্থান: বঙ্গভঙ্গ
বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে খুদিরাম বসু, প্রফুল্ল
চাকী এবং বাঘা যতীনের মতো বিপ্লবীদের হাত ধরে বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের
(সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন) ব্যাপক বিস্তার ঘটে।
৪. বঙ্গভঙ্গ
রদ বা হ্রদ (১৯১১)
স্বদেশী
আন্দোলন, গণ-অসন্তোষ এবং বিপ্লবী তৎপরতার মুখে ব্রিটিশ সরকার
তীব্র চাপের মুখে পড়ে। অবশেষে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে ব্রিটিশ
সম্রাট পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ
হ্রদ (বাতিল) করার ঘোষণা
দেন।
- এর ফলে ১৯১২ সালে আবার দুই বাংলা এক হয়ে যায়।
- তবে পূর্ব বাংলার মুসলিমদের সান্ত্বনা দিতে এবং
ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও তা বাস্তবায়ন করা
হয়।
- একই সাথে ব্রিটিশরা ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে
সরিয়ে দিল্লিতে স্থানান্তর করে।
উপসংহার
বঙ্গভঙ্গ
স্থায়ী না হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯০৫
সালের এই বিভাজন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে রাজনৈতিক ও মানসিক দূরত্বের
জন্ম দিয়েছিল, তা আর কখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। অনেকেই মনে করেন, ১৯০৫ সালের
বঙ্গভঙ্গের মধ্যেই নিহিত ছিল ১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান বিভাজনের (এবং
প্রকারান্তরে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের) প্রথম রাজনৈতিক বীজ।
বঙ্গভঙ্গ (Partition
of Bengal) ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক
ঘটনা। দুই দফায় বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল: একবার ১৯০৫ সালে লর্ড
কার্জনের আমলে এবং অন্যটি ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়।
১. বঙ্গভঙ্গ
১৯০৫ (প্রথম বিভাজন)
১৯০৫ সালের
১৬ অক্টোবর ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলা প্রদেশকে বিভক্ত করেন।
- প্রেক্ষাপট ও কারণ: তৎকালীন বাংলা প্রেসিডেন্সি (বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা) আকারে
অনেক বড় ছিল এবং জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লাখ। ব্রিটিশ সরকারের দাবি ছিল,
এত বিশাল অঞ্চলের প্রশাসনিক শাসনভার এককভাবে
পরিচালনা করা দুরূহ ছিল। তবে এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল—বাংলা তথা
ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা।
- বিভাজনের রূপ: ঢাকা,
চট্টগ্রাম, রাজশাহী
বিভাগ, আসাম ও পার্বত্য ত্রিপুরা নিয়ে গঠিত হয় 'পূর্ব বাংলা ও আসাম' প্রদেশ, যার রাজধানী হয়
ঢাকা। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা
নিয়ে গঠিত হয় 'পশ্চিমবঙ্গ' প্রদেশ এবং এর রাজধানী থাকে কলকাতা।
- প্রতিক্রিয়া: পূর্ব
বাংলার মুসলমানরা (যাদের একটি বড় অংশ পিছিয়ে ছিল) এই বিভাজনকে বাঁচার সুযোগ
হিসেবে দেখলেও কলকাতার বুদ্ধিজীবী ও হিন্দু জমিদার শ্রেণী একে 'বাঙালি জাতির বিভাজন' হিসেবে
আখ্যা দিয়ে তীব্র বিরোধিতা করে। এর ফলে 'স্বদেশী
আন্দোলন' ও 'বয়কট' আন্দোলন শুরু হয়।
- বঙ্গভঙ্গ রদ: তীব্র
আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ দিল্লির
দরবার থেকে বঙ্গভঙ্গ রদ বা বাতিলের ঘোষণা দেন। বাংলাকে পুনরায় একত্রিত করা হয়,
তবে আসাম ও বিহারকে আলাদা প্রদেশ হিসেবে গঠন করা হয়।
BOU E-Book +9
২. বঙ্গভঙ্গ
১৯৪৭ (দ্বিতীয় বিভাজন)
১৯৪৭ সালে
ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা ও ভারত বিভাজনের অংশ হিসেবে বাংলা পুনরায় বিভক্ত হয়।
- প্রেক্ষাপট: মাউন্টব্যাটেন
পরিকল্পনার অধীনে ধর্মভিত্তিক বিভাজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে, বাংলার হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে
প্রদেশটিকে দুই ভাগ করার প্রস্তাব আসে।
- বিভাজনের রূপ: মুসলিম
সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয় (পরে যা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ
করে বাংলাদেশ হয়)। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
বঙ্গভঙ্গের
ফলাফল ও গুরুত্ব
- সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ: ১৯০৫ সালের বিভাজনটি হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের
মধ্যে যে মানসিক ও রাজনৈতিক দূরত্বের সৃষ্টি করেছিল, তা পরবর্তীতে দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং ১৯৪৭ সালের
দেশভাগের পথকে প্রশস্ত করে।
- রাজনৈতিক জাগরণ: বঙ্গভঙ্গ
বিরোধী আন্দোলন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে একটি আঞ্চলিক দল থেকে সারা
দেশব্যাপী গণআন্দোলনে রূপ নিতে সাহায্য করে।
বাংলা অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এই বিভাজন গভীর ক্ষত ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ছাপ রেখে গেছে।
স্বদেশী আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
স্বদেশী আন্দোলন ছিল বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে
ভারতের প্রথম সারাদেশব্যাপী গণআন্দোলন। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী এক বিশাল জনসভায় এ আন্দোলনের সূচনা হয়।
১. আন্দোলনের কারণ
- বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ: ব্রিটিশ সরকারের
বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদ।
- ব্রিটিশ পণ্য বর্জন: ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে
দেশীয় পণ্য ব্যবহারের আহ্বান।
২. আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ
- সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী
আন্দোলনের অন্যতম নেতা।
- বিপিনচন্দ্র পাল: "প্রফেট অব
ন্যাশনালিজম" হিসেবে পরিচিত।
- অরবিন্দ ঘোষ: "বন্দে মাতরম" পত্রিকার
সম্পাদক।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: "বাংলার মাটি বাংলার
জল" গান লিখে আন্দোলনে যোগ দেন।
৩. আন্দোলনের কর্মসূচি
- বিদেশি পণ্য বর্জন: ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে
দেশীয় পণ্য ব্যবহার।
- স্বদেশি পণ্য প্রচার: দেশীয় শিল্পের প্রসার।
- জাতীয় শিক্ষা: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
- রাজনৈতিক আন্দোলন: ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি
পেশ।
৪. আন্দোলনের প্রভাব
- বাঙালি জাতীয়তাবাদ: বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ।
- ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস: কংগ্রেসের নেতৃত্বে
ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন জোরালো হয়।
- মুসলিম লীগ গঠন: ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়,
যা পরে পাকিস্তান
আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫. আন্দোলনের ফলাফল
- বঙ্গভঙ্গ রদ: ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ
রদ করে।
- রাজধানী স্থানান্তর: রাজধানী কলকাতা থেকে
দিল্লিতে স্থানান্তর।
স্বদেশী আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক
গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
স্বদেশী
আন্দোলন (১৯০৫–১৯০৮)
পটভূমি ও
সূচনা
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী ও
সংগঠিত প্রতিবাদ। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না — এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ
জাতীয় জাগরণ, যা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
চারটি
প্রধান স্তম্ভ
১. বয়কট
আন্দোলন
বঙ্গভঙ্গ
কার্যকরের দিন, ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ থেকেই ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের ডাক দেওয়া
হয়। ম্যানচেস্টারের কাপড়, লিভারপুলের লবণ, বিলাতি চিনি
— সব পোড়ানো হয় প্রকাশ্যে। দোকানদাররা ব্রিটিশ পণ্য বিক্রি না করার শপথ নেন। এই
বয়কট সরাসরি ব্রিটিশ বাণিজ্যে আঘাত করে।
২. স্বদেশী
শিল্প প্রতিষ্ঠা
বিদেশি পণ্য
বর্জনের পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়। বাংলায় অনেক নতুন কলকারখানা
প্রতিষ্ঠিত হয় — বস্ত্র, সাবান, দিয়াশলাই, মাটির তৈরি
পাত্র। রবীন্দ্রনাথ নিজে শিলাইদহে গ্রামীণ সমবায় ও কুটিরশিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ
নেন।
৩. জাতীয়
শিক্ষা আন্দোলন
ব্রিটিশ
শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয় (১৯০৬)। লক্ষ্য ছিল
মাতৃভাষায়, ভারতীয় মূল্যবোধে শিক্ষার প্রসার। রবীন্দ্রনাথের
শান্তিনিকেতন এই ধারণার পথিকৃৎ ছিল।
৪. সশস্ত্র
বিপ্লবী ধারা
আন্দোলনের
একটি অংশ সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মতো
সংগঠন গঠিত হয়। ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী ১৯০৮ সালে কিংসফোর্ডকে হত্যার
চেষ্টা করেন। ক্ষুদিরামের ফাঁসি তাঁকে শহিদের মর্যাদা দেয়।
সাংস্কৃতিক
মাত্রা
স্বদেশী
আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ছিল না — এর সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল
সুদূরপ্রসারী।
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর এই সময় "আমার সোনার বাংলা", "বাংলার মাটি
বাংলার জল"-সহ অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন। ১৬ অক্টোবর রাখীবন্ধন উৎসব
পালন করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তা দেওয়া হয়। "বন্দে মাতরম" হয়ে
ওঠে আন্দোলনের প্রাণমন্ত্র। চিত্রশিল্প, নাটক,
কবিতায় জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রবলভাবে প্রকাশ পায়।
প্রধান
নেতৃত্ব
|
নেতা |
ভূমিকা |
|
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর |
সাংস্কৃতিক
নেতৃত্ব, রাখীবন্ধন উদ্যোক্তা |
|
সুরেন্দ্রনাথ
বন্দ্যোপাধ্যায় |
জনসভা ও
রাজনৈতিক সংগঠন |
|
বিপিনচন্দ্র
পাল |
চরমপন্থী
বক্তৃতা ও সংবাদপত্র |
|
বাল
গঙ্গাধর তিলক |
সর্বভারতীয়
সমর্থন |
|
অরবিন্দ
ঘোষ |
বিপ্লবী
দর্শন ও যুব নেতৃত্ব |
|
ক্ষুদিরাম
বসু |
সশস্ত্র
বিপ্লবের প্রতীক |
আন্দোলনের
সীমাবদ্ধতা
সাফল্যের
পাশাপাশি আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু
বাঙালিকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামের কৃষক ও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে সংযুক্ত করা
যায়নি। ব্রিটিশ দমননীতি ও নেতৃত্বের গ্রেফতারে আন্দোলন ১৯০৮ সালের পর দুর্বল হয়ে
পড়ে।
ঐতিহাসিক
গুরুত্ব
স্বদেশী
আন্দোলন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে। প্রথমবারের মতো
রাজনৈতিক আন্দোলনে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ হয়। বয়কটের কৌশল পরবর্তীতে
গান্ধীজির অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের পথ দেখায়। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের
ধারণা প্রথমবার জনমানসে প্রোথিত হয়, যা স্বাধীনতার পরেও ভারতের আত্মনির্ভর
অর্থনৈতিক নীতির ভিত্তি তৈরি করে।
সংক্ষিপ্ত
উত্তর:
স্বদেশী আন্দোলন (Swadeshi Movement) ছিল 1905–1911
সময়কালে ব্রিটিশ ভারতের একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিরোধ-আন্দোলন,
যার মূল কৌশল ছিল বিলেতি পণ্য বর্জন (boycott) ও দেশীয়
পণ্য ও শিল্পের উৎসাহ। এই আন্দোলন বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয়ে ভারতীয়
জাতীয়তা, শিক্ষাবিদ্যা ও সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবন ত্বরান্বিত করে
এবং পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মৌলিক ভিত্তি গড়ে তোলায় সাহায্য
করে.wikipedia+1
প্রেক্ষাপট
ও সূচনা
- 1905 সালে বাংলা প্রেসিডেন্সিকে ব্রিটিশ প্রশাসনের
দ্বারা বিভক্ত করার (বঙ্গভঙ্গ) সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে এই
আন্দোলন শুরু হয়; বিশেষত বাঙালি শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী
ও ছাত্রসমাজ এতে সক্রিয় ছিল.songramernotebook+1
- স্বদেশী আন্দোলনকে মূলত কংগ্রেসের উগ্রপন্থী অংশ ও
স্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও প্রতিনিধিরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন; আন্দোলনের নীতিগুলো ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দিকে নজর দেওয়া.sattacademy+1
লক্ষ্য ও
কৌশলসমূহ
- প্রধান লক্ষ্য: ব্রিটিশ শাসনকে দুর্বল করা ও
ভারতীয় অর্থনীতি-শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা।.wikipedia
- কৌশল: বিদেশী (ব্রিটিশ) পণ্যের বয়কট, দেশীয় পণ্য ও হস্তশিল্প (khadi, indigenous
textiles) এবং স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠা, জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠন, প্রতিবাদী সমাবেশ ও প্রেস-প্রচারণা।.ebanglalibrary+1
- ছাত্র-ভূমিকা: ছাত্রদল — বিশেষত ‘এন্টি সার্কুলার
সোসাইটি’ মত সংগঠন — স্কুল-কলেজ থেকে বহিষ্কৃত ছাত্রদের কেন্দ্র করে সক্রিয়
ভূমিকা পালন করে; তারা বয়কট, সমাবেশ
ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প (জাতীয় বিদ্যালয়) গঠন করে.songramernotebook
প্রধান
নেতারা ও বুদ্ধিজীবীরা
- আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন লোকমান্য তিলক, লালা লাজপত রায়, অরবিন্দ
ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত নেতারা; এছাড়া বিপিন চন্দ্র পাল, আবদুর
রসুল সহ ছাত্রনেতারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন.wikipedia+1
- স্বাধীনচেতা বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকরা সাংস্কৃতিক
আন্দোলন পরিচালনা করেন—রবীন্দ্র-সঙ্গীত, নাটক ও
প্রকাশনা ঘর আন্দোলনকে শক্তি দেয়।.wikisource
আন্দোলনের
ক্রিয়া-কলাপ ও ঘটনাবলি
- বয়কট প্রচারণা: গ্রামে-শহরে মানুষ বিদেশি পণ্য না
কেনার স্বভাব গড়ে তোলে; কলকাতা ও অন্যান্য শহরে বয়কট পণ্যের দোকান তালিকা
ও স্বদেশী পণ্যের দোকান সম্প্রসারণ হয়।.sattacademy
- জাতীয় বিদ্যালয়/কলেজ: বহিষ্কৃত ছাত্র ও শিক্ষকরা
দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে—যেমন রংপুর, বরিশাল
ও অন্যান্য জায়গায় জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা।.songramernotebook
- সরকারী দমন: ব্রিটিশ প্রশাসন বয়কটকারীদের বিরুদ্ধে
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে—ছাত্র বহিষ্কার, কেলেঙ্কারী,
পুলিশি কার্যক্রম; এতে
অনেক স্থানে সংঘর্ষও ঘটেছে।.sattacademy+1
সাংস্কৃতিক
ও আর্থিক প্রভাব
- দেশীয় শিল্পে উত্সাহ: বয়কট ও স্বদেশী নীতির কারণে
তুলা-হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্প বাড়ে; মানুষের
মধ্যে স্বনির্ভরতার চেতনা জাগে।.wikipedia
- সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবন: শিক্ষাব্যবস্থা, সাহিত্য ও কলা-সংস্কৃতি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে
জাতীয় চেতনা শক্তিশালী হয়—গান, নাটক ও সংবাদপত্র
আন্দোলনের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।.wikisource
রাজনৈতিক
পরিণতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
- শাসনচাপে পরিবর্তন: তীব্র প্রতিবাদ ও বয়কটের কারণে
ব্রিটিশ সরকার চাপের সম্মুখীন হয়ে 1911 সালে
বঙ্গভঙ্গ বাতিল করে এবং দিল্লিতে রাজদূত সভার সিদ্ধান্তে কিছু প্রশাসনিক
পরিবর্তন আনে—এতে আন্দোলন অমীমাংসিত সাফল্য পান।.wikipedia
- স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান: স্বদেশী আন্দোলন পরবর্তী
দিকের বৃহত্তর জাতীয় আন্দোলনের (বিশেষত গান্ধীবাদী অখ্যাত কৌশলগুলো) জন্য
নীতিগত ও সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে; বয়কট
ও স্বদেশী কৌশল পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনে বারবার ব্যবহৃত হয়।.sattacademy+1
- সাম্প্রদায়িক অনুষঙ্গ: যদিও স্বদেশী আন্দোলন অনেক
সময় অসাম্প্রদায়িকভাবে সংগঠিত হত, তবে তার রাজনৈতিক
পরিণামে হিন্দু-মুসলিম রাজনীতির ভিন্নমুখী প্রবণতার সূচনা ও উদ্যোগিক বিভাজন
দেখা যায়—এটি পরবর্তী দশকগুলোর রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে।.banglapedia
উদাহরণ
(সংক্ষিপ্ত চিত্র)
- 1905–1908-এর মধ্যে কলকাতা ও পূর্ব বাংলার স্কুল-কলেজে
ছাত্র-আন্দোলন ও বহিষ্কার ব্যাপকভাবে ঘটেছিল; বহু
শহরে জাতীয় বাজার ও হস্তশিল্পের বিকাশ লক্ষণীয় ছিল।.sobbanglay+1
সংক্ষিপ্ত
সময়রেখা
- 1905: বঙ্গভঙ্গ ও প্রথম প্রতিক্রিয়ামূলক প্রতিবাদ।.wikipedia
- 1905–1908: স্বদেশী আন্দোলনের তীব্র পর্যায়; বয়কট, ছাত্রসংগঠন ও
জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিস্তার।.songramernotebook
- 1911: আন্দোলনের ফলস্বরূপ বঙ্গভঙ্গ রদ; আন্দোলন মন্দায় হলেও তার ধারণা স্বাধীনতা-চেতনায়
স্থায়ী প্রভাব ফেলে।.wikipedia
পঠন-সূত্র
(আরো জানতে)
- বাংলাপিডিয়া — স্বদেশী আন্দোলন.banglapedia
- সংকলিত প্রবন্ধ ও ইতিহাস পাঠ্যসূচি—স্থানীয় অনলাইন
লেখাসমূহ ও শিক্ষামূলক পোর্টালগুলোর সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ.sattacademy+1
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়ায়
যে **স্বদেশী আন্দোলন** শুরু হয়, তা ছিল ভারতের
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সফল গণ-আন্দোলন । এটি কেবল একটি অস্থায়ী প্রতিবাদ ছিল
না, বরং এটি ব্রিটিশ শাসনের
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও
সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
### 🧐
আন্দোলনের পটভূমি ও সূচনা
স্বদেশী আন্দোলন হঠাৎ করেই তৈরি হয়নি। এর পেছনে
ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও কিছু তাৎক্ষণিক কারণ:
* **অর্থনৈতিক
শোষণ**: দাদাভাই নওরোজির "সম্পদ নির্গমন" তত্ত্ব এবং রমেশচন্দ্র দত্তের
লেখনী থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, ভারত ব্রিটেনের
কাঁচামালের উৎস ও তৈরি পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছিল ।
* **মধ্যপন্থীদের
সীমাবদ্ধতা**: ১৮৯০-এর দশকে কংগ্রেসের মধ্যপন্থী নেতাদের আবেদন-নিবেদনের নীতি
অকার্যকর প্রতীয়মান হলে "লাল-বাল-পাল" (লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল)-এর নেতৃত্বে চরমপন্থী
নেতৃত্বের উত্থান ঘটে ।
* **বঙ্গভঙ্গের
স্ফুলিঙ্গ**: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে স্বদেশী
আন্দোলনের সূচনা হয়। এই দিনটিকে বাঙালি জাতি "শোক দিবস" হিসেবে পালন করে
।
### 🔥
আন্দোলনের রূপ ও কর্মসূচি
এটি ছিল একটি বহুমুখী আন্দোলন, যার প্রধান দুটি দিক ছিল নেতিবাচক (বয়কট) ও
ইতিবাচক (গঠনমূলক স্বদেশী)।
* **বর্জন (Boycott)**:
*
**অর্থনৈতিক বয়কট**: বিদেশি
পণ্য, বিশেষ করে ম্যানচেস্টারের
বস্ত্র ও লিভারপুলের লবণ প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং বিদেশি দ্রব্য বিক্রির
দোকানে পিকেটিং করা হয় ।
*
**প্রাতিষ্ঠানিক বয়কট**:
অরবিন্দ ঘোষের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত ও প্রশাসনিক দপ্তর বর্জনের ডাক দেওয়া হয়
।
* **গঠনমূলক স্বদেশী
(Constructive Swadeshi)**:
*
**স্বদেশী শিল্প**:
বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলস, বেঙ্গল
কেমিক্যালস, টাটা আয়রন
অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি এবং ভি.ও. চিদম্বরম পিল্লাইয়ের স্বদেশী স্টিম ন্যাভিগেশন
কোম্পানির মতো দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে ।
*
**জাতীয় শিক্ষা**: ১৯০৬
সালে "জাতীয় শিক্ষা পরিষদ" গঠিত হয় এবং বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ (বর্তমান
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বসূরী) প্রতিষ্ঠিত হয় ।
*
**আত্মশক্তির বিকাশ**:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'আত্মশক্তি'র ধারণা দেন, যার অর্থ আত্মনির্ভরশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের
মাধ্যমে জাতির পুনর্গঠন ।
* **গণসংযোগ ও
সংগঠন**:
*
**স্বদেশী সমিতি**:
অশ্বিনীকুমার দত্তের "স্বদেশ বান্ধব সমিতি"র মতো অসংখ্য সমিতি গড়ে ওঠে
যা জনগণকে সংগঠিত করার মূল বাহন ছিল ।
*
**সংবাদপত্র**: "বন্দে
মাতরম", "যুগান্তর" ও
"নিউ ইন্ডিয়া"র মতো সংবাদপত্র আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখে ।
### 🎨
সংস্কৃতিতে স্বদেশী ভাবনা
স্বদেশী আন্দোলন ছিল এক সাংস্কৃতিক জাগরণ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ সময় 'আমার সোনার বাংলা'
ও 'একলা চলো রে'র মতো কালজয়ী গান রচনা করেন । অন্যদিকে,
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ভারতমাতা' চিত্রকর্মটি জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী প্রতীকে
পরিণত হয় । একই সময়ে জগদীশ চন্দ্র বসুর বৈজ্ঞানিক গবেষণা দেশীয় প্রতিভার এক
উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ।
### 📉
আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা ও
পতন
তীব্রতা সত্ত্বেও ১৯০৮ সালের মধ্যেই আন্দোলন
দুর্বল হয়ে পড়ে।
* **সাম্প্রদায়িক
বিভাজন**: আন্দোলনে হিন্দু উৎসব ও প্রতীকের আধিক্য অনেক মুসলিমকে দূরে সরিয়ে দেয়।
পূর্ব বাংলার মুসলিম কৃষক ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ এতে যোগ দেয়নি, যা পরবর্তীতে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার
পথ প্রশস্ত করে ।
* **সীমিত
গণভিত্তি**: এই আন্দোলন মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত "ভদ্রলোক" শ্রেণির
মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ কৃষক সমাজকে এর সাথে সম্পৃক্ত করা যায়নি ।
* **কংগ্রেসের
বিভাজন**: ১৯০৭ সালে সুরাট অধিবেশনে কংগ্রেস চরমপন্থী ও মধ্যপন্থীদের মধ্যে বিভক্ত
হয়ে যায়, যা আন্দোলনের
পতনকে ত্বরান্বিত করে ।
### 💡
আন্দোলনের স্থায়ী প্রভাব
স্বদেশী আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি, বরং ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে এক নতুন পথ দেখিয়েছিল।
* **ভবিষ্যতের
রূপরেখা**: বয়কট ও স্বদেশী ছিল পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ ও আইন
অমান্য আন্দোলনের মূল অনুপ্রেরণা । অরবিন্দ ঘোষের "প্যাসিভ
রেজিস্ট্যান্স" বা নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের ধারণাও ভবিষ্যৎ আন্দোলনের
দিকনির্দেশনা দেয় ।
* **শিল্প ও শিক্ষার
বিকাশ**: আন্দোলনের সময় গড়ে ওঠা টাটা, গোদরেজ, বেঙ্গল
কেমিক্যালসের মতো প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে ভারতের শিল্প বিকাশে নেতৃত্ব দেয় । জাতীয়
শিক্ষা আন্দোলনও শিক্ষাক্ষেত্রে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
সবশেষে বলা যায়, স্বদেশী আন্দোলন ছিল মানসিক ও সাংস্কৃতিক
দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রথম সম্মিলিত চেষ্টা। এটি ব্রিটিশদের শোষণমূলক শাসনের
বিরুদ্ধে ভারতীয় জাতির আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতার এক বলিষ্ঠ ঘোষণাপত্র ছিল।
স্বদেশী
আন্দোলন
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। “স্বদেশী” শব্দের অর্থ
হলো নিজের দেশীয় জিনিস ব্যবহার করা। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশি পণ্য
বর্জন করে দেশীয় শিল্প ও সংস্কৃতিকে উন্নত করা এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনমত
গড়ে তোলা।
📌
স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমি
১৯০৫ সালে
ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলা প্রদেশকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন। এই ঘটনাকে বলা হয়
বঙ্গভঙ্গ।
বাংলার জনগণ মনে করেছিল—
- এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়,
- বরং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য নষ্ট করার ব্রিটিশ কৌশল।
এর প্রতিবাদ
থেকেই স্বদেশী আন্দোলনের জন্ম হয়।
📌
স্বদেশী আন্দোলনের উদ্দেশ্য
প্রধান
উদ্দেশ্য ছিল—
- ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করা
- দেশীয় শিল্পের উন্নয়ন
- জাতীয় চেতনা বৃদ্ধি
- ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা
- অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন
📌
আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচি
১. বিদেশি
পণ্য বর্জন
- ব্রিটিশ কাপড়, চিনি,
লবণ ইত্যাদি বর্জন করা হয়।
- বিদেশি কাপড় প্রকাশ্যে পোড়ানো হতো।
২. দেশীয়
পণ্যের ব্যবহার
- হাতে তৈরি কাপড় ও দেশীয় শিল্পপণ্যের ব্যবহার
বাড়ানো হয়।
- তাঁতশিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্প উৎসাহ পায়।
৩. জাতীয়
শিক্ষা আন্দোলন
- ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প গড়ার
চেষ্টা হয়।
- জাতীয় বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
৪.
গণআন্দোলন ও সভা
- মিছিল, সভা, গান, নাটক ও প্রচারণার
মাধ্যমে আন্দোলন পরিচালিত হয়।
৫.
সাংস্কৃতিক জাগরণ
- দেশাত্মবোধক গান ও সাহিত্য জনপ্রিয় হয়।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখীবন্ধন উৎসবের মাধ্যমে
হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ডাক দেন।
📌
আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ
স্বদেশী
আন্দোলনে অনেক নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন—
- সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
- বিপিনচন্দ্র পাল
- অরবিন্দ ঘোষ
- বাল গঙ্গাধর তিলক
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
📌
স্বদেশী আন্দোলনের ফলাফল
ইতিবাচক দিক
- জাতীয়তাবাদী চেতনা বৃদ্ধি পায়।
- দেশীয় শিল্পের উন্নয়ন ঘটে।
- জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ে।
- স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
নেতিবাচক
দিক
- ব্রিটিশ সরকার দমননীতি গ্রহণ করে।
- অনেক নেতা গ্রেফতার হন।
- আন্দোলনের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনও কিছুটা
বৃদ্ধি পায়।
📌
বঙ্গভঙ্গ রদ
স্বদেশী
আন্দোলনের তীব্র প্রতিবাদের ফলে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য
হয়।
📌
স্বদেশী আন্দোলনের গুরুত্ব
স্বদেশী
আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন দিক উন্মোচন করে।
এটি ছিল—
- প্রথম বৃহৎ গণআন্দোলন,
- অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের সূচনা,
- এবং পরবর্তী অসহযোগ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি।
🔚
উপসংহার
স্বদেশী
আন্দোলন শুধু বিদেশি পণ্য বর্জনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল
আত্মমর্যাদা, জাতীয় চেতনা ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের প্রতীক। এই
আন্দোলন ভারতীয় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকে শক্তিশালী ভিত্তি
প্রদান করে।
**স্বদেশী আন্দোলন (১৯০৫-১৯০৮/১১)** ভারতীয়
স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। এটি ব্রিটিশবিরোধী প্রথম বড়
গণ-আন্দোলন হিসেবে পরিচিত, যা
**বঙ্গভঙ্গ**কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এর মূলমন্ত্র ছিল **স্বদেশী** (নিজ দেশের
জিনিস) এবং **বয়কট** (বিদেশী পণ্য বর্জন)।
### পটভূমি ও কারণ
১৯০৩ সালে লর্ড কার্জন বাংলা প্রদেশ ভাগের
প্রস্তাব করেন। ১৯ জুলাই ১৯০৫-এ ঘোষণা এবং ১৬ অক্টোবর ১৯০৫-এ কার্যকর হয়।
প্রশাসনিক সুবিধার কথা বলা হলেও আসল উদ্দেশ্য ছিল **"Divide and
Rule"** — বাঙালি জাতীয়তাবাদকে
দুর্বল করা এবং হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি করা।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া
দেখা দেয়। ৭ আগস্ট ১৯০৫ কলকাতা টাউন হলে বয়কট রেজোলিউশন পাস হয় এবং স্বদেশী
আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
### উদ্দেশ্য
- ব্রিটিশ পণ্য বয়কট করে দেশীয় শিল্প ও উৎপাদনকে
উৎসাহিত করা।
- অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা (স্বদেশী) গড়ে তোলা।
- জাতীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐক্যবোধ জাগ্রত করা।
- বঙ্গভঙ্গ রদ করা।
### নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব
- **লাল-বাল-পাল** (Lal-Bal-Pal): লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল — চরমপন্থী নেতৃত্ব।
- **সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়** — মধ্যপন্থীদের
নেতৃত্ব।
- **রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর**: দেশাত্মবোধক গান (যেমন
*আমার সোনার বাংলা*, *বাংলার মাটি
বাংলার জল*), রাখিবন্ধন উৎসব,
বয়কট প্রচার। তিনি পরে
আন্দোলনের কিছু পদ্ধতি (বিশেষ করে জোর করে বয়কট) থেকে সরে যান।
- **অরবিন্দ ঘোষ**, অশ্বিনীকুমার দত্ত, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ।
- অন্যান্য: আবানীন্দ্রনাথ ঠাকুর (*ভারতমাতা*
চিত্র), প্রফুল্লচন্দ্র রায়
(বাংলা কেমিক্যালস)।
আন্দোলন বাংলায় সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল, কিন্তু মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, মাদ্রাজেও ছড়িয়ে পড়ে।
### কর্মসূচি ও পদ্ধতি
- **বয়কট**: বিদেশী কাপড়, লবণ, চিনি ইত্যাদি বর্জন। দোকানে পিকেটিং।
- **স্বদেশী**: দেশীয় কাপড় (খদ্দর), শিল্প প্রতিষ্ঠা (ব্যাংক, বীমা, জাহাজ নির্মাণ)।
- **জাতীয় শিক্ষা**: ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন
গঠন (১৯০৬), জাতীয় কলেজ ও
বিদ্যালয় স্থাপন।
- **সমিতি গঠন**: অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর — শারীরিক প্রশিক্ষণ ও পরে বিপ্লবী
কার্যকলাপ।
- **সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড**: বন্দে মাতরম গান,
শিবাজী উৎসব, রাখিবন্ধন, আরন্ধন (রান্না না করে অনশন)।
- গ্রামে প্রচার, নাটক, গান, পত্রিকা
(সঞ্জীবনী, বেঙ্গলী)।
### প্রভাব ও ফলাফল
**ইতিবাচক:**
- ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জাগরণ; প্রথম গণ-আন্দোলন।
- কংগ্রেসে চরমপন্থী-মধ্যপন্থী বিভাজন স্পষ্ট হয়
(১৯০৭ সুরাট বিভাগ)।
- দেশীয় শিল্পের উন্নতি (যদিও সীমিত)।
- বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদের উত্থান।
- গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
**নেতিবাচক/সীমাবদ্ধতা:**
- মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় অংশ দূরে সরে যায়
(হিন্দু প্রতীকের ব্যবহারের কারণে) → ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন।
- সরকারি দমনমূলক নীতি (১৯০৮-এ অনেক নেতা
গ্রেপ্তার)।
- ১৯০৮ সাল নাগাদ আন্দোলনের তীব্রতা কমে যায়।
**বঙ্গভঙ্গ রদ:** ১৯১১ সালে কিং জর্জ পঞ্চমের
দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করা হয় (বিহার-ওড়িশা আলাদা হয়)। রাজধানী কলকাতা
থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়।
### দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য
স্বদেশী আন্দোলন শুধু বয়কট নয়, এটি ছিল **আত্মনির্ভরতা ও জাতীয় চেতনার**
আন্দোলন। এটি দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক প্রতিরোধ রাজনৈতিক স্বাধীনতার শক্তিশালী
হাতিয়ার হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের *ঘরে-বাইরে* উপন্যাসে এর জটিলতা ফুটে উঠেছে।
এই আন্দোলন বাংলার নবজাগরণকে আরও প্রসারিত করে
এবং পরবর্তীকালের সব বড় আন্দোলনের (অসহযোগ, আইন অমান্য) পথ প্রশস্ত করে।
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে প্রথম সফল এবং
অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি গণ-আন্দোলন। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক ঘোষিত 'বঙ্গভঙ্গ'
(বাংলা ভাগ)-এর তীব্র প্রতিবাদ হিসেবে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। এর মূল
দর্শন ছিল—ব্রিটিশ পণ্য ও শাসন বর্জন (Boycott) করা এবং
দেশীয় তথা 'স্বদেশী' পণ্য ও
সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো।
নিচে
স্বদেশী আন্দোলনের কারণ, গতিপ্রকৃতি, গুরুত্ব ও এর সীমাবদ্ধতা বিস্তারিত আলোচনা
করা হলো:
১. স্বদেশী
আন্দোলনের পটভূমি ও কারণ
১৯০৫ সালের
১৬ই অক্টোবর ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে ঢাকাকে রাজধানী করে 'পূর্ববঙ্গ ও
আসাম' এবং কলকাতাকে রাজধানী করে 'পশ্চিমবঙ্গ'
নামে দুটি আলাদা প্রদেশ গঠন করে।
বাঙালি
বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বুঝতে পেরেছিলেন যে, এর আসল
উদ্দেশ্য ছিল উদীয়মান বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করা এবং হিন্দু-মুসলিম
সম্প্রদায়ের মধ্যে ফাটল ধরানো। এই রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের
ক্ষোভ যখন চরমে পৌঁছায়, তখন কেবল আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি পরিহার করে এক
যুগান্তকারী ও সক্রিয় প্রতিরোধের পথ বেছে নেওয়া হয়—যা ইতিহাসে 'স্বদেশী
আন্দোলন' নামে পরিচিত।
২.
আন্দোলনের প্রধান দুটি স্তম্ভ বা ধারা
স্বদেশী
আন্দোলন মূলত দুটি প্রধান কৌশলের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছিল:
ক. বয়কট বা
বর্জন আন্দোলন
ব্রিটিশদের
অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য বিলাতি পণ্য বর্জনের ডাক দেওয়া হয়।
- পণ্য বর্জন: বিলাতি কাপড়, লবণ,
চিনি, কাঁচের চুড়ি এবং
অন্যান্য বিদেশি সামগ্রী কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ছাত্র ও যুবকেরা
হাটে-বাজারে পিকেটিং করে বিলাতি পণ্যের দোকানে স্তূপ করে আগুন ধরিয়ে দেয়।
- উপাধি ও চাকরি বর্জন: বহু সরকারি কর্মচারী চাকরি থেকে ইস্তফা দেন এবং
আইনজীবীরা ব্রিটিশ আদালত বর্জন করতে শুরু করেন।
খ. স্বদেশী
বা দেশীয় শিল্পের বিকাশ
কেবল বিদেশি
পণ্য বর্জন করলেই চলবে না, তার বিকল্প হিসেবে নিজেদের পণ্য তৈরি করতে হবে—এই চিন্তা
থেকে 'স্বদেশী' ধারণার জন্ম।
- বস্ত্র শিল্প: সাধারণ মানুষ মোটা তাঁতের কাপড় পরা শুরু করে। কবি
রজনীকান্ত সেনের সেই বিখ্যাত গান—"মায়ের
দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই" এই সময়েরই সৃষ্টি। বাংলায় বহু নতুন টেক্সটাইল মিল ও
তাঁত শিল্প গড়ে ওঠে।
- অন্যান্য উদ্যোগ: আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (P.C. Ray) গড়ে তোলেন বিখ্যাত 'বেঙ্গল কেমিক্যালস'। এছাড়াও দেশীয় উদ্যোগে সাবান, ম্যাচ, কাগজ, চামড়ার কারখানা এবং স্বদেশী ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি
প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. সংস্কৃতি,
শিক্ষা ও সমাজে প্রভাব
স্বদেশী
আন্দোলন কেবল রাজনীতি ও অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি বাঙালির
শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এক বিশাল জোয়ার এনেছিল।
- জাতীয় শিক্ষা (National Education): ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্জন করায়
শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প হিসেবে 'জাতীয়
শিক্ষা পরিষদ' (National Council of Education) গঠিত
হয়। এর অধীনে বেশ কিছু জাতীয় বিদ্যালয় এবং আজকের বিখ্যাত যাদবপুর
বিশ্ববিদ্যালয় (তৎকালীন বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট) গড়ে ওঠে।
- সাহিত্য ও সঙ্গীত: এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, মুকুন্দ
দাস অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ এই সময়েই তাঁর বিখ্যাত 'আমার সোনার বাংলা' গানটি
লেখেন এবং সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে 'রাখীবন্ধন' উৎসবের
সূচনা করেন।
৪. উগ্র
জাতীয়তাবাদ ও সশস্ত্র বিপ্লবের সূচনা
আন্দোলন
দমনে ব্রিটিশ সরকার চরম লাঠিচার্জ, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধকরণ এবং বন্দি করার মতো
দমন নীতি গ্রহণ করে। ফলে নরমপন্থী বা অহিংস আন্দোলনের প্রতি যুব সমাজের একটি বড়
অংশের আস্থা উঠে যায়। এর মধ্য দিয়ে বাংলায় অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রকুমার
ঘোষ, বাঘা যতীন, খুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীর মতো বিপ্লবীদের নেতৃত্বে সশস্ত্র বিপ্লবী ধারা বা গুপ্ত সমিতির (যেমন: অনুশীলন
সমিতি ও যুগান্তর দল) উত্থান ঘটে।
৫.
আন্দোলনের ফলাফল ও গুরুত্ব
স্বদেশী
আন্দোলন পুরোপুরি সফল না হলেও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল:
- অর্থনৈতিক ধাক্কা: ব্রিটিশ ম্যানচেস্টারের কাপড়ের ব্যবসা এবং লবণ
শিল্পে ধস নামে, যা ব্রিটিশ সরকারকে চরম অর্থনৈতিক লোকসানের মুখে
ফেলে।
- বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১): আন্দোলনের তীব্রতা এবং বিপ্লবী তৎপরতার মুখে টিকতে
না পেরে অবশেষে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য
হয়।
- ভবিষ্যৎ আন্দোলনের ভিত্তি: এই আন্দোলনই প্রথম ভারতীয়দের শেখায় যে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে 'অর্থনৈতিক বর্জন' একটি
বড় হাতিয়ার হতে পারে। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর 'অসহযোগ'
এবং 'আইন অমান্য'
আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল এই স্বদেশী আন্দোলনের
কৌশল।
৬.
আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা
এত বড়
আন্দোলন হওয়া সত্ত্বেও এর কিছু ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা ছিল:
- সাম্প্রদায়িক দূরত্ব: আন্দোলনের নেতৃত্ব ও প্রতীকগুলো মূলত হিন্দু ধর্মীয়
ঐতিহ্য ও জাতীয়তাবাদ নির্ভর হওয়ায় তৎকালীন পূর্ব বাংলার সিংহভাগ মুসলিম
জনসংখ্যা এবং ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর মতো নেতৃবৃন্দ এই আন্দোলন থেকে দূরে
থাকেন। ফলে হিন্দু-মুসলিম মানসিক দূরত্ব আরও বাড়ে।
- কৃষক শ্রেণীর অভাব: আন্দোলনটি মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত
শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ কৃষক সমাজের অর্থনৈতিক সমস্যা ও
দুঃখ-দুর্দশা এই আন্দোলনের মূল এজেন্ডায় স্থান পায়নি।
উপসংহার
সীমাবদ্ধতা
থাকা সত্ত্বেও, ১৯০৫ সালের স্বদেশী আন্দোলন ছিল বাঙালির স্বাধিকার
চেতনার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এটি পরাধীন ভারতের মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতে
শিখিয়েছিল এবং আত্মমর্যাদার যে বীজ বপন করেছিল, তা-ই
পরবর্তীতে ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পথে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী
গণআন্দোলন। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার প্রতিবাদে
এর সূচনা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন
এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানো।
আন্দোলনের
পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
- বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫): ব্রিটিশ সরকার বঙ্গীয় প্রদেশকে বিভক্ত করার
সিদ্ধান্ত নিলে বাঙালিরা এর তীব্র বিরোধিতা করে।
- মূল রণকৌশল: প্রাথমিক
পর্যায়ে আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে ব্যর্থ হয়ে আন্দোলনকারীরা ব্রিটিশ পণ্য
বর্জন, স্বদেশী দ্রব্যের ব্যবহার, রাখি বন্ধন, এবং
অরন্ধনের মতো পন্থা গ্রহণ করেন।
আন্দোলনের
দুটি মূল ধারা
- গঠনমূলক স্বদেশী: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো ব্যক্তিদের
উদ্যোগে স্বদেশী শিল্প-কারখানা স্থাপন, সতীশচন্দ্র
মুখার্জীর জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন ও
গ্রাম উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করা হয়।
- রাজনৈতিক চরমপন্থা: বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ
ঘোষ, এবং বাল গঙ্গাধর তিলক প্রমুখ নেতার নেতৃত্বে
ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন ও চরমপন্থী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়।
গুরুত্ব ও
সাফল্য
এই আন্দোলনের ফলে বিদেশি কাপড়ের ব্যবহার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায় এবং দেশীয়
তাঁত, সাবান, ম্যাচ ও বস্ত্রশিল্পের বিকাশ ঘটে। অর্থনীতিতে
স্বনির্ভরতা আসার পাশাপাশি ছাত্র, নারী ও শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে
জাতীয়তাবাদী চেতনা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি কী ছিল? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিশ্লেষণ করুন ।
নিচে তিনটি
স্তরে আলোচনাটি সাজানো হয়েছে — প্রতিষ্ঠার পটভূমি, ভদ্রলোক
হিন্দুদের বিরোধিতা, এবং উপনিবেশিক সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা। প্রথমে
প্রেক্ষাপটটি একটি কাঠামোচিত্রে দেখানো হচ্ছে।
প্রথম অংশ:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
রাজনৈতিক
প্রেক্ষাপট: বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষত
১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদ পূর্ববঙ্গের মুসলমান জনগোষ্ঠীর জন্য ছিল গভীর রাজনৈতিক আঘাত। নতুন
প্রদেশে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে ঢাকাকে রাজধানী পেয়েছিলেন, নতুন
প্রশাসনিক সুযোগ পাচ্ছিলেন — হঠাৎ সবকিছু বাতিল হয়ে গেল। ব্রিটিশ সরকার বুঝতে
পেরেছিল এই সিদ্ধান্তে মুসলমানদের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে।
ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন তাই হয়ে ওঠে এক ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ।
দিল্লি
দরবারে (১৯১১) রাজা পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণার পরপরই, ১৯১২ সালের
ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় একটি প্রতিনিধিদল ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে সাক্ষাৎ
করে। নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে এই দলটি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের
দাবি পেশ করেন।
নাথান কমিশন
ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি
১৯১২ সালে
গঠিত নাথান কমিশন (R.N. Nathan-এর নেতৃত্বে) ঢাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়
স্থাপনের সুপারিশ করে। কমিশনের রিপোর্ট পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষার করুণ অবস্থার চিত্র
তুলে ধরে — কলকাতামুখী শিক্ষাকাঠামোয় পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা উচ্চশিক্ষা থেকে
কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিলেন।
প্রথম
বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) পরিকল্পনাকে কিছুটা বিলম্বিত করে, কিন্তু ১৯২০
সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হয় এবং ১ জুলাই ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়
যাত্রা শুরু করে।
ঢাকার নবাব
পরিবারের অবদান
নবাব পরিবার
কেবল রাজনৈতিক দাবি করেননি, বাস্তব অবদানও রেখেছিলেন। নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৬০০ একরের বেশি জমি দান করেন, যেখানে
আজকের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গড়ে উঠেছে। ঢাকার অভিজাত মুসলিম পরিবারগুলো অর্থ
ও সমর্থনে এগিয়ে আসে।
দ্বিতীয়
অংশ: ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
"ভদ্রলোক"
কারা?
"ভদ্রলোক"
ছিলেন কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চবর্ণ হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত — মূলত ব্রাহ্মণ,
কায়স্থ ও বৈদ্য — যারা ব্রিটিশ শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরি, আইন ও
সাংবাদিকতায় আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। বাংলার রাজনীতি ও শিক্ষার উপর তাদের
একচেটিয়া প্রভাব ছিল।
বিরোধিতার
কারণসমূহ
ভদ্রলোক
হিন্দুদের বিরোধিতা ছিল বহুস্তরীয় এবং তীব্র।
প্রথমত,
সম্পদের দ্বন্দ্ব। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অর্থ কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও মেধার একটি অংশ সরে যাওয়া। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধীনে পূর্ববঙ্গের কলেজগুলো থেকে মোটা অঙ্কের ফি আসত; নতুন
বিশ্ববিদ্যালয় সেই আয়ের উৎস বন্ধ করে দেবে।
দ্বিতীয়ত,
চাকরির ভয়। সিভিল সার্ভিস, আইন ও শিক্ষায় ভদ্রলোকদের আধিপত্য টিকিয়ে
রাখতে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষিত না হওয়াটাই তাদের স্বার্থে ছিল। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় মুসলমান প্রতিযোগীদের তৈরি করবে — এই আশঙ্কা সত্যিকার ছিল।
তৃতীয়ত,
রাজনৈতিক ক্ষমতা হ্রাসের ভয়। কলকাতা ছিল সমগ্র বাংলার সাংস্কৃতিক ও
রাজনৈতিক কেন্দ্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গকে একটি স্বতন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক
কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে, যা কলকাতার একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে।
রবীন্দ্রনাথ
ও ভদ্রলোক বিরোধিতার বিরোধাভাস
এখানে একটি
লক্ষণীয় ঐতিহাসিক বিরোধাভাস রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি নিজে
উদারনৈতিক মানবতাবাদী এবং বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ছিলেন, তিনিও ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, এতে বাংলার
শিক্ষা সম্পদ বিভক্ত হবে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিরোধিতায় সোচ্চার ছিলেন।
ভদ্রলোকদের
বিরোধিতার ভাষা ছিল মূলত "শিক্ষার মান রক্ষা" এবং "অপচয়
বন্ধ" — কিন্তু এর নিচে শ্রেণিগত ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থরক্ষার শক্তিশালী
উদ্দেশ্য কাজ করছিল। ব্রিটিশ সরকার অবশ্য এই বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে, কারণ তাদের
রাজনৈতিক হিসাব ছিল ভিন্ন — মুসলিম অভিজাতদের সন্তুষ্ট রাখা।
তৃতীয় অংশ:
উপনিবেশিক সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা### মুসলিম
মধ্যবিত্ত নির্মাণ
উপনিবেশিক
বাংলায় মুসলমান জনগোষ্ঠী শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত পিছিয়ে ছিল। ১৮৫৭
সালের পর ব্রিটিশ শাসক মুসলমানদের প্রতি বৈরী ছিল; হিন্দু
ভদ্রলোকরা ইংরেজি শিক্ষায় এগিয়ে যায়। ফলে প্রশাসনে, বিচারে,
ডাক্তারিতে মুসলমানদের অনুপস্থিতি ছিল প্রকট।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় এই শূন্যস্থান পূরণ শুরু করে। প্রথমবারের মতো পূর্ববঙ্গের কৃষক
পরিবারের সন্তানরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। ঢাকায় এসে পড়াশোনা মানে কলকাতার
ব্যয়বহুল পথ না মাড়িয়ে স্থানীয়ভাবে আইনজীবী, চিকিৎসক,
শিক্ষক হওয়ার সুযোগ।
জাতীয়
পরিচয় নির্মাণ এবং সাংস্কৃতিক জাগরণ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পেশাদার তৈরি করেনি — একটি বাঙালি মুসলমান সাংস্কৃতিক
পরিচয়ের কেন্দ্র তৈরি করেছিল। কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য এই সময়ের প্রতিনিধিত্ব
করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা "বাঙালি" এবং "মুসলমান" — দুটি
পরিচয়কে একসঙ্গে ধারণ করতে শেখে, যা পরবর্তী বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচনা
করে।
আশরাফ-আতরাফ
বিভাজনে প্রভাব
মুসলমান
সমাজের ভেতরে নিজস্ব শ্রেণিবিভাজন ছিল — আরবি-ফারসি বংশীয় "আশরাফ"
অভিজাত এবং স্থানীয় ধর্মান্তরিত কৃষক "আতরাফ"। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মেধার ভিত্তিতে সুযোগ দিয়ে এই বিভাজনকে আস্তে আস্তে দুর্বল করে — বংশ নয়,
শিক্ষা হয়ে ওঠে সামাজিক উত্থানের মাপকাঠি।
রাজনৈতিক
ভবিষ্যতের পীঠস্থান
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গভীর অবদান তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারে। এই
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা প্রজন্মই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়
ভূমিকা নেয়। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা উপলব্ধি
করে বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাষা হুমকির মুখে। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবিতে ২১শে
ফেব্রুয়ারির আন্দোলন গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্রদের নেতৃত্বে।
শেখ মুজিবুর রহমান-সহ যে প্রজন্ম ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের
চিন্তার ভিত গড়েছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ই।
সামগ্রিক
বিশ্লেষণ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘটনাটি উপনিবেশিক রাজনীতির একটি জটিল দলিল। ব্রিটিশরা
এটি প্রতিষ্ঠা করেছিল "বিভক্ত করো ও শাসন করো" নীতির অংশ হিসেবে —
মুসলমানদের কলকাতার হিন্দু জাতীয়তাবাদী কেন্দ্রের বিপরীতে একটি পাল্টা শক্তি
হিসেবে গড়ে তুলতে। কিন্তু ইতিহাসের বিচিত্র গতিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ই
১৯৪৭-পরবর্তী পাকিস্তানি উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং
শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে বেশ কিছু
কারণ ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের
জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। ব্রিটিশ সরকার ১৯১২ সালে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে
ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে
ভদ্রলোক হিন্দুদের তীব্র প্রতিক্রিয়া ছিল। তারা মনে করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠা হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব কমে যাবে এবং পূর্ববঙ্গে
মুসলমানদের শিক্ষা ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে
"মুসলমানদের বিশ্ববিদ্যালয়" হিসেবে আখ্যায়িত করে।
উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গীয় সমাজে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ
অবদান রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্ররা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও
মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি, হিন্দু সমাজের প্রতিক্রিয়া এবং উপনিবেশিক
আমলে তার সামাজিক ভূমিকা তিনটি প্রশ্নই একই রাজনৈতিক‒শিক্ষার ধারার অংশ,
তাই নিচে প্রতিটিকে আলাদা বিভাগে বিশ্লেষণ করে দিচ্ছি।
১. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
- বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম আলাদা প্রদেশ
হওয়ার পর এ অঞ্চলে উচ্চতর শিক্ষা‒প্রতিষ্ঠানের অবর্তমানতা তীব্রভাবে অনুভূত হয়;
কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক দূরে থাকা
বিষয়টি পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত‒মুসলিম যুবকদের জন্য বড় বাধা ছিল.dhakapost+1
- ব্রিটিশ প্রশাসন (বিশেষত পূর্ববঙ্গ ও আসামের গভর্নর
স্যার বেঙ্গল) “পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ
সৃষ্টি” ও “কলকাতার চাপ কমিয়ে আঞ্চলিক উন্নয়ন” যুক্তি দেখিয়ে একটি নতুন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়.nasaramin+1
- ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার আইন পাস করে এবং ১৯২১ সালের ১ জুলাই অক্সফোর্ড–কেমব্রিজ আদলে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়; এটিকে
“প্রাচ্যের অক্সফোর্ড” নামে পরিচিত করার উদ্দেশ্য ছিল.wikiwand+1
২. ভদ্রলোক
হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ঘোষণার
পর বিশেষ করে কলকাতা ও পূর্ববঙ্গের হিন্দু বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যাপক
বিরোধিতা দেখা যায়.somewhereinblog
- ১৯১২ সালে কলকাতার গড়ের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশাল সভায়
হিন্দু সম্প্রদায় ঢাকায় স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ
করে ব্রিটিশ সরকারে আবেদন করে; স্থানীয় হিন্দু
সংবাদপত্র ও বুদ্ধিজীবী বিশ্ববিদ্যালয়কে “মুসলিম স্বার্থসংগঠন” বা বিশেষ
সম্প্রদায়ের সুবিধার ব্যবস্থা হিসেবে চিত্রিত করে.dailyinqilab+1
- বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে যেমন হিন্দুসমাজ এক হয়েছিল
তেমনই এ প্রসঙ্গে তারা আবার এক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে
চলেছিল — ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু অংশও এ বিরোধিতায় যুক্ত ছিল.somewhereinblog
৩.
উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
৩.১
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত,
বিশেষ করে মুসলিম মধ্যবিত্ত যুবকদের কাছে
উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে; আগে
যারা কলকাতায় যেতে বাধ্য ছিল তারা এখন স্থানীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা
পেতে শুরু করে.dhakapost+1
- গোড়া থেকেই এখানে হিন্দু শিক্ষক ও অফিসারের
সংখ্যাধিক্য ছিল, তবে শিক্ষাপদ্ধতি ধর্মনিরপেক্ষ ও ইহজাগতিক
চিন্তাভাবনাকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল; বিশ্ববিদ্যালয়কে
ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার নীতি বেশিরভাগ সময় মান্য
হয়েছিল.khaborerkagoj
৩.২ সামাজিক
ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেক ইতিহাসবিদ “সামাজিক
মেল্টিং পট” বলে ব্যাখ্যা করেন; বিভিন্ন জেলা,
ধর্ম ও শ্রেণী থেকে আগত ছাত্রদের এখানে মিলন ও কমন
চিন্তার সৃষ্টি হয়েছিল.albd+1
- বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য, রাজনীতি,
সামাজিক আন্দোলন ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল —
নারীমুক্তি, শ্রেণী সংগ্রাম, ভাষা ও
রাজনৈতিক সচেতনতা সবক্ষেত্রে এর ভূমিকা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন.albd
৩.৩
সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ধ্রুপদী চর্যা
- ১৯৪০‑এর দশকে ঔপনিবেশিক রাজনীতি, ভারত বিভাগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের তীব্র বিভেদ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে প্রবেশ করে; ১৯৪৩
সালের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ (কার্জন হলের ঘটনা) এবং ১৯৪৭‑এর দাঙ্গার প্রভাব
ছিল উল্লেখযোগ্য.albd
- তবুও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষিত মহল অধিকাংশ
সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের উপর অন্তর্ভুক্তির নীতি বজায়
রাখতে চেষ্টা করে; বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়ন ও শিক্ষকদের ঐক্য ভঙ্গ না
হওয়া পর্যন্ত এটি একটি “স্বাধীন মেধার কেন্দ্র” হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল.khaborerkagoj+1
সংক্ষেপে
বিশ্লেষণ
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রশাসনের
“বিভাজন ও নিয়ন্ত্রণ” নীতির পাশাপাশি পূর্ববঙ্গের জন্য একটি আঞ্চলিক উন্নয়ন
প্রকল্প হিসেবে জন্ম নেয়; ফলে এর সঙ্গে সম্প্রদায়־ভিত্তিক রাজনীতিরও সংযোগ ছিল.nasaramin+1
- হিন্দু ভদ্রলোকসমাজ প্রাথমিকভাবে একে বিরোধিতা
করলেও বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে হিন্দু–মুসলিম উভয় মধ্যবিত্তের জন্য শিক্ষা
ও সাংস্কৃতিক সামাজিক যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছে.dhakapost+1
- ঔপনিবেশিক যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গীয়
সমাজে শুধুমাত্র শিক্ষালয় নয়, রাজনৈতিক কেন্দ্র,
সামাজিক নতুন মধ্যবিত্তের সংগঠক ও স্বাধীন চিন্তার
ঘাঁটি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে.nasaramin+2
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ছিল বিংশ
শতাব্দীর প্রথম ভাগে বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক প্রত্যক্ষ ফলাফল।
এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং পূর্ববঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া এক ধরনের
"রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ" হিসেবে বিবেচিত হয়।
### 📜
প্রতিষ্ঠার পটভূমি:
বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও ১৯১১ সালে তার রদকে বুঝতে হবে।
* **প্রশাসনিক ও
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট**: ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে সৃষ্ট পূর্ববঙ্গ ও আসাম
প্রদেশের রাজধানী হয় ঢাকা। এই বিভাজন পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর
জন্য নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। কিন্তু
কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির তীব্র বিরোধিতার মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ
সরকার এই বিভাজন রদ করতে বাধ্য হয়।
* **রাজনৈতিক
ক্ষতিপূরণ**: বঙ্গভঙ্গ রদ মুসলিম নেতৃত্বের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। নওয়াব
সলিমুল্লাহ ও অন্যান্য মুসলিম নেতাদের অসন্তোষ প্রশমনের জন্য তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড
হার্ডিং ১৯১২ সালে ঢাকা সফর করেন এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি
দেন, যা ছিল একটি সুস্পষ্ট
"সাম্রাজ্যিক ক্ষতিপূরণ" (splendid imperial compensation)। এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই ১৯২০ সালে "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন" পাস
হয় এবং ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টি তার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে।
### 🚫
ভদ্রলোক হিন্দু
সম্প্রদায়ের বিরূপ প্রতিক্রিয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার
বিরুদ্ধে তৎকালীন কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র
ও বহুমাত্রিক। তাদের বিরোধিতার প্রধান কারণগুলো ছিল:
* **রাজনৈতিক
বিভাজনের আশঙ্কা**: কলকাতার হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও জমিদাররা মনে করতেন, ঢাকায় একটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে
পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মধ্যে "মানসিক বিভাজন" (internal
partition of Bengal) আরও দৃঢ় হবে,
যা তারা বঙ্গভঙ্গের
মাধ্যমে প্রতিরোধ করেছিলেন।
* **অর্থনৈতিক ও
প্রশাসনিক আপত্তি**: তাদের আরেকটি বড় যুক্তি ছিল যে, পূর্ববঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠী মূলত কৃষিজীবী এবং
উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মতো সামাজিক অবস্থানে তারা তখনও পৌঁছাননি। ফলে তাদের জন্য
আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় অপ্রয়োজনীয় ও অপচয়মূলক। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার উল্লেখ
করেছেন, শিক্ষিত হিন্দু সমাজের
একটি অংশ ঢাকা কলেজের অবনমন ও একটি "খারাপ বিশ্ববিদ্যালয়" সৃষ্টির
আশঙ্কাও করেছিলেন।
* **সক্রিয় রাজনৈতিক
বিরোধিতা**: স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, রাসবিহারী ঘোষের মতো প্রখ্যাত নেতারা এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে লবিং
করেন এবং প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে ভাইসরয়ের কাছে নিজেদের আপত্তি জানান। কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটেও এর তীব্র বিরোধিতা করা হয়। এই বিরোধিতা এতটাই তীব্র ছিল
যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
বিলটি বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায় পাস না করিয়ে সরাসরি কেন্দ্রীয় আইনসভায় নিয়ে
যেতে হয়েছিল।
### 🏛️
উপনিবেশিক পূর্ববঙ্গীয়
সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গের
আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এর প্রভাব ছিল
বহুমুখী:
* **শিক্ষার প্রসার ও
মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ**: বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজে
আধুনিক শিক্ষার প্রসারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। পূর্বে যেখানে মুসলিম সমাজে
মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রায় অস্তিত্ব ছিল না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই একদল শিক্ষিত, পেশাদার ও সচেতন মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি
করে, যারা পরবর্তীতে সমাজ
সংস্কার ও রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেয়।
* **অসাম্প্রদায়িক
শিক্ষার পীঠস্থান**: রাজনৈতিকভাবে সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটে জন্ম হলেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রাথমিক যুগে একটি
অত্যন্ত উদার ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯৪০-এর
দশকের আগ পর্যন্ত এখানে হিন্দু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ড.
রমেশচন্দ্র মজুমদার ও প্রফুল্ল কুমার গুহের মতো শিক্ষকদের স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে,
শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলে
মিলে কীভাবে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য ক্যাম্পাস তৈরি করেছিলেন,
যেখানে ধর্মের ঊর্ধ্বে
উঠে জ্ঞানচর্চাই ছিল মুখ্য।
* **সাংস্কৃতিক ও
বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ**: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গে মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রধান
কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯২৬ সালে এখানে গঠিত "মুসলিম সাহিত্য সমাজ" (Muslim
Sahitya Samaj) মুসলিম সমাজে প্রগতিশীল
চিন্তা, নারীশিক্ষা ও ধর্মীয়
গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সংস্কার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। এই সময়টিকে ঢাকায় এক
নবজাগরণের (Renaissance) সময় হিসেবে
চিহ্নিত করা হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের আগমনে
ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল আরও সমৃদ্ধ হয়।
* **রাজনৈতিক সচেতনতা
ও আন্দোলনের সূতিকাগার**: প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৪৮ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূচনা এবং
১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এটি
পরবর্তীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও পাদপীঠ হয়ে ওঠে।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি, বিরোধিতা
এবং পূর্ববঙ্গীয় সমাজে এর ভূমিকা
📌
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালের ১ জুলাই। ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গ
অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার প্রসার এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা দূর করার
প্রয়োজন থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১. বঙ্গভঙ্গ
ও তার প্রভাব
১৯০৫ সালের
বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ গঠিত হয়। এর রাজধানী ছিল ঢাকা।
এই সময় পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা ও প্রশাসনিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা
সৃষ্টি হয়।
কিন্তু ১৯১১
সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করে। তাদের ক্ষোভ
প্রশমনের জন্য ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেয়।
২. মুসলিম
সমাজের শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা
পশ্চিমবঙ্গের
তুলনায় পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে ছিল। কলকাতাকেন্দ্রিক
শিক্ষাব্যবস্থার কারণে পূর্ববঙ্গের ছাত্রদের উচ্চশিক্ষা লাভ কঠিন ছিল। ফলে ঢাকায়
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।
৩. নাথান
কমিশনের সুপারিশ
১৯১২ সালে
গঠিত নাথান কমিশন ঢাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। এই
সুপারিশের ভিত্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম এগিয়ে যায়।
৪. রাজনৈতিক
উদ্দেশ্য
ব্রিটিশ
সরকার মুসলমানদের সমর্থন ধরে রাখতে এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী ছিল।
📌
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের অনেক ভদ্রলোক হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও
শিক্ষিত শ্রেণি বিরোধিতা করেন।
তাদের
বিরোধিতার কারণ
১. কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা
তারা মনে
করতেন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর মর্যাদা ও
প্রভাব কমে যাবে।
২.
অর্থনৈতিক আপত্তি
অনেকে দাবি
করেন—
- নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অতিরিক্ত সরকারি
অর্থ ব্যয় হবে,
- যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে ব্যবহার করা
উচিত।
৩.
সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি
কিছু
ভদ্রলোক হিন্দু মনে করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মূলত মুসলমানদের সুবিধার জন্য
প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে তারা এটিকে সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন।
৪.
সংবাদপত্র ও জনমত
তৎকালীন
কিছু হিন্দু সংবাদপত্র ও বুদ্ধিজীবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। তবে
সবাই বিরোধিতা করেননি; কিছু উদারপন্থী ব্যক্তি এই প্রতিষ্ঠাকে সমর্থনও করেছিলেন।
📌
উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এটি পূর্ববঙ্গের শিক্ষা, সংস্কৃতি,
রাজনীতি ও সমাজজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
১. শিক্ষার
প্রসার
- পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি
পায়।
- মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের বিকাশ ঘটে।
- নতুন শিক্ষিত শ্রেণির উদ্ভব হয়।
২. রাজনৈতিক
চেতনার বিকাশ
বিশ্ববিদ্যালয়টি
রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
- ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন,
- স্বাধিকার আন্দোলন,
- ছাত্ররাজনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩.
সাংস্কৃতিক জাগরণ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
- সাহিত্যচর্চা,
- নাটক,
- সংগীত,
- বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
৪. মুসলিম
সমাজের আধুনিকায়ন
বিশ্ববিদ্যালয়
মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষা ও উদার চিন্তার প্রসার ঘটায়। ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে
বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের চর্চা বৃদ্ধি পায়।
৫.
জাতীয়তাবাদ ও ভবিষ্যৎ আন্দোলন
পরবর্তীকালে
এই বিশ্ববিদ্যালয়—
- ভাষা আন্দোলন,
- স্বাধিকার আন্দোলন,
- এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক
ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
🔚
উপসংহার
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল পূর্ববঙ্গের জনগণের দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত ও সামাজিক
চাহিদার ফল। যদিও কিছু ভদ্রলোক হিন্দু এর বিরোধিতা করেছিলেন, তবুও
বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ববঙ্গীয় সমাজে আধুনিক শিক্ষা, রাজনৈতিক
চেতনা ও সাংস্কৃতিক জাগরণের কেন্দ্র হিসেবে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। উপনিবেশিক
আমলে এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং
পূর্ববঙ্গের সামাজিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
**ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি**
১৯০৫ সালের **বঙ্গভঙ্গ**ের পর পূর্ববঙ্গ ও আসাম
নতুন প্রদেশ গঠিত হয় এবং ঢাকা তার রাজধানী হয়। এতে পূর্বাঞ্চলের (বর্তমান
বাংলাদেশ) মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত সুবিধা পেতে শুরু
করে। কিন্তু প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। এতে পূর্ববঙ্গের
মুসলিম সম্প্রদায় হতাশ হয়।
ব্রিটিশ সরকার এই হতাশা মেটাতে এবং পূর্ববঙ্গের
শিক্ষা-সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি
দেয়। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরকালে নবাব স্যার খাজা
সলিমুল্লাহ, সৈয়দ নওয়াব আলী
চৌধুরী, এ.কে. ফজলুল হকসহ মুসলিম
নেতাদের দাবির প্রেক্ষিতে এ ঘোষণা দেন। এটিকে বঙ্গভঙ্গ রদের “ক্ষতিপূরণ” হিসেবেও
দেখা হয়।
ন্যাথান কমিটি (১৯১২) গঠিত হয় এবং ১৯২০ সালে
**ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন** পাস হয়। ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম
শুরু হয়। প্রথম উপাচার্য ছিলেন পি. জে. হার্টগ। এটি ছিল **রেসিডেন্সিয়াল টিচিং
ইউনিভার্সিটি** মডেলের (অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ ধাঁচে), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অ্যাফিলিয়েটিং নয়।
শুরুতে ৩টি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান, আইন), ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক ও
৮৪৭ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। নবাব সলিমুল্লাহসহ স্থানীয় নেতাদের জমি দান এতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
### ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে
ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
কলকাতাকেন্দ্রিক **হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণি**
(বিশেষ করে জমিদার, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ) এর তীব্র বিরোধিতা করেন। প্রধান
কারণগুলো:
- **কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য
হারানোর আশঙ্কা**: পূর্ববঙ্গের ছাত্ররা কলকাতায় পড়তে আসত। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হলে
ছাত্র ও অর্থের প্রবাহ কমে যাবে বলে মনে করা হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য
**স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়** এর অন্যতম প্রধান বিরোধী ছিলেন।
- **রাজনৈতিক-সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ**: অনেকে
এটিকে ব্রিটিশদের “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” নীতির অংশ এবং মুসলিমদের ক্ষমতায়নের পথ বলে
দেখেন। কেউ কেউ এটাকে “মক্কা ইউনিভার্সিটি” বলে বিদ্রূপ করেন।
- **অন্যান্য নেতা**: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়,
রাশবিহারী ঘোষ প্রমুখও
বিরোধিতা করেন। তারা স্মারকলিপি, সভা-সমাবেশ করে
বিরোধিতা করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতার অভিযোগ প্রচলিত
থাকলেও এর সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই; অনেক গবেষক এটিকে
অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। বিরোধিতা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার এগিয়ে যায়।
### উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
উপনিবেশিক যুগে (১৯২১-১৯৪৭) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
পূর্ববঙ্গের (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কৃষিপ্রধান,
শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা)
সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে:
- **মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান**: পূর্বে
হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির আধিপত্য ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম যুবকদের
উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও রাজনৈতিক
নেতৃত্বের সুযোগ করে দেয়। এটি একটি স্বতন্ত্র মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ গঠনে সাহায্য
করে, যা পরবর্তীকালে
পূর্ববাংলার রাজনীতিতে (ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- **শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র**: কলকাতার উপর
নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় চাহিদা অনুসারে শিক্ষা প্রসার করে। এটি “প্রাচ্যের
অক্সফোর্ড” খ্যাতি লাভ করে।
- **রাজনৈতিক সচেতনতা**: ছাত্ররা জাতীয়তাবাদী,
সাম্প্রদায়িক ও
পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় হয়। উপনিবেশিক আমলে এটি মুসলিম
লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক ধারার প্রভাবিত হয়।
- **সামাজিক পরিবর্তন**: পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ ও
কৃষক সমাজ থেকে শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করে সামাজিক গতিশীলতা বাড়ায়। তবে শুরুতে
হিন্দু-মুসলিম ছাত্র অনুপাতে ভারসাম্য ছিল না; ধীরে ধীরে মুসলিম ছাত্র বাড়ে।
**সারসংক্ষেপে**, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়,
বরং পূর্ববঙ্গের মুসলিম
সমাজের আত্মপ্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নের প্রতীক ছিল। এটি কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু
ভদ্রলোক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি বিকল্প বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে এবং
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য এবং যুগান্তকারী ঘটনা।
এটি কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং পূর্ব
বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
করেছিল।
আপনার তিনটি
প্রশ্নের আলোকপাতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি ছিল মূলত রাজনৈতিক এবং পূর্ব বাংলার মানুষের
দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাস। এর মূল সূত্রগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) এবং মুসলিমদের অসন্তোষ: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে
নতুন প্রদেশ গঠিত হলে ঢাকায় এর রাজধানী তৈরি হয়। এর ফলে এই অঞ্চলের শিক্ষা ও
অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি শুরু হয়। কিন্তু কলকাতার হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও
কংগ্রেসের তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল)
করে। এর ফলে পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজ চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয় এবং নিজেদের
প্রতারিত মনে করে।
- মুসলিম নেতৃবৃন্দের চাপ: বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ব বাংলার মুসলিমদের শান্ত
করার জন্য এবং তাদের ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড
হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা সফরে আসেন। তখন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ,
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, এবং নওয়াব আলী চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল
ভাইসরয়ের সাথে দেখা করে পূর্ব বাংলায় শিক্ষার অনগ্রসরতা দূর করতে ঢাকায় একটি
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান।
- লর্ড হার্ডিঞ্জের প্রতিশ্রুতি ও নাথান কমিটি: মুসলিম নেতৃবৃন্দের দাবির মুখে লর্ড হার্ডিঞ্জ
ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯১২ সালের মে মাসে
ব্যারিস্টার আর. ডব্লিউ. নাথানের নেতৃত্বে 'নাথান
কমিটি' গঠন করা হয়। এই কমিটি ঢাকায় একটি আবাসিক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিবাচক রিপোর্ট দেয়।
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও অর্থ সংকট: ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে এবং ১৯১৫ সালে
নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ ঝুলে যায়।
পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে গঠিত 'স্যাডলার কমিশন' (কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন) ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে পুনরায়
জোরালোভাবে সমর্থন করে। অবশেষে ১৯২০ সালে 'ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় আইন' পাস হয় এবং ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়।
২. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের পর কলকাতার এবং পূর্ব বাংলার এক শ্রেণীর
উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজ (যাঁদের ঐতিহাসিকভাবে 'ভদ্রলোক'
বলা হতো) এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের এই বিরোধিতার পেছনে সামাজিক,
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ ছিল। প্রতিক্রিয়াগুলো ছিল নিম্নরূপ:
- "মক্কা
বিশ্ববিদ্যালয়" বলে উপহাস: কলকাতার অনেক হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও পত্রিকা এই
প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যঙ্গ করে "মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়" বা
"ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়" বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল,
এটি কেবল মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান
হবে এবং শিক্ষার মান ধরে রাখতে পারবে না।
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিপত্য হারানোর ভয়: তৎকালীন সময়ে সমগ্র বাংলার উচ্চশিক্ষা কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হতো। ঢাকায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হলে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় তার বাজেট, প্রভাব এবং পূর্ব বাংলার বিশাল ছাত্রসমাজ (যারা
কলকাতার কলেজগুলোতে পড়তে যেত) হারাবে—এই অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং
সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এর বিরোধিতা করেন।
- রাজনৈতিক ও শ্রেণীগত আশঙ্কা: ভদ্রলোক হিন্দুদের একটি বড় অংশ মনে করত, পূর্ব বাংলার মুসলিম এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুরা
(নমশূদ্র) যদি উচ্চশিক্ষিত হয়ে ওঠে, তবে
চাকুরির বাজারে এবং রাজনীতিতে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও জমিদারী ব্যবস্থা
সংকটে পড়বে।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক: একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে যে, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে (কারো মতে
গঙ্গার তীরে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে আয়োজিত একটি প্রতিবাদ
সভায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভাপতিত্ব করেছিলেন। তবে আধুনিক অনেক
ইতিহাসবিদ (যেমন ড. আনিসুজ্জামান) গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, এই সভায় রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির কোনো সুনির্দিষ্ট
তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না এবং তিনি শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে ছিলেন। তবে
কলকাতার সাধারণ হিন্দু বুদ্ধিজীবী সমাজ যে এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন ও
স্মারকলিপি প্রদান করেছিল, তা ঐতিহাসিকভাবে সত্য।
উল্লেখ্য,
তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ব্রিটিশরা মুসলিমদের দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
রক্ষার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। তবে বিরোধিতাকারীদের শান্ত করতে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো 'অ্যাফিলিয়েটিং' ক্ষমতা
দেওয়া হয়নি (অর্থাৎ এটি কোনো কলেজের পরীক্ষা নিতে পারত না), একে কেবল
একটি 'আবাসিক-শিক্ষামূলক' বিশ্ববিদ্যালয়
হিসেবে তৈরি করা হয়।
৩.
ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
১৯২১ থেকে
১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গের সমাজ গঠনে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিল। একে "পূর্ব
বাংলার অক্সফোর্ড" বলা হতো এবং
এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না হয়ে সামাজিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তিতে
পরিণত হয়।
ক. নতুন
মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে পূর্ব বাংলায় সুশিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ প্রায়
অনুপস্থিত ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে গ্রামীণ ও মফস্বলের মুসলিম
পরিবারের সন্তানরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। এক প্রজন্মেরই মধ্যে পূর্ব বাংলায়
ডাক্তার, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা, অধ্যাপক এবং
সাংবাদিকের এক বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠে, যা সমাজের
নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নেয়।
খ. বুদ্ধির
মুক্তি আন্দোলন ও প্রগতিশীলতা
১৯২৬ সালে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের উদ্যোগে গঠিত হয় 'মুসলিম
সাহিত্য সমাজ'। আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ এবং কাজী মোতাহার হোসেনের
নেতৃত্বে এই আন্দোলন বাংলায় "বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন" নামে পরিচিতি
পায়। তাঁদের মুখপত্র 'শিখা' পত্রিকার স্লোগান ছিল—"জ্ঞান
যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি
সেখানে অসম্ভব।" এটি পূর্ব
বাংলার রক্ষণশীল মুসলিম সমাজকে আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল চিন্তায় দীক্ষিত
করে।
গ. রাজনৈতিক
সচেতনতা ও নেতৃত্বের সৃষ্টি
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক চেতনার আঁতুড়ঘর। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল,
জগন্নাথ হল ইত্যাদি আবাসিক হলগুলোকে কেন্দ্র করে ছাত্র সংসদের মাধ্যমে নতুন
নেতৃত্ব তৈরি হয়।
- শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের 'কৃষক প্রজা পার্টি' এবং
পরবর্তীতে মুসলিম লীগের বঙ্গীয় শাখা শক্তিশালী হয়ে ওঠার পেছনে এই
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অবদান ছিল প্রধান।
- তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান (যিনি
পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্থপতি হন) সহ তৎকালীন প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় বাঙালি
নেতা এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রোডাক্ট ছিলেন।
ঘ.
হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন
কলকাতার
ভদ্রলোক সমাজ শুরুতে বিরোধিতা করলেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিনগুলোতে
সিংহভাগ শিক্ষক এবং একটি বড় অংশের ছাত্র ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের। স্যার পি. সি.
রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু (বিজ্ঞানী), হরপ্রসাদ
শাস্ত্রীর মতো পণ্ডিতরা এখানে শিক্ষকতা করেছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এক
চমৎকার অসাম্প্রদায়িক ও জ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ তৈরি হয়, যা পূর্ব
বাংলার সমাজকে কলকাতার চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে বেশি উদারপন্থী করে তোলে।
ঙ. দেশভাগের
ও ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি
১৯৪০-এর
দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে,
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হওয়া জরুরি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঠিক
পূর্বমুহূর্তে এবং দেশভাগের পরপরই (যেমন ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন) বাঙালি
জাতীয়তাবাদের যে স্ফূরণ ঘটেছিল, তার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
উপসংহার
ঔপনিবেশিক
আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পূর্ববঙ্গের মানুষকে ডিগ্রি দেয়নি, বরং তাদের
"বাঙালি" এবং "অধিকার সচেতন" জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে
শিখিয়েছে। এটি না থাকলে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, '৬৯-এর
গণঅভ্যুত্থান কিংবা ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ ত্বরান্বিত হতো না। তাই ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুতিকাগার বলা অত্যন্ত যথার্থ।
১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক
ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্রিটিশ সরকার ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে。কলকাতা-কেন্দ্রিক
হিন্দু ভদ্রলোক সমাজ এর তীব্র বিরোধিতা করে。তবে পরবর্তীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি
পূর্ববঙ্গে শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনসহ
পুরো সমাজব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে。
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি:
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে ঢাকাকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন
প্রদেশ গঠিত হয়, যা এই অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য শিক্ষার আলো ও উন্নতির
সুযোগ তৈরি করে。কিন্তু প্রবল হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চাপে ১৯১১
সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়。পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা এতে চরমভাবে হতাশ হন。তাদের এই
ক্ষোভ প্রশমনের জন্য এবং পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ
সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়。অবশেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে。
ভদ্রলোক
হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া:
কলকাতা-কেন্দ্রিক 'ভদ্রলোক' হিন্দু সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা এই
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন —
- প্রতিহিংসা ও বিভাজনের অভিযোগ: ড. রাসবিহারী ঘোষ তৎকালীন ভাইসরয়কে বলেছিলেন,
ঢাকায় পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বাংলার
অভ্যন্তরীণ বিভাজন সৃষ্টি করবে。
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিপত্য রক্ষা: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ
মুখার্জীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা করেন。তাঁদের যুক্তি ছিল, পূর্ববঙ্গের
বেশিরভাগ মুসলমান কৃষক, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কোনো লাভ হবে না。
- অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন যে, এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব ও প্রাধান্য
কমিয়ে দেবে。
উপনিবেশিক
আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা:
- মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ববঙ্গের
অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটে。এর মাধ্যমে একটি নতুন শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত
শ্রেণির উদ্ভব হয়,যা পরবর্তীতে তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতিতে
গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব প্রদান করে।
- সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র: এটি কেবল শিক্ষাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না,
বরং আধুনিক চিন্তাধারা, সাহিত্য,
বিজ্ঞান ও গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে。
- রাজনৈতিক সচেতনতা: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, স্বাধিকার
আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবোধ ও ভাষা আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর
স্থাপনে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রধান সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে।