Search This Blog

Wednesday, October 29, 2025

POL-401 Governance: Issues and Problems (with special reference to Bangladesh) শাসনব্যবস্থা: সংস্করণ এবং সমস্যা ( বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে)

 Professor Dr. Farid Uddin Ahmed


১) শাসনের নতুন ধারণা কি, সমাজবিজ্ঞানে শাসন কিভাব আত্মপ্রকাশ করলো, শাসনের ঐতিহাসিক পটভূমি

  

শাসন (Governance) মোটামুটি বলতে গেলে সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্ষমতা ব্যবহার, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। নতুন ধারণায় “শাসন” শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকান্ড না হয়ে সরকার, বাজার, গৃহস্থালি, স্থানীয় গোষ্ঠী ও বেসরকারি সংস্থা—সব মিলে যে সমন্বিত প্রক্রিয়া দিয়ে সমাজকে পরিচালনা করা হয়, সেই পুরো কাঠামোকে বোঝায়file-mymensingh.portal+2


শাসনের নতুন ধারণা

  • আগে শাসনকে প্রায়ই রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের সাথে সংযুক্ত করা হতো, কিন্তু আধুনিক ধারণায় এটি বহুস্তরীয়, বহুবাহী প্রক্রিয়া (multi‑level, multi‑actor)wikipedia+1
  • বর্তমানে শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নাগরিক অংশগ্রহণ, ন্যায়ভিত্তিকতা ও কার্যকর প্রশাসনকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়; একে “সুশাসন” (Good Governance) রূপে উপস্থাপন করা হয়facebook+1

সমাজবিজ্ঞানে শাসনের আত্মপ্রকাশ

  • সমাজবিজ্ঞানে শাসনকে শুধু রাজনৈতিক‑প্রাসনিক কাঠামো না হয়ে, সমাজের মধ্যে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম‑শৃঙ্খলা ও সমলাভের সম্পর্কের একটি সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়wikipedia+1
  • রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রশাসনবিজ্ঞান ও নীতিবিজ্ঞান সমাজবিজ্ঞানের সাথে মিলিত হয়ে শাসন‑প্রক্রিয়ার উপর গবেষণা করে: যেমন কীভাবে আইন, নীতি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক আচরণ একত্রে শাসন‑ব্যবস্থা গঠন ও দৃঢ়করণ করেplasseycollege+1

শাসনের ঐতিহাসিক পটভূমি

  • প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকে মানবসমাজে শাসনের কেন্দ্র ছিল রাজা, সম্রাট, প্রভূত্বশীল গোষ্ঠী বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; তাদের নীতি ও আদেশই সমাজ‑অর্থনীতিকে পরিচালনা করতfacebook+1
  • আধুনিক ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতা, পুঁজিবাদ, যৌক্তিকীকরণ ও গণতন্ত্রের বিকাশের সাথে শাসন ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে যায় রাষ্ট্র‑নাগরিক সম্পর্ক, মানবাধিকার, সংস্থার দায়িত্ব ও মালিকানা‑বণ্টনের ধারণাwikipedia+1
  • ২০ শতকে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শাসনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে উপনিবেশবাদ, নাগরিক আন্দোলন, রাজনৈতিক বিপ্লব ও সংবিধান‑সংস্কার শাসন‑প্রক্রিয়াকে পুনর্গঠন করেছে; আজ শাসন ধারণা আরও জটিল, পারস্পরিক নির্ভরশীল এবং বহুকেন্দ্রিকsattacademy+1

চাইলে আপনি কোন প্রেক্ষাপট বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন—বাংলাদেশ/ভারত, বা সাধারণ আন্তর্জাতিক শাসন‑তত্ত্ব—তার ভিত্তিতে আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণও দেওয়া যাবে

 

 

 

এখন শাসনের ধারণা, সমাজবিজ্ঞানে এর আত্মপ্রকাশ এবং ঐতিহাসিক পটভূমি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি


শাসন (Governance): নতুন ধারণা, সমাজবিজ্ঞানীয় আত্মপ্রকাশ ও ঐতিহাসিক পটভূমি


১. শাসনের নতুন ধারণা (New Concept of Governance)

ঐতিহ্যবাহী অর্থে "শাসন" বলতে শুধু সরকারি কর্তৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে বোঝাত। কিন্তু আধুনিক যুগে এই ধারণা অনেক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক হয়েছে

নতুন শাসনের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:

রাষ্ট্র এখন একমাত্র কর্তৃপক্ষ নয় — নাগরিক সমাজ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বাজার শক্তি মিলে শাসনের কাঠামো তৈরি করে। এই বহু-অংশীদারী (multi-stakeholder) মডেলকেই বলা হয় "নতুন শাসন" বা New Governance

বিশিষ্ট তাত্ত্বিক Jan Kooiman একে বলেন "interactive governance" — যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ পারস্পরিক নির্ভরশীলতায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। Foucault-এর দৃষ্টিতে শাসন মানে শুধু আইন নয়, বরং জনগণের আচরণ, মানসিকতা ও জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল — এটিকে তিনি বলেছেন "governmentality"

আধুনিক শাসনের মূল স্তম্ভগুলো হলো: স্বচ্ছতা (transparency), জবাবদিহিতা (accountability), অংশগ্রহণমূলকতা (participation), আইনের শাসন (rule of law) এবং দক্ষতা (efficiency)


২. সমাজবিজ্ঞানে শাসনের আত্মপ্রকাশ

সমাজবিজ্ঞানে শাসনের ধারণা বিভিন্ন তাত্ত্বিক ধারায় বিকশিত হয়েছে:

ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) শাসনকে বৈধ কর্তৃত্বের (legitimate authority) প্রশ্নের সাথে যুক্ত করেন। তার তিনটি কর্তৃত্বের ধরন — ঐতিহ্যগত (traditional), ক্যারিশমাটিক (charismatic) ও আইনি-যুক্তিবাদী (legal-rational) — সমাজবিজ্ঞানে শাসনতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করে

এমিল ডুর্কহেইম (Émile Durkheim) শাসনকে সামাজিক সংহতি (social solidarity) ও সম্মিলিত চেতনার (collective conscience) সাথে সংযুক্ত করেন। তার মতে, সামাজিক নিয়মকানুনই শাসনের প্রকৃত ভিত্তি

পার্সনস ও ফাংশনালিজম — শাসনকে সামাজিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে

ফুকো ও পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম — শাসনকে ক্ষমতা-জ্ঞানের (power-knowledge) সম্পর্ক হিসেবে বিশ্লেষণ করে। শাসন শুধু উপর থেকে নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে বিদ্যমান

হ্যাবারমাস (Habermas) যোগাযোগমূলক যুক্তিবাদ (communicative rationality) ও বিতর্কমূলক গণতন্ত্রের (deliberative democracy) মাধ্যমে শাসনের বৈধতার ভিত্তি খোঁজেন

নেটওয়ার্ক গভর্ন্যান্স তত্ত্ব (Rhodes, 1997) — রাষ্ট্র, বাজার ও নাগরিক সমাজের আন্তঃসম্পর্কে তৈরি নেটওয়ার্ককেই আধুনিক শাসনের কাঠামো বলে চিহ্নিত করে


এখন একটি চিত্রের মাধ্যমে শাসনের ঐতিহাসিক বিবর্তন দেখানো হচ্ছে:---

৩. শাসনের ঐতিহাসিক পটভূমি

প্রাচীন যুগ: মেসোপটেমিয়া, মিশর, ভারত ও চীনে শাসনের প্রথম রূপ দেখা যায়। হাম্মুরাবির আইনসংহিতা (খ্রি.পূ. ১৭৫৪), কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র এবং অ্যারিস্টটলের Politics শাসনতত্ত্বের প্রাচীনতম গ্রন্থ। রাষ্ট্রকে "দেবরাজ" বা ঐশ্বরিক কর্তৃত্বের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হত

মধ্যযুগ: ইউরোপে চার্চ ও রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব শাসনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে ওঠে। ইসলামি বিশ্বে ইবনে খালদুন (১৩৭৭) তার মুকাদ্দিমা-তে রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেন — এটি আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের পূর্বসূরি

আধুনিক যুগের সূচনা (১৫০০–১৮০০): হবস, লক ও রুশো-র সামাজিক চুক্তিবাদ শাসনের নতুন ভিত্তি দেয় — রাষ্ট্রের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে। ম্যাকিয়াভেলি শাসনকে নৈতিকতা-নিরপেক্ষ ক্ষমতার কৌশল হিসেবে দেখেন

ঊনবিংশ শতক: শিল্প বিপ্লবের ফলে শ্রমিক-শ্রেণির উদ্ভব শাসনের প্রশ্নকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। মার্ক্স শাসনকে শ্রেণি-স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে, ওয়েবার আমলাতান্ত্রিক যুক্তিবাদের প্রকাশ হিসেবে দেখেন

বিংশ শতক: কল্যাণ রাষ্ট্রের উদ্ভব, দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ঔপনিবেশিকতার অবসান এবং স্নায়ুযুদ্ধ শাসনের রূপ আমূল বদলে দেয়। ১৯৮০-র দশকে থ্যাচার-রিগান যুগে নব্য-উদারনৈতিক শাসন মডেল প্রভাবশালী হয়

একবিংশ শতক ও বর্তমান: বিশ্বায়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং জলবায়ু সংকট শাসনকে আরো জটিল করেছে। এখন শাসন মানে শুধু সরকার নয় — এটি একটি বহুস্তরীয়, বহু-অভিনেতাভিত্তিক প্রক্রিয়া যেখানে রাষ্ট্র, বাজার, নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম একসাথে কাজ করে


সংক্ষেপে বলতে গেলে, শাসনের ধারণা একটি রৈখিক বিবর্তনের পথে এসেছে — দেবরাজ থেকে চুক্তিবাদ, চুক্তিবাদ থেকে কল্যাণ রাষ্ট্র, এবং সেখান থেকে আজকের নেটওয়ার্ক গভর্ন্যান্সে। সমাজবিজ্ঞান এই যাত্রার প্রতিটি ধাপকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করেছে এবং নতুন প্রশ্ন তুলেছে

 

 

 

আপনার প্রশ্নটি সমাজবিজ্ঞানে “শাসন” (Governance) ধারণাটির বিবর্তন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে। নিচে ধারাবাহিকভাবে উত্তর দেওয়া হলো

 

### ১. শাসনের নতুন ধারণা কী?

 

শাসন” শব্দটির প্রচলিত অর্থ ছিল সরকারি কর্তৃত্ব ও প্রশাসন। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিক থেকে বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার প্রচারণায় **শাসনের নতুন ধারণা** জনপ্রিয় হয়। এই নতুন ধারণার মূল কথা হলো:

 

* **শুধু সরকার নয়:** শাসন এখন শুধু রাষ্ট্র বা সরকারের কাজ নয়; বরং রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত ও সুশীল সমাজের (এনজিও, কমিউনিটি গ্রুপ) মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া

* **সুশাসন (Good Governance):** এখানে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ, আইনের শাসন, সমতা ও কার্যকারিতার ওপর জোর দেওয়া হয়

* **নেটওয়ার্ক ও অংশীদারিত্ব:** নতুন ধারণায় শাসনকে একটি অনুক্রমিক (hierarchical) কর্তৃত্ব না ভেবে জটিল সামাজিক নেটওয়ার্ক ও বহু-স্তরের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিচালিত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়

* **বিকেন্দ্রীকরণ:** ক্ষমতার বণ্টন, স্থানীয় শাসন ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ

 

সংক্ষেপে, পুরনো ধারণায় শাসন = সরকারি কর্তৃত্ব, নতুন ধারণায় শাসন = সকল স্টেকহোল্ডারের সম্মিলিত প্রক্রিয়া

 

### ২. সমাজবিজ্ঞানে শাসন কীভাবে আত্মপ্রকাশ করলো?

 

সমাজবিজ্ঞানে শাসন ধারণাটি আত্মপ্রকাশ করেছে ধাপে ধাপে:

 

* **১৯৮০-এর দশকের শেষ:** বিশ্বব্যাংক যখন আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য ঋণ শর্তে “সুশাসন” প্রয়োগ করে, তখন অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় এটি আসে। সমাজবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন এটি শুধু প্রশাসনিক কৌশল নয়, বরং ক্ষমতা, শ্রেণি, লিঙ্গ, জাতি ইত্যাদি সামাজিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করে

* **১৯৯০-এর দশক:** ইউরোপীয় সমাজবিজ্ঞানী যেমন **মিশেল ফুকো**-র “সরকারসত্তা” (Governmentality) ধারণা শাসন বিশ্লেষণে প্রভাব ফেলে। ফুকো দেখান, শাসন কেবল রাষ্ট্রের নয়, বরং কীভাবে ব্যক্তি নিজেকে ও অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করে সেটিও শাসনের আওতায় আসে

* **২০০০-এর পরে:** বিশ্বায়নের ফলে জাতি-রাষ্ট্রের সীমা অতিক্রম করে শাসনের বহু-স্তর বিশ্লেষণ শুরু হয়। সমাজবিজ্ঞানে **জেমস রোজেনাউ**-র “শাসন ব্যতীত সরকার” ধারণা আলোচিত হয়। এছাড়া পরিবেশ, স্বাস্থ্য, ডিজিটাল বিশ্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে শাসন কীভাবে কাজ করে সেটিও সমাজবিজ্ঞানের বিষয় হয়

 

সুতরাং, সমাজবিজ্ঞানে শাসনের আত্মপ্রকাশ মূলত উন্নয়ন আলোচনার মাধ্যমে, পরে তা ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, নেটওয়ার্ক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে রূপ নেয়

 

### ৩. শাসনের ঐতিহাসিক পটভূমি

 

শাসনের ঐতিহাসিক পটভূমি কয়েকটি পর্বে ভাগ করা যায়:

 

| পর্ব | সময়কাল | বৈশিষ্ট্য ও উদাহরণ |

|------|---------|----------------------|

| **প্রাচীন ও ধ্রুপদি শাসন** | সভ্যতার শুরু – ১৮শ শতক | সাম্রাজ্যবাদী, রাজকীয় আদেশ ও আইন। গ্রিক নগর-রাষ্ট্রে (পোলিস) সরাসরি জনসভার শাসন। মৌর্য ও গুপ্ত যুগে পঞ্চায়েত ও শাস্ত্রীয় আইন। |

| **আধুনিক রাষ্ট্রের উত্থান** | ১৬৪৮ (ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তি) – ১৯শ শতক | জাতি-রাষ্ট্রের জন্ম, আমলাতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে কেন্দ্রীভূত শাসন। জন লক ও রুশোর চুক্তি তত্ত্ব। |

| **কলোনিয়াল শাসন** | ১৮–২০শ শতক | উপনিবেশে রাষ্ট্র ও বেসরকারি ট্রেডিং কোম্পানির (ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি) যৌথ শাসন। এখানে কোম্পানি শাসন ছিল “শাসন ব্যতীত সরকার”-এর প্রথম উদাহরণ। |

| **গণতান্ত্রিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র** | ১৯৪৫–১৯৮০ | দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্র উন্নয়ন ও বিতরণের কেন্দ্রবিন্দু হয়। এটিকে “গভর্নমেন্ট” বলাই যথেষ্ট ছিল। |

| **নব্য-উদার ও সুশাসনের যুগ** | ১৯৮০-বর্তমান | রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে শাসনের নতুন ধারণার উদ্ভব। রাষ্ট্রের আকার ছোট, বেসরকারি ও এনজিওর ভূমিকা বাড়ে। |

| **ডিজিটাল ও বৈশ্বিক শাসন** | ২০০০-বর্তমান | সাইবার শাসন, জলবায়ু শাসন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর (ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ) বহু-স্তরীয় শাসন। |

 

**সারসংক্ষেপ:** শাসনের ধারণা ঐতিহাসিকভাবে রাজার একচ্ছত্র ক্ষমতা থেকে শুরু করে, আধুনিক রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র অতিক্রম করে, বর্তমানে বৈশ্বিক ও ডিজিটাল পর্যায়ে বহু-অভিনেতার সম্মিলিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। সমাজবিজ্ঞান এ প্রক্রিয়ার ক্ষমতার গতিবিধি, বৈষম্য, অংশগ্রহণ ও সামাজিক নির্মাণ বিশ্লেষণ করে

 

 

 

সমাজবিজ্ঞানে শাসনের নতুন ধারণা” (New Concept of Governance/Governmentality) বলতে বোঝায়—শুধু রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক আইন ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সমাজ পরিচালনা নয়; বরং রাষ্ট্র, বাজার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—সব মিলিয়ে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া


শাসনের নতুন ধারণা কী?

প্রথাগত ধারণায় শাসন মানে ছিল রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগ। কিন্তু আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে শাসনকে দেখা হয়—

  • অংশগ্রহণমূলক,
  • বিকেন্দ্রীভূত,
  • নেটওয়ার্কভিত্তিক,
  • সহযোগিতামূলক,
  • এবং বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়া হিসেবে

এখানে সরকার একমাত্র নিয়ন্ত্রক নয়; বরং বিভিন্ন সামাজিক শক্তি একসঙ্গে নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে অংশ নেয়

নতুন শাসন ধারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য

  1. জনঅংশগ্রহণ
    নাগরিকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করা
  2. জবাবদিহিতা
    শাসকদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকা
  3. স্বচ্ছতা
    প্রশাসনিক কার্যক্রম উন্মুক্ত রাখা
  4. বিকেন্দ্রীকরণ
    ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া
  5. সুশাসন (Good Governance)
    দক্ষ, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা

সমাজবিজ্ঞানে শাসনের ধারণা কীভাবে আত্মপ্রকাশ করল?

সমাজবিজ্ঞানে শাসনের ধারণা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল—

১. আধুনিক রাষ্ট্রের বিকাশ

শিল্পবিপ্লব ও আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের ফলে সমাজকে সংগঠিতভাবে পরিচালনার প্রয়োজন দেখা দেয়

২. সমাজের জটিলতা বৃদ্ধি

শহরায়ণ, শিল্পায়ন ও বিশ্বায়নের ফলে সমাজে বিভিন্ন গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান ও স্বার্থের উদ্ভব হয়। ফলে কেবল সরকার দিয়ে সব সমস্যা সমাধান সম্ভব হয়নি

৩. কল্যাণরাষ্ট্রের উত্থান

২০শ শতকে রাষ্ট্র শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে। এতে শাসনের পরিধি বিস্তৃত হয়

৪. মিশেল ফুকোর “Governmentality”

Michel Foucault শাসনকে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, বরং মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে—

মানুষকে এমনভাবে পরিচালিত করা যাতে তারা নিজেরাই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে

এই ধারণা সমাজবিজ্ঞানে “নতুন শাসন” তত্ত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে

৫. বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিক সংস্থা

World Bank, United Nations প্রভৃতি সংস্থা “Good Governance” ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে


শাসনের ঐতিহাসিক পটভূমি

প্রাচীন যুগ

প্রাচীন সমাজে শাসন ছিল মূলত রাজতান্ত্রিক ও ধর্মভিত্তিক। রাজাকে ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতার অধিকারী মনে করা হতো

উদাহরণ:

  • প্রাচীন মিশর
  • ভারতীয় রাজতন্ত্র
  • গ্রিক নগররাষ্ট্র

মধ্যযুগ

এই সময়ে সামন্তবাদী শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। রাজা, জমিদার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতা বিভক্ত ছিল


আধুনিক যুগ

সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব

Thomas Hobbes, John Locke এবং Jean-Jacques Rousseau রাষ্ট্র ও শাসনের বৈধতা ব্যাখ্যা করেন

তাঁদের মতে—

  • মানুষ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য রাষ্ট্র গঠন করেছে
  • জনগণের সম্মতিই শাসনের ভিত্তি

শিল্পবিপ্লবের পর

শিল্পায়নের ফলে প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের গুরুত্ব বাড়ে

Max Weber আধুনিক আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ধারণা দেন। তিনি বলেন—

  • নিয়ম,
  • দক্ষতা,
  • এবং কর্তৃত্বের কাঠামো

আধুনিক শাসনের মূল ভিত্তি


সমকালীন যুগ

বর্তমানে শাসন ধারণা রাষ্ট্রকেন্দ্রিকতা থেকে সরে এসে “গভর্ন্যান্স” বা সমন্বিত শাসনে রূপ নিয়েছে

এখানে—

  • সরকার,
  • এনজিও,
  • বেসরকারি খাত,
  • আন্তর্জাতিক সংস্থা,
  • নাগরিক সমাজ

সবাই অংশগ্রহণ করে


উপসংহার

সমাজবিজ্ঞানে শাসনের নতুন ধারণা হলো ক্ষমতার একক কেন্দ্রীভূত রূপ থেকে বের হয়ে অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক ও সমন্বিত ব্যবস্থায় রূপান্তর। ঐতিহাসিকভাবে রাজতন্ত্র থেকে আধুনিক রাষ্ট্র, এরপর বিশ্বায়ন ও সুশাসনের ধারণা—এই ধারাবাহিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে

 

 

 

**শাসনের নতুন ধারণা (New Concept of Governance):** 

 

শাসন (Governance) বলতে ঐতিহ্যগতভাবে শুধু সরকার বা রাষ্ট্রের (Government) একক কর্তৃত্ব বোঝানো হতো না। আধুনিক ধারণায় এটি একটি **গতিশীল, অংশগ্রহণমূলক ও বহু-অংশীদারি প্রক্রিয়া**। এতে সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং নাগরিকদের মধ্যে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হয়

 

**নতুন ধারণার মূল বৈশিষ্ট্য:**

- **সরকার থেকে শাসনের স্থানান্তর** — হায়ারার্কি (উপর থেকে নির্দেশ) থেকে নেটওয়ার্ক, মার্কেট ও অংশীদারিত্বের দিকে

- **সুশাসন (Good Governance)** — স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, অংশগ্রহণ, সমতা, দক্ষতা, সাড়া প্রদান এবং ন্যায়বিচার

- **১৯৯০-এর দশক থেকে জোরদার** — বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উন্নয়নশীল দেশে সুশাসনকে উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করে

 

বব জেসপের মতে, শাসন হলো সমাজের সকল শ্রেণিকে উন্নয়নের সাথে খাপ খাওয়ানোর গতিশীল প্রক্রিয়া। এটি শুধু ক্ষমতা প্রয়োগ নয়, বরং সমষ্টিগত কল্যাণের জন্য সমন্বয়

 

**সমাজবিজ্ঞানে শাসনের আত্মপ্রকাশ:**

 

সমাজবিজ্ঞান শাসনকে **সামাজিক সম্পর্ক, ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ ও সমাজের সংগঠন** হিসেবে দেখে। এটি শুধু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (regulatory principles of modern society)

 

- সমাজবিজ্ঞানীরা (যেমন: গোরান হাইডেন) শাসনকে তুলনামূলক রাজনীতির ছাতা-ধারণা হিসেবে ব্যবহার করেন, যা রাষ্ট্রকেন্দ্রিকতার বাইরে সমাজের অন্যান্য অংশীদারদের অন্তর্ভুক্ত করে

- এটি **সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, ক্ষমতার বিতরণ, হেজেমনি (Gramsci)** এবং সম্মতির উপর ভিত্তি করে। শাসন ছাড়া সমাজে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক অখণ্ডতা বজায় রাখা কঠিন

- আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে শাসনকে **নেটওয়ার্ক, স্ব-সংগঠিত প্রক্রিয়া** হিসেবে দেখা হয় — যেখানে রাষ্ট্র একা নয়, বরং বিভিন্ন অভিনয়কারী (actors) মিলে শাসন করে

 

**শাসনের ঐতিহাসিক পটভূমি:**

 

শাসনের ধারণা প্রাচীনকাল থেকে আছে। গ্রিক শব্দ *kubernaein* (স্টিয়ার করা) থেকে এসেছে, যা প্লেটোর সময় থেকে ব্যবহৃত। প্রাচীন গ্রিসে প্লেটো আদর্শ শাসক (দার্শনিক রাজা) এর কথা বলেছেন

 

- **প্রাচীন ও মধ্যযুগ** — রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, ধর্মীয় কর্তৃত্বের মাধ্যমে শাসন

- **আধুনিককাল** — জাতিরাষ্ট্রের উত্থান, ব্যুরোক্রেসি (Weber), কল্যাণ রাষ্ট্র

- **১৯৮০-৯০ এর পর** — নয়া উদারবাদ (Neoliberalism), নতুন জনপ্রশাসন (New Public Management), বাজার ও নেটওয়ার্কের উত্থান। রাষ্ট্রের ভূমিকা “steering” (নীতি নির্ধারণ) এ সীমাবদ্ধ হয়, “rowing” (সেবা প্রদান) বেসরকারি খাতে স্থানান্তরিত হয়

 

**সারসংক্ষেপে:**  

ঐতিহাসিকভাবে শাসন ছিল কেন্দ্রীয় ও এককেন্দ্রিক। নতুন ধারণায় এটি বিকেন্দ্রীকৃত, অংশগ্রহণমূলক ও সমন্বিত। সমাজবিজ্ঞান এই পরিবর্তনকে সমাজের জটিলতা, বিশ্বায়ন ও ক্ষমতার নতুন রূপ হিসেবে বিশ্লেষণ করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুশাসনের অভাবকে উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে দেখা হয়

 

 

 

সমাজবিজ্ঞানে শাসন’ (Governance) ধারণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং গতিশীল। ঐতিহ্যগত ‘সরকার’ (Government) ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে সমাজকে সুশৃঙ্খল ও পরিচালিত করার বহুমাত্রিক প্রক্রিয়াই হলো শাসন

আপনার বোঝার সুবিধার্থে শাসনের নতুন ধারণা, সমাজবিজ্ঞানে এর আত্মপ্রকাশ এবং এর ঐতিহাসিক পটভূমি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


১. শাসনের নতুন ধারণা (The New Concept of Governance)

ঐতিহ্যগতভাবে ‘শাসন’ বলতে কেবল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষ বা সরকারের আদেশ-নির্দেশকে বোঝানো হতো। কিন্তু আধুনিক বা নতুন ধারণায় শাসন কেবল সরকারের একক কাজ নয়

নতুন ধারণা অনুযায়ী, শাসন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত (Market) এবং সুশীল সমাজ (Civil Society)এই তিন পক্ষের যৌথ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়

নতুন শাসনের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • অংশগ্রহণমূলক (Participative): শাসন ব্যবস্থায় কেবল আমলারা নন, সাধারণ নাগরিক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়
  • সুশাসন (Good Governance): ১৯৯০-এর দশকে বিশ্বব্যাংক এই ধারণাটি জনপ্রিয় করে। এর মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, আইনের শাসন, সমতা এবং কার্যকারিতা
  • নেটওয়ার্ক শাসন (Network Governance): এখানে কোনো একক কেন্দ্র থেকে আদেশ আসে না, বরং বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্থা একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করে সমাজ পরিচালনা করে
  • বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralization): ক্ষমতা কেবল কেন্দ্রের হাতে কুক্ষিগত না রেখে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া

২. সমাজবিজ্ঞানে শাসন যেভাবে আত্মপ্রকাশ করলো

সমাজবিজ্ঞানে ‘শাসন’ বা Governance-এর আত্মপ্রকাশ মূলত সমাজ পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি এবং রাষ্ট্রের ভূমিকার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ঘটেছে

ক) ‘সরকার’ থেকে ‘শাসনে’ রূপান্তর (From Government to Governance)

বিশ শতকের শেষের দিকে সমাজবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন যে, সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কেবল সরকারের প্রথাগত আইন ও পুলিশি ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট নয়। সমাজকে স্থিতিশীল রাখতে রাষ্ট্রবহির্ভূত শক্তিগুলোর (যেমন: এনজিও, ব্যবসায়ী সংগঠন, নাগরিক সমাজ) ভূমিকা বাড়ছে। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই সমাজবিজ্ঞানে ‘গভর্নেন্স’ প্রত্যয়টি গুরুত্ব পায়

খ) বিশ্বায়ন ও নব্য-উদারনীতিবাদ (Globalization and Neo-liberalism)

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে বিশ্বায়নের ফলে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসার ঘটে। রাষ্ট্র তার অনেক দায়িত্ব বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা তখন গবেষণা শুরু করেন যে, রাষ্ট্র সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না করেও কীভাবে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সামাজিক সেবা (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি) নিশ্চিত করছে। এই প্রক্রিয়াই সমাজবিজ্ঞানে নতুন শাসন তত্ত্বের জন্ম দেয়

গ) সামাজিক পুঁজি ও সুশীল সমাজের উত্থান

সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম এবং অন্যান্যরা দেখিয়েছেন যে, একটি কার্যকর সমাজের জন্য নাগরিকদের পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সামাজিক সংগঠন (Social Capital) কতটা জরুরি। সমাজবিজ্ঞানে শাসন ধারণাটি এই সুশীল সমাজের ভূমিকাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য আত্মপ্রকাশ করে


৩. শাসনের ঐতিহাসিক পটভূমি (Historical Background of Governance)

শাসনের ইতিহাস মানব সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটিকে মূলত কয়েকটি প্রধান যুগে ভাগ করা যায়:

ক) প্রাচীন ও মধ্যযুগ: কর্তৃত্ববাদী শাসন (Authoritarian Governance)

প্রাচীনকালে শাসন ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা রাজতান্ত্রিক। মিশরের ফারাও, মেসোপটেমিয়ার রাজা কিংবা প্রাচীন বাংলার রাজাদের আমল ছিল এর উদাহরণ

  • বৈশিষ্ট্য: শাসকের কথাই ছিল আইন। শাসন প্রক্রিয়ায় জনগণের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। তবে গ্রিসের অ্যাথেন্সে সীমিত পরিসরে ‘গণতান্ত্রিক শাসন’-এর সূত্রপাত হয়েছিল, যা ছিল ব্যতিক্রম

খ) আধুনিক যুগের সূচনা: জাতি-রাষ্ট্রের উত্থান (Rise of the Nation-State)

১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির (Treaty of Westphalia) মাধ্যমে আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্ম হয়

  • বৈশিষ্ট্য: শাসন ব্যবস্থা আমলাতান্ত্রিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে। টমাস হবসের 'সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' বা সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের মাধ্যমে ধারণা তৈরি হয় যে, সমাজকে বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচাতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তির (রাষ্ট্র) শাসন প্রয়োজন

গ) শিল্প বিপ্লব ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র (Welfare State)

১৮শ ও ১৯শ শতকে শিল্প বিপ্লবের পর রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। ২০শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে (বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর) কল্যাণমূলক রাষ্ট্র’ (Welfare State) ধারণার বিকাশ ঘটে

  • বৈশিষ্ট্য: নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের দায়িত্ব শাসন ব্যবস্থার মূল অংশ হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র এখানে প্রধান অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে

ঘ) উত্তর-আধুনিক যুগ: সুশাসনের যুগ (The Era of Good Governance)

১৯৮০-এর দশকের পর থেকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে সমাজ ও অর্থনীতি স্থবির হতে থাকে। এর ফলে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য 'সুশাসন' (Good Governance)-এর শর্ত জুড়ে দেয়। এটিই শাসনের ইতিহাসের আধুনিকতম রূপ


সংক্ষেপে:

শাসনের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল 'রাজার একক আদেশ' দিয়ে, যা মধ্যযুগে 'রাষ্ট্রের কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণে' রূপ নেয় এবং বর্তমানে তা রূপান্তরিত হয়েছে 'রাষ্ট্র, বাজার ও জনগণের যৌথ অংশীদারিত্বে'সমাজবিজ্ঞান এই রূপান্তরকে কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখে না, বরং একে সামাজিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে

 

 

 

শাসনের নতুন ধারণা হলো, রাষ্ট্র কেবল এককভাবে কোনো সমাজ বা দেশ পরিচালনা করবে না; বরং সরকার, সুশীল সমাজ, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ নাগরিক—সবাই মিলে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে। এটি রাষ্ট্র থেকে নেটওয়ার্কভিত্তিক ক্ষমতায়নের একটি আধুনিক রূপ। 

 

The Global Development Research Center

 +3

সমাজবিজ্ঞানে শাসনের আত্মপ্রকাশ

সমাজবিজ্ঞানে 'শাসন' (Governance) মূলত ক্ষমতা (Power), আধিপত্য (Domination) এবং সামাজিক শৃঙ্খলা (Social Order) বজায় রাখার দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মপ্রকাশ করেছে। সমাজবিজ্ঞানীরা কেবল কে শাসন করছে তা দেখেন না, বরং দেখেন সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে কাজ করছে। 

 

Sage Knowledge

 +3

সমাজবিজ্ঞানে শাসনের ধারণাটি যেভাবে বিকশিত হয়েছে:

ক্ষমতার উৎস ও আধিপত্য: কার্ল মার্ক্স এবং পরবর্তীতে মিশেল ফুকোর মতো সমাজবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আদর্শ (Hegemony) বজায় রাখতে শাসনব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে

কাঠামোগত মিথস্ক্রিয়া: বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে শাসন হলো একটি জটিল প্রক্রিয়া। এটি দেখায় কীভাবে বৈচিত্র্যময় সামাজিক গোষ্ঠী, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করে এবং সমাজের নির্দেশনা নির্ধারণ করে

নব্য-প্রাতিষ্ঠানিকতা: প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সামাজিক আচরণ ও নিয়মনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, তা সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় শাসনের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

 

Springer Nature Link

 +3

শাসনের ঐতিহাসিক পটভূমি

শাসনের ধারণাটি মানব সভ্যতার মতোই প্রাচীন। এর ঐতিহাসিক বিবর্তনকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়: 

 

Quora

গোত্রভিত্তিক ও রাজতন্ত্র: প্রাগৈতিহাসিক যুগে সমাজ পরিচালিত হতো গোত্রের প্রবীণ বা শক্তিশালী নেতাদের দ্বারা। এরপর কৃষিভিত্তিক সমাজ ও সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে রাজতন্ত্র, সম্রাট বা ফারাওদের উদ্ভব ঘটে, যেখানে সম্পূর্ণ ক্ষমতা একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল

জাতীয় রাষ্ট্র (Nation-State): ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির পর আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার জন্ম হয়। এ সময় রাষ্ট্র তার নির্দিষ্ট ভূখণ্ড এবং সার্বভৌমত্বের ওপর ভিত্তি করে আইন ও শাসন পরিচালনা শুরু করে

কল্যাণমূলক রাষ্ট্র (Welfare State): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্র কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা কর আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নাগরিকদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা নেওয়া শুরু করে

সুশাসনের উত্থান (Good Governance): ১৯৯০-এর দশকের পর বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাবে বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সুশাসনের ধারণা জনপ্রিয়তা পায়। এই মডেলে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, আইনের শাসন, এবং বহুপাক্ষিক অংশগ্রহণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। 

 

ESCAP

 +5

আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসন (Governance) তাই সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে এসে সবার অংশগ্রহণে একটি দায়িত্বশীল ও টেকসই প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়েছে। 











২) শাসনের চারটি অর্থ, শাসন ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য শাসনের বৈশিষ্ট্য

 

শাসন বলতে সাধারণত কোনো রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা সমাজ‑গোষ্ঠীকে নিয়ম‑আইন, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার প্রক্রিয়া বোঝায়wikipedia+1


শাসনের চারটি অর্থ

ভাষাগত ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে শাসনের জনপ্রিয় চারটি অর্থ/ব্যবহার হলো:sobdartho

  1. নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাযেমন: দেশের “শাসন” বা “দেশশাসন”, অর্থাৎ দেশকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা
  2. নিয়ম‑বিধি ও বিধানযেমন: আদেশ, বিধি, নির্দেশ বা আইনগত বিধানকেও “শাসন” বলা হয় (শাস্ত্রের শাসন)sobdartho
  3. দমন ও শাস্তিদানযেমন: দুষ্ট রাজার “প্রজাপীড়ন” বা কঠোর আইন প্রয়োগকে শাসনের তিরস্কারমূলক অর্থে ব্যবহার করাsobdartho
  4. আধুনিক রাজনৈতিক শাসনরাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো: গণতন্ত্র, একচ্ছত্রবাদ, কর্তৃত্ববাদ ইত্যাদি ব্যবস্থাকে “শাসন ব্যবস্থা” হিসেবে বোঝানো হয়wikipedia

শাসন ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য

বিষয়

শাসন

সরকার

অর্থ/প্রকৃতি

শাসন একটি গতিশীল প্রক্রিয়া (কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আইন ও নীতি বাস্তবায়িত হয়)। wikipedia

সরকার রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠিত সংগঠন (মন্ত্রিসভা, প্রেসিডেন্ট/প্রধানমন্ত্রী, প্রশাসন ইত্যাদি)। teachers.gov

স্থায়িত্ব

শাসন হল একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া, যেটি সমাজে সার্বিকভাবে কাজ করে।

সরকার পরিবর্তনশীল; নির্বাচন বা রাজনৈতিক পরিবর্তনে ভাঙা ও পুনর্গঠন হতে পারে। lxnotes

পরিধি

শাসনে শুধু সরকার নয়, বেসরকারি সংস্থা, সমাজ গোষ্ঠী, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানসহ সব উপাদান জড়িত। wikipedia

সরকার রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কার্যকরী শাখা মাত্র, যেখানে শাসনের বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়। teachers.gov

সংক্ষেপে, শাসন হল প্রক্রিয়া আর সরকার হল সেই প্রক্রিয়াকে চালানোর জন্য তৈরি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানteachers.gov+1


শাসনের বৈশিষ্ট্য (সাধারণভাবে)

সাধারণত যে কোনো ভালো শাসনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হিসেবে নিম্নোক্তগুলো উল্লেখ করা হয়:lakhokonthe+1

  • অংশগ্রহণ (Participation)নাগরিক, দল ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমানভাবে শাসন‑প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ
  • জবাবদিহিতা (Accountability)শাসক, প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান জনগণ বা আইনগত প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহির দায়বদ্ধfacebook+1
  • স্বচ্ছতা (Transparency)তথ্য প্রকাশ ও সুস্পষ্ট নীতি‑ব্যবস্থা; সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়, সেটা সহজলভ্য ও বোধগম্যfacebook
  • দক্ষতা ও কার্যকারিতা (Effectiveness & Efficiency)সম্পদ ও সময় ইন্টেলিজেন্টলি ব্যবহার করে জনকল্যাণমূলক ফলাফল আনাlakhokonthe+1

এগুলো আধুনিক সুশাসনের বৈশিষ্ট্য হিসেবেও বিবেচিত হয়, তবে সাধারণ শাসনের ধারণাতেও এগুলো মূল উপাদান হিসেবে কাজ করে

 

 

 

 

তিনটি বিষয় আলাদা আলাদা চিত্রসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে।


শাসনের চারটি অর্থ

বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে "শাসন" শব্দটির চারটি স্বতন্ত্র অর্থ চিহ্নিত করা হয়েছে:

প্রথম অর্থ — ন্যূনতম রাষ্ট্র হিসেবে শাসন (Governance as Minimal State): নব্য-উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শাসন মানে রাষ্ট্রের ভূমিকা সংকুচিত করে বাজার ও বেসরকারি খাতের হাতে দায়িত্ব অর্পণ করা। থ্যাচার-রিগান যুগে এই ধারণা জনপ্রিয় হয়

দ্বিতীয় অর্থ — কর্পোরেট শাসন (Corporate Governance): প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতার কাঠামো। বিশ্বব্যাংক ও IMF এই অর্থে উন্নয়নশীল দেশে "সুশাসন" প্রচার করে

তৃতীয় অর্থ — নতুন জনব্যবস্থাপনা (New Public Management): সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাজার-কৌশল প্রয়োগ — দক্ষতা, ফলাফল-ভিত্তিক মূল্যায়ন, চুক্তিভিত্তিক সেবা। অসবোর্ন ও গেবলারের "Reinventing Government" (১৯৯২) এর মূল সূত্র

চতুর্থ অর্থ — নেটওয়ার্ক শাসন (Governance as Networks): Rhodes (১৯৯৬)-এর মতে সবচেয়ে আধুনিক অর্থ — রাষ্ট্র, বাজার ও নাগরিক সমাজের স্ব-নিয়ন্ত্রিত (self-organising) নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত শাসন, যেখানে কোনো একক কর্তৃপক্ষ নেই।---

শাসন ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য

"সরকার" (Government) ও "শাসন" (Governance) — এই দুটি ধারণা প্রায়ই একই মনে হলেও এরা মৌলিকভাবে আলাদা। সরকার হলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা, আর শাসন হলো একটি প্রক্রিয়া।---

শাসনের বৈশিষ্ট্যসমূহ

আধুনিক শাসনের কয়েকটি মূল বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে সনাতন সরকারি কর্তৃত্ব থেকে আলাদা করে:---

শাসনের আটটি বৈশিষ্ট্য একে অপরের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। অংশগ্রহণ না থাকলে জবাবদিহিতা অর্থহীন, স্বচ্ছতা না থাকলে আইনের শাসন ফাঁকা কথা। তাই আধুনিক সুশাসন তত্ত্বে এই বৈশিষ্ট্যগুলো আলাদা করে নয়, একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়

মূল কথায়: সরকার হলো শাসনের একটি হাতিয়ার মাত্র, শাসন নিজে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রক্রিয়া যেখানে ক্ষমতা, দায়িত্ব ও সম্পদ বহু অংশীদারের মধ্যে বিতরণ করা হয়

 

 

 

 

নিচে **শাসনের চারটি অর্থ**, **শাসন ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য** এবং **শাসনের বৈশিষ্ট্য** ধারাবাহিকভাবে ও উদাহরণসহ আলোচনা করা হলো।

 

### ১. শাসনের চারটি অর্থ (Four Meanings of Governance)

 

সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় “শাসন” শব্দটির কমপক্ষে চারটি স্তরের অর্থ বিদ্যমান:

 

1.  **প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ (প্রক্রিয়া ও কাঠামো):** 

    শাসন হচ্ছে সেই সব প্রক্রিয়া, প্রথা, নীতি, আইন ও প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি যার মাধ্যমে কোনো সমাজ, রাষ্ট্র বা সংগঠন পরিচালিত হয়। এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতার পদ্ধতি বোঝায়। 

    *উদাহরণ:* জাতিসংঘের শাসন বলতে সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদের কার্যপ্রণালী ও সনদকে বোঝায়।

 

2.  **বহু-অভিনেতার সমন্বয় (Network Governance):** 

    শাসন কেবল সরকারের একক কাজ নয়; বরং সরকার, বেসরকারি কোম্পানি, সুশীল সমাজ (এনজিও), গণমাধ্যম ও নাগরিকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। 

    *উদাহরণ:* গ্রামীণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা শাসনে সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিক ও স্থানীয় এনজিও (ব্র্যাক) একসঙ্গে কাজ করে।

 

3.  **সুশাসন (Good Governance) অর্থে:** 

    বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের ব্যবহারে শাসন বলতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, অংশগ্রহণ, আইনের শাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এটি একটি মূল্যনির্ভর অর্থ। 

    *উদাহরণ:* একটি বাজেট প্রণয়নে নাগরিকদের মতামত নেওয়া এবং বাজেট অনলাইনে প্রকাশ করা।

 

4.  **আত্ম-শাসন ও শৃঙ্খলা (Governmentality – Foucault):** 

    ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো-র মতে, শাসন কেবল রাষ্ট্রের নয়; বরং কীভাবে ব্যক্তি ও সমাজ নিজেদের আচরণ, চিন্তা ও দেহকে নিয়ন্ত্রণ করে – সেটিও শাসন। এটি আধুনিক সমাজে ক্ষমতার সূক্ষ্ম রূপ। 

    *উদাহরণ:* স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাস্ক পরা বা শিক্ষার্থীর পরীক্ষার জন্য নিজেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করাও এক ধরনের শাসন।

 

### ২. শাসন ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য (Difference between Governance and Government)

 

নিচের সারণিতে প্রধান পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:

 

| বৈশিষ্ট্য | সরকার (Government) | শাসন (Governance) |

| :--- | :--- | :--- |

| **সত্তা/কাঠামো** | একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা (যেমন মন্ত্রিসভা, সংসদ, প্রশাসন) | একটি বিমূর্ত প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি (যেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমন্বয়, জবাবদিহিতা) |

| **অভিনেতা** | শুধু রাষ্ট্রীয় অভিনেতা (মন্ত্রী, সচিব, পুলিশ, বিচারক) | রাষ্ট্রীয় + বেসরকারি + সুশীল সমাজ + নাগরিকসহ সকল পক্ষ |

| **কর্তৃত্বের উৎস** | আইন, সংবিধান ও সার্বভৌম ক্ষমতা | সামাজিক চুক্তি, আলোচনা, অংশীদারিত্ব ও নেটওয়ার্ক |

| **পরিধি** | সীমিত, সাধারণত ভূখণ্ডভিত্তিক | ব্যাপক, স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে (যেমন জলবায়ু শাসন) |

| **দিকনির্দেশনা** | সাধারণত উপর থেকে নিচে (Top-down) | বহু-মুখী (Horizontal, Network-based, Bottom-up সম্ভব) |

| **উদাহরণ** | বাংলাদেশ সরকার (প্রধানমন্ত্রী, সচিবালয়) | একটি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে সরকার, স্থানীয় জনতা, এনজিও ও নির্মাণ কোম্পানির সম্মিলিত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াই শাসন |

 

**সহজ সূত্র:** *সরকার হলো অভিনেতা, শাসন হলো সেই অভিনেতার কাজের প্রক্রিয়া ও পরিবেশ।* ঠিক যেমন একটি নাটকের অভিনেতা (সরকার) আর নাটকটি মঞ্চায়নের পুরো ব্যবস্থাপনা (শাসন) ভিন্ন।

 

### ৩. শাসনের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Governance)

 

আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে শাসনের প্রধান ৭টি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়:

 

1.  **বহু-অভিনেতা ও অংশীদারিত্ব (Multi-actor & Partnership):** 

    শাসনে কখনো একক কর্তৃত্ব থাকে না। রাষ্ট্র, বাজার ও সমাজের বিভিন্ন পক্ষ আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালনা করে।

 

2.  **প্রক্রিয়াকেন্দ্রিক (Process-oriented):** 

    শাসন একটি স্থির কাঠামো নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

 

3.  **জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা (Accountability & Transparency):** 

    সুশাসনের মূল শর্ত। শাসনের প্রতিটি পর্যায়ে কেন, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো – তার যুক্তি সব পক্ষের কাছে পরিষ্কার থাকা আবশ্যক।

 

4.  **আইনের শাসন ও বিধিবদ্ধতা (Rule of Law & Legitimacy):** 

    কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে নয়। শাসন কেবল কার্যকরী নয়, বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত হতে হয়।

 

5.  **অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি (Participation & Inclusiveness):** 

    শাসিত জনগণ শাসন প্রক্রিয়ায় সরাসরি বা প্রতিনিধির মাধ্যমে অংশ নিতে পারে। নারী, প্রান্তিক, সংখ্যালঘুদের কণ্ঠস্বর এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

 

6.  **নমনীয়তা ও অভিযোজন (Flexibility & Adaptability):** 

    জটিল সামাজিক সমস্যার কোনো একক সমাধান নেই। শাসন প্রক্রিয়া সময় ও প্রেক্ষাপটভেদে পরিবর্তনশীল এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ রাখে।

 

7.  **সম্পদ ও ক্ষমতার বণ্টন (Resource & Power Distribution):** 

    শাসন বিশ্লেষণ করে কে কী পায়, কে সিদ্ধান্ত নেয়, কারা উপকৃত হয় – অর্থাৎ ক্ষমতার গতিবিধি।

 

**উদাহরণসহ সংক্ষেপ:** 

মনে করুন একটি নগরীতে বায়ুদূষণ কমানোর উদ্যোগ – এখানে সরকার (আইন প্রণয়ন), কারখানা মালিক (প্রযুক্তি পরিবর্তন), গণমাধ্যম (সচেতনতা), স্কুল-কলেজ (শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ) ও নাগরিক ফোরাম (ট্রাফিক আইন মানা) – সবার মিথস্ক্রিয়াই **শাসন**, আর শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয় হলো **সরকার**। আর এই প্রক্রিয়াটি যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়, সেটাই **সুশাসনের বৈশিষ্ট্য**।

 

 

 

 

শাসনের চারটি অর্থ

সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে “শাসন” (Governance/Government) শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে শাসনের চারটি প্রধান অর্থ হলো—

১. নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা

সমাজ, রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার প্রক্রিয়াকে শাসন বলা হয়

উদাহরণ:
রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, প্রশাসন পরিচালনা করা ইত্যাদি


২. কর্তৃত্ব প্রয়োগ

শাসন বলতে বৈধ ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণকে পরিচালনা করাকে বোঝায়

এখানে রাষ্ট্র আইন, নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করে


৩. নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন

শাসনের অর্থ হলো—

  • জননীতি প্রণয়ন,
  • সিদ্ধান্ত গ্রহণ,
  • এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া

এটি শুধু সরকার নয়; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর অংশগ্রহণেও হতে পারে


৪. সমন্বিত সামাজিক ব্যবস্থাপনা

আধুনিক ধারণায় শাসন বলতে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাজ পরিচালনাকে বোঝায়

এটিই “গভর্ন্যান্স” বা নতুন শাসন ধারণা


শাসন ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য

বিষয়

শাসন (Governance)

সরকার (Government)

ধারণা

বিস্তৃত ও সমন্বিত প্রক্রিয়া

রাষ্ট্র পরিচালনার আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান

পরিধি

সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজসহ সবাই

মূলত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো

প্রকৃতি

অংশগ্রহণমূলক ও সহযোগিতামূলক

কর্তৃত্বমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক

উদ্দেশ্য

সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান

আইন প্রণয়ন ও প্রশাসন পরিচালনা

ক্ষমতার উৎস

বিভিন্ন সামাজিক শক্তি

সংবিধান ও আইন

কার্যপদ্ধতি

নেটওয়ার্ক ও অংশীদারিত্বভিত্তিক

আমলাতান্ত্রিক ও কেন্দ্রীভূত

উদাহরণ

সুশাসন, এনজিও ও জনগণের অংশগ্রহণ

মন্ত্রিসভা, সংসদ, প্রশাসন


শাসনের বৈশিষ্ট্য

আধুনিক শাসনব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—

১. অংশগ্রহণমূলক

জনগণ ও বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়


২. জবাবদিহিতা

শাসক ও প্রশাসন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে


৩. স্বচ্ছতা

নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম উন্মুক্ত ও পরিষ্কার থাকে


৪. আইনের শাসন

সবাই আইনের অধীন থাকে এবং আইন সমভাবে প্রয়োগ হয়


৫. বিকেন্দ্রীকরণ

ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার স্থানীয় পর্যায়ে বণ্টন করা হয়


৬. দক্ষতা ও কার্যকারিতা

সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ জনকল্যাণ নিশ্চিত করা হয়


৭. সমন্বয়মূলক চরিত্র

সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করে


৮. ন্যায়ভিত্তিকতা

সব নাগরিকের সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা হয়


উপসংহার

শাসন হলো সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বিস্তৃত প্রক্রিয়া, যা শুধু সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক বিশ্বে শাসন অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে সরকার হলো শাসনের একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানমাত্র

 

 

 

 

**শাসনের চারটি অর্থ (Four Meanings/Aspects of Governance):**

 

শাসন (Governance) শব্দটির একক সংজ্ঞা নেই, বরং এটি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশী শিক্ষা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় প্রায়শই নিম্নলিখিত **চারটি প্রধান অর্থ বা দিক** উল্লেখ করা হয় (বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের আলোকে):

 

1. **সরকারি খাতের দক্ষ ব্যবস্থাপনা (Public Sector Management)**: সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, দক্ষতা ও সম্পদ ব্যবহারের প্রক্রিয়া।

2. **জবাবদিহিতা (Accountability)**: সরকার ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা।

3. **আইনি কাঠামো (Legal Framework for Development)**: আইনের শাসন, চুক্তি প্রয়োগ ও উন্নয়ন-সহায়ক আইনি ব্যবস্থা।

4. **স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রবাহ (Transparency and Information)**: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া উন্মুক্ত রাখা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ।

 

অন্যান্য দৃষ্টিকোণ থেকে শাসনকে প্রক্রিয়া (process), কাঠামো (structure), নেটওয়ার্ক (network of actors) এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (regulatory system) হিসেবেও দেখা হয়।

 

**শাসন ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য (Difference between Governance and Government):**

 

| বিষয়              | **সরকার (Government)**                          | **শাসন (Governance)**                              |

|-------------------|------------------------------------------------|--------------------------------------------------|

| **প্রকৃতি**      | মূর্ত প্রতিষ্ঠান (Institution) — নির্দিষ্ট কাঠামো, কর্মকর্তা ও মেয়াদ। | বিমূর্ত প্রক্রিয়া (Process) — ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি। |

| **পরিধি**        | সরকারি সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। | সরকার + বেসরকারি খাত + সুশীল সমাজ + নাগরিক + আন্তর্জাতিক অংশীদার। |

| **উদ্দেশ্য**     | আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ ও ক্ষমতা ধারণ।     | নীতি বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও জনকল্যাণ নিশ্চিতকরণ। |

| **মডেল**         | উপর থেকে নিচে (Top-down), হায়ারার্কিক্যাল।   | নেটওয়ার্কভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক (Participatory)|

| **উদাহরণ**       | সংসদ, মন্ত্রিসভা, প্রশাসন।                    | সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের প্রক্রিয়া। |

 

সংক্ষেপে: **সরকার হলো যন্ত্র**, আর **শাসন হলো সেই যন্ত্রের ব্যবহারের পদ্ধতি ও ফলাফল**। একটি ভালো সরকার থাকলেও খারাপ শাসন হতে পারে, এবং সুশাসনের জন্য উভয়ের সমন্বয় প্রয়োজন।

 

**শাসনের (বিশেষ করে সুশাসনের) বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Governance/Good Governance):**

 

জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের মতে সুশাসনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

 

- **অংশগ্রহণ (Participation)**: নাগরিকদের (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ অংশগ্রহণ।

- **আইনের শাসন (Rule of Law)**: সকলের জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য।

- **স্বচ্ছতা (Transparency)**: তথ্য উন্মুক্ত ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া দৃশ্যমান।

- **জবাবদিহিতা (Accountability)**: কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা (উপরের দিকে ও নিচের দিকে)।

- **সংবেদনশীলতা/সাড়া প্রদান (Responsiveness)**: জনগণের চাহিদার প্রতি দ্রুত সাড়া।

- **ঐকমত্যভিত্তিক (Consensus Oriented)**: বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে সমন্বয়।

- **সাম্য ও অন্তর্ভুক্তি (Equity & Inclusiveness)**: সকলের সমান সুযোগ।

- **কার্যকারিতা ও দক্ষতা (Effectiveness & Efficiency)**: সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার।

 

এই বৈশিষ্ট্যগুলো টেকসই উন্নয়ন, দুর্নীতি হ্রাস ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুশাসনের অভাবকে উন্নয়নের অন্যতম বাধা হিসেবে দেখা হয়।

 

 

 

শাসনের আধুনিক ধারণাটি বুঝতে হলে এর সুনির্দিষ্ট অর্থ, সরকারের সাথে এর মৌলিক পার্থক্য এবং এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো জানা প্রয়োজন। সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো:


১. শাসনের চারটি অর্থ (Four Meanings of Governance)

বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গাই পিটার্স (Guy Peters) এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক প্রেক্ষাপটে ‘শাসন’ বা Governance-কে মূলত চারটি ভিন্ন অর্থে বা মডেলে ব্যাখ্যা করা হয়:

  1. বাজারভিত্তিক শাসন (Market Governance): এই অর্থে শাসন হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতি প্রয়োগ করা। এখানে সেবার মান বাড়াতে এবং খরচ কমাতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি করা হয় এবং অনেক দায়িত্ব বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়
  2. অংশগ্রহণমূলক শাসন (Participatory Governance): এই অর্থটি নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দেয়। শাসন কেবল উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং নীতি নির্ধারণে সাধারণ মানুষ, এনজিও এবং তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণই হলো এই মডেলের শাসন
  3. নমনীয় শাসন (Flexible Governance): ঐতিহ্যগত স্থায়ী আমলাতন্ত্রের বদলে পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তনশীল শাসন কাঠামোকে নমনীয় শাসন বলে। এখানে কোনো স্থায়ী পদ বা নিয়মের চেয়ে সাময়িক চুক্তি (Contracting) বা অস্থায়ী টাস্কফোর্সের মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হয়
  4. নিয়ন্ত্রণমুক্ত শাসন (Deregulation / Deregulated Governance): এই অর্থে শাসন মানে হলো সরকারের অতিরিক্ত নিয়মকানুন, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং আইনি কড়াকড়ি কমিয়ে আনা। সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়ে শাসন ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও ফলপ্রসূ করাই এর লক্ষ্য

২. শাসন ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য (Difference between Governance and Government)

সাধারণভাবে ‘শাসন’ এবং ‘সরকার’ শব্দ দুটিকে এক মনে হলেও সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রনীতিতে এদের মধ্যে গভীর পার্থক্য রয়েছে।

বিষয়ের ভিত্তি

সরকার (Government)

শাসন (Governance)

সংজ্ঞা

সরকার হলো একটি নির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বা কাঠামো, যা রাষ্ট্র পরিচালনা করে

শাসন হলো একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিচালিত করা হয়

সদস্য বা পক্ষ

এতে কেবল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষ (যেমন: নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ) অন্তর্ভুক্ত থাকে

এতে সরকার ছাড়াও বেসরকারি খাত, এনজিও, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ নাগরিক অন্তর্ভুক্ত থাকে

প্রকৃতি

এটি একটি সংবিধিবদ্ধ এবং দৃশ্যমান গঠন বা কাঠামো (Structure)

এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া বা কার্যধারা (Process)

ক্ষমতার প্রয়োগ

সরকার উপর থেকে নিচে (Top-down) আদেশ ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে

শাসন পারস্পরিক সহযোগিতা, নেটওয়ার্ক এবং সমঝোতার (Horizontal) মাধ্যমে কাজ করে

পরিধি

সরকারের পরিধি একটি নির্দিষ্ট দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ

শাসনের পরিধি স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বৈশ্বিক (Global Governance) পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে


৩. শাসনের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Governance)

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এবং বিশ্বব্যাংকের মতে, একটি আধুনিক ও কার্যকর শাসন ব্যবস্থার (বিশেষ করে সুশাসনের) প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

  • অংশগ্রহণ (Participation): শাসন ব্যবস্থায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে
  • আইনের শাসন (Rule of Law): আইন সবার জন্য সমান। কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং মানবাধিকার রক্ষা করাই শাসনের মূল লক্ষ্য
  • স্বচ্ছতা (Transparency): সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটি পরিষ্কার ও উন্মুক্ত হতে হবে, যেন জনগণ তা জানতে ও বুঝতে পারে
  • জবাবদিহিতা (Accountability): সরকারি, বেসরকারি এবং সুশীল সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে
  • ঐকমত্যভিত্তিক (Consensus Oriented): সমাজে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ থাকে। শাসন ব্যবস্থার কাজ হলো সবার সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমাজের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে একটি টেকসই ঐকমত্যে পৌঁছানো
  • ন্যায়পরায়ণতা ও সাম্য (Equity and Inclusiveness): সমাজের কোনো গোষ্ঠী যেন নিজেদের বঞ্চিত মনে না করে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা শাসনের অন্যতম দায়িত্ব
  • কার্যকারিতা ও দক্ষতা (Efficiency and Effectiveness): সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ও সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের চাহিদা পূরণ করা

সহজ কথায়: 'সরকার' হলো একটি গাড়ি, আর 'শাসন' হলো সেই গাড়িটি চালকের দ্বারা সঠিক নিয়মে, দক্ষতার সাথে এবং যাত্রীদের মতামত নিয়ে গন্তব্যে চালিয়ে নেওয়ার সামগ্রিক প্রক্রিয়া

 

 

 

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানে 'শাসন' (Governance) এবং 'সরকার' (Government) দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত ধারণানিচে এদের অর্থ, পার্থক্য এবং মূল বৈশিষ্ট্যগুলো সহজ ও সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হলো: 

Quora +2

শাসনের চারটি অর্থ

সাধারণত বহুমুখী প্রেক্ষাপটে 'শাসন' শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এর প্রধান চারটি অর্থ হলো:
১. রাজনৈতিক শাসন (Political): রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনার সার্বিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়
২. নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা (Control): কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা গোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখা এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা
৩. প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা (Administration): সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজ, জনসেবা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা
৪. সুশাসন (Good Governance): স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে জনকল্যাণমুখী ও অংশগ্রহণমূলক সমাজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা 

Quora +6


শাসন ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য

বৈশিষ্ট্য 

সরকার (Government)

শাসন (Governance)

সংজ্ঞা

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগকারী আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিবর্গ

রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার সামগ্রিক প্রক্রিয়া, কৌশল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি

পরিধি

সীমিত। এটি কেবল নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত

অত্যন্ত ব্যাপক। এতে সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ এবং নাগরিক—সবাই অন্তর্ভুক্ত থাকে

ক্ষমতা

এটি আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব, ক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কাজ করে

এটি আলোচনা, সমঝোতা, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়

কাঠামো

এটি একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা সিস্টেম (যেমন- সংসদ, বিচারালয়, প্রশাসন)

এটি কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নয়, বরং বিভিন্ন পক্ষের আন্তঃসম্পর্ক ও কার্যপ্রণালী


শাসনের বৈশিষ্ট্য (সুশাসনের মানদণ্ড)

একটি আদর্শ বা কার্যকর শাসনের (Good Governance) মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • অংশগ্রহণ (Participation): নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সমাজের সকল স্তরের নাগরিকের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা
  • আইনের শাসন (Rule of Law): আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং পক্ষপাতহীনভাবে আইনের প্রয়োগ হওয়া
  • স্বচ্ছতা (Transparency): সরকারের কার্যাবলী, সিদ্ধান্ত ও তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকা
  • জবাবদিহিতা (Accountability): সরকার ও প্রশাসনের গৃহীত সিদ্ধান্তের জন্য নাগরিক বা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা
  • কার্যকারিতা ও দক্ষতা (Effectiveness and Efficiency): সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে জনগণের চাহিদা পূরণে সক্ষম হওয়া
  • অন্তর্ভুক্তি ও সমতা (Equity and Inclusiveness): সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীসহ সবার উন্নয়ন ও সুযোগ নিশ্চিত করা 

Shivaji College +4

এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে ব্রিটানিকা (Britannica) এবং শিভাজি কলেজের (Shivaji College) প্রবন্ধগুলো পড়তে পারেন


No comments:

Post a Comment