### *রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ (Social Contract Theory)*
*জ্যাঁ জ্যাঁক রুশো (১৭১২-১৭৭৮)* - বই *"The
Social Contract" (১৭৬২)*। বইটির
প্রথম লাইন দিয়েই বিপ্লব শুরু:
> "Man
is born free, and everywhere he is in chains."
> মানুষ মুক্ত হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।
রুশো প্রশ্ন তুললেন - এই শৃঙ্খল বৈধ কি?
যদি বৈধ হয়, কোথা থেকে এলো? আর কিভাবে মানুষ আবার মুক্ত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই হলো তার সামাজিক চুক্তি
মতবাদ।
#### *১. চুক্তির পটভূমি - কেন চুক্তি দরকার হলো?*
চুক্তি বুঝতে হলে আগের ২টি ধাপ বুঝতে হবে।
*ক) প্রকৃতির রাজ্য ছিল স্বর্গ:*
মানুষ ছিল Noble Savage - সরল, সুখী, স্বাধীন, দয়ালু। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না, বৈষম্য ছিল না।
*খ) পতন - ব্যক্তিগত সম্পত্তি সব নষ্ট করলো:*
একজন মানুষ জমি ঘিরে বললো "এটা
আমার"। সেখান থেকেই চুরি, ডাকাতি, হিংসা, ধনী-গরিব, প্রভু-দাস তৈরি
হলো। স্বর্গ নরক হয়ে গেল। মানুষের স্বাধীনতা হারালো। প্রকৃতির রাজ্যে আর থাকা
সম্ভব নয়।
*গ) সমস্যা:*
এখন মানুষের সামনে ২টি দরকার:
১. নিরাপত্তা দরকার - যাতে কেউ কাউকে মারতে না
পারে।
২. স্বাধীনতাও দরকার - যা প্রকৃতির রাজ্যে ছিল।
হবস নিরাপত্তার জন্য স্বাধীনতা কোরবানি দিলেন।
রুশো বললেন - আমি এমন চুক্তি করবো যাতে নিরাপত্তাও থাকবে, স্বাধীনতাও থাকবে।
#### *২. রুশোর সামাজিক চুক্তি - মূল বক্তব্য*
রুশোর চুক্তির সূত্রটি মুখস্থ করো, এটাই পুরো তত্ত্ব:
> "প্রত্যেকে তার নিজের ব্যক্তিত্ব ও সমস্ত ক্ষমতা
সাধারণ ইচ্ছার নির্দেশে সমগ্র সমাজের হাতে সমর্পণ করে এবং আমরা প্রত্যেকে সমষ্টির
অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তা ফিরে পাই।"
কঠিন লাগছে? সহজে ভাঙি:
*ধাপ ১: সবাই সব দেবে:*
আমি, তুমি, সবাই - প্রত্যেকে
আমাদের সব অধিকার, সব শক্তি সমাজকে
দিয়ে দিলাম। কাউকে বাদ দিয়ে নয়, শর্ত ছাড়া।
*ধাপ ২: সমাজ সবার হয়ে গেল:*
আমরা সবাই মিলেই সমাজ। তাই আমরা যখন সমাজকে সব
দিলাম, মানে আমরা নিজেদেরকেই
দিলাম। কাউকে দাস বানালাম না।
*ধাপ ৩: সবাই সব ফিরে পেল:*
সমাজের সদস্য হিসেবে আমরা আবার সব ফিরে পেলাম -
কিন্তু এখন তা নিরাপদ। আগে আমার একার শক্তি ছিল ১, এখন সমাজের শক্তি ১০০০, সেই ১০০০ এর অংশীদার আমি।
*ফলাফল:*
- কেউ কারো অধীন নয়। আমি সমাজের অধীন, সমাজ মানেই আমি।
- আমি স্বাধীনতা হারালাম না। আগে ছিল প্রাকৃতিক
স্বাধীনতা (যা খুশি করা), এখন পেলাম নাগরিক
স্বাধীনতা (আইন মেনে নিরাপদ স্বাধীনতা)।
#### *৩. হবস, লক ও রুশোর চুক্তির মধ্যে পার্থক্য - পরীক্ষায়
১০০% আসে*
এই ছকটি না লিখলে ১০ নম্বর পাবে না:
বিষয় | হবস | লক | রুশো
**বই** | Leviathan (১৬৫১) | Two Treatises of Government (১৬৮৯) | The Social Contract (১৭৬২)
**প্রকৃতির রাজ্য** | নরক, যুদ্ধের রাজ্য | শান্তির রাজ্য,
তবে অসুবিধা ছিল |
স্বর্গরাজ্য
**চুক্তি কার মধ্যে?** | মানুষে মানুষে, রাজা চুক্তির বাইরে | মানুষে মানুষে, সরকার চুক্তির মধ্যে | মানুষে মানুষে, সবাই সমাজকে সব দেবে
**কি ছাড়লো?** | একটি ছাড়া সব অধিকার (আত্মরক্ষা ছাড়া) |
কিছু অধিকার (জীবন,
স্বাধীনতা, সম্পত্তি নিজের কাছে রাখলো) | সব অধিকার
**কাকে দিলো?** | রাজা / লেভিয়াথানকে | সরকারকে | সমগ্র সমাজ / সাধারণ ইচ্ছাকে
**ফলাফল কি হলো?** | চরম রাজতন্ত্র, স্বৈরাচার | সাংবিধানিক সরকার, উদার গণতন্ত্র | প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র, জনগণের সার্বভৌমত্ব
**সার্বভৌম কে?** | রাজা | সরকার ও জনগণ (যৌথ) | সাধারণ ইচ্ছা /
জনগণ
**বিপ্লবের অধিকার আছে?** | না, একবার চুক্তি করলে আর ফেরা যাবে না | হ্যাঁ, সরকার চুক্তি
ভাঙলে জনগণ সরকারকে বদলাতে পারবে | হ্যাঁ, সরকার সাধারণ ইচ্ছার প্রতিনিধি মাত্র, ভুল করলে বদলানো যাবে
#### *৪. রুশোর চুক্তির ৪টি বৈশিষ্ট্য*
*১. এটি সবচেয়ে গণতান্ত্রিক চুক্তি:*
হবস রাজাকে সব দিলেন, রুশো জনগণকে সব দিলেন।
*২. এটি প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র:*
রুশো বলেন - সাধারণ ইচ্ছা কখনো প্রতিনিধি (MP)
এর মাধ্যমে প্রকাশ পায়
না। ব্রিটিশরা মনে করে তারা স্বাধীন, কিন্তু রুশো বলেন - "ইংরেজরা শুধু ভোটের দিন স্বাধীন, তারপর ৫ বছর দাস।" তাই সব আইনে জনগণের
সরাসরি ভোট (Referendum) লাগবে।
*৩. সাম্য ও স্বাধীনতার সমন্বয়:*
চুক্তিতে সবাই সমানভাবে সব দিয়েছে, তাই সবাই সমান। এবং যেহেতু নিজের ইচ্ছা (সাধারণ
ইচ্ছা) মানছি, তাই আমি স্বাধীন।
*৪. রাষ্ট্র একটি নৈতিক সংস্থা:*
রাষ্ট্র শুধু পুলিশ নয়, রাষ্ট্র মানুষকে ভালো বানায়, নৈতিক বানায়। রাষ্ট্রের আইন মানাই নৈতিকতা।
#### *৫. সমালোচনা*
*১. অস্পষ্ট ও অবাস্তব চুক্তি:*
ইতিহাসে এমন কোনো চুক্তি সভা হয়নি। এটি
কল্পনা। হবস, লকও কল্পনা
করেছেন, কিন্তু রুশোরটা আরও বেশি
কল্পনা।
*২. স্বৈরাচারের বীজ - "Forced to
be free":*
রুশো বলেন - "যে সাধারণ ইচ্ছা মানবে না,
তাকে স্বাধীন হতে বাধ্য
করা হবে।" এই কথার সুযোগ নিয়ে রোবসপিয়ের ফরাসি বিপ্লবে হাজার হাজার মানুষকে
গিলোটিনে কেটেছে, বলেছে - এরা
সাধারণ ইচ্ছার শত্রু। স্ট্যালিন, হিটলারও একই কথা
বলেছে।
*৩. ব্যক্তি স্বাধীনতা ধ্বংস:*
সব অধিকার সমাজকে দিয়ে দিলে ব্যক্তির আর কিছু
থাকে না। রাষ্ট্র যদি বলে - তোমার সম্পত্তি দাও, তোমার জীবন দাও - তাও দিতে হবে। এটি ব্যক্তিকে
গিলে খায়।
*৪. সাধারণ ইচ্ছা বের করা অসম্ভব:*
কিভাবে বুঝবো কোনটা সাধারণ ইচ্ছা? ১৭ কোটি মানুষের দেশে সবাই এক জায়গায় বসে
আলোচনা করা অসম্ভব।
#### *৬. গুরুত্ব - কেন রুশো এখনো প্রাসঙ্গিক?*
১.
*ফরাসি বিপ্লব ও আমেরিকান বিপ্লব:* ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র
"স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব" রুশোর বই থেকেই এসেছে।
2. *গণতন্ত্রের
ভিত্তি:* জনগণের সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, গণভোট - সব ধারণা রুশোর।
3. *বাংলাদেশের
সংবিধান:* আমাদের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে আছে - "প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার
মালিক জনগণ" - এটি রুশোর সাধারণ ইচ্ছাই।
*পরীক্ষায় শেষ করার উপায়:*
> হবসের চুক্তি জন্ম দিয়েছে নিরাপত্তার, কিন্তু স্বাধীনতা মেরেছে। লকের চুক্তি জন্ম
দিয়েছে উদার গণতন্ত্রের। আর রুশোর চুক্তি জন্ম দিয়েছে বিপ্লবের - যেখানে মানুষ
নিজেই রাজা, নিজেই প্রজা। তাই
হবস হলেন স্বৈরাচারের দার্শনিক, লক হলেন
উদারবাদের জনক, আর রুশো হলেন
গণতন্ত্র ও বিপ্লবের জনক।
*এক লাইনে মনে রাখো:*
হবস = ভয়ে চুক্তি (বাঁচার জন্য রাজাকে সব দাও)
লক = যুক্তিতে চুক্তি (অধিকার বাঁচাতে সরকারকে
কিছু দাও)
রুশো = ভালোবাসায় চুক্তি (সবাই সবাইকে সব দাও,
সবাই স্বাধীন থাকো)
রুসোর
সামাজিক চুক্তি মতবাদ অনুযায়ী, মানুষ প্রাকৃতিক স্বাধীনতার অংশ ত্যাগ করে একটি রাজনৈতিক
সমষ্টি গঠন করে, যার একমাত্র বৈধ ভিত্তি হলো জনগণের সাধারণ ইচ্ছা। এই চুক্তির উদ্দেশ্য হলো সবার সমান স্বাধীনতা,
সমতা ও সাধারণ কল্যাণ নিশ্চিত করা।[revolution.chnm][britannica][britannica]
প্রকৃতির
রাজ্য
রুসোর
প্রকৃতির রাজ্যের ধারণা হবসের থেকে ভিন্ন। তাঁর মতে, প্রকৃতির
অবস্থায় মানুষ ছিল মূলত স্বাধীন, সমান ও শান্তিপ্রিয়; তবে
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সম্পত্তির উদ্ভব ও পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে
সংঘাত ও অসমতা তৈরি হয়।[britannica]
তাই সমাজ
গঠনের কারণ কেবল ভয় নয়; বরং মানুষের সম্মিলিত জীবন, নিরাপত্তা ও
নৈতিক জীবন রক্ষার প্রয়োজন।[britannica][revolution.chnm]
সামাজিক
চুক্তির মূল শর্ত
রুসোর মতে,
সামাজিক চুক্তির মূল শর্ত হলো: প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিত্ব ও
সম্পূর্ণ ক্ষমতা সাধারণ ইচ্ছার সর্বোচ্চ নির্দেশনার অধীনে সমষ্টির কাছে সমর্পণ করে;
বিনিময়ে সে সমষ্টির এক অবিচ্ছেদ্য সদস্য হিসেবে সমান অধিকার লাভ করে।[revolution.chnm][sourcebooks.fordham]
এর অর্থ:
- কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যের ওপর বিশেষ সুবিধা
পাবে না।
- সবাই সমানভাবে সাধারণ ইচ্ছার অধীন থাকবে।
- সমষ্টি সবার ব্যক্তিত্ব ও সম্পদ রক্ষা করবে।[revolution.chnm][history.hanover]
সাধারণ
ইচ্ছা
রুসোর
মতবাদের কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ
ইচ্ছা (volonté générale)। এটি ব্যক্তিগত ইচ্ছার সাধারণ যোগফল নয়;
বরং নাগরিকদের সম্মিলিত জনস্বার্থমুখী ইচ্ছা।[britannica][en.wikipedia]
সাধারণ
ইচ্ছাই আইন তৈরি করে এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে বৈধতা দেয়। তাই রুসোর মতে, জনগণের
সার্বভৌমত্বই রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি।[britannica][en.wikipedia][marxists]
জনসার্বভৌমত্ব
রুসোর মতে,
সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে থাকে এবং তা কোনো ব্যক্তি, রাজা বা
প্রতিনিধিদলের কাছে স্থায়ীভাবে হস্তান্তরযোগ্য নয়। কারণ সার্বভৌমত্ব হলো সাধারণ
ইচ্ছার প্রয়োগ, আর ইচ্ছা প্রতিনিধির মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা
যায় না।[marxists]
এ কারণে
রুসো সরাসরি গণতন্ত্র বা নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণের পক্ষে ছিলেন। তাঁর মতে,
আইন তৈরিতে নাগরিকদের নিজেদের অংশগ্রহণই রাজনৈতিক স্বাধীনতার মূল শর্ত।[en.wikipedia][egyankosh.ac]
স্বাধীনতা ও
সমতা
রুসোর
চুক্তিতত্ত্বে স্বাধীনতা ও সমতা পরস্পরবিরোধী নয়। মানুষ প্রাকৃতিক স্বাধীনতা
হারায়, কিন্তু বিনিময়ে পায় নাগরিক
স্বাধীনতা ও সম্পত্তির নিরাপত্তা।[history.hanover]
- প্রাকৃতিক স্বাধীনতা: যা চায় তা করার অসীম স্বাধীনতা।
- নাগরিক স্বাধীনতা: নিজের অংশগ্রহণে গঠিত বৈধ আইনের অধীনে সুরক্ষিত
স্বাধীনতা।
- নৈতিক স্বাধীনতা: ব্যক্তিগত আবেগের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে সাধারণ
ইচ্ছা মেনে চলা।[revolution.chnm][britannica][history.hanover]
এভাবে রুসোর
মতে, সাধারণ ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য মানুষকে দাস করে না; বরং তাকে
সত্যিকারের স্বাধীন নাগরিক করে।[britannica][egyankosh.ac]
রাষ্ট্র ও
সরকার
রুসোর
তত্ত্বে রাষ্ট্র বা সার্বভৌম কর্তৃত্ব এবং সরকার এক নয়। রাষ্ট্র হলো জনগণের
সমষ্টি ও সাধারণ ইচ্ছার বাহক; আর সরকার হলো সেই সাধারণ ইচ্ছা কার্যকর করার মধ্যস্থ
প্রতিষ্ঠান।[en.wikipedia][marxists]
সরকার
জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্তু তার
ক্ষমতা চিরস্থায়ী বা অসীম নয়। জনগণের সার্বভৌমত্বই সর্বোচ্চ; সরকার কেবল
তার নির্বাহী যন্ত্র।[marxists]
মূল্যায়ন
রুসোর
সামাজিক চুক্তি মতবাদ আধুনিক গণতন্ত্র, জনসার্বভৌমত্ব ও ফরাসি বিপ্লবের
নীতি—স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ব—গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাঁর চিন্তা
রাষ্ট্রের বৈধতাকে ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার বা বংশগত ক্ষমতার পরিবর্তে জনগণের সম্মতির
ওপর প্রতিষ্ঠিত করে।[revolution.chnm][britannica][en.wikipedia]
তবে
সমালোচকেরা বলেন, “সাধারণ ইচ্ছা” ধারণাটি অস্পষ্ট এবং এর নামে
ব্যক্তিস্বাধীনতা সীমিত বা সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবু
জনগণের সার্বভৌমত্ব ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের আলোচনায় রুসো অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ।[en.wikipedia][egyankosh.ac]
সংক্ষেপে: রুসোর মতে, রাষ্ট্র গঠিত হয় মানুষের স্বেচ্ছাকৃত
সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে; এই চুক্তিতে সবাই সাধারণ ইচ্ছার অধীনে সমানভাবে যুক্ত
হয়। তাই রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্ব জনগণের সাধারণ ইচ্ছা থেকেই আসে।[revolution.chnm][britannica][marxists]
রুশোর
সামাজিক চুক্তি মতবাদ
ভূমিকা
জাঁ-জ্যাক
রুশো (১৭১২–১৭৭৮) জেনেভায় জন্মগ্রহণকারী ফরাসি ভাষার দার্শনিক। তাঁর দ্য সোশ্যাল কন্ট্র্যাক্ট (১৭৬২)
গ্রন্থের শুরুতেই আছে বিখ্যাত উক্তি: মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, অথচ সর্বত্র
সে শৃঙ্খলে বাঁধা। রুশোর প্রশ্ন, এই শৃঙ্খলকে কী করে বৈধ করা যায়, অর্থাৎ
রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মানলেও মানুষ কীভাবে স্বাধীন থাকতে পারে। এর উত্তর হিসেবেই
তিনি সামাজিক চুক্তির তত্ত্ব দাঁড় করান। তাঁর এই তত্ত্ব হবস ও লকের চুক্তিবাদী
ধারার একটি স্বতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক রূপ।
প্রকৃতির
রাজ্য সম্পর্কে রুশোর ধারণা
রুশোর মতে
প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ ছিল সরল, স্বাধীন, শান্তিপ্রিয় ও আত্মতৃপ্ত। তিনি একে
"মহান বন্য মানুষ"-এর অবস্থা বলে কল্পনা করেন। তখন মানুষের দুটি
স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ছিল: আত্মরক্ষার আকাঙ্ক্ষা (amour de soi) এবং অন্যের
কষ্টে সহানুভূতি। এই অবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি, প্রতিযোগিতা
ও অসাম্য ছিল না। হবসের মতো তিনি একে যুদ্ধাবস্থা মনে করেননি; আবার লকের
মতো সম্পত্তির অধিকারভিত্তিক সমাজও নয়। তবে এটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়, বরং একটি
তাত্ত্বিক কল্পনা, যার মাধ্যমে তিনি আধুনিক সমাজের ত্রুটি বোঝাতে চেয়েছেন।
চুক্তির
প্রয়োজনীয়তা
সভ্যতার
বিকাশে কৃষি, ধাতুবিদ্যা ও সর্বোপরি ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব হলে
সমাজে ধনী-দরিদ্র বিভাজন, অহংকার ও পরনির্ভরতা (amour-propre) দেখা দেয়। ডিসকোর্স অন ইনইকুয়ালিটি (১৭৫৫)
গ্রন্থে রুশো লিখেছেন, যে ব্যক্তি প্রথম জমি ঘিরে বলেছিল "এটা আমার",
সেই ছিল সভ্য সমাজের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। ধনীরা তখন নিজেদের সম্পদ রক্ষার
জন্য আপাতদৃষ্টিতে ন্যায্য কিন্তু বস্তুত তাদের পক্ষেই ঝোঁকা এক প্রতারণামূলক
রাষ্ট্রচুক্তি চাপিয়ে দেয়। সোশ্যাল
কন্ট্র্যাক্ট-এ রুশো এর বিকল্প, অর্থাৎ
ন্যায্য ও বৈধ চুক্তির রূপরেখা দেন।
চুক্তির
স্বরূপ
রুশোর মতে
চুক্তির মূল সমস্যা হলো এমন একটি সংঘ গড়া, যা সবার
জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করবে, অথচ প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছাতেই চলবে এবং আগের মতোই
স্বাধীন থাকবে। সমাধান হিসেবে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের সমস্ত অধিকার কোনো এক
ব্যক্তির কাছে নয়, বরং সমগ্র সম্প্রদায়ের কাছে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে।
যেহেতু সবাই একইভাবে সব কিছু সমর্পণ করে, তাই সবার
অবস্থা সমান থাকে, কারও স্বার্থে অন্যকে বোঝা হতে হয় না। রুশো বলেন,
প্রত্যেকে সবার কাছে নিজেকে দেওয়ায় আসলে কারও কাছেই দেয় না। এই চুক্তির
মাধ্যমে একটি নৈতিক ও সমষ্টিগত সত্তার জন্ম হয়, যার নিজস্ব
পরিচয়, জীবন ও ইচ্ছা আছে। এই সত্তা নিষ্ক্রিয় অবস্থায়
"রাষ্ট্র", সক্রিয় অবস্থায় "সার্বভৌম", আর অন্য
রাষ্ট্রের তুলনায় "শক্তি" নামে পরিচিত।
চুক্তির মূল
বৈশিষ্ট্য
১.
সর্বসম্মত ও স্বেচ্ছাকৃত: চুক্তি সবার
সম্মতিতে হয়, কোনো শক্তি বা প্রতারণায় নয়।
২. সম্পূর্ণ
সমর্পণ: কেউ আংশিক অধিকার ধরে রাখে না, যাতে কেউ
বিশেষ সুবিধা না পায়।
৩. সমষ্টির
কাছে সমর্পণ: অধিকার কোনো
শাসকের হাতে যায় না, যায় সমগ্র সম্প্রদায়ের হাতে। ফলে চুক্তির পক্ষ ও শাসক
একই, অর্থাৎ জনগণ।
৪. দ্বৈত
সত্তা: প্রত্যেক ব্যক্তি একই সঙ্গে সার্বভৌমের অংশ
(আইন প্রণেতা নাগরিক) এবং রাষ্ট্রের অধীন (আইন মান্যকারী প্রজা)।
৫. সাধারণ
ইচ্ছার ভিত্তি: চুক্তি থেকে
যে সমষ্টিগত সত্তা জন্মায়, তার পরিচালক শক্তি সাধারণ ইচ্ছা, যা সর্বজনীন
কল্যাণের ইচ্ছা।
চুক্তির ফল
চুক্তির
মাধ্যমে মানুষ প্রাকৃতিক স্বাধীনতা হারায়, কিন্তু তার
বদলে পায় নাগরিক স্বাধীনতা, সম্পত্তির বৈধ অধিকার এবং নৈতিক স্বাধীনতা। রুশোর মতে
নিজের তৈরি আইন মেনে চলাই প্রকৃত স্বাধীনতা, আর কেবল
প্রবৃত্তির দাসত্ব করা পরাধীনতা। মানুষ সহজাত প্রবৃত্তির বদলে ন্যায় ও
কর্তব্যবোধে পরিচালিত হয়, যা তাকে নিছক প্রাণী থেকে নৈতিক সত্তায় উন্নীত করে।
সার্বভৌমত্ব
ও সরকার
রুশোর
তত্ত্বে সার্বভৌমত্ব জনগণের, এবং তা অবিভাজ্য ও অহস্তান্তরযোগ্য। সরকার সার্বভৌম নয়;
সে সাধারণ ইচ্ছা কার্যকর করার জন্য নিযুক্ত জনগণের প্রতিনিধি বা কর্মচারী
মাত্র। জনগণ ইচ্ছামতো সরকারকে গঠন, পরিবর্তন বা বাতিল করতে পারে। এজন্য রুশো
সরকারকে চুক্তি নয়, বরং সার্বভৌমের আদেশে নিযুক্ত একটি দায়িত্ব হিসেবে
দেখেন। তিনি আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে ছোট আকারের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রকে পছন্দ করতেন।
হবস,
লক ও রুশোর চুক্তি তুলনা
|
বিষয় |
হবস |
লক |
রুশো |
|
প্রকৃতির
রাজ্য |
যুদ্ধাবস্থা |
শান্তিপূর্ণ,
কিন্তু অসুবিধাযুক্ত |
সরল,
মুক্ত ও সুখী |
|
চুক্তির
উদ্দেশ্য |
নিরাপত্তা
ও শান্তি |
জীবন,
স্বাধীনতা ও সম্পত্তি রক্ষা |
স্বাধীনতা
ও সাম্যের সংরক্ষণ |
|
ক্ষমতা
কার কাছে |
সার্বভৌম
শাসক |
সীমিত
সরকার |
সমগ্র
জনগণ (সাধারণ ইচ্ছা) |
|
সার্বভৌমত্ব |
শাসকের,
নিরঙ্কুশ |
জনগণের
কাছে ন্যস্ত, সরকার সীমাবদ্ধ |
জনগণের,
অবিভাজ্য |
|
বিদ্রোহের
অধিকার |
নেই |
আছে |
জনগণ
সরকার বদলাতে পারে |
মূল্যায়ন ও
প্রভাব
রুশোর
সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব গণসার্বভৌমত্ব, জনসম্মতিভিত্তিক সরকার ও রাজনৈতিক সাম্যের
ধারণাকে শক্তিশালী ভিত্তি দেয়। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯), ১৭৮৯ সালের
মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণা এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এর গভীর প্রভাব
দেখা যায়। কান্ট ও হেগেলও রুশো দ্বারা প্রভাবিত হন।
সমালোচনা
সমালোচকদের
মতে এই তত্ত্ব কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল। প্রথমত, সব অধিকার
সমষ্টির কাছে সমর্পণের ধারণা ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা দুর্বল করে এবং সংখ্যালঘুর
অধিকার উপেক্ষিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, "স্বাধীন হতে
বাধ্য করা"র ধারণা স্বৈরতন্ত্রকে বৈধতা দিতে পারে, যে কারণে
ইসাইয়া বার্লিনসহ অনেকে একে বিপজ্জনক মনে করেছেন। তৃতীয়ত, প্রত্যক্ষ
গণতন্ত্র আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রে অবাস্তব। চতুর্থত, সাধারণ
ইচ্ছা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা অস্পষ্ট। পঞ্চমত, ঐতিহাসিক
চুক্তির ধারণা কাল্পনিক, যদিও রুশো নিজেও একে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে দাবি করেননি। তবে
সমর্থকদের মতে এটি বৈধ শাসনের একটি নৈতিক মানদণ্ড, নির্দিষ্ট
সরকারি কাঠামোর নকশা নয়।
উপসংহার
রুশোর
সামাজিক চুক্তি মতবাদের মূলকথা হলো, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের সমস্ত অধিকার সমগ্র
সম্প্রদায়ের কাছে সমর্পণ করে একটি নৈতিক সমষ্টিগত সত্তা গঠন করে, যার পরিচালক
শক্তি সাধারণ ইচ্ছা। এতে সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে থাকে এবং আইন মানা নিজেরই ইচ্ছা
মানার নামান্তর হয়, ফলে মানুষ রাষ্ট্রের অধীনে থেকেও স্বাধীন থাকে। যদিও এর
অস্পষ্টতা ও স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক আছে, গণতন্ত্র ও
জনসার্বভৌমত্বের ধারণার বিকাশে রুশোর অবদান অতুলনীয়।
রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ তাঁর রাজনৈতিক
দর্শনের প্রাণভোমরা। এটি মূলত একটি আদর্শিক কাঠামো, যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে স্বাধীন মানুষ একটি বৈধ
রাজনৈতিক সমাজ গঠন করতে পারে। রুশোর মতে, "মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলে আবদ্ধ"। এই
শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়ে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের উপায় হিসেবেই তিনি সামাজিক
চুক্তির ধারণা উপস্থাপন করেন। হবস ও লকের মতো পূর্ববর্তী চিন্তাবিদদের
চুক্তিতত্ত্ব থেকে রুশোর মতবাদ মৌলিকভাবে পৃথক, কারণ এর লক্ষ্য ছিল কেবল শৃঙ্খলা নয়, বরং **নৈতিক স্বাধীনতা ও সমতার** প্রতিষ্ঠা।
### 🌿
প্রকৃতির রাজ্য: রুশোর
দৃষ্টিভঙ্গি
সামাজিক চুক্তি বুঝতে হলে প্রথমে রুশোর 'প্রকৃতির রাজ্য' (State of Nature) সম্পর্কিত ধারণা বুঝতে হবে, যা হবসের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। হবস যেখানে
প্রকৃতির রাজ্যকে "সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ" বলে বর্ণনা করেছেন,
সেখানে রুশোর কাছে এটি
ছিল একটি **সরল, শান্তিপূর্ণ ও
সুখী** অবস্থা।
- **স্বাভাবিক সহানুভূতি ও স্বাধীনতা:** রুশোর মতে,
প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ
স্বভাবতই সহানুভূতিশীল (natural pity) এবং স্বাধীন ছিল। এখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, কৃত্রিম বৈষম্য বা শোষণের কোনো স্থান ছিল না।
- **সামাজিক ক্ষয়িষ্ণুতা:** সমস্যা হলো, সমাজ ও সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ
স্বার্থপর হয়ে ওঠে, ব্যক্তিগত
সম্পত্তির জন্ম হয় এবং অসমতা সৃষ্টি হয়। এই কৃত্রিম সমাজই মানুষকে তার স্বাভাবিক
স্বাধীনতা ও সরলতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
### 🤝
সামাজিক চুক্তি:
স্বাধীনতার হস্তান্তর নয়, রূপান্তর
রুশোর সামাজিক চুক্তি কোনো শাসকের কাছে
স্বাধীনতা "হস্তান্তর" (alienation) নয়। এটি একটি **রূপান্তরমূলক** প্রক্রিয়া,
যেখানে ব্যক্তি তার
প্রাকৃতিক স্বাধীনতা ত্যাগ করে বিনিময়ে **নাগরিক স্বাধীনতা** অর্জন করে।
- **চুক্তির শর্তাবলি:** চুক্তির মূল কথা হলো,
প্রতিটি ব্যক্তি তার
ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে **সাধারণ ইচ্ছার (General Will)** অধীন করে এবং নিজেকে সমষ্টিগত শরীরের (body
politic) একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ
হিসেবে গণ্য করে।
- **সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে:** এই চুক্তির মাধ্যমে
কোনো নির্দিষ্ট শাসক বা সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয় না। সার্বভৌমত্ব (Sovereignty)
সম্পূর্ণভাবে **জনগণের
সমষ্টিগত শরীরের** হাতে থাকে। সরকার কেবল জনগণের অধীনস্থ একটি নির্বাহী সংস্থা
মাত্র।
- **স্বাধীনতার রূপান্তর:** রুশোর মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে মানুষ তার "প্রাকৃতিক
স্বাধীনতা" (যা কেবল নিজের শক্তির সীমা পর্যন্ত ছিল) হারিয়ে **"নাগরিক
স্বাধীনতা"** অর্জন করে, যা সাধারণ ইচ্ছার
দ্বারা নির্ধারিত হয় এবং প্রকৃত নৈতিক স্বাধীনতা প্রদান করে।
### ⚖️
সাধারণ ইচ্ছা (General
Will): চুক্তির প্রাণশক্তি
সামাজিক চুক্তির কেন্দ্রীয় ধারণা হলো **সাধারণ
ইচ্ছা**। এটি কেবল সব ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছার যোগফল (Will of All) নয়। সাধারণ ইচ্ছা হলো সমাজের **সামগ্রিক
কল্যাণের (common good)** দিকে লক্ষ্যবদ্ধ
একটি সম্মিলিত, যুক্তিবাদী
ইচ্ছা।
- **অবিচ্ছেদ্য ও অপ্রতিরোধ্য:** সাধারণ ইচ্ছা
সার্বভৌম এবং এটি কখনো ভুল হতে পারে না। এটি সর্বদা সাধারণ কল্যাণের দিকেই
পরিচালিত হয়।
- **"মুক্ত হতে বাধ্য করা":** রুশোর একটি
বিতর্কিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, যদি কোনো ব্যক্তি সাধারণ ইচ্ছা মানতে অস্বীকার করে, তবে তাকে তা মানতে **বাধ্য** করা হবে। এর অর্থ
এই নয় যে তাকে দাসত্বে ফেলা হবে, বরং তার নিজের
নিম্নতর, স্বার্থপর
প্রবৃত্তি থেকে তাকে মুক্ত করে তার উচ্চতর, নৈতিক ও যুক্তিবাদী সত্তার কাছে ফিরিয়ে আনা
হবে—অর্থাৎ তাকে **"মুক্ত হতে বাধ্য করা"** হবে।
### 🏛️
সার্বভৌমত্ব ও সরকারের
পার্থক্য
রুশো স্পষ্টভাবে **সার্বভৌম (Sovereign)**
এবং **সরকার (Government)**
-এর মধ্যে পার্থক্য
করেছেন।
- **সার্বভৌম:** এটি জনগণের সমষ্টিগত সাধারণ ইচ্ছা।
সার্বভৌম ক্ষমতা অবিচ্ছেদ্য, অবিভাজ্য এবং
হস্তান্তরযোগ্য নয়।
- **সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব:** বিপ্লবের পর
শ্রমিক শ্রেণীকে নিজেদের রাষ্ট্রক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- **সরকার:** এটি সার্বভৌমের অধীনস্থ একটি নির্বাহী
সংস্থা, যা আইন প্রয়োগ করে।
সরকারের রূপ (গণতান্ত্রিক, অভিজাততান্ত্রিক
বা রাজতান্ত্রিক) সার্বভৌমের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।
### 💎
উপসংহার ও মূল্যায়ন
সংক্ষেপে, রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ একটি আদর্শিক
প্রয়াস, যা ব্যক্তির
স্বাধীনতা এবং সমষ্টিগত কর্তৃত্বের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে চায়। এটি হবসের মতো
কেবল নিরাপত্তা নয়, বরং **নৈতিকতা ও
স্বাধীনতার** ভিত্তিতে রাষ্ট্রের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে। তবে এই মতবাদের কিছু
সমালোচনাও রয়েছে। যেমন, 'সাধারণ ইচ্ছা'র অস্পষ্টতা এবং 'মুক্ত হতে বাধ্য করা'র ধারণাটি কর্তৃত্ববাদের দিকে পরিচালিত করতে
পারে বলে অনেকে মনে করেন। তা সত্ত্বেও, আধুনিক গণতন্ত্র, জনগণের
সার্বভৌমত্ব এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ধারণার বিকাশে রুশোর অবদান অপরিসীম।
রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ বর্ণনা কর
ভূমিকা
জ্যাঁ জ্যাক রুশো
(Jean-Jacques Rousseau) ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত ফরাসি রাজনৈতিক দার্শনিক। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান অবদান হলো সামাজিক চুক্তি মতবাদ
(Social Contract Theory)। ১৭৬২ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Social Contract বা
Du contrat social-এ তিনি এই মতবাদ ব্যাখ্যা করেন। রুশোর মতে,
রাষ্ট্রের বৈধতার মূল উৎস হলো জনগণ এবং জনগণের সাধারণ ইচ্ছা। তাঁর মতবাদে জনগণের সার্বভৌমত্ব,
স্বাধীনতা, সাম্য ও সাধারণ কল্যাণ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
১. প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে রুশোর ধারণা
রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ বুঝতে হলে প্রথমে প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে তাঁর ধারণা জানতে হয়।
রুশোর মতে, প্রাকৃতিক অবস্থায় মানুষ তুলনামূলকভাবে স্বাধীন, সরল ও শান্তিপ্রিয় ছিল। তার মৌলিক চাহিদা ছিল সীমিত এবং আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি ও সহানুভূতি তার আচরণকে প্রভাবিত করত। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশ, সামাজিক বৈষম্য এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার কারণে সমাজে প্রতিযোগিতা ও সংঘাত বাড়তে থাকে।
রুশোর বিখ্যাত বক্তব্য,
“Man is born free, and everywhere he is in chains”—অর্থাৎ,
মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে,
কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সমাজের বৈষম্যপূর্ণ ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার সমালোচনা করেন।
২. সামাজিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা
রুশোর মতে, মানুষের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং সামাজিক জীবনে ন্যায্য শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে সবাই সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করবে।
সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তিরা নিজেদের বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায় গঠন করে। এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে আইন প্রণয়ন করে এবং সাধারণ কল্যাণের জন্য কাজ করে।
রুশোর কাছে সামাজিক চুক্তির উদ্দেশ্য কেবল শক্তিশালী শাসক প্রতিষ্ঠা করা নয়;
বরং এমন একটি বৈধ রাজনৈতিক সমাজ গঠন করা, যেখানে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সাম্য বজায় থাকে।
৩. রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদের মূল বক্তব্য
ক. সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন
রুশোর মতে, স্বাধীন ও সমান ব্যক্তিরা পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সমাজ গঠন করে। প্রত্যেকে নিজেকে এবং নিজের ক্ষমতাকে সমগ্র সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে ব্যক্তিরা সম্মিলিতভাবে একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক সত্তা গঠন করে।
Internet
Encyclopedia of Philosophy
+1
খ. জনগণের সার্বভৌমত্ব
রুশোর মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রকৃত অধিকারী হলো জনগণ। কোনো রাজা, অভিজাত শ্রেণি বা শাসকগোষ্ঠী জনগণের সম্মতি ছাড়া স্বাভাবিকভাবে শাসন করার অধিকার লাভ করে না। জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাই রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বৈধতার ভিত্তি।
গ. সাধারণ ইচ্ছা
(General Will)
সাধারণ ইচ্ছা রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদের প্রাণকেন্দ্র। এটি ব্যক্তিগত স্বার্থের সমষ্টি নয়; বরং সমগ্র সমাজের সাধারণ কল্যাণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সম্মিলিত ইচ্ছা। রুশোর মতে, আইন সাধারণ ইচ্ছার প্রকাশ হওয়া উচিত।
Internet
Encyclopedia of Philosophy
+1
ঘ. ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা
রুশোর মতে, সামাজিক চুক্তির উদ্দেশ্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ব্যক্তি সমাজের সদস্য হয়েও স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারে। সবাই একই সাধারণ আইনের অধীন থাকবে এবং কোনো ব্যক্তি অন্যের ওপর স্বেচ্ছাচারী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।
ঙ. সার্বভৌমত্ব অবিভাজ্য ও হস্তান্তর-অযোগ্য
রুশো মনে করেন,
জনগণের সার্বভৌমত্বকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থায়ীভাবে হস্তান্তর করা যায় না। জনগণই আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত কর্তৃত্বের অধিকারী। তাঁর মতে, সার্বভৌমত্ব জনগণের সাধারণ ইচ্ছার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
চ. সরকার ও সার্বভৌম ক্ষমতার পার্থক্য
রুশো সার্বভৌম জনগণ এবং সরকারের মধ্যে পার্থক্য করেছেন।
- সার্বভৌম ক্ষমতা: জনগণের হাতে থাকে এবং সাধারণ আইন প্রণয়নের কর্তৃত্ব বহন করে।
- সরকার: জনগণের প্রণীত আইন কার্যকর করে এবং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
অর্থাৎ,
সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও সার্বভৌম ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ।
Stanford
Encyclopedia of Philosophy
+1
৪. রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদের গুরুত্ব
রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ রাজনৈতিক দর্শনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
1. জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণাকে সুস্পষ্ট করেছে।
2. রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধতার ভিত্তি হিসেবে জনগণের সম্মতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
3. স্বাধীনতা,
সাম্য ও নাগরিক অধিকারের আলোচনাকে শক্তিশালী করেছে।
4. গণতন্ত্র ও জনপ্রতিনিধিত্বমূলক রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশে প্রভাব ফেলেছে।
5. আইন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সাধারণ কল্যাণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
Internet
Encyclopedia of Philosophy
+1
৫. রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদের সমালোচনা
রুশোর মতবাদের কয়েকটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
- কাল্পনিক ভিত্তি: সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠনের ধারণা একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা; এটি সব রাষ্ট্রের প্রকৃত ঐতিহাসিক উৎপত্তির বিবরণ নয়।
- সাধারণ ইচ্ছা নির্ধারণের সমস্যা: জনগণের প্রকৃত সাধারণ ইচ্ছা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
- ব্যক্তিস্বাধীনতার আশঙ্কা: কোনো শাসক বা সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী নিজেদের সিদ্ধান্তকে সাধারণ ইচ্ছা বলে দাবি করে ব্যক্তিস্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।
- আধুনিক রাষ্ট্রে প্রয়োগের সমস্যা: বৃহৎ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজে প্রত্যক্ষ গণঅংশগ্রহণের মাধ্যমে সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কঠিন হতে পারে।
Internet
Encyclopedia of Philosophy
+1
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়,
রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলে,
যেখানে জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এবং সাধারণ ইচ্ছার মাধ্যমে আইন প্রণীত হয়। তাঁর মতে, সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে মানুষ রাজনৈতিক সমাজের সদস্য হয়েও স্বাধীনতা ও সাম্য বজায় রাখতে পারে। জনগণের সার্বভৌমত্ব,
সাধারণ ইচ্ছা এবং জনকল্যাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণে রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে।
পরীক্ষার জন্য মনে রাখবে: ভূমিকা,
প্রকৃতির রাজ্য,
সামাজিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা, জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাধারণ ইচ্ছা,
স্বাধীনতা ও সাম্য, সরকার ও সার্বভৌমত্বের পার্থক্য,
সমালোচনা এবং উপসংহার—এই ধারাবাহিকতায় উত্তরটি লিখবে।
**জ্যাঁ-জ্যাক রুশোর সামাজিক চুক্তি** (*The
Social Contract*, ১৭৬২) ব্যাখ্যা
করে মানুষ কীভাবে স্বাধীন থেকেও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধীনে থাকতে পারে। তাঁর
বিখ্যাত সূচনা: মানুষ স্বাধীন জন্মায়, অথচ সর্বত্র শৃঙ্খলিত।
### সমস্যার সূত্র
প্রকৃতির অবস্থায় মানুষ স্বাধীন ও সমান ছিল,
কিন্তু সম্পত্তি ও
সভ্যতার বিকাশে অসাম্য, নির্ভরতা ও
দাসত্ব এসেছে। প্রশ্ন হলো—এমন একটি সংঘ কীভাবে সম্ভব, যা প্রত্যেককে সুরক্ষা দেবে এবং একই সঙ্গে সে
আগের মতোই স্বাধীন থাকবে।
### চুক্তির মূল কথা
রুশোর সমাধান: প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে এবং
নিজের সমস্ত অধিকার **সমগ্র সম্প্রদায়ের** কাছে সমর্পণ করে।
- সমর্পণ আংশিক নয়, **সম্পূর্ণ**।
- শর্ত সকলের জন্য **একই**।
- কেউ কারও ব্যক্তিগত অধীন হয় না; সকলে সমষ্টির অধীন হয়।
- যেহেতু প্রত্যেকে সব দেয় এবং প্রত্যেকেই
সমষ্টির অংশ, কেউ কারও ওপর
অতিরিক্ত ক্ষমতা পায় না।
এই চুক্তি থেকে জন্ম নেয় একটি **নৈতিক ও
সমষ্টিগত সত্তা**—রাষ্ট্র বা প্রজাতন্ত্র। এর ইচ্ছাই **সাধারণ ইচ্ছা** (*general
will*)।
### চুক্তি কী দেয়
| হারানো | পাওয়া |
|---|---|
| প্রাকৃতিক স্বাধীনতা (যা খুশি তাই করার অধিকার)
| নাগরিক স্বাধীনতা (নিজের
তৈরি আইনের অধীনে থাকা) |
| প্রাকৃতিক সমতা (শক্তির সমতা) | নৈতিক ও আইনগত সমতা |
| ব্যক্তিগত শক্তির ওপর নির্ভরতা | সাধারণ ইচ্ছা ও আইনের সুরক্ষা |
ব্যক্তি এখন **নাগরিক** (সার্বভৌম ক্ষমতার
অংশীদার) এবং **প্রজা** (আইনের অধীন)।
### সার্বভৌমত্ব
- সার্বভৌম হলো জনগণ, যখন তারা সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশ করে।
- সার্বভৌমত্ব **অবিভাজ্য, হস্তান্তরযোগ্য নয় এবং ভুলহীন**—যতক্ষণ সাধারণ
স্বার্থই তার লক্ষ্য।
- সরকার সার্বভৌম নয়। সরকার শুধু নির্বাহী
এজেন্ট; জনগণ ইচ্ছে করলে তাকে
বদলাতে বা সরিয়ে দিতে পারে।
- আইন হতে হবে সাধারণ ইচ্ছার প্রকাশ: সকলের
দ্বারা, সকলের জন্য, সাধারণ বিষয়ে।
### চুক্তি ভাঙা হলে
যে শাসক বা নাগরিক চুক্তি লঙ্ঘন করে, সে রাজনৈতিক বন্ধন থেকে খসে পড়ে। স্বৈরশাসক আর
শাসক থাকে না; জনগণের বিদ্রোহের
অধিকার ফিরে আসে। রুশো স্পষ্ট বলেন, বলপ্রয়োগে টিকিয়ে রাখা আনুগত্য দায়িত্ব নয়, দাসত্ব।
### হবস–লকের সঙ্গে পার্থক্য
- **হবস**: অধিকার একটি সর্বশক্তিমান শাসকের কাছে
তুলে দেওয়া হয়; ফিরে পাওয়া যায়
না।
- **লক**: জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য সীমিত সরকার;
অধিকার থেকে যায়।
- **রুশো**: অধিকার সমষ্টির কাছে যায়, কিন্তু সমষ্টির অংশ হিসেবে ব্যক্তি নিজেই
সার্বভৌম থাকে। স্বাধীনতা মানে ইচ্ছামাফিক কাজ নয়, নিজের দেওয়া আইন মেনে চলা।
সংক্ষেপে, রুশোর সামাজিক চুক্তি এমন একটি যৌথ চুক্তি
যেখানে প্রত্যেকে সবাইকে নিজেকে দেয় এবং বিনিময়ে আইনগত স্বাধীনতা, সমতা ও সাধারণ ইচ্ছার শাসন পায়। বৈধ রাষ্ট্র
সেটাই, যা এই চুক্তি ও সাধারণ
ইচ্ছা থেকে জন্মায়।
১৮ শতকের
ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশো
(Jean-Jacques Rousseau, ১৭১২–১৭৭৮) তাঁর
বিশ্বপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'দ্য সোশ্যাল
কন্ট্রাক্ট' (The Social Contract, ১৭৬২)-এ সামাজিক চুক্তি মতবাদ (Social Contract Theory)
প্রদান করেন।
রাষ্ট্রের
উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদগুলোর মধ্যে চুক্তি মতবাদ অন্যতম প্রধান। রুশোর এই মতবাদ
শুধু রাষ্ট্রের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেনি, বরং জনগণের সার্বভৌমত্ব (Popular Sovereignty) এবং প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের (Direct Democracy) ভিত্তি
স্থাপন করেছিল, যা পরবর্তীকালে ফরাসি বিপ্লবকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত
করেছিল।
রুশোর
সামাজিক চুক্তি মতবাদটি কয়েকটি ধাপে সহজ ও বিস্তারিতভাবে নিচে আলোচনা করা হলো:
১. প্রথম
ধাপ: প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature)
টমাস হব্স
এবং জন লকের মতো রুশোও সামাজিক চুক্তি আলোচনার সূচনা করেছেন 'প্রকৃতির
রাজ্য' দিয়ে। তবে হব্সের বিপরীত মেরুতে গিয়ে রুশো প্রকৃতির
রাজ্যকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে চিত্রায়িত করেছেন:
- প্রাকৃতিক মানব ও স্বর্গীয় সুখ: রুশোর মতে, প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষ বাস করত অত্যন্ত শান্তিময়, সরল ও
স্বাধীন পরিবেশে। তিনি প্রকৃতির রাজ্যের মানুষকে "স্বর্গীয় বর্বর" (Noble Savage) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
- সহজাত অনুভূতি: মানুষ তখন কোনো আধুনিক জটিল নীতি-নৈতিকতা দ্বারা
নয়, বরং দুটি প্রধান সহজাত আবেগ দ্বারা পরিচালিত হতো—
- আত্মরক্ষা (Self-preservation): নিজের টিকে থাকার তাগিদ।
- সহানুভূতি বা দয়া (Compassion/Pity): অন্যের কষ্ট দেখে ব্যথিত হওয়ার মানবীয় অনুভূতি।
- সম্পূর্ণ স্বাধীনতা: প্রকৃতির রাজ্যে কোনো রাজা, আইন, আদালত বা ব্যক্তিগত
সম্পত্তি ছিল না। মানুষ ছিল সমান ও সম্পূর্ণ স্বাধীন।
২. দ্বিতীয়
ধাপ: প্রকৃতির রাজ্যের পতন ও বৈষম্যের সূচনা
রুশোর মতে,
এই সুখী ও শান্তিময় প্রকৃতির রাজ্য চিরকাল
স্থায়ী হয়নি। মানব সভ্যতার অগ্রগতি ও কিছু পরিবর্তনের ফলে সেখানে সংকট দেখা
দেয়:
- ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব: রুশো মনে করতেন, ব্যক্তিগত
সম্পত্তির সৃষ্টিই মানুষের সমস্ত দুঃখ-কষ্টের মূল কারণ। তাঁর বিখ্যাত উক্তি:
"যে ব্যক্তি
প্রথম একখণ্ড জমি ঘেরা দিয়ে বলেছিল 'এটি আমার',
এবং মানুষ তা বিশ্বাস করার মতো মূর্খ ছিল, সেই
ব্যক্তিই ছিল সভ্য সমাজের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।"
- সম্পদের লোভ ও বৈষম্য:
সম্পত্তি ধারণার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে লোভ,
ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা এবং
বৈষম্যের জন্ম হয়। সমাজ ধনী ও দরিদ্র—এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
- শান্তির বিনাশ: ধনীদের শোষণ ও দরিদ্রদের অসন্তোষের ফলে প্রকৃতির
রাজ্যের শান্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং হবসীয় 'যুদ্ধ
ও নৈরাজ্যের' অবস্থার সৃষ্টি হয়।
৩. তৃতীয়
ধাপ: সামাজিক চুক্তি সম্পাদন (The Social Contract)
নৈরাজ্য ও
অনিয়ম থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার করার জন্য মানুষ একত্রিত
হয়ে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
চুক্তির মূল
বিষয়বস্তু:
- ব্যক্তিগত অধিকার সমর্পণ: চুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক তার সমস্ত
ব্যক্তিগত অধিকার ও ক্ষমতা সমগ্র সমাজের কাছে নিঃশর্তভাবে তুলে দেয়।
- সমতার নীতি: যেহেতু সবাই সমানভাবে তাদের অধিকার সমর্পণ করছে,
তাই কেউ কারও চেয়ে বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত হয় না।
- চুক্তির মূল সুর: রুশোর ভাষায়—
"আমরা
প্রতিটি ব্যক্তি আমাদের সমস্ত ক্ষমতা ও অধিকারকে 'সাধারণ
ইচ্ছা'র (General Will) সর্বময়
নেতৃত্বের অধীনে সমর্পণ করছি এবং বিনিময়ে আমরা প্রতিটি সদস্যকে পুরো সমাজের
অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করছি।"
৪. চতুর্থ
ধাপ: চুক্তির ফলাফল—সাধারণ ইচ্ছা ও রাষ্ট্র গঠন
চুক্তির ফলে
কোনো একক ব্যক্তি (যেমন রাজা) শাসক হন না, বরং পুরো সমাজ বা জনগণই হয় সমষ্টিগত শাসক।
১. সাধারণ ইচ্ছা (General Will): চুক্তির
মাধ্যমে জন্ম হয় 'সাধারণ ইচ্ছা'-র, যা সমাজের
সমষ্টিগত ও সার্বজনীন কল্যাণের প্রতীক।
২. জনগণের সার্বভৌমত্ব (Popular Sovereignty): রুশোর মতে,
সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো রাজা বা সরকারের হাতে থাকে না, এটি থাকে
জনগণের হাতে। শাসক বা সরকার কেবল জনগণের প্রতিনিধি বা সেবক হিসেবে কাজ করে।
৩. প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ: প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষের যে 'প্রাকৃতিক স্বাধীনতা' ছিল,
চুক্তির পর মানুষ লাভ করে 'নাগরিক ও
নৈতিক স্বাধীনতা' (Civil and Moral Liberty)। সমাজে বসবাস
করে আইনের অধীনে থেকেও মানুষ প্রকৃতপক্ষে নিজের ওপরই শাসন প্রতিষ্ঠা করে, কারণ
আইনগুলো মানুষেরই 'সাধারণ ইচ্ছা' থেকে তৈরি।
রুশোর
বিখ্যাত সূচনা বাক্য:
"Man is
born free, but everywhere he is in chains." (মানুষ
স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।)
সামাজিক
চুক্তির মাধ্যমেই রুশো মানুষকে এই রাজনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে
প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়ার পথ দেখিয়েছেন।
সংক্ষেপে
রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদের সারসংক্ষেপ
[প্রকৃতির
রাজ্য (শান্তিময় ও স্বাধীন)]
↓
[ব্যক্তিগত
সম্পত্তি ও লোভের উৎপত্তি]
↓
[বৈষম্য,
নৈরাজ্য ও অশান্তি]
↓
[সামাজিক
চুক্তি সম্পাদন]
↓
[সাধারণ
ইচ্ছা (General Will) ও জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা]
মতবাদটির
রাজনৈতিক গুরুত্ব
- ফরাসি বিপ্লবের প্রেরণা: রুশোর "স্বাধীনতা, সাম্য
ও ভ্রাতৃত্ব"-এর বার্তা ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবকে সরাসরি উদ্দীপ্ত
করেছিল।
- আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি: রাজাদের 'ঐশ্বরিক
অধিকার তত্ত্ব' (Divine Right Theory) বর্জন
করে শাসনক্ষমতার আসল মালিক যে 'জনগণ'—এই সত্য রুশো তাঁর চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন।
- প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সমর্থক: রুশো প্রতিনিধিভিত্তিক গণতন্ত্রের চেয়ে সরাসরি
জনগণের অংশগ্রহণে গঠিত প্রত্যক্ষ
গণতন্ত্রের (Direct Democracy) জোরালো
সমর্থক ছিলেন।
অষ্টাদশ
শতকের বিখ্যাত সুইস দার্শনিক জ্যঁ-জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) ১৭৬২ সালে
প্রকাশিত তাঁর অমর গ্রন্থ ‘দ্য সোশ্যাল
কন্ট্রাক্ট’ (The Social Contract)-এ রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও বৈধতা নিয়ে তাঁর বিখ্যাত সামাজিক চুক্তি মতবাদ তুলে ধরেন।
রুশোর
সামাজিক চুক্তি মতবাদের মূল বিষয়গুলো নিচে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো:
১.
প্রাকৃতিক অবস্থা (State of Nature)
- রুশোর মতে, সভ্যতায়
আসার আগে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে এক শান্ত, সরল,
স্বাধীন ও সুখী জীবনযাপন করত।
- এই জীবনকে তিনি ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত
করেছেন। তখন মানুষের মধ্যে কোনো হিংসা, লোভ,
কৃত্রিমতা বা দ্বন্দ্ব ছিল না। মানুষ ছিল স্বাধীন ও
স্বনির্ভর।
- কিন্তু মানুষের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত
সম্পত্তির ধারণার (Private Property) উদ্ভবের
সাথে সাথে এই শান্তিতে ছেদ ঘটে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি সমাজে বৈষম্য, লোভ, হিংসা ও অশান্তি
নিয়ে আসে।
২. চুক্তির
প্রেক্ষাপট
- ব্যক্তিগত সম্পত্তি সৃষ্টির ফলে সমাজে যখন
ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়, তখন
মানুষ এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।
- রুশো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে বলেছেন: “মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কিন্তু সে সর্বত্রই শৃঙ্খলিত।” এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে কীভাবে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ
ও রাষ্ট্র গঠন করা যায়—তার উপায় হিসেবে তিনি চুক্তির প্রস্তাব করেন।
৩. চুক্তির
প্রকৃতি ও রূপরেখা
- থমাস হবস বা জন লকের চুক্তি থেকে রুশোর চুক্তির
পার্থক্য রয়েছে। রুশোর চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট শাসক বা রাজার সাথে হয় না।
- সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি তার সমস্ত ক্ষমতা, অধিকার ও সত্তা কোনো একক ব্যক্তি বা রাজার কাছে
সমর্পণ করে না। বরং সবাই মিলে সমষ্টিগতভাবে নিজেদের সমস্ত অধিকার সমগ্র
সমাজের কাছে অর্পণ করে।
- অর্জনের জন্যই বর্জন ছিল রুশোর চুক্তির মূলকথা।
অর্থাৎ মানুষ প্রাকৃতিক স্বাধীনতা ত্যাগ করে তার বিনিময়ে অধিকতর নিরাপদ ও
উন্নত ‘নাগরিক স্বাধীনতা’ লাভ করে।
৪. সাধারণ
ইচ্ছা (General Will)
- রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদের সবচেয়ে মৌলিক ধারণা
হলো ‘সাধারণ
ইচ্ছা’ (General Will)।
- সাধারণ ইচ্ছা হলো ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে
সমগ্র সম্প্রদায়ের কল্যাণ বা মঙ্গল সাধন করার সম্মিলিত ইচ্ছা।
- জনগণ যখন সাধারণ ইচ্ছা অনুযায়ী আইন তৈরি করে এবং তা
মেনে চলে, তখন তারা মূলত নিজেদেরই তৈরি করা নিয়ম মেনে চলে—যা
তাদের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
৫.
সার্বভৌমত্ব (Popular Sovereignty)
- রুশোর তত্ত্বে সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো রাজা বা
সম্রাটের হাতে থাকে না।
- সার্বভৌম ক্ষমতা থাকে জনগণের হাতে (জনপ্রিয়
সার্বভৌমত্ব বা Popular Sovereignty)। এই সার্বভৌমত্ব অবিভাজ্য ও হস্তান্তরযোগ্য নয়।