Search This Blog
Wednesday, October 29, 2025
HIST-401 History of Emergence of Bangladesh বাংলাদেশের উত্থানের ইতিহাস
ক্লাস-০২
বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
বঙ্গভঙ্গ বলতে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ব্রিটিশ
সরকারের করা বাংলার বিভাজনকে বোঝায়। এটা ছিল ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসের একটা বড় মোড়।
ব্রিটিশরা বলেছিল প্রশাসনিক সুবিধার জন্য। তখন
অবিভক্ত বাংলা ছিল খুব বড় - প্রায় ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল আর ৭ কোটি
৮০ লাখ মানুষ। কলকাতা থেকে দূরের অঞ্চল শাসন করা কঠিন হচ্ছিল।
- বাংলায় তখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরালো হচ্ছিল।
কলকাতা ছিল আন্দোলনের কেন্দ্র।
- ব্রিটিশরা "Divide and Rule" নীতি অনুসরণ করে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে বিভাজন
তৈরি করতে চেয়েছিল।
লর্ড কার্জনের পরিকল্পনায় বাংলাকে দুই ভাগ করা
হয়:
- পূর্ববঙ্গ ও আসাম: ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
রাজধানী ঢাকা।
- পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা: হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। রাজধানী কলকাতা।
মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া: সাধারণত সমর্থন। কারণ
পূর্ববঙ্গে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতিতে সুযোগ বাড়বে বলে মনে করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি এ
সময় থেকেই জোরালো হয়।
চাপের মুখে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালের ১২
ডিসেম্বর দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করে। বাংলাকে আবার এক করা হয়। একইসাথে
রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেওয়া হয়।
- মুসলমানদের মধ্যে আলাদা রাজনৈতিক চেতনা জন্ম
নেয়। এটাই পরে মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের পথ তৈরি করে।
- বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। স্বদেশি
আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।
- ঢাকা প্রথমবারের মতো রাজধানী হওয়ার অভিজ্ঞতা
পায়।
সংক্ষেপে:
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ হলো ব্রিটিশ শাসনকালে বড়লর্ট লর্ড কার্জনের নেতৃত্বে বাংলা
প্রেসিডেন্সিকে দুইভাগে বিভক্ত করার ঐতিহাসিক ঘটনা, যা ১৬
অক্টোবর ১৯০৫-এ কার্যকর করা হয়েছিল এবং পরে ১৯১১ সালে তা বাতিল করা হয়েছিল.thedailylearn+1
রূপরেখা —
প্রেক্ষাপট, কারণ, প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব
প্রেক্ষাপট
ও কার্যকরী বিন্যাস
- ১৯০৫ সালের পরিকল্পনায় বাংলা প্রেসিডেন্সি দুটি
প্রদেশে ভাগ করা হয়: “পূর্ববঙ্গ ও আসাম” (ঢাকা-কেন্দ্রিক — ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী
বিভাগ ও আসামের অংশ) এবং “পশ্চিমবঙ্গ” (কলকাতা ও বাকি অংশ, সঙ্গে বিহার–উড়িষ্যার কিছু অংশ)। এই বিভাজন ১৬
অক্টোবর ১৯০৫-এ কার্যকর করা হয়.kofipost+1
- ব্রিটিশ প্রশাসন এটি সরকারি কর্ম ও শাসনকার্য সহজ
করার যুক্তি দেখালে ঐতিহাসিক বিশ্লেষকরা এটিকে রাজনৈতিক কৌশল (Divide
and Rule) হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন.rkraihan+1
বিভাজনের
কারণসমূহ (সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ)
- প্রশাসনিক কারণ: বৃহৎ বাংলা প্রেসিডেন্সি একজান
অফিসার দ্বারা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হওয়ায় প্রশাসনিক পুনর্গঠনের
আভাস দেওয়া হয়েছিল.thedailylearn
- রাজনৈতিক/কৌশলগত কারণ: বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও
স্বদেশী-প্রবণতা বৃদ্ধিকে দুর্বল করতে, হিন্দু
ও মুসলিম-সমাজকে আলাদা করে ব্রিটিশ শাসন শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য দেখায় অনেক
ইতিহাসবিদ—অর্থাৎ “Divide and Rule” তত্ত্ব.kofipost+1
- সামাজিক-আর্থিক কারণ: পূর্ববঙ্গে বৃহত্তর মুসলিম
জনসংখ্যা ছিল এবং সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভাব দেখা যেত; আলাদা প্রদেশ হলে মুসলিম এলিট ও স্থানীয় শ্রেণি
প্রগতি পাবে বলে কিছু মুসলিম নেতার সমর্থনও ছিল.banglapedia+1
প্রতিক্রিয়া
ও আন্দোলন
- স্বদেশী আন্দোলন: হিন্দু-বিভাগ কেন্দ্রিক কংগ্রেস ও
বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ী মহল ব্যাপক প্রতিবাদ করে বর্জ্য (boycott) ও প্রতিরোধ চালায়; পণ্য
বর্জন, নিজস্ব শিল্প ও সামগ্রী উৎসাহিত করার প্রচেষ্টা
তৎকালীন রাজনীতিকে উত্তাল করে তোলে.wikipedia+1
- মুসলিম প্রতিক্রিয়া: অনেক পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ
প্রস্তাবকে অনুকূল দেখেছিল; এটি পরবর্তীতে
মুসলিম রাজনীতির বিভিন্ন সংগঠনের গঠনে ভূমিকা রাখে (উদাহরণ: মুসলিম লীগের
উত্থান সম্পর্কে ইতিহাসগত সংযোগ দেখা যায়).banglapedia+1
- প্রতিবাদ ও সংঘটিত ক্রিয়াকলাপের ফলে ব্রিটিশ সরকার
চাপের সম্মুখীন হয়ে ১৯১১ সালে দিল্লি দরবারে সিদ্ধান্ত বদলে বঙ্গভঙ্গ
রেকর্ডভাবে বাতিল করে এবং পরে ভারতীয় রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে
স্থানান্তর করে.wikipediayoutube
ফলপ্রসূ ও
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
- জাতীয় চেতনার সঞ্চার: বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র
বিচার ও আন্দোলন বাংলায় জাতীয়চেতনার জাগরণ ত্বরান্বিত করে; স্বদেশী আন্দোলন ও সংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া বাংলী
বোধকে প্রগাঢ় করে.educobd+1
- সাম্প্রদায়িক ধারার সূচনা: বিভাজন ও প্রাতিষ্ঠানিক
মানচিত্র পরিবর্তনের ফলে হিন্দু-ইসলাম ভিত্তিক রাজনৈতিক ভেদাভেদ বেড়ে
যায়—কিছু ইতিহাসবিদ এই ঘটনাকে পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের বৃহত্তর দেশভাগের এক
প্রাক-চিহ্ন হিসেবে দেখেন.kofipost+1
- প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং পুনর্গঠন: ১৯১1-এ রদ হওয়া সত্ত্বেও তার প্রভাব — প্রশাসনিক
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর রূপায়ণ ও রাজনীতির নতুন বন্ধন
— দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে.wikipedia+1
প্রাসঙ্গিক
তারিখ ও সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন
- 1903–1905: বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি শুরু;
1905-এ কার্যকর করা হয়.thedailylearn
- 16 অক্টোবর 1905: বিভাজন
কার্যকর হওয়ার তারিখ হিসেবে সাধারণভাবে চিহ্নিত.wikipedia+1
- 1911: দিল্লি দরবারে বিভাজন বাতিল ও বঙ্গ পুনর্মিলন ঘোষিত
হয়.youtubewikipedia
উদাহরণ/চিত্রকল্প
(সংক্ষিপ্ত)
- সহজ ভাষায় বোঝাতে: ব্রিটিশরা প্রশাসনিক কারণ
দেখালেও বাস্তবে বিভাজনটি রাজনৈতিকভাবে হিন্দু-মুসলিম ভেদকে ব্যবহার করে
স্থানীয় জাতীয়তাবাদী শক্তিকে দুর্বল করার কৌশল ছিল—এটি অনেক ইতিহাসবিদের
সাধারণ ব্যাখ্যা.rkraihan+1
আরো পড়ার
উৎস (উপযোগী লিংকগুলি)
- বাংলা উইকিপিডিয়া — বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫).wikipedia
- বাংলাপিডিয়া নিবন্ধ — বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৫.banglapedia
- বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ ও শিক্ষকীয় সারমর্ম — The
Daily Learn এবং Kofipost-র
প্রাসঙ্গিক আর্টিকেলগুলি.thedailylearn+1
বঙ্গভঙ্গ বলতে সাধারণত ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের
কৃত প্রথম বঙ্গভঙ্গকেই বোঝানো হয়, যা ভারতের
ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে দ্বিতীয়বারের
মতো বঙ্গভঙ্গ হয়। এখানে প্রথম বঙ্গভঙ্গ নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
* **মুসলিম
সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া**: পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি
বড় অংশ এই বিভাজনকে সমর্থন করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, এর ফলে তাদের জন্য শিক্ষা, চাকরি ও রাজনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং একটি
পৃথক প্রদেশে তারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবেন। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ এই
বিভাজনের একজন প্রধান সমর্থক ছিলেন। তবে, কিছু মুসলিম নেতা ও বুদ্ধিজীবী এই বিভাজনের বিরোধিতাও করেছিলেন।
* **প্রতিবাদের
রূপ**: বিরোধিতা দ্রুত আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে এক
বিশাল সভায় ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই আন্দোলন থেকে **স্বদেশী
ও বয়কট আন্দোলনের** সূচনা হয়। মানুষ বিদেশি পণ্য বর্জন করে এবং স্বদেশী শিল্পের
প্রসারে উদ্যোগী হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সময় 'আমার সোনার বাংলা' গানটি রচনা করেন এবং রাখিবন্ধন উপলক্ষে
হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে রাখি বাঁধার প্রস্তাব দেন।
2. **মুসলিম লীগের
জন্ম**: বঙ্গভঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি
পায় এবং ১৯০৬ সালে ঢাকায় **মুসলিম লীগ** প্রতিষ্ঠিত হয়।
3. **ভবিষ্যতের
পথরেখা**: ১৯০৫ সালের এই ঘটনাকে ভারত বিভাগের এক ধরনের মহড়া হিসেবে দেখা হয়। এর
মাধ্যমে যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা হয়, তা শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং
বাংলাদেশের জন্মের পথ তৈরি করে দেয়।
বঙ্গভঙ্গ
(১৯০৫)
পটভূমি
১৯০৫ সালের
বঙ্গভঙ্গ ছিল ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সেসময় বাংলা প্রদেশ
ছিল ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ইউনিট — বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ,
বিহার, ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত।
জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮ কোটি।
কারণ
প্রশাসনিক
যুক্তি (ব্রিটিশ দাবি): ভাইসরয়
লর্ড কার্জন দাবি করেন, এত বড় প্রদেশ দক্ষভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই
বিভক্তি প্রশাসনিক সুবিধার জন্য।
প্রকৃত
উদ্দেশ্য (ঐতিহাসিকদের মত):
- বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা
- হিন্দু ও মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা —
"ভাগ করো ও শাসন করো" নীতি প্রয়োগ
- পূর্ব বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে
রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া
বিভাজনের
রূপরেখা
বাংলাকে
দুটি প্রদেশে ভাগ করা হয়:
পশ্চিম
বাংলা: পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও
উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত; হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ।
পূর্ব বাংলা
ও আসাম: ঢাকাকে রাজধানী করে নতুন প্রদেশ গঠন; মুসলিম
সংখ্যাগরিষ্ঠ।
প্রতিক্রিয়া
ও আন্দোলন
বঙ্গভঙ্গের
বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল তীব্র ও বহুমাত্রিক।
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া —
ব্রিটিশ পণ্য বর্জন এবং দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করা। বিভাজনের দিন, ১৬ অক্টোবর,
রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে রাখীবন্ধন উৎসব পালিত হয় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের
প্রতীক হিসেবে।
বয়কট
আন্দোলনে ম্যানচেস্টারের কাপড় ও লিভারপুলের লবণ
পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাংলাজুড়ে জনসভা ও মিছিল হয়।
বিপ্লবী
আন্দোলনের উদ্ভব — অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর
দলের মতো সংগঠন সশস্ত্র বিপ্লবের পথে যায়। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল
চাকী-র মতো বিপ্লবীরা এই সময় সক্রিয় হন।
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন এবং অনেক
দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন।
মুসলিম
প্রতিক্রিয়া
বঙ্গভঙ্গের
বিষয়টি মুসলিম সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। একদিকে পূর্ব বাংলার অনেক
মুসলিম নেতা এতে সমর্থন দেন, কারণ নতুন প্রদেশে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন এবং ঢাকায়
রাজধানী স্থাপনে তারা রাজনৈতিক সুবিধা দেখেছিলেন। এই পটভূমিতে ১৯০৬ সালে ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত
হয়।
বঙ্গভঙ্গ রদ
(১৯১১)
তীব্র
জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে ১২ ডিসেম্বর ১৯১১ সালে দিল্লি
দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। একই সাথে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী
কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়।
দীর্ঘমেয়াদী
তাৎপর্য
বঙ্গভঙ্গের
ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম:
- এটি ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনকে নতুন গতি দেয় এবং
সাধারণ মানুষকে রাজনীতিমুখী করে তোলে
- স্বদেশী আন্দোলন প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক
জাতীয়তাবাদের ধারণাকে জনপ্রিয় করে
- হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে জটিলতার বীজ বপন হয়,
যা পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ খোলে
- ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও বাংলা বিভক্তির পটভূমি রচনায়
এই ঘটনার প্রভাব ছিল গভীর
- জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে চরমপন্থী (বাল গঙ্গাধর
তিলক) ও নরমপন্থী (গোপালকৃষ্ণ গোখলে) বিভাজন স্পষ্ট হয়
📌
বঙ্গভঙ্গ কী?
এই বিভাজন
কার্যকর হয় ১৬ অক্টোবর,
১৯০৫ সালে,
ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন-এর উদ্যোগে।
📌
বঙ্গভঙ্গের কারণ
১.
প্রশাসনিক কারণ (সরকারি ব্যাখ্যা)
ব্রিটিশ
সরকার দাবি করেছিল—
- বাংলা ছিল অত্যন্ত বৃহৎ প্রদেশ
- জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক চাপ সামলানো কঠিন ছিল👉 তাই প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ভাগ করা হয়
২. রাজনৈতিক
কারণ (প্রকৃত উদ্দেশ্য)
ইতিহাসবিদদের
মতে প্রকৃত কারণ ছিল—
- বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল
- হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ঐক্য ভাঙা👉 অর্থাৎ “Divide and Rule” (ভাগ করো ও শাসন করো) নীতি
📌
বঙ্গভঙ্গের ফলাফল
১. স্বদেশী
আন্দোলনের সূচনা
- বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে শুরু হয় স্বদেশী আন্দোলন
- বিদেশি পণ্য বর্জন ও দেশি পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি
পায়
২. বয়কট
আন্দোলন
- ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করা হয়
- দোকান, পোশাক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রে বয়কট
৩.
জাতীয়তাবাদের উত্থান
- মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়
- স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও শক্তিশালী হয়
৪.
হিন্দু-মুসলিম বিভাজন
- সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়তে শুরু করে
- পরবর্তীতে ভারতের রাজনীতিতে এর গভীর প্রভাব পড়ে
📌
বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)
- তীব্র আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়
সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে
- ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়
- বাংলা আবার একত্রিত হয়
- একই সময়ে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে
স্থানান্তর করা হয়
📌
বঙ্গভঙ্গের গুরুত্ব
- ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ
অধ্যায়
- প্রথমবারের মতো ব্যাপক জনসাধারণ আন্দোলনে যুক্ত হয়
- জাতীয়তাবাদী চেতনা শক্তিশালী হয়
🔚
সংক্ষেপে
বঙ্গভঙ্গ
ছিল শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং
ব্রিটিশদের রাজনৈতিক কৌশল, যার বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ভারতীয়
স্বাধীনতা আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়।
**বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)** বাংলার ইতিহাসে এবং ভারতীয়
স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি প্রথম বঙ্গভঙ্গ নামে
পরিচিত (দ্বিতীয়টি ১৯৪৭ সালে)।
ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলা প্রেসিডেন্সি (বাংলা,
বিহার, ওড়িশা ও আসামের কিছু অংশসহ) ছিল বিপুল আয়তনের
(প্রায় ৭৮.৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা) এবং সবচেয়ে বড় প্রদেশ। কলকাতা কেন্দ্র করে
পশ্চিমাঞ্চল উন্নত হলেও পূর্বাঞ্চল (আজকের বাংলাদেশের অধিকাংশ) অবহেলিত ছিল।
প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব, যোগাযোগের সমস্যা
এবং পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের অভাব ছিল প্রধান ইস্যু।
**১. প্রশাসনিক কারণ (ঘোষিত):**
লর্ড কার্জন (ভাইসরয়, ১৮৯৯-১৯০৫) বলেন, বিশাল প্রদেশ একজন গভর্নরের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে
শাসন করা কঠিন। পূর্ব বাংলাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়।
- বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছিল।
ব্রিটিশরা **"Divide and Rule"** নীতি প্রয়োগ করে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি
করতে চেয়েছিল।
- পূর্ব বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা (প্রায় ১৮
মিলিয়ন মুসলিম vs ১২ মিলিয়ন
হিন্দু) এবং পশ্চিমে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়।
- বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করা এবং কংগ্রেসের
প্রভাব কমানো ছিল লক্ষ্য।
পূর্ব বাংলার কাঁচামাল কলকাতায় গিয়ে শিল্পায়িত
হতো। পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য আলাদা প্রশাসনিক কেন্দ্র প্রয়োজন বলে যুক্তি
দেওয়া হয়।
- **ঘোষণা:** ১৯ জুলাই ১৯০৫।
- **কার্যকর:** ১৬ অক্টোবর ১৯০৫।
- **নতুন প্রদেশ:**
- **পূর্ব বাংলা ও
আসাম** (রাজধানী ঢাকা) — মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
- **পশ্চিম বাংলা**
(বিহার-ওড়িশাসহ, রাজধানী কলকাতা)
— হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ।
হিন্দু সম্প্রদায় (বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু)
এটাকে তীব্রভাবে বিরোধিতা করে। এটি **স্বদেশী আন্দোলন**, **বয়কট** এবং পরবর্তীকালে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদের
জন্ম দেয়।
- বয়কট আন্দোলন: ব্রিটিশ পণ্য বর্জন, দেশীয় শিল্প প্রচার।
- আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে এবং কংগ্রেসকে
গণ-আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়।
- মুসলিম লীগের (১৯০৬, ঢাকা) গঠন এই ঘটনার প্রভাবে ত্বরান্বিত হয়।
প্রবল আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদ করে। দিল্লি দরবারে (কিং জর্জ পঞ্চম) ঘোষণা করা হয়।
- হিন্দু আন্দোলনের তীব্রতা।
- স্বদেশী আন্দোলনের সাফল্য।
- বিপ্লবী তৎপরতা বৃদ্ধি।
- বাংলা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয় (বিহার-ওড়িশা আলাদা
হয়)।
- রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়।
- মুসলিম সম্প্রদায় ক্ষুব্ধ হয় কারণ তারা
পূর্বাঞ্চলের সুবিধা হারায়। এটি হিন্দু-মুসলিম বিভেদকে আরও গভীর করে।
- **স্বাধীনতা আন্দোলনে:** স্বদেশী আন্দোলন ভারতীয়
জাতীয় কংগ্রেসকে গণভিত্তিক করে তোলে এবং চরমপন্থী-মধ্যপন্থী বিভাজন স্পষ্ট করে।
- **সাম্প্রদায়িক রাজনীতি:** মুসলিম লীগের উত্থান
এবং পৃথক নির্বাচনের দাবি শক্তিশালী হয়। এটি ১৯৪৭-এর দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ ও
ভারত-পাকিস্তান বিভাগের পথ প্রশস্ত করে।
- **বাংলায়:** বাঙালি জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়,
কিন্তু সাম্প্রদায়িক
বিভেদও বাড়ে।
বঙ্গভঙ্গ (Partition
of Bengal) বাংলার ইতিহাসের তথা অবিভক্ত ভারতের রাজনীতিতে একটি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড
কার্জন প্রশাসনিক সংস্কারের অজুহাতে এই বিভাজন ঘোষণা করেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি
প্রশাসনিক সংস্কার মনে হলেও, এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল।
নিচে
বঙ্গভঙ্গের কারণ, ফলাফল এবং এর হ্রদ বা রদ হওয়ার ঘটনা বিস্তারিত আলোচনা
করা হলো:
১.
বঙ্গভঙ্গের পটভূমি ও কারণ
তৎকালীন 'বেঙ্গল
প্রেসিডেন্সি' বা বাংলা প্রদেশ ছিল বিশাল। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল
আজকের বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার,
ওড়িশা, আসাম এবং ছোটনাগপুর। এই বিশাল অঞ্চলের শাসনভার এককভাবে
পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল, যা
ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে। প্রধান কারণগুলোকে মূলত তিন ভাগে
ভাগ করা যায়:
ক.
প্রশাসনিক কারণ (অফিসিয়াল অজুহাত)
- বিশাল আয়তন: তৎকালীন বাংলার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লাখ।
একজন গভর্নরের পক্ষে এত বড় অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করা
কঠিন ছিল।
- যোগাযোগের অভাব: পূর্ব বাংলা ও আসামের অঞ্চলগুলো কলকাতা (তৎকালীন
রাজধানী) থেকে বেশ দূরে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে পূর্ব বাংলার
প্রশাসনিক তদারকি ঠিকমতো হতো না।
খ. রাজনৈতিক
কারণ (প্রধান ও গোপন উদ্দেশ্য)
- 'ভাগ করো এবং শাসন করো' (Divide and Rule) নীতি: ব্রিটিশরা দেখল যে, ভারতের
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতা এবং এখানকার হিন্দু
মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সমাজ। হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এই
রাজনৈতিক আন্দোলন দুর্বল করাই ছিল ব্রিটিশদের প্রধান লক্ষ্য।
- বাঙালি জাতীয়তাবাদ দমন: তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন এবং স্বরাষ্ট্র সচিব
এইচ. রিজলি মনে করতেন, "অবিভক্ত বাংলা একটি
বড় শক্তি; বিভক্ত হলে এর শক্তি কমে যাবে এবং রাজনৈতিক
আন্দোলনগুলো ভেঙে পড়বে।"
গ.
অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ
- পূর্ব বাংলার অবহেলা: সমস্ত বড় বড় শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালত কলকাতায় গড়ে উঠেছিল।
পূর্ব বাংলা থেকে রাজস্ব আদায় করে তা মূলত কলকাতার উন্নয়নে ব্যয় হতো। ফলে
পূর্ব বাংলার (বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের) অর্থনীতি স্থবির হয়ে
পড়েছিল।
- মুসলিম নেতৃবৃন্দের দাবি: নবাব সলিমুল্লাহ সহ পূর্ব বাংলার তৎকালীন মুসলিম
নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য একটি পৃথক প্রশাসনিক
কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
২. বঙ্গভঙ্গ
বাস্তবায়ন (১৯০৫)
১৯০৫ সালের
১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ আইন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাকে দুটি
প্রদেশে বিভক্ত করা হয়:
১. পূর্ববঙ্গ ও আসাম: এই প্রদেশের
মধ্যে ছিল পূর্ব বাংলা (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ) এবং আসাম। এর রাজধানী করা হয় ঢাকা। এই নতুন প্রদেশটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর প্রথম
গভর্নর ছিলেন স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার।
২. পশ্চিমবঙ্গ: এই প্রদেশের
মধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওড়িশা। এর রাজধানী থাকে কলকাতা। এটি ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল।
৩.
বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল
বঙ্গভঙ্গের
ঘোষণা তৎকালীন সমাজে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যা ভারতকে
স্থায়ীভাবে বদলে দেয়।
ক. মুসলিম
সমাজের প্রতিক্রিয়া (ইতিবাচক)
পূর্ব
বাংলার মুসলিম সমাজ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। তারা মনে করেছিল:
- ঢাকার গৌরব পুনরুজ্জীবিত হবে এবং এখানে নতুন
অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ গড়ে উঠবে।
- চাকুরির ক্ষেত্রে মুসলিমদের সুযোগ বাড়বে।
- এই রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের ফলেই ১৯০৬ সালে ঢাকায় 'আখিল
ভারত মুসলিম লীগ' গঠিত হয়।
খ. হিন্দু
সমাজের প্রতিক্রিয়া (নেতিবাচক)
কলকাতার
হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এবং জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ এই
বিভাজনের তীব্র বিরোধিতা করেন। তারা একে "মাতৃভূমির অঙ্গচ্ছেদ" হিসেবে
গণ্য করেন। এর ফলে দুটি বড় আন্দোলনের সূত্রপাত হয়:
- স্বদেশী আন্দোলন: ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের শপথ
নেওয়া হয়।
- বয়কট আন্দোলন: ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত এবং আইন অমান্য করার আন্দোলন শুরু হয়।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সময় ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে 'রাখীবন্ধন' উৎসবের
ডাক দেন এবং "আমার সোনার বাংলা" (যা বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয়
সঙ্গীত) গানটি রচনা করেন।
উগ্র
জাতীয়তাবাদের উত্থান: বঙ্গভঙ্গ
বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে খুদিরাম বসু, প্রফুল্ল
চাকী এবং বাঘা যতীনের মতো বিপ্লবীদের হাত ধরে বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের
(সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন) ব্যাপক বিস্তার ঘটে।
৪. বঙ্গভঙ্গ
রদ বা হ্রদ (১৯১১)
স্বদেশী
আন্দোলন, গণ-অসন্তোষ এবং বিপ্লবী তৎপরতার মুখে ব্রিটিশ সরকার
তীব্র চাপের মুখে পড়ে। অবশেষে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে ব্রিটিশ
সম্রাট পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ
হ্রদ (বাতিল) করার ঘোষণা
দেন।
- এর ফলে ১৯১২ সালে আবার দুই বাংলা এক হয়ে যায়।
- তবে পূর্ব বাংলার মুসলিমদের সান্ত্বনা দিতে এবং
ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও তা বাস্তবায়ন করা
হয়।
- একই সাথে ব্রিটিশরা ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে
সরিয়ে দিল্লিতে স্থানান্তর করে।
উপসংহার
বঙ্গভঙ্গ
স্থায়ী না হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯০৫
সালের এই বিভাজন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে রাজনৈতিক ও মানসিক দূরত্বের
জন্ম দিয়েছিল, তা আর কখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। অনেকেই মনে করেন, ১৯০৫ সালের
বঙ্গভঙ্গের মধ্যেই নিহিত ছিল ১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান বিভাজনের (এবং
প্রকারান্তরে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের) প্রথম রাজনৈতিক বীজ।
বঙ্গভঙ্গ (Partition
of Bengal) ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক
ঘটনা। দুই দফায় বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল: একবার ১৯০৫ সালে লর্ড
কার্জনের আমলে এবং অন্যটি ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়।
১. বঙ্গভঙ্গ
১৯০৫ (প্রথম বিভাজন)
১৯০৫ সালের
১৬ অক্টোবর ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলা প্রদেশকে বিভক্ত করেন।
- প্রেক্ষাপট ও কারণ: তৎকালীন বাংলা প্রেসিডেন্সি (বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা) আকারে
অনেক বড় ছিল এবং জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লাখ। ব্রিটিশ সরকারের দাবি ছিল,
এত বিশাল অঞ্চলের প্রশাসনিক শাসনভার এককভাবে
পরিচালনা করা দুরূহ ছিল। তবে এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল—বাংলা তথা
ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা।
- বিভাজনের রূপ: ঢাকা,
চট্টগ্রাম, রাজশাহী
বিভাগ, আসাম ও পার্বত্য ত্রিপুরা নিয়ে গঠিত হয় 'পূর্ব বাংলা ও আসাম' প্রদেশ, যার রাজধানী হয়
ঢাকা। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা
নিয়ে গঠিত হয় 'পশ্চিমবঙ্গ' প্রদেশ এবং এর রাজধানী থাকে কলকাতা।
- প্রতিক্রিয়া: পূর্ব
বাংলার মুসলমানরা (যাদের একটি বড় অংশ পিছিয়ে ছিল) এই বিভাজনকে বাঁচার সুযোগ
হিসেবে দেখলেও কলকাতার বুদ্ধিজীবী ও হিন্দু জমিদার শ্রেণী একে 'বাঙালি জাতির বিভাজন' হিসেবে
আখ্যা দিয়ে তীব্র বিরোধিতা করে। এর ফলে 'স্বদেশী
আন্দোলন' ও 'বয়কট' আন্দোলন শুরু হয়।
- বঙ্গভঙ্গ রদ: তীব্র
আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ দিল্লির
দরবার থেকে বঙ্গভঙ্গ রদ বা বাতিলের ঘোষণা দেন। বাংলাকে পুনরায় একত্রিত করা হয়,
তবে আসাম ও বিহারকে আলাদা প্রদেশ হিসেবে গঠন করা হয়।
BOU E-Book +9
২. বঙ্গভঙ্গ
১৯৪৭ (দ্বিতীয় বিভাজন)
১৯৪৭ সালে
ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা ও ভারত বিভাজনের অংশ হিসেবে বাংলা পুনরায় বিভক্ত হয়।
- প্রেক্ষাপট: মাউন্টব্যাটেন
পরিকল্পনার অধীনে ধর্মভিত্তিক বিভাজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে, বাংলার হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে
প্রদেশটিকে দুই ভাগ করার প্রস্তাব আসে।
- বিভাজনের রূপ: মুসলিম
সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয় (পরে যা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ
করে বাংলাদেশ হয়)। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
বঙ্গভঙ্গের
ফলাফল ও গুরুত্ব
- সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ: ১৯০৫ সালের বিভাজনটি হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের
মধ্যে যে মানসিক ও রাজনৈতিক দূরত্বের সৃষ্টি করেছিল, তা পরবর্তীতে দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং ১৯৪৭ সালের
দেশভাগের পথকে প্রশস্ত করে।
- রাজনৈতিক জাগরণ: বঙ্গভঙ্গ
বিরোধী আন্দোলন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে একটি আঞ্চলিক দল থেকে সারা
দেশব্যাপী গণআন্দোলনে রূপ নিতে সাহায্য করে।
বাংলা অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এই বিভাজন গভীর ক্ষত ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ছাপ রেখে গেছে।
ক্লাস-০৩
স্বদেশী আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
স্বদেশী আন্দোলন ছিল বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে
ভারতের প্রথম সারাদেশব্যাপী গণআন্দোলন। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী এক বিশাল জনসভায় এ আন্দোলনের সূচনা হয়।
- বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ: ব্রিটিশ সরকারের
বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদ।
- ব্রিটিশ পণ্য বর্জন: ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে
দেশীয় পণ্য ব্যবহারের আহ্বান।
- সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী
আন্দোলনের অন্যতম নেতা।
- বিপিনচন্দ্র পাল: "প্রফেট অব
ন্যাশনালিজম" হিসেবে পরিচিত।
- অরবিন্দ ঘোষ: "বন্দে মাতরম" পত্রিকার
সম্পাদক।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: "বাংলার মাটি বাংলার
জল" গান লিখে আন্দোলনে যোগ দেন।
- বিদেশি পণ্য বর্জন: ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে
দেশীয় পণ্য ব্যবহার।
- স্বদেশি পণ্য প্রচার: দেশীয় শিল্পের প্রসার।
- জাতীয় শিক্ষা: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
- রাজনৈতিক আন্দোলন: ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি
পেশ।
- বাঙালি জাতীয়তাবাদ: বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ।
- ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস: কংগ্রেসের নেতৃত্বে
ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন জোরালো হয়।
- মুসলিম লীগ গঠন: ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়,
যা পরে পাকিস্তান
আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- বঙ্গভঙ্গ রদ: ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ
রদ করে।
- রাজধানী স্থানান্তর: রাজধানী কলকাতা থেকে
দিল্লিতে স্থানান্তর।
স্বদেশী
আন্দোলন (১৯০৫–১৯০৮)
পটভূমি ও
সূচনা
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী ও
সংগঠিত প্রতিবাদ। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না — এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ
জাতীয় জাগরণ, যা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
চারটি
প্রধান স্তম্ভ
১. বয়কট
আন্দোলন
বঙ্গভঙ্গ
কার্যকরের দিন, ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ থেকেই ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের ডাক দেওয়া
হয়। ম্যানচেস্টারের কাপড়, লিভারপুলের লবণ, বিলাতি চিনি
— সব পোড়ানো হয় প্রকাশ্যে। দোকানদাররা ব্রিটিশ পণ্য বিক্রি না করার শপথ নেন। এই
বয়কট সরাসরি ব্রিটিশ বাণিজ্যে আঘাত করে।
২. স্বদেশী
শিল্প প্রতিষ্ঠা
বিদেশি পণ্য
বর্জনের পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়। বাংলায় অনেক নতুন কলকারখানা
প্রতিষ্ঠিত হয় — বস্ত্র, সাবান, দিয়াশলাই, মাটির তৈরি
পাত্র। রবীন্দ্রনাথ নিজে শিলাইদহে গ্রামীণ সমবায় ও কুটিরশিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ
নেন।
৩. জাতীয়
শিক্ষা আন্দোলন
ব্রিটিশ
শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয় (১৯০৬)। লক্ষ্য ছিল
মাতৃভাষায়, ভারতীয় মূল্যবোধে শিক্ষার প্রসার। রবীন্দ্রনাথের
শান্তিনিকেতন এই ধারণার পথিকৃৎ ছিল।
৪. সশস্ত্র
বিপ্লবী ধারা
আন্দোলনের
একটি অংশ সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মতো
সংগঠন গঠিত হয়। ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী ১৯০৮ সালে কিংসফোর্ডকে হত্যার
চেষ্টা করেন। ক্ষুদিরামের ফাঁসি তাঁকে শহিদের মর্যাদা দেয়।
সাংস্কৃতিক
মাত্রা
স্বদেশী
আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ছিল না — এর সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল
সুদূরপ্রসারী।
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর এই সময় "আমার সোনার বাংলা", "বাংলার মাটি
বাংলার জল"-সহ অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন। ১৬ অক্টোবর রাখীবন্ধন উৎসব
পালন করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তা দেওয়া হয়। "বন্দে মাতরম" হয়ে
ওঠে আন্দোলনের প্রাণমন্ত্র। চিত্রশিল্প, নাটক,
কবিতায় জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রবলভাবে প্রকাশ পায়।
প্রধান
নেতৃত্ব
|
নেতা |
ভূমিকা |
|
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর |
সাংস্কৃতিক
নেতৃত্ব, রাখীবন্ধন উদ্যোক্তা |
|
সুরেন্দ্রনাথ
বন্দ্যোপাধ্যায় |
জনসভা ও
রাজনৈতিক সংগঠন |
|
বিপিনচন্দ্র
পাল |
চরমপন্থী
বক্তৃতা ও সংবাদপত্র |
|
বাল
গঙ্গাধর তিলক |
সর্বভারতীয়
সমর্থন |
|
অরবিন্দ
ঘোষ |
বিপ্লবী
দর্শন ও যুব নেতৃত্ব |
|
ক্ষুদিরাম
বসু |
সশস্ত্র
বিপ্লবের প্রতীক |
আন্দোলনের
সীমাবদ্ধতা
সাফল্যের
পাশাপাশি আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু
বাঙালিকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামের কৃষক ও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে সংযুক্ত করা
যায়নি। ব্রিটিশ দমননীতি ও নেতৃত্বের গ্রেফতারে আন্দোলন ১৯০৮ সালের পর দুর্বল হয়ে
পড়ে।
ঐতিহাসিক
গুরুত্ব
স্বদেশী
আন্দোলন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে। প্রথমবারের মতো
রাজনৈতিক আন্দোলনে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ হয়। বয়কটের কৌশল পরবর্তীতে
গান্ধীজির অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের পথ দেখায়। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের
ধারণা প্রথমবার জনমানসে প্রোথিত হয়, যা স্বাধীনতার পরেও ভারতের আত্মনির্ভর
অর্থনৈতিক নীতির ভিত্তি তৈরি করে।
স্বদেশী আন্দোলন (Swadeshi Movement) ছিল 1905–1911
সময়কালে ব্রিটিশ ভারতের একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিরোধ-আন্দোলন,
যার মূল কৌশল ছিল বিলেতি পণ্য বর্জন (boycott) ও দেশীয়
পণ্য ও শিল্পের উৎসাহ। এই আন্দোলন বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয়ে ভারতীয়
জাতীয়তা, শিক্ষাবিদ্যা ও সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবন ত্বরান্বিত করে
এবং পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মৌলিক ভিত্তি গড়ে তোলায় সাহায্য
করে.wikipedia+1
প্রেক্ষাপট
ও সূচনা
- 1905 সালে বাংলা প্রেসিডেন্সিকে ব্রিটিশ প্রশাসনের
দ্বারা বিভক্ত করার (বঙ্গভঙ্গ) সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে এই
আন্দোলন শুরু হয়; বিশেষত বাঙালি শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী
ও ছাত্রসমাজ এতে সক্রিয় ছিল.songramernotebook+1
- স্বদেশী আন্দোলনকে মূলত কংগ্রেসের উগ্রপন্থী অংশ ও
স্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও প্রতিনিধিরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন; আন্দোলনের নীতিগুলো ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দিকে নজর দেওয়া.sattacademy+1
লক্ষ্য ও
কৌশলসমূহ
- প্রধান লক্ষ্য: ব্রিটিশ শাসনকে দুর্বল করা ও
ভারতীয় অর্থনীতি-শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা।.wikipedia
- কৌশল: বিদেশী (ব্রিটিশ) পণ্যের বয়কট, দেশীয় পণ্য ও হস্তশিল্প (khadi, indigenous
textiles) এবং স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠা, জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠন, প্রতিবাদী সমাবেশ ও প্রেস-প্রচারণা।.ebanglalibrary+1
- ছাত্র-ভূমিকা: ছাত্রদল — বিশেষত ‘এন্টি সার্কুলার
সোসাইটি’ মত সংগঠন — স্কুল-কলেজ থেকে বহিষ্কৃত ছাত্রদের কেন্দ্র করে সক্রিয়
ভূমিকা পালন করে; তারা বয়কট, সমাবেশ
ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প (জাতীয় বিদ্যালয়) গঠন করে.songramernotebook
প্রধান
নেতারা ও বুদ্ধিজীবীরা
- আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন লোকমান্য তিলক, লালা লাজপত রায়, অরবিন্দ
ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত নেতারা; এছাড়া বিপিন চন্দ্র পাল, আবদুর
রসুল সহ ছাত্রনেতারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন.wikipedia+1
- স্বাধীনচেতা বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকরা সাংস্কৃতিক
আন্দোলন পরিচালনা করেন—রবীন্দ্র-সঙ্গীত, নাটক ও
প্রকাশনা ঘর আন্দোলনকে শক্তি দেয়।.wikisource
আন্দোলনের
ক্রিয়া-কলাপ ও ঘটনাবলি
- বয়কট প্রচারণা: গ্রামে-শহরে মানুষ বিদেশি পণ্য না
কেনার স্বভাব গড়ে তোলে; কলকাতা ও অন্যান্য শহরে বয়কট পণ্যের দোকান তালিকা
ও স্বদেশী পণ্যের দোকান সম্প্রসারণ হয়।.sattacademy
- জাতীয় বিদ্যালয়/কলেজ: বহিষ্কৃত ছাত্র ও শিক্ষকরা
দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে—যেমন রংপুর, বরিশাল
ও অন্যান্য জায়গায় জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা।.songramernotebook
- সরকারী দমন: ব্রিটিশ প্রশাসন বয়কটকারীদের বিরুদ্ধে
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে—ছাত্র বহিষ্কার, কেলেঙ্কারী,
পুলিশি কার্যক্রম; এতে
অনেক স্থানে সংঘর্ষও ঘটেছে।.sattacademy+1
সাংস্কৃতিক
ও আর্থিক প্রভাব
- দেশীয় শিল্পে উত্সাহ: বয়কট ও স্বদেশী নীতির কারণে
তুলা-হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্প বাড়ে; মানুষের
মধ্যে স্বনির্ভরতার চেতনা জাগে।.wikipedia
- সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবন: শিক্ষাব্যবস্থা, সাহিত্য ও কলা-সংস্কৃতি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে
জাতীয় চেতনা শক্তিশালী হয়—গান, নাটক ও সংবাদপত্র
আন্দোলনের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।.wikisource
রাজনৈতিক
পরিণতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
- শাসনচাপে পরিবর্তন: তীব্র প্রতিবাদ ও বয়কটের কারণে
ব্রিটিশ সরকার চাপের সম্মুখীন হয়ে 1911 সালে
বঙ্গভঙ্গ বাতিল করে এবং দিল্লিতে রাজদূত সভার সিদ্ধান্তে কিছু প্রশাসনিক
পরিবর্তন আনে—এতে আন্দোলন অমীমাংসিত সাফল্য পান।.wikipedia
- স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান: স্বদেশী আন্দোলন পরবর্তী
দিকের বৃহত্তর জাতীয় আন্দোলনের (বিশেষত গান্ধীবাদী অখ্যাত কৌশলগুলো) জন্য
নীতিগত ও সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে; বয়কট
ও স্বদেশী কৌশল পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনে বারবার ব্যবহৃত হয়।.sattacademy+1
- সাম্প্রদায়িক অনুষঙ্গ: যদিও স্বদেশী আন্দোলন অনেক
সময় অসাম্প্রদায়িকভাবে সংগঠিত হত, তবে তার রাজনৈতিক
পরিণামে হিন্দু-মুসলিম রাজনীতির ভিন্নমুখী প্রবণতার সূচনা ও উদ্যোগিক বিভাজন
দেখা যায়—এটি পরবর্তী দশকগুলোর রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে।.banglapedia
উদাহরণ
(সংক্ষিপ্ত চিত্র)
- 1905–1908-এর মধ্যে কলকাতা ও পূর্ব বাংলার স্কুল-কলেজে
ছাত্র-আন্দোলন ও বহিষ্কার ব্যাপকভাবে ঘটেছিল; বহু
শহরে জাতীয় বাজার ও হস্তশিল্পের বিকাশ লক্ষণীয় ছিল।.sobbanglay+1
সংক্ষিপ্ত
সময়রেখা
- 1905: বঙ্গভঙ্গ ও প্রথম প্রতিক্রিয়ামূলক প্রতিবাদ।.wikipedia
- 1905–1908: স্বদেশী আন্দোলনের তীব্র পর্যায়; বয়কট, ছাত্রসংগঠন ও
জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিস্তার।.songramernotebook
- 1911: আন্দোলনের ফলস্বরূপ বঙ্গভঙ্গ রদ; আন্দোলন মন্দায় হলেও তার ধারণা স্বাধীনতা-চেতনায়
স্থায়ী প্রভাব ফেলে।.wikipedia
পঠন-সূত্র
(আরো জানতে)
- বাংলাপিডিয়া — স্বদেশী আন্দোলন.banglapedia
- সংকলিত প্রবন্ধ ও ইতিহাস পাঠ্যসূচি—স্থানীয় অনলাইন
লেখাসমূহ ও শিক্ষামূলক পোর্টালগুলোর সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ.sattacademy+1
### 🧐
আন্দোলনের পটভূমি ও সূচনা
স্বদেশী আন্দোলন হঠাৎ করেই তৈরি হয়নি। এর পেছনে
ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও কিছু তাৎক্ষণিক কারণ:
* **মধ্যপন্থীদের
সীমাবদ্ধতা**: ১৮৯০-এর দশকে কংগ্রেসের মধ্যপন্থী নেতাদের আবেদন-নিবেদনের নীতি
অকার্যকর প্রতীয়মান হলে "লাল-বাল-পাল" (লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল)-এর নেতৃত্বে চরমপন্থী
নেতৃত্বের উত্থান ঘটে ।
* **বঙ্গভঙ্গের
স্ফুলিঙ্গ**: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে স্বদেশী
আন্দোলনের সূচনা হয়। এই দিনটিকে বাঙালি জাতি "শোক দিবস" হিসেবে পালন করে
।
এটি ছিল একটি বহুমুখী আন্দোলন, যার প্রধান দুটি দিক ছিল নেতিবাচক (বয়কট) ও
ইতিবাচক (গঠনমূলক স্বদেশী)।
*
**অর্থনৈতিক বয়কট**: বিদেশি
পণ্য, বিশেষ করে ম্যানচেস্টারের
বস্ত্র ও লিভারপুলের লবণ প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং বিদেশি দ্রব্য বিক্রির
দোকানে পিকেটিং করা হয় ।
*
**প্রাতিষ্ঠানিক বয়কট**:
অরবিন্দ ঘোষের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত ও প্রশাসনিক দপ্তর বর্জনের ডাক দেওয়া হয়
।
*
**স্বদেশী শিল্প**:
বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলস, বেঙ্গল
কেমিক্যালস, টাটা আয়রন
অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি এবং ভি.ও. চিদম্বরম পিল্লাইয়ের স্বদেশী স্টিম ন্যাভিগেশন
কোম্পানির মতো দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে ।
*
**জাতীয় শিক্ষা**: ১৯০৬
সালে "জাতীয় শিক্ষা পরিষদ" গঠিত হয় এবং বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ (বর্তমান
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বসূরী) প্রতিষ্ঠিত হয় ।
*
**আত্মশক্তির বিকাশ**:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'আত্মশক্তি'র ধারণা দেন, যার অর্থ আত্মনির্ভরশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের
মাধ্যমে জাতির পুনর্গঠন ।
*
**স্বদেশী সমিতি**:
অশ্বিনীকুমার দত্তের "স্বদেশ বান্ধব সমিতি"র মতো অসংখ্য সমিতি গড়ে ওঠে
যা জনগণকে সংগঠিত করার মূল বাহন ছিল ।
*
**সংবাদপত্র**: "বন্দে
মাতরম", "যুগান্তর" ও
"নিউ ইন্ডিয়া"র মতো সংবাদপত্র আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখে ।
স্বদেশী আন্দোলন ছিল এক সাংস্কৃতিক জাগরণ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ সময় 'আমার সোনার বাংলা'
ও 'একলা চলো রে'র মতো কালজয়ী গান রচনা করেন । অন্যদিকে,
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ভারতমাতা' চিত্রকর্মটি জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী প্রতীকে
পরিণত হয় । একই সময়ে জগদীশ চন্দ্র বসুর বৈজ্ঞানিক গবেষণা দেশীয় প্রতিভার এক
উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ।
তীব্রতা সত্ত্বেও ১৯০৮ সালের মধ্যেই আন্দোলন
দুর্বল হয়ে পড়ে।
* **সীমিত
গণভিত্তি**: এই আন্দোলন মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত "ভদ্রলোক" শ্রেণির
মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ কৃষক সমাজকে এর সাথে সম্পৃক্ত করা যায়নি ।
* **কংগ্রেসের
বিভাজন**: ১৯০৭ সালে সুরাট অধিবেশনে কংগ্রেস চরমপন্থী ও মধ্যপন্থীদের মধ্যে বিভক্ত
হয়ে যায়, যা আন্দোলনের
পতনকে ত্বরান্বিত করে ।
স্বদেশী আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি, বরং ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে এক নতুন পথ দেখিয়েছিল।
* **শিল্প ও শিক্ষার
বিকাশ**: আন্দোলনের সময় গড়ে ওঠা টাটা, গোদরেজ, বেঙ্গল
কেমিক্যালসের মতো প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে ভারতের শিল্প বিকাশে নেতৃত্ব দেয় । জাতীয়
শিক্ষা আন্দোলনও শিক্ষাক্ষেত্রে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। “স্বদেশী” শব্দের অর্থ
হলো নিজের দেশীয় জিনিস ব্যবহার করা। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশি পণ্য
বর্জন করে দেশীয় শিল্প ও সংস্কৃতিকে উন্নত করা এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনমত
গড়ে তোলা।
📌
স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমি
- এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়,
- বরং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য নষ্ট করার ব্রিটিশ কৌশল।
এর প্রতিবাদ
থেকেই স্বদেশী আন্দোলনের জন্ম হয়।
📌
স্বদেশী আন্দোলনের উদ্দেশ্য
প্রধান
উদ্দেশ্য ছিল—
- ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করা
- দেশীয় শিল্পের উন্নয়ন
- জাতীয় চেতনা বৃদ্ধি
- ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা
- অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন
📌
আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচি
১. বিদেশি
পণ্য বর্জন
- ব্রিটিশ কাপড়, চিনি,
লবণ ইত্যাদি বর্জন করা হয়।
- বিদেশি কাপড় প্রকাশ্যে পোড়ানো হতো।
২. দেশীয়
পণ্যের ব্যবহার
- হাতে তৈরি কাপড় ও দেশীয় শিল্পপণ্যের ব্যবহার
বাড়ানো হয়।
- তাঁতশিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্প উৎসাহ পায়।
৩. জাতীয়
শিক্ষা আন্দোলন
- ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প গড়ার
চেষ্টা হয়।
- জাতীয় বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
৪.
গণআন্দোলন ও সভা
- মিছিল, সভা, গান, নাটক ও প্রচারণার
মাধ্যমে আন্দোলন পরিচালিত হয়।
৫.
সাংস্কৃতিক জাগরণ
- দেশাত্মবোধক গান ও সাহিত্য জনপ্রিয় হয়।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখীবন্ধন উৎসবের মাধ্যমে
হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ডাক দেন।
📌
আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ
স্বদেশী
আন্দোলনে অনেক নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন—
- সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
- বিপিনচন্দ্র পাল
- অরবিন্দ ঘোষ
- বাল গঙ্গাধর তিলক
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
📌
স্বদেশী আন্দোলনের ফলাফল
ইতিবাচক দিক
- জাতীয়তাবাদী চেতনা বৃদ্ধি পায়।
- দেশীয় শিল্পের উন্নয়ন ঘটে।
- জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ে।
- স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
নেতিবাচক
দিক
- ব্রিটিশ সরকার দমননীতি গ্রহণ করে।
- অনেক নেতা গ্রেফতার হন।
- আন্দোলনের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনও কিছুটা
বৃদ্ধি পায়।
📌
বঙ্গভঙ্গ রদ
স্বদেশী
আন্দোলনের তীব্র প্রতিবাদের ফলে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য
হয়।
📌
স্বদেশী আন্দোলনের গুরুত্ব
- প্রথম বৃহৎ গণআন্দোলন,
- অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের সূচনা,
- এবং পরবর্তী অসহযোগ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি।
🔚
উপসংহার
স্বদেশী
আন্দোলন শুধু বিদেশি পণ্য বর্জনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল
আত্মমর্যাদা, জাতীয় চেতনা ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের প্রতীক। এই
আন্দোলন ভারতীয় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকে শক্তিশালী ভিত্তি
প্রদান করে।
১৯০৩ সালে লর্ড কার্জন বাংলা প্রদেশ ভাগের
প্রস্তাব করেন। ১৯ জুলাই ১৯০৫-এ ঘোষণা এবং ১৬ অক্টোবর ১৯০৫-এ কার্যকর হয়।
প্রশাসনিক সুবিধার কথা বলা হলেও আসল উদ্দেশ্য ছিল **"Divide and
Rule"** — বাঙালি জাতীয়তাবাদকে
দুর্বল করা এবং হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি করা।
- ব্রিটিশ পণ্য বয়কট করে দেশীয় শিল্প ও উৎপাদনকে
উৎসাহিত করা।
- অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা (স্বদেশী) গড়ে তোলা।
- জাতীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐক্যবোধ জাগ্রত করা।
- বঙ্গভঙ্গ রদ করা।
- **লাল-বাল-পাল** (Lal-Bal-Pal): লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল — চরমপন্থী নেতৃত্ব।
- **সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়** — মধ্যপন্থীদের
নেতৃত্ব।
- **রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর**: দেশাত্মবোধক গান (যেমন
*আমার সোনার বাংলা*, *বাংলার মাটি
বাংলার জল*), রাখিবন্ধন উৎসব,
বয়কট প্রচার। তিনি পরে
আন্দোলনের কিছু পদ্ধতি (বিশেষ করে জোর করে বয়কট) থেকে সরে যান।
- **অরবিন্দ ঘোষ**, অশ্বিনীকুমার দত্ত, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ।
- অন্যান্য: আবানীন্দ্রনাথ ঠাকুর (*ভারতমাতা*
চিত্র), প্রফুল্লচন্দ্র রায়
(বাংলা কেমিক্যালস)।
- **বয়কট**: বিদেশী কাপড়, লবণ, চিনি ইত্যাদি বর্জন। দোকানে পিকেটিং।
- **স্বদেশী**: দেশীয় কাপড় (খদ্দর), শিল্প প্রতিষ্ঠা (ব্যাংক, বীমা, জাহাজ নির্মাণ)।
- **জাতীয় শিক্ষা**: ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন
গঠন (১৯০৬), জাতীয় কলেজ ও
বিদ্যালয় স্থাপন।
- **সমিতি গঠন**: অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর — শারীরিক প্রশিক্ষণ ও পরে বিপ্লবী
কার্যকলাপ।
- **সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড**: বন্দে মাতরম গান,
শিবাজী উৎসব, রাখিবন্ধন, আরন্ধন (রান্না না করে অনশন)।
- গ্রামে প্রচার, নাটক, গান, পত্রিকা
(সঞ্জীবনী, বেঙ্গলী)।
**ইতিবাচক:**
- ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জাগরণ; প্রথম গণ-আন্দোলন।
- কংগ্রেসে চরমপন্থী-মধ্যপন্থী বিভাজন স্পষ্ট হয়
(১৯০৭ সুরাট বিভাগ)।
- দেশীয় শিল্পের উন্নতি (যদিও সীমিত)।
- বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদের উত্থান।
- গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
- মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় অংশ দূরে সরে যায়
(হিন্দু প্রতীকের ব্যবহারের কারণে) → ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন।
- সরকারি দমনমূলক নীতি (১৯০৮-এ অনেক নেতা
গ্রেপ্তার)।
- ১৯০৮ সাল নাগাদ আন্দোলনের তীব্রতা কমে যায়।
স্বদেশী আন্দোলন শুধু বয়কট নয়, এটি ছিল **আত্মনির্ভরতা ও জাতীয় চেতনার**
আন্দোলন। এটি দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক প্রতিরোধ রাজনৈতিক স্বাধীনতার শক্তিশালী
হাতিয়ার হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের *ঘরে-বাইরে* উপন্যাসে এর জটিলতা ফুটে উঠেছে।
নিচে
স্বদেশী আন্দোলনের কারণ, গতিপ্রকৃতি, গুরুত্ব ও এর সীমাবদ্ধতা বিস্তারিত আলোচনা
করা হলো:
১. স্বদেশী
আন্দোলনের পটভূমি ও কারণ
১৯০৫ সালের
১৬ই অক্টোবর ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে ঢাকাকে রাজধানী করে 'পূর্ববঙ্গ ও
আসাম' এবং কলকাতাকে রাজধানী করে 'পশ্চিমবঙ্গ'
নামে দুটি আলাদা প্রদেশ গঠন করে।
বাঙালি
বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বুঝতে পেরেছিলেন যে, এর আসল
উদ্দেশ্য ছিল উদীয়মান বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করা এবং হিন্দু-মুসলিম
সম্প্রদায়ের মধ্যে ফাটল ধরানো। এই রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের
ক্ষোভ যখন চরমে পৌঁছায়, তখন কেবল আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি পরিহার করে এক
যুগান্তকারী ও সক্রিয় প্রতিরোধের পথ বেছে নেওয়া হয়—যা ইতিহাসে 'স্বদেশী
আন্দোলন' নামে পরিচিত।
২.
আন্দোলনের প্রধান দুটি স্তম্ভ বা ধারা
স্বদেশী
আন্দোলন মূলত দুটি প্রধান কৌশলের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছিল:
ক. বয়কট বা
বর্জন আন্দোলন
ব্রিটিশদের
অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য বিলাতি পণ্য বর্জনের ডাক দেওয়া হয়।
- পণ্য বর্জন: বিলাতি কাপড়, লবণ,
চিনি, কাঁচের চুড়ি এবং
অন্যান্য বিদেশি সামগ্রী কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ছাত্র ও যুবকেরা
হাটে-বাজারে পিকেটিং করে বিলাতি পণ্যের দোকানে স্তূপ করে আগুন ধরিয়ে দেয়।
- উপাধি ও চাকরি বর্জন: বহু সরকারি কর্মচারী চাকরি থেকে ইস্তফা দেন এবং
আইনজীবীরা ব্রিটিশ আদালত বর্জন করতে শুরু করেন।
খ. স্বদেশী
বা দেশীয় শিল্পের বিকাশ
কেবল বিদেশি
পণ্য বর্জন করলেই চলবে না, তার বিকল্প হিসেবে নিজেদের পণ্য তৈরি করতে হবে—এই চিন্তা
থেকে 'স্বদেশী' ধারণার জন্ম।
- বস্ত্র শিল্প: সাধারণ মানুষ মোটা তাঁতের কাপড় পরা শুরু করে। কবি
রজনীকান্ত সেনের সেই বিখ্যাত গান—"মায়ের
দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই" এই সময়েরই সৃষ্টি। বাংলায় বহু নতুন টেক্সটাইল মিল ও
তাঁত শিল্প গড়ে ওঠে।
- অন্যান্য উদ্যোগ: আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (P.C. Ray) গড়ে তোলেন বিখ্যাত 'বেঙ্গল কেমিক্যালস'। এছাড়াও দেশীয় উদ্যোগে সাবান, ম্যাচ, কাগজ, চামড়ার কারখানা এবং স্বদেশী ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি
প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. সংস্কৃতি,
শিক্ষা ও সমাজে প্রভাব
স্বদেশী
আন্দোলন কেবল রাজনীতি ও অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি বাঙালির
শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এক বিশাল জোয়ার এনেছিল।
- জাতীয় শিক্ষা (National Education): ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্জন করায়
শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প হিসেবে 'জাতীয়
শিক্ষা পরিষদ' (National Council of Education) গঠিত
হয়। এর অধীনে বেশ কিছু জাতীয় বিদ্যালয় এবং আজকের বিখ্যাত যাদবপুর
বিশ্ববিদ্যালয় (তৎকালীন বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট) গড়ে ওঠে।
- সাহিত্য ও সঙ্গীত: এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, মুকুন্দ
দাস অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ এই সময়েই তাঁর বিখ্যাত 'আমার সোনার বাংলা' গানটি
লেখেন এবং সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে 'রাখীবন্ধন' উৎসবের
সূচনা করেন।
৪. উগ্র
জাতীয়তাবাদ ও সশস্ত্র বিপ্লবের সূচনা
আন্দোলন
দমনে ব্রিটিশ সরকার চরম লাঠিচার্জ, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধকরণ এবং বন্দি করার মতো
দমন নীতি গ্রহণ করে। ফলে নরমপন্থী বা অহিংস আন্দোলনের প্রতি যুব সমাজের একটি বড়
অংশের আস্থা উঠে যায়। এর মধ্য দিয়ে বাংলায় অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রকুমার
ঘোষ, বাঘা যতীন, খুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীর মতো বিপ্লবীদের নেতৃত্বে সশস্ত্র বিপ্লবী ধারা বা গুপ্ত সমিতির (যেমন: অনুশীলন
সমিতি ও যুগান্তর দল) উত্থান ঘটে।
৫.
আন্দোলনের ফলাফল ও গুরুত্ব
স্বদেশী
আন্দোলন পুরোপুরি সফল না হলেও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল:
- অর্থনৈতিক ধাক্কা: ব্রিটিশ ম্যানচেস্টারের কাপড়ের ব্যবসা এবং লবণ
শিল্পে ধস নামে, যা ব্রিটিশ সরকারকে চরম অর্থনৈতিক লোকসানের মুখে
ফেলে।
- বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১): আন্দোলনের তীব্রতা এবং বিপ্লবী তৎপরতার মুখে টিকতে
না পেরে অবশেষে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য
হয়।
- ভবিষ্যৎ আন্দোলনের ভিত্তি: এই আন্দোলনই প্রথম ভারতীয়দের শেখায় যে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে 'অর্থনৈতিক বর্জন' একটি
বড় হাতিয়ার হতে পারে। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর 'অসহযোগ'
এবং 'আইন অমান্য'
আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল এই স্বদেশী আন্দোলনের
কৌশল।
৬.
আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা
এত বড়
আন্দোলন হওয়া সত্ত্বেও এর কিছু ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা ছিল:
- সাম্প্রদায়িক দূরত্ব: আন্দোলনের নেতৃত্ব ও প্রতীকগুলো মূলত হিন্দু ধর্মীয়
ঐতিহ্য ও জাতীয়তাবাদ নির্ভর হওয়ায় তৎকালীন পূর্ব বাংলার সিংহভাগ মুসলিম
জনসংখ্যা এবং ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর মতো নেতৃবৃন্দ এই আন্দোলন থেকে দূরে
থাকেন। ফলে হিন্দু-মুসলিম মানসিক দূরত্ব আরও বাড়ে।
- কৃষক শ্রেণীর অভাব: আন্দোলনটি মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত
শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ কৃষক সমাজের অর্থনৈতিক সমস্যা ও
দুঃখ-দুর্দশা এই আন্দোলনের মূল এজেন্ডায় স্থান পায়নি।
উপসংহার
সীমাবদ্ধতা
থাকা সত্ত্বেও, ১৯০৫ সালের স্বদেশী আন্দোলন ছিল বাঙালির স্বাধিকার
চেতনার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এটি পরাধীন ভারতের মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতে
শিখিয়েছিল এবং আত্মমর্যাদার যে বীজ বপন করেছিল, তা-ই
পরবর্তীতে ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পথে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী
গণআন্দোলন। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার প্রতিবাদে
এর সূচনা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন
এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানো।
আন্দোলনের
পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
- বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫): ব্রিটিশ সরকার বঙ্গীয় প্রদেশকে বিভক্ত করার
সিদ্ধান্ত নিলে বাঙালিরা এর তীব্র বিরোধিতা করে।
- মূল রণকৌশল: প্রাথমিক
পর্যায়ে আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে ব্যর্থ হয়ে আন্দোলনকারীরা ব্রিটিশ পণ্য
বর্জন, স্বদেশী দ্রব্যের ব্যবহার, রাখি বন্ধন, এবং
অরন্ধনের মতো পন্থা গ্রহণ করেন।
আন্দোলনের
দুটি মূল ধারা
- গঠনমূলক স্বদেশী: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো ব্যক্তিদের
উদ্যোগে স্বদেশী শিল্প-কারখানা স্থাপন, সতীশচন্দ্র
মুখার্জীর জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন ও
গ্রাম উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করা হয়।
- রাজনৈতিক চরমপন্থা: বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ
ঘোষ, এবং বাল গঙ্গাধর তিলক প্রমুখ নেতার নেতৃত্বে
ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন ও চরমপন্থী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়।
ক্লাস-০৪
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি কী ছিল? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিশ্লেষণ করুন ।
নিচে তিনটি
স্তরে আলোচনাটি সাজানো হয়েছে — প্রতিষ্ঠার পটভূমি, ভদ্রলোক
হিন্দুদের বিরোধিতা, এবং উপনিবেশিক সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা। প্রথমে
প্রেক্ষাপটটি একটি কাঠামোচিত্রে দেখানো হচ্ছে।
প্রথম অংশ:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
রাজনৈতিক
প্রেক্ষাপট: বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষত
১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদ পূর্ববঙ্গের মুসলমান জনগোষ্ঠীর জন্য ছিল গভীর রাজনৈতিক আঘাত। নতুন
প্রদেশে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে ঢাকাকে রাজধানী পেয়েছিলেন, নতুন
প্রশাসনিক সুযোগ পাচ্ছিলেন — হঠাৎ সবকিছু বাতিল হয়ে গেল। ব্রিটিশ সরকার বুঝতে
পেরেছিল এই সিদ্ধান্তে মুসলমানদের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে।
ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন তাই হয়ে ওঠে এক ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ।
দিল্লি
দরবারে (১৯১১) রাজা পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণার পরপরই, ১৯১২ সালের
ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় একটি প্রতিনিধিদল ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে সাক্ষাৎ
করে। নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে এই দলটি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের
দাবি পেশ করেন।
নাথান কমিশন
ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি
১৯১২ সালে
গঠিত নাথান কমিশন (R.N. Nathan-এর নেতৃত্বে) ঢাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়
স্থাপনের সুপারিশ করে। কমিশনের রিপোর্ট পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষার করুণ অবস্থার চিত্র
তুলে ধরে — কলকাতামুখী শিক্ষাকাঠামোয় পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা উচ্চশিক্ষা থেকে
কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিলেন।
প্রথম
বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) পরিকল্পনাকে কিছুটা বিলম্বিত করে, কিন্তু ১৯২০
সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হয় এবং ১ জুলাই ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়
যাত্রা শুরু করে।
ঢাকার নবাব
পরিবারের অবদান
নবাব পরিবার
কেবল রাজনৈতিক দাবি করেননি, বাস্তব অবদানও রেখেছিলেন। নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৬০০ একরের বেশি জমি দান করেন, যেখানে
আজকের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গড়ে উঠেছে। ঢাকার অভিজাত মুসলিম পরিবারগুলো অর্থ
ও সমর্থনে এগিয়ে আসে।
দ্বিতীয়
অংশ: ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
"ভদ্রলোক"
কারা?
"ভদ্রলোক"
ছিলেন কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চবর্ণ হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত — মূলত ব্রাহ্মণ,
কায়স্থ ও বৈদ্য — যারা ব্রিটিশ শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরি, আইন ও
সাংবাদিকতায় আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। বাংলার রাজনীতি ও শিক্ষার উপর তাদের
একচেটিয়া প্রভাব ছিল।
বিরোধিতার
কারণসমূহ
ভদ্রলোক
হিন্দুদের বিরোধিতা ছিল বহুস্তরীয় এবং তীব্র।
প্রথমত,
সম্পদের দ্বন্দ্ব। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অর্থ কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও মেধার একটি অংশ সরে যাওয়া। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধীনে পূর্ববঙ্গের কলেজগুলো থেকে মোটা অঙ্কের ফি আসত; নতুন
বিশ্ববিদ্যালয় সেই আয়ের উৎস বন্ধ করে দেবে।
দ্বিতীয়ত,
চাকরির ভয়। সিভিল সার্ভিস, আইন ও শিক্ষায় ভদ্রলোকদের আধিপত্য টিকিয়ে
রাখতে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষিত না হওয়াটাই তাদের স্বার্থে ছিল। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় মুসলমান প্রতিযোগীদের তৈরি করবে — এই আশঙ্কা সত্যিকার ছিল।
তৃতীয়ত,
রাজনৈতিক ক্ষমতা হ্রাসের ভয়। কলকাতা ছিল সমগ্র বাংলার সাংস্কৃতিক ও
রাজনৈতিক কেন্দ্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গকে একটি স্বতন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক
কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে, যা কলকাতার একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে।
রবীন্দ্রনাথ
ও ভদ্রলোক বিরোধিতার বিরোধাভাস
এখানে একটি
লক্ষণীয় ঐতিহাসিক বিরোধাভাস রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি নিজে
উদারনৈতিক মানবতাবাদী এবং বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ছিলেন, তিনিও ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, এতে বাংলার
শিক্ষা সম্পদ বিভক্ত হবে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিরোধিতায় সোচ্চার ছিলেন।
ভদ্রলোকদের
বিরোধিতার ভাষা ছিল মূলত "শিক্ষার মান রক্ষা" এবং "অপচয়
বন্ধ" — কিন্তু এর নিচে শ্রেণিগত ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থরক্ষার শক্তিশালী
উদ্দেশ্য কাজ করছিল। ব্রিটিশ সরকার অবশ্য এই বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে, কারণ তাদের
রাজনৈতিক হিসাব ছিল ভিন্ন — মুসলিম অভিজাতদের সন্তুষ্ট রাখা।
তৃতীয় অংশ:
উপনিবেশিক সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা### মুসলিম
মধ্যবিত্ত নির্মাণ
উপনিবেশিক
বাংলায় মুসলমান জনগোষ্ঠী শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত পিছিয়ে ছিল। ১৮৫৭
সালের পর ব্রিটিশ শাসক মুসলমানদের প্রতি বৈরী ছিল; হিন্দু
ভদ্রলোকরা ইংরেজি শিক্ষায় এগিয়ে যায়। ফলে প্রশাসনে, বিচারে,
ডাক্তারিতে মুসলমানদের অনুপস্থিতি ছিল প্রকট।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় এই শূন্যস্থান পূরণ শুরু করে। প্রথমবারের মতো পূর্ববঙ্গের কৃষক
পরিবারের সন্তানরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। ঢাকায় এসে পড়াশোনা মানে কলকাতার
ব্যয়বহুল পথ না মাড়িয়ে স্থানীয়ভাবে আইনজীবী, চিকিৎসক,
শিক্ষক হওয়ার সুযোগ।
জাতীয়
পরিচয় নির্মাণ এবং সাংস্কৃতিক জাগরণ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পেশাদার তৈরি করেনি — একটি বাঙালি মুসলমান সাংস্কৃতিক
পরিচয়ের কেন্দ্র তৈরি করেছিল। কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য এই সময়ের প্রতিনিধিত্ব
করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা "বাঙালি" এবং "মুসলমান" — দুটি
পরিচয়কে একসঙ্গে ধারণ করতে শেখে, যা পরবর্তী বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচনা
করে।
আশরাফ-আতরাফ
বিভাজনে প্রভাব
মুসলমান
সমাজের ভেতরে নিজস্ব শ্রেণিবিভাজন ছিল — আরবি-ফারসি বংশীয় "আশরাফ"
অভিজাত এবং স্থানীয় ধর্মান্তরিত কৃষক "আতরাফ"। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মেধার ভিত্তিতে সুযোগ দিয়ে এই বিভাজনকে আস্তে আস্তে দুর্বল করে — বংশ নয়,
শিক্ষা হয়ে ওঠে সামাজিক উত্থানের মাপকাঠি।
রাজনৈতিক
ভবিষ্যতের পীঠস্থান
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গভীর অবদান তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারে। এই
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা প্রজন্মই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়
ভূমিকা নেয়। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা উপলব্ধি
করে বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাষা হুমকির মুখে। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবিতে ২১শে
ফেব্রুয়ারির আন্দোলন গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্রদের নেতৃত্বে।
শেখ মুজিবুর রহমান-সহ যে প্রজন্ম ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের
চিন্তার ভিত গড়েছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ই।
সামগ্রিক
বিশ্লেষণ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘটনাটি উপনিবেশিক রাজনীতির একটি জটিল দলিল। ব্রিটিশরা
এটি প্রতিষ্ঠা করেছিল "বিভক্ত করো ও শাসন করো" নীতির অংশ হিসেবে —
মুসলমানদের কলকাতার হিন্দু জাতীয়তাবাদী কেন্দ্রের বিপরীতে একটি পাল্টা শক্তি
হিসেবে গড়ে তুলতে। কিন্তু ইতিহাসের বিচিত্র গতিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ই
১৯৪৭-পরবর্তী পাকিস্তানি উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং
শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। ব্রিটিশ সরকার ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের তীব্র প্রতিক্রিয়া ছিল। তারা মনে করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব কমে যাবে এবং পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের শিক্ষা ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে "মুসলমানদের বিশ্ববিদ্যালয়" হিসেবে আখ্যায়িত করে।
উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গীয় সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্ররা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি, হিন্দু সমাজের প্রতিক্রিয়া এবং উপনিবেশিক
আমলে তার সামাজিক ভূমিকা তিনটি প্রশ্নই একই রাজনৈতিক‒শিক্ষার ধারার অংশ,
তাই নিচে প্রতিটিকে আলাদা বিভাগে বিশ্লেষণ করে দিচ্ছি।
১. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
- বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম আলাদা প্রদেশ
হওয়ার পর এ অঞ্চলে উচ্চতর শিক্ষা‒প্রতিষ্ঠানের অবর্তমানতা তীব্রভাবে অনুভূত হয়;
কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক দূরে থাকা
বিষয়টি পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত‒মুসলিম যুবকদের জন্য বড় বাধা ছিল.dhakapost+1
- ব্রিটিশ প্রশাসন (বিশেষত পূর্ববঙ্গ ও আসামের গভর্নর
স্যার বেঙ্গল) “পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ
সৃষ্টি” ও “কলকাতার চাপ কমিয়ে আঞ্চলিক উন্নয়ন” যুক্তি দেখিয়ে একটি নতুন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়.nasaramin+1
- ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার আইন পাস করে এবং ১৯২১ সালের ১ জুলাই অক্সফোর্ড–কেমব্রিজ আদলে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়; এটিকে
“প্রাচ্যের অক্সফোর্ড” নামে পরিচিত করার উদ্দেশ্য ছিল.wikiwand+1
২. ভদ্রলোক
হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ঘোষণার
পর বিশেষ করে কলকাতা ও পূর্ববঙ্গের হিন্দু বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যাপক
বিরোধিতা দেখা যায়.somewhereinblog
- ১৯১২ সালে কলকাতার গড়ের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশাল সভায়
হিন্দু সম্প্রদায় ঢাকায় স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ
করে ব্রিটিশ সরকারে আবেদন করে; স্থানীয় হিন্দু
সংবাদপত্র ও বুদ্ধিজীবী বিশ্ববিদ্যালয়কে “মুসলিম স্বার্থসংগঠন” বা বিশেষ
সম্প্রদায়ের সুবিধার ব্যবস্থা হিসেবে চিত্রিত করে.dailyinqilab+1
- বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে যেমন হিন্দুসমাজ এক হয়েছিল
তেমনই এ প্রসঙ্গে তারা আবার এক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে
চলেছিল — ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু অংশও এ বিরোধিতায় যুক্ত ছিল.somewhereinblog
৩.
উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
৩.১
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত,
বিশেষ করে মুসলিম মধ্যবিত্ত যুবকদের কাছে
উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে; আগে
যারা কলকাতায় যেতে বাধ্য ছিল তারা এখন স্থানীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা
পেতে শুরু করে.dhakapost+1
- গোড়া থেকেই এখানে হিন্দু শিক্ষক ও অফিসারের
সংখ্যাধিক্য ছিল, তবে শিক্ষাপদ্ধতি ধর্মনিরপেক্ষ ও ইহজাগতিক
চিন্তাভাবনাকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল; বিশ্ববিদ্যালয়কে
ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার নীতি বেশিরভাগ সময় মান্য
হয়েছিল.khaborerkagoj
৩.২ সামাজিক
ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেক ইতিহাসবিদ “সামাজিক
মেল্টিং পট” বলে ব্যাখ্যা করেন; বিভিন্ন জেলা,
ধর্ম ও শ্রেণী থেকে আগত ছাত্রদের এখানে মিলন ও কমন
চিন্তার সৃষ্টি হয়েছিল.albd+1
- বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য, রাজনীতি,
সামাজিক আন্দোলন ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল —
নারীমুক্তি, শ্রেণী সংগ্রাম, ভাষা ও
রাজনৈতিক সচেতনতা সবক্ষেত্রে এর ভূমিকা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন.albd
৩.৩
সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ধ্রুপদী চর্যা
- ১৯৪০‑এর দশকে ঔপনিবেশিক রাজনীতি, ভারত বিভাগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের তীব্র বিভেদ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে প্রবেশ করে; ১৯৪৩
সালের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ (কার্জন হলের ঘটনা) এবং ১৯৪৭‑এর দাঙ্গার প্রভাব
ছিল উল্লেখযোগ্য.albd
- তবুও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষিত মহল অধিকাংশ
সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের উপর অন্তর্ভুক্তির নীতি বজায়
রাখতে চেষ্টা করে; বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়ন ও শিক্ষকদের ঐক্য ভঙ্গ না
হওয়া পর্যন্ত এটি একটি “স্বাধীন মেধার কেন্দ্র” হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল.khaborerkagoj+1
সংক্ষেপে
বিশ্লেষণ
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রশাসনের
“বিভাজন ও নিয়ন্ত্রণ” নীতির পাশাপাশি পূর্ববঙ্গের জন্য একটি আঞ্চলিক উন্নয়ন
প্রকল্প হিসেবে জন্ম নেয়; ফলে এর সঙ্গে সম্প্রদায়־ভিত্তিক রাজনীতিরও সংযোগ ছিল.nasaramin+1
- হিন্দু ভদ্রলোকসমাজ প্রাথমিকভাবে একে বিরোধিতা
করলেও বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে হিন্দু–মুসলিম উভয় মধ্যবিত্তের জন্য শিক্ষা
ও সাংস্কৃতিক সামাজিক যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছে.dhakapost+1
- ঔপনিবেশিক যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গীয়
সমাজে শুধুমাত্র শিক্ষালয় নয়, রাজনৈতিক কেন্দ্র,
সামাজিক নতুন মধ্যবিত্তের সংগঠক ও স্বাধীন চিন্তার
ঘাঁটি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে.nasaramin+2
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ছিল বিংশ
শতাব্দীর প্রথম ভাগে বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক প্রত্যক্ষ ফলাফল।
এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং পূর্ববঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া এক ধরনের
"রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ" হিসেবে বিবেচিত হয়।
* **রাজনৈতিক
ক্ষতিপূরণ**: বঙ্গভঙ্গ রদ মুসলিম নেতৃত্বের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। নওয়াব
সলিমুল্লাহ ও অন্যান্য মুসলিম নেতাদের অসন্তোষ প্রশমনের জন্য তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড
হার্ডিং ১৯১২ সালে ঢাকা সফর করেন এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি
দেন, যা ছিল একটি সুস্পষ্ট
"সাম্রাজ্যিক ক্ষতিপূরণ" (splendid imperial compensation)। এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই ১৯২০ সালে "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন" পাস
হয় এবং ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টি তার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে।
* **অর্থনৈতিক ও
প্রশাসনিক আপত্তি**: তাদের আরেকটি বড় যুক্তি ছিল যে, পূর্ববঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠী মূলত কৃষিজীবী এবং
উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মতো সামাজিক অবস্থানে তারা তখনও পৌঁছাননি। ফলে তাদের জন্য
আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় অপ্রয়োজনীয় ও অপচয়মূলক। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার উল্লেখ
করেছেন, শিক্ষিত হিন্দু সমাজের
একটি অংশ ঢাকা কলেজের অবনমন ও একটি "খারাপ বিশ্ববিদ্যালয়" সৃষ্টির
আশঙ্কাও করেছিলেন।
* **সক্রিয় রাজনৈতিক
বিরোধিতা**: স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, রাসবিহারী ঘোষের মতো প্রখ্যাত নেতারা এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে লবিং
করেন এবং প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে ভাইসরয়ের কাছে নিজেদের আপত্তি জানান। কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটেও এর তীব্র বিরোধিতা করা হয়। এই বিরোধিতা এতটাই তীব্র ছিল
যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
বিলটি বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায় পাস না করিয়ে সরাসরি কেন্দ্রীয় আইনসভায় নিয়ে
যেতে হয়েছিল।
* **অসাম্প্রদায়িক
শিক্ষার পীঠস্থান**: রাজনৈতিকভাবে সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটে জন্ম হলেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রাথমিক যুগে একটি
অত্যন্ত উদার ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯৪০-এর
দশকের আগ পর্যন্ত এখানে হিন্দু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ড.
রমেশচন্দ্র মজুমদার ও প্রফুল্ল কুমার গুহের মতো শিক্ষকদের স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে,
শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলে
মিলে কীভাবে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য ক্যাম্পাস তৈরি করেছিলেন,
যেখানে ধর্মের ঊর্ধ্বে
উঠে জ্ঞানচর্চাই ছিল মুখ্য।
* **সাংস্কৃতিক ও
বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ**: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গে মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রধান
কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯২৬ সালে এখানে গঠিত "মুসলিম সাহিত্য সমাজ" (Muslim
Sahitya Samaj) মুসলিম সমাজে প্রগতিশীল
চিন্তা, নারীশিক্ষা ও ধর্মীয়
গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সংস্কার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। এই সময়টিকে ঢাকায় এক
নবজাগরণের (Renaissance) সময় হিসেবে
চিহ্নিত করা হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের আগমনে
ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল আরও সমৃদ্ধ হয়।
* **রাজনৈতিক সচেতনতা
ও আন্দোলনের সূতিকাগার**: প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৪৮ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূচনা এবং
১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এটি
পরবর্তীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও পাদপীঠ হয়ে ওঠে।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি, বিরোধিতা
এবং পূর্ববঙ্গীয় সমাজে এর ভূমিকা
📌
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালের ১ জুলাই। ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গ
অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার প্রসার এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা দূর করার
প্রয়োজন থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১. বঙ্গভঙ্গ
ও তার প্রভাব
১৯০৫ সালের
বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ গঠিত হয়। এর রাজধানী ছিল ঢাকা।
এই সময় পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা ও প্রশাসনিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা
সৃষ্টি হয়।
কিন্তু ১৯১১
সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করে। তাদের ক্ষোভ
প্রশমনের জন্য ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেয়।
২. মুসলিম
সমাজের শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা
পশ্চিমবঙ্গের
তুলনায় পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে ছিল। কলকাতাকেন্দ্রিক
শিক্ষাব্যবস্থার কারণে পূর্ববঙ্গের ছাত্রদের উচ্চশিক্ষা লাভ কঠিন ছিল। ফলে ঢাকায়
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।
৩. নাথান
কমিশনের সুপারিশ
১৯১২ সালে
গঠিত নাথান কমিশন ঢাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। এই
সুপারিশের ভিত্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম এগিয়ে যায়।
৪. রাজনৈতিক
উদ্দেশ্য
ব্রিটিশ
সরকার মুসলমানদের সমর্থন ধরে রাখতে এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী ছিল।
📌
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের অনেক ভদ্রলোক হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও
শিক্ষিত শ্রেণি বিরোধিতা করেন।
তাদের
বিরোধিতার কারণ
১. কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা
তারা মনে
করতেন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর মর্যাদা ও
প্রভাব কমে যাবে।
২.
অর্থনৈতিক আপত্তি
অনেকে দাবি
করেন—
- নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অতিরিক্ত সরকারি
অর্থ ব্যয় হবে,
- যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে ব্যবহার করা
উচিত।
৩.
সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি
কিছু
ভদ্রলোক হিন্দু মনে করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মূলত মুসলমানদের সুবিধার জন্য
প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে তারা এটিকে সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন।
৪.
সংবাদপত্র ও জনমত
তৎকালীন
কিছু হিন্দু সংবাদপত্র ও বুদ্ধিজীবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। তবে
সবাই বিরোধিতা করেননি; কিছু উদারপন্থী ব্যক্তি এই প্রতিষ্ঠাকে সমর্থনও করেছিলেন।
📌
উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এটি পূর্ববঙ্গের শিক্ষা, সংস্কৃতি,
রাজনীতি ও সমাজজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
১. শিক্ষার
প্রসার
- পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি
পায়।
- মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের বিকাশ ঘটে।
- নতুন শিক্ষিত শ্রেণির উদ্ভব হয়।
২. রাজনৈতিক
চেতনার বিকাশ
বিশ্ববিদ্যালয়টি
রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
- ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন,
- স্বাধিকার আন্দোলন,
- ছাত্ররাজনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩.
সাংস্কৃতিক জাগরণ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
- সাহিত্যচর্চা,
- নাটক,
- সংগীত,
- বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
৪. মুসলিম
সমাজের আধুনিকায়ন
বিশ্ববিদ্যালয়
মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষা ও উদার চিন্তার প্রসার ঘটায়। ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে
বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের চর্চা বৃদ্ধি পায়।
৫.
জাতীয়তাবাদ ও ভবিষ্যৎ আন্দোলন
পরবর্তীকালে
এই বিশ্ববিদ্যালয়—
- ভাষা আন্দোলন,
- স্বাধিকার আন্দোলন,
- এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক
ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
🔚
উপসংহার
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল পূর্ববঙ্গের জনগণের দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত ও সামাজিক
চাহিদার ফল। যদিও কিছু ভদ্রলোক হিন্দু এর বিরোধিতা করেছিলেন, তবুও
বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ববঙ্গীয় সমাজে আধুনিক শিক্ষা, রাজনৈতিক
চেতনা ও সাংস্কৃতিক জাগরণের কেন্দ্র হিসেবে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। উপনিবেশিক
আমলে এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং
পূর্ববঙ্গের সামাজিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
**ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি**
১৯০৫ সালের **বঙ্গভঙ্গ**ের পর পূর্ববঙ্গ ও আসাম
নতুন প্রদেশ গঠিত হয় এবং ঢাকা তার রাজধানী হয়। এতে পূর্বাঞ্চলের (বর্তমান
বাংলাদেশ) মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত সুবিধা পেতে শুরু
করে। কিন্তু প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। এতে পূর্ববঙ্গের
মুসলিম সম্প্রদায় হতাশ হয়।
ব্রিটিশ সরকার এই হতাশা মেটাতে এবং পূর্ববঙ্গের শিক্ষা-সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরকালে নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, এ.কে. ফজলুল হকসহ মুসলিম নেতাদের দাবির প্রেক্ষিতে এ ঘোষণা দেন। এটিকে বঙ্গভঙ্গ রদের “ক্ষতিপূরণ” হিসেবেও দেখা হয়।
ন্যাথান কমিটি (১৯১২) গঠিত হয় এবং ১৯২০ সালে **ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন** পাস হয়। ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম উপাচার্য ছিলেন পি. জে. হার্টগ। এটি ছিল **রেসিডেন্সিয়াল টিচিং ইউনিভার্সিটি** মডেলের (অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ ধাঁচে), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অ্যাফিলিয়েটিং নয়। শুরুতে ৩টি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান, আইন), ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক ও ৮৪৭ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। নবাব সলিমুল্লাহসহ স্থানীয় নেতাদের জমি দান এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কলকাতাকেন্দ্রিক **হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণি**
(বিশেষ করে জমিদার, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ) এর তীব্র বিরোধিতা করেন। প্রধান
কারণগুলো:
- **রাজনৈতিক-সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ**: অনেকে
এটিকে ব্রিটিশদের “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” নীতির অংশ এবং মুসলিমদের ক্ষমতায়নের পথ বলে
দেখেন। কেউ কেউ এটাকে “মক্কা ইউনিভার্সিটি” বলে বিদ্রূপ করেন।
- **অন্যান্য নেতা**: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়,
রাশবিহারী ঘোষ প্রমুখও
বিরোধিতা করেন। তারা স্মারকলিপি, সভা-সমাবেশ করে
বিরোধিতা করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতার অভিযোগ প্রচলিত থাকলেও এর সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই; অনেক গবেষক এটিকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। বিরোধিতা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার এগিয়ে যায়।
### উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
উপনিবেশিক যুগে (১৯২১-১৯৪৭) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
পূর্ববঙ্গের (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কৃষিপ্রধান,
শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা)
সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে:
- **শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র**: কলকাতার উপর
নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় চাহিদা অনুসারে শিক্ষা প্রসার করে। এটি “প্রাচ্যের
অক্সফোর্ড” খ্যাতি লাভ করে।
- **রাজনৈতিক সচেতনতা**: ছাত্ররা জাতীয়তাবাদী,
সাম্প্রদায়িক ও
পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় হয়। উপনিবেশিক আমলে এটি মুসলিম
লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক ধারার প্রভাবিত হয়।
- **সামাজিক পরিবর্তন**: পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ ও
কৃষক সমাজ থেকে শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করে সামাজিক গতিশীলতা বাড়ায়। তবে শুরুতে
হিন্দু-মুসলিম ছাত্র অনুপাতে ভারসাম্য ছিল না; ধীরে ধীরে মুসলিম ছাত্র বাড়ে।
**সারসংক্ষেপে**, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজের আত্মপ্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নের প্রতীক ছিল। এটি কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু ভদ্রলোক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি বিকল্প বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য এবং যুগান্তকারী ঘটনা।
এটি কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং পূর্ব
বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
করেছিল।
আপনার তিনটি
প্রশ্নের আলোকপাতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি ছিল মূলত রাজনৈতিক এবং পূর্ব বাংলার মানুষের
দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাস। এর মূল সূত্রগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) এবং মুসলিমদের অসন্তোষ: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে
নতুন প্রদেশ গঠিত হলে ঢাকায় এর রাজধানী তৈরি হয়। এর ফলে এই অঞ্চলের শিক্ষা ও
অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি শুরু হয়। কিন্তু কলকাতার হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও
কংগ্রেসের তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল)
করে। এর ফলে পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজ চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয় এবং নিজেদের
প্রতারিত মনে করে।
- মুসলিম নেতৃবৃন্দের চাপ: বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ব বাংলার মুসলিমদের শান্ত
করার জন্য এবং তাদের ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড
হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা সফরে আসেন। তখন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ,
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, এবং নওয়াব আলী চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল
ভাইসরয়ের সাথে দেখা করে পূর্ব বাংলায় শিক্ষার অনগ্রসরতা দূর করতে ঢাকায় একটি
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান।
- লর্ড হার্ডিঞ্জের প্রতিশ্রুতি ও নাথান কমিটি: মুসলিম নেতৃবৃন্দের দাবির মুখে লর্ড হার্ডিঞ্জ
ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯১২ সালের মে মাসে
ব্যারিস্টার আর. ডব্লিউ. নাথানের নেতৃত্বে 'নাথান
কমিটি' গঠন করা হয়। এই কমিটি ঢাকায় একটি আবাসিক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিবাচক রিপোর্ট দেয়।
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও অর্থ সংকট: ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে এবং ১৯১৫ সালে
নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ ঝুলে যায়।
পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে গঠিত 'স্যাডলার কমিশন' (কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন) ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে পুনরায়
জোরালোভাবে সমর্থন করে। অবশেষে ১৯২০ সালে 'ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় আইন' পাস হয় এবং ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়।
২. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের পর কলকাতার এবং পূর্ব বাংলার এক শ্রেণীর
উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজ (যাঁদের ঐতিহাসিকভাবে 'ভদ্রলোক'
বলা হতো) এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের এই বিরোধিতার পেছনে সামাজিক,
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ ছিল। প্রতিক্রিয়াগুলো ছিল নিম্নরূপ:
- "মক্কা
বিশ্ববিদ্যালয়" বলে উপহাস: কলকাতার অনেক হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও পত্রিকা এই
প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যঙ্গ করে "মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়" বা
"ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়" বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল,
এটি কেবল মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান
হবে এবং শিক্ষার মান ধরে রাখতে পারবে না।
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিপত্য হারানোর ভয়: তৎকালীন সময়ে সমগ্র বাংলার উচ্চশিক্ষা কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হতো। ঢাকায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হলে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় তার বাজেট, প্রভাব এবং পূর্ব বাংলার বিশাল ছাত্রসমাজ (যারা
কলকাতার কলেজগুলোতে পড়তে যেত) হারাবে—এই অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং
সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এর বিরোধিতা করেন।
- রাজনৈতিক ও শ্রেণীগত আশঙ্কা: ভদ্রলোক হিন্দুদের একটি বড় অংশ মনে করত, পূর্ব বাংলার মুসলিম এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুরা
(নমশূদ্র) যদি উচ্চশিক্ষিত হয়ে ওঠে, তবে
চাকুরির বাজারে এবং রাজনীতিতে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও জমিদারী ব্যবস্থা
সংকটে পড়বে।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক: একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে যে, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে (কারো মতে
গঙ্গার তীরে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে আয়োজিত একটি প্রতিবাদ
সভায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভাপতিত্ব করেছিলেন। তবে আধুনিক অনেক
ইতিহাসবিদ (যেমন ড. আনিসুজ্জামান) গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, এই সভায় রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির কোনো সুনির্দিষ্ট
তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না এবং তিনি শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে ছিলেন। তবে
কলকাতার সাধারণ হিন্দু বুদ্ধিজীবী সমাজ যে এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন ও
স্মারকলিপি প্রদান করেছিল, তা ঐতিহাসিকভাবে সত্য।
উল্লেখ্য,
তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ব্রিটিশরা মুসলিমদের দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
রক্ষার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। তবে বিরোধিতাকারীদের শান্ত করতে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো 'অ্যাফিলিয়েটিং' ক্ষমতা
দেওয়া হয়নি (অর্থাৎ এটি কোনো কলেজের পরীক্ষা নিতে পারত না), একে কেবল
একটি 'আবাসিক-শিক্ষামূলক' বিশ্ববিদ্যালয়
হিসেবে তৈরি করা হয়।
৩.
ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
১৯২১ থেকে
১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গের সমাজ গঠনে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিল। একে "পূর্ব
বাংলার অক্সফোর্ড" বলা হতো এবং
এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না হয়ে সামাজিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তিতে
পরিণত হয়।
ক. নতুন
মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে পূর্ব বাংলায় সুশিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ প্রায়
অনুপস্থিত ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে গ্রামীণ ও মফস্বলের মুসলিম
পরিবারের সন্তানরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। এক প্রজন্মেরই মধ্যে পূর্ব বাংলায়
ডাক্তার, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা, অধ্যাপক এবং
সাংবাদিকের এক বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠে, যা সমাজের
নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নেয়।
খ. বুদ্ধির
মুক্তি আন্দোলন ও প্রগতিশীলতা
১৯২৬ সালে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের উদ্যোগে গঠিত হয় 'মুসলিম
সাহিত্য সমাজ'। আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ এবং কাজী মোতাহার হোসেনের
নেতৃত্বে এই আন্দোলন বাংলায় "বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন" নামে পরিচিতি
পায়। তাঁদের মুখপত্র 'শিখা' পত্রিকার স্লোগান ছিল—"জ্ঞান
যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি
সেখানে অসম্ভব।" এটি পূর্ব
বাংলার রক্ষণশীল মুসলিম সমাজকে আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল চিন্তায় দীক্ষিত
করে।
গ. রাজনৈতিক
সচেতনতা ও নেতৃত্বের সৃষ্টি
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক চেতনার আঁতুড়ঘর। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল,
জগন্নাথ হল ইত্যাদি আবাসিক হলগুলোকে কেন্দ্র করে ছাত্র সংসদের মাধ্যমে নতুন
নেতৃত্ব তৈরি হয়।
- শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের 'কৃষক প্রজা পার্টি' এবং পরবর্তীতে মুসলিম লীগের বঙ্গীয় শাখা শক্তিশালী হয়ে ওঠার পেছনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অবদান ছিল প্রধান।
ঘ.
হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন
কলকাতার
ভদ্রলোক সমাজ শুরুতে বিরোধিতা করলেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিনগুলোতে
সিংহভাগ শিক্ষক এবং একটি বড় অংশের ছাত্র ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের। স্যার পি. সি.
রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু (বিজ্ঞানী), হরপ্রসাদ
শাস্ত্রীর মতো পণ্ডিতরা এখানে শিক্ষকতা করেছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এক
চমৎকার অসাম্প্রদায়িক ও জ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ তৈরি হয়, যা পূর্ব
বাংলার সমাজকে কলকাতার চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে বেশি উদারপন্থী করে তোলে।
ঙ. দেশভাগের
ও ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি
১৯৪০-এর
দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে,
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হওয়া জরুরি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঠিক
পূর্বমুহূর্তে এবং দেশভাগের পরপরই (যেমন ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন) বাঙালি
জাতীয়তাবাদের যে স্ফূরণ ঘটেছিল, তার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
উপসংহার
ঔপনিবেশিক
আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পূর্ববঙ্গের মানুষকে ডিগ্রি দেয়নি, বরং তাদের
"বাঙালি" এবং "অধিকার সচেতন" জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে
শিখিয়েছে। এটি না থাকলে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, '৬৯-এর
গণঅভ্যুত্থান কিংবা ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ ত্বরান্বিত হতো না। তাই ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুতিকাগার বলা অত্যন্ত যথার্থ।
১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক
ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্রিটিশ সরকার ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে。কলকাতা-কেন্দ্রিক
হিন্দু ভদ্রলোক সমাজ এর তীব্র বিরোধিতা করে。তবে পরবর্তীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি
পূর্ববঙ্গে শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনসহ
পুরো সমাজব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে。
- প্রতিহিংসা ও বিভাজনের অভিযোগ: ড. রাসবিহারী ঘোষ তৎকালীন ভাইসরয়কে বলেছিলেন,
ঢাকায় পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বাংলার
অভ্যন্তরীণ বিভাজন সৃষ্টি করবে。
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিপত্য রক্ষা: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ
মুখার্জীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা করেন。তাঁদের যুক্তি ছিল, পূর্ববঙ্গের
বেশিরভাগ মুসলমান কৃষক, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কোনো লাভ হবে না。
- অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন যে, এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব ও প্রাধান্য
কমিয়ে দেবে。
উপনিবেশিক
আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা:
- মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ববঙ্গের
অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটে。এর মাধ্যমে একটি নতুন শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত
শ্রেণির উদ্ভব হয়,যা পরবর্তীতে তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতিতে
গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব প্রদান করে।
- সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র: এটি কেবল শিক্ষাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না,
বরং আধুনিক চিন্তাধারা, সাহিত্য,
বিজ্ঞান ও গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে。
- রাজনৈতিক সচেতনতা: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, স্বাধিকার
আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবোধ ও ভাষা আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর
স্থাপনে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রধান সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে।
১৯৩২‑এর
সম্প্রদায়গত রোয়েদাদকে “বাংলা ভাগ হওয়ার” কারণ বলা হয় তার নীতিগত প্রভাবের
কারণে, না কি সেই সময় বাংলা আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ হয়ে গিয়েছিল
তার জন্য‑না। আসল কারণ হলো: এই রোয়েদাদ বাংলার হিন্দু–মুসলিম প্রতিনিধিত্বকে
সম্প্রদায়ভিত্তিকভাবে ধারালো করে দিয়েছিল, যার ফলে
বাংলা ভাগ হওয়ার রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক ভিত্তি আরও শক্ত হয়ে ওঠে।banglapedia+2
সম্প্রদায়গত
রোয়েদাদ কী করেছিল?
- ১৯৩২‑এর ১৬ আগস্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামজে
ম্যাকডোনাল্ড ঘোষিত এই রোয়েদাদ বাংলা সহ প্রাদেশিক আইনসভার আসন হিন্দু,
মুসলিম, ডাঙ্গর (অস্পৃশ্য),
ইউরোপীয় ইত্যাদি সম্প্রদায়ভিত্তিকভাবে সংরক্ষণ
করে দেয়।qualitycando+1
- বাংলা আসেম্বলিতে ২৫০টি আসনের মধ্যে জনসংখ্যার
অনুপাতের চেয়ে কম বা বেশি করে আসন বরাদ্দ করে মুসলিম ও বিশেষ
সম্প্রদায়গুলোকে আলাদা “আইডিয়াল প্যাকেজ” হিসেবে দাঁড় করানো হয়, যা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে।facebook+2
কেন একে
“বাংলা ভাগ করার কারণ” বলা হয়?
- রোয়েদাদ বাংলার রাজনীতিকে হিন্দু–মুসলিম দুই তীর
করে দেয়, প্রতিটি সম্প্রদায়কে আলাদা ভোটব্যবস্থা ও
আসনভিত্তিক সুযোগ দিয়ে; এটাই পরবর্তী দেশভাগ ও বাংলা ভাগের ধারার শুরু বলা
হয়।rc+2
- বাংলার হিন্দু রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এই
রোয়েদাদকে “বাংলা ভাগ” হিসেবে ব্যাখ্যা করার ঐতিহাসিক–রাজনৈতিক ধারা আছে,
কারণ এটি বাংলার অখণ্ড জাতীয় পরিচয়কে
সম্প্রদায়বিভক্ত “রাজনৈতিক ব্লক”‑এ রূপান্তর করেছিল।banglapedia+2
সংক্ষেপে
মূল কারণ
- সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ ১৯৩২ হিন্দু–মুসলিম, ডাঙ্গর ও অন্যান্য দলগুলোকে আলাদা “ভোট–ব্লক”
হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মান্যতা দেয়, যা
বাংলার একাত্ম রাজনৈতিক বোধকে ভেঙে দেয় এবং ১৯৪৭‑এর দেশভাগ ও পূর্ব–পশ্চিম
বাংলা বিভক্তির নীতিগত ভিত্তি তৈরি করে।banglapedia+2
সম্প্রদায়গত
রোয়েদাদ ১৯৩২ এবং বাংলা ভাগের সম্পর্ক
সম্প্রদায়গত
রোয়েদাদ কী?
১৯৩২ সালের
১৬ আগস্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড এই রোয়েদাদ ঘোষণা করেন।
এতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর জন্য — মুসলিম, শিখ,
খ্রিস্টান এবং "দলিত শ্রেণি"র জন্য — পৃথক নির্বাচনক্ষেত্র ও
সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়।
বাংলায় এর
প্রভাব
এই রোয়েদাদ
বাংলায় আইনসভার আসন পুনর্বণ্টন করে — মুসলমানদের জনসংখ্যা ৫৪% হলেও তাদের ৪৭.৮%
আসন দেওয়া হয়। এতে হিন্দু সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
১৯৩২ সালের
এই রোয়েদাদের ফলে আইনসভায় মুসলমানদের আসন আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৭ সাল থেকে
মুসলমানরা বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সরকার গঠন করে। মোট
২৫০টি আসনের মধ্যে ১১৯টি মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
কীভাবে
বাংলা ভাগের পথ তৈরি হলো?
১.
হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি
১৯৩২ সালের
সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ ঘোষণার আগ পর্যন্ত বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক মোটামুটি
সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক ছিল। ব্রিটিশ কৌশল ছিল কেন্দ্রকে দুর্বল ও
প্রদেশগুলোকে শক্তিশালী রাখা, যাতে সারা ভারত পর্যায়ে স্বাভাবিক রাষ্ট্রগঠন
প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
২. ভদ্রলোক
শ্রেণির ক্ষমতা হ্রাস
১৯৩২ সালে
পৃথক নির্বাচনক্ষেত্র চালুর ফলে কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লিগের জোট বাংলায়
ক্ষমতায় আসে। এতে উচ্চবর্ণীয় হিন্দু মধ্যবিত্ত বা "ভদ্রলোক" শ্রেণির
রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতা বিপন্ন হয়ে পড়ে — এবং তারা ক্রমশ সাম্প্রদায়িক
রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকে।
৩. ভাগই
"কম ক্ষতি"র পথ
সুভাষ বসু
বাংলা ভাগকে কোনো 'রোয়েদাদ' বলতে রাজি ছিলেন না — তাঁর কাছে এটি ছিল
"বাংলা ভাগের চেয়ে কম ক্ষতিকর একটি বিকল্প"। কিন্তু হিন্দু
জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা শেষ পর্যন্ত ভাগকেই সমর্থন করেন, কারণ তারা
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অবিভক্ত বাংলায় সংখ্যালঘু হতে চাননি।
৪. পৃথক
নির্বাচন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
১৯০৯ সালের
মর্লে-মিন্টো সংস্কার থেকে শুরু হয়ে ১৯১৯ ও ১৯৩২ সালের রোয়েদাদের মাধ্যমে পৃথক
নির্বাচনক্ষেত্র ধারাবাহিকভাবে প্রসারিত হয়, যা ধর্মকে
রাজনীতির কেন্দ্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
সংক্ষেপে
|
কারণ |
ব্যাখ্যা |
|
পৃথক
নির্বাচনক্ষেত্র |
হিন্দু ও
মুসলমানকে রাজনৈতিকভাবে আলাদা করল |
|
ক্ষমতার
পরিবর্তন |
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ
বিধানসভা হিন্দু অভিজাতদের উদ্বিগ্ন করল |
|
সাম্প্রদায়িকতার
বিস্তার |
ভদ্রলোক
শ্রেণি হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকল |
|
ব্রিটিশ
"ভাগ করো শাসন করো" নীতি |
বিভেদকে
কাজে লাগিয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দুর্বল করা |
উপসংহার: ১৯৩২ সালের সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ সরাসরি বাংলা ভাগ
করেনি, কিন্তু এটি হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক মেরুকরণকে এমনভাবে
গভীর করে দেয় যে ১৯৪৭ সালের ভাগ কার্যত অনিবার্য হয়ে পড়ে।
১৯৩২ সালের সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ বা কমিউনাল
অ্যাওয়ার্ড ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই
রোয়েদাদের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য আইনসভায়
প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করে দেয়।
১৯৩২ সালের "কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড"
ছিল ব্রিটিশ সরকারের একটি ঘোষণা, যা ভারতের
বিভিন্ন প্রদেশে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা নির্বাচকমণ্ডলীর
ব্যবস্থা করে । বাংলার ক্ষেত্রে এই ঘোষণার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে বাংলার
আইনসভায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয় এবং হিন্দুরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়
।
আইনসভায় সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়ার পর বাংলার
হিন্দু নেতৃত্ব বুঝতে পারেন যে আগের মতো তাঁরা আর ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। বিশেষ
করে, বাংলার উচ্চবর্ণের হিন্দু
অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যাঁরা
"ভদ্রলোক" নামে পরিচিত, তাঁরা মনে করেন
একটি মুসলমান-অধ্যুষিত সরকার তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না ।
এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপড়েন ধীরে ধীরে
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও হিংসার রূপ নেয়। ১৯৪৬ সালের আগস্টে "ডাইরেক্ট অ্যাকশন
ডে"-র পর কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গা হয় ("গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং")। এর
পরে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে সহাবস্থান প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে ।
১৯৩২ সালের কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড বাংলার
সংখ্যালঘু হিন্দুদের মনে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করে। ক্ষমতা ধরে রাখার
তাগিদ থেকে একটি শক্তিশালী হিন্দু গোষ্ঠী একটি পৃথক প্রদেশের দাবি তুলে, যা ধীরে ধীরে অমীমাংসিত সাম্প্রদায়িক
দ্বন্দ্বের জন্ম দেয় এবং শেষ পর্যন্ত বাংলার চূড়ান্ত বিভাজনের মাধ্যমে গিয়ে পৌঁছায়
।
Communal Award ছিল ব্রিটিশ
প্রধানমন্ত্রী Ramsay MacDonald ঘোষিত একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা (১৬ আগস্ট ১৯৩২), যেখানে
ব্রিটিশ ভারতবর্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীর জন্য আলাদা প্রতিনিধিত্ব ও
সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য বলা হয়েছিল সংখ্যালঘুদের
প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, কিন্তু বাস্তবে এটি “divide and rule” নীতিকে আরও
শক্তিশালী করে।
বাংলা ভাগ
হওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিল:
- ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থানমুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার মতো দলগুলো ক্রমে ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক ভিত্তি বানায়। Communal Award এই বিভাজনকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
- পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী (Separate Electorates)মুসলিম, হিন্দু, শিখসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী আলাদা ভোটব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করত। ফলে “একক ভারতীয় জাতীয়তা” দুর্বল হয়ে যায়।
- বাংলার জনসংখ্যাগত বাস্তবতাঅবিভক্ত বাংলায় পূর্বাঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পশ্চিমাঞ্চলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। ১৯৪০-এর দশকে এই ধর্মীয় বিভাজন রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নেয়।
- Lahore Resolutionমুসলিম লীগ পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি তোলে, যা পরে পাকিস্তান সৃষ্টির ভিত্তি হয়।
- Partition of Indiaব্রিটিশরা ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় ধর্মভিত্তিক বিভাজনের পথ বেছে নেয়। ফলে বাংলা দুই ভাগে বিভক্ত হয়:
- পূর্ব বাংলা → পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান Bangladesh)
- পশ্চিম বাংলা → ভারতের West Bengal
অর্থাৎ,
১৯৩২ সালের Communal Award একমাত্র কারণ ছিল না, তবে এটি
ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক বিভাজনকে গভীর করে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলা ভাগের পথে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
**সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ (Communal Award) ১৯৩২ সালের ১৬ আগস্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
রামসে ম্যাকডোনাল্ড ঘোষণা করেন।** এটি গোলটেবিল বৈঠকে (১৯৩০-৩২) সাম্প্রদায়িক
প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ব্যর্থতার পর ব্রিটিশ সরকারের একতরফা সিদ্ধান্ত ছিল। এর মূল
উদ্দেশ্য ছিল প্রাদেশিক আইনসভায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের (মুসলিম, শিখ, দলিত/Depressed Classes, ইউরোপীয়ান,
অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান
ইত্যাদি) জন্য **পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী (separate electorate)** এবং আসন বণ্টন নির্ধারণ করা, যা পরে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে অন্তর্ভুক্ত
হয়।
- বাংলায় মুসলমানরা জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ
(প্রায় ৫৪-৫৭%) হলেও রোয়েদাদে তাদের আসন সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা **প্রকৃত সংখ্যাগুরু থেকে কার্যত
সংখ্যালঘু** অবস্থায় চলে যায়।
- ইউরোপীয়ানদের (ব্রিটিশ ব্যবসায়ী-জমিদার)
অতিরিক্ত আসন (weightage) দেওয়া হয়,
যা হিন্দু-মুসলিম উভয়কেই
প্রভাবিত করে।
- এতে **সাম্প্রদায়িক রাজনীতি** আরও তীব্র হয়।
হিন্দু সম্প্রদায় (বিশেষ করে উচ্চবর্ণের বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণি) এটিকে মুসলিম
আধিপত্যের হুমকি হিসেবে দেখে, আর মুসলিম লীগ ও
অন্যান্য মুসলিম নেতারা এটিকে অপর্যাপ্ত মনে করলেও গ্রহণ করে।
রোয়েদাদ **সরাসরি বাংলা ভাগ করে নি** (১৯০৫-এর
প্রথম বঙ্গভঙ্গ আলাদা ঘটনা, যা ১৯১১ সালে
বাতিল হয়)। কিন্তু এটি **দীর্ঘমেয়াদি কারণ** হিসেবে কাজ করে:
2. **বাংলার রাজনীতিতে পরিবর্তন**: ১৯৩৭ সালের
নির্বাচনে মুসলিম লীগ ও অন্যান্য মুসলিম দল শক্তিশালী হয়। হিন্দু নেতৃত্ব (যেমন
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দু মহাসভা প্রভাব) ক্রমশ মুসলিম-সংখ্যাগুরু বাংলায়
নিজেদের অবস্থান হারানোর আশঙ্কায় সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে।
3. **১৯৪০-এর দশকে চূড়ান্ত প্রভাব**: লাহোর প্রস্তাব
(১৯৪০), দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর
রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার (১৯৪৬) মধ্য দিয়ে বাংলা ভাগের দাবি জোরালো হয়।
হিন্দু নেতারা পশ্চিমবঙ্গ চেয়েছিলেন যাতে হিন্দু সংখ্যাগুরু হয়, মুসলিম লীগ পূর্ববঙ্গ-পাকিস্তান চেয়েছিল।
১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ (Communal Award) এবং এর
পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ বাংলার ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বাঁক। এটি সরাসরি ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগের একমাত্র কারণ না হলেও, বিভাজনের
বীজ বপন এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে এটি
একটি অনুঘটক (catalyst) হিসেবে কাজ করেছিল।
বিষয়টি
সহজভাবে বোঝার জন্য রোয়েদাদ কী ছিল এবং সেটি কীভাবে পরোক্ষভাবে বাংলা ভাগের পথ
তৈরি করেছিল, তা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১.
সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ (১৯৩২) কী ছিল?
১৯৩২ সালের
১৬ আগস্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড এই রোয়েদাদ বা নীতি ঘোষণা
করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের আইনসভাগুলোতে বিভিন্ন ধর্মের ও অনগ্রসর শ্রেণীর
মানুষের জন্য আসন সংখ্যা এবং প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করা।
এর প্রধান
বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:
- পৃথক নির্বাচন মণ্ডলী (Separate
Electorate): মুসলমান, শিখ,
ভারতীয় খ্রিস্টান, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান
এবং দলিত (তফসিলি জাতি)-দের জন্য আলাদা নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ,
মুসলিম আসনের জন্য কেবল মুসলিমরাই ভোট দেবেন,
দলিত আসনের জন্য দলিতরাই ভোট দেবেন।
- বাংলায় আসন বিন্যাস: বাংলার আইনসভায় মুসলিম মেজরিটিকে (সংখ্যাগরিষ্ঠতা)
স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তাদের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে আসন কিছুটা কম দেওয়া হয়,
আবার ইউরোপীয় ও ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত আসন
বরাদ্দ করা হয়। ফলে কোনো একক দেশীয় দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছিল না।
২. এটি কেন
বাংলা ভাগের ভিত্তি তৈরি করল?
রোয়েদাদ
সরাসরি কোনো দেশ বা প্রদেশ ভাগ করেনি, কিন্তু এটি এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্ম
দেয় যা পরবর্তীতে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল তুলে দেয়।
ক) রাজনৈতিক
মেরুকরণ ও ক্ষমতার ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন
১৯৩২ সালের
পর ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বাংলায় শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি
এবং মুসলিম লীগের যৌথ সরকার গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালেও মুসলিম লীগ সরকার গঠন
করে। মুসলিম লীগ মূলত মুসলিম স্বার্থের রাজনীতি করায় এবং হিন্দু রাজনৈতিক নেতারা
ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় বাংলার উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের একাংশের মধ্যে এক
ধরনের অবহেলা ও ভয়ের অনুভূতি তৈরি হয়। তারা ভাবতে শুরু করেন যে, অখন্ড
বাংলায় তারা চিরকাল রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে থাকবেন।
খ) কংগ্রেস
ও মুসলিম লীগের দূরত্ব
রোয়েদাদকে
কেন্দ্র করে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যকার দূরত্ব চূড়ান্ত রূপ নেয়। কংগ্রেস এই
পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার বিরোধিতা করে (কারণ এটি ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে খণ্ডিত
করছিল), অন্যদিকে মুসলিম লীগ একে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব
রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে লুফে নেয়। ফলে যৌথ রাজনৈতিক আন্দোলনের সম্ভাবনা চিরতরে শেষ
হয়ে যায়।
৩.
চূড়ান্তভাবে কেন বাংলা ভাগ হলো (১৯৪৭)?
১৯৩২ সালের
রোয়েদাদ যে সাম্প্রদায়িক দূরত্বের সৃষ্টি করেছিল, তার চূড়ান্ত
রূপ প্রকাশ পায় ১৯৪০-এর দশকের কিছু বাস্তবতার মাধ্যমে। মূলত ৩টি প্রধান কারণে ১৯৪৭
সালে বাংলা ভাগ হয়ে যায়:
- জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব ও পাকিস্তান আন্দোলন: মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর "দ্বিজাতি তত্ত্ব"
(হিন্দু ও মুসলিম দুটি আলাদা জাতি) এবং মুসলিম লীগের আলাদা স্বাধীন পাকিস্তান
রাষ্ট্রের দাবি বাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মুসলিম লীগ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ
অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান গঠন করতে চেয়েছিল, যার
মধ্যে পুরো বাংলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
- ১৯৪৬ সালের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ও দাঙ্গা: ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের ডাকা 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' বা
প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসকে কেন্দ্র করে কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা
(Great Calcutta Killings) শুরু হয়। এরপর নোয়াখালীতেও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এই
নৃশংসতা সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতাদের বোঝাইয়া দেয় যে, দুই সম্প্রদায় হয়তো আর একসাথে শান্তিতে থাকতে
পারবে না।
- বাংলার হিন্দুদের একাংশের দেশভাগের দাবি: দাঙ্গার পর এবং মুসলিম লীগ সরকারের অধীনে নিজেদের
ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে বাংলার হিন্দু মহাসভা (শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির
নেতৃত্বে) এবং কংগ্রেসের একাংশ দাবি তোলে—যদি ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান হয়ই,
তবে বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে (পশ্চিমবঙ্গ)
ভারতের সাথে যুক্ত করা হোক। তারা পুরো বাংলা পাকিস্তানের অধীনে যাওয়ার চেয়ে
বাংলা ভাগ করাকে শ্রেয় মনে করেছিলেন।
সংক্ষেপে: ১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ধর্মের ভিত্তিতে
নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করে বাংলার হিন্দু ও মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুটি ভিন্ন
মেরুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। এই মেরুকরণই পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা এবং ১৯৪৭
সালের দেশভাগের সময় বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি
করে।
১৯৩২ সালের 'সম্প্রদায়গত
রোয়েদাদ' (Communal Award) ছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামজে ম্যাকডোনাল্ডের
ঘোষিত একটি নীতি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু, মুসলিম ও
অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা ও আসন বণ্টন করা। এটি বাংলার
রাজনীতিতে স্থায়ী সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করে এবং পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ধর্মের
ভিত্তিতে বাংলা ভাগের ভিত্তি স্থাপন করে।
কেন বাংলা
ভাগ হলো?
- সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের প্রভাব: ১৯৩২ সালের রোয়েদাদে মুসলিমদের জন্য জনসংখ্যার
অনুপাতে আসন সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, যা
হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে রাজনৈতিক বৈরিতা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে উভয়
সম্প্রদায়ের মধ্যে আলাদা জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে।
- সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর দ্বন্দ্ব: অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমরা সামগ্রিক ভাবে
সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও, ব্রিটিশ আমলে শিক্ষা, অর্থনীতি
ও চাকরিতে হিন্দুরা তুলনামূলক এগিয়ে ছিল। এই রোয়েদাদের ফলে মুসলমানরা
নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
- ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও, হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয়
জাতীয়তাবাদ প্রবল আকার ধারণ করে। বাংলা ভাগের পেছনে এটি সবচেয়ে বড় সামাজিক
কারণ হিসেবে ভূমিকা রাখে।
- রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা: ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে অখণ্ড বাংলার দাবীতে কিছু
নেতা (যেমন—শরৎ বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী) সোচ্চার হলেও, হিন্দু মহাসভা (শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বে)
এবং মুসলিম লীগের মধ্যে চূড়ান্ত মতবিরোধের কারণে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
- সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা: Direct Action Day বা 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস'-এর মতো ঘটনা এবং পরবর্তী দাঙ্গোগুলো হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থার সংকট চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। শেষপর্যন্ত বাংলা বিধানসভার ভোটাভুটির মাধ্যমে বাংলা দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ক্লাস লেকচার বিষয়: হিন্দু ঐক্য এবং মুসলমান স্বেচ্ছাচার: হিন্দু
ভদ্রলোক রাজনীতির বিভিন্ন বিষয় (১৯৩৬-৪৭) প্রিয়
শিক্ষার্থীবৃন্দ, আমরা আজকের ক্লাসে আলোচনা করব ১৯৩৬- ৪৭ কাল পর্বে হিন্দু
ভদ্রলোক রাজনীতি কিভাবে উপনিবেশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী প্রবণতা থেকে সরে গিয়ে
ক্রমেই অভ্যন্তরীণ ও সংকীর্ণ বিষয় দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং ক্রমবর্ধমান ভাবে ভদ্রলোক
রাজনীতি স্থানীয় জেলা বোর্ডের নগণ্য বিষয়ের মধ্যে যেমন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে তেমনি
হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী হিন্দু সাম্প্রদায়িকতায় আকৃষ্ট হলো এজন্য তারা উল্লিখিত
কাল পর্বে “হিন্দু রাজনৈতিক সম্প্রদায়” গড়ে তোলার সর্বাত্মক প্রয়াস গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে আমরা প্রথমে হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী কেন ও কিভাবে
হিন্দু রাজনৈতিক সম্প্রদায় গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করল সে বিষয়ে আলোকপাত
করে এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া কি ছিল এর পরিণতি কি ছিল তার উপর আলোচনা
করব। লেকচারটি তৈরি করা হয়েছে, জয়া চ্যাটার্জির
বাঙলা ভাগ হলো গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়:হিন্দু ঐক্য এবং মুসলমান:স্বেচ্ছাচার হিন্দু
ভদ্রলোক রাজনীতির বিভিন্ন বিষয় ১৯৩৬-৪৭ এর ওপর ভিত্তি করে। আপনাদের কাজ হল- আমার
লেকচারটি পড়ার আগে জয়া চ্যাটার্জির বাঙলা ভাগ হলো গ্রন্থ থেকে উল্লেখিত চ্যাপ্টারটি
মনোযোগ সহকারে কয়েকবার পড়বেন। পড়ার সময় প্রত্যেকটি লাইন মনোযোগ দিয়ে পড়বেন।
যে লাইনগুলো আপনার কাছে ইম্পোর্টেন্ট মনে হবে সেগুলো আন্ডারলাইন করুন। এরপর গোটা
চ্যাপ্টারের একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করুন। এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল
প্রশ্ন অনুযায়ী পরীক্ষার খাতায় যতটুকু লিখতে পারবেন ঠিক ততটুকু নোট রাখুন। বিশেষ দ্রষ্টব্য: আপনারা প্রতিটি বড় প্রশ্ন লেখার জন্য ৪৮
মিনিট সময় পান!
এমন হতে পারে এভাবে জয়া চ্যাটার্জির উল্লিখিত
চ্যাপ্টারটি পড়ার পরে আমার লেকচার আর আপনার পড়ার প্রয়োজনীয়তা নাও হতে পারে।
কারণ এখানে আমার কোনো বক্তব্য নাই,পুরো বক্তব্যটি
জয়া চ্যাটার্জীর!
প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, প্রথমেই আমরা আলোচনা করি হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী ১৯৩৬-৪৭ কাল
পর্বে কেন হিন্দু রাজনৈতিক সম্প্রদায় গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলো? সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ ঘোষণা(১৯৩২) ও পুনা চুক্তির পর বিভিন্ন
সংগঠন(বিশেষভাবে -সত্যম শিবম )নতুন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। বাঙলার জনসংখ্যার
মধ্যে মোটামুটিভাবে শতকরা ১১ শতাংশ ছিল সম্প্রদায়ের লোক। তাদেরকে ফলপ্রসূভাবে
হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করা গেলে ভদ্রলোকেরা ক্রমান্বয়ে বেশি করে 'হিন্দু' স্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকে পড়ায় ব্যাপক
হিন্দু রাজনৈতিক ভিত্তি গঠনের প্রয়োজনে নিম্ন শ্রেণীর উন্নত সামাজিক মর্যাদার
আকাঙ্ক্ষার প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল হতে উৎসাহিত হয়। সামগ্রিকভাবে ভদ্রলোক সমাজের কাছে 'সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের' বৈশিষ্ট্য
নিঃসন্দেহে একটা মহান প্রতীক হিসেবে আকর্ষণ সৃষ্টি করে; শহরের পেশাগত শ্রেণী বা গ্রামীণ জমিদার ও তালুকদার, পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত' বুদ্ধিজীবী বা
ঐতিহ্যগত সম্ভ্রান্ত সম্প্রদায় (gentry), ১৪ সম্পদশালী খ্যাতিমান
ব্যক্তিবর্গ বা অতি সাধারণ ভদ্রলোক পুরোহিত সবার। কাছে তা আবেদন সৃষ্টি করে।
বস্তুত মধ্যম সারির ভদ্রলোক, যারা কোলকাতা ও মফস্বল শহরে বিভিন্ন সার্ভিসের
নিচের দিকের স্তরে কাজ করত দৈহিক শ্রম দেয় না এমন কর্মচারী ও ছোট শহরের উকিল, যারা শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল জীবিকায় নিয়োজিত ছিল-এ ধরনের
লোকজনেরা তাদের উর্ধ্বতন লোকদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাবির সাথে একাত্মতা
প্রকাশ করে। কিন্তু ব্যাপক অর্থে ভদ্রলোক সমাজের সব অংশকে একত্রিত করা এখন আর
যথেষ্ট ছিল না। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে এটা প্রমাণিত হয় যে, কেবলমাত্র ব্যাপক হিন্দু সমর্থন পেলেই প্রদেশের রাজনীতিতে
উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুরা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে। তফশিলি সম্প্রদায়ের আসনের
মধ্যে শতকরা বিশ ভাগের বেশি বেশি আসন লাভে কংগ্রেসের ব্যর্থতায় ঐ দলের সামাজিক
ভিত্তির সীমাবদ্ধতা এবং ভদ্রলোক জগতের ক্ষুদ্র গণ্ডির বাইরে বন্ধু লাভের ব্যর্থতা
প্রকাশ পায়। এই শক্তিশালী রাজনৈতিক বিবেচনা হিন্দু স্বার্থের মুখপাত্রদের হিন্দু জনগণের ঐ অংশকে, যারা ঐতিহাসিকভাবে ঐ স্বার্থের অংশীদার নয়, যাদের ভদ্রলোক সংস্কৃতি থেকে বাইরে রাখা হয়েছিল, তাদের মন জয় করার চেষ্টা করতে বাধ্য করায়। নিষ্ফল গণসংযোগ
উদ্যোগের ইতিহাস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, অনুন্নত শ্রেণীর
সমর্থন প্রাপ্তির উদ্যোগে ভূ-সম্পত্তি বিষয়ক চরম মতবাদকে ভিত্তি করা যাবে না; ভদ্রলোকদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে হিন্দু ঐক্য
গঠন করা যাবে না। তাই বিভিন্ন শ্রেণীর হিন্দুদের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ
হিন্দু রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের পরিধির বিস্তার একটি উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে
আবির্ভূত হয়।
মধ্য ত্রিশ দশকে বাঙলায় বিভিন্ন শ্রেণীকে
সংঘবদ্ধ করার কর্মসূচির বিস্তৃতি লক্ষ করা যায় এ উদ্যোগ নেয় প্রধানত হিন্দু সভা ও
মহাসভা। ১৯৩১ সালে মহাসভা বাংলা, আসাম ও বিহার অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ সাঁওতাল, গারো, ডালু, বানাই, খাসিয়া, ওড়াৎ, মুণ্ডা, মিকির, মিরি, মিসনি, লুসাই, কুকী, লালুং, কাছাড়ী, রাভ, মেচ প্রভৃতি, উপজাতীয়দের উচ্চ শ্রেণীর হিন্দু নাম গ্রহণের এবং পরবর্তী
আদমশুমারিতে 'ক্ষত্রিয়' হিসেবে নাম তালিকাভুক্তির আহ্বান জানায়। ১৯৩৯ সালের মার্চ মাসে সাভারকার নিজে বাঙলায় আনুষ্ঠানিকভাবে
পুনরায় মহাসভার কর্মসূচি চালু করেন। এ কর্মসূচিতে বর্ণগত ঐক্যের ওপর দল যে বিশেষ
গুরুত্ব আরোপ করেছে তার উল্লেখ করা হয়। মুঙ্গেরে এক জনসভায় সাভারকার পাঁচটি
সাঁওতাল ছেলেকে হিন্দু সম্প্রদায়ে গ্রহণ করে নেন। ঐ বছরের শেষের দিকে ড, শ্যামাপ্রসাদ
মুখার্জী টিপেরা জেলার চাঁদপুরে যান। সাহা সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত
স্থানীয় গৌর-নিতাই মন্দির সকল বর্ণের হিন্দুদের উপাসনার জন্য তিনি মন্দির খুলে
দিতে তাদের রাজি করাতে সক্ষম হন'। এ সময় অনেক
হিন্দু সংগঠনের উন্মেষ ঘটে এদের সবার উদ্দেশ্য হল হিন্দু সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা।
১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গীয় হিন্দু সংহতি প্রতিষ্ঠিত হয়, এর উদ্দেশ্য ছিল 'বাঙলার হিন্দুদের
অধিকার, আইনগত স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধা রক্ষা করা এবং হিন্দু
সম্প্রদায়ের সব শ্রেণীর মধ্যে সংহতি বৃদ্ধি করা'।” ঐ বছরের মার্চ মাসে এ সংগঠনের লোকেরা কোলকাতায় বলেন যে, 'আদিবাসী গোষ্ঠীর লোকদের হিন্দু হিসেবে পরিচিতির প্রয়োজন আছে' এবং তারা এই সংগঠনের কাজে যোগ দেওয়ার জন্য প্রদেশের হিন্দু
জমিদারদের কাছে আহ্বান জানায়। একটা 'কনট্যাক্ট বোর্ড' (Contact Board) বা যোগাযোগ করার জন্য বোর্ড নিয়োগ করা হয় এ বোর্ডের ঘোষিত
উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর লোকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ
রক্ষা করা। এ ধরনের প্রস্তাবে নিম্ন বর্ণের অনেক সংগঠন আগ্রহের সাথে
সাড়া দেয়। তাদের শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে গ্রহণের এবং তাদের সামাজিক
আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি লাভের জন্য তারা খুবই আগ্রহী ছিল। ১৯৩৯ সালের এপ্রিল মাসে
মেদিনীপুরের জলামুখায় আয়োজিত মাহিষ্য সম্মেলনের কথা বলা যেতে পারে । এই সম্মেলনের
আহ্বান ছিল- 'প্রতিটি গ্রামে হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠা, কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর কথা উল্লেখ না করে নিজেদের হিন্দু
পরিচয়ে সার্বজনীন পূজা পালন অনুষ্ঠান প্রবর্তন (সব শ্রেণীর সম্মিলিত উপাসনা), বিভিন্ন গোত্র ও উপগোত্রের মধ্যে অসবর্ণ বিবাহ প্রবর্তন এবং
সাধারণভাবে হিন্দুদের স্বার্থকে রক্ষার প্রয়াস চালানো। ২০ মাহিষ্যরা ছিল মধ্যবর্তী
'জলাচল' শ্রেণীর লোক, ধর্মীয় মর্যাদায়
নীচু হলেও তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল বেশি। ২৪ নমঃশূদ্রদের
মতো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে,
বিশেষ করে বিশ দশকে মেদিনীপুরে ইউনিয়ন বোর্ড
বয়কট করার ক্ষেত্রে তারা একটা ভূমিকা পালন করে। মাহিষ্যদের যেসব সদস্য ঐ সম্মেলনে
প্রতিনিধিত্ব করে তারা 'সাধারণভাবে হিন্দুদের স্বার্থে' নিজেদের সংশ্লিষ্ট করতে ইচ্ছুক বলে প্রতীয়মান হয়, তবে বিনিময়ে তারা এই দাবি করে যে মাহিষ্য সম্প্রদায়ের
গৌরবময় অতীত'কে উচ্চ বংশজাত হিন্দুদের গ্রহণ করতে হবে। প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, এবার আসা যাক-
হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণীর হিন্দু রাজনৈতিক সম্প্রদায় গড়ে তোলার প্রয়াস এর
বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল-সে বিষয়ে আলোচনায় যাওয়া যাক! ত্রিশ দশকের শেষ দিকে বিভিন্ন শ্রেণীকে সংঘবদ্ধ করার
কর্মসূচি ছিল বাঙলায় ঐক্যবদ্ধ ও আত্ম-সচেতন হিন্দু রাজনৈতিক সম্প্রদায় সৃষ্টির
বৃহত্তর আন্দোলনের অংশবিশেষ। এতে বিশ্বয়ের কিছু নেই যে, এসব আন্দোলন মুসলমানদের কাছে যথেষ্ট বিরক্তির কারণ হয়। ১৯৪১ সালের আদমশুমারি ও বর্ণ হিন্দুদের
উদ্দীপনার সাথে নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তরকরণ একই সময় ঘটে। এ সময় দুই
সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে এবং তা রাজনৈতিক মঞ্চকে
প্রভাবিত করে…। মন্ত্রীদের মধ্যে ঘন ঘন 'আলোচনা অনুষ্ঠিত
হয়; মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিতে থাকেন; হিন্দু সংবাদপত্রে পাল্টা বিবৃতি প্রকাশিত হতে থাকে এবং দুই
সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের একটা আবহাওয়া সৃষ্টি হয়'। আদমশুমারির কাজ
চলার সময় সারা প্রদেশ থেকে খবর পাওয়া যায় যে, 'তফশিলি
সম্প্রদায়ের লোকদের শুধু হিন্দু হিসেবে তালিকাভুক্তির চেষ্টা করা হচ্ছে', এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ চেষ্টার সময় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ
হয়েছে। রাজশাহীতে 'বিক্ষোভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে সাঁওতালদের নিয়ে। বাঁকুড়া জেলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লক্ষ করেন যে, সাঁওতালদের হিন্দু হিসেবে গণনা করার জন্য মহাসভার লোকেরা
অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। এর পাল্টা পরিশ্রম হিসেবে স্থানীয় মুসলিম লীগের লোকেরা
সাঁওতালদের মধ্যে কাজ করে এবং তাদের আদিবাসী হিসেবে নিজেদের রেকর্ড করাতে উৎসাহিত
করার জন্য 'চেষ্টার ত্রুটি করেনি'। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এই আন্দোলনে ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ
করেন। 'এ বিষয়ে জেলায় কয়েকটা বক্তৃতা দেওয়ার জন্য' তিনি কোলকাতা থেকে বাঁকুড়ায় আসেন। স্থানীয় মহাসভা নেতারা 'সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকায় বক্তা ও এজেন্ট প্রেরণ করে। মুসলিম
লীগের পক্ষ থেকেও তাদের প্রয়াস জোরদার করা হয়। পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট জানান যে, 'হিন্দু-বিরোধী প্রচার করার জন্য মুসলিম লীগ কিছু সাঁওতালকে
অর্থের বিনিময়ে কাজে লাগায়।; সাধারণভাবে নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুরা, বিশেষ করে বিশুদ্ধতর শাস্ত্রীয় মর্যাদার স্বীকৃতির জন্য
যারা আগে থেকেই দাবি জানিয়ে আসছিল তারা, কৃতজ্ঞচিত্তে
প্রস্তাবিত 'হিন্দু' পরিচিতি গ্রহণ করে। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের শ্রেণী সংগঠিত করার আন্দোলনে
দ্বিতীয় বার জন্মলাভ করা বর্ণের বিষয়টি মানুষের হৃদয় পরিবর্তনে সমর্থ হয়নি। এর ওপর
মনে হবে এই আন্দোলনের দর্শন উনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার ঠিক
বিপরীত, যে চিন্তাধারায় জাতিভেদ প্রথাকে সমর্থন করা হয় এবং
শ্রেণীভিত্তিক বিধানের প্রতি দৃঢ় আনুগত্য প্রচার করা হয়। কিন্তু আসলে জাতিভেদ
প্রথা আমূল পরিবর্তনের জন্য সমালোচনা করা হিন্দু সভার কর্মসূচি ও আদর্শের কোনো অংশ
ছিল না। এর পরিবর্তে নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুদের 'হিন্দু
সম্প্রদায়ের' মধ্যে আকৃষ্ট করার আন্দোলনগুলির লক্ষ্য ছিল একটি স্বীকৃত
কাঠামোর মধ্যে কাজ করা। সাধারণভাবে যাকে বলা যায় 'সংস্কৃতায়ন' (sanskriti-sation)। নিম্ন বর্ণের
লোকেদের ক্রমোচ্চ শ্রেণীবিভাগের অপেক্ষাকৃত উঁচু স্তরে উঠে আসতে কিছু পরিচিত
আচার-আচরণ পালন করতে উৎসাহিত করা হয়। সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর নাম গ্রহণ করে বর্ণভেদ
প্রথায় দ্বিতীয়বার জাতিগত হওয়ার জন্য তারা কিছুটা ধর্মীয় আচার পালনের অনুমতি পায়
এবং যেসব 'অপবিত্র' ধর্মীয় প্রথা পালনের জন্য তাদেরকে অপমানিত করা
হত সেই সব প্রথার কিছু কিছু আচার তাদের ত্যাগ করতে বলা হয়। নতুন হিন্দু নাম
গ্রহণের মাধ্যমে ধর্মান্তরিতকরণের আন্দোলনকে বলা হয় 'শুদ্ধি' আন্দোলন আন্দোলনের এই নাম থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, বিংশ শতাব্দীর হিন্দু সম্প্রদায়গত সংগঠনগুলো পবিত্রতা ও
অশুদ্ধতার বিষয় নিয়ে তাদের আচ্ছন্নতা বজায় রেখেছে। আর ঐ বিষয়গুলোই হল জাতিভেদ
প্রথার মূল এবং কেন্দ্রীয় বিষয়। এ কারণে সত্যম শিবম সম্প্রদায়ের (sect) স্বরাজবাদী 'সন্ন্যাসী বাবা'র উৎসাহে জিতু সাঁওতাল আনুষ্ঠানিকভাবে অপবিত্র শুকর ও
মুরগির মাংস ত্যাগ করে 'হিন্দুদের মধ্যে সাঁওতালদের অন্তর্ভুক্ত হতে' উদ্বুদ্ধ হয়। ১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে 'সারা বাঙলায় সপ্তাহব্যাপী হিন্দু মেলা অনুষ্ঠিত হয়'ঐসব মেলায় নিম্ন শ্রেণীর লোকেরা 'শুদ্ধি' অনুষ্ঠানের মাধ্যমে 'পুনরায় ধর্মান্তরিত' হয়। এই কর্ম কৌশল
বাঙলার জন্য উপযোগী ছিল এখানে আগে থেকেই অনেক নিম্ন শ্রেণীর লোক নিজেদেরকে পবিত্র
করার বা নিজেদের ধর্মীয় আচারকে ব্রাহ্মণদের মতো করার চেষ্টা করে। দৃষ্টান্ত হিসেবে
বলা যায়, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে রাজবংশী নেতা পঞ্চানন বর্মন তার
শ্রেণীর লোকদের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী মূল্যবোধ ও আচার প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে 'ক্ষত্রিয় সভা' প্রতিষ্ঠিত করেন। কুড়ি বছর পর সেটেলমেন্ট অফিসার এফ, ও. বেল এই আন্দোলনের সাফল্য দেখতে পান। ১৯৩৯ সালে তিনি লক্ষ
করেন যে, সবচেয়ে গরিব রাজবংশী কৃষকও দ্বিতীয় বারের জাত শ্রেণীর পৈতা
ব্যবহার করে।
ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে নিম্ন শ্রেণীর লোকদের
হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আনার এসব আন্দোলন তাদেরকে বাহ্যিকভাবে সাম্প্রদায়িক
রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতি আরো বেশি করে আকৃষ্ট করে। জিতু সান্যালের সর্বশেষ
প্রতিরোধটি হয় ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদকে নিয়ে, ১৯৩২ সালে। জিতু
ও তার অনসারী একদল সাঁওতাল লোক এই পরিত্যক্ত মসজিদে আক্রমণ চালায় এবং ধ্বংসাবশেষের
ওপর 'অশাস্ত্রসম্মতভাবে' কালী উপাসনার
ব্যবস্থা করে। এ সময় পুলিশের গুলিতে জিতু নিহত হয়। চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে নিম্ন শেণীর লোকদের হিন্দু
রাজনীতিতে আনার প্রয়াস যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন নিম্ন শেণীর
লোক ও মুসলমানদের মধ্যে অনেক আক্রমণ পাল্টা আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ১৯৪১
সালের প্রথম দিকে 'রাজশাহীতে একটা মসজিদের সামনে গানবাদ্যসহ একটা সরস্বতী পূজা
মিছিল অতিক্রম করার সময় স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা দেখা দেয়'। সরস্বতী পূজা হল
বিদ্যা দেবীর উপাসনা,
প্রত্যেক বসন্তকালে অধিকাংশ ভদ্রলোক বাঙালি গৃহে
এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এবার 'প্রায় দু'হাজার সাঁওতাল তীর-ধনুক বা লাঠি নিয়ে মিছিলে যোগ দেওয়ায়
বাড়তি উত্তেজনা দেখা দেয়'। পূজায় সাঁওতালদের
এভাবে অংশগ্রহণে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, হিন্দু ধর্মের
প্রতি ভঙ্গুরভাবে আনুগত্যশীল এই লোকদের ওপর ভদ্রলোক হিন্দুরা তাদের ইচ্ছানুযায়ী 'সংস্কৃতি' চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছে এবং
পুজায় সাঁওতালদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ ধরনের অশুভ একটি
প্রবণতা সম্পর্কে একজন স্থানীয় কর্মকর্তা বলেন যে, 'হিন্দুরা
সাম্প্রদায়িক বিবাদে সাঁওতালদের ব্যবহার করছে। দুই মাস পর বার্নপুরের কাছে নরসিংহবাদে একটা বড় ধরনের
সংঘর্ষ অতি অল্পের জন্য এড়ানো যায়। গোয়ালা শ্রেণীর সদস্যরা আসানসোল থেকে বার্নপুর
গো-মাংসের বাজারে গো-মাংস বহন করে নিয়ে যাওয়ায় মুসলমানদের বাধা দিতে শুরু করে, অথচ তারা 'কোনরকম আপত্তি ছাড়াই এটি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিল'। একই পক্ষকালের
মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলার সুমি থানা এলাকায় অহিরন নামক স্থানে গোয়ালারা অন্য একটা
ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। 'বিভিন্ন ঘটনার কারণে ঐ এলাকায় হিন্দু গোয়ালা ও মুসলমান
প্রজাদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। উত্তর বাঙলায় 'অচ্ছুৎ' লোকদের 'শুদ্ধি' করার কাজ অব্যাহত থাকে এখানে 'চা বাগানের কুলিদের কড়া মদ পান ও গো-মাংস খাওয়া থেকে বিরত
রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়'। পূর্ব বাঙলার
টিপেরা জেলার তফশিলি সম্প্রদায়ের কয়েকটি গ্রুপের লোক বিদ্যমান পরিস্থিতির সুযোগ
নিয়ে তাদের পূর্ব-প্রদত্ত মর্যাদার চেয়ে একটু উচ্চতর ধর্মীয় মর্যাদা দাবি করে।
স্থানীয় পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট লক্ষ করেন যে, 'ভোলাহাট, নাসিরগড় ও সরাইলের তফশিলি সম্প্রদায়ের হিন্দুরা
সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আবরণে উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুদেরকে তাদের কাছ থেকে খাদ্য
গ্রহণের এবং তাদেরকে অস্পৃশ্য হিসেবে গণ্য না করার অনুরোধ করছে। আদমশুমারিকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতামূলক ধর্মান্তরকরণ শেষ
হওয়ার পরও চল্লিশ দশকের মধ্য ভাগ পর্যন্ত এ অবস্থা বিরাজ করতে থাকে। ১৯৪৫ সালের
জানুয়ারি মাসে 'দিনাজপুর জেলার লালবাগ এলাকায় নামাজের সময় স্থানীয় মসজিদের
পাশ দিয়ে সাঁওতালদের নেতৃত্বে কালী পূজা উপলক্ষে মিছিল অতিক্রম করাকে কেন্দ্র করে' মুসলমান ও সাঁওতালদের মধ্যে একটা গোলমালের আশংকা দেখা দেয়; ঐ একই বছর যশোরের লোহাগড়া থানা এলাকায় মিঠাপুর বাজারে
নমঃশূদ্র ও মুসলমানেরা পরস্পরের বিরুদ্ধে মারাত্মক সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়। এভাবে যশোরে মুসলমান ও নমঃশূদ্র মধ্যে সার্থক লড়াই যেমন লক্ষ্য
করা গেছে তেমনি বর্ধমানেও সাম্প্রদায়িক সংঘাতে তফসিলি সম্প্রদায়ের লোক নিহত
হয়েছে। আবার ঢাকার দাঙ্গার জের ধরে খুলনায় নমঃশূদ্র ও মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষ
হয়েছে । ঢাকা শহরে হিন্দু দাঙ্গাকারীদের মধ্যেমধ্যে গোয়ালারা ছিল উল্লেখযোগ্য
সংখ্যায়। মেদিনীপুরে দেশভাগের সময়কার দাঙ্গায় সাঁওতালদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। চল্লিশ দশকের মধ্য ভাগ থেকে হিন্দু ধর্মযোদ্ধাদের অগ্রবর্তী
দল হিসেবে নিম্ন শ্রেণীর লোক এবং উপজাতীয়দের মোতায়েন করা হয়। শুদ্ধি অভিযান ও
সংগঠন নিম্ন শ্রেণীর'
লোক ও উপজাতীয়দের ওপর বিশেষ কার্যকর প্রভাব
বিস্তার করে বলে প্রতীয়মান হয়। পূর্বাঞ্চলের নমঃশূদ্র ও উত্তরাঞ্চলের রাজবংশী ও
সাঁওতালেরা নিজ উদ্যোগেই গত কয়েক দশক ধরে উচ্চতর ধর্মীয় মর্যাদার দাবি জানিয়ে
আসছিল। ভোটার হওয়া প্রধানত সমৃদ্ধ নমঃশূদ্র ও রাজবংশীরা বৃহত্তর 'হিন্দু সম্প্রদায়ে'র সাথে নিজেদের
পরিচিত করার আগ্রহ আবার নতুনভাবে প্রকাশ করে। ১৯৪৬ সালের আইন সভার নির্বাচনে
ভদ্রলোক রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিও তারা তাদের একাত্মতার কথা ব্যক্ত করে। এ
নির্বাচনে তফশিলি সম্প্রদায়ের ত্রিশটি আসনের মধ্যে তিনটি ছাড়া সব ক'টি আসনেই কংগ্রেস জয়লাভ করে-১৯৩৬ সালের নির্বাচনের তুলনায়
এটা একটা বিরাট সাফল্য। প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, এবার আসা যাক এর পরিণতি কি হয়েছিল;সে প্রসঙ্গে! সম্প্রদায়গত
রোয়েদাদ ঘোষণার পর স্থানীয় বিষয়ে ভদ্রলোক স্বার্থের গুরুত্ব নতুনভাবে দেখা দেয় এবং
স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুরু হয় বেশি করে। ১৯৩৫
সালের আইনের সম্পদ্রায়গত বিধানগুলো জেলা ও স্থানীয়
প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রযোজ্য ছিল না। স্থানীয় ও জেলা বোর্ড, স্কুল বোর্ড ও কমিটির মতো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন
কোনো আসন সংরক্ষণ ছাড়াই যৌথ নির্বাচনের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ও
মিউনিসিপ্যাল কমিটিতে সরকার মনোনীত ব্যক্তিদের জন্য গুটিকয়েক আসন পৃথক করে রাখা
হয়। স্থানীয় রাজনীতিতে মাঠ পর্যায়ে সামাজিক সম্পর্কের নির্ভুল প্রতিফলন ঘটে এবং এই
সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংঘটিত বিভিন্ন পরিবর্তনে সেটি বেশি বেশি স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।
স্থানীয় নির্বাচনের ভোটাররা ছিল প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার সম্ভবত। শতকরা ১৫ ভাগ।
এদের সম্প্রদায়গত ভোটার হিসেবে পরিচিতি ছিল না, তাদের পরিচিতি
*ছিল সম্পদ ও শিক্ষার মাপকাঠিতে। যারা কমপক্ষে এক টাকা সেস বা চৌকিদারি ট্যাক্স
দিত এবং যাদের গ্রাজুয়েট বা সমমানের ডিগ্রি ছিল তাদের ভোটাধিকার ছিল। তারা ছিল।
জেলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও উচ্চ শিক্ষিত লোকদের প্রতিনিধি। সম্প্রদায়গত রোয়েদাদের
কবিধানে প্রাদেশিক রাজনীতিতে ভদ্রলোক হিন্দুদের কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ চলে
গেলেও স্থানীয় ও জেলা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে অসুবিধা ছিল না।
কিন্তু এখানেও উদীয়মান মুসলিম গ্রুপগুলো ভদ্রলোক কর্তৃত্বকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ
করতে থাকে। পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে হিন্দুরা সংখ্যায় বেশি থাকা সত্ত্বেও স্থানীয়
স্বায়ত্তশাসিত সরকারি প্রতিষ্ঠানে মুসলিম প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মফস্বলের সামাজিক কাঠামোয় পরিবর্তন হওয়ায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলমানদের এই
প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এই প্রভাব বৃদ্ধির কারণ হল এক শ্রেণীর মুসলমান কৃষকের সম্পদ
বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র হলেও সরব মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উন্মেষ। ভালো অবস্থায় থাকা
মুসলমান প্রজারা ভূমির ওপর তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে, আর খাজনা আদায়কারী হিন্দুদের অবস্থান শিথিল হয়ে পড়ে
প্রদেশের সর্বত্র স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলমান সদস্যদের সংখ্যা ও অনুপাত
বৃদ্ধি পায়। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোতে সংখ্যানুপাতে যে পরিমাণ প্রতিনিধিত্ব
তাদের পাওয়ার কথা, প্রায় ক্ষেত্রেই তারা তার চেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্ব অর্জন
করে। আর প্রতিষ্ঠিত হিন্দু ভদ্রলোকদের পরাজিত করেই তারা ঐ অতিরিক্ত ক্ষমতা লাভ
করে। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন কার্যকর হবার পর এই প্রবণতা আরও
বৃদ্ধি পায়। এ সময় ফজলুল হক সরকার স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশি ক্ষমতা দেওয়ার
পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৩৫ সালের বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ডেটরস্ এ্যাক্ট চালু করে
সরকার বিভিন্ন স্থানে তিন হাজারের বেশি ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করে বিদ্যমান স্থানীয়
প্রতিষ্ঠানগুলো এসর্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করে। ঋণ কম হলে এবং ঋণ পরিশোধে অস্বীকৃতি
জানানো হলে ঋণদাতাদের হয়ে এসব বোর্ডের ব্যবস্থা নেবার যথেষ্ট ক্ষমতা ছিল ঋণদাতারা
ইউনিয়ন ও স্থানীয় বোর্ডের মাধ্যমে একত্রিত হয়ে ঋণগ্রহীতাদের পাকড়াও করে তাদের
অনুকূলে সমস্যার নিষ্পত্তি করতে পারত। ইউনিয়ন ও ঋণ
সালিশি বোর্ডগুলি জমিদার ও সুদ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের খাতকদের বিশেষ করে
জোতদারদের সাথে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বোর্ড জোতদারদের হাতে পড়লে জমিদার ও সুদ
ব্যবসায়ীরা জানত যে,
সালিশিতে বিলম্ব হবে এবং নানা ধরনের
বাধা-বিপত্তি আসবে। এর ফলে 'ঋণ পরিশোধ না করার' মনোভাব বৃদ্ধি পাবে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে, বিশেষ করে রাজশাহীতে এটা খুব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। এসব
এলাকায় জোতদারেরা ছিল খুবই শক্তিশালী, 'আর ইউনিয়ন বোর্ড
ও ঋণ সালিশি বোর্ডের অধিকাংশ সদস্যই ছিল জোতদার শ্রেণীর'। এসব জেলায় বেল
লক্ষ করেন যে, 'বোর্ডগুলোর সদস্যদের পক্ষপাতিত্ব ছিল জমিদারদের বিরুদ্ধে...
নিষ্পত্তিতে তাদেরকে বিলম্বের শিকারে পরিণত করে, ঋণ পরিশোধের
অসমর্থতাকে বড় করে দেখিয়ে এবং যারা ঋণ পরিশোধে সমর্থ তাদেরকে বোর্ডের আশ্রয় নিতে
উৎসাহিত করা হচ্ছে... এসবের ফলে ঋণ আদায়ের পরিমাণ মারাত্মকভাবে কম হচ্ছে। বোর্ডের সিদ্ধান্ত বিপক্ষে গেলে এমনকি সম্পদশালী এবং
প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও বোর্ডের কাছে প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম।
বালুরঘাট কমিশনারের সাথে সাক্ষাৎ করে 'একজন বিখ্যাত
কংগ্রেস নেতা দুঃখের সাথে মন্তব্য করেন যে, কমিউনিস্ট
প্রচারণা নিয়ে চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ সরকার তাদের
বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ডেটরস্ এ্যাক্টের প্রশাসন নিয়ে নিজেই কমিউনিজম নিয়ে এসেছে'। ঐনেতা 'তাঁর সারা জীবনের সঞ্চয় বালুরঘাট ব্যাংকে জমা রাখেন এবং
সম্ভবত তা লোকসান হয়'। যেখানে বড় অঙ্কের
টাকার বিষয় ছিল সেখানে খাতক ও ঋণদাতার এবং তাদের প্রতিনিধিত্বকারী দলের প্রধান
বিষয় হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে দখল করা। এখন এমনকি ছোটখাট স্থানীয়
প্রতিষ্ঠান কাদের নিয়ে গঠিত হবে তা নিয়েও প্রাদেশিক নেতা ও দল সক্রিয়ভাবে আগ্রহ
দেখাতে শুরু করে। চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার কিছুটা বিরক্তির সাথে মন্তব্য করেন যে, 'ফেনীতে স্থানীয় সদস্যগণ (আইন সভার) দাবি করেন যে, ইউনিয়ন বোর্ডের সব মনোনয়ন তাদের নিজের অনুসারীদের পেতে
হবে... তাঁরা বোর্ডের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছেন, অথচ সে-ব্যাপারে তাদের স্থানীয় বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই।' প্রভাবশালী অনেক ভদ্রলোক হিন্দু ইউনিয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে
কংগ্রেস প্রচারণাকে সমর্থন করে এবং পূর্বে এরাই জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে
ইউনিয়ন বোর্ড রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান করছিল। তারা এখন স্থানীয় নির্বাচনে গভীর
আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। কোনরকম উচ্চবাচ্য না করে বেঙ্গল কংগ্রেস ইউনিয়ন বোর্ড
বিরোধী বিক্ষোভ বন্ধ করে দেয়। জেলা কংগ্রেস কমিটিগুলো স্থানীয় ও পৌরসভার বিষয়-আশয়
নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতে শুরু করে। ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাস নাগাদ কংগ্রেস
স্থানীয় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করে।
হুগলীতে দেখা যায় কংগ্রেস পার্টি খুবই সক্রিয় ... বিশেষ করে জেলার শ্রীরামপুর
মিউনিসিপ্যালিটির আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ' আর ঢাকায় ঐ মাসে
অনুষ্ঠেয় মিউনিসিপ্যালিটি নির্বাচনে আসন দখলে স্থানীয় কংগ্রেস কর্মীরা জোর
প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ৭ এমনকি সামান্য ইউনিয়ন বোর্ডের মতো নির্বাচনকেও দল খুবই
গুরুত্ব দিচ্ছে: 'হাওড়ায় কংগ্রেস ... প্রার্থীদের হয়ে নির্বাচন পরিচালনার
জন্য দুটো নির্বাচনী কমিটি গঠন করেছে ... একটি উলুবেডিয়া ও অপরটি সদর মহকুমার
ইউনিয়ন বোর্ড নির্বাচনের জন্য। '৭১ রাজশাহীতে দল একাধিক স্থানীয় ও ইউনিয়ন বোর্ড
নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। ইউনিয়ন বোর্ডের
বিরুদ্ধে বিক্ষোভের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মেদিনীপুরেও কংগ্রেস এখন উৎসাহের সাথে
নির্বাচনী প্রচারণায় যোগ দিয়েছে। ১৯৩৭ সালের মে মাসে নারাজোলের রাজা 'মেদিনীপুর স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নির্বাচনী সাব-কমিটি' গঠনের জন্য জেলা কংগ্রেস কমিটির নেতৃত্ব দেন এই সব কমিটির
উদ্দেশ্য হচ্ছে 'নতুন গঠিত ইউনিয়ন বোর্ডের প্রার্থীদের হয়ে নির্বাচন
পরিচালনা করা এবং ইতিমধ্যে গঠিত ইউনিয়ন বোর্ডকে নিয়ন্ত্রণ করা'। জেলা
ম্যাজিস্ট্রেটের মতে,
'এর কারণ সম্ভবত এই যে, কংগ্রেস এখন উপলব্ধি করেছে যে ইউনিয়ন বোর্ড দখল করা হচ্ছে
গ্রামীণ রাজনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার দখল করা। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায়
দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চাপা উত্তেজনাও তীব্র আকার ধারণ করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা
যায়, মুসলমান প্রভাবিত এলাকায় পুরানো ক্ষমতাধরেরা স্থানীয়
প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে হিন্দুদের এই নতুন আগ্রহে খুবই ক্ষুব্ধ হয়। ১৯৩৭ সালের
ডিসেম্বর মাসে টিপেরায় 'ইউনিয়ন বোর্ডের নির্বাচনে ভোট প্রদান' 'সাম্প্রদায়িক বিচার-বিবেচনায় পরিচালিত হয়। নোয়াখালী থেকে
আগত মৌলভীরা চাঁদপুরে বিভিন্ন মসজিদ ও অন্যান্য স্থানে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ভোট
দেওয়ার কথা প্রচার করে'। ১৯৩৭ সালের জুন
মাসে ময়মনসিংহের বেতাগিরিতে স্থানীয় হিন্দুরা ইউনিয়ন বোর্ডে প্রবেশ করার উদ্যোগ
নিলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মতে: অতীতে এ গ্রামের হিন্দুরা কংগ্রেসী বন্ধুদের পরামর্শে
ইউনিয়ন বোর্ডের ব্যাপারে প্রায় কোনো আগ্রহ দেখাত না। কিন্তু এর গুরুত্ব উপলব্ধি
করার পর তারা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার উদ্যোগ নেয় এবং দুটো
আসনে জয়ী হয়... হিন্দুরা যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় সে-ব্যাপারে মুসলমানেরা
অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। কোনো হিন্দুকে কোনো মুসলমান সমর্থন দিলে তার সাথে
সম্পর্ক না রাখার হুমকি দেওয়া হয়। মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে একটা সংঘর্ষের ঘটনা
ঘটে কারণ তাদের মধ্যে একজন এক হিন্দুকে সমর্থন করে। হিন্দু ভদ্রলোক প্রভাবিত এলাকায় প্রায় সময় গোলমাল দেখা দিত।
এসব এলাকায় ক্রমবর্ধমান মুসলমান প্রভাব প্রতিহত করতে হিন্দু দলগুলো ব্যর্থ হয়।
দৃষ্টান্ত হিসেবে হাওড়ার কথা বলা যায়। এখানে দুটো নির্বাচনী কমিটি গঠন করা
সত্ত্বেও ১৯৩৭ সালে কংগ্রেসের স্থানীয় প্রতিষ্ঠান দখলের প্রয়াস 'ব্যর্থ হয়'। অপর পক্ষে
উলুবেড়িয়ায় মুসলমানদের আসনের অংশ এক বছরের মধ্যে শতকরা ১৬.৬ ভাগ থেকে ২৫ ভাগে
বৃদ্ধি পায়।" মেদিনীপুর ইউনিয়ন বোর্ড নির্বাচনে ৯৮টি ইউনিয়ন বোর্ডের মধ্যে
মাত্র ৩৭টিতে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এ ধারা আরও জোরদার হয় ৩০ দশকের শেষ
ও চল্লিশ দশকের প্রথম দিকে এ সময় হক সরকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে স্থানীয়
প্রতিষ্ঠানগুলোর মনোনীত আসনের ওপর (মোট সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ) নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
এ ব্যবস্থায় সরকারের সমর্থনে মুসলমানদের আসন সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বেড়ে যায়। বিষয়টি
স্থানীয় হিন্দু ভদ্রলোকদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দৃষ্টান্ত
হিসেবে উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী জেলার কথা উল্লেখ করা যায়। এ জেলায় মুসলমানদের সংখ্যা
মোট জনসংখ্যার চার ভাগের মধ্যে তিন ভাগের বেশি। কিন্তু প্রদেশের অন্যান্য অনেক
এলাকার মতো এখানে হিন্দু প্রভাব ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি। চল্লিশ দশকের প্রথম দিকে কংগ্রেস ও মহাসভার সম্মিলিত
প্রয়াসও স্থানীয় সংস্থাগুলোকে হিন্দু নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল না, কারণ এ সময়ে সরকার মুসলমান সদস্যদের মনোনয়ন দিয়ে এসব
সংস্থায় হস্তক্ষেপ করছিল। সরকারি মনোনয়নে মুসলমানদের
অনুকূলে ক্ষমতার পাল্লা ভারি করা সম্ভব এবং বাস্তবে প্রায়শই তা-ই ঘটছিল। নবাবগঞ্জ
থানার বুরা (Burrah)
ইউনিয়ন বোর্ডের জন্য 'একজন অত্যন্ত যোগ্য হিন্দু ব্যক্তির পক্ষে' সদস্য পদের দাবি উত্থাপন করা হয় 'যিনি স্থানীয় এলাকায় হিন্দু স্বার্থের একজন দৃঢ় সমর্থক'। এ ব্যাপারে
স্থানীয় এক মহাসভা কর্মী সতর্ক করে দেন যে, 'কোনভাবে সরকার
যদি এই মনোনয়নের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে তাহলে একজন মুসলমান নিশ্চিতভাবে প্রেসিডেন্ট
নির্বাচিত হয়ে যাবে। নবাবগঞ্জ থানার অধীন অধিকাংশ ইউনিয়ন বোর্ডে প্রেসিডেন্ট হল
মুসলমান।" এটা এমন এক জেলার ঘটনা যেখানে হিন্দুরা হল সংখ্যাগরিষ্ঠ। মহাসভা
হতাশা প্রকাশ করে যখন তারা দেখে- লীগ সরকারের কাছ
থেকে ন্যায়বিচারের আশা কমই করে। এই সরকার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাতেও
মিউনিসিপ্যালিটির আসন দখল করতে ইচ্ছুক বলে মনে হয়, এবং ডিস্ট্রিক্ট
ও ইউনিয়ন বোর্ডে এই কাজ তারা আগেই করেছে। মিউনিসিপ্যালিটিতে নির্বাচিত মুসলমান
কমিশনারদের চেয়ে নির্বাচিত হিন্দু কমিশনারদের সংখ্যা বেশি হলেও লীগ সরকার
সম্প্রদায়গত ভিত্তিতে মনোনয়ন দিয়ে যে কোনো সময় মুসলমানদের অনুকূলে পাল্লা ভারি
করতে পারে। বেশ কিছু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় হিন্দুদের স্থানীয়
প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে,
বলতে গেলে, এক প্রকার
বিতাড়িত করা হয়। ভদ্রলোক প্রভাবিত এলাকা বাকেরগঞ্জ জেলার একজন মহাসভা সদস্য অভিযোগ
করেন যে, 'মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে প্রায় কোনো হিন্দু নির্বাচিত
হতে পারে না। কারণ, মুসলমানেরা ভোট দেয় সম্প্রদায় ভিত্তিতে', আর লীগ সরকারের মনোনয়ন পদ্ধতি হল 'দুর্নীতি ও অসৎ স্বার্থসিদ্ধির জন্য উর্বর জায়গা'।৮২ এক মাস পর ঐ একই ব্যক্তি
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে অবহিত করে যে, 'বরিশালে শহর
প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে চেয়ারম্যানের পদটি হিন্দুদের দখলে ছিল, এবার তা হিন্দুদের হাত থেকে চলে যাচ্ছে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠান তথা ইউনিয়ন, স্থানীয় ও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড এবং পৌরসভার পরিবর্তনশীল গঠন
কাঠামোতে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ
করা যায়। আগে যেসব গ্রুপ ক্ষমতায় ছিল তারা এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ
হারিয়ে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় এবং সাধারণত ভদ্রলোকেরাই ক্ষমতা হারায়। প্রায় ক্ষেত্রেই
এর ফল দাঁড়ায় সাম্প্রদায়িক বিরোধ, এবং অনেক সময় তা সংঘর্ষে পরিণত হয়। দৃষ্টান্ত
হিসেবে মালদার কথা বলা যায়। এখানে ১৯৪১ সালে অনুষ্ঠিত জেলা বোর্ডের নির্বাচন
ঘুষাঘুষির কারণে স্থগিত হয়ে যায় একটা গ্রুপ প্রিজাইডিং অফিসারের বিরুদ্ধে 'সম্প্রদায় প্রীতি'র অভিযোগ উত্থাপন
করে এবং 'পোলিং সেন্টারে আক্রমণ চালিয়ে ভোটের বাক্স ভেঙে ফেলে'। ঐ একই নির্বাচনে
সমগ্র রাজশাহী ডিভিশনের বিভিন্ন পোলিং সেন্টারে 'গুণ্ডামি' করা হয়। ঐ মাসে রংপুর জেলায় অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন বোর্ড
নির্বাচনে এলাকায় 'সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে'।" রংপুর হল একটা
মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা এবং এখানে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলমান আসনের
সংখ্যা এ সময়ে ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। এটা হল এক বিশেষ ধরনের প্রবণতা যা বাঙলার
বিভিন্ন এলাকার সাম্প্রদায়িক তিক্ততা বৃদ্ধিতে ইন্ধন যোগায়। স্কুল বোর্ডগুলোতেও
একই ধারা পরিলক্ষিত হয় অতীতে এসব বোর্ডে ভদ্রলোকদের প্রভাব ছিল সংরক্ষিত। শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো ভদ্রলোক হিন্দুদের জন্য সত্যি অসহনীয় ছিল, কারণ তারা নিজেদেরকে বাঙলার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক
ঐতিহ্যের অভিভাবক হিসেবে গণ্য করত। বর্ধমান, ২৪ পরগনা এবং
মেদিনীপুর ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা এবং ভদ্রলোক রাজনীতির প্রধান ঘাঁটি।এ
তিনটি জেলায় একই ধরনের ঘটনায়(গরু কুরবানি করা এবং তাকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের
সহিংস প্রতিক্রিয়া,
মসজিদের সামনে বাজনা সহকারে প্রতিমা শোভাযাত্রা
প্রভৃতি-এগুলোকে কেন্দ্র করে হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক
উত্তেজনা বৃদ্ধি ) স্পষ্ট হয়ে যায় যে, স্থানীয়
রাজনীতিতে ভদ্রলোক হিন্দুদের অংশগ্রহণ যখন ক্রমাগত অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করতে থাকে
তখন স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার ভারসাম্যের সামান্য পরিবর্তন যতটা গুরুত্বপূর্ণ হবার
কথা তার থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর
হিন্দু ভদ্রলোকেরা আশা করেছিল যে, প্রাদেশিক পর্যায়ে তারা যে ক্ষমতা হারিয়েছে সেটা
তারা স্থানীয় পর্যায়ে অধিকতর ভূমিকা রেখে পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু তা অসম্ভব বলে
প্রমাণিত হয়। এর পরিবর্তে তারা দেখতে পায়, সব ক্ষেত্রেই
তারা মুসলমানদের কাছে হেরে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, উৎসব পালনের
ক্ষেত্রে মুসলমানদের নতুন দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠার প্রয়াস ছিল বিশেষভাবে
প্ররোচনামূলক। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, কুরবানি প্রতিরোধ
করতে ভদ্রলোকদের প্রবল প্রতিরোধকে ধর্মের প্রতি সাংঘাতিক অবমাননা রোধের প্রচেষ্টা
হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না, কারণ বর্ধমান শহরে কুরবানি ছিল একটি প্রচলিত
রীতি। গো-রক্ষা আন্দোলনে আর্য সমাজবাদীরা বাঙলায় কখনও জনগণকে
তেমনভাবে সংগঠিত করতে পারেনি। বলা যায়, ভদ্রলোকদের ঐ
প্রতিরোধ বরং তাদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অক্ষমতাকেই তুলে ধরে। সংখ্যালঘিষ্ঠ
মুসলমান সম্প্রদায় যখন প্রথমবারের মতো কুরবানি দিতে শুরু করে তখন এটা তাদের
ক্রমবর্ধমান মর্যাদা ও ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। হিন্দুদের
দৃষ্টিতে, ঐতিহ্যগতভাবে হিন্দু প্রভাবিত এলাকায় গরু কুরবানি, প্রতীকী হলেও, একটা শক্তিশালী
চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। তাই তারা এটার প্রতিরোধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। ফজলুল
হক ও নাজিমুদ্দিন সরকারের আমলে কোলকাতার 'মুসলিম' সরকারের হস্তক্ষেপ থেকে ভদ্রলোকদের স্থানীয় দুর্গকে রক্ষা
করা ক্রমাগতভাবে কষ্টকর হয়ে পড়ে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে প্রদেশে 'মুসলিম স্বেচ্ছাচার'কে গ্রহণের
অস্বীকৃতির সংকল্প আরও দৃঢ় হয়। সুতরাং এটা বিস্ময়কর নয় যে, ১৯৪৭ সালে এই তিন জেলা থেকেই প্রবলভাবে একটা পৃথক 'হিন্দু আবাসভূমি' সৃষ্টির আন্দোলন
শুরু হয়।
সম্ভাব্য প্রশ্ন: ১৯৪০ এর দশকে
পূর্ববঙ্গের মুসলিম কৃষকরা কেন দলে দলে পাকিস্তান আন্দোলনে সামিল হয়েছিল?
অথবা
তাজ হাশমি কেন
ও কিভাবে পূর্ব বঙ্গে পাকিস্তান আন্দোলন জনপ্রিয় হয়েছিল বলে ব্যাখ্যা করেছেন?
আপনি কি তাঁর সঙ্গে একমত?
ক্লাস লেকচার
১৯৪০-এর দশকে গ্রামীণ পূর্ব বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার
উত্থান সম্পর্কে বোঝার জন্য কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা সিপিআই এর
কার্যকলাপের ব্যর্থ থেকে গুরুত্ব সহকারে বুঝতে হবে। কারণ সিপিআই গণ মানুষের সাম্প্রদায়িকতাকে বুঝতে সক্ষম ছিল না। ঐ সময়ে
সাম্প্রদায়িকতা কমিউনিস্ট এবং অ-সাম্প্রদায়িক কৃষক আন্দোলনের জন্য সম্ভাব্য
প্রকৃত হুমকি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল। ত্রিপুরা-নোয়াখালী উপ-অঞ্চল, যা উগ্র কৃষক
সমিতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি ছিল, ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ব বাংলার কিছু অঞ্চল (বিশেষভাবে নোয়াখালী ও তৎসংলগ্ন এলাকা) তিক্ত
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার স্থল ছিল। এই দাঙ্গাগুলি ইঙ্গিত দেয় যে কমিউনিস্ট মতাদর্শ
কেবল কৃষক সমাজের উপরি আবরণ স্পর্শ করেছিল, গভীরে প্রবেশ
করতে পারেনি। শ্রেণীভিত্তিক আন্দোলন বাংলার মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশের
(প্রধানত উপজাতি) মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায়, বাকি কৃষকরা ছোট ছোট ঘটনা এবং সাধারণ উস্কানির
মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক অনুভূতিতে সাড়া দেওয়ার ঝুঁকিতে ছিল।
১৯৪৬ সালের আইনসভা নির্বাচনের পর কেপিপি(কৃষক প্রজা পার্টি) রাজনৈতিক শক্তি
হিসেবে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়। রেসিপি ১৯৪০ এর দশকের গোড়ার দিকে
জিন্নাহর মুসলিম লীগ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাছাড়া ৪৬ এর নির্বাচনের
প্রাক্কালে কেপিপি কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলে মুসলিমদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা
হারিয়ে ফেলে। কেপিপির “কংগ্রেসপন্থী" পদক্ষেপগুলি মুসলিমদের মধ্যে বিপরীত
প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় । এমনকি দুর্ভিক্ষের
সময় খাদ্য পরিস্থিতির কেপিপির রাজনীতি জনগণের মধ্যে মুসলিম লীগের ব্যাপারে
নেতিবাচক ধারণা তৈরিতে ব্যর্থ হয়। ফলস্বরূপ, কেপিপি ১৯৪৬
সালের নির্বাচনে মাত্র তিনটি আসন দখল করতে সক্ষম হয়, যার মধ্যে
বাকরগঞ্জে দুটি আসন ফজলুল হক জিতেছিলেন। কংগ্রেসপন্থী "জাতীয়তাবাদী"
("অসাম্প্রদায়িক") মুসলিমরা, নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হন। বেশিরভাগ
মুসলিম প্রার্থী, এমনকি ঢাকার নবাব হাবিবুল্লাহ, যিনি কংগ্রেসের
টিকিটে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তারাও মুসলিম
লীগ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যর্থ হন । এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, পূর্বে
প্রভাবশালী কৃষক প্রজা পার্টি (কেপিপি) নেতারা, বগুড়ার
রাজিবউদ্দিন তরফদার, রংপুরের কাজী ইমদাদুল হক, যশোরের সৈয়দ
নওশের আলী, বগুড়ার ডক্টর মফিজউদ্দিন, খুলনার
জালালউদ্দিন হাশেমী, রংপুরের আবু হোসেন সরকার এবং ঢাকার আব্দুল লতিফ বিশ্বাস,
যারা কংগ্রেস বা কংগ্রেস-সমর্থিত জমিয়ত-উল-উলামা-ই-হিন্দ প্রার্থী হিসেবে
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তারা পরাজিত হয়েছিলেন । বেশিরভাগ নির্বাচনী
এলাকায় "জাতীয়তাবাদী" মুসলিম প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী জামানত
বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ ময়মনসিংহ পূর্ব (গ্রামীণ) এর পরিস্থিতি
তুলে ধরে যেখানে লীগের নুরুল আমিন ২৬,৭১৯ ভোট পেয়েছেন, কেপিপির আব্দুল
ওয়াহিদ বোকাইনগরী মাত্র ২১৯ ভোট পেয়েছেন, বাকরগঞ্জ
পশ্চিম (গ্রামীণ) এর লীগের মাওলানা কাসিম ১৩,১৯৮ ভোট
পেয়েছেন, বিখ্যাত কেপিপি নেতা হাশেম আলী খান মাত্র ২০৫ ভোট পেয়েছেন।
খুলনা সদরে জাতীয়তাবাদী মুসলিম প্রার্থী আহমেদ আলী ১,৬৪২ ভোট
পেয়েছিলেন যেখানে লীগের আবদুস সবুর খান ২১,৮৯৫ ভোট
পেয়েছিলেন। অন্যদিকে কেপিপির তৈয়বউদ্দিন আহমেদ মাত্র ৩৪২ ভোট পেয়েছিলেন যেখানে
লীগের স্থানীয় জমিদার খুররম খান পন্নী ১৬,৮২৬ ভোট পেয়েছিলেন। মুসলিম লীগ মুসলিমদের জন্য
সংরক্ষিত ১২১ আসনের মধ্যে মোট ১১৩টি আসন দখল করে ।(১১১টি গ্রামীণ আসনের মধ্যে
১০৩টি আসন সহ)। সমগ্র বাংলায় মুসলিম ভোটের সংখ্যা ছিল ২৪৩,৪,১০০ এর মধ্যে
২০৩,৬৭৭৫ টি ভোট পায় মুসলিম লীগ যা মোট মুসলিম ভোটের প্রায় ৮০ শতাংশ । মনে হয়,
তারা মুসলিম ও কৃষক স্বার্থ রক্ষার জন্য মুসলিম লীগের কর্মসূচির পক্ষে ভোট
দিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে, মাওলানা আবদুল্লাহ আল-বাকী, আবুল মনসুর
আহমেদ, নবাবজাদা হাসান আলী খান এবং শামসুদ্দিন আহমেদের মতো বিশিষ্ট কেপিপি নেতারা
মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন। কেপিপির তরুণ, জঙ্গি এবং
বুদ্ধিজীবী সদস্যদের সবচেয়ে কার্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিভাগ-পন্থী পূর্ব
পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটিতে যোগদান করেছিল। যা বাংলার মুসলমানদের মধ্যে পাকিস্তান
মতবাদ প্রচারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম ছিল। ১৯৪৬ সালের গোড়ার দিকে
গুরুত্বপূর্ণ কেপিপি সদস্যদের ব্যাপকভাবে লীগে যোগদানের ফলে কেপিপি কার্যত বিলুপ্ত
হয়ে যায়। মুসলিম লীগ চরম ডানপন্থী এবং "প্রগতিশীল কেপিপি" উভয়ের জন্য
যথেষ্ট জায়গা করে দেয়। ১৯৪৪ সালের মধ্যে মুসলিম লীগ "সকলের জন্য
সবকিছু" বলে বিবেচিত হত। জিন্নাহর শোষণ ও ধর্মতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল
ঘোষণার কারণে, সেই সময়কালে অনেক "উগ্রপন্থী" মুসলিম লীগে
যোগদান করে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে মুসলিম লীগের মঞ্চ থেকে
"কৃষকের হাতে জমি"; "শ্রমিকরাই শিল্পের মালিক"; "কায়েমী
স্বার্থবাদী গোষ্ঠীগুলিকে চূর্ণ করো" এবং "পাকিস্তান শ্রমিক ও কৃষকদের
পক্ষে" - এই ধরণের উগ্র স্লোগান উচ্চারিত হয়। জিন্নাহর ডান হাত লিয়াকত আলী
খানের সভাপতিত্বে ১২ জানুয়ারী ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত বেঙ্গল মুসলিম লীগের গফরগাঁও
সম্মেলনের পর জমিদারদের কোনও ক্ষতিপূরণ না দিয়ে জমিদারি ব্যবস্থার বিলুপ্তি দলের
একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠে। মুসলিম লীগের
নির্ধারিত মূল্য এবং খাদ্যের উন্নত বন্টনের পক্ষে ওকালতি এবং ১৯৪৩-৪৪ সালের
দুর্ভিক্ষের আসল কারণ হিসেবে হিন্দু জমিদার, মহাজন এবং
বণিকদের সফলভাবে চিত্রিত করার ফলে ভারসাম্য তাদের পক্ষে ঝুঁকে পড়ে। মুসলিম লীগ
নেতারা স্বল্পস্থায়ী হক-মুখার্জী জোট মন্ত্রিসভাকেও দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী
করেছিলেন। দুর্ভিক্ষের পর অনেক মুসলিম নেতা সমগ্র অঞ্চলে কিছু মুসলিম নেতার
বিরোধিতার খবর প্রচার করায় এটি সহজ হয়ে ওঠে।পাকিস্তান দাবি করা মুসলিমদের
"পাঠ শেখানোর জন্য" পূর্ব বাংলায় খাদ্যশস্য পাঠানোর জন্য হিন্দু
নেতারা। নির্বাচনগুলি মুসলিম লীগের সমর্থকদের বাংলা এবং উপমহাদেশের অন্যান্য
স্থানে হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে কাল্পনিক গল্প
ছড়িয়ে দেওয়ার আরও সুযোগ করে দেয়। মুসলিম লীগপন্থী জমিয়ত-উল-উলামা-ই -ইসলাম
নির্বাচনের সময় গ্রামীণ মুসলমানদের মধ্যে মুসলিম লীগকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্পষ্টতই সাম্প্রদায়িক আবেদনের কারণে, মুসলিম লীগ
সিপিআই, কংগ্রেস এবং গ্রামাঞ্চলের অন্যান্য গোষ্ঠীর থেকে এগিয়ে ছিল । সংক্ষেপে, মুসলিম লীগের কংগ্রেস-বিরোধী এবং হিন্দু-বিরোধী প্রচারণা,
পাকিস্তান অর্জনের পর আমূল ভূমি সংস্কারের প্রতিশ্রুতিসহ, মুসলিম কৃষকদের
কংগ্রেস এবং সিপিআই থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলেছিল। এই অঞ্চলের গ্রামীণ
মুসলমানদের ভোটদানের ধরণ পাকিস্তানের দাবি বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক আবেদন
তৈরি করেছিল এবং বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলন ছিল গণ-ভিত্তিক এবং গণতান্ত্রিক।
সংক্ষেপে, পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলন প্রতিটি বাঙালি মুসলমানকে
তার শ্রেণীগত পটভূমি নির্বিশেষে সবকিছুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আন্দোলনে অর্থনৈতিক
কর্মসূচি সম্পর্কে খুব অস্পষ্ট কিছু ছিল, তবে সাধারণভাবে মুসলমানরা এবং বিশেষ করে কৃষকরা
জীবনের সকল ক্ষেত্রে আরও ভালো কিছু আশা করেছিল। খাদ্য, বস্ত্র,
আশ্রয়, শিক্ষা, চাকরি এবং সর্বোপরি, স্বাধীনতা যা
একজন কৃষকের কাছে পুলিশ বাহিনী, আদালত ও কাঠুরিয়া, জেল এবং লকআপের বিলুপ্তি এবং শোষণের অন্যান্য
সমস্ত বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। পাকিস্তান বলতে প্রাথমিক খিলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা
এবং এই অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য "চিরন্তন ঈদ" বা আনন্দের ভূমিকেও
বোঝানো হয়েছিল,অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং পারস্পরিক কোন্দলের কারণে সিপিআই,
কংগ্রেস এবং অন্যান্য বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলিও তাদের অবস্থান
হারিয়ে ফেলে। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের-বিরোধিতার কারণে কিছু জায়গায় সিপিআই
নির্বাচনে তার প্রার্থীদের সমর্থনে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাতে পারেনি। নগর ও শিল্প
কেন্দ্রগুলিতে সিপিআই-এর বেশিরভাগ নেতা ও কর্মীর কতৃত্ব কৃষকদের উপর তাদের
নিয়ন্ত্রণকে আরও দুর্বল করে তোলে, মুষ্টিমেয় উপজাতি হাজং এবং রাজবংশী ছাড়া।
বিদ্রূপাত্মকভাবে, দলটি যুদ্ধের পরে জনসমর্থন অর্জনের জন্য লীগের বিকল্প
কর্মসূচি গ্রহণের চেয়ে অ-কৃষক শ্রেণীর উপর জমিদারি ব্যবস্থার বিলোপের প্রভাব
সম্পর্কে বেশি চিন্তিত ছিল,যখন হিন্দু ভদ্রলোকের নেতৃত্বে বাংলায় সিপিআই "একটি
খাঁটি কৃষক সংগঠন" গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তখন মুসলিম লীগ
আমূল ভূমি সংস্কারের কর্মসূচি গ্রহণ করে। জমিদার-বিরোধী এবং মহাজন-বিরোধী
কেপিপি-লোকদের বিশাল আগমন মুসলিম লীগকে "শ্রমিক-কৃষকদের দল"-এ
রূপান্তরিত করতেও সাহায্য করে। দলের নতুন
সদস্যদের প্রচণ্ড চাপের মুখে মুসলিম লীগ হাইকমান্ডকে জমিদার-বিরোধী, মহাজন-বিরোধী
কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়েছিল, যা মূলত হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণীর ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করার
জন্যই করা হয়েছিল। তবে আশরাফ, উলামা, জোতদার এবং ভদ্রলোক সকল শ্রেণীর মুসলিম লীগ নেতারা
শোষণমুক্ত সমাজ অর্জনের পূর্বশর্ত হিসেবে পাকিস্তান অর্জনের উপর বেশি জোর
দিয়েছিলেন। শীঘ্রই পাকিস্তানের দাবি জমিদারি-মহাজানি ব্যবস্থার বিলোপ এবং এই
অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য উন্নত চাকরি ও শিক্ষার সুযোগের দাবির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ
হয়ে ওঠে। পাকিস্তান দাবির প্রতি হিন্দুদের বিরোধিতা, সাধারণত
অর্থনৈতিক বিবেচনায় অনুপ্রাণিত কারণ হিন্দুরা জমিদার-বিরোধী, মহাজন-বিরোধী
যেকোনো কর্মসূচির প্রধান শিকার হবে, যা সমগ্র বাংলায় গুরুতর সাম্প্রদায়িক
অস্থিরতার সৃষ্টি করে। প্রতিটি জেলায়
মুসলিম লীগ কর্তৃক “পাকিস্তান সম্মেলন” অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বক্তারা
"ভিক্ষা করে নয় বরং বিপ্লবের মাধ্যমে" পাকিস্তান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা
সম্পর্কে জনসাধারণকে বক্তাদের কাছে তুলে ধরেন," ১৯৪০-এর দশকে
কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা পাকিস্তানের বিরোধিতা করার জন্য পাল্টা সম্মেলন করতে
প্ররোচিত করে। উভয় পক্ষের তীব্র সাম্প্রদায়িক প্রচারণার কারণে, একদিকে মুসলিম
লীগ বাদশাহী বা মুসলিম শাসন পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্যদিকে কংগ্রেস-মহাসভার নেতারা রামরাজ্য বা হিন্দু রাজ্য
প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল । ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, বেশিরভাগ
জায়গায় অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় বিষয়গুলির মধ্যে পার্থক্য ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল।
দিনাজপুর-রংপুর, যশোর-খুলনা, ত্রিপুরা-নোয়াখালী এবং উত্তর ময়মনসিংহের তথাকথিত
"কমিউনিস্ট বলয়" আর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার হাত থেকে মুক্ত ছিল না।
সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ আর ধনী-দরিদ্রের মধ্যে আকস্মিক দ্বন্দ্ব ছিল না। ১৯৪০-এর
দশকের মাঝামাঝি সময়ে এগুলি দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে নির্বিচারে লড়াইয়ে পরিণত
হয়েছিল। গ্রামাঞ্চল যেমন এবং এই অঞ্চলের ছোট শহরগুলিতে আবারও হিন্দু ও মুসলিমদের
মধ্যে আন্তঃশ্রেণীগত দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, যার মধ্যে প্রধান বিষয় ছিল মন্দির অপবিত্র করা
এবং মসজিদের কাছে সঙ্গীত বাজানো। ফরিদপুর,
যশোর এবং খুলনার কিছু অংশে, নম-শূদ্র এবং মুসলিম কৃষকদের মধ্যে দাঙ্গা ১৯৪৬-৪৭ সালের
নোয়াখালী দাঙ্গার চেয়েও কম ছিল। ১৯৪৪ সালের ২৫ মে খুলনার মোল্লাহাটে এক নমশূদ্র
এবং একজন মুসলিম কৃষকের মধ্যে জমির এক টুকরো নিয়ে বিরোধের জের ধরে পরিস্থিতি
গুরুতর মোড় নেয়। খুলনা এবং পার্শ্ববর্তী যশোরের কয়েক বর্গমাইল এলাকায় লুটপাট ও
দাঙ্গার ফলে ছয়জন নিহত হয়, যার মধ্যে পাঁচজন মুসলিম ছিল এবং ৫২১টি বাড়ি পুড়িয়ে
দেওয়া হয়। তেভাগা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নড়াইল (যশোর)ও দরিদ্র
নমশূদ্র এবং মুসলিম কৃষকদের মধ্যে গুরুতর দাঙ্গার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।
দাঙ্গার প্ররোচনাকারীদের সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কিছুই জানা যায়নি। মুসলিম লীগ এবং
মহাসভার নেতাদের তীব্র বক্তৃতার খবর ছাড়াও, মোল্লাহাটের
কিছু নমশূদ্র কৃষক, যারা খুলনার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন,
তাকে বলেছিলেন যে ১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে কিছু স্বার্থপর ব্যক্তি তাদের
বিভ্রান্ত করেছে। মুসলিম কৃষকরা রংপুর শহরের কারমাইকেল কলেজের হিন্দু ছাত্রদের উপর
কিছু মুসলিম ছাত্র এবং শহরের নেতাদের প্ররোচনায় আক্রমণ করেছিল-এর প্ররোচনা
স্থানীয়ভাবে হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিম ভারতের হিন্দুদের গোয়ালিয়র রাজ্যে একটি মসজিদের
অপবিত্রতার অভিযোগে ১৯৪৬ সালের মে মাসে যশোরের গ্রামাঞ্চলে গুরুতর দাঙ্গা শুরু
হয়। ১৯৪০ সালের আগস্টে পূর্ব বাংলার মুসলিম কৃষকরা পাকিস্তানের
ধারণার প্রতি এতটাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে পড়েছিল যে এটি আর কোনও রাজনৈতিক বা
আঞ্চলিক বিষয় ছিল না, তাদের কাছে এর একটি আবেগগত এবং ধর্মীয় আবেদন ছিল। বিশেষ
করে ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক পালিত ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে এর প্রেক্ষাপটে
কলকাতায় ঘটে যাওয়া দাঙ্গার পর, যার ফলে ৪,০০০ এরও বেশি
লোক মারা যায়, পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর হয়ে ওঠে কারণ সমগ্র অঞ্চল
গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়। ততক্ষণে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ এত
তীব্র হয়ে ওঠে যে এমনকি সিনিয়র আইনজীবী এবং বিচারকরাও তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য
অর্জনের জন্য দাঙ্গাকে সমর্থন করতে শুরু করেন। আবুল মনসুর আহমেদের একজন
উচ্চশিক্ষিত মুসলিম বন্ধু তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন বলে জানা গেছে: "আপনি কতজন
হিন্দুকে হত্যা করেছেন? মুসলিমদের স্বার্থে কেবল মুখের কথা বলে কোনও লাভ হবে না।
এমনকি খাজা নাজিমুদ্দিনের মতো একজন শীর্ষ মুসলিম লীগ নেতাও মন্তব্য করেছিলেন যে
ডাইরেক্ট অ্যাকশনের অর্থ ব্রিটিশ-বিরোধী নয় বরং মুসলমানদের পক্ষ থেকে
হিন্দু-বিরোধী আন্দোলন। ফলস্বরূপ, হিন্দু জমিদার, মহাজন এবং নিম্ন শ্রেণীর প্রতিবেশীদের সাথে সকল
শ্রেণীর মুসলিম কৃষকদের আচরণ থেকে স্পষ্ট যে হিন্দুদের সম্পর্কে সাম্প্রদায়িক
মুসলিম লীগ নেতাদের এবং তাদের নিজেদের মধ্যে খুব কমই মতপার্থক্য ছিল। কলকাতা
দাঙ্গার পরপরই নোয়াখালীতেও তা ঘটে। নোয়াখালীর দাঙ্গা অবশ্যই "যা আছে"
এবং "যা নেই" এর মধ্যে সংগ্রামের অংশ ছিল, মূলত হিন্দু
জমিদার, মহাজন এবং মুসলিম কৃষকদের মধ্যে। এই দাঙ্গাগুলি "মুসলিম জনগণের
জন্য পাকিস্তানের ভিন্ন অর্থ" প্রতিফলিত করে। ১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ডের
পর এই অঞ্চলের অধিকাংশ মুসলমান মনে করেছিলেন যে পাকিস্তানই সাংবিধানিক সমস্যার
একমাত্র সমাধান। পূর্ব বাংলার মুসলিম প্রধান জেলাগুলিতে দাঙ্গাকে সম্ভবত অনেক
মুসলমান পাকিস্তান অর্জনের একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। ১৯৪৬ সালের অক্টোবরের নোয়াখালী দাঙ্গা, যা হিন্দু
সংবাদমাধ্যমে অতিরঞ্জিতভাবে প্রচারিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে
পূর্ব বাংলার গ্রামগুলির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার নমুনা প্রদান করে।
প্রায় ৩৭২টি হিন্দু গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছিল, হাজার হাজার
বসতবাড়ি লুটপাট ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং জেলায় প্রায় ২২০ জন হিন্দু,
যার মধ্যে কিছু মহাজনও ছিলেন, প্রাণ হারান। ধর্মীয় উগ্রতা
এবং লুটপাটের আকাঙ্ক্ষা উভয়ই মুসলিম জনতাকে তাদের হিন্দু প্রতিবেশীদের উপর আক্রমণ
করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। একজন সমসাময়িক পর্যবেক্ষকের মতে, তাদের
বেশিরভাগই স্থানীয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল, যার
সম্পূর্ণরূপে মুসলিমরা থাকবে। এর ফলে হিন্দুদের উপর আক্রমণ শুরু
হয়। যদিও এই অস্থিরতার প্রাথমিক
প্রণোদনা ছিল সাম্প্রদায়িক। নোয়াখালীর
অস্থিরতা, বিশেষ করে হিন্দুদের জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা এবং
জেলার একটি বিশাল এলাকায় মুসলিম সন্ত্রাসীদের, বেশিরভাগ
কৃষকদের দ্বারা হিন্দু মহিলাদের অপহরণ, এই ঘটনাগুলির জন্য মূলত মাওলানা গোলাম সারোয়ার
হোসায়নী দায়ী বলে বিশ্বাস করা কঠিন। তবে, কেপিপির
প্রাক্তন বিধায়ক হোসায়নী, যিনি ১৯৪৮ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সমর্থক জমিয়তুল উলামা
বিধানসভার প্রার্থী হিসেবে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন মূল
উস্কানিদাতা। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপ, সন্দ্বীপ সহ
ত্রিপুরা নোয়াখালী উপ-অঞ্চল জুড়ে হিন্দু-বিরোধী আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা ইঙ্গিত
দেয় যে হোসায়নী ছাড়াই হিন্দু-বিরোধী আন্দোলন সংঘটিত হত। তবে, কলকাতা
দাঙ্গায় তাঁর জামাতাকে হারানোর পর তিনি প্রাথমিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নোয়াখালীর
রামগঞ্জ, বেগমগঞ্জ এবং লক্ষ্মীপুর থানা এলাকার একজন প্রভাবশালী পীর
হিসেবে তাঁর এক বিশাল মুসলিম কৃষক অনুসারী ছিল যারা হিন্দুদের হত্যাকে একটি পবিত্র
অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করত। লীগ ন্যাশনাল গার্ড এবং দলের স্থানীয় নেতারা
দাঙ্গার মূল সংগঠক ছিলেন, যারা ১৯৪৬ সালের আগস্টে, অস্থিরতা শুরু
হওয়ার দুই মাস আগে, প্রত্যক্ষ কর্ম দিবস পালনের সময় মুসলিম কৃষক এবং অন্যান্য
গ্রামবাসীদের হিন্দু জমিদার, মহাজন, দোকানদার এবং অন্যান্য শ্রেণীর লোকদের বয়কট করতে প্ররোচিত
করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের গোড়ার দিকে, যদিও গান্ধী
এবং সোহরাওয়ার্দীর (বাংলার মুখ্যমন্ত্রী) শান্তি মিশনের কারণে ত্রিপুরা নোয়াখালী
উপ-অঞ্চলে লুটপাট এবং দাঙ্গার ঘটনা হ্রাস পেয়েছিল, তবুও পূর্ব
বাংলা জুড়ে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে লীগ এবং মহাসভার প্রচারণার কারণে
সাম্প্রদায়িক তিক্ততা চরমে পৌঁছেছিল। ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে হিন্দু ও মুসলিম
সংবাদমাধ্যম দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে গলফ সম্প্রসারণের বাকি কাজটি করেছিল।
নোয়াখালীকে আর "আইনহীন অঞ্চল" হিসেবে চিহ্নিত করা যায়নি কারণ দাসেন,
ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, যশোর, পাবনা, বগুড়া এবং রংপুর জেলায় পরিস্থিতি খুব একটা ভালো ছিল না।
মুসলিম কৃষকরা ইসলাম, পাকিস্তান এবং জিন্নাহ সাহেবের (মি. জিন্নাহ) নামে
আইনশৃঙ্খলা অমান্য করে সামনের সারিতে ছিল। ততক্ষণে "ইসলাম বিপদে" এই
স্লোগান কেবল সশস্ত্র লুঙ্গি পরিহিত, মাতাল মুসলমানদের কলকাতার পার্ক স্ট্রিট এবং
চৌরঙ্গী বা ঢাকার ইসলামপুর ও নবাবপুরের ফুটপাতে টেনে আনেনি, বরং এটি পূর্ব
বাংলার গ্রামীণ বাঁশের বেড়া বরাবরও প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। হিন্দু জমিদার,
মহাজন, ভদ্রলোক এবং নিম্নবিত্তদের প্রতি মুসলিম কৃষকদের আচরণ থেকে
যা দেখা যায় তা হল, কৃষকরা তাদের "নতুন অর্জিত ক্ষমতা এবং বিশ্বাসের প্রতি
আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে যে তারা ইতিমধ্যেই "স্বাধীন" হয়ে গেছে।
নোয়াখালী এবং ত্রিপুরার কিছু অংশের দাঙ্গা-পীড়িত অঞ্চলের বেশিরভাগ গ্রাম থেকে
হিন্দুদের ব্যাপকভাবে দেশত্যাগের পর, একজন বয়স্ক মুসলিম দরিদ্র কৃষক মন্তব্য
করেছিলেন যে তারা পাকিস্তান অর্জন করেছেন কারণ ফেনী এবং চাঁদপুরের মধ্যবর্তী
অঞ্চলটি "মুক্ত" করা হয়েছিল। মুসলিম কৃষকদের জোরপূর্বক হিন্দুদের
ধর্মান্তরিত করে তাদের মহিলাদের বিয়ে করার স্বতঃস্ফূর্ততা তাদের শ্রেণী এবং
সাম্প্রদায়িক শত্রুদের অপমান ও অবমূল্যায়ন করার তাদের ইচ্ছাকে প্রতিফলিত করে। এই কাজগুলি তাদের গোপন আকাঙ্ক্ষাগুলিকে তৃপ্ত করেছিল,
যা তারা ভেবেছিল পাকিস্তান অর্জনের পরে তারা পূরণ করতে পারবে যেমনটি আগে আলোচনা করা হয়েছে, বিভিন্ন অঞ্চলে
কৃষক বিদ্রোহের মাত্রা এবং প্রকৃতির তারতম্যের জন্য আর্থ-সামাজিক কাঠামো, কৃষি সম্পর্কের
উপ-আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, ভূমিহীনতার পরিমাণ, জনসংখ্যার চাপ এবং কৃষকদের রাজনৈতিক সচেতনতার
স্তর দায়ী ছিল। দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী সময়ে দাঙ্গা-পীড়িত নোয়াখালী ও ত্রিপুরার
কিছু অংশে অর্থনৈতিক দুর্দশার তীব্রতা এবং নোয়াখালী-তিপুরার কৃষকদের আপেক্ষিক
স্বাধীনতা তাদের নেতাদের সামান্যতম উস্কানিতেই হিংস্র করে তুলেছিল। এই উপ-অঞ্চলের
দরিদ্র কৃষকদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বহুলাংশে, "বলশেভিকদের" দ্বারা গঠিত হয়েছিল, যারা ১৯৪৬
সালের অস্থিরতার অনেক আগে থেকেই তাদের অভিযোগ প্রতিকারের সহিংস উপায় শিখিয়েছিল।
রংপুর-দিনাজপুর, পাবনা-বগুড়া, যশোর-খুলনা এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ অঞ্চলের দরিদ্র
কৃষকরা নোয়াখালী-ত্রিপুরা উপ-অঞ্চলের তাদের প্রতিপক্ষের তুলনায় "সেই
পরিমাণে সাম্প্রদায়িক" হয়ে ওঠেনি, কারণ রংপুর, দিনাজপুর এবং
পাবনা, বগুড়া, ঢাকা এবং অন্যান্য অংশের তাৎক্ষণিক শোষক শ্রেণীগুলি ছিল
মুসলিম জোতদার। রংপুর-দিনাজপুরের দরিদ্র কৃষকরা আবার বেশিরভাগই ছিল দাস শ্রমিক এবং
ভাগচাষী। ১৯৪৬ সালের শেষের দিকে, রংপুর, দিনাজপুর,
যশোর, খুলনা এবং ময়মনসিংহের কিছু অংশের দরিদ্র কৃষকরা কমিউনিস্ট
নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং তেভাগার জন্য লড়াই করছিল। তবে, কমিউনিস্ট
নিয়ন্ত্রণে থাকা বর্গাদার এবং ট্যাঙ্কাদাররা যে সাম্প্রদায়িক বিষয় দ্বারা
অনুপ্রাণিত ছিলেন না তা পুরোপুরি সত্য নয়। ময়মনসিংহের উচ্চ বর্ণের হিন্দু জমিদার
এবং রংপুর ও দিনাজপুরের মুসলিম জোতদারদের তুলনায় উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার
তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সহজেই উপজাতি এবং সাম্প্রদায়িক একচেটিয়াতার উপজাত হিসাবে
চিহ্নিত করা যেতে পারে। মুসলিম
বর্গাদার এবং অন্যান্য শ্রেণীর দরিদ্র কৃষকদের তেভাগা বা অন্যান্য জোতদার বিরোধী
আন্দোলনে লেগে থাকার জন্য খুব একটা সাম্প্রদায়িক প্রেরণা ছিল না। বর্গাদার বিল,
যা সাধারণত তেভাগা বিল নামে পরিচিত, প্রবর্তন মুসলিম বর্গাদারদের আন্দোলন থেকে বিরত
রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, যদিও বিলটি সোহরাওয়ার্দী সরকার কখনই আইন হিসেবে প্রণয়নের
উদ্দেশ্যে তৈরি করেনি। এটি পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি দরিদ্র মুসলিম কৃষকদের
সমর্থন আকর্ষণ করার জন্য একটি ওজর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এই বিলের পরে আরেকটি
উগ্র বিল, জমিদারি ব্যবস্থা বিলোপের জন্য পরিকল্পিত রাজ্য অধিগ্রহণ ও
প্রজাস্বত্ব বিল, ২১শে এপ্রিল মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক বিধানসভায় পেশ করা
হয়। এই বিলটি সরকার এবং মুসলিম লীগ মিডিয়ার মাধ্যমে সমগ্র অঞ্চলে ব্যাপক
প্রচারণা লাভ করে। বেশিরভাগ কৃষক এবং তাদের কিছু নেতা বিশ্বাস করতেন যে বিলটি
"জমির মালিকানা" স্লোগানকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা
হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ঋণদাতা কেপিপি নেতা সৈয়দ নওশের আলী এবং আবু হোসেন সরকার,
যারা তেভাগা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তারা শীঘ্রই
নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে সিপিআই থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে
নেন। সোহরাওয়ার্দীর কমিউনিস্ট-বিরোধী অবস্থান, যা বেশিরভাগ
মুসলমানদের মধ্যে, বিশেষ করে ধনী ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিল,
মুসলিম গণগোষ্ঠীর উপর সিপিআই-এর প্রভাবকে নিরপেক্ষ করতে সফল হয়েছিল। বিভিন্ন
উগ্র প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে, যা কৌশল হিসেবে কাজ করেছিল, লীগ ১৯৪৭ সালের
এপ্রিলের পর সিপিআই-এর পাল থেকে কার্যত বাতাস কেড়ে নেয়। ইতিমধ্যে, কংগ্রেস এবং
অন্যান্য প্রধানত হিন্দু গোষ্ঠীগুলিকে ইসলাম ও পাকিস্তানের শত্রু এবং জমিদার ও
মহাজনদের রক্ষক হিসেবে কৃষকদের একটি বিশাল অংশের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে নিন্দিত করা
হয়েছিল। ধনগড়ে সঠিকভাবেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গ্রাসকারী প্রভাবের কথা উল্লেখ
করেছেন যার ফলে বিপুল সংখ্যক মুসলিম কৃষক কিষাণ সভা থেকে সরে এসেছিলেন, তবে তিনি
জমিদারি-মহাজানি ব্যবস্থা বিলোপের দাবির প্রভাবকে কম গুরুত্ব দিয়েছেন, যার ফলে
কৃষকদের একটি বিশাল অংশের উপর বিরাট প্রভাব পড়েছিল। পাকিস্তানের পক্ষে কৃষকদের
সমর্থন আদায়ে মুসলিম লীগের সাফল্য এই দাবিগুলির মধ্যেই নিহিত ছিল, যার
সাম্প্রদায়িক এবং শ্রেণীগত আবেদন উভয়ই ছিল। আশরাফ এবং মুসলিম জোতদারদের মধ্যে
সুবিধার সফল সংযোগের মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছিল, যারা যৌথভাবে
কৃষক সমাজের নিম্ন স্তরের মধ্যে "মিথ্যা চেতনা" জাগিয়ে তুলেছিল।
দীর্ঘমেয়াদে, এটি পূর্ব বাংলার গ্রামীণ অঞ্চলে একটি প্রভাবশালী শ্রেণী
হিসেবে জোতদারদের উত্থানের ইঙ্গিত দেয়, যা পরবর্তীতে ভূমিকা পালন করে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, কমিউনিস্ট
নেতৃত্ব শ্রেণী ভিত্তিক কৃষক আন্দোলনে ব্যর্থ ছিলেন। কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের
দোলুল্যমান ও আপোষমুলক কর্মপন্থা এটা প্রমাণ করে যে, তারা কিছুটা
সুবিধাবাদী ছিলেন, প্রধানত তাদের নগর-ভিত্তিক শিল্প
আন্দোলনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বর্গাচাষীদের একত্রিত করতে আগ্রহী ছিলেন। শ্রমিক
ও সর্বহারা শ্রেণীর, যাদেরকে কৃষকদের চেয়ে বেশি বিপ্লবী সম্ভাবনাময় বলা হয়
এবং এই সময়কালে সিপিআই বা বঙ্গীয় কিষাণ সভা কেন্দ্রীয় কমিটিতে দরিদ্র কৃষকদের
সম্পূর্ণ অপ্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে এটি প্রতিফলিত হয়েছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ
যখন সবচেয়ে দুর্বল ছিল তখন তাদের উপর আঘাত না করার জন্য, ১৯৪৭ সালে
"এক জাতি" এবং "দ্বি-জাতি" তত্ত্বকে অস্বীকার করে
"বৃহত্তর বাংলা আন্দোলন"-এর জন্য কৃষকদের একত্রিত করার জন্য সিপিআইকে
আরও লিঞ্চ করা যেতে পারে। বর্গাচাষীরা "বিপ্লবী তত্ত্বের সীমিত ধারণা থাকা
সত্ত্বেও" যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে প্রস্তুত ছিল বলেও বলা হয়। কিন্তু আমরা
মনে করি এই ধরণের যুক্তি "দ্বি-জাতি তত্ত্ব"-এর প্রভাবকে অবমূল্যায়ন
করে, যা শ্রেণী, জাতিগত এবং অন্যান্য পার্থক্যকে উপেক্ষা করে উপমহাদেশের
সমস্ত মুসলমানদের জন্য পৃথক জাতিসত্তার প্রচার করে। সিপিআই নেতৃত্ব দ্বিধাগ্রস্ত
ছিল, মাঝে মাঝে কৃষকদের স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছিল, এই
দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা না করেই, আন্দোলনগুলি ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ ছিল বৃহত্তর
জাতীয়তাবাদী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে তাদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা,
যা কৃষক এবং বর্গাচাষীদের বিভিন্ন শ্রেণীর কল্পনাকে আঁকড়ে ধরে তাদের
"কৃষক ইউটোপিয়া" প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভক্ত করেছিল। পরিশেষে, ধনী এবং মাঝারি
কৃষক এবং বর্গাচাষীদের আলাদা "ইউটোপিয়া" ছিল। মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক
স্বদেশ, পাকিস্তানের আন্দোলন, এই পার্থক্যগুলিকে ঝাপসা করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে,
যার ফলে ট্যাঙ্কাদার এবং বর্গাদারদের ছোট অংশ, বেশিরভাগই
অমুসলিম উপজাতি, তাদের দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ক্লাস লেকচার
বিষয়: ১৯৫০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান কিভাবে হল ?
১৯৪৭-৭১ কালপর্বে পূর্ববঙ্গীয় ইতিহাস পাঠে গভীর মনোযোগ ও
সতর্কতা জরুরি। পূর্ববঙ্গীয় জনগণ ঔপনিবেসিক শক্তির বিরুদ্ধে চল্লিশের দশকে 'পাকিস্তান
আন্দোলন' করেছিল। এরাই আবার বিশেষ করে ৬০.র দশকে পশ্চিম
পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়
ঘটে। বাংলাদেশের উত্থানকে প্রায়শই ব্যাখ্যা করা হয়-দুই পাকিস্তানের মধ্যে 'বৈষম্যতত্ত্ব'
দিয়ে (Sobhan, R., 2015 and Jahan, R., 1994)। এই
বৈষম্যতত্ত্ব দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যূদয়কে ব্যাখ্যা করাটা সম্ভবত খুবই অগভীর।
সরলভাবে দেখলেও বৈষম্যের ব্যাপারটি যথাযথ নয়। পাকিস্তান সরকারের তৃতীয়
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৬৫-১৯৭০) বৈষম্য কমে আসছিল। আর পাকিস্তান অর্থনৈতিক
পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৭০-৭৫) দেখা যায় পূর্ব
পাকিস্থানের জন্য বরাদ্দ হচ্ছে ৬০% আর পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ৪০%। টাকার
অঙ্কে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ২৯,৪০০ মিলিয়ন আর পশ্চিম পাকিস্তানের পণ্য বরাদ্দ
১৯৬০০ মিলিয়ন (Choudhury, G.W., 1994: 62-63)। তাছাড়া,
যে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে 'উন্নয়ন' সমভাবে হয় না। উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতি ছাড়াও
অবকাঠামোসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিক বিষয়াদির উপস্থিতি অত্যাবশ্যক, উদাহরণ হিসেবে
বলা যায়,পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে এবং ভারতের
বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে 'উন্নয়ন বা উন্নয়ন বাজেটে'র তারতম্য
বিরাজমান সত্ত্বেও 'বৈষম্যতত্ত্ব' দিয়ে কেউ স্বাধীন হয়ে যায়নি। তাই 'বৈষম্যতত্ত্ব'
পূর্ববঙ্গীয় জনগণের উত্থানের পুরো গল্পটির প্রতিনিধিত্ব করে না। এর জন্য একটু
গভীরে অনুসন্ধান চালানো সমীচীন হবে। প্রথমেই দৃষ্টি
দেয়া যাক ১৯৪৭ পূর্ববর্তী সময়ে উপনিবেশ বিরোধী পাকিস্তান আন্দোলন পর্বে। পূর্ববঙ্গ
“পাকিস্তান আন্দোলন” বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে আদর্শের চেয়ে অনেক বেশি আর্থ-সামাজিক
উপাদান দ্বারা সঞ্চারিত ছিল। জমিদারের প্রভাব সব জেলায় সমান ছিল না। ছোট জমিদার বা
জোতদার প্রভাবিত জেলা ছিল রংপুর ও দিনাজপুর। আবার মুসলিম মধ্যবিত্ত কৃষকদের প্রভাব
ছিল নোয়াখালী ও কুমিল্লায়। নোয়াখালী এবং কুমিল্লায় ভারতীয় কংগ্রেসের সমর্থন বেশি
ছিল । তাছাড়া, কৃষক প্রজা পাটি মুসলিম লিগে যোগ দিলে নোয়াখালী ও কুমিল্লায়
মুসলিম লিগের জনসমর্থন বেড়ে যায় (Hashmi, T. 2022 49)। সাধারণ মুসলমান
জনগণের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন এবং জমিদারী ও মহাজনি প্রথার
বিলোপের দাবীর বিরুদ্ধে বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকদের বিরোধিতাই দেশভাগের পথরেখা তৈরি
করেছিল। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে স্বরণে রাখা দরকার, মুসলিম লিগ ও
কৃষক প্রজা পার্টি জমিদারি প্রথা বিলোপে বেশি সোচ্চার ছিল (Hashmi, T.
2022:৫০)। এপ্রসঙ্গে আর আলোচনা না বাড়িয়ে মোদ্দা কথায় বলা যায়-পূর্ব
বাংলার মুসলিম কৃষকরা দলে দলে পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল এই জন্য যে,
'পাকিস্তান' অর্জন তাদের হিন্দু 'জমিদার'
ও 'মহাজন' শ্রেণি থেকে মুক্তি দেবে (Hashmi,T1, 1994: 248-56)। কিন্তু 'পাকিস্তান'
অর্জনের পর দেখা গেল হিন্দু জমিদার, ভদ্রলোক ও মহাজনদের স্থলে মুসলিম কৃষকদের
নেতৃত্বদানকারী আশরাফ, উলামা ও জোতদার শ্রেণিটি সেই স্থান দখল করছে (Hashmi,
T., 2022:50) এবার পূর্ববঙ্গীয় জনগণের 'পাকিস্তান' হাসিলের সময়কালীন সময়ে দৃষ্টি দেয়া যাক- পূর্ব ও পশ্চিম
নামে যে 'পাকিস্তান' রাষ্ট্রের পথ চলা আরম্ভ হলো, সেটা কোনোভাবেই
ভারসাম্য পূর্ণ ছিলনা। পশ্চিম পাকিস্তান বেশি সম্পদশালি ছিল। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক,
ঐতিহাসিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে ছিল । পশ্চিম
পাকিস্তানে আয়তনের দিক দিয়ে বৃহত্তম-৩১০,০০০ বর্গমাইল পূর্ব পাকিস্তানের আয়তন ৫৫০০০ বর্গ
মাইল। আবার জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে মোট জনসংখ্যার ৫৬% লোকের
বসবাস। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে অনেক বেশি সম্পদশালী।
বৃটিশদের তৈরি করা আধুনিক সেচ ব্যবস্থা ছিল পশ্চিমপাকিস্তানে। তাছাড়া পশ্চিম
পাকিস্তান অপেক্ষাকৃত বেশি উন্নত ছিল-নগরায়ন ও শিল্পোয়নের ক্ষেত্রে। এছাড়াও বড়
ব্যবসায়ি ব্যাংকার, শিল্পপতি, ভূস্বামী, ধনী কৃষক এবং প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলা,
১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত লাহোর বিশ্ববিদ্যালয় এবং এক ডজন ভালো মানের কলেজ যা
উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি তৈরি হয়েছিল (Hashmi, T., 2022:50)। ১৯৪৭ সালে
স্বাধীনতা প্রাপ্তির সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে আইসিএস অফিসার ছিল ৯৫ জন আর পূর্ব
পাকিস্তানে মাত্র ০১ জন (Hashmi, T., 2022:66)। করাচিতে ছিল
আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ও সমুদ্রবন্দর কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান একটিও বিমানবন্দর ও
সমুদ্রবন্দর ছিল না (Hashmi, T., 2022:53)। ১৯৪৭-৫০
কালপর্বে প্রায় সব হিন্দু পেশাজীবি, শিক্ষক, অভিজাত হিন্দুরা ভারতে চলে যায়। পূর্ববঙ্গ থেকে
ভারতে যাওয়া হিন্দুদের মধ্যে মাত্র ৪% ছিল কৃষক, ৩৮% ছিল
ব্যবসায়ি ও শিল্পোপতি ১২% চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষিত পেশাজীবি, (Islam, S.,
(Ed.) 1997:116)। দেশভাগের পরিণতিতে হিন্দু পেশাজীবি, ব্যবসায়ী প্রভৃতির দেশত্যাগের ফলে সৃষ্ট শুন্যতা
পূরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতা সম্পন্ন মুসলমান প্রশাসক,
শিক্ষক ও পেশাজীবিদের দিয়ে। অনেক মুসলমান কলেজ শিক্ষক একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন। আবার, পূর্ব পাকিস্তানের শুন্যতা পূরণে পশ্চিম
পাকিস্তান থেকে অপেক্ষাকৃত গোছালো ও দক্ষ পেশাজীবিরা এগিয়ে এলেন। উপরিউক্ত আলোচনায় আমরা দেখলাম, পূর্ব ও পশ্চিম
পাকিস্তানের ঐতিহাসিক, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট ভারসাম্যহীনতায় ভারতে হিন্দু
পেশাজীবিদের দেশত্যাগে সৃষ্ট শুন্যস্থান পশ্চিম পাকিস্তানী বুর্জোযা ও অপেক্ষাকৃত
কম দক্ষ পূর্ব পাকিস্তানী পেশাজীবি বুর্জোয়া শ্রেণিটি সেই জায়গা নিচ্ছে। এবার আমরা
অভিবাসি মুসলমানদের দিকে দৃষ্টি দেই। অভিবাসী মুসলিমদের মধ্যে-উত্তর ভারতের
উর্দুভাষী শিক্ষিত ব্যবসায়ী শ্রেণিটি পশ্চিম পাকিস্তানে যায় আর পূর্ব পাকিস্তানে
আসে কম শিক্ষিত দরিদ্র মুসলিমরা, যারা মূলত বিহার ও পশ্চিম বাংলা থেকে আগত। পশ্চিম
পাকিস্তানে উর্দুভাষী মোহাজের মুসলিমরা পুঁজি বিনিয়োগ করল (John, R., 1994,
31-32)। এই পুঁজির সাথে পরবর্তীকালে মেট্রোপলিটন পুঁজির সংযোগ সংযোগ ঘটে। পশ্চিম
পাকিস্তানে বুর্জোয়াদের হাত ধরে প্রাথমিকভাবে এভাবে পুঁজির বিকাশ হয়। ১৯৪৭ সালে যে 'পূর্ববঙ্গীয় সমাজটি' পূর্ব
পাকিস্তান হলো সেটি বিভাগপর্বে বাংলায় ছিল প্রধানত শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহকারী
কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী অঞ্চল। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উজ্জল উদাহরণ 'পাট'। পূর্ব বঙ্গে
পৃথিবীর ৮০% পাট উৎপাদিত হলেও এ অঞ্চলে কোনো পাটকল ছিলনা। পাটকলগুলো দিল কলকাতা ও
তৎসন্নিহিত এলাকায়। দেশভাগের ফলে পূর্ব বঙ্গীয় পাটের তাৎক্ষনিক গন্তব্যস্থল হয়
পশ্চিম পাকিস্তানে কারণ পূর্ববঙ্গে প্রথম পাটকল স্থাপিত হয় ১৯৫০ সালে নারায়নগঞ্জ (Hashmi,
T., 2022 53) 1 এবার ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কালে সংস্কৃতির জগতে পরিবর্তনকারী ঘটনার
প্রতি সতর্ক দৃষ্টি দেই। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৪৮ এ ভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর বক্তব্যে
তাৎক্ষনিক ও প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ করেছিল ছাত্র-ছাত্রীরা। এই ছাত্র-ছাত্রী কারা?
এরা তারাই ঔপনিবেশিক আমলে হিন্দুদের থেকে চাকুরী, ব্যবসা বা
অন্যান্য পেশায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ে থাকত। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়েও ভাষায়
প্রশ্নে অন্যভাষার (উর্দু) আধিপত্যে পিছিয়ে পড়ার সঙ্কাতেই সেই শ্রেণিটি প্রতিবাদ
করল। এই শ্রেণিটিই ঔপনিবেশিক আমলে 'পাকিস্তানে'র স্বপ্ন দেখে ছিল মূলত হিন্দু জমিদার, ভদ্রলোক ও
মহাজনদের থেকে মুক্তি'র। ভাষা'র প্রশ্নটি সামনে আসাতে গোটা চল্লিশের দশকে, পাকিস্তান
আন্দোলনের জোয়ার ভাসতে থাকা পূর্ববঙ্গের “মুসলমান বাঙালি”র পরিচয় “বাঙালি মুসলমান”
পরিচয়ের সূচনা বিন্দু সৃষ্টি করল। বদরুদ্দিন উমর সেটাকে বলছেন-বাঙালি মুসলমানদের 'ঘরে ফেরা'
(বদরুদ্দিন উমর, ১৯৬৯:৮-১১)। 'মুসলিম বাঙালি'র এই 'বাঙালি মুসলমান'
হওয়া দীর্ঘ মেয়াদে গোটা পূর্ববঙ্গকে প্রভাবিত করেছিল। ৫০ এর দশকের মাঝামাঝি
সময়ে সংখ্যালঘু ভাষাভাষীদের সঙ্গে সংখ্যগুরু ভাষাভাষীদের 'শ্রেণি সংঘাতেই
'বাঙালি জাতীয়তাবাদীর উত্থান। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে 'ভাষা প্রশ্নে'
বাঙালি মুসলমানের সরব প্রতিবাদ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পরিণতি
লাভকরে। উদীয়মান শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শেণির শ্রেণি চেতনার সেই শুরু। এরপর
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নিকট মুসলিম লিগের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে 'মুসলিম'
রাজনীতির 'শেষের শুরু' বলা যেতে পারে। স্বাধীনতার প্রথম দশকে পূর্ব পাকিস্তানের
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো 'ভার্নাকুলার এলিটে'র উত্থান। বাঙালি
মুসলমানদের আধুনিক যুগে প্রবেশের ঘটনাটি ঘটে একটু দেরিতে। স্বাধীনতার পূর্বে
বাঙালি মুসলমানদের যারা নেতৃত্ব দিত তারা ছিল মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক অবাঙালি
(ননভার্নাকুলার)। কিন্তু স্বাধীনতার পর প্রথম দশকেই ভার্নাকুলার এলিটরা ভাষাকে
ভিত্তি করে রাজনৈতিক দল ও প্লাটফরম গঠন করে। ১৯৫৪ এর নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে
ভার্নাকুলার এলিটরা পুরাতন অবাঙালি অভিজাত শ্রেণিকে ক্ষমতার রাজনীতিতে হারিয়ে দেন
(Jahan, R., 1994, 38-39)। আওয়ামী লিগ 'আওয়ামী মুসলিম লিগ' থেকে 'মুসলিম' বাদ দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সূচনা করে
১৯৫৬ সালে। এর মাধ্যমে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের সেক্যুলার রাজনীতির সূচনা হয়। স্বাধীনতার প্রথম দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান
ছাড়াও আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো-বাঙালি ও অবাঙালি দ্বন্দ্ব। আমরা পূর্বে
আলোচনায় দেখিয়েছিলাম, হিন্দু ভদ্রলোক, জমিদার ও মহাজন শ্রেণির দেশত্যাগের ফলে সৃষ্ট
শুন্যতা পূরণ করে অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানি ও ভারতীয় অভিবাসি মুসলিমরা। স্বাধীনতা
পরবর্তী সময়ে বাঙালি মুসলমান শ্রেণি এটাকে দেখল বৈষম্য হিসেবে। তারা দেখল নবসৃষ্ট
কলকারখানার মালিকানায় অবাঙালি, এই অবাঙালি শিল্পমালিকরা অবাঙালি শ্রমিকদের কারখানায় চাকুরি
দিচ্ছে। এতে বঞ্চিতের ক্ষোভ দানা বেধে ওঠে। 'বাঙালি ও 'অবাঙালি'
যথাক্রমে 'আমরা ও 'তারা' হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই বাঙালি ও অবাঙালি দ্বন্দ্বের
চূড়ান্ত পরিণতিতে পঞ্চাশের দশকে মাঝামাঝি সময়ে আদমজী পাটকল বাঙালি ও অবাঙালি
শ্রমিকদের মধ্যে দাঙ্গায় কয়েকশত শ্রমিক নিহত হয়। পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তান
শাসনের 'শেষের শুরু' তখনই (Hashmi, T., 2022:63) এবার আসা যাক,
ষাটের দশকে। এটা স্বীকৃত যে, পূর্ব বাংলার জন্য স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম দশক ছিল 'স্থবিরতার পর্ব',
(Jahan, R., 1994; 30)। ঘাটের দশকে এই স্থবিরতায় গতিশীলতার সৃষ্টি হয়। ১৯৫৯-৬৫
কালপর্বে মাথাপিছ আয় বেড়ে হয় ২.৬%। এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে ১৫৪৮ মাইল রাস্তা
তৈরি হয়, ১৯২৯ জন নূতন ডাক্তার যেমন তৈরি হয় তেমনি শিক্ষাক্ষেত্রে
১১৫৩ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরি হয়। হাইস্কুল, কলেজ এবং
বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাক্রমে ৪১৯০০১, ৮১১০৩ এবং ৫০৬৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় (Jahan, R.,
1994, 81-82)। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে পূর্ববঙ্গীয় কৃষকরা তাদের পণ্য সামগ্রী
পরিবহনে অভূতপূর্ব সুবিধা পায়। এর প্রত্যক্ষ ফল হলো- কৃষকের হাতে নগদ টাকার
প্রবাহ। এই কৃষকের সন্তানরাই ষাটের দশকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভীড় করছে । ফলে স্কুল,
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির হার বেড়ে যাওয়া এই শিক্ষার্থীরাই সেই শ্রেণির
জন্ম দিল, যে শ্রেণি হলো 'শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি'। এই শিক্ষিত
মধ্যবিত্ত শ্রেণিই জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ভূমিকা
রেখেছিল।