POL-206 Government and Politics in Bangladesh বাংলাদেশে সরকার ও রাজনীতি (PROFESSOR DR. MD. SHAMSUL ALAM)
১৯৭১
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়, যা বিভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি পর্যায়ে যুদ্ধের কৌশল, সংগঠন ও কার্যক্রমে পরিবর্তন এসেছে। নিচে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান পর্যায়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
:
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনা করে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে গণহত্যা শুরু করে1।
শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে1।
চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহী সেনা ও সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে1।
:
যুদ্ধের প্রথম দিকে প্রতিরোধ ছিল অসংগঠিত ও এলোমেলো1।
১০ই এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্য দেশকে ৪টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়2।
১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়1।
পর্যায়
সময়কাল
প্রধান বৈশিষ্ট্য
যুদ্ধের সূচনা ও গণহত্যা
মার্চ – এপ্রিল
অপারেশন সার্চলাইট, গণহত্যা, স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ
অসংগঠিত প্রতিরোধ ও সংগঠন
এপ্রিল – জুন
সরকার গঠন, অঞ্চল ভাগ, সংগঠিত প্রতিরোধ
সেক্টর ভাগ ও গেরিলা যুদ্ধ
জুলাই – সেপ্টেম্বর
১১ সেক্টর, গেরিলা যুদ্ধ, প্রশিক্ষণ
সম্মুখ যুদ্ধ ও মুক্তাঞ্চল বিস্তার
অক্টোবর – ডিসেম্বর
সীমান্তঘাঁটি দখল, সম্মুখ যুদ্ধ, ভারতীয় সেনার অংশগ্রহণ
বিজয় ও সমাপ্তি
ডিসেম্বর
আত্মসমর্পণ, স্বাধীনতা অর্জন
এই পর্যায়গুলোতে মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ জনগণ, ছাত্র-যুবক, এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রাখে, যার ফলে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে12।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কয়েকটি স্বতন্ত্র পর্যায়ে বিভক্ত ছিল:
প্রাথমিক পর্যায় (মার্চ-এপ্রিল ১৯৭১)
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এই পর্যায়। অসহযোগ আন্দোলন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড 'অপারেশন সার্চলাইট' দিয়ে এই পর্যায়ের সূচনা।
সংগঠন পর্যায় (এপ্রিল-জুন ১৯৭১)
১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ। মুক্তিবাহিনী গঠন, ১১টি সেক্টরে দেশ বিভাজন এবং সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ। এই সময় প্রবাসী সরকার ভারতে আশ্রয় নেয় এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে।
গেরিলা যুদ্ধের পর্যায় (জুন-অক্টোবর ১৯৭১)
মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা কৌশল অবলম্বন করে। বিভিন্ন সেক্টরে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা। এই সময় নৌ-কমান্ডোদের সাহসী অভিযান, বিশেষত 'অপারেশন জ্যাকপট' সংঘটিত হয়।
প্রচণ্ড যুদ্ধের পর্যায় (নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৭১)
৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যৌথ বাহিনী গঠন। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী একসাথে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ঢাকা অভিমুখে দ্রুত অগ্রসর হওয়া।
বিজয়ের পর্যায় (১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১)
১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জেনারেল নিয়াজীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে যুদ্ধ সমাপ্তি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন।
এই পুরো ৯ মাসের যুদ্ধে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হন এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ঐতিহাসিক সংগ্রাম, যা মূলত তিনটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। এই পর্যায়গুলো নিম্নরূপ:
### ১. **প্রাথমিক পর্যায় (মার্চ – এপ্রিল ১৯৭১)**
- **৭ মার্চের ভাষণ:** বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যা স্বাধীনতার ডাক হিসেবে বিবেচিত হয়।
- **২৫ মার্চের গণহত্যা:** পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে ঢাকাসহ সারাদেশে নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়।
- **২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা:** বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এরপর তাকে গ্রেফতার করা হয়।
- **গেরিলা যুদ্ধের সূচনা:** মুক্তিকামী বাঙালিরা স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মুক্তিবাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
### ২. **সংগঠিত প্রতিরোধ পর্যায় (মে – সেপ্টেম্বর ১৯৭১)**
- **মুক্তিবাহিনীর গঠন:** এপ্রিল-মে মাসে ভারতের সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী (Muktibahini) সংগঠিত হয়। বাঙালি সৈন্য, পুলিশ, ইপিআর সদস্য ও সাধারণ জনতা এতে যোগ দেয়।
- **গেরিলা যুদ্ধের বিস্তৃতি:** মুক্তিবাহিনী ১১টি সেক্টরে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা আক্রমণ চালায়। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে (কুমিল্লা, সিলেট, যশোর) তীব্র যুদ্ধ হয়।
- **স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন:** ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (মুজিবনগর) অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
### ৩. **চূড়ান্ত আক্রমণ ও বিজয় পর্যায় (অক্টোবর – ডিসেম্বর ১৯৭১)**
- **মিত্রবাহিনীর সমর্থন:** ভারত বাংলাদেশের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেয় (৩ ডিসেম্বর থেকে)। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ তীব্র করে।
- **নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ:** ডিসেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে যৌথ বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয়। গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো হয় যশোর, কুষ্টিয়া, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুরে।
- **১৬ ডিসেম্বর বিজয়:** ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। লে. জেনারেল এ. কে. নিয়াজি মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ পত্রে স্বাক্ষর করেন।
### বিশেষ ঘটনাবলি:
- **অপারেশন জ্যাকপট:** নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী সমগ্র দেশে সমন্বিত গেরিলা আক্রমণ চালায়।
- **বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড:** ডিসেম্বরের ১৪-১৫ তারিখে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা (রাজাকার, আল-বদর) বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে।
মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২-৩ লক্ষ নারী নির্যাতনের শিকার হন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এক জটিল ও ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, যা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বিভক্ত। নিচে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান পর্যায়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
🟠 ১. রাজনৈতিক উত্তেজনা ও দ্বন্দ্ব (১৯৭০-১৯৭১ সালের মার্চ)
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়।
পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি।
শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ (১৯৭১): “এইবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম...”
২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’: পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরু।
🔴 ২. মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও সরকার গঠন (মার্চ – এপ্রিল ১৯৭১)
২৬ মার্চ: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
পুরো দেশজুড়ে গণআন্দোলন ও প্রতিরোধ শুরু হয়।
এপ্রিল ১৭: বৈদ্যনাথতলায় (মেহেরপুরে) “মুজিবনগর সরকার” গঠিত হয়।
🟡 ৩. সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ (এপ্রিল – জুন ১৯৭১)
বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়।
মুক্তিবাহিনীর গঠন শুরু:
সেনাবাহিনীর সদস্য, সাধারণ মানুষ, ছাত্র-যুবক, প্রবাসী বাঙালিদের অংশগ্রহণ।
ভারত সরকার বাংলাদেশিদের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে।
🟢 ৪. মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত পর্ব (জুলাই – সেপ্টেম্বর ১৯৭১)
সেক্টর ভিত্তিক যুদ্ধ: ১১টি সেক্টরে যুদ্ধ পরিচালিত হয়।
ভারতীয় সীমান্তবর্তী ঘাঁটি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান চলতে থাকে।
মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনী (Mukti Bahini ও Mujib Bahini) সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যায়।
🔵 ৫. চূড়ান্ত সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক চাপ (অক্টোবর – নভেম্বর ১৯৭১)
মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতি শুরু।
বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন বাড়তে থাকে।
পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়ন বৃদ্ধি পায়।
🟣 ৬. ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ও বিজয় (ডিসেম্বর ১৯৭১)
৩ ডিসেম্বর: পাকিস্তান ভারতের ওপর আক্রমণ করে – শুরু হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ।
৬ ডিসেম্বর: ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
১৬ ডিসেম্বর: ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
✅ বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় ও স্বাধীনতা অর্জন।
১৯৭২
১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার একটি চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, শরণার্থী পুনর্বাসন, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা—এসব ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। নিচে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রধান ভূমিকা ও কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হলো:
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে এসে প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন256।
১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে অস্থায়ী সংবিধান আদেশের মাধ্যমে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয় এবং ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে পূর্ণ সংবিধান গৃহীত হয়34।
প্রশাসনিক পুনর্গঠন, বিচার বিভাগ পুনঃস্থাপন, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র জমা ও পুনর্বাসন, এবং সরকারি চাকরিতে জেলা-ভিত্তিক কোটাপদ্ধতি চালু করা হয়34।
যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়1245।
রাষ্ট্রায়ত্তকরণ নীতির আওতায় ৮৬% শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা, জুট মিল, টেক্সটাইল, গ্যাস ফিল্ড ইত্যাদি জাতীয়করণ করা হয়15।
ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমিতে কর মওকুফ, কৃষি উপকরণ বিতরণ, এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ শুরু হয়145।
৪টি মৌলিক নীতির (জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র) ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার ঘোষণা দেওয়া হয়1।
৪০,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, ১১,০০০ নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা, ছাত্রদের জন্য বিনামূল্যে বই বিতরণ, এবং শিক্ষা সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়4।
নারীদের পুনর্বাসনের জন্য মহিলা পুনর্বাসন কেন্দ্র, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট, শ্রমিকদের জন্য প্রথম শ্রমনীতি প্রণয়ন ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম চালু করা হয়34।
বাংলাদেশকে বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়, জাতিসংঘ ও নিরপেক্ষ আন্দোলনে (NAM) সদস্যপদ অর্জন24।
ভারতের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি, যুদ্ধবন্দী বিনিময়, এবং পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাংলাদেশি নাগরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা24।
আন্তর্জাতিক সহায়তা ও উন্নয়নমূলক সাহায্য সংগ্রহের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে সফর25।
স্বাধীনতাবিরোধী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যতীত অধিকাংশ দেশীয় সহযোগীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা4।
মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সামরিক ও পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন23।
খাত
কার্যক্রম ও অর্জন
প্রশাসন
সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় শাসন, বিচার বিভাগ পুনঃস্থাপন
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সংবিধান প্রণয়ন ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি স্থাপন
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়, যা ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। এই সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা - এই চার মূলনীতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কর্মসূচি
যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থাকাঠামো পুনর্নির্মাণ, রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, এবং বন্দর সুবিধা চালু করার জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ। বিদেশি সাহায্য সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সাথে সহযোগিতা স্থাপন।
জাতীয়করণ নীতি বাস্তবায়ন
বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলো জাতীয়করণ করা হয়। পাকিস্তানি ও অবাঙালি মালিকানাধীন সম্পত্তি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন
ভারত, ভুটান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পর অন্যান্য দেশের স্বীকৃতি আদায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের প্রচেষ্টা।
শরণার্থী পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন
প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর দেশে ফিরে আসা এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালনা।
শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক নীতি
প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা হয় এবং বাংলা ভাষাকে সকল ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার নীতি গ্রহণ। রবীন্দ্রসংগীতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বাঙালি সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহ প্রদান।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
যুদ্ধ-পরবর্তী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার মূলত একটি নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের মহাকর্মযজ্ঞে নিয়োজিত ছিল।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার হিসেবে **শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার** দেশ পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি সচল করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। নিচে তাঁর সরকারের ভূমিকা ও উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমগুলো তুলে ধরা হলো:
---
### **১. দেশ পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা**
- **যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো মেরামত:** স্বাধীনতার পর দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা, সেতু, রেলওয়ে ও শিল্পকারখানা ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল। সরকার দ্রুত পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু করে।
- **প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস:** পাকিস্তানি আমলের প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কার করে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী প্রশাসন গঠন করা হয়।
- **ফেরত আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসন:** ১৯৭১ সালে প্রায় **১ কোটি শরণার্থী** ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।
---
### **২. সংবিধান প্রণয়ন ও আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা**
- **বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন (১৯৭২):**
- ১৯৭২ সালের **৪ নভেম্বর** বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয় এবং **১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২** (বিজয় দিবস) থেকে এটি কার্যকর হয়।
- সংবিধানে **জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা**—এই চার মূলনীতিকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
- **আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা:**
- যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য **আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)** গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হয় (যদিও তা বাস্তবায়িত হয় অনেক পরে)।
- **রাজাকার, আল-বদর ও শান্তি কমিটির সদস্যদের বিচারের** উদ্যোগ নেওয়া হয়।
---
### **৩. অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও নীতি প্রণয়ন**
- **যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার:**
- শিল্প, কৃষি ও যোগাযোগ খাত পুনর্গঠনে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু হয়।
- **বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক** ও **বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক** প্রতিষ্ঠা করা হয় (১৯৭২)।
- **সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মডেল:**
- মুজিব সরকার **সমাজতান্ত্রিক নীতি** গ্রহণ করে, যেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় শিল্প ও ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়।
- **বেসরকারি খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ** বৃদ্ধি করা হয়।
- **ভারত ও অন্যান্য দেশের সহযোগিতা:**
- ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কাছ থেকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়।
---
### **৪. শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন**
- **শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার:**
- প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়।
- **বাংলাকে সরকারি ভাষা** হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় (১৯৭২ সালের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত)।
- **সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ:**
- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়।
- **বাংলা একাডেমি** ও **শিল্পকলা একাডেমি**কে শক্তিশালী করা হয়।
- **স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন:**
- গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতাল পুনর্গঠনে জোর দেওয়া হয়।
---
### **৫. বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি**
- **জাতিসংঘ ও OIC-এ সদস্যপদ লাভ:**
- ১৯৭২ সালের **১৭ সেপ্টেম্বর** বাংলাদেশ **জাতিসংঘের সদস্য** হয়।
- **ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা (OIC)**-তেও যোগদান করে।
- **ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক:**
- ১৯৭২ সালের **১৯ মার্চ** **ইন্দিরা গান্ধী-মুজিব চুক্তি** স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার ও সীমান্ত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়।
- **মৈত্রী চুক্তি (১৯৭২)** স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করে।
---
### **৬. চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা**
- **অর্থনৈতিক সংকট:**
- যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরগতির ছিল।
- **রাজনৈতিক অস্থিরতা:**
- কিছু বামপন্থী ও ডানপন্থী গোষ্ঠী মুজিব সরকারের বিরোধিতা করে।
- **১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ:**
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও খাদ্য সংকটের কারণে ১৯৭৪ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
---
### **সর্বোপরি, ১৯৭২ সালে মুজিব সরকারের প্রধান সাফল্য:**
✅ একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করা।
✅ গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা।
✅ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা।
✅ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করা।
যদিও অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে গিয়ে পরবর্তীতে **১৯৭৫ সালে এক ঘাতক চক্রের হাতে শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন**, তবুও ১৯৭২ সালে তাঁর সরকারের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার জাতীয় পুনর্গঠন, সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিচে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের প্রধান ভূমিকা ও কার্যক্রমগুলো তুলে ধরা হলো:
🟢 ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের ভূমিকা ও কার্যক্রম
🔶 ১. স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও সরকার গঠন
১০ জানুয়ারি ১৯৭২: বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন।
১২ জানুয়ারি ১৯৭২: বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়।
🔶 ২. সংবিধান প্রণয়ন
একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ।
৪ নভেম্বর ১৯৭২: গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২: সংবিধান কার্যকর হয়।
🔶 ৩. জাতীয় পুনর্গঠন ও পূনর্বাসন
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামো পুনর্গঠন শুরু।
প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন।
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার, গৃহহীনদের জন্য পুনর্বাসন কার্যক্রম।
🔶 ৪. শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার
শিক্ষা কমিশন গঠন (কুদরত-এ-খুদা কমিশন)।
শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও বিজ্ঞানভিত্তিকতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত ও কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পদক্ষেপ।
🔶 ৫. অর্থনৈতিক জাতীয়করণ
ফেব্রুয়ারি ১৯৭২: ২৫টি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
ব্যাংক, বিমা, ও বিদেশি মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ।
সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনের উদ্যোগ।
🔶 ৬. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনীতি
১৯৭২ সালের মধ্যে ১০০টিরও বেশি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
আগস্ট ১৯৭২: বাংলাদেশ জাতিসংঘে সদস্যপদ চাইলেও চীন ভেটো দেয়।
🔶 ৭. যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ
যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করতে “বিশেষ ট্রাইব্যুনাল” গঠন।
রাজাকার, আলবদর, আলশামস সদস্যদের গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু।
🔶 ৮. সংঘটন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গঠন
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বর্তমান বিজিবি) পুনর্গঠন।
রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি।
🔚 উপসংহার:
১৯৭২ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য পুনর্গঠন, স্বীকৃতি অর্জন ও একটি জাতির কাঠামোগত ভিত্তি স্থাপনের বছর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই সময়ের কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতের জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী: রাজনীতিতে একটি মাইলফলক
বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী (১৯৭৫) দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও বিতর্কিত মাইলফলক। এ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক কাঠামো এবং মৌলিক অধিকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়।
মূল পরিবর্তনসমূহ ও তাৎপর্য:
সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়। রাষ্ট্রপতির হাতে সর্বময় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় এবং তাকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ নয়, বরং রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জন্য তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের সমর্থনের বিধান রাখা হয়, যা তাকে কার্যত অপসারণ-অযোগ্য করে তোলে25।
বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রবর্তন করা হয়। রাষ্ট্রপতি চাইলে দেশের সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একটি জাতীয় দল গঠন করতে পারেন, এবং সরকারি কর্মচারীরাও সেই দলে সদস্য হতে পারেন। জাতীয় দলের মনোনয়ন ছাড়া কেউ রাষ্ট্রপতি বা সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না235।
জাতীয় সংসদের ক্ষমতা খর্ব করা হয় এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়। সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার এখতিয়ার থেকেও বঞ্চিত হয়। বিচারক নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির হাতে চলে যায়15।
সংবিধানের একাধিক অনুচ্ছেদ ও তফসিল সংশোধন করা হয় এবং নতুন অনুচ্ছেদ সংযুক্ত হয়1।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব:
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ভারসাম্য ভেঙে পড়ে এবং কার্যত একনায়কতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয়। মওদুদ আহমদ লিখেছেন, “চতুর্থ সংশোধনীর ফলে এত দিনের সংগ্রামে গড়ে তোলা রাষ্ট্রের সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এক আঘাতে চুরমার হয়ে যায় এবং দেশের একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভ্যুদয় সূচিত হয়”2।
মানুষের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ হয় এবং বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়4।
আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠনের পথ উন্মুক্ত হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হন45।
এই সংশোধনীকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী বলে রায় দিয়েছে1।
উপসংহার:
চতুর্থ সংশোধনী বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায়। এটি গণতান্ত্রিক কাঠামো থেকে একদলীয় ও কেন্দ্রীভূত শাসনের দিকে রাষ্ট্রকে নিয়ে যায়, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আজও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত ও সমালোচিত12345।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী পাস হয়, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নির্ণায়ক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সংশোধনী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে।
প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি প্রবর্তন
সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সমস্ত নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী হন। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় এবং রাষ্ট্রপতি সরকারের সর্বোচ্চ নির্বাহী হন।
একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা
বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করে সকল রাজনৈতিক দলকে এর অধীনে আনার ব্যবস্থা করা হয়। অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করা হয় অথবা বাকশালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গণমাধ্যমে সরকারি নিয়ন্ত্রণ
চারটি সরকারি পত্রিকা ছাড়া অন্য সব পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। তথ্য প্রবাহ সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
বিচার বিভাগীয় পরিবর্তন
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হ্রাস পায় এবং নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। বিচারকদের নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়।
সংশোধনীর যুক্তি ও কারণ
তৎকালীন পরিস্থিতিতে দেশে খাদ্য সংকট, অর্থনৈতিক সমস্যা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই পরিবর্তন আনা হয় বলে দাবি করা হয়। দ্রুত উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
এই সংশোধনী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তী দশকগুলোতে সামরিক শাসন ও একনায়কতন্ত্রের জন্য একটি নজির স্থাপিত হয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা পরবর্তী রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।
বিতর্ক ও মূল্যায়ন
চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। সমর্থকরা এটিকে তৎকালীন সংকট মোকাবেলার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন, অন্যদিকে সমালোচকরা এটিকে গণতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
এই সংশোধনী বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে।
### **সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী (১৯৭৫): একটি রাজনৈতিক মাইলফলক**
১৯৭৫ সালের **২৫ জানুয়ারি** বাংলাদেশের সংবিধানে **চতুর্থ সংশোধনী** পাস হয়, যা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করে। এই সংশোধনী প্রধানত **বাকশাল** (Bangladesh Krishak Sramik Awami League) গঠনের মাধ্যমে **একদলীয় শাসনব্যবস্থা** প্রবর্তন করে এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। এটি শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের একটি বিতর্কিত ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।
---
## **প্রধান পরিবর্তনসমূহ ও প্রভাব**
### ১. **বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিলুপ্তি ও একদলীয় শাসন (বাকশাল)**
- **রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ:** চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে **সরকারি দল (বাকশাল) ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ** করা হয়।
- **একদলীয় শাসন:** শেখ মুজিব যুক্তি দিয়েছিলেন যে বহুদলীয় রাজনীতি দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তাই জাতীয় ঐক্যের জন্য বাকশাল গঠন করা প্রয়োজন।
- **সমালোচনা:** বিরোধী দলগুলোর মতে, এটি ছিল **গণতন্ত্রের উপর আঘাত** এবং মুজিবের স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার প্রকাশ।
### ২. **সংসদীয় থেকে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার**
- **প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত:** সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে **রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা** চালু হয়। রাষ্ট্রপতি হন **সরকার ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী**।
- **ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণ:** রাষ্ট্রপতির হাতে আইন প্রণয়ন, প্রশাসন ও নীতি নির্ধারণের সম্পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়।
### ৩. **মৌলিক অধিকার সীমিতকরণ**
- **বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হ্রাস:** সংবিধানের **৩৮ নং অনুচ্ছেদ** সংশোধন করে বিরোধী মত প্রকাশের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।
- **হেফাজত আইনের বিধান:** রাষ্ট্রপতির আদেশে **বিনা বিচারে আটক** রাখার ব্যবস্থা চালু হয়, যা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার কারণ হয়।
### ৪. **বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হ্রাস**
- **সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কমানো:** রাষ্ট্রপতি বিচারক নিয়োগ ও প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের ক্ষমতা পান।
- **মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে বাধা:** নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আদালতের ভূমিকা সীমিত করা হয়।
---
## **চতুর্থ সংশোধনীর পটভূমি**
- **১৯৭৪-৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা:** অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ (১৯৭৪), এবং বাম-ডানপন্থী গোষ্ঠীর সহিংস আন্দোলনে দেশ অস্থির হয়ে পড়ে।
- **মুজিবের হতাশা:** মুজিব সরকারের ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও, বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা ও ষড়যন্ত্রের আশঙ্কায় তিনি **"দ্বিতীয় বিপ্লব"** ঘোষণা করেন এবং একদলীয় ব্যবস্থাকে সমাধান হিসেবে দেখেন।
- **আন্তর্জাতিক প্রভাব:** কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, **সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর (সোভিয়েত ইউনিয়ন, কিউবা) মডেল** অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছিল।
---
## **পরিণতি ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন**
✅ **ইতিবাচক দিক (মুজিব সরকারের যুক্তি):**
- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে মনোনিবেশ।
- দলীয় কোন্দল কমিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠন।
❌ **নেতিবাচক দিক:**
- **গণতন্ত্রের অবসান:** বহুদলীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা।
- **মুজিবের জনপ্রিয়তা হ্রাস:** অনেক বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মী এই সিদ্ধান্তে হতাশ হন।
- **১৫ আগস্টের পটভূমি:** ১৯৭৫ সালের **১৫ আগস্ট** সেনাবাহিনীর একাংশের হাতে মুজিব সপরিবারে নিহত হন, যা অনেকের মতে চতুর্থ সংশোধনীর পরিণতি।
### **পরবর্তী সংশোধনী ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা**
- **১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার** হয় (১২তম সংশোধনী)।
- বর্তমানে চতুর্থ সংশোধনীকে **গণতন্ত্রের জন্য একটি অন্ধকার অধ্যায়** হিসেবে দেখা হয়, যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ একে **জাতীয় সংকটকালীন একটি জরুরি পদক্ষেপ** বলে ব্যাখ্যা করেন।
---
### **উপসংহার**
চতুর্থ সংশোধনী ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি **মাইলফলক কিন্তু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত**, যা গণতন্ত্রকে স্থগিত করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনের শেষ পর্যায়ের নাটকীয় পরিবর্তনের প্রতীক এবং আজও রাজনৈতিক আলোচনায় এর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী (১৯৭৫) রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে আমূল পরিবর্তন করেছিল।
🟥 সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী: রাজনীতিতে একটি মাইলফলক
🔶 সংশোধনীর তারিখ:
২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫
🔶 মূল বিষয়বস্তু:
১. রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা চালু:
সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু হয়।
রাষ্ট্রপতি হন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী, আইনপ্রণেতা ও সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক।
২. জাতীয় সংসদের ক্ষমতা খর্ব:
সংসদের স্বাধীনতা ও তদারকি ক্ষমতা কমে যায়।
বিচার বিভাগ ও প্রশাসন কার্যত রাষ্ট্রপতির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন:
বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) গঠন বাধ্যতামূলক হয়।
অন্যান্য রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়।
গণমাধ্যম ও মত প্রকাশে নিয়ন্ত্রণ:
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়।
কেবল ৪টি পত্রিকা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলার অনুমতি পায় (যেমন: দ্য বাংলাদেশ টাইমস, দৈনিক বাংলা ইত্যাদি)।
🟨 রাজনীতিতে প্রভাব ও তাৎপর্য:
✅ ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে:
দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা ও চক্রান্ত দমনে কঠোর কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল।
বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি একীভূত ও কর্মক্ষম প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে।
❌ নেতিবাচক প্রভাব:
গণতন্ত্র ও বহুদলীয় রাজনীতির বিলুপ্তি ঘটে।
মত প্রকাশ ও বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়।
রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নতুন অসন্তোষ ও চক্রান্ত সৃষ্টি করে।
পরবর্তীকালে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পথ প্রশস্ত করে।
🔚 উপসংহার:
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ও বিতর্কিত মোড়। এটি একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আনার প্রয়াস ছিল, অন্যদিকে গণতন্ত্রের মূল্যবোধ ও সাংবিধানিক ভারসাম্য ধ্বংস করে দেয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ গণতন্ত্র থেকে একনায়কতন্ত্রের পথে এগিয়ে যায়।
১৯৭৫ সালের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের কারণসমূহ
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান ঘটে দেশকে গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে। এই অভ্যুত্থানের পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করে, যা নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. রাজনৈতিক অস্থিরতা ও একদলীয় শাসনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করেন, যা বহুদলীয় গণতন্ত্রকে বিলুপ্ত করে। এই পদক্ষেপ অনেক রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
বাকশালের মাধ্যমে রাজনৈতিক অধিকার সীমিত হওয়া, বিরোধী দল ও মতপ্রকাশের সুযোগ বন্ধ হওয়া সামরিক ও রাজনৈতিক মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
২. অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ
১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে এবং সরকারের প্রতি আস্থা কমে যায়।
অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হওয়ায় সামরিক বাহিনীর মধ্যেও অসন্তোষ ও হতাশা বাড়ে।
৩. সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ
১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে জুনিয়র অফিসার ও মধ্য সারির সেনাদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, যেখানে অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ ছিল।
অনেক সেনা অফিসার মনে করতেন তাদের অবহেলা করা হচ্ছে এবং তারা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্তি চান।
সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা অভ্যুত্থানে সরাসরি জড়িত না থাকলেও, বরখাস্তকৃত কর্মকর্তারা অভ্যুত্থানে অংশ নেন।
৪. ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত
শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী ও মন্ত্রীদের মধ্যে মতবিরোধ এবং ক্ষমতার জন্য লড়াই চলছিল।
খন্দকার মোশতাক আহমেদসহ কিছু রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিরা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন।
৫. বিদেশি প্রভাব ও কূটনৈতিক চাপ
কিছু তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সমর্থন ছিল, যা তখনকার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির অংশ ছিল।
প্রতিবেশী দেশ ভারত ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ও কূটনৈতিক চাপও অভ্যুত্থানের পেছনে প্রভাব ফেলেছিল।
৬. সামরিক অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা ও শৃঙ্খলা সংকট
১৫ আগস্টের পরপরই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বর আরও অভ্যুত্থান ঘটে, যা সামরিক বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব সংকটের প্রতিফলন।
অভ্যুত্থানের পর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ ও দাঙ্গার অবস্থা দীর্ঘদিন টিকে থাকে।
সংক্ষেপে কারণসমূহ
কারণ
বর্ণনা
একদলীয় শাসনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া
বাকশাল প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক অধিকার হ্রাস
অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক অবস্থা
সামরিক বাহিনীর অসন্তোষ
মধ্য সারির অফিসারদের অবহেলা, শৃঙ্খলা সংকট
রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ
ক্ষমতার লড়াই, রাজনৈতিক সংঘাত
বিদেশি প্রভাব
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ ও সম্ভাব্য সমর্থন
অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা
১৫ আগস্টের পর ৩ ও ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান, শৃঙ্খলা সংকট
১৯৭৫ সালের এই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা দেশের গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে126.
১৯৭৪-৭৫ সালে বাংলাদেশ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকটে লাখো মানুষের মৃত্যু, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান চরমভাবে অবনতি ঘটে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা হ্রাস পায় এবং ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
চতুর্থ সংশোধনী ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস
১৯৭�৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করা হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার ফলে ব্যাপক রাজনৈতিক অসন্তোষ দেখা দেয়।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিভক্তি
দলের মধ্যে তীব্র গ্রুপিং, ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। অনেক প্রবীণ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা নেতৃত্বের সাথে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েন। দলের মধ্যে ঐক্যের অভাব এবং বিভিন্ন উপদলের সৃষ্টি সরকারের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি
দেশজুড়ে চুরি, ডাকাতি, হত্যাকাণ্ড এবং নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করে। রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়।
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিস্তার
সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি, ত্রাণের অর্থ আত্মসাৎ, চোরাচালান এবং স্বজনপ্রীতির কারণে জনগণের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার ও লুটপাটের ঘটনা সরকারের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করে।
সেনাবাহিনীর অসন্তোষ ও অবহেলা
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনা কর্মকর্তাদের অনেকে সরকারের নীতি ও আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। সেনাবাহিনীর প্রতি অবহেলা, রক্ষীবাহিনীকে অধিক গুরুত্ব প্রদান এবং কিছু সেনা কর্মকর্তার পদোন্নতিতে বৈষম্য অসন্তোষ বৃদ্ধি করে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও শীতল যুদ্ধের প্রভাব
১৯৭০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী শীতল যুদ্ধের প্রভাব এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির গোপন মদদ ও হস্তক্ষেপ অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করে।
যুব সমাজ ও ছাত্রদের হতাশা
স্বাধীনতার পর তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা যুব সমাজের মধ্যে ব্যাপক হতাশা সৃষ্টি করে। ছাত্র রাজনীতিতে অস্থিরতা এবং সহিংসতার বৃদ্ধি সামাজিক অশান্তি বাড়ায়।
বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের বিক্ষোভ
শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজের অনেকেই সরকারের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে তাদের সোচ্চার প্রতিবাদ জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে।
এই সমস্ত কারণ একসাথে মিলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক অশান্তির মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি অংশ ক্ষমতা দখলের সুযোগ পায়।
১৯৭৫ সালের **১৫ আগস্ট** বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক রক্তাক্ত ও নাটকীয় মোড় পরিবর্তন ঘটে, যখন **সেনাবাহিনীর একদল জুনিয়র অফিসার** **শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা** করে এবং ক্ষমতা দখল করে। এই অভ্যুত্থানের পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কারণ জড়িত ছিল। নিচে এর প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
---
## **১. রাজনৈতিক কারণসমূহ**
### **(ক) একদলীয় শাসন ও বাকশাল গঠন (চতুর্থ সংশোধনী, ১৯৭৫)**
- ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে **সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী** পাস করে শেখ মুজিব **বাকশাল (একদলীয় শাসন)** প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে সব বিরোধী দল নিষিদ্ধ হয়।
- **গণতন্ত্র হ্রাস:** সংসদীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে **রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন** চালু করা হয়, যা অনেকের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
- **মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের ভাঙন:** মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও একদলীয় ব্যবস্থার বিরোধিতা করতে থাকেন।
### **(খ) বিরোধী দল ও গোষ্ঠীগুলোর অসন্তোষ**
- **বামপন্থী গোষ্ঠী:** জাসদ, সিপিবি, মাওবাদীরা মুজিবের "সমাজতন্ত্র"-কে ভুয়া মনে করে বিদ্রোহ শুরু করে।
- **ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলো:** ইসলামপন্থীরা (জামায়াতে ইসলামী সহ) মুজিবের **ধর্মনিরপেক্ষতা** নীতির বিরোধিতা করে।
- **সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ:** কিছু অফিসার মনে করতেন মুজিব সরকার সেনাবাহিনীতে "আওয়ামী লীগপন্থী" লোক নিয়োগ দিচ্ছেন।
---
## **২. অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ (১৯৭৪)**
- **১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ:** বন্যা, খাদ্য সংকট ও দুর্নীতির কারণে লক্ষাধিক মানুষ মারা যায়। সরকারের ব্যর্থতা জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
- **অর্থনৈতিক মন্দা:** যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের নীতি (সমাজতান্ত্রিক জাতীয়করণ) সফল হয়নি।
- **দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা:** মুজিব সরকারের কিছু ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও আমলাদের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
---
## **৩. সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল**
### **(ক) সেনাবাহিনীতে বিভেদ**
- **মুক্তিযোদ্ধা vs. পাকিস্তান থেকে ফেরত সেনারা:** কিছু সেনা কর্মকর্তা (যারা পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিলেন) মনে করতেন মুক্তিযোদ্ধারা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে।
- **জুনিয়র অফিসারদের অসন্তোষ:** মেজরদের নেতৃত্বে একদল তরুণ অফিসার (যেমন: **মেজর ফারুক, রশিদ, ডালিম**) ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করে।
### **(খ) ভারত-বিরোধী মনোভাব**
- কিছু সেনা সদস্য ও রাজনীতিবিদ মনে করতেন, **মুজিব সরকার ভারতের অতিমাত্রায় প্রভাবাধীন**। তারা বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে বলে মনে করতেন।
---
## **৪. আন্তর্জাতিক প্রভাব ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব**
- **মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা:** কিছু ঐতিহাসিক দাবি করেন, **সিআইএ** মুজিবের সমাজতান্ত্রিক নীতির বিরোধিতা করছিল।
- **মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল শক্তির ভূমিকা:** মুজিবের **ধর্মনিরপেক্ষতা** নীতির বিরোধিতা করে সৌদি আরব ও পাকিস্তান কিছু গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
---
## **৫. মুজিবের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দুর্বলতা**
- **১৫ আগস্টের দিন:** মুজিব **৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসভবনে** কোনো শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই অবস্থান করছিলেন।
- **বিশ্বাসঘাতকতা:** তাঁর কিছু নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মী ও সেনা সদস্যই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল।
---
## **অভ্যুত্থানের পরিণতি**
- **খন্দকার মোশতাক আহমেদের ক্ষমতা দখল:** মুজিব হত্যার পর তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্য মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হন এবং **ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ (দায়মুক্তি আইন)** পাস করেন, যা হত্যাকারীদের বিচার বন্ধ করে দেয়।
- **সেনাশাসনের সূচনা:** পরবর্তীতে **জেনারেল জিয়াউর রহমান** (১৯৭৭) ও **জেনারেল এরশাদ** (১৯৮২) সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘস্থায়ী বাধা সৃষ্টি করে।
---
### **উপসংহার**
১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান ছিল **বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়**, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলাফল। মুজিব হত্যার মাধ্যমে দেশ **গণতন্ত্র থেকে সেনাশাসনের দিকে** ঝুঁকে পড়ে, যার প্রভাব আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুভূত হয়।
১৯৭৫ সালের বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান একটি ঐতিহাসিক মোড় ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের নাম, যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক চিত্র একেবারে বদলে যায়। এই অভ্যুত্থানের পেছনে একাধিক সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক কারণ কাজ করেছে।
🟥 ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের কারণসমূহ
🔶 ১. চতুর্থ সংবিধান সংশোধন ও একদলীয় শাসনব্যবস্থা
১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা।
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ, বিরোধী মত ও সংবাদপত্র দমন — এতে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়।
জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের সুযোগ নষ্ট হয়।
🔶 ২. সামরিক বাহিনীর অবমূল্যায়ন ও অখুশি
মুক্তিযুদ্ধকালীন অনেক তরুণ অফিসার ও সৈনিক মনে করতেন, বেসামরিক প্রশাসন বা রাজনীতিবিদদের গুরুত্ব বেশি দেওয়া হচ্ছে।
মুক্তিযোদ্ধা ও নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়।
সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও গ্রুপিং স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
🔶 ৩. অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও দুর্নীতি
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছিল।
খাদ্য সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও কালোবাজারি জনঅসন্তোষ তৈরি করে।
সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যায়, যা অভ্যুত্থানকারীদের জন্য সহায়ক হয়।
🔶 ৪. রাজনৈতিক দমননীতি ও নেতৃত্বে বিচ্ছিন্নতা
সংবাদপত্র বন্ধ, বিরোধী নেতাদের দমন এবং বাকশাল বাধ্যতামূলক করায় মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী সমাজ অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে।
অনেক আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা নেতৃত্ব থেকে দূরে সরে যান।
ক্ষমতার অত্যধিক কেন্দ্রীকরণে ভিন্নমতের স্থান সংকুচিত হয়।
🔶 ৫. অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও বিদেশি প্রভাব
কিছু উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।
কিছু আন্তর্জাতিক মহল (বিশেষ করে ঠাণ্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে) বঙ্গবন্ধুর সমাজতান্ত্রিক ও ভারতঘেঁষা নীতিতে অসন্তুষ্ট ছিল।
আন্তর্জাতিক সমর্থন বা নীরবতা অভ্যুত্থানকারীদের আত্মবিশ্বাস জোগায়।
🔶 ৬. নাগরিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতা
রক্ষীবাহিনীর কার্যক্রমে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা হ্রাস পাওয়ায় তারা অসন্তুষ্ট হয়।
🟨 উপসংহার:
১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ছিল একাধিক পুঞ্জীভূত অসন্তোষের বিস্ফোরণ। রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্র, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, সেনাবাহিনীর মধ্যে মতভেদ, ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র মিলে এই বিপর্যয়ের জন্ম দেয়।
এই অভ্যুত্থান শুধু বঙ্গবন্ধুর হত্যাই নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন ধারায় একটি ভয়াবহ বিভাজন সৃষ্টি করে দেয়।
জিয়াউর রহমানের গণতন্ত্র উত্তরণ ও ক্ষমতা অনুমোদনের জন্য গ্রহণকৃত পদক্ষেপসমূহ
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তার ক্ষমতা বৈধতা প্রদানের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার এই উদ্যোগগুলো দেশকে স্বৈরাচার থেকে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রধান পদক্ষেপগুলো নিম্নরূপ:
১. বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন, যা দেশের প্রথম বহুদলীয় রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্যতম।
তিনি বাকশাল বিলুপ্ত করে দেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে নিয়ে আসেন এবং নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করার সুযোগ দেন।
সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করেন, যা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য ছিল2356।
২. রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও জয়লাভ
১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটে বিজয়ী হন, যেখানে মোট ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল।
এই নির্বাচনে তার জয় তাকে গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের বৈধতা প্রদান করে এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনে2।
৩. ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা ও গণভোট
১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যা দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও জনকল্যাণের লক্ষ্যে পরিকল্পিত ছিল।
৩০ মে ১৯৭৮ সালে আস্থা যাচাইয়ের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন, যা তার শাসনের বৈধতা আরও সুদৃঢ় করে23।
৪. বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা
জিয়া বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব প্রবর্তন করেন, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকের ঐক্য ও সংহতির ওপর গুরুত্বারোপ করে।
এই ধারণা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে তোলে26।
৫. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে উদ্যোগ
জিয়াউর রহমান দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন।
শিক্ষা, কৃষি, শিল্পায়ন ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে মনোযোগ দেন5।
সংক্ষেপে জিয়াউর রহমানের পদক্ষেপসমূহ
পদক্ষেপ
বিবরণ
বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
বিএনপি প্রতিষ্ঠা, বাকশাল বিলুপ্তি, রাজনৈতিক দলগুলোর পুনরুজ্জীবন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ
১৯৭৮ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়া
১৯ দফা কর্মসূচি ও গণভোট
দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের জন্য কর্মসূচি ঘোষণা ও গণভোটে সমর্থন
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন
জাতীয় ঐক্য ও সংহতির ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রচার
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
শিক্ষা, কৃষি, শিল্পায়ন ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প গ্রহণ
জিয়াউর রহমানের এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং তার শাসনকে বৈধতা ও স্থিতিশীলতা প্রদান করে2356।
১৯৭৫ সালের নভেম্বরে ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান তার সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ নেন। প্রথমে তিনি ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য গণভোট আয়োজন করেন এবং ৯৮.৮৮% ভোট পেয়ে জনগণের সমর্থন দাবি করেন।
সংবিধান সংশোধন ও ইসলামীকরণ
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে "আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস" সংযোজন করেন। "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" সংবিধানের প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত করে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি রক্ষণশীল এবং ধর্মপ্রাণ মানুষদের সমর্থন লাভ করেন।
বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা
১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে বহুদলীয় রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করেন। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার দাবি করেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন
১৯৭৮ সালে বিএনপি গঠন করে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেন। এই দল গঠনের মাধ্যমে তিনি সামরিক শাসক থেকে রাজনৈতিক নেতায় রূপান্তরিত হওয়ার চেষ্টা করেন এবং ব্যাপক জনসমর্থনের ভিত্তি গড়ে তোলেন।
১৯-দফা কর্মসূচি ঘোষণা
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য ১৯-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচিতে গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মাধ্যমে জনগণের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে যাওয়া
নিজেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সংযুক্ত করেন। "আমি একজন সৈনিক, আপনারা আমাকে রাজনীতির সৈনিক বানিয়েছেন" - এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণের আবেগকে কাজে লাগান।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিকরণ
গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা করে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। উপজেলা ব্যবস্থা চালু করে বিকেন্দ্রীকরণের নামে নিজের ক্ষমতার ভিত্তি আরও মজবুত করেন।
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও প্রচারণা
সরকারি গণমাধ্যমের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালান এবং নিজের ভাবমূর্তি উন্নয়নে কাজ করেন। টেলিভিশন ও রেডিওতে নিয়মিত ভাষণ দিয়ে জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন।
অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি
ব্যক্তিগত খাতকে উৎসাহিত করে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথে হাঁটেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করেন।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন
পশ্চিমা দেশগুলো এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জনের চেষ্টা করেন। চীন ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে ভারত-বিরোধী মনোভাবাপন্ন জনগণের সমর্থন লাভ করেন।
সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা
১৯৭৯ সালের নির্বাচনের পর সংসদীয় সরকার গঠন করে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দাবি করেন। যদিও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার ক্ষমতা অটুট রাখেন, তবুও সংসদীয় কার্যক্রম চালু করে গণতান্ত্রিক চর্চার ভান করেন।
এই সমস্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান সামরিক শাসনকে বেসামরিক রূপ দিয়ে নিজের ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার শাসনামলে যদিও নির্বাচন হয়েছিল, কিন্তু প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা সীমিত ছিল।
জিয়াউর রহমান (১৯৭৫-১৯৮১) বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি জটিল ও বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতায় আসলেও পরবর্তীতে গণতন্ত্রের দিকে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে তার এই পদক্ষেপগুলো কতটা গণতান্ত্রিক ছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নিচে তার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
---
### **১. রাজনৈতিক দলের অনুমোদন ও বহুদলীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন**
- **১৯৭৮ সালে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা:**
- জিয়া **বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)** গঠন করেন, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধান দুটি দলের মধ্যে একটিতে পরিণত হয়।
- এই দলের মাধ্যমে তিনি একটি **বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম** তৈরি করেন, যা আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে।
- **রাজনৈতিক দলের উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল:**
- মুজিব আমলের **একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা** বাতিল করে **বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ সুগম** করেন।
- তবে বিরোধী দলগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।
---
### **২. নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বৈধতা অর্জন**
- **১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন:**
- জিয়া **সেনাপ্রধান থাকাকালীনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা** করেন এবং বিজয়ী হন।
- এই নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো **অনিয়ম ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ**ের অভিযোগ তোলে।
- **১৯৭৯ সালের সংসদীয় নির্বাচন:**
- এই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে।
- নির্বাচনটি **বহুদলীয় ব্যবস্থায় ফেরার একটি পদক্ষেপ** হিসেবে দেখা হয়, যদিও এটি পুরোপুরি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ছিল না।
---
### **৩. সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন**
- **পঞ্চম সংশোধনী (১৯৭৯):**
- মুজিব আমলের **ধর্মনিরপেক্ষতা** নীতিকে পরিবর্তন করে **"বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম"** সংবিধানের প্রস্তাবনায় যুক্ত করা হয়।
- **ধর্মীয় পরিচয়ের উপর জোর** দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা বাড়ায়।
- **সামরিক শাসনের অবসান ও নাগরিক সরকার প্রতিষ্ঠা:**
- ১৯৭৯ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে **সামরিক ইউনিফর্ম ত্যাগ** করে নাগরিক রাষ্ট্রপতিতে পরিণত হন।
- তবে সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা কঠিন ছিল।
---
### **৪. স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ**
- **পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন:**
- জিয়া **স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী** করার জন্য নিয়মিত নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন।
- এর মাধ্যমে তিনি **গ্রামীণ পর্যায়ে তার রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত** করতে চেয়েছিলেন।
---
### **৫. অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বৈদেশিক নীতি**
- **মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝোঁক:**
- মুজিবের **সমাজতান্ত্রিক নীতি** থেকে সরে এসে তিনি **বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত** করেন।
- রপ্তানিমুখী শিল্প ও বৈদেশিক বিনিয়োগে জোর দেওয়া হয়।
- **পশ্চিমা বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সম্পর্ক জোরদার:**
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেন, যা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
---
### **৬. সমালোচনা ও বিতর্ক**
- **গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা:**
- জিয়ার সময়ে **মিডিয়া ও বিরোধী দলগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ** বজায় রাখা হয়েছিল।
- ১৯৭৭ সালে **সেনা অভ্যুত্থান দমন** করে তিনি জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন।
- **সামরিক শাসনের উত্তরাধিকার:**
- তিনি নিজেই **সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন**, তাই তার গণতান্ত্রিক সংস্কারগুলোকে অনেকেই **"নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র"** বলে মনে করেন।
- **হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের অভিযোগ:**
- তার শাসনামলে **বিরোধী নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার ও দমন**-এর অভিযোগ রয়েছে।
- ১৯৭৭ সালে **কর্নেল তাহেরের ফাঁসি** নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
---
### **উপসংহার: জিয়াউর রহমানের ভূমিকা**
জিয়াউর রহমানের শাসনামল **গণতন্ত্রের দিকে একটি রূপান্তরকালীন পর্যায়** ছিল, কিন্তু তা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক বা স্বচ্ছ ছিল না। তার পদক্ষেপগুলো ছিল **"উর্ধ্ব থেকে গণতন্ত্র" (Democracy from Above)**-এর একটি উদাহরণ, যেখানে ক্ষমতাসীন শক্তি কিছু গণতান্ত্রিক সংস্কার করলেও প্রকৃত ক্ষমতা নিজের হাতেই রাখে।
✅ **ইতিবাচক দিক:**
- বহুদলীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন।
- স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ।
- অর্থনৈতিক উদারীকরণ।
❌ **নেতিবাচক দিক:**
- নির্বাচনে অনিয়ম ও বিরোধী দলগুলোর দমন।
- সামরিক শাসনের উত্তরাধিকার বজায় রাখা।
তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে **একটি বিকল্প ধারা তৈরি** করেছিলেন, কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তার আমলে সম্পূর্ণ হয়নি। তার উত্তরসূরি **এরশাদও সামরিক শাসন জারি রাখেন**, এবং বাংলাদেশে পূর্ণ গণতন্ত্র ফিরতে আরও সময় লাগে।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর এক সেনাশাসক হিসেবে ক্ষমতায় এলেও পরবর্তীতে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও তার ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন মোড় সৃষ্টি করে।
🟢 গণতন্ত্র উত্তরণের জন্য ও ক্ষমতার অনুমোদনের জন্য জিয়াউর রহমানের পদক্ষেপসমূহ
🔶 ১. রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের অবস্থান বৈধ করার প্রচেষ্টা
১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়:
প্রশ্ন: "আমি জিয়াউর রহমানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সমর্থন করি কি না?"
সরকার দাবি করে যে প্রায় ৯৮% ভোটার হ্যাঁ ভোট দিয়েছে।
যদিও নির্বাচন কমিশন বা স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের কার্যকর উপস্থিতি ছিল না।
🔶 ২. রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা
১৯৭৫ সালের বাকশাল ব্যবস্থা বাতিল করে বহুদলীয় রাজনীতি পুনরায় চালু করেন।
১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
🔶 ৩. নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা – বিএনপি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল)
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়া বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।
এটি ছিল একটি মুক্তিযুদ্ধ, ইসলামি মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদভিত্তিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
দলটিতে সাবেক আওয়ামী লীগার, মুক্তিযোদ্ধা, বামপন্থী, ডানপন্থী, ইসলামপন্থী সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
🔶 ৪. রাষ্ট্রপতি নির্বাচন – ১৯৭৮
১৯৭৮ সালের ৩ জুন সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করেন।
জিয়া বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন।
এ নির্বাচন ছিল তার ক্ষমতার জনগণের ম্যান্ডেট প্রাপ্তির প্রথম সাংবিধানিক প্রয়াস।
🔶 ৫. ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন
বহুদলীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি।
নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল এবং এতে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
এ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তন হয়।
🔶 ৬. গণতন্ত্রের নামে প্রশাসনিক সংস্কার ও স্থানীয় সরকার উদ্যোগ
“বাড়ির পাশে সরকার” ধারণা প্রচার করে গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেন।
ইউনিয়ন পরিষদ, থানা প্রশাসন ও জেলা পরিষদে নির্বাচনের উদ্যোগ নেন।
🔶 ৭. সংবিধানে পঞ্চম সংশোধনী (১৯৭৯)
সেনাশাসনের সময় (১৯৭৫-১৯৭৯) জারি করা সব রাষ্ট্রপতির আদেশকে বৈধতা প্রদান করা হয়।
এতে জিয়ার শাসনকাল সংবিধানিক বৈধতা পায়।
🔚 উপসংহার:
জিয়াউর রহমান সেনাশাসক হিসেবে ক্ষমতায় এলেও, ধীরে ধীরে নিজেকে গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। তিনি গণভোট, নির্বাচন, দলগঠন, ও সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে তার ক্ষমতার সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুমোদন অর্জনের পথ অনুসরণ করেন।
এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনে একটি বড় ভূমিকা রাখে।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসন আমল মূল্যায়ন
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনামলকে সাধারণত সামরিক একনায়কতন্ত্র হিসেবে দেখা হয়, তবে কিছু উন্নয়নমূলক কাজও তার সরকারের সময় সম্পন্ন হয়েছিল। নিচে তার শাসনামলের প্রধান দিকগুলো মূল্যায়ন করা হলো:
সামরিক অভ্যুত্থান ও ক্ষমতা দখল
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থান করেন এবং সামরিক শাসন জারি করেন।
১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি দেশের শাসনভার নেন এবং সামরিক শাসন চালিয়ে যান126।
রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র
১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ওই বছর সংসদীয় সাধারণ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করান, যেখানে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তবে এই নির্বাচনগুলো ব্যাপক বিতর্কিত ছিল; আওয়ামী লীগ ও জামায়াত অংশগ্রহণ করলেও বিএনপি নির্বাচনে বয়কট করেছিল।
বিরোধী দলের আন্দোলনে চাপ পড়ে ১৯৮৭ সালে সংসদ বাতিল করেন এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে সকল দল বয়কট করে16।
১৯৯০ সালে ব্যাপক গণবিক্ষোভ ও বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে আন্দোলনের ফলে সেনাবাহিনীর সমর্থন না পেয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন12।
প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজ
১৯৮৪ সালে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন, যা স্থানীয় শাসনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।
অবকাঠামো উন্নয়ন, জাতীয়কৃত শিল্পের বেসরকারিকরণ, জাতীয় মহাসড়ক সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেন2।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা (SAARC) প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য2।
ধর্ম ও সংবিধান
১৯৮৯ সালে সংসদে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন, যা বাংলাদেশের মূল সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির পরিপন্থী ছিল এবং ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে2।
সমালোচনা ও বিরোধিতা
তার শাসনামলকে সামরিক একনায়কতন্ত্র হিসেবে দেখা হয়, যেখানে গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত ছিল।
বিরোধী দল ও সাধারণ জনগণের ওপর দমন-পীড়ন, সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হ্রাস পেয়েছিল।
ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নির্বাচনে কারচুপি ও জোরজবরদস্তির অভিযোগ ছিল15।
সংক্ষেপে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলের মূল্যায়ন
দিক
বিবরণ
ক্ষমতা দখল ও সামরিক শাসন
১৯৮২ সালে অভ্যুত্থান, সামরিক শাসন আরোপ, ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ
রাজনৈতিক ব্যবস্থা
জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা, বিতর্কিত নির্বাচন, বিরোধী দল বর্জন ও আন্দোলন
প্রশাসনিক সংস্কার
উপজেলা পদ্ধতি চালু, অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন
ধর্ম ও সংবিধান
ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম ঘোষণা, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির পরিপন্থী
সমালোচনা ও বিরোধিতা
গণতান্ত্রিক অধিকার হ্রাস, দমন-পীড়ন, নির্বাচনে কারচুপি ও দুর্নীতি
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামল বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক শাসনের একটি দীর্ঘ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে কিছু উন্নয়নমূলক কাজের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে126।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি প্রাথমিকভাবে দুর্নীতি নির্মূল ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনমত গঠনের চেষ্টা করেন। সামরিক আইন জারি করে সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কার
এরশাদের অর্থনৈতিক নীতি ছিল মিশ্র প্রকৃতির। তিনি ব্যক্তিগত খাতের বিকাশে উৎসাহ প্রদান করেন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের বেসরকারিকরণ শুরু করেন। রপ্তানি-মুখী শিল্প, বিশেষত পোশাক শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। তার শাসনামলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্থিতিশীলতা অর্জন করে।
বিকেন্দ্রীকরণ ও উপজেলা সিস্টেম
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো উপজেলা প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন। ১৯৮২ সালে স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদ গঠন করে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করেন। এই সিস্টেম আজও বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া
এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। ১৯৮৮ সালে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে এই পরিবর্তন আনা হয়। তবে এই পদক্ষেপ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
জাতীয় পার্টি গঠন ও রাজনৈতিক বৈধতা
১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি গঠন করে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেন। নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের নামে নির্বাচনের আয়োজন করেন, যদিও প্রধান বিরোধী দলগুলো এসব নির্বাচন বয়কট করে। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে বিতর্কিত পদ্ধতিতে জয়লাভ করেন।
শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক নীতি
শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। নারী শিক্ষার প্রসার, কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করেন। তবে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীন চিন্তাধারার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
অবস্থাকাঠামো উন্নয়ন
যমুনা সেতু (বঙ্গবন্ধু সেতু) নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ, প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য কাজ করেন। ঢাকা শহরের উন্নয়নে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেন।
গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও প্রতিরোধ
এরশাদের শাসনামলে ক্রমাগত গণআন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন জোরদার হয়। ১৯৮৭ সালে শিক্ষা সচিবের গাড়ি ঘেরাও থেকে শুরু করে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত তীব্র রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হন।
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি
এরশাদের শাসনামলে ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠে। তার পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা এবং সরকারি পদে অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি করে।
পতন ও মূল্যায়ন
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার শাসনামলের ইতিবাচক দিক হলো অর্থনৈতিক কিছু সংস্কার ও উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন। কিন্তু গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, বাক স্বাধীনতা হ্রাস এবং সামরিক শাসনের কারণে তার শাসন ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
এরশাদের শাসনামল বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। উপজেলা সিস্টেম তার একটি স্থায়ী অবদান। তবে সামরিক শাসনের নেতিবাচক ঐতিহ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।
এরশাদের ৮ বছরের শাসনামল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি জটিল অধ্যায়। যদিও কিছু উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছিল, কিন্তু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এটি একটি অন্ধকার সময় হিসেবে বিবেচিত হয়।
### **হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামল (১৯৮২-১৯৯০): একটি মূল্যায়ন**
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ **১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ** এক রক্তহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এবং **১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর** পর্যন্ত প্রায় **৯ বছর** বাংলাদেশ শাসন করেন। তার শাসনামলকে **সামরিক শাসন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের যুগ** হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিচে তার শাসনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
---
## **১. রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও শাসন কাঠামো**
### **(ক) সামরিক শাসন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র**
- **অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল:**
- এরশাদ **সেনাবাহিনীর প্রধান** থাকাকালীন রাষ্ট্রপতি **আব্দুস সাত্তারকে অপসারণ** করে নিজেকে **প্রধান সামরিক প্রশাসক** ঘোষণা করেন।
- ১৯৮৩ সালে তিনি **রাষ্ট্রপতি হন** এবং ১৯৮৫ সালে **দল গঠন করে (জাতীয় পার্টি)** রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
- **নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণ:**
- **১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন:** এই নির্বাচনে **জাতীয় পার্টি** সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, কিন্তু বিরোধীরা **ভোট কারচুপি** ও জালিয়াতির অভিযোগ তোলে।
- **১৯৮৮ সালের সংসদ নির্বাচন:** প্রধান বিরোধী দলগুলো (আওয়ামী লীগ, বিএনপি) বয়কট করে, ফলে এরশাদের দল এককভাবে ক্ষমতায় থাকে।
### **(খ) বিরোধী দলগুলোর দমন-পীড়ন**
- **আন্দোলন দমনে কঠোর নীতি:**
- ১৯৮৩-১৯৯০ পর্যন্ত **ছাত্র-গণআন্দোলন, হরতাল ও প্রতিবাদ** দমনে পুলিশ ও সেনাবাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নেয়।
- **কারাবন্দি নেতা-কর্মী:** শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়াসহ অনেক রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।
---
## **২. প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার সংস্কার**
### **(ক) উপজেলা ব্যবস্থা চালু**
- **১৯৮২ সালে উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তন:**
- এরশাদ **থানা পর্যায়কে উপজেলায় উন্নীত** করে স্থানীয় শাসনকে বিকেন্দ্রীকরণের চেষ্টা করেন।
- **উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচন** চালু করা হয়, যা স্থানীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
### **(খ) আমলাতন্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ**
- **সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি:**
- আমলাদের মাধ্যমে **রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ** বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
---
## **৩. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্প**
### **(ক) গ্রামীণ উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতা**
- **গ্রামীণ ব্যাংক ও এনজিওদের সম্প্রসারণ:**
- ড. মুহাম্মদ ইউনূসের **গ্রামীণ ব্যাংক**কে সমর্থন দেওয়া হয়, যা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে বেগবান করে।
- **এনজিওগুলোকে উৎসাহিত** করা হয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে।
### **(খ) যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন**
- **মেগা প্রকল্প:**
- **যমুনা সেতুর প্রস্তুতি** (পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে নির্মিত হয়)।
- **ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উন্নয়ন**।
- **পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (REB)** গঠন করে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু।
### **(গ) অর্থনৈতিক উদারীকরণ**
- **বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ:**
- রপ্তানি ও বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া হয়।
---
## **৪. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নীতি**
### **(ক) ইসলামী রাষ্ট্রীয় পরিচয় জোরদার**
- **সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা (১৯৮৮):**
- **৮ম সংশোধনী** পাস করে বাংলাদেশকে **"রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম"** ঘোষণা করা হয়, যা আজও বহাল আছে।
- এটি **ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের মধ্যে বিতর্ক** সৃষ্টি করে।
### **(খ) শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন**
- **মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড স্থাপন:**
- নতুন শিক্ষা বোর্ড তৈরি করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত করা হয়।
- **স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ:**
- উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সম্প্রসারণ।
---
## **৫. পতন ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন**
### **(ক) ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান**
- **ছাত্র-গণআন্দোলন:**
- ১৯৯০ সালে **আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রসংগঠনগুলোর联合** এরশাদবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়।
- **সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য** ও **জাসদ**-এর নেতৃত্বে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
- **ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য:**
- ১৯৯০ সালের **৬ ডিসেম্বর** এরশাদ **রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ** করেন এবং **তত্ত্বাবধায়ক সরকারের** কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
### **(খ) ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক**
✅ **ইতিবাচক দিক:**
- স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ (উপজেলা ব্যবস্থা)।
- গ্রামীণ উন্নয়ন ও ক্ষুদ্রঋণ প্রসার।
- যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন।
❌ **নেতিবাচক দিক:**
- **সামরিক শাসন ও গণতন্ত্র হরণ**।
- **নির্বাচনে কারচুপি ও দমন-পীড়ন**।
- **রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তন** যা ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করে।
---
### **উপসংহার**
এরশাদের শাসনামল **বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি জটিল অধ্যায়**। তিনি কিছু **উন্নয়নমূলক কাজ** করলেও **গণতন্ত্রকে দমনের** চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করে যে **সামরিক শাসন বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়**। তার পতনের পর বাংলাদেশ **পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের** দিকে ফিরে যায়।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত রাষ্ট্রনায়ক। তিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক ও বেসামরিক উভয়ভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনামলকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে মিশ্র একটি চিত্র পাওয়া যায়—একদিকে কিছু উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্র ও রাজনৈতিক দমনপীড়ন।
🟦 হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামল: একটি মূল্যায়ন
🟥 ১. ক্ষমতা দখল ও সামরিক শাসন (১৯৮২)
২৪ মার্চ ১৯৮২: রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এরশাদ সেনাপ্রধান হিসেবে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
সাংবিধানিক সরকার বিলুপ্ত করে সামরিক আইন জারি করেন।
🟨 ২. রাজনৈতিক দমননীতি ও গণতন্ত্র সংকোচন
রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ।
সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশে কড়াকড়ি, সেন্সরশিপ চালু।
আন্দোলনকারী ছাত্র, রাজনৈতিক নেতা, ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর দমনমূলক পদক্ষেপ।
বিভক্ত বিরোধী রাজনীতির সুযোগ নিয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতা কায়েম।
🟩 ৩. দল গঠন ও নির্বাচন আয়োজন
১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি (Jatiya Party) গঠন করে নিজেকে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেন।
১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন, যদিও নির্বাচনগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
নির্বাচন কমিশনের উপর সরকারের প্রভাব ছিল ব্যাপক।
🟦 ৪. উন্নয়নমূলক কর্মসূচি
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন (১৯৮২) – স্থানীয় শাসনে এক নতুন ধারা।
সড়ক, সেচ, জলাধার, কৃষি ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দেন।
প্রাথমিক শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনায় কিছু অগ্রগতি হয়।
🟫 ৫. ইসলামীকরণ নীতি
ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে যুক্ত করেন (১৯৮৮)।
রাজনৈতিকভাবে ইসলামী দল ও গোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের কৌশল হিসেবে ধর্মীয় আদর্শকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যবহার করেন।
🔶 ৬. বিরোধী আন্দোলন ও পতন
১৯৮৭-১৯৮৮ থেকে ছাত্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হয়।
১৯৯০ সালে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলমত নির্বিশেষে একব্যাপক আন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করেন।
৬ ডিসেম্বর ১৯৯০: এরশাদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সেনাবাহিনীর চাপে ও গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন।
🟨 উপসংহার:
দিক
মূল্যায়ন
✅ উন্নয়ন
উপজেলা ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক কাঠামো বিকাশ
❌ নেতিবাচক
সামরিক শাসন, গণতন্ত্র হরণ, রাজনৈতিক দমন, নির্বাচন প্রহসন
⚖️ সামগ্রিক
একটি উন্নয়নমুখী স্বৈরতন্ত্র হিসেবে এরশাদ শাসনকাল ইতিহাসে চিহ্নিত
🔖 মন্তব্য: হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক পরীক্ষার যুগ, যেখানে উন্নয়ন ও কর্তৃত্ব একসাথে সহাবস্থান করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের জয় হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনীসমূহের আলোচনা
বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে এটি দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামো নির্ধারণ করে। স্বাধীনতার পর থেকে সংবিধানে মোট ১৭ বার সংশোধনী আনা হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত12।
প্রধান সংশোধনীগুলোর বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব
প্রথম সংশোধনী (১৯৭৩): মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য আনা হয়। এটি যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে আইনি স্বীকৃতি দেয়2।
দ্বিতীয় সংশোধনী (১৯৭৩): জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও মৌলিক অধিকার স্থগিত করার বিধান সংযোজন করা হয়। এতে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ বা বহিরাক্রমণের সময় মৌলিক অধিকার সাময়িকভাবে সীমিত করার সুযোগ রাখা হয়2।
চতুর্থ সংশোধনী (১৯৭৫): সংসদীয় গণতন্ত্র বাতিল করে রাষ্ট্রপতিশাসিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়। বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং রাষ্ট্রপতিকে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক মাইলফলক হলেও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি6।
পঞ্চম সংশোধনী (১৯৭৯): ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান ও পরবর্তী ঘটনাগুলোকে বৈধতা দেয়া হয়। এটি পরে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জড হয় এবং বাতিল হয়16।
সপ্তম থেকে দশম সংশোধনী (এরশাদের আমল): সামরিক শাসনকে সংবিধানে বৈধতা দেয়া হয় এবং কিছু মৌলিক অধিকার সীমিত করা হয়। এগুলোও পরে আদালতে চ্যালেঞ্জড হয়16।
ত্রয়োদশ সংশোধনী (বিএনপি আমল): বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সীমিত করা হয় এবং কিছু মৌলিক অধিকার হ্রাস পায়। এটি সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জড হয়1।
পঞ্চদশ সংশোধনী (২০১১): ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূলনীতি ফিরিয়ে আনা হয় এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনর্বাসন করা হয়। এটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন এবং বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে16।
ষোড়শ সংশোধনী (২০১৮): সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এটি আদালতে চ্যালেঞ্জড হয়েছে এবং অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে16।
সংশোধনী প্রক্রিয়া ও সীমাবদ্ধতা
সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন (অনুচ্ছেদ ১৪২)।
তবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, যেমন প্রস্তাবনা, মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রধর্ম ইত্যাদি সংশোধন অযোগ্য (অনুচ্ছেদ ৭খ)।
বাস্তবে রাজনৈতিক স্বার্থে অনেক সংশোধনী আনা হয়েছে, যার ফলে মৌলিক অধিকার সংকুচিত হয়েছে এবং সংবিধানের স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে156।
সমালোচনা ও ভবিষ্যৎ চিন্তা
সংবিধানের বারবার সংশোধন ও বাতিলের কারণে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে।
অনেক সংশোধনী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থে আনা হয়েছে, যা সংবিধানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়েছে567।
সাম্প্রতিক সময়ে সংবিধান পুনঃলিখন বা বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব উঠেছে, তবে তা কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে68
সংক্ষেপে বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনীসমূহ
সংশোধনী সংখ্যা
সময়কাল ও সরকার
প্রধান বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব
অবস্থা
১ম
১৯৭৩, বঙ্গবন্ধু সরকার
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিতকরণ
প্রয়োগে আছে
২য়
১৯৭৩, বঙ্গবন্ধু সরকার
জরুরি অবস্থা ও মৌলিক অধিকার সাময়িক স্থগিত
প্রয়োগে আছে
৪র্থ
১৯৭৫, বঙ্গবন্ধু সরকার
একদলীয় শাসন, বাকশাল প্রতিষ্ঠা
দীর্ঘস্থায়ী হয়নি
৫ম
১৯৭৯, জিয়াউর রহমান
১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান বৈধতা
সুপ্রিম কোর্টে বাতিল
৭ম-১০ম
১৯৮০-৯০, এরশাদ আমল
সামরিক শাসন বৈধতা, মৌলিক অধিকার সীমিত
বিচারাধীন বা বাতিল
১৩ম
২০০৫, বিএনপি আমল
বিচার বিভাগে সীমাবদ্ধতা
বাতিল
১৫ম
২০১১, আওয়ামী লীগ
মৌলিক অধিকার পুনর্বাসন, মূলনীতি ফিরিয়ে আনা
বিচারাধীন
১৬ম
২০১৮, আওয়ামী লীগ
নারী আসনের মেয়াদ বৃদ্ধি
বাতিল
বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন একটি প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া হলেও রাজনৈতিক স্বার্থে এর অপব্যবহার এবং মৌলিক কাঠামোর প্রতি অবজ্ঞা দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে1256।
১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই গৃহীত এই সংশোধনীর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩ প্রণয়নের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করে। এই সংশোধনী মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের পথ সুগম করে।
দ্বিতীয় সংশোধনী (১৯৭৩)
জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত বিধানাবলী সংশোধন করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরি অবস্থার সময়কাল নির্ধারণ ও সংসদের অনুমোদনের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়।
তৃতীয় সংশোধনী (১৯৭৪)
ভারতের সাথে সীমানা নির্ধারণী চুক্তি অনুসরণে বেরুবাড়ি ও দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহল বিনিময়ের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করা হয়। এই সংশোধনী দুই দেশের মধ্যে সীমানা সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখে।
চতুর্থ সংশোধনী (১৯৭�৫)
এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত সংশোধনী। সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করা হয়। চারটি সরকারি পত্রিকা ছাড়া অন্য সব পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়।
পঞ্চম সংশোধনী (১৯৭৯)
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এই সংশোধনী গৃহীত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক শাসনামলের সব কার্যক্রমকে সাংবিধানিক বৈধতা প্রদান করা হয়। "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" সংবিধানের প্রস্তাবনায় সংযোজন করা হয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে "আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস" স্থান পায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।
ষষ্ঠ সংশোধনী (১৯৮১)
উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে তার দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করা হয়।
সপ্তম সংশোধনী (১৯৮৬)
এরশাদের শাসনামলে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সামরিক শাসনামলের সকল কার্যক্রমকে বৈধতা প্রদান করা হয়। সংসদে ৩০টি মহিলা আসন সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়।
অষ্টম সংশোধনী (১৯৮৮)
ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামকেও হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এই সংশোধনীটি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
নবম সংশোধনী (১৯৮৯)
উপ-রাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির মৃত্যু বা পদত্যাগের ক্ষেত্রে স্পিকার কর্তৃক দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করা হয়।
দশম সংশোধনী (১৯৯০)
সংরক্ষিত মহিলা আসনের মেয়াদ আরও ১০ বছর বৃদ্ধি করা হয়।
একাদশ সংশোধনী (১৯৯১)
গণআন্দোলনের পর গৃহীত এই সংশোধনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়।
দ্বাদশ সংশোধনী (১৯৯১)
সংসদীয় পদ্ধতি অনুযায়ী সংবিধানের কিছু ধারায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়।
ত্রয়োদশ সংশোধনী (১৯৯৬)
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।
চতুর্দশ সংশোধনী (২০০৪)
সংরক্ষিত মহিলা আসন ৩০ থেকে বৃদ্ধি করে ৪৫ করা হয় এবং উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে বৃদ্ধি করে ৬৭ বছর করা হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনী (২০১১)
এটি একটি ব্যাপক সংশোধনী। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। মূল সংবিধানের চার মূলনীতি (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংসদ ভবনে প্রদর্শনের বিধান রাখা হয়। মহিলাদের সংরক্ষিত আসন ৫০-এ উন্নীত করা হয়।
ষোড়শ সংশোধনী (২০১৪)
বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদের ভূমিকা বৃদ্ধি করা হয়। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত এই সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে।
সপ্তদশ সংশোধনী (২০১৮)
সংরক্ষিত মহিলা আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বৃদ্ধি করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের এই সংশোধনীগুলো দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সংগতি রেখে গৃহীত হয়েছে। তবে কিছু সংশোধনী বিতর্কিত এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হয়।
# **বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনীসমূহ: একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ**
বাংলাদেশের সংবিধান **১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর** গৃহীত হয় এবং **১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২** থেকে কার্যকর হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সংবিধানে **১৬টি সংশোধনী** (২০২৪ সাল পর্যন্ত) আনা হয়েছে। নিচে প্রতিটি সংশোধনীর মূল বিষয়বস্তু ও প্রভাব আলোচনা করা হলো:
---
## **১. প্রথম সংশোধনী (১৯৭৩)**
- **পরিবর্তন:**
- **যুদ্ধাপরাধীদের বিচার** করার জন্য **আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩** সংবিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করা হয়।
- **৯৩(১) অনুচ্ছেদ** সংশোধন করে **মৌলিক অধিকার নিলম্বনযোগ্য** করা হয় (জাতীয় জরুরি অবস্থায়)।
- **প্রভাব:**
- মুক্তিযুদ্ধের সময় **গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার** শুরু করার আইনি ভিত্তি তৈরি করে।
- **তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সাবেক প্রধান বিচারপতির অন্তর্ভুক্তি**।
- **প্রভাব:**
- **২০০৬-০৭ সালের রাজনৈতিক সংকটের** পটভূমি তৈরি করে।
---
## **১৫. পঞ্চদশ সংশোধনী (২০১১)**
- **পরিবর্তন:**
- **তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল**।
- **মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব** (Basic Structure Doctrine) সংযোজন—যা সংসদকে সংবিধানের মূল চেতনা পরিবর্তন থেকে বিরত রাখে।
- **রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল** রাখা হয়।
- **প্রভাব:**
- **আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতায়নের** পথ সুগম করে।
---
## **১৬. ষোড়শ সংশোধনী (২০১৭)**
- **পরিবর্তন:**
- **সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদকে ফেরত** দেওয়া (যা পরে **আদালত বাতিল** করে)।
- **প্রভাব:**
- **বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বনাম সংসদের কর্তৃত্ব** নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে।
---
### **সংশোধনীগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব**
- **গণতন্ত্র vs স্বৈরতন্ত্র:** চতুর্থ, পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী **সামরিক শাসনকে বৈধতা** দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে আদালত বাতিল করে।
- **ধর্মনিরপেক্ষতা vs রাষ্ট্রধর্ম:** অষ্টম সংশোধনী **ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম** করে ধর্মীয় রাজনীতির দিকে ঝুঁকিয়েছে।
- **মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব:** পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে **সংবিধানের মূল নীতিগুলো রক্ষার** চেষ্টা করা হয়েছে।
### **উপসংহার**
বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনীগুলো **রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামরিক শাসনের বৈধতা ও সমাজের চাহিদা** প্রতিফলিত করে। কিছু সংশোধনী **গণতন্ত্রকে শক্তিশালী** করলেও, কিছু **স্বৈরাচারী প্রবণতাকে বৈধতা** দিয়েছে। বর্তমানে সংবিধান **মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব** দ্বারা সুরক্ষিত, যা ভবিষ্যতে এর মৌলিক আদর্শ রক্ষা করবে বলে আশা করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনীসমূহের আলোচনা
বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালে প্রণীত হওয়ার পর থেকে সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী এতে একাধিকবার সংশোধনী (Amendment) আনা হয়েছে। প্রতিটি সংশোধনীর পেছনে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট কাজ করেছে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হলো।
🟦 বাংলাদেশের সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীসমূহের আলোচনা
সংশোধনী
তারিখ
প্রধান বৈশিষ্ট্য / উদ্দেশ্য
১ম
১৯৭৩
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সংক্রান্ত ধারা যুক্ত হয়; আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ক্ষমতা স্বীকৃত।
২য়
১৯৭৩
সংসদ সদস্যদের পদত্যাগ ও অনুপস্থিতি সংক্রান্ত বিধান যুক্ত।
৩য়
১৯৭৪
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সীমান্ত এলাকার মালিকানা হস্তান্তরের সাংবিধানিক অনুমোদন।
৪র্থ
১৯৭৫
একদলীয় বাকশাল শাসন চালু, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হ্রাস।
ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা, হাইকোর্ট বেঞ্চ বিভাজন ও বিভাগীয় বিচারব্যবস্থা।
৯ম
বাতিল
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন (আলোচিত হলেও বাস্তবায়িত হয়নি)।
১০ম
১৯৯০
নারীদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৩০ করা হয়।
১১তম
১৯৯১
রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের বৈধতা।
১২তম
১৯৯১
রাষ্ট্রপতি শাসন বাতিল করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন।
১৩তম
১৯৯৬
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ প্রশাসনের বিধান।
১৪তম
২০০৪
সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫টি করা হয়, রাষ্ট্রপতির শপথবাক্য পরিবর্তন।
১৫তম
২০১১
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, ৫ম ও ৭ম সংশোধনী বাতিল, চার মূলনীতি পুনর্বহাল।
১৬তম
২০১৪
বিচারপতিদের অপসারণে সংসদের ক্ষমতা পুনঃস্থাপন, যদিও পরে আদালত এই সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করে।
১৭তম
২০১৮
সংরক্ষিত নারী আসনের সময়সীমা আরও ২৫ বছর বাড়ানো।
🟨 সংবিধান সংশোধনীর প্রভাব ও মূল্যায়ন:
✅ ইতিবাচক দিক:
সংবিধান সময়োপযোগী করার প্রয়াস।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, নারী অধিকার ও নির্বাচনব্যবস্থার উন্নয়ন।
❌ নেতিবাচক দিক:
কিছু সংশোধনী সাংবিধানিক ভারসাম্য নষ্ট করে।
একনায়কতন্ত্র ও সামরিক শাসন বৈধতা পায় (৫ম, ৭ম সংশোধনী)।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হ্রাস পায় (৪র্থ, ১৬তম সংশোধনী)।
🟩 উপসংহার:
বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনীগুলো একদিকে রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটালেও, অন্যদিকে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনের ধারাকে বহুবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এর মাধ্যমে দেশের আইনি কাঠামো ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে, যা কখনো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে, আবার কখনো দুর্বল।
১৯৯০
১৯৯০ সালে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই পতনের পেছনে একাধিক কারণ ও ঘটনা ভূমিকা রেখেছিল, যা নিচে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর এরশাদের শাসনকালজুড়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ১৯৮৭ সালে নূর হোসেন হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলন হত্যার মাধ্যমে আন্দোলন আরও তীব্র ও ব্যাপক আকার ধারণ করে। এই হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসে এবং আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়35।
এরশাদ সরকারের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সেনাবাহিনীর সমর্থন হারানো। ১৯৯০ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের এক জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, চলমান সংকট রাজনৈতিক এবং এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবে করতে হবে; সেনাবাহিনী আর সরকারের পক্ষে কোনো পদক্ষেপ নেবে না। প্রেসিডেন্ট এরশাদ সামরিক আইন জারির প্রস্তাব দিলেও সেনাবাহিনী তা প্রত্যাখ্যান করে35। ৪ ডিসেম্বর সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম সরাসরি এরশাদকে পদত্যাগের পরামর্শ দেন এবং জানান, সেনাবাহিনীর মধ্যে অধৈর্যতা বাড়ছে235।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন পরিচালনা করেছিল এবং এরশাদ পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ফর্মুলা আগেই ঠিক করে রেখেছিল। এই ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত আন্দোলন এরশাদ সরকারের ওপর চাপ বাড়ায়2।
গণআন্দোলন দমন করতে এরশাদ সরকার জরুরি অবস্থা ও কারফিউ জারি করলেও তা কোনো কাজে আসেনি। জনগণের প্রতিরোধ ও সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে সরকার কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে235।
সবশেষে, ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে জেনারেল এরশাদ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র দেন45।
তাঁর পতনের মূল কারণগুলো ছিল:
গণআন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ ও সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ
সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রত্যাহার
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ কৌশল
রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা ও প্রশাসনিক অকার্যকারিতা
এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
১৯৯০ সালে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের মূল কারণ ছিল দীর্ঘ ৯ বছর ধরে চলে আসা স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন। এই আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে এবং শেষ পর্যন্ত একটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এরশাদকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য করার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ বিদ্যমান ছিল:
দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসন: ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। তার সামরিক শাসন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার ঘটনা জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
ছাত্র আন্দোলন: এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর থেকেই ছাত্ররা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে ছাত্রদের মিছিলে সেনাবাহিনীর হামলায় হতাহতের ঘটনা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে। ১৯৯০ সালে 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের' ব্যানারে ছাত্ররা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন: বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এরশাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। যদিও মাঝেমধ্যে তাদের মধ্যে ছন্দপতন হয়েছিল, তবুও ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে আন্দোলনরত দলগুলোর মধ্যে ইস্যুভিত্তিক ঐক্য গড়ে ওঠে এবং তারা এরশাদের পদত্যাগ দাবিতে সোচ্চার হয়।
ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ড: ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা এরশাদবিরোধী আন্দোলনকে আরও তুঙ্গে তোলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রত্যাহার: গণআন্দোলন যখন তীব্র রূপ নেয় এবং জরুরি অবস্থা ও কারফিউ জারি করেও তা দমানো যাচ্ছিল না, তখন সেনাবাহিনী এরশাদের দিক থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। ৪ ডিসেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল নূর উদ্দিনসহ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা সরাসরি এরশাদকে পদত্যাগের জন্য বলেন। সেনাবাহিনীর এই নেতিবাচক মনোভাব এরশাদের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিন জোটের রূপরেখা: আন্দোলনরত তিনটি প্রধান রাজনৈতিক জোট (আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট এবং বাম দলগুলোর পাঁচ দলীয় জোট) একটি রূপরেখা তৈরি করে, যেখানে এরশাদের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানানো হয়। এই রূপরেখা আন্দোলনের দালিলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
এই সম্মিলিত চাপের মুখে ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন।
## **১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের পতনের কারণ: একটি বিশ্লেষণ**
১৯৯০ সালের **৬ ডিসেম্বর**, বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন—**জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ** ৯ বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। তার পতনের পেছনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণ জড়িত ছিল। নিচে প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
---
### **১. গণতন্ত্রহীনতা ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন**
- **দীর্ঘ সামরিক শাসন (১৯৮২-১৯৯০):** এরশাদ **অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল** করে সংবিধান স্থগিত করেন এবং **নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা** করেন।
- **নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ:**
- **১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন**ে বিরোধীরা ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলে।
- **১৯৮৮ সালের নির্বাচন** প্রধান দলগুলো (আওয়ামী লীগ, বিএনপি) বয়কট করে।
- **ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন:**
- **১৯৮৩ সাল থেকে চলমান আন্দোলন** ১৯৯০ সালে চূড়ান্ত রূপ নেয়।
- **"এরশাদ হটাও"** স্লোগানে সারাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে।
---
### **২. বিরোধী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ**
- **আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের যৌথ আন্দোলন:**
- **শেখ হাসিনা** (আওয়ামী লীগ) ও **খালেদা জিয়া** (বিএনপি) একত্রিত হয়ে **এরশাদ বিরোধী জোট** গঠন করেন।
- এমনকি **জামায়াতে ইসলামী**ও এই আন্দোলনে শরিক হয় (যদিও পরে তাদের ভূমিকা বিতর্কিত হয়)।
- ১৯৯১ সালে **সংসদীয় গণতন্ত্র** ফিরে আসে এবং **খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার** গঠিত হয়।
❌ **অস্থিরতার ধারা অব্যাহত:**
- **তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা** চালু হলেও তা পরবর্তীতে বিতর্কিত হয় (২০১১ সালে বাতিল)।
- **সেনা-সমর্থিত সরকারের ধারা** (২০০৭-০৮) পরোক্ষভাবে এরশাদের শাসনের উত্তরাধিকার বলে বিবেচিত হয়।
---
### **উপসংহার**
এরশাদের পতন ছিল **বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক বিজয়**। এটি প্রমাণ করে যে **সামরিক শাসন বাংলাদেশের জনগণের কাছে কখনই গ্রহণযোগ্য নয়**। তবে, এরশাদের আমলের কিছু সংস্কার (যেমন: উপজেলা ব্যবস্থা, গ্রামীণ উন্নয়ন) ইতিবাচকভাবে স্মরণ করা হয়। আজও ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান **গণতন্ত্রপন্থী শক্তির জন্য একটি অনুপ্রেরণা**।
১৯৯০ সালে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ একত্রিত হয়ে একটি বিস্তৃত গণআন্দোলনে রূপ নেয়, যার ফলস্বরূপ তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
🟦 ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের প্রধান কারণসমূহ:
🟥 ১. সামরিক শাসনের দীর্ঘস্থায়িত্ব ও কর্তৃত্ববাদ
১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ।
বারবার নির্বাচনকে প্রভাবিত করে, সংসদ ও বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
বাকস্বাধীনতা ও বিরোধী মত দমন—রাজনৈতিক দল ও সংবাদমাধ্যমের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
🟥 ২. নির্বাচনে কারচুপি ও গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি
১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের জাতীয় নির্বাচন ছিল বিতর্কিত ও একপাক্ষিক।
জনগণের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ায় আস্থাহীনতা বৃদ্ধি পায়।
🟥 ৩. অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও ব্যর্থতা
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি বৃদ্ধি।
মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও বৈষম্যের ফলে জনজীবনে অসন্তোষ বৃদ্ধি।
দারিদ্র্য বিমোচনে বড় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া।
🟥 ৪. ছাত্র ও যুব আন্দোলন
১৯৮৩ সাল থেকেই শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন সময়ের সঙ্গে আরও সংগঠিত ও তীব্র হয়।
১৯৯০ সালে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যজোট গঠন করে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়।
🟥 ৫. জাতীয় ঐক্য ও দুই প্রধান দলের সম্মিলিত আন্দোলন
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই প্রধান রাজনৈতিক দল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়।
“দল-মত-নির্বিশেষে” আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
এরশাদের পতনের জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একক দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে অংশ নেয়।
🟥 ৬. মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ
শিক্ষক, আইনজীবী, ডাক্তার, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণির পেশাজীবীরা গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে সক্রিয় হন।
🟥 ৭. আন্তর্জাতিক চাপ ও বৈদেশিক সমর্থনের অভাব
আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো, গণতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে অবস্থান নেয়।
এরশাদের সরকারের প্রতি বিদেশি আস্থাহীনতা বৃদ্ধি পায়।
✅ পরিণতি:
৪ ডিসেম্বর ১৯৯০: ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ অবস্থানে যায়।
৬ ডিসেম্বর ১৯৯০: এরশাদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে।
🟩 উপসংহার:
এরশাদের পতনের মূল কারণ ছিল দীর্ঘ সময় ধরে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ, দুর্নীতি ও দমননীতি। এসবের বিরুদ্ধে জনগণের সব স্তরের সম্মিলিত প্রতিরোধই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পটভূমি
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই নির্বাচনের পটভূমি ছিল বহুমাত্রিক ও তাৎপর্যপূর্ণ, যার মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সামরিক শাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ
১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসক জেনারেল এইচ এম এরশাদের শাসনে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক কার্যক্রম স্থগিত ছিল। ১৯৯০ সালের শেষদিকে ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হন। এর ফলে দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসার জন্য নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি ওঠে3।
২. নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন
১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন। যদিও তখনও সংবিধানে নিরপেক্ষ সরকারের বিধান ছিল না, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে এই ব্যবস্থা গৃহীত হয়3। এতে জনগণের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আস্থা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
৩. রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা প্রধান দুই দল—বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (নেতৃত্বে শেখ হাসিনা) ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি, নেতৃত্বে খালেদা জিয়া)—নির্বাচনে অংশ নেয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দলীয় জোট এবং বামপন্থী পাঁচ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে5।
৪. নির্বাচন ও ভোটার অংশগ্রহণ
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৩০০টি আসনের বিপরীতে ৭৫টি দল ও ৪২৪ জন স্বতন্ত্রসহ মোট ২৭৮৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য, এবং নির্বাচন ছিল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ও সহিংসতামুক্ত145।
৫. নির্বাচনের তাৎপর্য
সামরিক শাসনের অবসানের পর গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ
নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে
প্রধান দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তবে প্রচারে তুলনামূলকভাবে কম আক্রমণাত্মক মনোভাব5
উপসংহার
এই পটভূমিতে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে এক মাইলফলক হয়ে ওঠে3।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে:
রাজনৈতিক পরিস্থিতি
১৯৯০ সালের শেষের দিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে এরশাদ সরকারের পতনের জন্য আন্দোলনে নামে। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন
এরশাদের পদত্যাগের পর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করা।
সংবিধান সংশোধনী
১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটি ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
অর্থনৈতিক অবস্থা
দীর্ঘ সামরিক শাসনের ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল নাজুক। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং দুর্নীতি ছিল প্রধান সমস্যা। জনগণ অর্থনৈতিক মুক্তির আশায় নতুন সরকারের প্রত্যাশা করছিল।
আন্তর্জাতিক পরিবেশ
স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি এবং বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের জোয়ারের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের চাপ ছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়তার আশ্বাস দেয়।
এই পটভূমিতেই ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
### **১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পটভূমি: গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের লড়াই**
#### **১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সামরিক শাসনের অবসান**
- **১৯৮২-১৯৯০: এরশাদের সামরিক শাসন**
- জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন।
- ৯ বছরের শাসনামলে **নির্বাচনে কারচুপি, বিরোধী দলগুলোর দমন-পীড়ন** এবং **রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তন** (১৯৮৮) সহ বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
- **১৯৯০: গণঅভ্যুত্থান**
- **ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলন** ("এরশাদ হটাও") এবং **আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াতের ঐতিহাসিক জোট** এরশাদকে পদত্যাগে বাধ্য করে।
- **৬ ডিসেম্বর ১৯৯০**: এরশাদ ক্ষমতা ত্যাগ করেন এবং **তত্ত্বাবধায়ক সরকার** (প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে) গঠিত হয়।
- প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে নির্বাচন পরিচালিত হয়।
- **সেনাবাহিনীর সমর্থন** নিশ্চিত করা হয় যাতে কোনো ধরনের প্রভাব না পড়ে।
- **প্রধান ইস্যু**
- গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার
- অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা
- দুর্নীতি দমন
#### **৫. ফলাফল ও সরকার গঠন**
- **বিএনপি বিজয়ী** (১৪০ আসন), কিন্তু **পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায়** জামায়াত ও অন্যান্য দলের সমর্থনে সরকার গঠন করে।
- **খালেদা জিয়া** বাংলাদেশের **প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী** হন।
- **আওয়ামী লীগ** প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয় (৮৮ আসন)।
#### **৬. ঐতিহাসিক তাৎপর্য**
- **গণতন্ত্রের পুনরুত্থান**: ১৯৭৫ সালের পর প্রথম সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত সরকার।
- **নারী নেতৃত্বের উত্থান**: খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে আবির্ভূত হন।
- **দ্বি-দলীয় ব্যবস্থার সূচনা**: বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়, যা আজও চলছে।
### **উপসংহার**
১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল **বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি নতুন ভোর**, যা সামরিক শাসনের অবসান এনে **জনগণের ভোটে সরকার গঠনের** পথ সুগম করে। তবে, এই নির্বাচন থেকে জন্ম নেওয়া **রাজনৈতিক বিভাজন** পরবর্তী দশকগুলোতেও প্রভাব ফেলে। আজও এই নির্বাচনকে **বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়** হিসেবে স্মরণ করা হয়।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, কারণ এটি ছিল একটি গণআন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর প্রথম মুক্ত, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ গণতন্ত্রে পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবর্তন করে এবং রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়।
🟦 ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পটভূমি
🟥 ১. এরশাদের পতনের প্রেক্ষাপট
১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত এরশাদ সামরিক শাসক ও পরে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, ছাত্র অন্দোলন, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের বিরোধিতার ফলে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করেন।
এর মাধ্যমে দেশে একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে।
🟥 ২. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন
এরশাদের পদত্যাগের পর একটি অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে।
এ সরকার নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে।
🟥 ৩. জনগণের গণতন্ত্র প্রত্যাশা
জনগণ দীর্ঘদিন পর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়, যার ফলে ভোটে উৎসাহ ব্যাপক ছিল।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও নির্বাচন পরিচালনায় মোটামুটি সহনশীলতা দেখা যায়।
🟥 ৪. বহুদলীয় রাজনীতির পূর্ণ প্রত্যাবর্তন
সব প্রধান রাজনৈতিক দল (বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলাম, জাসদ প্রভৃতি) নির্বাচনে অংশ নেয়।
দীর্ঘ সেনাশাসনের পর রাজনৈতিক দলগুলো নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে জনমনে আস্থা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে।
🟥 ৫. নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা
নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভাব ছিল।
সেনাবাহিনী ও প্রশাসন নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে, যা অতীতের তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন।
🟩 উপসংহার:
১৯৯১ সালের নির্বাচনের পটভূমি ছিল একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পরিপূর্ণ প্রতিফলন। দীর্ঘকাল পরে প্রথমবারের মতো জনগণ তাদের ভোটাধিকার নির্বিঘ্নে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়। এই নির্বাচন শুধু নতুন সরকারই গঠন করেনি, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোকেও বদলে দেয়, কারণ এর পরপরই সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়।
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে জেনারেল এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়, যা ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পটভূমি তৈরি করে। এই নির্বাচনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন।
পটভূমিটি নিম্নলিখিত প্রধান উপাদানগুলো নিয়ে গঠিত:
এরশাদের পতন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার: দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হয় এবং এরশাদ পদত্যাগ করেন। এরপর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন। এই সরকারে বিভিন্ন পেশাজীবী ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে উপদেষ্টামণ্ডলী গঠন করা হয়, যাদের মূল কাজ ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা।
গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা: এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই ছিল দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। জনগণ সামরিক শাসন থেকে মুক্তি এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য উন্মুখ ছিল। এরশাদের পতনের পর জনগণের মধ্যে একটি উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, এবার একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
তিন জোটের রূপরেখা: এরশাদবিরোধী আন্দোলনকালে প্রধান তিনটি রাজনৈতিক জোট (আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট এবং বাম দলগুলোর পাঁচ দলীয় জোট) একটি ঐতিহাসিক রূপরেখা তৈরি করেছিল। এই রূপরেখার অন্যতম প্রধান দাবি ছিল, এরশাদের পদত্যাগ এবং নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। এই রূপরেখাটিই পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
সংবিধানের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ঐকমত্য: বাংলাদেশের সংবিধানে তখন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলে কোনো বিধান ছিল না। কিন্তু এরশাদের দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের কারণে রাজনৈতিক দলগুলো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আনার জন্য একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এই প্রয়োজন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি অভূতপূর্ব ঐকমত্য গড়ে ওঠে, যার ফলশ্রুতিতে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।
পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশন: একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করা হয় এবং তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। এটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত ছিল।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি: এরশাদের পতনের পর দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ, নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারণায় দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি করে।
এই পটভূমিতে, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের কারণ মূলত ছিল দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ না করায় তারা ভোটে পরাজিত হয় বলে বলা যায়, কারণ দলটি কার্যত নির্বাচনে ছিল অনুপস্থিত1।
আওয়ামী লীগ তখন সামরিক শাসন ও এরশাদের পতনের পর রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ছিল, কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি বা অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছে। এর ফলে বিএনপি প্রধান বিরোধীদল হিসেবে উঠে আসে এবং নির্বাচনে জয় লাভ করে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পরিবর্তিত করে এবং বিএনপির জয় নিশ্চিত করে।
সুতরাং, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা বা কার্যত নির্বাচনে অনুপস্থিত থাকা1।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করেছিল:
নেতৃত্বের সংকট ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে গুরুতর নেতৃত্ব সংকট ছিল। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দলের নেতৃত্বে এলেও দলের অভিজ্ঞ নেতাদের সাথে তার সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। দলের বিভিন্ন অংশে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং গ্রুপিং নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর সাথে একসাথে কাজ করেছিল। যেহেতু জামায়াত ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তাই এই সহযোগিতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
বিএনপির কৌশলগত অবস্থান
বিএনপি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে উপস্থিত হয়। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এবং ইসলামী মূল্যবোধের সাথে জাতীয়তাবাদের সমন্বয় ঘটিয়ে ব্যাপক জনসমর্থন পায়।
অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক নীতি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। অন্যদিকে বিএনপি বাজার অর্থনীতি এবং বেসরকারিকরণের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সমর্থন পায়।
গ্রামীণ ভোটব্যাংকে দুর্বলতা
আওয়ামী লীগ প্রধানত শহুরে এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমর্থন পেলেও গ্রামীণ এলাকায় তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল। বিএনপি স্থানীয় প্রভাবশালী এবং ধর্মীয় নেতাদের সমর্থন পেয়ে গ্রামাঞ্চলে এগিয়ে থাকে।
প্রচারণার অভাব
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণা বিএনপির তুলনায় কম কার্যকর ছিল। দলের বার্তা জনগণের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষ করে নতুন গণতান্ত্রিক পরিবেশে জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল।
ধর্মীয় অনুভূতির ব্যবহার
বিএনপি এবং তার মিত্ররা ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগকে ধর্মবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করে। এটি গ্রামীণ এবং ধর্মপ্রাণ ভোটারদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এসব কারণে আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসনে জিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকে, যেখানে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।
### **১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের কারণ**
১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পেছনে **কয়েকটি কৌশলগত, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ** দায়ী ছিল। নিচে মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
---
#### **১. **দলীয় সংগঠনের দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল**
- **দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা**:
- ১৯৭৫-১৯৯০ পর্যন্ত সামরিক শাসনের সময় আওয়ামী লীগ **প্রায় ১৫ বছর** সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিল।
- দলের **গ্রামীণ ও স্থানীয় কাঠামো দুর্বল** হয়ে পড়ে, যা বিএনপির তুলনায় সংগঠনকে পিছিয়ে দেয়।
- **নেতৃত্বের নতুন রূপান্তর**:
- শেখ হাসিনা **১৯৮১ সালে দলের নেতৃত্বে আসেন**, কিন্তু তখনও তিনি অভিজ্ঞতায় অপেক্ষাকৃত নতুন ছিলেন।
- দলের অভ্যন্তরে **প্রবীণ ও তরুণ নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা** দেখা দেয়।
---
#### **২. **এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে জামায়াতের সাথে জোটের বিতর্ক**
- **১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে জামায়াতের অংশগ্রহণ**:
- আওয়ামী লীগ **জামায়াতের সাথে সাময়িক জোট** করে এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও, এটি **মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ভিত্তিক সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি** তৈরি করে।
- সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধারা **জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের সহযোগিতাকে সমর্থন করেননি**।
---
#### **৩. **বিএনপির শক্তিশালী সংগঠন ও গ্রামীণ জনসমর্থন**
- **বিএনপির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক**:
- বিএনপি **জিয়াউর রহমানের সময় (১৯৭৭-১৯৮১) থেকে গ্রামীণ পর্যায়ে শক্তিশালী ভিত্তি** গড়ে তুলেছিল।
- **স্থানীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসনে বিএনপির প্রভাব** বেশি ছিল, যা নির্বাচনী ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
- **খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা**:
- খালেদা জিয়া **"সাধারণ মানুষের নেত্রী"** হিসেবে আবির্ভূত হন এবং **দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ব্যাপক সমর্থন** পান।
- বিএনপি **মুক্ত বাজার অর্থনীতি, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও গ্রামীণ উন্নয়নের** প্রতিশ্রুতি দেয়, যা ব্যবসায়ী ও কৃষকদের আকর্ষণ করে।
- আওয়ামী লীগ **সমাজতান্ত্রিক নীতি** নিয়ে প্রচার করায় অনেকেই এটিকে **পুরনো ধারার রাজনীতি** মনে করে।
- **ধর্মীয় আবেগের ব্যবহার**:
- বিএনপি **ধর্মীয় মূল্যবোধ ও স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসার নেটওয়ার্ক** ব্যবহার করে ভোটারদের কাছে পৌঁছায়।
- আওয়ামী লীগ **ধর্মনিরপেক্ষতা** নিয়ে প্রচার করায় কিছু রক্ষণশীল ভোটার দূরে সরে যায়।
---
#### **৫. **মিডিয়া ও প্রচারণায় পিছিয়ে থাকা**
- **বিএনপির মিডিয়া কৌশল**:
- বিএনপি **স্থানীয় পত্রিকা, মাইকিং ও জনসভায়** বেশি কার্যকর ছিল।
- আওয়ামী লীগের প্রচারণা **শহরকেন্দ্রিক** হওয়ায় গ্রামীণ অঞ্চলে কম প্রভাব ফেলে।
- **নেতৃত্বের চরিত্রগত পার্থক্য**:
- খালেদা জিয়াকে **দৃঢ় ও সহজ-সরল নেত্রী** হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, অন্যদিকে শেখ হাসিনা তখনও **রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় অপেক্ষাকৃত নতুন** ছিলেন।
---
#### **৬. **তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা ও নির্বাচনী ব্যবস্থা**
- **ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট সিস্টেমের প্রভাব**:
- বিএনপি **কম ভোট পেয়েও বেশি আসন** পায় (আওয়ামী লীগের ভোট বেশি ছিল কিছু এলাকায়, কিন্তু আসন কম)।
- **ভোট বিভাজন**: জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য ছোট দলগুলো আওয়ামী লীগের ভোট ভাগ করে দেয়।
---
### **পরিণতি ও শিক্ষা**
- আওয়ামী লীগ **১৯৯১ সালের পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে সংগঠন শক্তিশালী করে** এবং **১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ** করে।
- এই নির্বাচন প্রমাণ করে যে, **শুধু ঐতিহাসিক ভূমিকা নয়, স্থানীয় সংগঠন, কৌশল ও জনসম্পর্কই নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে**।
### **উপসংহার**
১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় **দলীয় দুর্বলতা, কৌশলগত ভুল এবং বিএনপির শক্তিশালী প্রতিযোগিতার** ফল ছিল। তবে, এই পরাজয়ই পরবর্তীতে দলকে **পুনর্গঠিত হতে এবং ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসতে** সাহায্য করে।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ছিল অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল, কিন্তু তারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কাছে পরাজিত হয়। যদিও আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ ছিল, এরপরও এই নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে কিছু রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও কৌশলগত কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
🟦 ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের প্রধান কারণসমূহ:
🟥 ১. বিএনপির সঙ্গে ইসলামপন্থী দলগুলোর জোট
বিএনপি জামায়াতে ইসলামি, ইসলামী ঐক্যজোটসহ বিভিন্ন ডানপন্থী ও ইসলামপন্থী দলের সমর্থন লাভ করে।
এই জোটের ফলে ধর্মভিত্তিক ভোট একদিকে ঝুঁকে পড়ে।
🟥 ২. বাম-ধারার ভোট বিভক্ত হওয়া
আওয়ামী লীগের আদর্শিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বামপন্থী ভোটের একটা অংশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), ওয়ার্কার্স পার্টি ও ন্যাপের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এতে আওয়ামী লীগ পূর্ণ ভোট পায়নি।
🟥 ৩. আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক দুর্বলতা
দীর্ঘ সামরিক শাসন ও দমনপীড়নের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে দলটির সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে।
অনেক জায়গায় দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে বিভাজন ও সমন্বয়ের অভাব ছিল।
🟥 ৪. নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক ভাষা
শেখ হাসিনা তখনো তুলনামূলকভাবে রাজনীতিতে নতুন (১৯৮১ সালে দলীয় প্রধান হন) এবং তুলনায় কম অভিজ্ঞ বলে বিবেচিত হয়।
অপরদিকে খালেদা জিয়া ছিলেন সদ্য স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী শক্তিশালী প্রতীক।
🟥 ৫. ধর্ম ও জাতীয়তাবাদী আবেগকে কাজে লাগানো
বিএনপি তার প্রচারে “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” এবং “ধর্মীয় মূল্যবোধ” তুলে ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে সমর্থন জোগাড়ে সক্ষম হয়।
আওয়ামী লীগ “ধর্মনিরপেক্ষতা” এবং “ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখার” মতাদর্শকে জোর দিয়েছিল, যা একটি অংশের মধ্যে ভুল ব্যাখ্যার কারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
🟥 ৬. চূড়ান্ত কৌশলগত ভুল
অনেক নির্বাচনী আসনে প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল ও মনোনয়ন বিতর্ক দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নির্বাচনী প্রচারণায় দলীয় বার্তা ও কৌশলে ঘাটতি ছিল।
🟥 ৭. নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে অভিযোজনের ঘাটতি
সেনাশাসনের পর নির্বাচনী পরিবেশ ছিল অনেকটা নতুন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল।
বিএনপি এই নতুন পরিস্থিতির সাথে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারলেও, আওয়ামী লীগ কিছুটা পিছিয়ে পড়ে।
🟩 উপসংহার:
১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় ছিল অনেকগুলো কৌশলগত, আদর্শিক ও সাংগঠনিক ভুলের ফল। যদিও দলটি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখে, তবুও ভোটের রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে তারা ব্যর্থ হয়।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পেছনে বেশ কিছু কারণ বিদ্যমান ছিল। যদিও মোট প্রাপ্ত ভোটের দিক থেকে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে ব্যবধান খুব বেশি ছিল না (বিএনপি প্রায় ১৪০টি আসন পেয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পেয়েছিল), তবুও আওয়ামী লীগের প্রত্যাশিত বিজয় না আসার পেছনে যে কারণগুলো আলোচনা করা হয়, সেগুলো হলো:
অতি-আত্মবিশ্বাস ও আত্মম্ভরিতা: আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং দলের কর্মীদের মধ্যে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সফলতার পর একটি প্রবল আত্মবিশ্বাস কাজ করছিল যে তারাই ক্ষমতায় আসবে। এই অতি-আত্মবিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রে আত্মম্ভরিতায় রূপ নেয়, যা তাদের নির্বাচনী কৌশল এবং প্রচারণায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেকেই মনে করেন, তারা বিজয়কে নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন, যার ফলে তাদের চেষ্টা ও প্রচারণায় কিছুটা শিথিলতা আসে।
সংগঠনিক দুর্বলতা: দীর্ঘ সামরিক শাসন এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক দুর্বলতা দেখা গিয়েছিল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জনগণের ব্যাপক সমর্থন পেলেও, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা এবং ভোটারদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কিছু ত্রুটি ছিল।
প্রচারের কৌশলগত ভুল: আওয়ামী লীগ তাদের প্রচারে 'একাত্তরের চেতনা' এবং 'মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি'র উপর বেশি জোর দিয়েছিল। যদিও এটি তাদের মূল ভিত্তি, কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচনে নতুন ভোটার এবং যারা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল, তাদের কাছে নিত্যদিনের সমস্যা এবং ভবিষ্যতের সরকার কেমন হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বার্তা পৌঁছাতে পারেনি। অন্যদিকে, বিএনপি একটি অপেক্ষাকৃত নতুন দল হিসেবে দুর্নীতিমুক্ত শাসন এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে, যা ভোটারদের আকৃষ্ট করে।
নেতৃত্বের প্রশ্ন: যদিও শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, কিন্তু জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে আসা খালেদা জিয়ার প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি কাজ করছিল। বিশেষ করে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে আবেগ কাজ করেছিল।
ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা: ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বেশ কিছু আসনে জয়লাভ করে (১৮টি আসন) এবং অন্যান্য ছোট ইসলামী দলগুলোও কিছু ভোট পায়। এই ভোটগুলো মূলত আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকে ভাগ বসিয়েছিল বলে মনে করা হয়, কারণ বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে কিছুটা কৌশলগত বোঝাপড়া ছিল। নির্বাচনের পর জামায়াত বিএনপির প্রতি সমর্থনও জানিয়েছিল।
ভোট স্থানান্তরের ব্যর্থতা: আওয়ামী লীগ ভেবেছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলনের জনপ্রিয়তা তাদের ভোটে রূপান্তরিত হবে। কিন্তু গণআন্দোলনের আবেগ পুরোপুরি ভোটকেন্দ্রে প্রতিফলিত হয়নি। অনেকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকলেও, ভোট দেওয়ার সময় তারা ভিন্ন দলকে বেছে নেয়।
মিডিয়ার ভূমিকা ও জনমতের প্রভাব: সে সময় মিডিয়ার ভূমিকাও কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রতিকূলে ছিল বলে মনে করা হয়। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগা: দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর প্রথমবারের মতো একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে ছিল, তাদের গণতান্ত্রিক নির্বাচনী পদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগেছিল।
এই কারণগুলোর সম্মিলিত প্রভাবে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রত্যাশিত ফলাফল লাভে ব্যর্থ হয় এবং বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
সংবিধান প্রণয়নের পদ্ধতি
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পদ্ধতি ছিল একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটির মাধ্যমে গৃহীত এবং গণপরিষদের সম্মতিক্রমে সম্পন্ন একটি প্রক্রিয়া, যার মূল ধাপগুলো নিম্নরূপ:
সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন: ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল গণপরিষদে ৩৪ সদস্যের একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়, যার সভাপতি ছিলেন ড. কামাল হোসেন। কমিটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যেমন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এম আমীর-উল ইসলাম প্রমুখ45।
খসড়া সংবিধান প্রণয়ন: কমিটির প্রথম বৈঠক হয় ১৭ এপ্রিল ১৯৭২ এবং পরবর্তী মাসগুলো জুড়ে ধারাবাহিকভাবে ৮৫ দিন ধরে আলোচনা ও খসড়া প্রণয়ন চলে। ১০ জুন ১৯৭২-এ সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ খসড়া অনুমোদিত হয়, যা বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণ ছিল। এরপর ইংরেজি ও বাংলা ভাষ্যের আইনি ও ভাষাগত শুদ্ধতা উন্নত করার কাজ চলে4।
গণপরিষদে খসড়া বিল পেশ ও আলোচনা: ১২ অক্টোবর ১৯৭২-এ সংবিধান খসড়া বিল আকারে গণপরিষদের সামনে পেশ করা হয়। ১৯ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত গণপরিষদে সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৪৫ জন সদস্য অংশগ্রহণ করেন এবং ১৩৫টি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। আওয়ামী লীগের সদস্যরা ৮৩টি সংশোধনী প্রস্তাব দেন, যেগুলো প্রধানত ভাষাগত ও শব্দগত ছিল45।
সংশোধনী প্রস্তাবের বিবেচনা ও গৃহীত হওয়া: আওয়ামী লীগের পরামর্শে একটি ৩৩ সদস্যের উপকমিটি গঠন করা হয় যা সংশোধনী প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করে এবং অধিকাংশ সংশোধনী গৃহীত হয়4।
গৃহীত সংবিধান: ৪ নভেম্বর ১৯৭২-এ গণপরিষদে তৃতীয় ও চতুর্থ পাঠ অনুষ্ঠিত হয় এবং সংবিধানটি করতালির মাধ্যমে গৃহীত হয়। এরপর ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর গণপরিষদের সদস্যরা হাতে লেখা সংবিধানের কপিতে স্বাক্ষর করেন, প্রথমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান45।
কার্যকর হওয়া: সংবিধান ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে কার্যকর হয়, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রতিফলন ছিল16।
সংক্ষেপে
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পদ্ধতি ছিল:
স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণার পর গণপরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
ধারাবাহিক বৈঠক ও আলোচনা মাধ্যমে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন
গণপরিষদে খসড়া বিল পেশ ও সাধারণ আলোচনা
সংশোধনী প্রস্তাব বিবেচনা ও গৃহীত হওয়া
সংবিধান গৃহীত ও স্বাক্ষরিত হওয়া
নির্ধারিত দিনে সংবিধান কার্যকর করা
এই প্রক্রিয়াটি ছিল গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতামত ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছিল456।
একটি সংবিধান প্রণয়ন একটি জটিল ও বহু-পর্যায়ভিত্তিক প্রক্রিয়া, যা একটি রাষ্ট্রের মৌলিক আইন, শাসন ব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকারের কাঠামো নির্ধারণ করে। যদিও প্রতিটি দেশের নিজস্ব প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে, তবে কিছু সাধারণ ধাপ অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়াটি একটি চমৎকার উদাহরণ, যা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
সাধারণভাবে সংবিধান প্রণয়নের পদ্ধতি:
১. গণপরিষদ গঠন (Constituent Assembly Formation):
সংবিধান প্রণয়নের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো একটি গণপরিষদ বা সংবিধান সভা গঠন করা। এই পরিষদ সাধারণত জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয়, যাদের মূল কাজই হলো সংবিধান প্রণয়ন করা।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই ছিল দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। জনগণ সামরিক শাসন থেকে মুক্তি এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য উন্মুখ ছিল। এরশাদের পতনের পর জনগণের মধ্যে একটি উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, এবার একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
গণপরিষদকে সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব দেওয়া হয়, যাতে তারা স্বাধীনভাবে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধান তৈরি করতে পারে।
২. সংবিধান কমিটি গঠন ও খসড়া প্রণয়ন (Drafting Committee Formation and Drafting):
গণপরিষদ তার সদস্যদের মধ্য থেকে একটি 'সংবিধান প্রণয়ন কমিটি' বা 'খসড়া কমিটি' গঠন করে। এই কমিটি সংবিধানের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও আলোচনা করে একটি প্রাথমিক খসড়া তৈরি করে।
কমিটি বিভিন্ন দেশের সংবিধান, আইন, এবং জনগণের মতামত পর্যালোচনা করে। প্রয়োজনে জনমত জরিপ, আলোচনা সভা, এবং বিশেষজ্ঞ কমিটির সাহায্য নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে: ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম বৈঠক বসে এবং পরদিন ১১ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি ব্যাপক পর্যালোচনা ও আলোচনার পর ১৯৭২ সালের ১০ জুন সংবিধানের একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া অনুমোদন করে। কমিটি জনগণের কাছ থেকে প্রাপ্ত ৯৮টি সুপারিশও বিবেচনা করে।
৩. খসড়া সংবিধান পেশ ও সাধারণ আলোচনা (Presentation of Draft Constitution and General Discussion):
খসড়া কমিটি কর্তৃক প্রণীত সংবিধানের খসড়া গণপরিষদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
এরপর গণপরিষদের সদস্যরা খসড়া সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ, ধারা ও উপ-ধারা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও বিতর্ক করেন। এই ধাপে সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে বিতর্ক চলে এবং সদস্যরা তাদের মতামত, প্রস্তাবনা ও সংশোধনী পেশ করেন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে: ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন ১৫৩টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত ৭২ পৃষ্ঠার খসড়া সংবিধান বিল আকারে গণপরিষদের সামনে পেশ করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত এই বিলের ওপর সাধারণ আলোচনা চলে। গণপরিষদের ৪৫ জন সদস্য এই আলোচনায় অংশ নেন।
৪. নেতা, বিরোধী দলীয় ও নির্দলীয়দের বক্তব্য (Statements by Leaders, Opposition and Independents):
আলোচনার সময় সংসদীয় দলের নেতা, বিরোধী দলের নেতা এবং নির্দলীয় সদস্যরা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে খসড়া সংবিধানের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত দেন। তাদের মতামত সংবিধানের চূড়ান্ত রূপরেখায় প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. সংবিধান বিল অনুমোদন (Approval of the Constitution Bill):
সাধারণ আলোচনার পর, যদি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব থাকে, তবে সেগুলো নিয়ে ভোট গ্রহণ করা হয়। চূড়ান্তভাবে, গণপরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সংবিধানের বিলটি অনুমোদিত হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে: দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। মোট ২১টি অধিবেশনে ২০৮ দিনে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হয়।
৬. কার্যকরী হওয়া (Commencement):
গণপরিষদ কর্তৃক অনুমোদনের পর, একটি নির্দিষ্ট তারিখ থেকে সংবিধান কার্যকর হয়। এই তারিখটি সাধারণত একটি ঐতিহাসিক বা তাৎপর্যপূর্ণ দিন হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে: ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, যা বাংলাদেশের বিজয় দিবস, থেকে সংবিধান কার্যকর হয়।
৭. হাতেলেখা সংবিধান ও স্বাক্ষরদান (Handwritten Constitution and Signing Ceremony):
অনেক সময়, সংবিধানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য হাতেলেখা একটি অনুলিপি তৈরি করা হয়, যেখানে গণপরিষদের সদস্যরা স্বাক্ষর করেন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে: বাংলাদেশের সংবিধানের একটি সুন্দর হাতেলেখা অনুলিপিও তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে গণপরিষদের সদস্যরা স্বাক্ষর করেছিলেন।
এভাবে একটি দেশ তার নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, আদর্শ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করে একটি মৌলিক আইন তৈরি করে, যা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিচালনার দিকনির্দেশনা দেয়।
### **সংবিধান প্রণয়নের পদ্ধতি (Constitution-Making Process)**
সংবিধান প্রণয়ন একটি জটিল ও সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া, যা রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, নাগরিক অধিকার ও শাসনব্যবস্থা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পদ্ধতি একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ। নিচে ধাপে ধাপে সংবিধান প্রণয়নের সাধারণ পদ্ধতি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা হলো:
---
## **১. সংবিধান প্রণয়নের সাধারণ পদ্ধতি**
### **(ক) প্রস্তুতিমূলক পর্যায়**
1. **প্রস্তাবনা ও প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ:**
- স্বাধীনতা-উত্তর বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
- *উদাহরণ:* বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পর নতুন সংবিধান প্রয়োজন হয়।
2. **সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন:**
- একটি **সংবিধান কমিশন** বা **প্রণয়ন কমিটি** গঠন করা হয়।
- *উদাহরণ:* বাংলাদেশে **ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্যের কমিটি** গঠিত হয়।
### **(খ) খসড়া প্রণয়ন**
3. **আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ:**
- রাষ্ট্রের আদর্শ (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি) ঠিক করা হয়।
- *উদাহরণ:* বাংলাদেশের সংবিধানে **৪ মূলনীতি** অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
4. **জনগণের মতামত গ্রহণ (ঐচ্ছিক):**
- কিছু দেশে গণপরিষদ বা জনগণের মতামত নেওয়া হয়।
- *উদাহরণ:* ভারতের সংবিধানে গণপরিষদের মাধ্যমে আলোচনা করা হয়েছিল।
### **(গ) অনুমোদন ও কার্যকরকরণ**
5. **আইনসভা বা গণপরিষদে পাস:**
- সংবিধান খসড়া সংসদ বা বিশেষ সমাবেশে ভোটে পাস করা হয়।
- *উদাহরণ:* বাংলাদেশের সংবিধান **১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর** গণপরিষদে গৃহীত হয়।
6. **সাংবিধানিক স্বাক্ষর ও কার্যকর:**
- রাষ্ট্রপ্রধান বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়ে সংবিধান কার্যকর হয়।
- *উদাহরণ:* বাংলাদেশের সংবিধান **১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২** থেকে কার্যকর হয়।
---
## **২. বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের বিশেষ বৈশিষ্ট্য**
### **(ক) দ্রুততম সময়ে প্রণয়ন**
- **মাত্র ১০ মাসে** (মার্চ-ডিসেম্বর ১৯৭২) সংবিধান চূড়ান্ত করা হয়।
- **ড. কামাল হোসেন** কমিটির প্রধান ছিলেন, এবং **বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান** এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এটি প্রণীত হয়।
### **(খ) ৪ মূলনীতি অন্তর্ভুক্তি**
1. **জাতীয়তাবাদ**
2. **সমাজতন্ত্র** (সাম্যবাদ নয়)
3. **গণতন্ত্র**
4. **ধর্মনিরপেক্ষতা**
### **(গ) সংশোধনীর ব্যবস্থা**
- সংবিধানে **অনুচ্ছেদ ১৪২**-এ সংশোধনীর পদ্ধতি উল্লেখ আছে:
- সংসদের **দুই-তৃতীয়াংশ ভোট** প্রয়োজন।
- *ব্যতিক্রম:* মৌলিক কাঠামো (Basic Structure) পরিবর্তনযোগ্য নয় (১৫তম সংশোধনী, ২০১১)।
---
## **৩. সংবিধান প্রণয়নের অন্যান্য মডেল**
### **(ক) গণপরিষদ মডেল (Constituent Assembly)**
- *উদাহরণ:* **ভারত (১৯৫০), নেপাল (২০১৫)**।
- সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন।
### **(খ) শাসকগোষ্ঠী দ্বারা প্রণয়ন**
- *উদাহরণ:* **পাকিস্তান (১৯৭৩), থাইল্যান্ড**।
- সামরিক বা শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সংবিধান জারি।
### **(গ) আন্তর্জাতিক সহায়তায় প্রণয়ন**
- *উদাহরণ:* **ইরাক (২০০৫), দক্ষিণ সুদান**।
- জাতিসংঘ বা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়।
2. **মৌলিক অধিকার বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা** এর ভারসাম্য রাখা।
3. **ভবিষ্যতের জন্য নমনীয়তা** রাখা (যাতে পরিবর্তন সহজ হয়)।
---
## **৫. উপসংহার**
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন **একটি ঐতিহাসিক ও দ্রুততম প্রক্রিয়া** ছিল, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিফলিত করে। এটি **জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার দলিল** হিসেবে কাজ করে, তবে সময়ের সাথে সাথে **১৬টি সংশোধনী** এর রূপ পরিবর্তন করেছে। সংবিধান প্রণয়নের সফলতা নির্ভর করে **সহমর্মিতা, স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া**-এর উপর।
> ✅ **মূল শিক্ষা:** একটি স্থায়ী সংবিধানের জন্য **জনগণের অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ঐক্য** অপরিহার্য।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটাধিকার সীমিত করে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে নির্বাচিত হয়ে:
(ক) উক্ত দল থেকে পদত্যাগ করেন, অথবা
(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দেন,
তাহলে তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য বলে গণ্য হবে। তবে এই কারণে তিনি পরবর্তী নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না15।
মূল উদ্দেশ্য ও প্রভাব
৭০ নং অনুচ্ছেদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সংসদে দলের ঐক্য বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এর ফলে সংসদ সদস্যরা সাধারণত তাদের দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন না, যা দলের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করে। তবে এই বিধান সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করে এবং সংসদকে ক্ষমতাসীন দলের গৃহীত পদক্ষেপের পুতুল সংসদে পরিণত করে13।
সমালোচনা ও বিতর্ক
অনুচ্ছেদটি অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে কারণ এটি সংসদ সদস্যদের বাকস্বাধীনতা ও বিবেকের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যায়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের জন্য অনাস্থা ভোট দেওয়া থেকে সংসদ সদস্যদের বাধাগ্রস্ত করে, ফলে সরকারের প্রতি জবাবদিহিতার অভাব দেখা দেয় এবং একনায়কতন্ত্রের অভিযোগ বাড়ে। অনেক রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার কর্মী ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন134।
প্রস্তাবিত সংস্কার
বিভিন্ন সময়ে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব উঠেছে, যাতে সংসদ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন অনাস্থা ভোট, অর্থ বিল, সংবিধান সংশোধনী বিল ও রাষ্ট্র নিরাপত্তার প্রশ্নে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন। তবে সাধারণ বিল বা অন্যান্য বিষয়ে দলের সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখতে হবে বলে প্রস্তাবিত হয়েছে36।
সংক্ষেপে:
সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের দলবিরোধী ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখে এবং দল থেকে পদত্যাগ করলে সংসদ সদস্যপদ শূন্য করে। এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করলেও সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে135।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদটি সংসদ সদস্যদের জন্য দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোনো সংসদ সদস্য কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর দল ত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়।
বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অনুচ্ছেদের মূল উদ্দেশ্য হলো দলীয় আনুগত্য বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। তবে, এর সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, ৭০ নং অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের অধিকারকে সীমিত করে, যা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। কারণ, এর ফলে সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করতে সাহসী হন না।
সংক্ষেপে, সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের দলীয় অনুশাসন মানতে বাধ্য করে, অন্যথায় তাদের সদস্যপদ বাতিল হতে পারে।
### **বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদ: একটি বিশ্লেষণ**
**অনুচ্ছেদ ৭০** বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় **দলীয় শৃঙ্খলা** বজায় রাখার জন্য একটি বিতর্কিত ধারা। এটি সংসদ সদস্যদের (এমপি) **দলত্যাগ বা ভোটদানে স্বাধীনতা সীমিত** করে। নিচে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
---
## **১. অনুচ্ছেদ ৭০-এর মূল ভাষ্য**
**সংবিধানের ৭০(১) ধারা অনুযায়ী:**
> *"কোনো সংসদ-সদস্য যদি—*
> - *(ক) নিজ দলের নেতৃত্বে প্রদত্ত নির্দেশ ভিন্নভাবে ভোট দেন, বা*
> - *(খ) নিজ দল ত্যাগ করেন, বা*
> - *(গ) দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদে অনুপস্থিত থাকেন,*
> *তবে তার আসন শূন্য হবে।"*
**ব্যতিক্রম:**
- দল যদি **সংসদে ভোটদানের আগে কোনো নির্দেশ না দেয়**, তবে এমপি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন।
---
## **২. এই ধারার উদ্দেশ্য**
1. **দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা:**
- দলীয় নীতি ও ইশতেহার অনুসারে ভোটিং নিশ্চিত করা।
2. **রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা:**
- দলত্যাগ বা "**ফ্লোর-ক্রসিং**" রোধ করে সরকারের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি।
3. **জনম্যান্ডেট রক্ষা:**
- ভোটাররা যেই দলকে ভোট দেয়, সেই দলের নীতিই সংসদে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
---
## **৩. প্রভাব: ইতিবাচক vs নেতিবাচক**
| **ইতিবাচক দিক** | **নেতিবাচক দিক** |
|------------------|------------------|
| ✅ সরকারের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি (অস্থিরতা কমে) | ❌ এমপিদের **স্বাধীন চিন্তা ও বিবেকের ভোটদান** হ্রাস |
| ✅ দলীয় ইশতেহার বাস্তবায়ন সহজ | ❌ **সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা** কমে |
- **১৯৭২ সালে মূল সংবিধানে যুক্ত** হয় (সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণের জন্য)।
- **১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের** পর এই ধারা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়।
- **২০১১ সালের ১৫তম সংশোধনীতে** এই ধারা পুনরায় জোরদার করা হয়।
**বিতর্কিত ঘটনা:**
- ২০০৪ সালে **জামায়াতের এক এমপি দলত্যাগ করায়** আসন শূন্য হয়।
- ২০২৩ সালে **কোনো বিরোধী দলের এমপি ভোটদানে অনীহা** দেখালেও ধারা ৭০ প্রয়োগের ঝুঁকি থাকে।
---
## **৫. অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা**
| **দেশ** | **দলত্যাগ নীতি** |
|----------|------------------|
| **ভারত** | দলত্যাগ করলে আসন শূন্য (১০তম তফসিল) |
| **যুক্তরাজ্য** | এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন |
| **পাকিস্তান** | দলত্যাগ করলে আসন শূন্য (১৮তম সংশোধনী) |
---
## **৬. সমালোচনা ও সংস্কারের দাবি**
- **বিরোধী দলের মত:**
- এই ধারা **গণতন্ত্রকে দুর্বল** করে এবং সংসদকে "**রাবারের স্ট্যাম্প**"-এ পরিণত করে।
- **সুপারিশ:**
- **নির্দিষ্ট বিষয়ে (মৌলিক অধিকার, বাজেট) স্বাধীন ভোটদানের** অনুমতি দেওয়া।
- **দলত্যাগের শাস্তি শিথিল** করে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা।
---
### **৭. উপসংহার**
অনুচ্ছেদ ৭০ **সরকারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত** করলেও এটি **সংসদীয় গণতন্ত্রের গুণগত মান** নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ভবিষ্যতে **সুষম সংস্কার** (যেমন: নির্বাচনী এলাকার মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা) প্রয়োজন।
> ✍️ **মূল বার্তা:** এই ধারা বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার একটি "**অপরিহার্য অথচ অসম্পূর্ণ**" অংশ, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে সমন্বয় খুঁজছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলো এমন একটি শাসন ব্যবস্থা যেখানে দুইটি নির্বাচিত সরকারের মধ্যবর্তী সময়ে সাময়িকভাবে নিরপেক্ষ ও অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গ দেশের শাসনভার গ্রহণ করে থাকে। এর প্রধান কাজ সাধারণত হয় নির্বাচন পরিচালনা করা এবং নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা1।
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সূচনা হয় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর, যখন স্বৈরশাসক এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তরের পর একটি নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা হয়। পরে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ব্যবস্থায় প্রধান বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর সর্বশেষ ব্যক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাকে এক দল নিরপেক্ষ উপদেষ্টামণ্ডলী সাহায্য করে থাকে13।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা সীমিত এবং এটি স্বল্পমেয়াদী হয়, সাধারণত নতুন সরকার নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত শাসন পরিচালনা করে। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের থেকে আলাদা, কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব তুলনায় বেশি এবং রাজনৈতিক সংকটের সময় দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে2।
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রবর্তিত হয়েছিল, বিশেষ করে এরশাদের শাসনামলের নির্বাচনে ব্যাপক ভোট জালিয়াতির পর। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো নিরপেক্ষ পরিবেশে নির্বাচন করার সুযোগ পায়3।
সংক্ষেপে:
তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলো নির্বাচিত সরকারের মধ্যবর্তী সময়ে গঠিত নিরপেক্ষ, অনির্বাচিত সরকার
প্রধান কাজ: নির্বাচন পরিচালনা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা
প্রধান উপদেষ্টা সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি
স্বল্পমেয়াদী ও সীমিত ক্ষমতার সরকার
বাংলাদেশে ১৯৯০ থেকে শুরু, ১৯৯৬ সালে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়
অন্তর্বর্তী সরকারের থেকে আলাদা, কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা বেশি ও সময়কাল অনির্দিষ্ট হতে পারে123
তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলো এমন একটি অস্থায়ী ও অনির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা, যা একটি দেশে নিয়মিত নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য রাষ্ট্রীয় কার্যভার পরিচালনা করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা, যাতে কোনো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে না পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল বৈশিষ্ট্য ও কাজ
অস্থায়ী প্রকৃতি: এটি একটি স্বল্পমেয়াদী সরকার। সাধারণত নির্বাচন আয়োজন এবং নতুন সরকার গঠন পর্যন্ত এর মেয়াদ থাকে।
অনির্বাচিত ও নির্দলীয়: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্যরা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না এবং তারা নিজেরা নির্বাচনে প্রার্থী হন না। এর ফলে তাদের নিরপেক্ষতা বজায় থাকে বলে মনে করা হয়।
সীমিত ক্ষমতা: এই সরকার নীতি-নির্ধারণী বা দীর্ঘমেয়াদী কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। তাদের প্রধান কাজ হলো রুটিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা এবং একটি নিরপেক্ষ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাধারণত রাষ্ট্রপতির অধীনে থাকে।
আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন: যে দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে অবিশ্বাস ও অনাস্থা থাকে, সেখানে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ভোটারদের আস্থা অর্জনে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা
বাংলাদেশে ১৯৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা তৈরি করে।
১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়া হয়। এরপর ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়।
তবে, ২০১১ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এটি বাতিল করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই।
### **তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী?**
তত্ত্বাবধায়ক সরকার (Caretaker Government) হলো একটি **অস্থায়ী সরকার ব্যবস্থা**, যার মূল কাজ হলো **নিরপেক্ষভাবে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করা**। এটি সাধারণত সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বাধীন সরকারের পরিবর্তে **নির্বাচনকালীন সময়ে** ক্ষমতায় থাকে।
---
## **১. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈশিষ্ট্য**
✅ **অস্থায়ী প্রকৃতি:** শুধুমাত্র নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত হয় (সাধারণত ৩ মাস)।
✅ **নিরপেক্ষতা:** রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান (প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন) নির্বাচনে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখে।
✅ **সীমিত ক্ষমতা:** নতুন নীতি প্রণয়ন বা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকে।
---
## **২. বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইতিহাস**
### **(ক) উদ্ভব ও প্রয়োজনীয়তা**
- **১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর** প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় (প্রধান বিচারপতি **শাহাবুদ্দিন আহমেদ**-এর নেতৃত্বে)।
- **১৯৯৬ সালে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী** দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়।
### **(খ) গঠন পদ্ধতি**
- **প্রধান উপদেষ্টা** (সাধারণত সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি) এবং ১০ জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে গঠিত হতো।
- **নির্বাচন শেষে** ক্ষমতা বিজয়ী দলের হাতে হস্তান্তর করা হতো।
### **(গ) বাতিলকরণ**
- **২০১১ সালের ১৫তম সংশোধনী** দ্বারা এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।
- **কারণ:**
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিজেই **বিতর্কিত** হয়ে উঠেছিল (২০০৬-০৮ সালের সংকট)।
- সুপ্রিম কোর্ট **এটিকে অসাংবিধানিক** ঘোষণা করে (২০১০)।
---
## **৩. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক**
| **ইতিবাচক** | **নেতিবাচক** |
|--------------|--------------|
| ✅ নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করে | ❌ **নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ** (২০০৬-০৮ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের দিকে পরিচালিত করে) |
| ✅ ক্ষমতা হস্তান্তরে স্বচ্ছতা আনে | ❌ **সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক** (কারণ এটি নির্বাচিত সরকারের বিকল্প) |
| ✅ রাজনৈতিক সংঘাত কমায় | ❌ **আন্তর্জাতিক চাপ** তৈরি করে (গণতন্ত্রে বাধা হিসেবে দেখা হয়) |
---
## **৪. অন্যান্য দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার**
- **ভারত:** নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন হয় না।
- **পাকিস্তান:** নির্বাচনকালে একটি **নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার** গঠিত হয়।
- **যুক্তরাজ্য:** প্রধানমন্ত্রীর সরকারই নির্বাচন পরিচালনা করে।
---
## **৫. বর্তমান বাংলাদেশে কী ব্যবস্থা রয়েছে?**
- **১৫তম সংশোধনী (২০১১) অনুযায়ী,** এখন নির্বাচনকালে **বর্তমান সংসদীয় সরকারই** দায়িত্ব পালন করে।
- **নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন**ভাবে কাজ করতে দেওয়া হয় (যদিও বিরোধী দলগুলি এটিকে **নিরপেক্ষ মনে করে না**)।
---
### **৬. উপসংহার**
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল বাংলাদেশের **রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি পরীক্ষামূলক মডেল**, যা শেষ পর্যন্ত **সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ** বিবেচিত হয়ে বাতিল করা হয়। বর্তমানে **নির্বাচনী অবাধ ও নিরপেক্ষতা** নিয়ে বিতর্ক চলমান থাকলেও, এটি এখন **নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সদিচ্ছার** উপর নির্ভরশীল।
> 📌 **মূল প্রশ্ন:** "তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই কি সত্যিকার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব?"—এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তাৎপর্য ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর মূল দিকগুলো হলো:
গণতান্ত্রিক শাসনে প্রত্যাবর্তন: ১৯৯০ সালে সামরিক শাসক জেনারেল এইচ এম এরশাদের পতনের পর এটি ছিল প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যা নিরপেক্ষ সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সূচনা হয়145।
সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন: এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতির পরিবর্তে সংসদীয় শাসন চালু হয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে, যা সংসদীয় ব্যবস্থার প্রথম সরকার হিসেবে গণ্য হয়7।
রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা: আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ মোট ৭৫টি দল ও ২৭৮৭ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করে। বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে, আওয়ামী লীগ পায় ৮৪টি আসন137।
নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা: নির্বাচনে মোট ভোটগ্রহণ ছিল প্রায় ৫৫.৪%, এবং নির্বাচনের পরিবেশ তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল148।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন: নির্বাচনের আগে দুই প্রধান দল পরস্পরের প্রতি আক্রমণাত্মক না হওয়ায় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কিছু বিতর্ক ও অভিযোগও ছিল5।
গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা: এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং পরবর্তী নির্বাচনের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করে38।
সারাংশে, ১৯৯১ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের সামরিক শাসনের পর গণতান্ত্রিক শাসনে প্রত্যাবর্তন এবং সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের সূচনা হিসেবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল। এরশাদের দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর এটি ছিল দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ। এই নির্বাচনের তাৎপর্যগুলো নিম্নরূপ:
১. গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা ও সংসদীয় পদ্ধতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা:
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য ছিল বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা। দীর্ঘ সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। যদিও সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পরবর্তী সময়ে পাস হয়, তবে এই নির্বাচনই সংসদীয় পদ্ধতির দিকে দেশকে পরিচালিত করার প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করে।
২. প্রথমবারের মতো একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন:
১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই নির্বাচন সফলভাবে আয়োজন করে। এটি ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য একটি মডেল স্থাপন করে, যা ১৯৯৬ সালে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী রূপে অন্তর্ভুক্ত হয়।
৩. জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা:
এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ দীর্ঘ ৯ বছর পর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়। এতে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ফিরে আসে এবং তারা নিজেদের সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে।
একটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির স্থাপন হয়, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক ছিল।
৪. বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ ও নারী নেতৃত্বের উত্থান:
এই নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে।
৫. রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ:
এই নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ নিয়ে আসে। বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতায় আসা বিএনপি - উভয়কেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য গড়ে উঠেছিল, তার একটি সফল প্রতিফলন ঘটে এই নির্বাচনে।
৬. সাংবিধানিক সংস্কারের পথ উন্মোচন:
এই নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংবিধানে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনার পথ খুলে দেয়। বিশেষত, দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসার আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়।
৭. অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের একটি উদাহরণ:
১৯৯১ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অপেক্ষাকৃত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার মানদণ্ড নির্ধারণে সহায়তা করে।
সব মিলিয়ে, ১৯৯১ সালের নির্বাচন শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভোটাধিকার এবং জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ একটি ঘটনা। এর বহুমুখী তাৎপর্য নিম্নরূপ:
গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার
দীর্ঘ নয় বছরের সামরিক শাসনের অবসানের পর এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের জনগণ স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম।
সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন
এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হন সরকার প্রধান এবং রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে থাকেন।
নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের নজির
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সর্বজনস্বীকৃত নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের নজির স্থাপন করে। এটি ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে।
দ্বিদলীয় রাজনীতির সূচনা
এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে মূলত দ্বিদলীয় রাজনীতির সূচনা হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং পরবর্তী দশকগুলোতে এই দুই দলের মধ্যেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে।
নারী নেতৃত্বের স্বীকৃতি
খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের একটি নতুন যুগের সূচনা হয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন
নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি সরকার বাজার অর্থনীতি ও উদারীকরণ নীতি গ্রহণ করে। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর
এই নির্বাচন প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর সম্ভব। এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়, কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচন এই ব্যবস্থার সফলতা প্রমাণ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য পথ প্রশস্ত করে।
এভাবে ১৯৯১ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয় এবং আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো গঠনে মৌলিক ভূমিকা পালন করে।
নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্বগুলো হলো:
নির্বাচন পরিচালনা: জাতীয় সংসদ, রাষ্ট্রপতি, স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য সকল নির্বাচনের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ আয়োজন নিশ্চিত করা।
ভোটার তালিকা প্রস্তুতি ও হালনাগাদ: ভোটারদের সঠিক তালিকা তৈরি ও নিয়মিত হালনাগাদ করা যাতে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারে।
নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ: নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ করা এবং সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা করা।
নির্বাচনী নিয়মাবলী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন: নির্বাচন সংক্রান্ত আইন, বিধি-বিধান প্রণয়ন ও তাদের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা: নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
অভিযোগ তদন্ত ও প্রতিকার: নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ।
স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা: নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, যাতে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত হয়।
নির্বাচনী প্রযুক্তি ব্যবহারে নেতৃত্ব: ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রয়োগসহ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়া উন্নত করা।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রসার: প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন ভোটিং পদ্ধতি যেমন প্রক্সি ভোটিং, পোস্টাল ভোটিং, অনলাইন ভোটিং প্রবর্তনের সম্ভাবনা যাচাই ও বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৯ এর আওতায় গঠিত একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনাররা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। কমিশন সচিবালয় ঢাকায় অবস্থিত এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা নির্বাচন অফিস রয়েছে, যা মাঠ পর্যায়ে কাজ করে6124।
নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন কমিশনের প্রধান কাজ হল রাষ্ট্রপতি ও সংসদের নির্বাচন পরিচালনা, ভোটার তালিকা তৈরি, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, এবং অন্যান্য নির্বাচন পরিচালনা. এটি একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা যা নির্বাচন প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করে এবং নিশ্চিত করে যে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়.
নির্বাচন কমিশনের আরও বিস্তারিত দায়িত্বগুলো হলো:
ভোটার তালিকা প্রস্তুত:
নির্বাচন কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল ভোটার তালিকা তৈরি এবং তা নিয়মিতভাবে যাচাই করা.
নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ:
নির্বাচন কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ এবং তা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা.
নির্বাচন পরিচালনা:
নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি ও সংসদের নির্বাচন পরিচালনা করে, এছাড়াও অন্যান্য নির্বাচন যেমন স্থানীয় সরকার নির্বাচনও পরিচালনা করে.
নির্বাচন সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন তৈরি:
নির্বাচন কমিশন নির্বাচন সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন তৈরি এবং তা বাস্তবায়ন করে.
নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি:
নির্বাচন কমিশন নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি করে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে.
নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ:
নির্বাচন কমিশন নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে.
এছাড়াও, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা, প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ, ভোটগ্রহণ তদারকি এবং ফলাফল প্রকাশ করার মতো কাজও করে. নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করে যে নির্বাচন প্রক্রিয়া সকলের জন্য উন্মুক্ত এবং অংশগ্রহণমূলক হয়.
### **নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও কার্যাবলী**
নির্বাচন কমিশন (EC) একটি **স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা** যার মূল দায়িত্ব হলো **সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন** নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের সংবিধানের **অনুচ্ছেদ ১১৮-১২৬** এ এর ক্ষমতা ও কার্যক্রম বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে এর প্রধান দায়িত্বসমূহ বিশ্লেষণ করা হলো:
---
## **১. নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব**
### **(ক) নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ**
- জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন) এবং উপজেলা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা।
- **উদাহরণ:** ১২তম সংসদ নির্বাচন-২০২৪ এর সময়সূচি নির্ধারণ।
### **(খ) ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও হালনাগাদ**
- **জাতীয় ভোটার তালিকা** তৈরি ও সংশোধন (বায়োমেট্রিক সিস্টেম ব্যবহার)।
- মৃত, অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অযোগ্য ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া।
### **(গ) নির্বাচনী এলাকা পুনঃনির্ধারণ**
- জনসংখ্যার ভিত্তিতে **সংসদীয় ও স্থানীয় আসনের সীমানা** পুনর্বিন্যাস (ডেলিমিটেশন)।
নির্বাচন কমিশনের সফলতা নির্ভর করে **নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির** উপর। বাংলাদেশে এটি **সংবিধানিকভাবে স্বাধীন** হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতে **ডিজিটাল নির্বাচন ব্যবস্থা (বায়োমেট্রিক, ব্লকচেইন)** এবং **সকল দলের অংশগ্রহণ** নিশ্চিত করলে এর ভাবমূর্তি জোরদার হতে পারে।
> 📌 **মূল বার্তা:** "নির্বাচন কমিশন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, গণতন্ত্রের প্রহরী। এর সততা পুরো জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে।"
গেরিলা যুদ্ধ হলো এমন এক ধরনের যুদ্ধ পদ্ধতি যেখানে ক্ষুদ্র ও অপ্রশিক্ষিত বাহিনী বৃহৎ ও শক্তিশালী শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে ভূমি ও ভৌগোলিক সুবিধা ব্যবহার করে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে গেরিলা যোদ্ধারা হিট অ্যান্ড রান কৌশল, অন্তর্ঘাত, ক্ষুদ্র যুদ্ধ ইত্যাদি কৌশল ব্যবহার করে শত্রুকে হয়রানি ও দুর্বল করে। এই যুদ্ধ সাধারণত দুর্গম বন-জঙ্গল বা গ্রামীণ এলাকায় সংঘটিত হয় এবং এতে গেরিলারা সম্মুখযুদ্ধ এড়িয়ে চলে1234।
গেরিলা যুদ্ধের মূল বৈশিষ্ট্য হলো:
ক্ষুদ্র বাহিনীর মাধ্যমে শত্রুর ওপর আকস্মিক আক্রমণ
শত্রুর চলাচল ও সরবরাহ লাইন বিঘ্নিত করা
দ্রুত আক্রমণ করে দ্রুত সরে আসা (হিট অ্যান্ড রান)
সাধারণ জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রয়োজন
শক্তির অসমতা থাকায় সম্মুখযুদ্ধ এড়ানো
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা
বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ছিল, যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে গেরিলা কৌশলে লড়াই করেছিল। তারা সাধারণত গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে গেরিলা ঘাঁটি গঠন করে অপারেশন পরিচালনা করত25।
সংক্ষেপে, গেরিলা যুদ্ধ হলো একটি বিশেষ রণকৌশল যা ছোট দল বা বাহিনী ব্যবহার করে বড় ও শক্তিশালী শত্রুকে অপ্রত্যাশিত ও গতিশীল আক্রমণের মাধ্যমে পরাজিত করার চেষ্টা করে।
গেরিলা যুদ্ধ হলো একটি বিশেষ ধরনের অপ্রচলিত যুদ্ধ কৌশল যেখানে ছোট ছোট সশস্ত্র দল বা বাহিনী শত্রুর বিরুদ্ধে আকস্মিক আক্রমণ, অতর্কিত হামলা এবং হিট-অ্যান্ড-রান কৌশল ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনা করে।
গেরিলা যুদ্ধের মূল বৈশিষ্ট্য
অনিয়মিত যুদ্ধ পদ্ধতি: গেরিলারা প্রচলিত সেনাবাহিনীর মতো খোলা মাঠে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয় না। তারা লুকিয়ে থেকে আক্রমণ করে এবং দ্রুত পালিয়ে যায়।
স্থানীয় জনগণের সমর্থন: গেরিলা যুদ্ধের সফলতা অনেকাংশে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ও সমর্থনের উপর নির্ভর করে। জনগণ তাদের আশ্রয়, খাবার, তথ্য এবং নতুন যোদ্ধা সরবরাহ করে।
ভৌগোলিক সুবিধা গ্রহণ: পাহাড়, জঙ্গল, দুর্গম এলাকা গেরিলাদের প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল। এসব এলাকায় তারা ঘাঁটি স্থাপন করে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালায়।
গেরিলা যুদ্ধের কৌশল
আকস্মিক আক্রমণ: শত্রুর অপ্রত্যাশিত সময়ে এবং স্থানে আক্রমণ করা। এতে শত্রুপক্ষ প্রস্তুত থাকে না এবং তাৎক্ষণিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
সাবোটাজ: রেললাইন, সেতু, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সরবরাহ লাইন ধ্বংস করে শত্রুর কার্যক্রম ব্যাহত করা।
চলমান যুদ্ধ: একস্থানে দীর্ঘসময় অবস্থান না করে ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করা এবং বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ চালানো।
ঐতিহাসিক উদাহরণ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১): মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা কৌশল ব্যবহার করে। তারা গ্রামাঞ্চলে, হাওর এলাকায় এবং সীমান্ত অঞ্চলে ঘাঁটি স্থাপন করে নিয়মিত আক্রমণ চালায়।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ: ভিয়েত কং আমেরিকান বাহিনীর বিরুদ্ধে জঙ্গল এলাকায় গেরিলা কৌশল প্রয়োগ করে দীর্ঘ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে: মুজাহিদরা পাহাড়ি এলাকায় গেরিলা কৌশল ব্যবহার করে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে।
গেরিলা যুদ্ধের সুবিধা
শত্রুর তুলনায় কম সংখ্যক এবং কম সম্পদ নিয়েও কার্যকর প্রতিরোধ গড়া সম্ভব। শত্রুর মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে টেনে এনে তাদের ক্লান্ত করে তোলা যায়। স্থানীয় পরিস্থিতির সাথে পরিচিত থাকায় ভৌগোলিক সুবিধা নেওয়া সহজ হয়।
সীমাবদ্ধতা
গেরিলা যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং তাৎক্ষণিক ফলাফল আশা করা যায় না। শত্রুর প্রতিশোধমূলক আক্রমণের ফলে সাধারণ জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই ধরনের যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং সুসংগঠিত কৌশল প্রয়োজন।
গেরিলা যুদ্ধ মূলত দুর্বল পক্ষের শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি কার্যকর পদ্ধতি এবং ইতিহাস জুড়ে অনেক স্বাধীনতা সংগ্রাম ও প্রতিরোধ আন্দোলনে এর সফল প্রয়োগ দেখা গেছে।
গেরিলা যুদ্ধ (Guerrilla warfare) হলো এক ধরনের অপ্রচলিত যুদ্ধ যেখানে ছোট ছোট দল বা বাহিনী কোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অতর্কিত আক্রমণ, নাশকতা, হানা, এবং ক্ষুদ্র যুদ্ধ কৌশল ব্যবহার করে। এটি সাধারণত এমন স্থানে করা হয় যেখানে নিয়মিত সেনাবাহিনীর জন্য কাজ করা কঠিন, যেমন বন এবং পাহাড়।
এখানে গেরিলা যুদ্ধের কিছু বৈশিষ্ট্য এবং কৌশল উল্লেখ করা হলো:
অতর্কিত আক্রমণ:
গেরিলা বাহিনী সাধারণত বড় সেনাবাহিনীর ওপর অতর্কিতভাবে হামলা করে।
নাশকতা:
তারা সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা অবকাঠামোর ক্ষতি করে।
হানা:
তারা শত্রুকে ছোট ছোট যুদ্ধে পর্যুদস্ত করে এবং তাদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে আক্রমণ করে।
ভূমি ও ভৌগোলিক সুবিধা:
গেরিলা বাহিনী সাধারণত তাদের পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে, যেমন বন, পাহাড়, বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক বা ভৌগোলিক সুবিধা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের উপর সুবিধা অর্জন করে।
ছোট দল:
গেরিলা যুদ্ধে ছোট দল বা বাহিনী বড় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে।
উদ্দেশ্য:
গেরিলা যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো শত্রুকে হয়রানি করা, দুর্বল করা, এবং সম্ভব হলে তাদের পরাজিত করা।
ঐতিহাসিকভাবে, গেরিলা যুদ্ধ বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা ও স্ব-শাসনের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন:
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ:
বাংলাদেশে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও বিভিন্ন দেশে গেরিলা যুদ্ধের উদাহরণ দেখা যায়।
ভিয়েতন যুদ্ধ:
ভিয়েতন যুদ্ধেও গেরিলা যুদ্ধের কৌশল ব্যবহৃত হয়েছিল।
গেরিলা যুদ্ধ একটি জটিল এবং বিতর্কিত বিষয়। এটি সাধারণত একটি দুর্বল দলের দ্বারা একটি শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, এবং এতে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
১৯৭১ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়ার প্রধান কারণ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বাঙালি জনগণের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের অবজ্ঞা ও দমন-পীড়ন।
: পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত ছিল। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পশ্চিম পাকিস্তান সরকার স্বীকার না করে ক্ষমতা হস্তান্তর থেকে বিরত থাকে।
: নির্বাচনের ফলাফলকে অগ্রাহ্য করে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয় এবং বাঙালি নেতৃত্বকে দমন করা শুরু হয়। এতে বাঙালি জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়।
: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে একটি সামরিক অভিযান চালিয়ে সাধারণ বাঙালি, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ছাত্র ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গণহত্যা শুরু করে। এই নৃশংসতা বাঙালিদের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা আরও জোরদার করে।
: পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাদের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য রক্ষা এবং রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন শুরু করে। ৭ই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেয়া হয়।
: পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচার ও গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালি জনগণ গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত হয়।
: ভারতের সমর্থন ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
১৯৭১ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয় কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা বাঙালিদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি উপেক্ষা করে, নির্বাচনের ফলাফল অগ্রাহ্য করে, এবং সামরিক বাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়ন ও গণহত্যার মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্তেজনা ও প্রতিরোধকে উস্কে দেয়। এই পরিস্থিতি স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে14।
১৯৭১ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেওয়ার পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনা দায়ী ছিল।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা
১৯৪৭ সাল থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক আধিপত্যের শিকার ছিল। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব পেত না। ক্ষমতার কেন্দ্র সবসময় পশ্চিম পাকিস্তানে থাকত।
১৯৭০ সালের নির্বাচনী ফলাফল অস্বীকার
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ১৬০টি আসন পায়। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই নির্বাচনী রায় মেনে নিতে অস্বীকার করে। তারা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব করতে থাকে।
ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর ষড়যন্ত্র
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো একযোগে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা লাভ রোধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। ৩ মার্চের নির্ধারিত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা এই ষড়যন্ত্রের প্রকাশ।
পূর্ব পাকিস্তানে গণঅভ্যুত্থান
জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের পর পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয়। শেখ মুজিব অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। সরকারি কার্যালয়, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার আওয়ামী লীগের হাতে চলে আসে।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ
রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে। "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম" - এই ঘোষণা জনগণের মধ্যে যুদ্ধের মানসিকতা তৈরি করে।
২৫ মার্চের কালরাত্রি
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ২৫ মার্চ রাতে "অপারেশন সার্চলাইট" নামে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দফতরে নির্বিচার গণহত্যা চালানো হয়।
শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতার
২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পূর্বে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা ওয়ারলেসের মাধ্যমে সারাদেশে প্রচারিত হয়।
সশস্ত্র প্রতিরোধের শুরু
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস আক্রমণের পর শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। বাঙালি সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বিদ্রোহ করে। চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের পক্ষে যায়। ভারত শরণার্থীদের আশ্রয় দেয় এবং মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা প্রদান শুরু করে।
জনগণের প্রতিরোধের মানসিকতা
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক নিপীড়নের ফলে বাঙালি জাতির মধ্যে প্রতিরোধের মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ডের পর এই মানসিকতা সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়।
এভাবে রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ পথ যখন বন্ধ হয়ে গেল এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সামরিক শক্তি প্রয়োগ করল, তখন বাঙালি জাতির কাছে সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকল না। এই পরিস্থিতিতেই ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়।
১৯৭১ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূলত পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষের মধ্যে স্বাধিকার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। এই আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে सशस्त्र সংগ্রামে রূপ নেয়, কারণ পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারগুলি পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকৃত ছিল।
এখানে কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো:
রাজনৈতিক বৈষম্য:
পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অধিকার পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করে আসছিল, কিন্তু তাদের দাবিগুলি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক অগ্রাহ্য করা হতো।
অর্থনৈতিক বৈষম্য:
পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অনেক দুর্বল ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ শোষণ করে, যা জনগণের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করে।
ভাষা ও সংস্কৃতি:
পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা এবং সংস্কৃতি পশ্চিম পাকিস্তানের থেকে ভিন্ন ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা এবং সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করত, যা জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে।
গণতন্ত্রের প্রতি অনাস্থা:
পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে গণতন্ত্রের প্রতি অনাস্থা ছিল, কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে রাজি ছিল না।
অসহনীয় অত্যাচার:
পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক ব্যাপক অত্যাচার এবং নির্যাতন চালানো হতো। এই অত্যাচার জনগণের মধ্যে আরও বেশি ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
এই সব কারণে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের গুরুত্ব
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন হলো জনগণের সার্বভৌমত্বের বহিঃপ্রকাশ এবং শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণের প্রধান মাধ্যম। এর গুরুত্ব নিম্নরূপ:
জনগণের ক্ষমতার উৎস হিসেবে নির্বাচন: গণতন্ত্রে সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। নির্বাচন হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে শাসন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে36।
শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ: নির্বাচন জনগণের মতামত ও ইচ্ছার প্রকাশ ঘটায় এবং তাদের শাসন ব্যবস্থায় সরাসরি বা পরোক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়1।
সরকার গঠনের বৈধতা ও জবাবদিহিতা: নির্বাচনের মাধ্যমে যে দল বা ব্যক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তারাই সরকার গঠন করে। এটি সরকারের বৈধতা নিশ্চিত করে এবং জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা বাড়ায়5।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ঐক্য: সুষ্ঠু নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সংলাপের সুযোগ দেয়, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ঐক্য গড়ে তুলতে সাহায্য করে5।
গণতন্ত্রের বিকাশ ও সংস্কারের প্রেরণা: নির্বাচন জনগণের মতামত জানিয়ে দেয়, যা শাসকগোষ্ঠীকে সংস্কার ও উন্নতির পথে পরিচালিত করে। এটি গণতন্ত্রকে জীবন্ত ও গতিশীল রাখে12।
রাজনৈতিক দল ও প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ: আধুনিক গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন একে অপরের পরিপূরক। নির্বাচন ছাড়া দলগুলোর কার্যক্রম ও শাসনব্যবস্থা কার্যকর হয় না5।
জনগণের অধিকারের সুরক্ষা: নির্বাচন জনগণকে তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে সক্ষম করে, যা গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তি13।
সারসংক্ষেপ
নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রমাণ, শাসনব্যবস্থায় তাদের অংশগ্রহণের প্রধান মাধ্যম এবং সরকারের বৈধতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তি। এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ঐক্য ও গণতন্ত্রের বিকাশে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে জনগণ তাদের সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করে এবং শাসন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে।
জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা
নির্বাচন গণতন্ত্রের মূলভিত্তি "জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস" এই নীতিকে বাস্তবায়িত করে। প্রতিটি নাগরিক তার ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে। এটি নিশ্চিত করে যে সরকারের বৈধতা জনগণের সম্মতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।
প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠন
নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। এই প্রতিনিধিরা জনগণের পক্ষে সরকার পরিচালনা করেন এবং তাদের স্বার্থ রক্ষা করেন। এর ফলে একটি বৈধ ও জনকল্যাণমুখী সরকার গঠিত হয়।
ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর
নির্বাচন ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের পথ সুগম করে। জনগণের রায়ের ভিত্তিতে সরকার পরিবর্তন হয়, যা সহিংসতা বা অভ্যুত্থানের প্রয়োজনীয়তা দূর করে। এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তি বজায় রাখে।
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
নিয়মিত নির্বাচন শাসকদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। সরকার জানে যে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য পরবর্তী নির্বাচনে জবাব দিতে হবে। এটি দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা রোধ করে এবং সুশাসন নিশ্চিত করে।
জনমতের প্রতিফলন
নির্বাচন জনমতের একটি নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন অংশের চিন্তাভাবনা ও প্রত্যাশা প্রকাশ পায়। এটি নীতিনির্ধারকদের জনগণের প্রকৃত চাহিদা বুঝতে সাহায্য করে।
রাজনৈতিক অংশগ্রহণ উৎসাহিতকরণ
নির্বাচন নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে। ভোট দেওয়া, প্রচারণায় অংশ নেওয়া, রাজনৈতিক আলোচনায় যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে জনগণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশে অবদান রাখে।
বিকল্প নীতি ও কর্মসূচির পছন্দ
নির্বাচন জনগণকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নীতি ও কর্মসূচির মধ্যে পছন্দ করার সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয় এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন হয়।
সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা
গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা সংখ্যালঘু মতামত ও স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। সংসদে বিরোধী দল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের উপস্থিতি সামাজিক ন্যায়বিচার ও সকলের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা পালন করে।
রাজনৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা
নির্বাচনী প্রক্রিয়া জনগণের রাজনৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করে। নির্বাচনী প্রচারণা, বিতর্ক ও আলোচনার মাধ্যমে মানুষ রাজনৈতিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালীকরণ
নিয়মিত নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, সংসদ এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরীক্ষিত ও উন্নত হয়।
সামাজিক সংহতি ও একতা
নির্বাচন বিভিন্ন মতাদর্শ ও স্বার্থের মানুষদের একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একত্রিত করে। এটি সামাজিক বিভাজন কমিয়ে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধিতে সহায়ক।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা
নির্বাচিত সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকায় তারা জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণে উৎসাহী হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখে।
নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি গণতান্ত্রিক সমাজের প্রাণশক্তি। এর মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশের জন্য অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অপরিহার্য।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন একটি মৌলিক স্তম্ভ, যা জনগণের ইচ্ছাকে প্রতিফলিত করে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকার গঠন করে। এটি জনগণের স্ব-শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধতা নিশ্চিত করে।
নির্বাচনের গুরুত্ব:
গণতন্ত্রের ভিত্তি:
নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এর মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে, যারা তাদের পক্ষে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
জনগণের সার্বভৌমত্ব:
নির্বাচন জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রকাশ। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়, যা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া:
নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। এটি জনগণের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের সুযোগ করে।
দায়িত্বশীল সরকার:
নির্বাচন সরকারের জন্য একটি জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া তৈরি করে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হয় এবং তাদের কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাব দিতে হয়।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা:
নিয়মিত নির্বাচন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আস্থা তৈরি করে এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার পরিবর্তন নিশ্চিত করে।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ:
নির্বাচন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে। এটি জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং গণতন্ত্রের প্রতি তাদের বিশ্বাস স্থাপন করে।
গণতন্ত্রের পরিমার্জিত রূপ:
নির্বাচন জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে। এটি জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং গণতন্ত্রের সঠিক পথে পরিচালিত হতে সাহায্য করে।
নিরপেক্ষ নির্বাচন:
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এটি জনগণের ইচ্ছাকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে এবং সরকারের বৈধতা নিশ্চিত করে।
রাজনৈতিক দলের ভূমিকা:
নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জনগণের সাথে সংযোগ স্থাপন এবং তাদের নীতি ও কর্মসূচি প্রচারের সুযোগ তৈরি করে।
No comments:
Post a Comment