Professor Dr. Farid Uddin Ahmed
১ শাসনের সংজ্ঞা,
বৈশিষ্ট্য, প্রয়োজনীয়তা
২ সুশাসনের
অর্থ, বৈশিষ্ট্য, নির্দেশক, বাংলাদেশে সুশাসনের সমস্যা ও সম্ভাবনা
৩ জবাবদিহীতা
বলতে কী বুঝেন? এর ধরণ, নিশ্চিত করনের উপায়। সরকার ও আমলাদের জবাবদিহীতার উপায় সমূহ।
৪ গণতান্ত্রিক
শাসন বলতে কি বোঝেন? গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান
ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকা
৫ নির্বাহী
শাসন ও আমলাতন্ত্র কি? এর ভূমিকা বর্ণনা করুন
১ শাসনের সংজ্ঞা,
বৈশিষ্ট্য, প্রয়োজনীয়তা
শাসন (Governance) - এর সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োজনীয়তা১. শাসনের
সংজ্ঞাসাধারণ অর্থে শাসন হলো সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়া। কিন্তু
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এর অর্থ আরো ব্যাপক।কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা:জাতিসংঘের (UNDP)
মতে: শাসন হলো এমন একটি
প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করা
হয়।বিশ্বব্যাংকের মতে: শাসন হলো একটি দেশের উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক
সম্পদের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ক্ষমতার প্রয়োগ।সহজ ভাষায়: রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ
- আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও
বিচার বিভাগের মাধ্যমে আইন তৈরি, তা প্রয়োগ ও
ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার সামগ্রিক ব্যবস্থাই হলো শাসন।আধুনিক ধারণায় শাসন শুধু
সরকার নয়, সরকার + বেসরকারি
খাত + নাগরিক সমাজ - সবার অংশগ্রহণে যে পরিচালনা, সেটাই শাসন।২. শাসনের বৈশিষ্ট্যশাসনকে ভালোভাবে
বুঝতে হলে এর বৈশিষ্ট্যগুলো জানা জরুরি।ক) প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য:নিয়মভিত্তিক:
শাসন আইন, নীতি ও সংবিধানের
আলোকে চলে।কর্তৃত্বসম্পন্ন: শাসনের আদেশ মানা বাধ্যতামূলক, না মানলে শাস্তি আছে।গতিশীল: সমাজের পরিবর্তনের
সাথে শাসনও পরিবর্তন হয়।খ) সুশাসনের (Good Governance) ৮টি মূল বৈশিষ্ট্য - UNDP এর মতে:অংশগ্রহণ (Participation): নারী-পুরুষ সবার সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের
সুযোগ।আইনের শাসন (Rule of Law): আইন সবার জন্য
সমান, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে
নয়।স্বচ্ছতা (Transparency): তথ্য ও
সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া সবার কাছে উন্মুক্ত।জবাবদিহিতা (Accountability): সরকারি কর্মকর্তা জনগণের কাছে জবাব দিতে
বাধ্য।সংবেদনশীলতা (Responsiveness): জনগণের চাহিদা দ্রুত পূরণ করা।ঐক্যমত (Consensus Oriented): বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে সমঝোতা
করা।ন্যায়পরায়ণতা ও অন্তর্ভুক্তি (Equity and Inclusiveness): কাউকে বাদ না দেওয়া।দক্ষতা ও কার্যকারিতা (Effectiveness
and Efficiency): কম খরচে ভালো
ফলাফল।৩. শাসনের প্রয়োজনীয়তা / গুরুত্বশাসন ছাড়া কোনো সমাজ টিকতে পারে না। এর
প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।১. শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা: শাসন না থাকলে সমাজে
"সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ" - হবসের প্রকৃতির রাজ্যের মতো অবস্থা হতো।
শাসন আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখে।২. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: দুর্বলের অধিকার রক্ষা,
অপরাধীর বিচার শাসনের
মাধ্যমেই হয়।৩. উন্নয়ন ও সেবা প্রদান: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ - সব নাগরিক সেবা শাসনযন্ত্রের
মাধ্যমেই জনগণের কাছে পৌঁছায়।৪. অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা: মত প্রকাশের স্বাধীনতা,
ভোটের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার শাসনই নিশ্চিত করে।৫.
অর্থনৈতিক উন্নয়ন: বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি, বাজার নিয়ন্ত্রণ, বেকারত্ব দূরীকরণে সুশাসন অপরিহার্য। বাংলাদেশে
বিনিয়োগ কম হওয়ার অন্যতম কারণ দুর্বল শাসন।৬. জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব: ভেতরে
ঐক্য ধরে রাখা এবং বাইরের হুমকি থেকে দেশকে রক্ষা করা শাসনের কাজ।
শাসন হলো
রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সেই সামগ্রিক প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি, যার মাধ্যমে
ক্ষমতা প্রয়োগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নীতি বাস্তবায়নের কাজ সম্পন্ন হয়। এটি কেবল সরকারি কাঠামো নয়, বরং শাসক ও
শাসিতের মধ্যকার সম্পর্ক, অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনসহ বিস্তর বিষয়কে
অন্তর্ভুক্ত করে।[bn.wikipedia][pulsebangladesh][teachers.gov][chakribangla]
শাসনের
সংজ্ঞা
বিভিন্ন
প্রতিষ্ঠান ও চিন্তাবিদ শাসনকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন:
- বিশ্বব্যাংক (১৯৯৪): “সুশাসন
এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি দেশের অর্থনৈতিক ও
সামাজিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়।”[teachers.gov][chakribangla]
- UNDP: “একটি দেশের সার্বিক
স্তরের কার্যাবলি পরিচালনার জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক
এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের চর্চার বা প্রয়োগের পদ্ধতিই হলো সুশাসন।”[rastrobiggyanpath.blogspot]
- ম্যাক করনি: “সুশীল
সমাজ ও রাষ্ট্র, সরকার ও শাসিত জনগণ এবং শাসক ও শাসিতের মধ্যকার
সম্পর্ককে সুশাসন বলে।”[teachers.gov]
- সাধারণ রাজনৈতিক সংজ্ঞা: শাসন হলো সরকারের রূপ বা নিয়ম, সাংস্কৃতিক বা সামাজিক নিয়মের সেট যা একটি সরকার
বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং সমাজের সাথে এর মিথস্ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।[bn.wikipedia]
সহজ ভাষায়,
সরকার হলো প্রতিষ্ঠান (institution), আর শাসন হলো প্রক্রিয়া (process)—যে
প্রক্রিয়ায় সরকারি নীতি, আইন ও সিদ্ধান্ত সমাজে বাস্তবায়িত হয়।[pulsebangladesh]
শাসনের
প্রধান বৈশিষ্ট্য
আধুনিক
গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নমুখী শাসনব্যবস্থার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:
|
বৈশিষ্ট্য |
অর্থ/ব্যাখ্যা |
|
আইনের
শাসন |
সবাই
আইনের অধীন; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয়। [chakribangla][julienflorkin] |
|
জবাবদিহিতা
(Accountability) |
শাসকগণ
তাদের কাজের জন্য জনগণের বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব দিতে বাধ্য।
[bn.wikipedia][chakribangla] |
|
স্বচ্ছতা
(Transparency) |
সরকারি
তথ্য, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম উন্মুক্ত ও প্রকাশ্য; দুর্নীতি
হ্রাস পায়। [bn.wikipedia][chakribangla][courstika] |
|
অংশগ্রহণ
(Participation) |
নাগরিক,
সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
[bn.wikipedia][chakribangla] |
|
দায়িত্বশীলতা
(Responsiveness) |
জনস্বার্থে
দ্রুত ও কার্যকর সাড়া দেওয়া; জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা। [chakribangla] |
|
ঐকমত্য-ভিত্তিক
সিদ্ধান্ত (Consensus Oriented) |
বিভিন্ন
স্বার্থের মধ্যে মধ্যস্থতা করে ব্যাপক ঐকমত্যে পৌঁছানো। [bn.wikipedia][chakribangla] |
|
সাম্য ও
অন্তর্ভুক্তি (Equity & Inclusiveness) |
সব
নাগরিকের সমান সুযোগ; কোনো গোষ্ঠী বঞ্চিত না হয়। [bn.wikipedia][chakribangla] |
|
দক্ষতা ও
কার্যকারিতা (Efficiency & Effectiveness) |
সম্পদের
সঠিক ব্যবহার; লক্ষ্য অর্জনে সর্বোচ্চ ফলাফল। [bn.wikipedia][chakribangla] |
|
দৃষ্টিভঙ্গি
ও নেতৃত্ব (Strategic Vision & Leadership) |
দীর্ঘমেয়াদি
উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের উপস্থিতি। [chakribangla] |
|
প্রাতিষ্ঠানিক
সক্ষমতা |
সরকারি
খাত ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা ও দক্ষতা; উন্নয়নের জন্য শক্ত আইনি কাঠামো। [bn.wikipedia] |
এছাড়া
শাসনের আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে: নাগরিক সার্বভৌমত্ব, প্রতিনিধিত্বমূলক
ব্যবস্থা, শক্তির পৃথকীকরণ ও ভারসাম্য, বহুস্তরীয়
শাসন, মূল্যবোধভিত্তিক শাসন, এবং
পরিবর্তনশীলতা।[gyanchautari]
শাসনের
প্রয়োজনীয়তা
শাসনব্যবস্থা
ছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ সুশৃঙ্খলভাবে চলতে পারে না। এর প্রয়োজনীয়তা
নিম্নরূপ:
- শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা: আইন-শৃঙ্খলা বজায় রেখে সামাজিক ও রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।[courstika][devlibrary]
- জনকল্যাণ ও উন্নয়ন: অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার
মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হয়।[teachers.gov][rastrobiggyanpath.blogspot]
- ন্যায়বিচার ও অধিকার রক্ষা: নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা
ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।[chakribangla][courstika]
- দুর্নীতি হ্রাস: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে দুর্নীতি ও অনিয়ম
কমে আসে।[chakribangla][julienflorkin]
- জনগণের অংশগ্রহণ: নাগরিকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত
করে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।[chakribangla][courstika]
- সরকার-জনগণের সম্পর্ক উন্নয়ন: শাসক ও শাসিতের মধ্যে আস্থা ও সম্পর্ক দৃঢ় হয়।[teachers.gov][courstika]
- বহুত্ব ও বৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা: বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও
সংস্কৃতির মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখে।[gyanchautari]
- আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা: সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও
সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়।[chakribangla]
সারকথা হলো,
শাসন কেবল ক্ষমতা পরিচালনার প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি
একটি মূল্যবান সামাজিক চুক্তি—যেখানে রাষ্ট্র, সরকার ও
নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করে ন্যায়বিচার, উন্নয়ন ও
মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করে।[teachers.gov][chakribangla][rastrobiggyanpath.blogspot]
শাসন:
সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োজনীয়তা
ভূমিকা
মানবসমাজ
যখন থেকে সংঘবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করেছে, তখন থেকেই
শৃঙ্খলা রক্ষা, সম্পদের বণ্টন, বিরোধ
নিষ্পত্তি এবং সমষ্টিগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোনো না কোনো ধরনের শাসনব্যবস্থার
প্রয়োজন হয়েছে। প্রাচীন গোত্রপ্রধানের নেতৃত্ব থেকে আধুনিক রাষ্ট্রের জটিল
প্রশাসনিক কাঠামো পর্যন্ত শাসনের রূপ বদলেছে, কিন্তু এর
মূল উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত থেকেছে। সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও
উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তাই শাসন কেবল ক্ষমতার প্রয়োগ নয়, বরং
জনকল্যাণের একটি সংগঠিত প্রক্রিয়া।
শাসনের
সংজ্ঞা
সাধারণ
অর্থে শাসন বলতে বোঝায় একটি রাষ্ট্র, সংগঠন বা সমাজকে পরিচালনা করার প্রক্রিয়া,
যার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, তা
বাস্তবায়ন এবং নাগরিকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে
শাসন হলো সেই কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সরকার তার ভূখণ্ডের অধিবাসীদের
ওপর আইনসম্মতভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে এবং সামষ্টিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করে।
আধুনিক
ধারণায় শাসনের অর্থ আরও বিস্তৃত। বিশ্বব্যাংকের মতে, শাসন হলো
সেই ঐতিহ্য ও প্রতিষ্ঠানসমূহের সমষ্টি, যার মাধ্যমে একটি দেশে কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা
হয়। এর মধ্যে রয়েছে সরকার নির্বাচন, পর্যবেক্ষণ ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া, কার্যকর
নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সামর্থ্য এবং নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে
প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা। এখানে "শাসন" ও
"সুশাসন" ধারণাটি আলাদা। শাসন একটি নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া, আর সুশাসন
হলো সেই শাসন, যা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী।
সংক্ষেপে
বলা যায়, শাসন হলো আইন, প্রতিষ্ঠান
ও নীতির কাঠামোর মধ্য দিয়ে সমাজ পরিচালনা এবং জনগণের চাহিদা পূরণের একটি সুসংগঠিত
ব্যবস্থা।
শাসনের
বৈশিষ্ট্য
১. কর্তৃত্ব
ও বৈধতা: শাসনের মূল ভিত্তি হলো আইনসম্মত কর্তৃত্ব।
শাসক বা সরকারের ক্ষমতা তখনই কার্যকর হয়, যখন জনগণ তা
বৈধ বলে মেনে নেয়। এই বৈধতা আসতে পারে সংবিধান, নির্বাচন,
ঐতিহ্য বা জনসমর্থন থেকে।
২. আইনের
শাসন: শাসনব্যবস্থায় সবাই আইনের অধীন, শাসক ও
শাসিত উভয়ই। আইন সবার জন্য সমান প্রযোজ্য হলে সমাজে ন্যায় ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত
হয়।
৩.
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: শাসন
পরিচালিত হয় আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মতো সুসংগঠিত
প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও ক্ষমতা থাকে,
যা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক।
৪.
সার্বভৌমত্ব: রাষ্ট্রীয়
শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সার্বভৌম ক্ষমতা, অর্থাৎ
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব এবং বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার
সামর্থ্য।
৫. নীতি
প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন: শাসন কেবল
আইন তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি,
প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে নীতি নির্ধারণ ও তা কার্যকর করাও এর অংশ।
৬.
জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা: আধুনিক
শাসনব্যবস্থায় শাসকগণ তাঁদের কাজের জন্য জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহি করতে
বাধ্য। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যত স্বচ্ছ হয়, শাসনের
প্রতি আস্থা তত বাড়ে।
৭.
জনঅংশগ্রহণ: গণতান্ত্রিক
শাসনে নাগরিকদের মতামত প্রকাশ, ভোটদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। এটি
শাসনকে অধিক প্রতিনিধিত্বশীল করে তোলে।
৮.
বলপ্রয়োগের বৈধ অধিকার: শৃঙ্খলা
রক্ষা ও আইন লঙ্ঘনকারীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য শাসনব্যবস্থা আইনানুগ বলপ্রয়োগের
ক্ষমতা রাখে, যা পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আদালতের মাধ্যমে প্রয়োগ হয়।
৯.
পরিবর্তনশীলতা: সময়,
প্রযুক্তি ও সামাজিক চাহিদার সঙ্গে শাসনব্যবস্থা নিজেকে মানিয়ে নেয়। তাই
এটি একটি গতিশীল ও বিবর্তনশীল প্রক্রিয়া।
শাসনের
প্রয়োজনীয়তা
১. শান্তি ও
শৃঙ্খলা রক্ষা: শাসনব্যবস্থা
না থাকলে সমাজে অরাজকতা দেখা দেয়, যেখানে শক্তিশালী দুর্বলকে নিপীড়ন করে। আইন
ও প্রশাসনের মাধ্যমে নাগরিকদের জীবন, সম্পত্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা যায়।
২.
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: মানুষের
মধ্যে বিরোধ অনিবার্য। নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে এসব বিরোধ নিষ্পত্তি করে
ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা শাসনের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব।
৩. মৌলিক
অধিকার সংরক্ষণ: বাকস্বাধীনতা,
ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমতা ও জীবনের অধিকারের মতো মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য
একটি কার্যকর শাসনকাঠামো প্রয়োজন।
৪.
অর্থনৈতিক উন্নয়ন: সম্পদের
সুষ্ঠু বণ্টন, অবকাঠামো নির্মাণ, কর্মসংস্থান
সৃষ্টি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সুশৃঙ্খল শাসন অপরিহার্য।
৫. জনসেবা
নিশ্চিতকরণ: শিক্ষা,
স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ ও
যোগাযোগের মতো মৌলিক সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
শাসনব্যবস্থা এই সেবাগুলোর সমন্বয় ও বিতরণ করে।
৬. জাতীয়
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা: বহিঃশত্রুর
আক্রমণ থেকে দেশের স্বাধীনতা ও ভূখণ্ড রক্ষার জন্য সংগঠিত প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক
কাঠামো দরকার, যা শাসনের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে।
৭. সামাজিক
সংহতি ও জাতীয় ঐক্য: বিভিন্ন
ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষকে একটি অভিন্ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ
রাখতে শাসনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৮. পরিবেশ ও
প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা: জলবায়ু
পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের এই যুগে প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ
প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণে কার্যকর শাসননীতি অত্যন্ত জরুরি।
৯.
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষা: বিশ্বায়নের
যুগে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য, চুক্তি ও
কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে একটি সংগঠিত ও দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন।
উপসংহার
শাসন
মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রার অন্যতম ভিত্তি। এটি সমাজে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও
ন্যায় নিশ্চিত করে এবং উন্নয়নের পথ সুগম করে। তবে শাসন তখনই সার্থক, যখন তা
স্বেচ্ছাচারিতার পরিবর্তে আইন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনঅংশগ্রহণের নীতির ওপর
প্রতিষ্ঠিত হয়। শাসক যদি নিজেকে জনগণের প্রভু নয়, বরং সেবক
হিসেবে বিবেচনা করেন, তবেই শাসন প্রকৃত অর্থে কল্যাণকর হয়ে ওঠে। তাই একটি
সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য সুশাসনের
চর্চা ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা প্রতিটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।
**শাসন** (Governance) হলো এমন একটি প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত
হয়। এটি মূলত ক্ষমতা প্রয়োগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ
এবং নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজে শৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করার সাথে
সম্পর্কিত।
নিচে শাসনের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিতভাবে
আলোচনা করা হলো:
---
### ১. শাসনের সংজ্ঞা (Definition of
Governance)
বিভিন্ন দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শাসনকে
বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন:
- **সাধারণ অর্থে:** শাসন বলতে রাষ্ট্র পরিচালনার
কার্যাবলি, ক্ষমতা প্রয়োগ,
আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন,
এবং জনগণের কল্যাণে
সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে বোঝায়।
- **আধুনিক অর্থে:** শাসন হলো রাষ্ট্র, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি খাতের মধ্যে পারস্পরিক相互作用
(interaction) এর মাধ্যমে সমাজ
পরিচালনার একটি কাঠামো।
- **জাতিসংঘের সংজ্ঞা:** শাসন হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ
ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া, যেখানে সরকার,
প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকরা
অংশগ্রহণ করে।
- **ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সংজ্ঞা:** শাসন হলো একটি
দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি, যার মধ্যে রয়েছে নীতি নির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা।
**সারসংক্ষেপে:** শাসন হলো এমন একটি ব্যবস্থা যা
ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের
বণ্টন এবং প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজকে পরিচালিত করে।
---
### ২. শাসনের বৈশিষ্ট্য (Characteristics
of Governance)
সুশাসনের ক্ষেত্রে শাসনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ
বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
1. **অংশগ্রহণ (Participation):** শাসন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত
করতে হয়। এটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হতে পারে।
2. **আইনের শাসন (Rule of Law):** শাসন আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হয়। কোনো
ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
3. **জবাবদিহিতা (Accountability):** শাসক ও প্রশাসকদের জনগণের প্রতি জবাবদিহি থাকতে
হয়।
4. **স্বচ্ছতা (Transparency):** সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া
স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত হতে হয়।
5. **সহমত (Consensus-oriented):** বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে
সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।
6. **সমতা ও অন্তর্ভুক্তি (Equity and
Inclusiveness):** সমাজের সব
শ্রেণি-পেশার মানুষের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হয়।
7. **কার্যকারিতা ও দক্ষতা (Effectiveness
and Efficiency):** সীমিত সম্পদের
সর্বোত্তম ব্যবহার করে লক্ষ্য অর্জন করতে হয়।
8. **দায়বদ্ধতা (Responsiveness):** জনগণের চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি
সংবেদনশীল হতে হয়।
9. **নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য (Checks and
Balances):** ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হয়।
10. **দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি (Strategic
Vision):** শাসন ব্যবস্থায়
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হয়।
---
### ৩. শাসনের প্রয়োজনীয়তা (Importance/Necessity
of Governance)
শাসন একটি রাষ্ট্র ও সমাজের অপরিহার্য উপাদান।
এর প্রয়োজনীয়তা নিম্নরূপ:
1. **রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা:** সুশাসন রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, যা উন্নয়নের
পূর্বশর্ত।
2. **আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা:** শাসন ব্যবস্থা
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
3. **অর্থনৈতিক উন্নয়ন:** স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক
শাসন বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে।
4. **দারিদ্র্য বিমোচন:** সুশাসন দারিদ্র্য বিমোচন ও
সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক।
5. **মৌলিক অধিকার রক্ষা:** শাসন ব্যবস্থা নাগরিকদের
মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করে।
6. **সামাজিক সম্প্রীতি:** বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে
সামাজিক সম্প্রীতি ও সহাবস্থান নিশ্চিত করে।
7. **জনগণের আস্থা:** সুশাসন জনগণের মধ্যে সরকার ও
প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা সৃষ্টি করে।
8. **টেকসই উন্নয়ন:** সুশাসন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য
(SDG) অর্জনের জন্য অপরিহার্য।
9. **দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ:** স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
10. **আন্তর্জাতিক সুনাম:** সুশাসন একটি দেশের
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও সুনাম বৃদ্ধি করে।
---
### উপসংহার
শাসন হলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি। সঠিক
শাসন ব্যবস্থা ছাড়া কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র টেকসই উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। তাই
শাসনের বৈশিষ্ট্যগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রতিটি
রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
**শাসনের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োজনীয়তা**
শাসন (Governance) হলো রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার **প্রক্রিয়া**।
সরকার একটি প্রতিষ্ঠান; শাসন সেই
প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য অংশীজন যেভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, নীতি নেয় ও তা বাস্তবায়ন করে—সেই পদ্ধতি।
## সংজ্ঞা
উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি দেশের রাজনৈতিক,
অর্থনৈতিক ও সামাজিক
বিষয়াদি পরিচালনার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিকে **শাসন** বলে।
- **বিশ্বব্যাংক (১৯৯২/১৯৯৪):** উন্নয়নের স্বার্থে
দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতা প্রয়োগের ধরনই শাসন।
- **UNDP:** অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের প্রয়োগ,
যার মাধ্যমে দেশের
বিষয়াদি পরিচালিত হয়।
- **ল্যান্ডেল-মিলস ও সেরাজেলদিন:** জনগণ কীভাবে
শাসিত হয়, রাষ্ট্রীয়
বিষয়াদি কীভাবে চলে এবং তা প্রশাসন ও আইনের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত—এই পুরো
প্রক্রিয়াই শাসন।
সহজ কথায়, শাসন মানে কেবল সরকারের আদেশ নয়; সরকার, প্রশাসন, নাগরিক, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি খাত মিলে দেশ চালানোর
পদ্ধতি।
## বৈশিষ্ট্য
| বৈশিষ্ট্য | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| প্রক্রিয়া | শাসন কোনো দপ্তর বা দল নয়; ক্ষমতা প্রয়োগের ধারা |
| বহু অংশীজন | সরকারের পাশাপাশি নাগরিক, গণমাধ্যম, বেসরকারি সংস্থা ও বাজার যুক্ত |
| তিন স্তর | রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক |
| নীতি ও বাস্তবায়ন | সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা কার্যকর করা—দুটোই এর
অংশ |
| আইনি কাঠামো | আইন, নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিচালিত |
| জবাবদিহিতা | শাসকের কাজের হিসাব দেওয়ার ধারণা এর সঙ্গে
জড়িত |
| গতিশীল | সময়, চাহিদা ও প্রযুক্তির সঙ্গে বদলায় |
| জনস্বার্থমুখী | লক্ষ্য সমাজের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও কল্যাণ |
## প্রয়োজনীয়তা
1. **শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা** — শাসন না থাকলে সমাজে
বিশৃঙ্খলা ও স্বেচ্ছাচার বাড়ে।
2. **আইন প্রয়োগ** — অধিকার রক্ষা ও অপরাধ দমন
শাসনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হয়।
3. **সম্পদ ব্যবস্থাপনা** — কর, বাজেট, ভূমি ও সেবা সঠিকভাবে চালাতে শাসন লাগে।
4. **উন্নয়ন** — শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও অর্থনীতির নীতি বাস্তবায়ন শাসনের
কাজ।
5. **নাগরিক অধিকার** — স্বাধীনতা, সমতা ও ন্যায়বিচার টিকিয়ে রাখে।
6. **সংঘাত নিরসন** — ভিন্ন মত ও স্বার্থের মধ্যে
সমন্বয় করে।
7. **রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা** — সরকার বদলালেও
শাসনপ্রক্রিয়া থাকলে রাষ্ট্র চলতে থাকে।
8. **সুশাসনের ভিত্তি** — স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক শাসনই সুশাসনের
পূর্বশর্ত।
**এক কথায়:** শাসন হলো দেশ চালানোর পদ্ধতি;
এর বৈশিষ্ট্য বহুপক্ষীয়,
আইননির্ভর ও জনকল্যাণমুখী
প্রক্রিয়া; আর এর
প্রয়োজনীয়তা সমাজের শৃঙ্খলা, অধিকার ও উন্নয়ন
নিশ্চিত করা।
শাসনের
সংজ্ঞা
শাসন হলো রাষ্ট্র বা কোনো সংগঠন পরিচালনার এমন একটি
প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আইন, নীতি,
সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সাহায্যে সমাজে
শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার
ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করা
হয়।
সহজভাবে বলা
যায়, রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হয় এবং জনগণের জন্য সিদ্ধান্ত
কীভাবে বাস্তবায়িত হয়—তার সামগ্রিক প্রক্রিয়াই শাসন।
শাসনের
বৈশিষ্ট্য
১. আইনভিত্তিক — শাসন
সাধারণত সংবিধান ও আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
২. জনকল্যাণমুখী — জনগণের
নিরাপত্তা, অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
৩. কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার প্রয়োগ — সিদ্ধান্ত
গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের জন্য বৈধ কর্তৃত্ব প্রয়োজন।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো — সরকার,
প্রশাসন, বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শাসন পরিচালনায়
ভূমিকা রাখে।
৫. জবাবদিহিতা — শাসনব্যবস্থায়
কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
৬. অংশগ্রহণমূলক — আধুনিক
শাসনে নাগরিকদের মতামত ও অংশগ্রহণের গুরুত্ব রয়েছে।
৭. পরিবর্তনশীল — সময়,
সমাজ ও জনগণের চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে শাসনব্যবস্থাও পরিবর্তিত হয়।
শাসনের
প্রয়োজনীয়তা
১. আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা — সমাজে
শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য শাসন অপরিহার্য।
২. নাগরিকের অধিকার রক্ষা — মানুষের
মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা সংরক্ষণে শাসনের ভূমিকা রয়েছে।
৩. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা — অপরাধ
নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর শাসন প্রয়োজন।
৪. জনসেবা প্রদান — শিক্ষা,
স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, পানি, বিদ্যুৎসহ
বিভিন্ন জনসেবা পরিচালনা করা।
৫. অর্থনৈতিক উন্নয়ন — দেশের
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের জন্য নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
৬. সামাজিক স্থিতিশীলতা — বিভিন্ন
গোষ্ঠীর স্বার্থের সমন্বয় করে সামাজিক সংঘাত কমাতে সাহায্য করে।
৭. উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন — দেশের
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে শাসন গুরুত্বপূর্ণ।
৮. জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা — অভ্যন্তরীণ
ও বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর শাসন প্রয়োজন।
সংক্ষেপে: শাসন হলো রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক
প্রক্রিয়া। সুশাসন নিশ্চিত হলে আইনের শাসন,
জবাবদিহিতা, জনঅংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার
ও জনকল্যাণ প্রতিষ্ঠা
করা সহজ হয়।
শাসন (Governance)
হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও লোকপ্রশাসনের একটি মৌলিক ধারণা। সমাজ বা রাষ্ট্রকে
সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। নিচে শাসনের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য
এবং প্রয়োজনীয়তা ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো:
১. শাসনের
সংজ্ঞা
সাধারণ
অর্থে, শাসন বলতে কোনো
রাষ্ট্র, সমাজ বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।
ব্যাপক
অর্থে, শাসন হলো এমন একটি পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে
কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা
হয়। এটি কেবল সরকারের কাজ নয়; বরং সরকার কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, কীভাবে নীতি
নির্ধারণ করে এবং তা কীভাবে বাস্তবায়ন করে—তার সামগ্রিক রূপই হলো শাসন।
বিশ্বব্যাংকের মতে, শাসন হলো এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও
সামাজিক উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়।
২. শাসনের
বৈশিষ্ট্য
একটি
কার্যকর শাসন ব্যবস্থার বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকে:
- ধারাবাহিক প্রক্রিয়া:
শাসন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি নীতি নির্ধারণ, সিদ্ধান্ত
গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের একটি অবিরাম ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
- কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার প্রয়োগ: শাসনের একটি মূল দিক হলো বৈধ ক্ষমতার প্রয়োগ। এই
ক্ষমতার মাধ্যমে সমাজে আইন ও নিয়মকানুন বলবৎ করা হয়।
- প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো:
শাসন মূলত সরকার, আমলাতন্ত্র,
বিচারালয়, আইনসভা
এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
- সম্পদ ব্যবস্থাপনা: রাষ্ট্রের মানবিক ও বস্তুগত সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও
বণ্টন শাসনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
- সমন্বয়সাধন: সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, গোষ্ঠী
এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে একটি স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি
করা শাসনের কাজ।
(আধুনিক যুগে
শাসনের একটি উন্নত রূপ হলো 'সুশাসন' বা Good
Governance, যার বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা,
আইনের শাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণ অন্তর্ভুক্ত থাকে।)
৩. শাসনের
প্রয়োজনীয়তা
যেকোনো
মানবসমাজ বা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং এর উন্নয়নের জন্য শাসন
অপরিহার্য। এর প্রধান প্রয়োজনীয়তাগুলো হলো:
- শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা: সমাজে বিশৃঙ্খলা রোধ করে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায়
রাখতে একটি সুনির্দিষ্ট শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজন। শাসন ছাড়া সমাজে 'জোর যার মুল্লুক তার' বা
মাৎস্যন্যায় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
- আইনের প্রয়োগ ও ন্যায়বিচার: নাগরিক অধিকার রক্ষা করা, অপরাধ
দমন করা এবং সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর শাসন ব্যবস্থা
অত্যন্ত জরুরি।
- জাতীয় নিরাপত্তা: দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষার পাশাপাশি
বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য
শাসন ব্যবস্থা প্রয়োজন।
- উন্নয়ন তরান্বিত করা:
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা,
স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সঠিক নীতি
প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কেবল একটি দক্ষ শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব।
- জনকল্যাণ নিশ্চিতকরণ: আধুনিক রাষ্ট্রগুলো মূলত কল্যাণমূলক। জনগণের মৌলিক
চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত
করার জন্য শাসনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
সংক্ষেপে,
সমাজকে অরাজকতার হাত থেকে রক্ষা করে একটি সুশৃঙ্খল, উন্নত ও
ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করার জন্যই শাসনের উদ্ভব ও প্রয়োজনীয়তা।
শাসন হলো রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান
বা সম্পদকে নিয়মানুবর্তিতা, নীতিমালা এবং কর্তৃত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে সকলের কল্যাণে
পরিচালনা করার একটি সামগ্রিক
প্রক্রিয়া। [1, 2]
নিচে শাসনের
সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য এবং প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো:
শাসনের
সংজ্ঞা
সহজ কথায়,
শাসন (Governance) হলো কোনো সমাজ, রাষ্ট্র বা
প্রতিষ্ঠানকে সুশৃঙ্খলভাবে চালিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি বা ব্যবস্থাপনা। এর মাধ্যমে
ক্ষমতার প্রয়োগ, নীতি নির্ধারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অন্যদিকে,
প্রশাসন হলো সেই শাসনের নীতিমালা ও সিদ্ধান্তগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার
দাপ্তরিক কার্যক্রম। [3, 4]
শাসনের
বৈশিষ্ট্যসমূহ
একটি
সুশৃঙ্খল ও কার্যকর শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- অংশগ্রহণ: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমাজের সকল স্তরের
মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
- আইনের শাসন: আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং নিরপেক্ষভাবে আইন
প্রয়োগ করা।
- স্বচ্ছতা: রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাবলি ও তথ্য সাধারণ
মানুষের জানার অধিকার থাকা।
- জবাবদিহিতা: ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের জন্য
জনগণের কাছে বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে দায়বদ্ধ থাকা।
- দক্ষতা ও কার্যকারিতা:
কম সময়ে ও কম খরচে সর্বোত্তম উপায়ে নাগরিক সেবা ও
প্রয়োজন মেটানো।
- ঐকমত্যভিত্তিক: সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মতের মধ্যে সমঝোতা ও
ঐকমত্যের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
- অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়বিচার: সমাজের সব শ্রেণি, পেশা ও
লিঙ্গের মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
[2, 3, 5, 6, 7, 8]
শাসনের
প্রয়োজনীয়তা
একটি
রাষ্ট্র বা সমাজের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য শাসনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম:
- শৃঙ্খলা রক্ষা: সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা দূর করে আইনের অনুশাসন ও
শান্তি বজায় রাখা।
- সম্পদের সঠিক ব্যবহার:
রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক মানবসম্পদ ও প্রাকৃতিক
সম্পদের অপচয় রোধ করে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
- নাগরিক অধিকার সুরক্ষা: মানুষের মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা
এবং নিরাপত্তা সংরক্ষণ করা।
- অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন: সুষম উন্নয়ন, বিনিয়োগ
বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটানো।
- দুর্নীতি প্রতিরোধ: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে দুর্নীতি ও অনিয়ম
কমিয়ে আনা। [3, 8]
আপনি কি সুশাসন ও সাধারণ শাসনের পার্থক্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান, নাকি কোনো নির্দিষ্ট দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে চান?
[3] https://www.ebookbou.edu.bd
সুশাসন (Good Governance)রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
হলো - শাসন আছে, কিন্তু সেটা কি
সুশাসন?১. সুশাসনের অর্থ ও
সংজ্ঞাসাধারণ শাসনের সাথে যখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন ও
জনগণের অংশগ্রহণ যুক্ত হয়, তখন তাকে সুশাসন
বলে।সংজ্ঞা:বিশ্বব্যাংকের মতে: "যে শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সম্পদ দক্ষতার
সাথে ও জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তাই সুশাসন।"UNDP এর মতে: সুশাসন
হলো এমন একটি ব্যবস্থা যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সকল ক্ষেত্রে নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করে।সহজ কথায়:
জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা,
জনগণের কল্যাণে পরিচালিত
শাসনই সুশাসন। যেখানে সরকার হবে সেবক, প্রভু নয়।শাসন বনাম সুশাসন: শাসন হলো গাড়ি, সুশাসন হলো ভালো ড্রাইভারসহ ভালো গাড়ি।২.
সুশাসনের বৈশিষ্ট্য - ৯টিUNDP ও বিশ্বব্যাংক
মোট ৯টি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছে, যা পরীক্ষায়
অবশ্যই লিখতে হবে:১. অংশগ্রহণ (Participation): সকল নাগরিকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে
সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ।
২. আইনের শাসন (Rule of Law): আইন সবার জন্য সমান। আইনের চোখে প্রধানমন্ত্রী
ও রিকশাওয়ালা সমান।
৩. স্বচ্ছতা (Transparency): সরকারের আয়-ব্যয়, টেন্ডার, নিয়োগ - সব তথ্য জনগণ জানতে পারবে। তথ্য
অধিকার আইন এর উদাহরণ।
৪. জবাবদিহিতা (Accountability): সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী, এমপি - সবাই জনগণের কাছে জবাব দিতে বাধ্য।
৫. সংবেদনশীলতা (Responsiveness): জনগণের সমস্যায় দ্রুত সাড়া দেওয়া। যেমন -
৩৩৩ নম্বরে কল।
৬. ঐক্যমত্য (Consensus Oriented): সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের সাথে সংখ্যালঘুর
স্বার্থ রক্ষা।
৭. সাম্য ও অন্তর্ভুক্তি (Equity and
Inclusiveness): নারী, আদিবাসী, দরিদ্র - কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না।
৮. দক্ষতা ও কার্যকারিতা (Effectiveness
& Efficiency): কম সময়ে,
কম খরচে ভালো সেবা।
৯. কৌশলগত দূরদর্শিতা (Strategic
Vision): সরকার শুধু আজকের কথা নয়,
২০৪১ সালের কথাও ভাববে।৩.
সুশাসনের নির্দেশক বা সূচকবিশ্বব্যাংক সুশাসন মাপার জন্য ৬টি নির্দেশক (WGI)
ব্যবহার করে:ভয়েস ও
জবাবদিহিতা: মানুষ কি কথা বলতে পারে? মিডিয়া স্বাধীন?রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতা: ঘন ঘন হরতাল, সহিংসতা আছে কিনা?সরকারের কার্যকারিতা: আমলাতন্ত্র কতটা দক্ষ ও
দুর্নীতিমুক্ত?নিয়ন্ত্রণের
গুণগত মান: ব্যবসা-বান্ধব আইন আছে কিনা?আইনের শাসন: আদালতে বিচার পেতে কতদিন লাগে? পুলিশ নিরপেক্ষ?দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ: ঘুষ ছাড়া কাজ হয় কিনা?এই ৬টি সূচকে বাংলাদেশের স্কোর -১০০ থেকে +১০০
এর মধ্যে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের স্কোর খুব কম।৪. বাংলাদেশে সুশাসনের
সমস্যাপ্রধান ৭টি সমস্যা:১. দুর্নীতি: TIB এর মতে, বাংলাদেশে সেবা
খাতে ৬০% মানুষকে ঘুষ দিতে হয়। দুর্নীতি সুশাসনের ১ নম্বর শত্রু।
২. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা: বিরোধী দল
দমন, মত প্রকাশে ভয়।
৩. দুর্বল আইনের শাসন: বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা -
মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে ৬-৭ বছর লাগে। ৪০ লাখ মামলা জট।
৪. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও স্বজনপ্রীতি: ফাইল
আটকে রাখা, ঘুষ ছাড়া ফাইল
নড়ে না।
৫. মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা:
গুম, হেফাজতে নির্যাতন।
৬. তথ্যের অভাব ও স্বচ্ছতার অভাব: তথ্য অধিকার
আইন থাকলেও তথ্য পাওয়া কঠিন।
৭. দুর্বল স্থানীয় সরকার: ইউনিয়ন পরিষদ,
উপজেলাকে ক্ষমতা না
দেওয়া। সব ক্ষমতা ঢাকা কেন্দ্রিক।৫. বাংলাদেশে সুশাসনের সম্ভাবনা ও করণীয়সমস্যা
আছে মানে সম্ভাবনাও আছে।সম্ভাবনার দিক:তরুণ জনগোষ্ঠী: ৬৫% জনগণ তরুণ, যারা সচেতন ও প্রযুক্তি-বান্ধব।ডিজিটাল
বাংলাদেশ: ৩৩৩, জাতীয় তথ্য
বাতায়ন, ই-নথি - দুর্নীতি
কমাচ্ছে।শক্তিশালী এনজিও ও মিডিয়া: ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, সাংবাদিকরা জবাবদিহিতা বাড়াচ্ছে।তথ্য
প্রযুক্তি: ফেসবুকে দুর্নীতি ভাইরাল হয়ে যায়, সরকার চাপে পড়ে।করণীয় - ৫টি উপায়:দুর্নীতি
দমন কমিশনকে সত্যিকারের স্বাধীন করাবিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা ও মামলা জট
কমাতে ই-জুডিশিয়ারিতথ্য অধিকার আইনের পূর্ণ বাস্তবায়নস্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী
করা - বাজেটের ৪০% তাদের হাতে দেওয়ানাগরিক সচেতনতা: জনগণকে অধিকার সম্পর্কে জানতে
হবে। জবাবদিহিতা চাইতে হবে।উপসংহার: সুশাসন ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। পদ্মা
সেতু, মেট্রোরেল হলো উন্নয়ন,
কিন্তু সেই উন্নয়নের
সুফল সবাই পাচ্ছে কিনা, দুর্নীতি ছাড়া
সেবা পাচ্ছে কিনা - সেটাই সুশাসন। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশ হতে
হলে সুশাসনই হবে মূল চাবিকাঠি।তোমার এটা কি অনার্স ১ম বর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের
প্রশ্ন? যদি হয়, তাহলে আমি তোমাকে পরীক্ষায় লেখার মতো ১০
নম্বরের উত্তর ফরম্যাটে সাজিয়ে দিতে পারি।
সুশাসন হলো
এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক,
অংশগ্রহণমূলক ও জনকল্যাণমুখীভাবে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে
অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও সুশাসনের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, রাজনৈতিক
হস্তক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার মতো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে; তবে
ডিজিটালাইজেশন, তরুণ জনগোষ্ঠী ও সুশীল সমাজের সক্রিয়তা নতুন সম্ভাবনা
তৈরি করছে।[teachers.gov][banglalecturesheet][preparation.com][jica.go][edusphereglobalpress]
সুশাসনের
অর্থ ও সংজ্ঞা
“সুশাসন” (Good
Governance) শব্দটি ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রথম ব্যবহৃত হয় এবং পরবর্তীতে UNDP,
OECD, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এটি গ্রহণ করে।[preparation.com][documents1.worldbank]
বিভিন্ন
সংজ্ঞা:
- বিশ্বব্যাংক (১৯৯৪): “সুশাসন
এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি দেশের অর্থনৈতিক ও
সামাজিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়।”[teachers.gov][preparation.com]
- UNDP: “একটি দেশের সার্বিক
স্তরের কার্যাবলি পরিচালনার জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক
এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের চর্চার বা প্রয়োগের পদ্ধতিই হলো সুশাসন।”[preparation.com]
- ম্যাক করনি: “সুশাসন
বলতে রাষ্ট্রের সাথে সুশীল সমাজের, সরকারের
সাথে শাসিত জনগণের, শাসকের সাথে শাসিতের সম্পর্ককে বোঝায়।”[banglalecturesheet]
- সহজ অর্থে: সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা,
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা
এবং জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে জনগণের কল্যাণে শাসনকার্য পরিচালনাই হলো
সুশাসন।[teachers.gov]
সুশাসন কেবল
সরকারি কাজ নয়; এটি রাষ্ট্র, বাজার ও সুশীল সমাজের মধ্যে একটি
ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে।[banglalecturesheet][preparation.com]
সুশাসনের
বৈশিষ্ট্য
আন্তর্জাতিক
সংস্থা ও গবেষকরা সুশাসনের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন:
|
বৈশিষ্ট্য |
ব্যাখ্যা |
|
অংশগ্রহণ
(Participation) |
সব নাগরিক,
বিশেষ করে প্রান্তিক গোষ্ঠী, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
[teachers.gov][teachers.gov] |
|
আইনের
শাসন (Rule of Law) |
আইন সবার
জন্য সমান; বিচার বিভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। [m.somewhereinblog][teachers.gov] |
|
স্বচ্ছতা
(Transparency) |
সরকারি
তথ্য, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম উন্মুক্ত ও সহজলভ্য। [teachers.gov][edusphereglobalpress] |
|
জবাবদিহিতা
(Accountability) |
শাসকগণ
তাদের কাজের জন্য জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়ী। [teachers.gov][m.somewhereinblog] |
|
দায়িত্বশীলতা
(Responsiveness) |
সরকার
জনগণের চাহিদা ও সমস্যার প্রতি দ্রুত সাড়া দেয়। [teachers.gov][teachers.gov] |
|
ঐকমত্য-ভিত্তিক
(Consensus Oriented) |
বিভিন্ন
স্বার্থের মধ্যে মধ্যস্থতা করে ব্যাপক ঐকমত্যে পৌঁছানো। [teachers.gov] |
|
সাম্য ও
অন্তর্ভুক্তি (Equity & Inclusiveness) |
সব
নাগরিকের সমান সুযোগ; কোনো গোষ্ঠী বঞ্চিত না হয়। [teachers.gov] |
|
দক্ষতা ও
কার্যকারিতা (Efficiency & Effectiveness) |
সম্পদের
সঠিক ব্যবহার; লক্ষ্য অর্জনে সর্বোচ্চ ফলাফল। [teachers.gov][m.somewhereinblog][teachers.gov] |
|
দৃষ্টিভঙ্গি
ও নেতৃত্ব (Strategic Vision) |
দীর্ঘমেয়াদি
উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের উপস্থিতি। [teachers.gov] |
|
বিচার
বিভাগের স্বাধীনতা |
ন্যায়বিচার
নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত। [teachers.gov][edusphereglobalpress][teachers.gov] |
|
গণমাধ্যমের
স্বাধীনতা |
স্বাধীন
গণমাধ্যম সরকারি কাজের তদারকি ও জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। [teachers.gov] |
সুশাসনের
নির্দেশক (Indicators)
বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators (WGI) সুশাসন
মূল্যায়নের জন্য ছয়টি মাত্রা ব্যবহার করে:[documents1.worldbank][uits.edu]
- Voice and Accountability (কণ্ঠস্বর
ও জবাবদিহিতা): নাগরিকদের
মতপ্রকাশ, সংগঠন ও নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের সুযোগ।
- Political Stability and Absence of Violence (রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংসতা অনুপস্থিতি): সরকারের পতন বা সহিংসতার ঝুঁকি।
- Government Effectiveness (সরকারি
কার্যকারিতা): সরকারি
সেবার মান, বেসামরিক চাকরির স্বাধীনতা ও নীতি বাস্তবায়ন।
- Regulatory Quality (নিয়ন্ত্রণমূলক
গুণমান): বাজারবান্ধব
নীতি ও প্রবিধান তৈরির ক্ষমতা।
- Rule of Law (আইনের
শাসন): আইনের
প্রতি শ্রদ্ধা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও চুক্তি বাস্তবায়ন।
- Control of Corruption (দুর্নীতি
নিয়ন্ত্রণ): সরকারি
ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ।
এছাড়া UNDP
ও অন্যান্য সংস্থা স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ, দারিদ্র্য
হ্রাস, মানব উন্নয়ন, কর-জিডিপি
অনুপাত, ডিজিটাল সেবা ইত্যাদিকেও নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করে।[jica.go][edusphereglobalpress]
বাংলাদেশে
সুশাসনের সমস্যা
বাংলাদেশে
সুশাসনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান:
১. দুর্নীতি
ও জবাবদিহিতার অভাব
- Transparency International-এর Corruption
Perceptions Index-এ বাংলাদেশ নিচের দিকে অবস্থান করে।[documents1.worldbank]
- বিশ্বব্যাংকের WGI অনুযায়ী,
“Control of Corruption” ও “Voice and Accountability” সূচক ২০০০ সাল থেকে উন্নত হয়নি, বরং কিছু ক্ষেত্রে অবনতি ঘটেছে।[jica.go][uits.edu]
২. রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতার অভাব
- দলীয় কোন্দল, হরতাল-অবরোধ
ও সহিংসতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।[uits.edu][iosrjournals]
- “Political Stability” সূচকে
বাংলাদেশের অবস্থান খুবই নিম্ন (২০০৬ সালে মাত্র ৬.৬%)।[uits.edu]
৩. সরকারি
কার্যকারিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দুর্বলতা
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দক্ষ
জনবলের অভাব ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সরকারি সেবার মান কম।[jica.go][edusphereglobalpress]
- “Government Effectiveness” ও “Regulatory
Quality” সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।[jica.go][uits.edu]
৪. আইনের
শাসন ও বিচার বিভাগের দুর্বলতা
- বিচার বিভাগে রাজনৈতিক প্রভাব, মামলার জট ও দীর্ঘসূত্রিতা ন্যায়বিচারে বাধা
সৃষ্টি করে।[edusphereglobalpress][iosrjournals]
- “Rule of Law” সূচকে বাংলাদেশের
অবস্থান নিম্ন (১৯.৮%)।[uits.edu]
৫. অতিরিক্ত
রাজনীতিকরণ
- সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা
ও চাকরিতে দলীয়করণ সুশাসনকে ব্যাহত করে।[uits.edu][iosrjournals]
- Partisan politics সব ক্ষেত্রে
ছড়িয়ে পড়েছে।[uits.edu]
৬. স্বচ্ছতা
ও তথ্যের অভাব
- সরকারি তথ্যের সহজলভ্যতা সীমিত; নাগরিকরা অনেক সময় তথ্য অধিকার আইন ব্যবহারে বাধার
সম্মুখীন হয়।[edusphereglobalpress]
৭. রাজস্ব
আহরণের নিম্ন হার
- কর-জিডিপি অনুপাত খুবই কম, যা সরকারি সক্ষমতা ও আর্থিক সুস্থতার দুর্বলতা
নির্দেশ করে।[jica.go]
বাংলাদেশে
সুশাসনের সম্ভাবনা
সমস্যা
সত্ত্বেও বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বেশ কিছু সম্ভাবনা রয়েছে:
১. ডিজিটাল
সরকার ও সেবা
- e-Government, Digital Center, অনলাইন
সেবা (যেমন: e-TIN, e-Passport, ভূমি সেবা)
স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়িয়েছে।[edusphereglobalpress]
- ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক
জটিলতা কমানো সম্ভব।[edusphereglobalpress]
২. তরুণ
জনগোষ্ঠী ও প্রযুক্তি ব্যবহার
- জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ, যারা
প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে সচেতন ও সক্রিয়।[edusphereglobalpress]
- তথ্য অধিকার আইন, অনলাইন
অভিযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে।[edusphereglobalpress]
৩. সুশীল
সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা
- এনজিও, গবেষণা প্রতিষ্ঠান
ও গণমাধ্যম সরকারি কাজের তদারকি ও মতামত দিচ্ছে।[edusphereglobalpress]
- সামাজিক আন্দোলন (পরিবেশ, নারী
অধিকার, শিক্ষা) সুশাসনের দাবি তুলে ধরছে।[edusphereglobalpress]
৪.
অর্থনৈতিক অগ্রগতি
- দ্রুত জিডিপি বৃদ্ধি, মাথাপিছু
আয় বৃদ্ধি ও মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া সরকারি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।[jica.go]
- অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে নাগরিকদের সুশাসনের
চাহিদাও বাড়ছে।[documents1.worldbank]
৫.
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও চাপ
- বিশ্বব্যাংক, UNDP, JICA-সহ
উন্নয়ন সহযোগীরা সুশাসন সংস্কারে সহায়তা ও চাপ দিচ্ছে।[jica.go][documents1.worldbank]
- SDG (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অর্জনে সুশাসন অন্যতম
লক্ষ্য।[edusphereglobalpress]
৬.
সংস্কারের রাজনৈতিক ইচ্ছা
- নতুন সরকার বা নেতৃত্ব সংস্কারের অঙ্গীকার করলে
প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন সম্ভব।[edusphereglobalpress]
- স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা) শক্তিশালী হলে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা
বাড়বে।[jica.go]
উপসংহার
সুশাসন কেবল
তাত্ত্বিক ধারণা নয়; এটি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য
হ্রাস ও গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণের মূল চাবিকাঠি। বর্তমান
চ্যালেঞ্জগুলো (দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক
দুর্বলতা) কাটিয়ে উঠতে হলে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক
সংস্কার, নাগরিক সচেতনতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়
প্রয়োজন। ডিজিটাল প্রযুক্তি, তরুণ শক্তি
ও সুশীল সমাজের সক্রিয়তা বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।[teachers.gov][preparation.com][jica.go][edusphereglobalpress]
সুশাসন:
অর্থ, বৈশিষ্ট্য, নির্দেশক
এবং বাংলাদেশে সমস্যা ও সম্ভাবনা
ভূমিকা
রাষ্ট্র
পরিচালনায় ক্ষমতা থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই ক্ষমতা কীভাবে ও কার স্বার্থে প্রয়োগ
হচ্ছে, সেটিই মুখ্য। এই প্রশ্ন থেকেই সুশাসনের ধারণার উদ্ভব।
বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) ও অন্যান্য
আন্তর্জাতিক সংস্থা সুশাসনকে টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG) ১৬ নম্বর
লক্ষ্যে শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে,
যা সুশাসনেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য সুশাসন
তাই অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি।
সুশাসনের
অর্থ
সুশাসন (Good
Governance) বলতে এমন শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদ আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা
ও জনঅংশগ্রহণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা হয়। সহজ
কথায়, সুশাসন হলো জনগণের চাহিদা অনুযায়ী, ন্যায্য ও
কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়া।
"শাসন"
একটি নিরপেক্ষ ধারণা, কারণ শাসন ভালো বা মন্দ দুই-ই হতে পারে। যে শাসন
স্বেচ্ছাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত ও জনবিমুখ, তা কুশাসন।
আর যে শাসন নিয়ম, নীতি ও নৈতিকতার ভিত্তিতে জনস্বার্থে পরিচালিত হয়,
তাই সুশাসন। এতে শুধু সরকার নয়, বেসরকারি
খাত, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানেরও ভূমিকা থাকে।
সুশাসনের
বৈশিষ্ট্য
UNDP সুশাসনের
কয়েকটি মূল বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছে। সেগুলোর আলোকে প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে
আলোচনা করা হলো।
১. আইনের
শাসন: আইন সবার জন্য সমান এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে
নয়। বিচার বিভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হলে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
২.
স্বচ্ছতা: সরকারি সিদ্ধান্ত ও তার প্রক্রিয়া জনগণের
কাছে উন্মুক্ত থাকা। তথ্যে অবাধ প্রবেশাধিকার স্বচ্ছতার মূল ভিত্তি।
৩.
জবাবদিহিতা: সরকারি
কর্মকর্তা, নির্বাচিত প্রতিনিধি ও প্রতিষ্ঠান তাঁদের কাজ ও
সিদ্ধান্তের জন্য জনগণ ও আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
৪.
জনঅংশগ্রহণ: নীতি
প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সরাসরি বা
প্রতিনিধির মাধ্যমে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা।
৫.
সাড়াদানশীলতা: প্রতিষ্ঠানগুলো
যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে নাগরিকের প্রয়োজন ও অভিযোগে সাড়া দেবে।
৬. সমতা ও
অন্তর্ভুক্তি: সমাজের
দরিদ্র, প্রান্তিক, নারী ও সংখ্যালঘুসহ কেউই উন্নয়ন ও সুযোগ
থেকে বঞ্চিত হবে না।
৭.
কার্যকারিতা ও দক্ষতা: সীমিত
সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে জনগণের চাহিদা পূরণ করা।
৮.
ঐকমত্য-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত: সমাজের
বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে সর্বসম্মত বা বৃহত্তর স্বার্থের পক্ষে
সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
৯. কৌশলগত
দূরদৃষ্টি: দীর্ঘমেয়াদি
উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি।
সুশাসনের
নির্দেশক
সুশাসনের
মান পরিমাপের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্দিষ্ট সূচক ব্যবহার করে।
সর্বাধিক প্রচলিত হলো বিশ্বব্যাংকের বিশ্বব্যাপী
সুশাসন নির্দেশক (Worldwide Governance Indicators), যাতে ছয়টি
মাত্রা রয়েছে।
১. মতপ্রকাশ ও জবাবদিহিতা: নাগরিকরা
সরকার নির্বাচনে কতটা অংশ নিতে পারে এবং মতপ্রকাশ, সংগঠন ও
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা আছে।
২. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংসতার অনুপস্থিতি: সরকার অসাংবিধানিক বা সহিংস উপায়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার
ঝুঁকি কতটা।
৩. সরকারের কার্যকারিতা: সরকারি
সেবার মান, প্রশাসনের দক্ষতা, রাজনৈতিক
চাপ থেকে মুক্ত থাকা এবং নীতি বাস্তবায়নের সামর্থ্য।
৪. নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থার মান: বেসরকারি
খাতের উন্নয়নে সহায়ক নীতি ও বিধিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগের সক্ষমতা।
৫. আইনের শাসন: আইন,
চুক্তি, সম্পত্তির অধিকার, পুলিশ ও
আদালতের প্রতি আস্থা এবং অপরাধ ও সহিংসতার সম্ভাবনা।
৬. দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ: ব্যক্তিগত
স্বার্থে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার কতটা নিয়ন্ত্রিত।
এ ছাড়া
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির
ধারণা সূচক (CPI), ফ্রিডম হাউসের স্বাধীনতা
সূচক, মো ইব্রাহিম ফাউন্ডেশনের আফ্রিকা
শাসন সূচক এবং UNDP-র মানব উন্নয়ন সূচকও সুশাসন
বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)
নিয়মিতভাবে বিভিন্ন খাতের দুর্নীতি ও সুশাসন নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করে।
বাংলাদেশে
সুশাসনের সমস্যা
সংবিধানে
গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের চোখে সমতা ও জনগণের ক্ষমতার কথা
স্পষ্টভাবে বলা আছে। তবুও বাস্তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ নানা চ্যালেঞ্জের
মুখোমুখি।
১. ব্যাপক
দুর্নীতি: সরকারি সেবা, ক্রয়প্রক্রিয়া,
ব্যাংকিং ও অবকাঠামো প্রকল্পে দুর্নীতি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। অর্থ
পাচার ও খেলাপি ঋণ অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা। দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা ও
নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন উঠেছে।
২. রাজনীতির
অতি-দলীয়করণ ও প্রতিহিংসা: প্রশাসন,
পুলিশ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব এবং ক্ষমতার পালাবদলে রাজনৈতিক
প্রতিহিংসার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতাকে দুর্বল করেছে।
৩. দুর্বল
নির্বাচনী ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক চর্চা: নির্বাচনের
গ্রহণযোগ্যতা ও সুষ্ঠুতা নিয়ে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এতে জনগণের আস্থা
কমেছে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে।
৪. বিচার
বিভাগের ওপর চাপ ও মামলাজট: বিচারব্যবস্থায়
মামলার জট ও দীর্ঘসূত্রতা, নিম্ন আদালতের ওপর প্রশাসনিক প্রভাব এবং ন্যায়বিচারে
প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা ন্যায়বিচারকে ব্যাহত করে।
৫.
জনপ্রশাসনের অদক্ষতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: লাল ফিতার
দৌরাত্ম্য, পদোন্নতি ও নিয়োগে অনিয়ম এবং সেবাগ্রহীতার প্রতি
অসংবেদনশীলতা প্রশাসনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
৬. আইন
প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহির ঘাটতি: বিচারবহির্ভূত
হত্যা, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ এবং এসব ঘটনায় জবাবদিহির অভাব
মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৭. দুর্বল
স্থানীয় সরকার: স্থানীয়
সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন সীমিত। ক্ষমতা ও সম্পদের
কেন্দ্রীভবনের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সেবা ও অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়।
৮. সংসদের
সীমিত কার্যকারিতা: আইনসভা
নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নজরদারি করতে পারেনি। সংসদীয় কমিটিগুলোর ভূমিকাও
অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকেছে।
৯. গণমাধ্যম
ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট: আইনগত
বিধিনিষেধ, আত্মসেন্সরশিপ ও হয়রানির ঝুঁকি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও
নাগরিক সমাজের ভূমিকা সংকুচিত করে।
১০.
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা: আয়বৈষম্য,
নারীর প্রতি বৈষম্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা অন্তর্ভুক্তিমূলক
উন্নয়নের পথে বাধা।
বাংলাদেশে
সুশাসনের সম্ভাবনা
নানা সমস্যা
সত্ত্বেও বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অনুকূল কিছু ভিত্তি ও সুযোগ রয়েছে।
১.
সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামো: সংবিধানে
জনগণের ক্ষমতা, মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসনের নিশ্চয়তা রয়েছে। তথ্য
অধিকার আইন ২০০৯, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, জাতীয়
শুদ্ধাচার কৌশল এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির মতো উদ্যোগ
সুশাসনের ভিত্তি দিতে পারে।
২.
প্রযুক্তি ও ই-গভর্ন্যান্স: ডিজিটাল
সেবা, অনলাইন ক্রয়ব্যবস্থা (e-GP), ইউনিয়ন
ডিজিটাল সেন্টার ও তথ্য বাতায়ন সেবা সহজ, স্বচ্ছ ও
দুর্নীতিমুক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এই সম্ভাবনাকে আরও
বাড়াতে পারে।
৩. সচেতন ও
তরুণ জনগোষ্ঠী: দেশের
জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। তাদের সচেতনতা, সামাজিক
মাধ্যমের ব্যবহার ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জবাবদিহিমূলক শাসনের জন্য শক্তিশালী চাপ
সৃষ্টি করে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলন এই জনআকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।
৪. সক্রিয়
নাগরিক সমাজ ও এনজিও: টিআইবি,
ব্র্যাকসহ বিভিন্ন সংগঠন গবেষণা, অ্যাডভোকেসি
ও তৃণমূলে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সুশাসনের পক্ষে ভূমিকা রাখছে।
৫.
সংস্কারের সুযোগ: রাজনৈতিক
পটপরিবর্তনের পর নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন,
পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে। এই
সংস্কার-উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী হতে পারে।
৬. স্থানীয়
সরকার শক্তিশালীকরণের সুযোগ: ক্ষমতা ও
সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটালে তৃণমূলে জনঅংশগ্রহণ বাড়বে এবং সেবা প্রদান আরও
কার্যকর হবে।
৭.
অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: পোশাকশিল্প,
প্রবাসী আয় ও কৃষির সাফল্যে অর্জিত অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং
উন্নয়ন-সহযোগীদের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা সংস্কারে সহায়ক হতে পারে।
সুশাসন
প্রতিষ্ঠায় করণীয়
সম্ভাবনাকে
বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। এগুলো হলো বিচার বিভাগের পূর্ণ
স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও কার্যকর
করা, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলা, জনপ্রশাসনে
মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া, তথ্য অধিকার
আইনের কার্যকর প্রয়োগ, সংসদীয় কমিটিকে শক্তিশালী করা, স্থানীয়
সরকারকে ক্ষমতা ও সম্পদ হস্তান্তর করা এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা
সুরক্ষা করা। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে
তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
সুশাসন কোনো
একদিনে অর্জিত হয় না, এটি একটি ধারাবাহিক ও সম্মিলিত প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে
দুর্নীতি, দলীয়করণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির ঘাটতি
সুশাসনের পথে বড় প্রতিবন্ধক। তবে সাংবিধানিক ভিত্তি, প্রযুক্তির
প্রসার, সচেতন তরুণ প্রজন্ম ও সংস্কারের জনআকাঙ্ক্ষা আশার আলো
দেখায়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকার
সমন্বয় ঘটলেই বাংলাদেশ একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে
সফল হতে পারে।
**সুশাসনের মূল কথা হলো:** এটি এমন একটি
শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পদ ব্যবস্থাপনা হয় স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের অধিকার ও কল্যাণকে
অগ্রাধিকার দিয়ে। বাংলাদেশে সুশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো **প্রাতিষ্ঠানিক
দলীয়করণ, আমলাতান্ত্রিক
জটিলতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি**, আর সম্ভাবনা
নির্ভর করছে চলমান সংস্কার উদ্যোগগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
---
### ১. সুশাসনের অর্থ (Meaning)
সুশাসন হলো শাসন প্রক্রিয়ার একটি **নৈতিক ও
মূল্যায়নমূলক রূপ**। জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার (OHCHR) মতে, সুশাসন বলতে এমন প্রক্রিয়াকে বোঝায় যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো
**জনস্বার্থ পরিচালনা, জনসম্পদ
ব্যবস্থাপনা এবং মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ** করে—অপব্যবহার ও দুর্নীতিমুক্ত থেকে এবং
আইনের শাসনকে যথাযথভাবে সম্মান করে ।
বিশ্বব্যাংক ১৯৯৪ সালে সুশাসনকে সংজ্ঞায়িত করে
বলেছে—এটি হলো **সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ
ব্যবস্থাপনার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি** । অর্থাৎ, শাসন তখনই সুশাসন হয়, যখন তার লক্ষ্য থাকে দরিদ্রতম নাগরিকের জীবনমান
উন্নয়ন এবং সমাজের সকল স্তরের কল্যাণ ।
---
### ২. সুশাসনের বৈশিষ্ট্য (Characteristics)
সুশাসনের কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
| বৈশিষ্ট্য | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| **অংশগ্রহণ (Participation)** | নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় জনগণের বা তাদের
প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ |
| **আইনের শাসন (Rule of Law)** | সবাই আইনের কাছে সমান, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় |
| **স্বচ্ছতা (Transparency)** | সিদ্ধান্ত ও কার্যাবলি জনগণের কাছে উন্মুক্ত ও
সহজলভ্য |
| **জবাবদিহিতা (Accountability)** | শাসক ও প্রশাসকদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে
হবে |
| **সংবেদনশীলতা (Responsiveness)** | জনগণের চাহিদা ও অভিযোগ চিহ্নিত করে কার্যকর
পদক্ষেপ গ্রহণ |
| **সমতা ও অন্তর্ভুক্তি (Equity &
Inclusiveness)** | সমাজের সব
শ্রেণির মানুষের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা
|
| **কার্যকারিতা ও দক্ষতা (Effectiveness
& Efficiency)** | সীমিত সম্পদের
সর্বোত্তম ব্যবহারে লক্ষ্য অর্জন |
| **ঐক্যমতভিত্তিক সিদ্ধান্ত (Consensus
Orientation)** | বিভিন্ন
স্বার্থের সমন্বয়ে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ
|
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ বিশেষভাবে পাঁচটি মূল
বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দিয়েছে: **স্বচ্ছতা, দায়িত্ব, জবাবদিহিতা,
অংশগ্রহণ এবং জনগণের
প্রতি সংবেদনশীলতা** ।
---
### ৩. সুশাসনের নির্দেশক (Indicators)
সুশাসন পরিমাপের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে
বহুল ব্যবহৃত কাঠামো হলো **বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators
(WGI)**। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রকাশিত এই সূচক ছয়টি মাত্রায়
সুশাসন পরিমাপ করে :
1. **Voice and
Accountability** — মত প্রকাশের
স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা
2. **Political
Stability and Absence of Violence** — রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতা
3. **Government
Effectiveness** — সরকারের
কার্যকারিতা
4. **Regulatory
Quality** — নিয়ন্ত্রক গুণমান
5. **Rule of
Law** — আইনের শাসন
6. **Control of
Corruption** — দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ
WGI মূলত জনমত জরিপ, প্রতিষ্ঠান জরিপ এবং বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের
ভিত্তিতে তৈরি, যা ২০০-এর বেশি
দেশে ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত তুলনামূলক চিত্র দেয় । বাংলাদেশের জন্য জাতীয়
পর্যায়েও একটি **National Governance Assessment Framework (NGAF)** প্রস্তাব করা হয়েছে, যা SDG-16-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্দেশক নির্ধারণের
ওপর জোর দেয় ।
---
### ৪. বাংলাদেশে সুশাসনের সমস্যা (Problems)
বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান
অন্তরায়গুলো:
**ক) প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ**
রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক
প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা না গেলে সুশাসন কখনোই সম্ভব নয় বলে
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। জুলাই আন্দোলনের পর গঠিত ১২টির মতো সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট
যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি ।
**খ) আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতা**
নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত হলেও বাস্তবায়ন
পর্যায়ে ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরতেই মাস কেটে যায়। প্রশাসনের ভেতরে
দীর্ঘদিনের সুবিধাভোগী একটি অংশ সংস্কারে বাধা সৃষ্টি করতে পারে ।
**গ) জবাবদিহিতার ঘাটতি**
টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্তৃত্ববাদী সরকার পতনের পর এক বছরেও আইনের
শাসন, স্বচ্ছতা ও স্পষ্ট
রোডম্যাপের ঘাটতিতে রাষ্ট্র সংস্কারের পথ কণ্টকাকীর্ণ। তথ্য কমিশন ও মানবাধিকার
কমিশন পুনর্গঠন হয়নি, র্যাব বিলুপ্তি ও
গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কারে অগ্রগতি নেই ।
**ঘ) স্থানীয় সরকারের দুর্বলতা**
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং জবাবদিহিতার অভাবে
উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত হচ্ছে না। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও
স্থানীয় সরকার সংস্কার এখন সময়ের দাবি ।
**ঙ) দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী**
প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী
গোষ্ঠীর প্রভাব রয়ে গেছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ
বলেছেন—"রাজনৈতিক ইচ্ছা ছাড়া দুর্নীতি শুধু উৎস পরিবর্তন করে" ।
---
### ৫. বাংলাদেশে সুশাসনের সম্ভাবনা (Prospects)
সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনা
রয়েছে:
- **সংস্কার কমিশনের সুপারিশ:** ১১টি সংস্কার কমিশন
গঠন ও সুপারিশ জমা দেওয়া হয়েছে, যেগুলো যদি
কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তবে সুশাসনের ভিত্তি মজবুত হবে ।
- **নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন:** নির্বাচন কমিশন
পুনর্গঠন ও আর্থিক খাত সংস্কারে টাস্কফোর্স গঠন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ।
- **ডিজিটালাইজেশন:** ই-গভর্নেন্স ও সেবা
ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে ।
- **সুশীল সমাজের সক্রিয়তা:** সুশীল সমাজ ও নাগরিক
সংগঠনগুলোর সক্রিয়তা সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে ।
- **তরুণ প্রজন্মের দাবি:** জুলাই আন্দোলনের
মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম সুশাসনের দাবিকে সামনে এনেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন
আনতে পারে।
তবে সম্ভাবনার মূল শর্ত হলো **রাজনৈতিক
সদিচ্ছা**। ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের ভাষায়—"রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া
টেকসই সমতাভিত্তিক উন্নয়ন সম্ভব নয়" ।
---
### সারসংক্ষেপ
সুশাসন কেবল একটি আদর্শ নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। বাংলাদেশে
সুশাসনের সংকট মূলত **প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দলীয়করণ ও জবাবদিহিতার অভাব** থেকে সৃষ্ট।
সংস্কার উদ্যোগগুলো যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়
এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তবে সুশাসনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
**সুশাসনের অর্থ, বৈশিষ্ট্য, নির্দেশক এবং বাংলাদেশে সমস্যা ও সম্ভাবনা**
সুশাসন (Good Governance) হলো এমন শাসনপ্রক্রিয়া, যেখানে ক্ষমতা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, অংশগ্রহণমূলক ও আইনানুগভাবে প্রয়োগ হয় এবং
লক্ষ্য থাকে জনকল্যাণ ও উন্নয়ন। শাসন যেকোনো ধরনের ক্ষমতা-প্রয়োগ; সুশাসন তার উত্তম রূপ। এর বিপরীত হলো কুশাসন।
## অর্থ
যে শাসনে—
- সিদ্ধান্ত ও তথ্য উন্মুক্ত থাকে,
- শাসক কাজের জন্য জবাব দেয়,
- নাগরিক অংশ নিতে পারে,
- সবাই আইনের অধীন,
- সেবা দক্ষ ও ন্যায্যভাবে মেলে—
তাকে **সুশাসন** বলে।
- **বিশ্বব্যাংক:** উন্নয়নের জন্য দেশের অর্থনৈতিক
ও সামাজিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতা প্রয়োগের যে ধরন জবাবদিহিতা, আইনি কাঠামো, স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রবাহের ওপর দাঁড়ায়, সেটাই সুশাসন।
- **UNDP (১৯৯৭):** সকল স্তরে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের এমন প্রয়োগ,
যা জনগণের অংশগ্রহণ,
আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে টেকসই মানব
উন্নয়ন নিশ্চিত করে।
## বৈশিষ্ট্য
UNDP-র প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো এভাবে মনে রাখা যায়:
| বৈশিষ্ট্য | অর্থ |
|---|---|
| অংশগ্রহণ | নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নাগরিকের প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষ অংশ |
| আইনের শাসন | সবাই আইনের সমান অধীন; নিরপেক্ষ বিচার |
| স্বচ্ছতা | সিদ্ধান্তের কারণ ও তথ্য জনগণের নাগালে |
| জবাবদিহিতা | সরকার, প্রশাসন ও বেসরকারি খাত কাজের হিসাব দেয় |
| সংবেদনশীলতা | জনদাবির প্রতি সময়মতো সাড়া |
| ঐকমত্য | ভিন্ন স্বার্থের মধ্যে সমঝোতা |
| সমতা ও অন্তর্ভুক্তি | সুযোগ ও সেবায় বৈষম্যহীনতা |
| কার্যকারিতা ও দক্ষতা | কম সম্পদে বেশি ফল, অপচয় কম |
| কৌশলগত দৃষ্টি | দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা |
এগুলোর সঙ্গে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীন গণমাধ্যমও
যুক্ত।
## নির্দেশক
নির্দেশক হলো সুশাসন আছে কি না, তা মাপার দৃশ্যমান চিহ্ন।
**বিশ্বব্যাংকের ছয় নির্দেশক (WGI):**
1. কণ্ঠস্বর ও জবাবদিহিতা — মতপ্রকাশ, সংগঠন, সরকারকে প্রশ্ন করার সুযোগ
2. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা — সহিংসতা ও অস্থিরতার
অনুপস্থিতি
3. সরকারের কার্যকারিতা — নীতি ও সেবার মান
4. নিয়ন্ত্রণের গুণগত মান — আইন-বিধি ব্যবসা ও
নাগরিকের জন্য বাধা না হওয়া
5. আইনের শাসন — চুক্তি পালন, পুলিশ ও আদালতের নিরপেক্ষতা
6. দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ — ক্ষমতার অপব্যবহার কম
হওয়া
**ব্যবহারিক নির্দেশক (পাঠ্যক্রমে প্রচলিত):**
- অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন
- স্বাধীন বিচার বিভাগ ও দ্রুত বিচার
- তথ্য অধিকার ও উন্মুক্ত বাজেট
- দুর্নীতির মাত্রা কম
- স্বাধীন গণমাধ্যম
- কার্যকর স্থানীয় সরকার
- মানবাধিকার সংরক্ষণ
- সেবা সহজলভ্য (সময়, খরচ, ঘুষমুক্ত)
## বাংলাদেশে সুশাসনের সমস্যা
1. **দুর্নীতি** — সেবা, ক্রয়, প্রকল্প ও নিয়োগে ঘুষ ও স্বজনপ্রীতি; সম্পদের অপচয়।
2. **রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা** — দলীয় সংঘাত, প্রতিহিংসা ও অস্থিরতা নীতি ও প্রশাসনকে দুর্বল
করে।
3. **জবাবদিহিতার ঘাটতি** — অনেক সিদ্ধান্ত ও ব্যয়
জনগণের জিজ্ঞাসার বাইরে থেকে যায়।
4. **আইনের শাসনের দুর্বলতা** — মামলার দীর্ঘসূত্রতা,
প্রভাবশালীদের ছাড় এবং
সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার কষ্ট।
5. **প্রশাসনিক জটিলতা** — লালফিতা, ঘুষ ছাড়া সেবা না মেলা, দলীয়করণ।
6. **স্বচ্ছতার অভাব** — ক্রয়, নিয়োগ ও প্রকল্পে তথ্য গোপন থাকা।
7. **কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা** — স্থানীয় সরকারের অর্থ,
জনবল ও সিদ্ধান্তের
স্বাধীনতা কম।
8. **নাগরিক অংশগ্রহণের সীমা** — দারিদ্র্য, অসচেতনতা এবং প্রতিষ্ঠানে কণ্ঠস্বরের দুর্বলতা।
9. **গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের বাধা** — সমালোচনা ও
নজরদারির জায়গা সংকুচিত হলে জবাবদিহি কমে।
10. **বৈষম্য** — আয়, শিক্ষা ও সেবার ব্যবধান দুর্বল জনগোষ্ঠীকে
সুশাসনের বাইরে রাখে।
## সম্ভাবনা
1. **সাংবিধানিক ভিত্তি** — প্রজাতন্ত্র, গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার এবং আইনের শাসন সংবিধানে আছে;
এগুলো কাজে লাগালে
সুশাসনের পথ খোলে।
2. **আইনি কাঠামো** — তথ্য অধিকার আইন ২০০৯, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের
বিধান থাকলেও প্রয়োগই আসল সম্ভাবনা।
3. **ডিজিটাল শাসন** — ই-সেবা, অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল পেমেন্ট ও তথ্য প্রকাশ ঘুষ ও সময়
কমায় এবং স্বচ্ছতা বাড়ায়।
4. **অর্থনৈতিক অগ্রগতি** — প্রবৃদ্ধি ও মধ্যবিত্তের
বিস্তার ভালো প্রতিষ্ঠান ও সেবার চাহিদা তৈরি করে।
5. **তরুণ জনগোষ্ঠী ও শিক্ষা** — সচেতন নাগরিক
সুশাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
6. **স্থানীয় সরকার** — ইউনিয়ন, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন শক্তিশালী হলে সেবা
কাছাকাছি আসে।
7. **সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম** — নজরদারি, গবেষণা ও জনমত সুশাসনের চাপ তৈরি করে।
8. **আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার** — এসডিজি-১৬ (শান্তি,
ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী
প্রতিষ্ঠান) সংস্কারের বাইরের মানদণ্ড দেয়।
**সারাংশ:** সুশাসন মানে জনকল্যাণে স্বচ্ছ,
জবাবদিহিমূলক ও আইননির্ভর
শাসন। এর বৈশিষ্ট্য অংশগ্রহণ থেকে কৌশলগত দৃষ্টি পর্যন্ত; নির্দেশক হলো নির্বাচন, বিচার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও সেবার মতো মাপযোগ্য চিহ্ন। বাংলাদেশে দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান বড় বাধা;
আইন, ডিজিটাল সেবা, শিক্ষিত নাগরিক ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালী
করলে সম্ভাবনা বাস্তব হয়।
সুশাসনের
অর্থ, বৈশিষ্ট্য, নির্দেশক,
বাংলাদেশে সুশাসনের সমস্যা ও সম্ভাবনা
১. সুশাসনের
অর্থ
সুশাসন (Good
Governance) বলতে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা,
আইনের শাসন, জনগণের অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার
ও দক্ষতার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় এবং জনগণের
কল্যাণ নিশ্চিত করা হয়।
সহজভাবে বলা
যায়, জনগণের স্বার্থে আইন ও নীতির ভিত্তিতে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক,
অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়াই সুশাসন।
২. সুশাসনের
বৈশিষ্ট্য
সুশাসনের
প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
১. আইনের শাসন — রাষ্ট্রের
সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আইনের অধীন থাকবে।
২. স্বচ্ছতা — সরকারি
সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের জানার সুযোগ থাকবে।
৩. জবাবদিহিতা — সরকারি
কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে।
৪. জনঅংশগ্রহণ — রাষ্ট্র
পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে।
৫. দক্ষতা ও কার্যকারিতা — সীমিত
সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে দ্রুত ও মানসম্মত সেবা প্রদান।
৬. ন্যায় ও সমতা — সকল
নাগরিকের প্রতি বৈষম্যহীন আচরণ নিশ্চিত করা।
৭. দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন — দুর্নীতি ও
ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা।
৮. দায়িত্বশীলতা — সরকার ও
প্রশাসন জনগণের প্রয়োজন ও প্রত্যাশার প্রতি সংবেদনশীল থাকবে।
৯. ঐকমত্য সৃষ্টি — বিভিন্ন
শ্রেণি ও গোষ্ঠীর স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করা।
১০. মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা — নাগরিকের
মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করা।
৩. সুশাসনের
নির্দেশক
সুশাসন
পরিমাপ বা মূল্যায়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক (Indicators)
ব্যবহার করা হয়। যেমন—
|
নির্দেশক |
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা |
|
জনঅংশগ্রহণ |
জনগণের
সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ |
|
আইনের
শাসন |
আইন সবার
জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া |
|
স্বচ্ছতা |
তথ্য ও
সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ততা |
|
জবাবদিহিতা |
ক্ষমতাসীন
ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাজের জন্য জবাবদিহি |
|
দুর্নীতি
নিয়ন্ত্রণ |
ঘুষ,
অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ |
|
সরকারের
কার্যকারিতা |
দক্ষতার
সঙ্গে সরকারি সেবা ও নীতি বাস্তবায়ন |
|
নিয়ন্ত্রক
মান |
অর্থনৈতিক
ও সামাজিক কার্যক্রমে কার্যকর নীতি ও নিয়ন্ত্রণ |
|
ন্যায়বিচার
ও সমতা |
সকল
নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার |
|
মানবাধিকার |
নাগরিকের
মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার সুরক্ষা |
|
সেবা
প্রদানের মান |
জনগণকে
সময়মতো ও মানসম্মত সরকারি সেবা প্রদান |
৪.
বাংলাদেশে সুশাসনের সমস্যা
বাংলাদেশে
সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা রয়েছে। প্রধান সমস্যাগুলো হলো—
ক. দুর্নীতি
দুর্নীতি
প্রশাসনের দক্ষতা কমায়, সরকারি সম্পদের অপচয় ঘটায় এবং জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন
করে।
খ. আইনের
শাসনের দুর্বলতা
আইনের সমান
প্রয়োগ ও দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়।
গ. রাজনৈতিক
ও প্রশাসনিক প্রভাব
প্রশাসনের
ওপর অতিরিক্ত রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের প্রভাব নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা
সৃষ্টি করতে পারে।
ঘ.
জবাবদিহিতার ঘাটতি
কিছু সরকারি
প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঙ.
স্বচ্ছতার অভাব
সরকারি
সিদ্ধান্ত, প্রকল্প ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত
তথ্যপ্রকাশের ঘাটতি সুশাসনের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
চ.
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
অতিরিক্ত
নিয়ম-কানুন, দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নাগরিকসেবা পেতে
সময় ও অর্থ বেশি ব্যয় হতে পারে।
ছ. দুর্বল
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা
কিছু
প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত জনবল, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও সম্পদের অভাব কার্যকর সেবা
প্রদানে সমস্যা সৃষ্টি করে।
জ. নাগরিক
অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা
রাষ্ট্র
পরিচালনা ও নীতি নির্ধারণে সাধারণ নাগরিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ সব ক্ষেত্রে
সমানভাবে নিশ্চিত হয় না।
ঝ. তথ্যের
সীমিত ব্যবহার ও ডিজিটাল বৈষম্য
ডিজিটাল
সেবা সম্প্রসারিত হলেও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার ও ডিজিটাল দক্ষতার বৈষম্য কিছু
জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে দিতে পারে।
৫.
বাংলাদেশে সুশাসনের সম্ভাবনা
সমস্যা
থাকলেও বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
১. তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি — ই-গভর্ন্যান্স
ও ডিজিটাল সেবা সরকারি কার্যক্রমকে আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে পারে।
২. তথ্য অধিকার — সরকারি তথ্য
পাওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা শক্তিশালী করতে পারে।
৩. দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ
— দুর্নীতি প্রতিরোধ ও শাস্তির কার্যকর ব্যবস্থা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক।
৪. বিচার বিভাগের কার্যকারিতা বৃদ্ধি
— দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা গেলে আইনের শাসন শক্তিশালী হবে।
৫. নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি — অধিকার ও
দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নাগরিক সুশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৬. গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা
— অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে স্বাধীন গণমাধ্যম ও নাগরিক
সমাজ গুরুত্বপূর্ণ।
৭. স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ — জনগণের
কাছাকাছি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেবা প্রদান আরও কার্যকর করা সম্ভব।
৮. প্রশাসনিক সংস্কার — দক্ষতা,
নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রশাসনকে আরও কার্যকর করা যায়।
৯. যুবসমাজের অংশগ্রহণ — শিক্ষিত ও
প্রযুক্তিনির্ভর তরুণদের অংশগ্রহণ সুশাসনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
১০. সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন — শিক্ষা,
প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নাগরিকদের সুশাসনের দাবি ও
অংশগ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে পারে।
উপসংহার
সুশাসন একটি
দেশের গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও
অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বাংলাদেশে
দুর্নীতি, জবাবদিহিতার ঘাটতি, প্রশাসনিক
জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, নাগরিক
সচেতনতা, প্রশাসনিক সংস্কার, আইনের শাসন,
শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা
গেলে বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হবে।
সুশাসন (Good
Governance) বলতে এমন এক শাসন ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে রাষ্ট্রের
সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা,
আইনের শাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংক
সর্বপ্রথম তাদের এক প্রতিবেদনে টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে 'সুশাসন'
প্রত্যয়টি ব্যবহার করে।
সুশাসনের
বৈশিষ্ট্য ও নির্দেশক
জাতিসংঘ
উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) সুশাসনের ৮টি মূল নির্দেশক বা বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছে,
যা একটি কার্যকর রাষ্ট্র ব্যবস্থার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়:
১. অংশগ্রহণ (Participation): রাষ্ট্রীয়
সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ
থাকার সুযোগ।
২. আইনের শাসন (Rule of Law): একটি
নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সবার জন্য সমান ও বৈষম্যহীন আইন
প্রয়োগ করা।
৩. স্বচ্ছতা (Transparency): সরকারের
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং নিয়মকানুন জনগণের কাছে উন্মুক্ত রাখা, যাতে তথ্যের
অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হয়।
৪. প্রতিক্রিয়াশীলতা (Responsiveness): রাষ্ট্রীয়
প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসন কর্তৃক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দ্রুততার সাথে জনগণকে সেবা
প্রদান করা।
৫. ঐকমত্য (Consensus Oriented): সমাজের
বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মতাদর্শের মানুষের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে বৃহত্তর জাতীয়
স্বার্থে ঐকমত্যে পৌঁছানো।
৬. সমতা ও অন্তর্ভুক্তি (Equity and Inclusiveness):
সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীসহ সবাইকে রাষ্ট্রীয়
সুযোগ-সুবিধার অন্তর্ভুক্ত করা।
৭. কার্যকারিতা ও দক্ষতা (Effectiveness and
Efficiency): রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ও সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে
জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন।
৮. জবাবদিহিতা (Accountability): সরকার,
বেসরকারি খাত এবং সুশীল সমাজ—সবাইকে নিজ নিজ কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের বা
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দায়বদ্ধ থাকা।
বাংলাদেশে
সুশাসনের সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা
বাংলাদেশের
মতো উন্নয়নশীল দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বেশ কিছু কাঠামোগত ও রাজনৈতিক
প্রতিবন্ধকতা রয়েছে:
- দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি: সরকারি ও বেসরকারি খাতে ব্যাপক দুর্নীতি, ঘুষ এবং স্বজনপ্রীতি সুশাসনের পথে সবচেয়ে বড়
অন্তরায়। এটি সেবাপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন রোধ করে।
- জবাবদিহিতার অভাব: প্রশাসন ও রাজনৈতিক কাঠামোতে কার্যকর জবাবদিহিতার
সংস্কৃতি অত্যন্ত দুর্বল। ভুল বা অনিয়মের জন্য শাস্তি পাওয়ার দৃষ্টান্ত কম
থাকায় অনিয়ম উৎসাহিত হয়।
- আইনের শাসনের ঘাটতি: অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব বা ক্ষমতার অপব্যবহারের
কারণে বিচার প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়, যা
সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে।
- রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব,
বয়কট এবং সাংঘর্ষিক রাজনীতি গণতান্ত্রিক
প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেয়।
- আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা (Red Tape):
প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষকে সরকারি
সেবা পেতে মাত্রাতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয় এবং হয়রানির শিকার হতে
হয়।
- স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা: দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার
কমিশন, নির্বাচন কমিশন বা মহা হিসাব-নিরীক্ষকের মতো
প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ
করতে পারে না।
বাংলাদেশে
সুশাসনের সম্ভাবনা
সীমাবদ্ধতা
থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনা ও
সুযোগ তৈরি হয়েছে:
- ই-গভর্ন্যান্স ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার: সরকারি সেবাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ (যেমন-
ই-পাসপোর্ট, অনলাইন ট্যাক্স রিটার্ন, ই-টেন্ডারিং,
মোবাইল ব্যাংকিং) মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য
কমিয়েছে, দুর্নীতি হ্রাস করেছে এবং প্রশাসনে ব্যাপক স্বচ্ছতা
এনেছে।
- সচেতন তরুণ প্রজন্ম ও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড: দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ সমাজ তাদের অধিকার
সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তারা যেকোনো
অন্যায়, দুর্নীতি বা বৈষম্যের বিরুদ্ধে দ্রুত জনমত তৈরি
করছে।
- সক্রিয় স্বাধীন গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ: সংবাদপত্র, টেলিভিশন
এবং ডিজিটাল মিডিয়া সরকারের ভুলত্রুটি ও দুর্নীতির চিত্র প্রতিনিয়ত তুলে
ধরছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও ও অধিকারকর্মীরা জবাবদিহিতা নিশ্চিতে সরকারের
ওপর যৌক্তিক চাপ তৈরি করছে।
- আন্তর্জাতিক নজরদারি ও অংশীদারিত্ব: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীরা
(যেমন- বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘ) আর্থিক ও
কারিগরি সহায়তার শর্ত হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সুশাসনের ওপর জোর
দিচ্ছে, যা ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
- প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি: সাধারণ মানুষের মধ্যে সেবার মান নিয়ে সচেতনতা
বৃদ্ধি পাওয়ায় পুলিশ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কারের প্রবল
জনদাবি তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ সুশাসনের পথ প্রশস্ত করছে।
সুশাসন (Good
Governance) বলতে এমন এক শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়, যা হয়
দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ এবং
জনকল্যাণমুখী। বিশ্বব্যাংক
ও জাতিসংঘের মতে, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক,
অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করা হয়। [1,
2]
সুশাসনের
বৈশিষ্ট্যসমূহ
জাতিসংঘ ও
বিশ্বব্যাংকের ধারণামতে সুশাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- অংশগ্রহণ: নীতিনির্ধারণ ও রাষ্ট্রীয় কাজে নারী-পুরুষ
নির্বিশেষে সকল নাগরিকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ।
- আইনের শাসন: আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং আইনের নিরপেক্ষ ও
কঠোর প্রয়োগ।
- স্বচ্ছতা: রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত
গ্রহণ ও অর্থ ব্যয়ের তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে উন্মুক্ত থাকা।
- জবাবদিহিতা: সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কাজের জন্য
জনগণের কাছে বা সংসদের কাছে দায়ী থাকা।
- সংবেদনশীলতা (Responsiveness): নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জনগণের সমস্যা শোনা এবং তার
দ্রুত সমাধান করা।
- সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক: সমাজের প্রতিটি মানুষের, বিশেষ
করে পিছিয়ে পড়া মানুষের সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা।
- দক্ষতা ও কার্যকারিতা:
কম সময়ে এবং কম ব্যয়ে সর্বোচ্চ জনসেবা নিশ্চিত করা।
[3, 4]
সুশাসনের
নির্দেশক (Indicators of Good Governance)
কোনো
রাষ্ট্রে সুশাসন আছে কি না তা বোঝার প্রধান নির্দেশকগুলো হলো:
- আইনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা।
- দুর্নীতি দমন কমিশনের (ACC) কার্যকারিতা।
- সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ।
- অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ
নির্বাচন ব্যবস্থা।
- সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের সক্রিয় ভূমিকা।
- সরকারি সেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তির (যেমন:
ই-গভর্ন্যান্স) ব্যবহার। [2]
বাংলাদেশে
সুশাসনের সমস্যাসমূহ
বাংলাদেশে
সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো হলো:
- ব্যাপক দুর্নীতি: সরকারি বিভিন্ন খাতের (যেমন- আইন প্রয়োগকারী
সংস্থা, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ
ইত্যাদি) দুর্নীতি দীর্ঘদিনের সমস্যা।
- রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও হস্তক্ষেপ: প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ এবং নীতিনির্ধারণে দলীয়
প্রভাব।
- জবাবদিহিতার অভাব: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যথাযথ জবাবদিহিতা ও
স্বচ্ছতার ঘাটতি।
- দুর্বল আইনি ও বিচারিক কাঠামো: বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনের প্রয়োগে
দীর্ঘদিনের জটিলতা।
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা:
সেবাপ্রাপ্তিতে অতিরিক্ত লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও
অদক্ষতা।
- সিভিল সমাজের দুর্বল ভূমিকা: নিরপেক্ষ সুশীল সমাজের সরব উপস্থিতির অভাব।
[5, 6, 7, 8]
বাংলাদেশে
সুশাসনের সম্ভাবনা
বাংলাদেশকে
সুশাসনের পথে এগিয়ে নিতে বেশ কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে:
- ডিজিটাল বাংলাদেশ / স্মার্ট বাংলাদেশ রূপকল্প: সরকারি প্রায় সব সেবা অনলাইনে (ই-নথি, ই-মিউটেশন, জাতীয়
পরিচয়পত্র ইত্যাদি) নিয়ে আসার ফলে হয়রানি ও দুর্নীতি কিছুটা কমানো সম্ভব
হচ্ছে।
- তরুণ সমাজের জাগরণ: দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি
পাচ্ছে।
- সচেতন নাগরিক সমাজ: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)সহ বিভিন্ন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের জোরালো ভূমিকা।
[5]
- প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুযোগ: রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী ও সাংবিধানিক
প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সুশাসন জোরালো করার বড় ক্ষেত্র
তৈরি হয়েছে।
সুশাসন
সম্পর্কে আপনি কি নির্দিষ্ট
কোনো নির্দেশক (যেমন: আইনের শাসন বা দুর্নীতি দমন) নিয়ে আরও
বিস্তারিত জানতে চান?
[2] https://www.researchgate.net
[6] https://journal.ump.edu.my
জবাবদিহীতা বলতে কী বুঝেন? এর ধরণ, নিশ্চিত করনের উপায়। সরকার ও আমলাদের জবাবদিহীতার উপায় সমূহ
জবাবদিহিতা (Accountability)সুশাসনের প্রাণ হলো জবাবদিহিতা। জবাবদিহিতা না
থাকলে ক্ষমতা দানবে পরিণত হয়।১. জবাবদিহিতা বলতে কী বোঝেন?সহজ সংজ্ঞা: কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার
কাজের জন্য কারো কাছে জবাব দিতে বাধ্য থাকা এবং ভালো কাজের জন্য পুরস্কার ও খারাপ
কাজের জন্য শাস্তি পাওয়ার ব্যবস্থাই হলো জবাবদিহিতা।ইংরেজি শব্দ Accountability
এসেছে Account থেকে। যেমন দোকানের হিসাব দিতে হয়, তেমনি ক্ষমতার হিসাব দিতে হয়।অধ্যাপক এ.এম.এম
শওকত আলীর মতে: "জবাবদিহিতা হলো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কর্তৃক তার
কার্যকলাপের ব্যাখ্যা প্রদানের বাধ্যবাধকতা।"উদাহরণ: একজন ইউএনও যদি চাল চুরি
করে, তাকে কেন চুরি করলো,
তার জবাব জনগণ ও সরকারকে
দিতে হবে। এটাই জবাবদিহিতা।২. জবাবদিহিতার ধরণ - ৪ প্রকারপরীক্ষায় এই ৪ প্রকার
অবশ্যই লিখবে:ক) রাজনৈতিক জবাবদিহিতা (Political Accountability):
জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা। কিভাবে?
ভোটের মাধ্যমে। ৫ বছর পর
জনগণ ভোট দিয়ে সরকারকে জবাব চায়।খ) প্রশাসনিক বা আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতা (Administrative
Accountability):
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে অধস্তনের
জবাবদিহিতা।কিভাবে? একজন এসিল্যান্ড
তার কাজের জন্য ডিসির কাছে জবাবদিহি করেন।গ) আর্থিক জবাবদিহিতা (Financial
Accountability):
সরকারি টাকা কোথায় খরচ হলো তার হিসাব।কিভাবে?
অডিট, মহা হিসাব নিরীক্ষক (CAG) এর মাধ্যমে।ঘ) আইনগত জবাবদিহিতা (Legal
Accountability):
আইন ভঙ্গ করলে আদালতের কাছে জবাবদিহিতা।কিভাবে?
হাইকোর্টে রিট, দুর্নীতির মামলা।আরেকভাবে ভাগ করা
হয়:অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা: নিজ বিভাগের ভেতরে।বাহ্যিক জবাবদিহিতা: জনগণ, মিডিয়া, সংসদের কাছে।৩. জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের উপায়
- ৮টি হাতিয়ার১. সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ:
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব, সংসদীয় স্থায়ী
কমিটি। মন্ত্রীকে সংসদে জবাব দিতে হয়।
২.
বিচার বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ: হাইকোর্টে রিট করা যায়। অবৈধ কাজ করলে আদালত
বাতিল করে দেয়।
৩.
অডিট ব্যবস্থা: CAG অফিস প্রতিটি
সরকারি খরচ অডিট করে।
৪.
গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া: সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এখন ফেসবুকে
ভাইরাল হলেই কর্মকর্তা বদলি হয়।
৫.
নাগরিক সমাজ ও এনজিও: TIB, সুজন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সরকারের সমালোচনা করে।
৬.
ন্যায়পাল (Ombudsman): সরকারি
কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনার জন্য স্বাধীন ব্যক্তি। বাংলাদেশে আইন আছে কিন্তু
এখনো নিয়োগ হয়নি।
৭.
তথ্য অধিকার আইন ২০০৯: যেকোনো নাগরিক সরকারি তথ্য চাইতে পারে। এতে স্বচ্ছতা
বাড়ে।
৮.
ই-গভর্নেন্স: ৩৩৩, জাতীয় তথ্য
বাতায়ন, অনলাইনে সেবা -
এতে ঘুষ ও হয়রানি কমে, জবাবদিহিতা
বাড়ে।৪. সরকার ও আমলাদের জবাবদিহিতার উপায়সমূহএই অংশটা পরীক্ষায় আলাদা করে
আসে।ক) সরকারের জবাবদিহিতা - রাজনৈতিক সরকারের:১.
সংসদের কাছে: প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। অনাস্থা
প্রস্তাবে সরকার পড়ে যেতে পারে।
২.
জনগণের কাছে: নির্বাচন। ভোট হলো সবচেয়ে বড় জবাবদিহিতা। জনগণ ভোট না দিলে
সরকার ক্ষমতা হারায়।
৩.
বিরোধী দলের কাছে: বিরোধী দল সংসদে ও রাজপথে সরকারের সমালোচনা করে।
৪.
সংবিধানের কাছে: সরকার সংবিধানের বাইরে যেতে পারে না। গেলে আদালত বাতিল
করে।
৫.
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে: জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থার কাছেও সরকারকে জবাব দিতে
হয়।খ) আমলাদের জবাবদিহিতা - প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের:আমলাদের জবাবদিহিতা সবচেয়ে
দুর্বল, তাই দুর্নীতি
বেশি।১. ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে: এসি
ল্যান্ড -> ইউএনও ->
ডিসি -> বিভাগীয় কমিশনার -> সচিব। এই চেইন।
২.
মন্ত্রণালয়ের কাছে: সচিব মন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করেন।
৩.
বিভাগীয় মামলা: দুর্নীতি করলে চাকরি থেকে বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা হয়।
৪.
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক): ঘুষ খেলে দুদক মামলা করে।
৫.
বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (ACR): খারাপ কাজ করলে ACR খারাপ হয়,
প্রমোশন আটকে যায়।
৬.
জনগণের কাছে সরাসরি: গণশুনানি, উন্মুক্ত বাজেট সভা। এখন ইউএনওরা ফেসবুক লাইভে এসে জবাব দেন।মূল সমস্যা:
বাংলাদেশে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি কম করে, আর আমলারা সরকারের কাছে জবাবদিহি বেশি করে,
জনগণের কাছে কম। এই উল্টো
পিরামিডই সুশাসনের বড় বাধা।পরীক্ষায় লেখার টিপস: শেষে একটি লাইন যোগ করবে -
"জবাবদিহিতা হলো গণতন্ত্রের অক্সিজেন। অক্সিজেন ছাড়া মানুষ যেমন বাঁচে না,
জবাবদিহিতা ছাড়া
গণতন্ত্র ও উন্নয়ন টেকে না।"
জবাবদিহিতা
(Accountability) হলো এমন একটি নীতি ও প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো
ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকার তাদের সিদ্ধান্ত, কাজ ও
কর্মকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা জনগণের কাছে জবাব দিতে বাধ্য থাকে এবং
প্রয়োজনে পরিণাম বা শাস্তি গ্রহণ করে। এটি
সুশাসনের অন্যতম মূল স্তম্ভ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও
দায়িত্বজ্ঞানহীনতা রোধে অপরিহার্য।[dspace.bracu.ac][academia][2024.sci-hub][edunewsbd24]
জবাবদিহিতার
সংজ্ঞা
বিভিন্ন
গবেষক ও প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিতাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন:
- সাধারণ সংজ্ঞা: “জবাবদিহিতা
মানে হলো অন্য কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের সিদ্ধান্ত বা কাজের ব্যাখ্যা দেওয়া
এবং সেখান থেকে উদ্ভূত যেকোনো পরিণাম গ্রহণ করা।”[dspace.bracu.ac]
- বিশ্বব্যাংক: জবাবদিহিতা হলো সরকারের দায়িত্ব ও উত্তরদায়িত্ব,
যেখানে সরকার জনগণের কাছে তাদের কাজের জন্য
জবাবদিহি।[cpd.org]
- প্রশাসনিক সংজ্ঞা: প্রশাসনিক জবাবদিহিতা হলো সরকারি কর্মকর্তা ও
আমলাদের নিজ নিজ দায়িত্ব, কার্যকলাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং গৃহীত
সিদ্ধান্তের জন্য আইনগত ও নৈতিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, বিচার বিভাগ বা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকার
প্রক্রিয়া।[edunewsbd24]
সহজ ভাষায়,
জবাবদিহিতা = দায়িত্ব + উত্তরদায়িত্ব + পরিণাম গ্রহণ।
জবাবদিহিতার
প্রকারভেদ
জবাবদিহিতাকে
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়:
১. দিক
অনুযায়ী (Direction-based)
|
প্রকার |
ব্যাখ্যা |
উদাহরণ |
|
ঊর্ধ্বমুখী
(Upward) |
নিম্নপদস্থ
কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি। [academia] |
উপজেলা
নির্বাহী অফিসার জেলা প্রশাসকের কাছে রিপোর্ট করেন। |
|
নিম্নমুখী
(Downward) |
ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষ নিম্নপদস্থ বা সেবাগ্রহীতার কাছে জবাবদিহি। [academia] |
মন্ত্রণালয়
স্থানীয় সরকারের কাছে তহবিল ব্যবহারের হিসাব দেন। |
|
উল্লম্ব (Vertical) |
নাগরিক,
গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ নির্বাচন ও চাপের মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহি করে।
[cpd.org][academia] |
নির্বাচনে
ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন; গণমাধ্যমের তদন্ত প্রতিবেদন। |
|
অনুভূমিক
(Horizontal) |
সরকারি
প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের ওপর নজরদারি ও ভারসাম্য বজায় রাখে। [cpd.org][academia] |
সংসদীয়
কমিটি, নিরীক্ষা বিভাগ, দুর্নীতি
দমন কমিশন, ওম্বুডসম্যান। |
২. প্রকৃতি
অনুযায়ী (Nature-based)
Bruce, Dwivedi ও Jabbra
(১৯৮৮) জবাবদিহিতার ৮টি প্রকার চিহ্নিত করেছেন:[dspace.bracu.ac]
- নৈতিক জবাবদিহিতা (Moral): ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে
দায়বদ্ধতা।
- প্রশাসনিক জবাবদিহিতা (Administrative):
আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ও নিয়মকানুন মেনে কাজ করার
দায়িত্ব।[2024.sci-hub][edunewsbd24]
- রাজনৈতিক জবাবদিহিতা (Political): নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ ও জনগণের কাছে
জবাবদিহি।[2024.sci-hub][scribd]
- ব্যবস্থাপনাগত জবাবদিহিতা (Managerial):
সম্পদ ও কর্মী ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও ফলাফলের
দায়িত্ব।
- বাজারভিত্তিক জবাবদিহিতা (Market): প্রতিযোগিতা ও গ্রাহকের পছন্দের মাধ্যমে সেবার মান
নিয়ন্ত্রণ।
- আইনি/বিচারিক জবাবদিহিতা (Legal/Judicial):
আদালত ও আইনের মাধ্যমে দায়িত্ব আদায়।[scribd][journals.bpatc.gov]
- নির্বাচনী/উপাদানগত জবাবদিহিতা (Constituency
Relation): নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধতা।
- পেশাগত জবাবদিহিতা (Professional): পেশাগত মান ও নীতিমালা মেনে চলা।
৩.
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনুযায়ী
- প্রাতিষ্ঠানিক/আনুষ্ঠানিক জবাবদিহিতা: সংবিধান, আইন,
বিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে নিশ্চিত করা
হয়।[epress.lib.uts.edu][sahajpora]
- অভ্যন্তরীণ: অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (ACR), পদোন্নতি-পদাবনতি।[dspace.bracu.ac][pssr.org]
- বাহ্যিক: সংসদ, আদালত, নিরীক্ষা বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন।[scribd][journals.bpatc.gov]
- সামাজিক/অপ্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা: নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম,
সামাজিক আন্দোলন ও অনানুষ্ঠানিক চাপের মাধ্যমে
আদায় করা হয়।[epress.lib.uts.edu][onlinelibrary.wiley][khaborerkagoj]
জবাবদিহিতা
নিশ্চিত করার উপায়
জবাবদিহিতা
নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন:
সাধারণ
উপায়
- স্বচ্ছতা ও তথ্যের অধিকার: সরকারি তথ্য সহজলভ্য করা; তথ্য
অধিকার আইন কার্যকর করা।[scribd][khaborerkagoj]
- নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন:
অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ নিরীক্ষা, বার্ষিক কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন।[scribd][journals.bpatc.gov]
- আইনি ব্যবস্থা: দুর্নীতি দমন আইন, প্রশাসনিক
ট্রাইব্যুনাল, আদালতের মাধ্যমে জবাবদিহি আদায়।[scribd][journals.bpatc.gov]
- নাগরিক অংশগ্রহণ: গণশুনানি, বাজেট
অধিবেশন, ওয়ার্ড সভা, নাগরিক
চার্টার।[academia][khaborerkagoj]
- গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ: তদন্তমূলক সাংবাদিকতা, এনজিওর
তদারকি।[epress.lib.uts.edu][khaborerkagoj]
- ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা, ই-গভর্ন্যান্স,
ড্যাশবোর্ড।[scribd]
সরকারের
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উপায়
সরকার
(নির্বাচিত প্রতিনিধি ও মন্ত্রীরা) মূলত নিম্নলিখিত উপায়ে জবাবদিহি থাকে:
|
উপায় |
বিবরণ |
|
নির্বাচন |
নিয়মিত
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সরকারকে জবাবদিহি করে; খারাপ
কর্মকাণ্ডে ভোট দিয়ে পরিবর্তন আনে। [dspace.bracu.ac][academia] |
|
সংসদীয়
ব্যবস্থা |
সংসদে
প্রশ্নোত্তর, বিতর্ক, বাজেট অনুমোদন, কমিটির
তদন্তের মাধ্যমে সরকার জবাবদিহি। [cpd.org][scribd][khaborerkagoj] |
|
মন্ত্রিসভা
ও কমিটি |
মন্ত্রিসভা
ও সংসদীয় কমিটি (যেমন: পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি) সরকারি কাজের তদারকি করে।
[cpd.org][journals.bpatc.gov] |
|
বিচার
বিভাগ |
আদালত
সরকারি সিদ্ধান্তের বৈধতা যাচাই করে; রিট, পিটিশনের
মাধ্যমে নাগরিকরা সরকারকে জবাবদিহি করতে পারে। [scribd][journals.bpatc.gov] |
|
নিরীক্ষা
বিভাগ |
কম্পট্রোলার
ও অডিটর জেনারেল (CAG) সরকারি হিসাব নিরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেয়।
[academia][scribd] |
|
দুর্নীতি
দমন কমিশন |
দুর্নীতি
দমন কমিশন (ACC) সরকারি কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের দুর্নীতির তদন্ত করে।
[academia] |
|
ওম্বুডসম্যান
(প্রস্তাবিত) |
জনঅভিযোগ
নিষ্পত্তি ও প্রশাসনিক অন্যায়ের তদন্তের জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। [academia] |
|
গণমাধ্যম
ও সুশীল সমাজ |
সংবাদপত্র,
টিভি, এনজিও সরকারি কাজের সমালোচনা ও তদন্ত করে। [epress.lib.uts.edu][khaborerkagoj] |
|
তথ্য
অধিকার আইন |
নাগরিকরা
সরকারি তথ্য চেয়ে জবাবদিহি আদায় করতে পারে। [scribd] |
আমলাদের
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উপায়
আমলাতন্ত্র
(সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী) মূলত নিম্নলিখিত উপায়ে জবাবদিহি থাকে:
|
উপায় |
বিবরণ |
|
পদক্রমিক
কাঠামো (Hierarchy) |
প্রতিটি
আমলা তার ঊর্ধ্বতনের কাছে জবাবদিহি; সচিব → মন্ত্রী → সংসদ।
[documents1.worldbank][dspace.bracu.ac][2024.sci-hub] |
|
বার্ষিক
গোপনীয় প্রতিবেদন (ACR) |
প্রতি বছর
কর্মকর্তার কর্মমূল্যায়ন করা হয়; পদোন্নতি, পদাবনতি ও
পুরস্কার-শাস্তি ACR-এর ওপর নির্ভর করে। [dspace.bracu.ac][pssr.org] |
|
বিভাগীয়
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা |
অসদাচরণ,
দুর্নীতি বা অদক্ষতার জন্য বিভাগীয় শাস্তি (বরখাস্ত, পদাবনতি,
জরিমানা)। [2024.sci-hub][iiste] |
|
প্রশাসনিক
ট্রাইব্যুনাল |
সরকারি
কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত ও নিষ্পত্তি। [iiste] |
|
আইনি
জবাবদিহিতা |
আমলাদের
বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা যায়; দুর্নীতি দমন আইনে শাস্তির বিধান। [scribd][journals.bpatc.gov] |
|
নিরীক্ষা
ও তদন্ত |
অভ্যন্তরীণ
নিরীক্ষা, এলজিইডি, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত। [scribd][journals.bpatc.gov] |
|
নাগরিক
চার্টার ও সেবা মান |
প্রতিটি
দপ্তরের নাগরিক চার্টারে সেবার সময়সীমা ও মান উল্লেখ; তা না হলে
অভিযোগের ব্যবস্থা। [scribd] |
|
অভিযোগ
ব্যবস্থা |
হটলাইন,
অনলাইন পোর্টাল (যেমন: ৩৩৩, অভিযোগ.গভ.বিডি), উপজেলা/ইউনিয়ন
পর্যায়ে গণশুনানি। [khaborerkagoj] |
|
ডিজিটাল
রেকর্ড ও ট্র্যাকিং |
ই-ফাইল,
ই-নথি, টেন্ডার পোর্টালের মাধ্যমে কাজের ট্র্যাকিং ও
স্বচ্ছতা। [scribd] |
|
পেশাগত
নীতিমালা |
সিভিল
সার্ভিস কোড অফ কন্ডাক্ট, নৈতিকতা কমিটি। [2024.sci-hub] |
বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে
জবাবদিহিতা ব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
- ঊর্ধ্বমুখী জবাবদিহিতা প্রবল: আমলাগণ মূলত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি;
সাধারণ নাগরিকের কাছে নয়।[academia][documents1.worldbank]
- অনানুষ্ঠানিক চাপ: নাগরিকরা অনেক সময় “রude accountability” বা অনানুষ্ঠানিক চাপ (যেমন: ঘুষ, সুপারিশ) ব্যবহার করে সেবা আদায় করে।[onlinelibrary.wiley]
- প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: দুর্নীতি দমন কমিশন, ওম্বুডসম্যান
(এখনও গঠিত নয়), সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা সীমিত।[academia][iiste]
- রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: আমলাদের পদোন্নতি-বদলিতে রাজনৈতিক প্রভাব
জবাবদিহিতা দুর্বল করে।[pssr.org][iiste]
তবে
সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল সরকার, তথ্য অধিকার আইন, অনলাইন
অভিযোগ ব্যবস্থা ও সুশীল সমাজের সক্রিয়তা জবাবদিহিতা ব্যবস্থায় কিছু উন্নতি
এনেছে।[scribd][khaborerkagoj]
উপসংহার
জবাবদিহিতা
কেবল আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি একটি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ। সরকার ও আমলাদের জবাবদিহি করতে হলে শক্তিশালী
প্রাতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা, নাগরিক সচেতনতা, গণমাধ্যমের
স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশে
সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জবাবদিহিতা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও
নাগরিকমুখী করে তোলা জরুরি।[2024.sci-hub][edunewsbd24][cpd.org][khaborerkagoj]
জবাবদিহিতা:
অর্থ, ধরন, নিশ্চিতকরণের উপায় এবং সরকার ও আমলাদের
জবাবদিহিতা
ভূমিকা
ক্ষমতা যার
হাতে থাকে, তার কাজের হিসাব দেওয়ার দায়ও থাকে। এই দায়বদ্ধতাই
জবাবদিহিতা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ ক্ষমতার উৎস, আর সরকার ও
প্রশাসন সেই ক্ষমতার আমানতদার মাত্র। আমানতদার যদি তার কাজের জন্য কারও কাছে
দায়বদ্ধ না থাকে, তবে ক্ষমতা সহজেই স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতিতে পরিণত
হয়। এ কারণেই জবাবদিহিতাকে সুশাসনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ বলা হয়।
জবাবদিহিতার
অর্থ
জবাবদিহিতা
(Accountability) বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান
বা কর্তৃপক্ষ তার গৃহীত সিদ্ধান্ত, কাজ ও ব্যয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে
ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য থাকা এবং ব্যর্থতা বা অনিয়মের ক্ষেত্রে দায় বহন করা। এর
তিনটি মূল উপাদান রয়েছে:
- তথ্য প্রদান: কী করা হলো, কেন
করা হলো তা জানানো।
- ব্যাখ্যা ও যৌক্তিকতা উপস্থাপন: সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেওয়া।
- দায় বহন ও শাস্তি বা সংশোধন: ভুল বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে তার পরিণতি মেনে নেওয়া।
সংক্ষেপে,
জবাবদিহিতা হলো ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তাঁদের কাজের জন্য প্রশ্নের
মুখোমুখি হওয়া এবং দায় স্বীকার করার ব্যবস্থা।
জবাবদিহিতার
ধরন
জবাবদিহিতাকে
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করা যায়।
ক.
কর্তৃপক্ষের দিক থেকে
১. রাজনৈতিক
জবাবদিহিতা: নির্বাচিত
প্রতিনিধি ও সরকার জনগণ ও সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের
কাজের মূল্যায়ন করে।
২.
প্রশাসনিক জবাবদিহিতা: সরকারি
কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উচ্চতন কর্তৃপক্ষ ও আইনের কাছে দায়বদ্ধ। এটি সাধারণত
শ্রেণিবিন্যাস ও বিধি-বিধানের মাধ্যমে কার্যকর হয়।
৩. আইনগত বা
বিচারিক জবাবদিহিতা: আইন লঙ্ঘন
বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে বিচার ও প্রতিকার।
৪. আর্থিক
জবাবদিহিতা: সরকারি
অর্থের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেওয়া এবং নিরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া।
৫. সামাজিক
জবাবদিহিতা: নাগরিক,
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ সংগঠনের মাধ্যমে সরকারের কাজের ওপর নজরদারি।
৬. পেশাগত ও
নৈতিক জবাবদিহিতা: চিকিৎসক,
আইনজীবী, প্রকৌশলীর মতো পেশাজীবীদের পেশাগত আচরণবিধি ও নৈতিক
মানদণ্ড মেনে চলার দায়।
খ. দিক বা
অবস্থানের বিচারে
১.
ঊর্ধ্বমুখী (Vertical) জবাবদিহিতা: জনগণ,
নির্বাচন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের জবাবদিহি
আদায়। এখানে জনগণ ক্ষমতাধরদের কাছে হিসাব চায়।
২.
সমান্তরাল (Horizontal) জবাবদিহিতা: রাষ্ট্রের
এক প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন আদালত,
সংসদ, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক নির্বাহী
বিভাগের তদারকি।
৩.
অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক জবাবদিহিতা: প্রতিষ্ঠানের
ভেতরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, উচ্চতন
কর্তৃপক্ষের তদারকি) এবং বাইরের নজরদারি (সংসদ, আদালত,
গণমাধ্যম)।
জবাবদিহিতা
নিশ্চিত করার উপায়
১. স্বাধীন
ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ: আদালত যখন
নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রমের বৈধতা যাচাই করতে পারে, তখন ক্ষমতার
অপব্যবহার কমে।
২. কার্যকর
সংসদ ও সংসদীয় কমিটি: প্রশ্নোত্তর
পর্ব, মুলতবি প্রস্তাব, অনাস্থা
প্রস্তাব ও স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে সরকারের কাজের তদারকি।
৩. তথ্য
অধিকার নিশ্চিতকরণ: নাগরিক যাতে
সরকারি তথ্য জানতে পারে, সেজন্য তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন। তথ্য
ছাড়া জবাবদিহি চাওয়া সম্ভব নয়।
৪. স্বাধীন
নিরীক্ষা ও দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান: মহাহিসাব
নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও
সম্পদসমৃদ্ধ করা।
৫.
ন্যায়পাল (Ombudsman) প্রতিষ্ঠা: প্রশাসনিক
অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য স্বাধীন
ন্যায়পাল ব্যবস্থা।
৬. স্বাধীন
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ: অনুসন্ধানী
সাংবাদিকতা, গবেষণা ও অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে অনিয়ম উন্মোচন।
৭. অবাধ ও
সুষ্ঠু নির্বাচন: নিয়মিত,
নিরপেক্ষ নির্বাচন জনগণকে ব্যর্থ সরকারকে পরিবর্তন করার সুযোগ দেয়।
৮. স্বচ্ছ
প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও ই-গভর্ন্যান্স: সেবা প্রদান
ও ক্রয়প্রক্রিয়া ডিজিটাল করলে মানবিক হস্তক্ষেপ ও অনিয়ম কমে।
৯. নাগরিক
সনদ ও গণশুনানি: সেবার মান ও
সময়সীমা জনসমক্ষে ঘোষণা এবং সেবাগ্রহীতার মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা।
১০. অভিযোগ
প্রতিকার ব্যবস্থা ও হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা: অনিয়ম
ফাঁসকারীদের নিরাপত্তা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর কাঠামো।
১১.
আচরণবিধি ও নৈতিকতা চর্চা: সরকারি
কর্মচারী আচরণ বিধিমালা এবং সম্পদের হিসাব প্রকাশের বাধ্যবাধকতা।
সরকারের
জবাবদিহিতার উপায়সমূহ
১. সংসদের
মাধ্যমে: সংসদীয় পদ্ধতিতে মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে
সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদে এই নীতি উল্লেখ আছে।
প্রশ্নোত্তর, আলোচনা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও অনাস্থা প্রস্তাবের
মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহি করতে হয়।
২.
নির্বাচনের মাধ্যমে: পাঁচ বছর
অন্তর জনগণ ভোটের মাধ্যমে সরকারের কাজের মূল্যায়ন করে। এটি জবাবদিহিতার সবচেয়ে
মৌলিক রূপ।
৩. বিচার
বিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে: সরকারের
কোনো আদেশ বা আইন সংবিধানের পরিপন্থী হলে আদালত তা বাতিল করতে পারে। রিট
এখতিয়ারের মাধ্যমে নাগরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইতে পারে।
৪. নিরীক্ষা
ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে: মহাহিসাব
নিরীক্ষক সরকারি ব্যয় নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেন। সংসদের হিসাব
সংক্রান্ত কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি সেই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে। বাজেট
অনুমোদনের মাধ্যমেও সংসদ অর্থ নিয়ন্ত্রণ করে।
৫. গণমাধ্যম
ও জনমতের মাধ্যমে: স্বাধীন
গণমাধ্যম সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে এবং জনমত গঠন করে।
৬. নাগরিক
সমাজ ও বিরোধী দলের মাধ্যমে: বিরোধী দল
সংসদে ও সংসদের বাইরে সরকারের সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করে। নাগরিক
সংগঠনগুলো নীতি পর্যবেক্ষণ করে।
৭. তথ্য
অধিকার ও স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে: সরকারি
সিদ্ধান্ত ও ব্যয়ের তথ্য প্রকাশে বাধ্য করা।
৮.
সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে: নির্বাচন
কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার
কমিশন ও ন্যায়পালের মতো প্রতিষ্ঠান।
৯.
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে: মানবাধিকার
চুক্তি, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন ও উন্নয়ন-সহযোগীদের শর্ত
সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখে।
আমলাদের
জবাবদিহিতার উপায়সমূহ
আমলাতন্ত্র
নীতি বাস্তবায়নের হাতিয়ার। যেহেতু আমলারা নির্বাচিত নন এবং স্থায়ী চাকরিতে
থাকেন, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১. রাজনৈতিক
নেতৃত্বের তদারকি: আমলারা
মন্ত্রীর নির্দেশনা ও নীতি অনুযায়ী কাজ করেন এবং মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদের
কাছে পরোক্ষভাবে দায়বদ্ধ থাকেন।
২.
শ্রেণিবিন্যাসগত (উর্ধ্বতন) নিয়ন্ত্রণ: অধস্তন
কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জবাবদিহি করেন। বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন ও
কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন এর অংশ।
৩. আইন ও
বিধিবিধান: সরকারি
কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালার অধীনে
অসদাচরণ, দুর্নীতি বা অদক্ষতার জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা ও শাস্তি।
৪. সংসদীয়
কমিটির তদারকি: সংসদীয়
স্থায়ী কমিটিগুলো মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কাজ পর্যালোচনা করে এবং কর্মকর্তাদের তলব
করতে পারে।
৫.
নিরীক্ষা: অভ্যন্তরীণ ও বহিঃনিরীক্ষার মাধ্যমে আর্থিক
অনিয়ম চিহ্নিত করা।
৬. দুর্নীতি
দমন কমিশন ও আদালত: দুর্নীতি বা
ক্ষমতার অপব্যবহার প্রমাণিত হলে ফৌজদারি মামলা, বিচার ও
শাস্তি। আদালত আমলাদের অবৈধ আদেশও বাতিল করতে পারে।
৭.
কর্মসম্পাদন চুক্তি ও লক্ষ্যভিত্তিক মূল্যায়ন: বার্ষিক
কর্মসম্পাদন চুক্তি ও কর্মকৃতি মূল্যায়ন ব্যবস্থায় দায়িত্ব ও ফলাফল নির্দিষ্ট
থাকে।
৮. নাগরিক
সনদ, গণশুনানি ও অভিযোগ ব্যবস্থা: সেবাগ্রহীতার কাছে সরাসরি দায়বদ্ধতা তৈরি করে। অভিযোগ
প্রতিকার ব্যবস্থা (GRS) এ ক্ষেত্রে সহায়ক।
৯. সম্পদের
বিবরণী দাখিল: আমলাদের
নিয়মিত সম্পদের হিসাব জমা দেওয়া ও তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা।
১০.
গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও তথ্য অধিকার:
আমলাদের কাজের তথ্য জনগণের কাছে উন্মুক্ত রাখা এবং সামাজিক নিরীক্ষা ও
সংবাদমাধ্যমের নজরদারি।
১১.
পেশাদারিত্ব ও নৈতিক প্রশিক্ষণ: নিয়োগ ও
পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তি এবং নৈতিকতা ও জনসেবার মূল্যবোধ গড়ে তোলার
প্রশিক্ষণ।
বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপটে মন্তব্য
বাংলাদেশে
সংবিধান, তথ্য অধিকার আইন, সংসদীয়
কমিটি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো কাঠামো থাকলেও বাস্তবে জবাবদিহিতা অনেকাংশে
দুর্বল। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে শিথিলতা, দলীয়
প্রভাব, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠানের নিষ্ক্রিয়তা এবং আমলাতান্ত্রিক
জটিলতা এর প্রধান কারণ। তাই কাঠামো থাকা যথেষ্ট নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর
স্বাধীনতা ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার
জবাবদিহিতা
ছাড়া ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, আর নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা জনস্বার্থের
পরিপন্থী। সরকার ও আমলা উভয়ের জন্য রাজনৈতিক, প্রশাসনিক,
আইনগত ও সামাজিক জবাবদিহির বহুমাত্রিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। স্বাধীন
প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ, সক্রিয়
গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিক মিলেই কার্যকর জবাবদিহিতা গড়ে ওঠে, যা সুশাসনের
অপরিহার্য শর্ত।
জবাবদিহিতা বলতে মূলত **ক্ষমতার অধিকারী
ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা** এবং তাদের কার্যক্রমের
জন্য দায়ী থাকার বিষয়টিকে বোঝায়। এটি শুধু হিসাব দেওয়ার বিষয় নয়, বরং জনগণের স্বার্থে ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য
দায়বদ্ধ থাকার একটি প্রক্রিয়া।
### 🔍
জবাবদিহিতা কী
জবাবদিহিতা হলো এমন একটি সম্পর্ক যেখানে একজন
"প্রিন্সিপাল" (যেমন জনগণ) এবং একজন "এজেন্ট" (যেমন সরকার বা
আমলা) থাকে। এজেন্ট প্রিন্সিপালের কাছ থেকে ক্ষমতা পায় এবং বিনিময়ে তার কাজের
জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। এর মূল উপাদানগুলো হলো জবাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা,
স্বচ্ছতা এবং প্রয়োজনে
নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা।
### 📊
জবাবদিহিতার প্রকারভেদ
জবাবদিহিতাকে সাধারণত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা
হয়:
* **উল্লম্ব
জবাবদিহিতা (Vertical Accountability)**: এখানে জনগণ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শাসকদের জবাবদিহি করে। নির্বাচন, ভোট, এবং স্বাধীন গণমাধ্যম এর প্রধান উদাহরণ। এই সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি হলো
জনগণের সম্মতি।
* **অনুভূমিক
জবাবদিহিতা (Horizontal Accountability)**: রাষ্ট্রের ভেতরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একে অপরের
ওপর নজর রাখে। যেমন- সংসদ সরকারের কাজের জবাবদিহি চায়, বিচার বিভাগ ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছতা
নিশ্চিত করে।
* **সামাজিক
জবাবদিহিতা (Social Accountability)**: নাগরিক ও সুশীল সমাজের সরাসরি অংশগ্রহণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পদ্ধতি।
সামাজিক নিরীক্ষা (Social Audit), নাগরিক রিপোর্ট
কার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণ সরকারের কাজ মূল্যায়ন করে।
* **তির্যক
জবাবদিহিতা (Diagonal Accountability)**: একটি মিশ্র ধারণা, যেখানে নাগরিক ও
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সরাসরি অনুভূমিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে (যেমন
সংসদীয় কমিটি) অংশগ্রহণ করে এবং সরকারের কাছে জবাবদিহি আদায়ে ভূমিকা রাখে।
### 🛠️
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার
উপায়
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নানা ধরনের
প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ব্যবস্থা কাজ করে:
* **তথ্যপ্রাপ্তির
স্বাধীনতা**: নাগরিকদের সরকারি তথ্য পাওয়ার অধিকার থাকলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন (Right to Information Act) এর একটি উদাহরণ।
* **স্বাধীন
গণমাধ্যম**: মিডিয়া "ওয়াচডগ" হিসেবে সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে এবং
জনগণের সামনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
* **সুশীল সমাজের
সক্রিয়তা**: এনজিও এবং নাগরিক সংগঠনগুলো সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এবং
প্রয়োজনে সোচ্চার হয়।
* **নির্বাচনী
জবাবদিহিতা**: সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা তাদের প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডের
মূল্যায়ন করে এবং ভালো কাজ না করলে তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারে।
* **আইনগত ও
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো**: দুদক (ACC), মানবাধিকার কমিশন, জাতীয় শুদ্ধাচার
কৌশল (National Integrity Strategy) প্রভৃতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক উদাহরণ।
### 🏛️
সরকার ও আমলাদের জবাবদিহি
নিশ্চিত করার উপায়
সরকার (মন্ত্রী ও রাজনীতিবিদ) এবং আমলাদের
(সরকারি কর্মকর্তা) জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে:
**সরকারের (মন্ত্রী ও রাজনীতিবিদদের) জবাবদিহি:**
* **সংসদীয়
কার্যক্রম**: প্রশ্নোত্তর পর্ব (Question Hour), সংসদীয় কমিটির তদন্ত এবং মন্ত্রীদের জবাবদিহির
মাধ্যমে সংসদ সরকারকে জবাবদিহি করে।
* **নির্বাচনী
জবাবদিহিতা**: ভোটাররা নির্বাচনে সরকারের কাজের মূল্যায়ন করে এবং রায় দেয়।
* **সাংবিধানিক
প্রক্রিয়া**: ক্ষমতা পৃথকীকরণের নীতির মাধ্যমে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের
মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা হয়।
**আমলাদের (সরকারি কর্মকর্তাদের) জবাবদিহি:**
* **কর্মসম্পাদন
ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (GPMS)**: বার্ষিক
কর্মসম্পাদন চুক্তি (APA) এর মাধ্যমে
প্রত্যেক সরকারি দপ্তরের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এবং তা অর্জন
করতে না পারলে জবাবদিহি করতে হয়।
* **শুদ্ধাচার ও
নৈতিকতা**: জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল এবং আচরণবিধি (Code of Conduct) এর মাধ্যমে আমলাদের নৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত
করা হয়।
* **অভিযোগ
ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (GRS)**: জনগণের অভিযোগ
সরাসরি গ্রহণ ও নিষ্পত্তির মাধ্যমে আমলাদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
* **মেধাভিত্তিক
নিয়োগ ও পদোন্নতি**: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি
ব্যবস্থা আমলাদের জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করে।
* **সচিবালয় ও মাঠ
প্রশাসনের সংস্কার**: ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা পৃথকীকরণ এবং জনপ্রশাসনের গঠনমূলক
সংস্কারের মাধ্যমে আমলাদের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
যদিও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এই ব্যবস্থাগুলো
তাত্ত্বিকভাবে স্পষ্ট, তবুও বাস্তবে
রাজনৈতিক ইচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক
সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাব এর কার্যকর বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে
রয়ে যায়।
**জবাবদিহিতা: অর্থ, ধরন এবং সরকার ও আমলাদের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করার
উপায়**
## জবাবদিহিতা বলতে কী বোঝায়
জবাবদিহিতা (Accountability) হলো এমন বাধ্যবাধকতা, যেখানে কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা সরকার অর্পিত ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত, কাজ ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য যাদের কাছে
দায়ী—জনগণ, সংসদ বা ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষ—তাদের কাছে ব্যাখ্যা দেয় এবং ভুল হলে তার ফল ভোগ করে।
সহজ কথায়: **যে ক্ষমতা পেয়েছে, সে কাজের হিসাব দেবে।**
এর তিনটি অংশ—
1. **দায়** — কাজটি কার করতে হবে, তা স্পষ্ট।
2. **ব্যাখ্যা** — কী করা হয়েছে ও কেন, তা জানানো।
3. **পরিণতি** — ঠিক কাজের স্বীকৃতি, ভুল কাজের শাস্তি বা সংশোধন।
সুশাসনে জবাবদিহিতা স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের
সঙ্গে যুক্ত। ক্ষমতা থাকলেই জবাবদিহি না থাকলে তা স্বেচ্ছাচারে পরিণত হয়।
## ধরন
| ধরন | কাদের কাছে | কীভাবে |
|---|---|---|
| রাজনৈতিক | জনগণ ও সংসদ | নির্বাচন, প্রশ্নোত্তর, অনাস্থা, বাজেট |
| প্রশাসনিক | ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রী | আদেশ, শৃঙ্খলা, চাকরিবিধি,
মূল্যায়ন |
| আইনগত | আদালত | বিচারিক পর্যালোচনা, মামলা, শাস্তি |
| আর্থিক | নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ ও সংসদ | হিসাব পরীক্ষা, আপত্তি, বাজেট নিয়ন্ত্রণ |
| পেশাগত | পেশার মান ও সহকর্মী | নীতিমালা, দক্ষতা, পেশাগত শৃঙ্খলা |
| নৈতিক | বিবেক ও সমাজ | সততা, স্বার্থের সংঘাত এড়ানো |
| সামাজিক | নাগরিক ও গণমাধ্যম | জনমত, প্রতিবেদন, নাগরিক নজরদারি |
দিক অনুসারে আরও তিন ভাগ—
- **ঊর্ধ্বমুখী:** কর্মচারী মন্ত্রী বা বসের কাছে।
- **নিম্নমুখী:** সরকার ও আমলা নাগরিকের কাছে।
- **অনুভূমিক:** আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করে।
## নিশ্চিত করার সাধারণ উপায়
1. স্পষ্ট দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা লেখা থাকা।
2. আইনের শাসন — কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
3. স্বচ্ছতা — সিদ্ধান্ত, ব্যয় ও তথ্য প্রকাশ।
4. স্বাধীন বিচার বিভাগ।
5. কার্যকর সংসদীয় নজরদারি।
6. স্বাধীন নিরীক্ষা।
7. তথ্য অধিকার।
8. স্বাধীন গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ।
9. নিয়মিত ও অবাধ নির্বাচন।
10. অভিযোগ, তদন্ত ও শাস্তির বাস্তব ব্যবস্থা।
11. নাগরিক সনদ — সেবার সময়, খরচ ও মান আগে থেকে জানানো।
12. স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ এবং হুইসেলব্লোয়ার
সুরক্ষা।
## সরকারের জবাবদিহিতার উপায়
সরকার মূলত জনগণ ও সংসদের কাছে দায়ী।
1. **নির্বাচন** — মেয়াদ শেষে ভোটে বিচার; সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জবাবদিহি।
2. **সংসদ** — প্রশ্নোত্তর, স্থগিত প্রস্তাব, বাজেট পাস, অনাস্থা প্রস্তাব।
3. **স্থায়ী কমিটি** — মন্ত্রণালয়ের কাজ, ব্যয় ও নীতি খতিয়ে দেখা।
4. **বিরোধীদল** — সমালোচনা ও বিকল্প তুলে ধরা।
5. **বিচার বিভাগ** — আইন ও সংবিধানবিরোধী সিদ্ধান্ত
বাতিল (বিচারিক পর্যালোচনা)।
6. **মহাহিসাব নিরীক্ষক** — সরকারি অর্থের হিসাব
পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন।
7. **সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান** — নির্বাচন কমিশন,
দুর্নীতি দমন কমিশন
ইত্যাদি।
8. **গণমাধ্যম ও জনমত** — নীতি ও কেলেঙ্কারি প্রকাশ।
9. **তথ্য অধিকার আইন** — নাগরিক সরকারি তথ্য চাইতে
পারে।
10. **মন্ত্রিপরিষদের যৌথ দায়** — সংসদীয়
ব্যবস্থায় মন্ত্রিসভা সংসদের আস্থা হারালে পদত্যাগ করে।
## আমলাদের জবাবদিহিতার উপায়
আমলা নির্বাচিত নন, তাই তাদের জবাবদিহি পরোক্ষ—মূলত মন্ত্রী,
আইন ও নাগরিকের মাধ্যমে।
1. **মন্ত্রীর মাধ্যমে সংসদে** — নীতির দায়
মন্ত্রীর; আমলা মন্ত্রীকে
তথ্য ও পরামর্শ দেয়, মন্ত্রী সংসদে
জবাব দেন।
2. **প্রশাসনিক শৃঙ্খলা** — ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার
আদেশ, বদলি, পদোন্নতি ও শাস্তি।
3. **চাকরিবিধি ও আচরণবিধি** — দায়িত্ব, গোপনীয়তা, উপহার ও রাজনীতিতে অংশের নিয়ম।
4. **বার্ষিক মূল্যায়ন** — কাজের মান অনুসারে
পদোন্নতি বা শাস্তি।
5. **আর্থিক নিরীক্ষা** — ব্যয়, ক্রয় ও প্রকল্পে আপত্তি।
6. **দুর্নীতি দমন কমিশন** — ঘুষ, অবৈধ সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার তদন্ত।
7. **বিচারিক পর্যালোচনা** — স্বেচ্ছাচারী আদেশ
আদালতে চ্যালেঞ্জ।
8. **প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল** — চাকরিজীবী বিষয়ক
বিরোধ নিষ্পত্তি।
9. **তথ্য অধিকার ও নাগরিক সনদ** — ফাইল, সময়সীমা ও সেবার মান জনগণ দেখতে পারে।
10. **অভিযোগ ব্যবস্থা** — নাগরিক অভিযোগ, শুনানি ও প্রতিকার।
11. **ডিজিটাল নথি** — আবেদন, অনুমোদন ও সময় রেকর্ড থাকলে দায় এড়ানো কঠিন।
12. **নৈতিক দায়** — সততা, নিরপেক্ষতা এবং দলীয় স্বার্থে নয়, আইন অনুসারে কাজ।
**মনে রাখার কথা:** সরকার জনগণের কাছে সরাসরি
জবাবদিহি করে, প্রধানত নির্বাচন
ও সংসদের মাধ্যমে। আমলারা সরাসরি ভোটে বিচার হয় না; তাই তাদের জবাবদিহি টিকে থাকে মন্ত্রী, আইন, নিরীক্ষা, দুদক, আদালত ও নাগরিকের তথ্য অধিকারের ওপর। এসব উপায়
দুর্বল হলে ক্ষমতা থাকলেও হিসাব থাকে না।
জবাবদিহিতা:
অর্থ, ধরন ও নিশ্চিতকরণের উপায়
১.
জবাবদিহিতা বলতে কী বোঝায়?
জবাবদিহিতা
(Accountability) বলতে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান
বা সরকারি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কাজ,
সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা জনগণের কাছে ব্যাখ্যা
প্রদান এবং প্রয়োজনে দায় স্বীকার করার বাধ্যবাধকতাকে বোঝায়।
সহজভাবে বলা
যায়—কে কী কাজ করেছে, কেন করেছে
এবং সেই কাজের ফলাফলের জন্য তাকে ব্যাখ্যা দিতে হলে সেটিই জবাবদিহিতা।
সুশাসনের
অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা। এটি স্বচ্ছতা,
দায়িত্বশীলতা, আইনের শাসন ও জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠায়
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২.
জবাবদিহিতার ধরন
জবাবদিহিতা
বিভিন্নভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। প্রধান ধরনগুলো হলো—
ক. রাজনৈতিক
জবাবদিহিতা
সরকার ও
রাজনৈতিক নেতারা তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণ ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের
কাছে জবাবদিহি করবেন।
উদাহরণ: নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে সরকারের কর্মকাণ্ডের
মূল্যায়ন।
খ.
প্রশাসনিক জবাবদিহিতা
সরকারি
কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক
প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।
গ.
আইনগত/বিচারিক জবাবদিহিতা
সরকার বা
সরকারি কর্মকর্তা আইন লঙ্ঘন করলে আদালতের মাধ্যমে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।
ঘ. আর্থিক
জবাবদিহিতা
সরকারি অর্থ
কীভাবে সংগ্রহ, বরাদ্দ ও ব্যয় করা হয়েছে তার হিসাব প্রদান করাকে
আর্থিক জবাবদিহিতা বলে।
ঙ. সামাজিক
জবাবদিহিতা
নাগরিক সমাজ,
গণমাধ্যম, পেশাজীবী সংগঠন ও সাধারণ জনগণের কাছে সরকারি প্রতিষ্ঠান
ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করাকে সামাজিক জবাবদিহিতা বলা হয়।
চ.
অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক জবাবদিহিতা
- অভ্যন্তরীণ: প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম ও কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে
জবাবদিহিতা।
- বাহ্যিক: সংসদ, আদালত, গণমাধ্যম, নিরীক্ষা
প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মাধ্যমে জবাবদিহিতা।
৩.
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের উপায়
জবাবদিহিতা
নিশ্চিত করার জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়—
১. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা — সবাইকে
আইনের আওতায় আনতে হবে।
২. স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা — সরকারি
সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা।
৩. তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা — নাগরিকদের
সরকারি তথ্য পাওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি করা।
৪. স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা
— অন্যায় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিকার নিশ্চিত করা।
৫. সংসদীয় নজরদারি বৃদ্ধি — সংসদকে
সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন করার কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে।
৬. নিরীক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা
— সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কার্যকর অডিট ব্যবস্থা প্রয়োজন।
৭. দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা
— দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৮. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা — অনিয়ম ও
দুর্নীতি অনুসন্ধান ও প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা।
৯. নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি — জনগণকে
সরকারি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও মতামত প্রদানের সুযোগ দেওয়া।
১০. কার্যকর অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা
— নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা।
১১. কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন — কর্মকর্তা ও
প্রতিষ্ঠানের কাজের নিয়মিত মূল্যায়ন করা।
১২. শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা — ভালো কাজের
স্বীকৃতি এবং অনিয়মের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. সরকারের
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উপায়
সরকারের
জবাবদিহিতা মূলত জনগণ,
সংসদ, আদালত ও বিভিন্ন সাংবিধানিক/প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়।
১. নির্বাচন
নির্বাচনের
মাধ্যমে জনগণ সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করার সুযোগ পায়।
২. সংসদীয়
নিয়ন্ত্রণ
সংসদে
প্রশ্নোত্তর, আলোচনা, কমিটির কার্যক্রম ইত্যাদির মাধ্যমে সরকারের
কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করা যায়।
৩. বিচার
বিভাগীয় পর্যালোচনা
সরকারের
কোনো সিদ্ধান্ত আইনবিরোধী হলে আদালতের মাধ্যমে তার বৈধতা পরীক্ষা করা যায়।
৪. আর্থিক
নিরীক্ষা
সরকারি
অর্থের ব্যবহার নিরীক্ষার মাধ্যমে পরীক্ষা করা এবং অনিয়ম চিহ্নিত করা যায়।
৫. তথ্য
প্রকাশ
সরকারি নীতি,
বাজেট, প্রকল্প ও ব্যয়ের তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করা হলে
স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়।
৬. গণমাধ্যম
ও নাগরিক সমাজ
গণমাধ্যম ও
নাগরিক সমাজ সরকারি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে অনিয়ম জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারে।
৭. স্বাধীন
প্রতিষ্ঠান
দুর্নীতি
দমন, মানবাধিকার, নির্বাচন, তথ্য অধিকার ও সরকারি হিসাব-নিরীক্ষার মতো
ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিতা বাড়াতে পারে।
৫. আমলাদের
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উপায়
সরকারি
কর্মকর্তা বা আমলাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য—
১. সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
২. কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন নিয়মিত করতে হবে।
৩. প্রশাসনিক তদারকি কার্যকর করতে হবে।
৪. সরকারি বিধি-বিধান ও আচরণবিধি যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
৫. দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে
শাস্তির ব্যবস্থা কার্যকর
করতে হবে।
৬. সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের যথাযথ নিরীক্ষা করতে হবে।
৭. অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
৮. ডিজিটাল প্রশাসন
চালু করে সিদ্ধান্ত ও সেবা প্রদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
৯. নাগরিক সনদ (Citizen Charter) অনুযায়ী
নির্ধারিত সময়ে সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
১০. তথ্য অধিকার ও অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
১১. সংসদীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বাড়াতে হবে।
১২. যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি ও
পুরস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
সরকার ও
আমলাদের জবাবদিহিতার পার্থক্য
|
বিষয় |
সরকার |
আমলা/প্রশাসন |
|
প্রধান
জবাবদিহির ক্ষেত্র |
জনগণ ও
সংসদ |
ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষ, আইন ও জনগণ |
|
প্রধান
মাধ্যম |
নির্বাচন,
সংসদীয় নজরদারি |
প্রশাসনিক
নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন |
|
আইনগত
নিয়ন্ত্রণ |
আদালত |
আদালত ও
প্রশাসনিক বিধি |
|
আর্থিক
নিয়ন্ত্রণ |
সংসদ ও
নিরীক্ষা |
নিরীক্ষা
ও আর্থিক বিধি |
|
সামাজিক
নিয়ন্ত্রণ |
গণমাধ্যম
ও নাগরিক সমাজ |
গণমাধ্যম,
নাগরিক অভিযোগ ও তদারকি |
উপসংহার
জবাবদিহিতা
ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সরকারকে
জনগণের কাছে এবং আমলাতন্ত্রকে সরকার, আইন ও জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনতে হলে স্বচ্ছতা, আইনের শাসন,
সংসদীয় নজরদারি, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নিরীক্ষা,
তথ্যের অধিকার, গণমাধ্যম ও কার্যকর অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
জবাবদিহিতা
(Accountability) বলতে নিজের অর্পিত দায়িত্ব, কাজ এবং
গৃহীত সিদ্ধান্তের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট
পক্ষ বা জনগণের কাছে উত্তর দেওয়ার বা ব্যাখ্যা করার বাধ্যবাধকতাকে বোঝায়। সহজ
কথায়, যার কাছে যে ক্ষমতা বা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে তা
যথাযথভাবে পালন করছে কি না এবং ক্ষমতার কোনো অপব্যবহার করছে কি না, তার
সুস্পষ্ট হিসাব দেওয়াই হলো জবাবদিহিতা। এটি সুশাসন ও গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান
স্তম্ভ।
জবাবদিহিতার
ধরন
জবাবদিহিতাকে
তার প্রয়োগের ক্ষেত্র অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা: সরকার বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তাদের নেওয়া
সিদ্ধান্ত ও কাজের জন্য আইনসভা (সংসদ) এবং সাধারণ ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধ
থাকা।
- প্রশাসনিক বা নির্বাহী জবাবদিহিতা: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাদের কাজের জন্য
নির্দিষ্ট প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে দায়বদ্ধ থাকা।
- আইনগত বা বিচারিক জবাবদিহিতা: দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধান মেনে চলা এবং আইন ভঙ্গ
বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য হওয়া।
- আর্থিক জবাবদিহিতা: সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থের যথাযথ ব্যবহার
নিশ্চিত করা এবং হিসাব-নিরীক্ষকের (অডিট) কাছে আয়-ব্যয়ের সঠিক ও নির্ভুল
হিসাব প্রদান।
- সামাজিক বা পাবলিক জবাবদিহিতা: নাগরিক সমাজ, ভোক্তা
অধিকার সংস্থা বা গণমাধ্যমের কাছে প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা।
- নৈতিক জবাবদিহিতা: কোনো বাহ্যিক চাপ ছাড়াই নিজ বিবেক ও মূল্যবোধের
কাছে কাজের জন্য সৎ ও দায়ী থাকা।
জবাবদিহিতা
নিশ্চিতকরণের সাধারণ উপায়
যেকোনো
প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিচের ব্যবস্থাগুলো
অপরিহার্য:
- স্বচ্ছতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ: কাজের প্রক্রিয়ায় লুকোচুরি না রাখা এবং 'তথ্য অধিকার আইন' বাস্তবায়নের
মাধ্যমে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা।
- স্বাধীন বিচার বিভাগ: অন্যায় বা অনিয়মের ক্ষেত্রে আইনের শাসন ও দ্রুত
বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন
ও প্রভাবমুক্ত রাখা।
- সক্রিয় গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ: মুক্ত ও সাহসী সাংবাদিকতা এবং সুশীল সমাজের ক্রমাগত
নজরদারি জবাবদিহিতা নিশ্চিতের শক্তিশালী হাতিয়ার।
- ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: ক্ষমতা এককেন্দ্রিক না রেখে স্থানীয় সরকার
পর্যায়ে ভাগ করে দেওয়া, যেন সাধারণ মানুষ সহজে জনপ্রতিনিধিদের কাছে প্রশ্ন
করতে পারে।
- পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা: ভালো কাজের জন্য স্বীকৃতি এবং অনিয়ম বা দুর্নীতির
জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান (Reward and Punishment) কার্যকর রাখা।
সরকার ও
আমলাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের উপায়
রাষ্ট্রীয়
শাসন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সরকার এবং স্থায়ী আমলাতন্ত্র—উভয়েরই জবাবদিহিতা
আদায়ের সুনির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে।
সরকারের
(রাজনৈতিক নির্বাহী) জবাবদিহিতা
১. আইনসভা বা সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ: সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার তার যাবতীয় কাজের জন্য
আইনসভার কাছে দায়ী থাকে। বিরোধী দলের প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা (Question Hour), অনাস্থা
প্রস্তাব, বাজেট বা ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর বিতর্ক এবং বিভিন্ন 'সংসদীয়
স্থায়ী কমিটি'র মাধ্যমে সরকারের কাজের জবাবদিহি আদায় করা হয়।
২. নির্বাচনী ব্যবস্থা: নির্দিষ্ট
মেয়াদ শেষে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ভোট দিয়ে
সরকারের কাজের মূল্যায়ন করে। ভালো কাজের জন্য পুনর্নির্বাচন এবং খারাপ কাজের জন্য
ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার মূল ভিত্তি।
৩. স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান: নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি
দমন কমিশন (দুদক), মানবাধিকার কমিশন এবং মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের
(CAG) কার্যালয় স্বাধীনভাবে কাজ করলে সরকারের ভুলত্রুটি ও
আর্থিক অনিয়ম জবাবদিহিতার আওতায় আসে।
৪. জনমত ও সিভিল সোসাইটি: সরকার
সবসময় জনমতের প্রতি সংবেদনশীল থাকে। মিছিল, সমাবেশ,
প্রতিবাদ এবং নাগরিক সমাজের চাপের মুখে সরকার তার স্বেচ্ছাচারী বা ভুল
সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।
আমলাদের
(সরকারি কর্মকর্তা) জবাবদিহিতা
১. অভ্যন্তরীণ বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ: আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে (Hierarchy) প্রতিটি
নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে সরাসরি জবাবদিহি করতে বাধ্য।
বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (ACR) এবং সার্ভিস রুল বা বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার
মাধ্যমে এটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।
২. সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ: আমলারা
তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর মাধ্যমে আইনসভার কাছে পরোক্ষভাবে দায়ী
থাকেন। এছাড়া সংসদের বিভিন্ন 'সরকারি হিসাব কমিটি' বা 'স্থায়ী
কমিটি' প্রয়োজনে সচিব বা ঊর্ধ্বতন আমলাদের সরাসরি তলব করে কাজের
হিসাব চাইতে পারে।
৩. বিচারিক বা আইনগত নিয়ন্ত্রণ: কোনো সরকারি কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার, বৈষম্য বা
বেআইনি কাজ করলে সংক্ষুব্ধ নাগরিক আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। উচ্চ আদালতের রিট বা
প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আমলাদের বেআইনি কাজের জবাবদিহি আদায় করা হয়।
৪. ন্যায়পাল (Ombudsman) ব্যবস্থা: প্রশাসনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও
স্বেচ্ছাচারিতা তদন্ত করার জন্য ন্যায়পাল একটি কার্যকর মাধ্যম। ন্যায়পাল সরাসরি
নাগরিকদের অভিযোগ আমলে নিয়ে স্বাধীনভাবে আমলাদের তদন্তের আওতায় আনতে পারেন।
৫. তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ:
এই আইনের অধীনে সাধারণ নাগরিক যেকোনো সরকারি দপ্তরের সিদ্ধান্ত, টেন্ডার বা
বাজেটের তথ্য চাওয়ার আইনগত অধিকার রাখেন, যা আমলাদের
সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছ হতে বাধ্য করে।
জবাবদিহিতা
(Accountability) বলতে কোনো
ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে তার কাজের, সিদ্ধান্তের
এবং অর্পিত দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা বা কৈফিয়ত দিতে
বাধ্য থাকাকে বোঝায়। সহজ কথায়, নিজের কাজের
জন্য দায়ী থাকা এবং প্রয়োজনে তার সঠিকতা প্রমাণ করাই হলো জবাবদিহিতা। এটি
সুশাসনের (Good Governance) অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
নিচে
জবাবদিহিতার ধরন, তা নিশ্চিত করার উপায় এবং সরকার ও আমলাদের জবাবদিহিতা
আদায়ের মাধ্যমগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১.
জবাবদিহিতার ধরণ (Types of Accountability)
জবাবদিহিতাকে
প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- রাজনৈতিক জবাবদিহিতা: নির্বাচিত প্রতিনিধিরা (যেমন: সংসদ সদস্য ও
মন্ত্রী) তাদের নীতি ও কাজের জন্য জনগণের কাছে দায়ী থাকেন। নির্দিষ্ট মেয়াদ
শেষে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ এই জবাবদিহিতা মূল্যায়ন করে।
- প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা: সরকারি কর্মকর্তা বা আমলারা তাদের কাজের জন্য
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মন্ত্রণালয় এবং নির্ধারিত প্রশাসনিক নিয়মের কাছে
জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন।
- আইনি জবাবদিহিতা: দেশের সংবিধান, আইন
এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি সবার দায়বদ্ধতা। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন
অমান্য করলে আদালতের মুখোমুখি হতে হয়।
- আর্থিক জবাবদিহিতা: সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডের সঠিক, স্বচ্ছ এবং নিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। এর
জন্য অডিট বা নিরীক্ষা ব্যবস্থা কাজ করে।
- সামাজিক জবাবদিহিতা: নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম
এবং সাধারণ জনগণের কাছে সরকার বা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়বদ্ধতা।
২.
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের উপায় (Ways to Ensure Accountability)
যেকোনো সমাজ
বা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিচের পদক্ষেপগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখে:
- স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: সব কাজের প্রক্রিয়া এবং তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত
রাখা। তথ্য গোপন করার সুযোগ কম থাকলে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়।
- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা:
আইনের চোখে সবাইকে সমান বিবেচনা করা এবং অপরাধের
জন্য শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
- স্বাধীন বিচার বিভাগ: বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনৈতিক
প্রভাবমুক্ত রাখা, যাতে তারা যেকোনো অনিয়মের নিরপেক্ষ বিচার করতে
পারে।
- শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশনের মতো
সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া।
- তথ্য অধিকার আইনের বাস্তবায়ন: নাগরিকদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা,
যাতে তারা যেকোনো সরকারি সিদ্ধান্তের কারণ ও
প্রক্রিয়া জানতে পারে।
৩. সরকার ও
আমলাদের জবাবদিহিতার উপায়সমূহ (Accountability Mechanisms for Government
and Bureaucracy)
গণতান্ত্রিক
ব্যবস্থায় সরকার (নির্বাহী বিভাগ) এবং আমলাতন্ত্রের (প্রশাসন) জবাবদিহিতা নিশ্চিত
করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক মাধ্যম রয়েছে:
ক) সরকারের
জবাবদিহিতার উপায়:
- সংসদীয় বিতর্ক ও প্রশ্নোত্তর পর্ব: সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দল এবং অন্যান্য সংসদ সদস্যরা
সরকারের নীতি ও কাজের সমালোচনা করেন এবং মন্ত্রীদের বিভিন্ন প্রশ্ন করে
জবাবদিহি করতে বাধ্য করেন।
- সংসদীয় স্থায়ী কমিটি: বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের তদারকি করার জন্য
সংসদীয় কমিটি থাকে। এই কমিটিগুলো সরকারি কাজের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম
খতিয়ে দেখে।
- নিয়মিত নির্বাচন: এটি সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার। সরকার ভালো কাজ
না করলে জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচনে তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে
দিতে পারে।
- গণমাধ্যম ও জনমত: সংবাদপত্র, টেলিভিশন
এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরে জনমত গঠন করা হয়,
যা সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে বাধ্য করে।
খ) আমলাদের
জবাবদিহিতার উপায়:
- বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (APA): আমলারা বা সরকারি দপ্তরগুলো বছরের শুরুতে কী কী কাজ
করবে তার একটি চুক্তি সরকারের সাথে করে। বছর শেষে সেই কাজের মূল্যায়ন করা
হয়।
- বিভাগীয় মামলা ও শৃঙ্খলা বিধি: কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে 'সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা' অনুযায়ী বদলি, সাময়িক
বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
- মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (CAG):
সরকারি অর্থের প্রতিটি আনা-আনার সঠিক হিসাব রাখা
এবং আমলারা সরকারি ফান্ডের অপব্যবহার করছেন কি না তা অডিটের (নিরীক্ষা)
মাধ্যমে প্রকাশ করা।
- নাগরিক সনদ (Citizen's Charter): প্রতিটি সরকারি অফিস কোন সেবা কত দিনে এবং কত খরচে
দেবে তা দেয়ালে বা ওয়েবসাইটে টাঙিয়ে রাখতে হয়। এর ব্যতিক্রম হলে নাগরিকরা
অভিযোগ করতে পারেন।
- জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল (NIS): আমলাদের নৈতিকতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের
জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে এই কৌশল বাস্তবায়ন করা হয়।
গণতান্ত্রিক শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের ভূমিকাএটি অনার্স ২য় ও ৩য় বর্ষের সবচেয়ে
কমন প্রশ্ন। উত্তরটি ৩ ভাগে সাজালাম।১. গণতান্ত্রিক শাসন বলতে কী বোঝেন?গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়। ভোট হলো
গণতন্ত্রের দরজা, পুরো ঘর
নয়।আব্রাহাম লিংকনের বিখ্যাত সংজ্ঞা: "গণতন্ত্র হলো জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য পরিচালিত শাসন
ব্যবস্থা।"ব্যাপক অর্থে গণতান্ত্রিক শাসনের ৫টি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে:জনগণের
সার্বভৌমত্ব: ক্ষমতার মালিক জনগণ, কোনো ব্যক্তি বা
বাহিনী নয়।অবাধ, সুষ্ঠু ও
নিরপেক্ষ নির্বাচন: ভোট ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। ভোটে কারচুপি হলে সেটা গণতন্ত্র
নয়।আইনের শাসন ও মানবাধিকার: সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেলেও সরকার সংখ্যালঘুর অধিকার
কেড়ে নিতে পারবে না।মত প্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা: যে কেউ সরকারের সমালোচনা করতে
পারবে, দল করতে পারবে।জবাবদিহিতা
ও ক্ষমতার পালাবদল: সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর ক্ষমতা ছাড়তে
হবে।মনে রাখবেন: একনায়কতন্ত্রেও নির্বাচন হয় - উত্তর কোরিয়াতেও হয়। কিন্তু
সেখানে বিরোধী দল নেই, মিডিয়া নেই। তাই
সেটা গণতন্ত্র নয়।২. গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকারাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠান হলো গণতন্ত্রের স্তম্ভ বা Pillar। স্তম্ভ দুর্বল
হলে ঘর ভেঙে পড়ে।ক) রাজনৈতিক দল:
এটা গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিষ্ঠান।ভূমিকা: জনগণকে সংগঠিত করে, নীতি তৈরি করে, নির্বাচনে অংশ
নেয়।সমস্যা বাংলাদেশে: পরিবারতন্ত্র। আওয়ামী লীগ, বিএনপি দুটোই এক পরিবার কেন্দ্রিক। দলের ভেতরে
গণতন্ত্র নেই, তাই দেশেও
গণতন্ত্র দুর্বল হয়। দলের ভেতরে ভোট হয় না।খ) সংসদ / পার্লামেন্ট:ভূমিকা: আইন
তৈরি, সরকারকে নিয়ন্ত্রণ,
বাজেট পাস। সংসদ হলো
জনগণের আয়না।সমস্যা: বাংলাদেশে সংসদে ৫০ বছরে একটি বেসরকারি বিলও পাস হয়নি।
সংসদে বিরোধী দল না থাকলে তা রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়।গ) নির্বাচন কমিশন (EC):ভূমিকা: নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করা। EC
হলো গণতন্ত্রের রেফারি।
রেফারি পক্ষপাতদুষ্ট হলে খেলা নষ্ট।সমস্যা: ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ এর নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক এই প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাই প্রমাণ করে।ঘ) বিচার
বিভাগ ও আইনের শাসন:ভূমিকা: সংবিধান রক্ষা করা, নির্বাচনে কারচুপি হলে তা বাতিল করা।উদাহরণ:
পাকিস্তানে সুপ্রিম কোর্ট অনেকবার গণতন্ত্র বাঁচিয়েছে।ঙ) স্থানীয় সরকার:
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা হলো গণতন্ত্রের স্কুল। এখানে মানুষ
গণতন্ত্র শেখে।৩. গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সুশীল সমাজ বা Civil Society-র ভূমিকাসুশীল সমাজ মানে সরকার নয়, দল নয়, কিন্তু জনগণের পক্ষে কথা বলে - যেমন: শিক্ষক,
সাংবাদিক, আইনজীবী, এনজিও, TIB, সুজন, ছাত্র সংগঠন।এদেরকে গণতন্ত্রের Watchdog বা প্রহরী কুকুর বলা হয়।তাদের ৬টি বড়
ভূমিকা:১. সরকারের সমালোচনা ও জবাবদিহিতা তৈরি:
রাজনৈতিক দল যখন বিরোধী দলে থাকে না, তখন সুশীল সমাজই সরকারের ভুল ধরে। যেমন TIB
দুর্নীতির রিপোর্ট
দেয়।২. জনগণকে সচেতন করা:
ভোটের অধিকার, তথ্য অধিকার সম্পর্কে মানুষকে জানায়। সুজন
যেমন 'ভোটের অধিকার' নিয়ে কাজ করে।৩. মধ্যস্থতা করা:
১৯৯০ সালে এরশাদ পতনে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে ডাক্তার,
শিক্ষক, আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল বিশাল।৪. মানবাধিকার
রক্ষা:
আইন ও সালিশ কেন্দ্র, অধিকার - এরা গুম, খুন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলে।৫. গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তৈরি:
গণতন্ত্র শুধু আইন নয়, এটা একটা সংস্কৃতি। অন্যের মত সহ্য করা,
আলোচনা করা - এটা সুশীল
সমাজ শেখায়।৬. নির্বাচন পর্যবেক্ষণ:
নির্বাচনে কারচুপি হচ্ছে কিনা তা দেশি-বিদেশি
পর্যবেক্ষকরা দেখে।বাংলাদেশের বাস্তবতা: আমাদের দেশে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো
দলীয়করণ হয়ে গেছে। ফলে সুশীল সমাজের উপর চাপ বেশি। যখন রাজনৈতিক দল দুর্বল হয়,
তখন সেনাবাহিনী বা
আমলাতন্ত্র ক্ষমতা নেয়। ১/১১ এর সময় তাই হয়েছিল।উপসংহার:
গণতন্ত্র একটি টেবিলের মতো - যার ৩টি পা। ১.
শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ২. সক্রিয় সুশীল
সমাজ, ৩. সচেতন জনগণ। একটি পা
ভাঙলে টেবিল পড়ে যাবে। বাংলাদেশে এখন তৃতীয় পা অর্থাৎ সচেতন জনগণ ও সুশীল
সমাজকেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হতে হবে।
গণতান্ত্রিক
শাসন হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে এবং
তারা সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে দেশ শাসন করে। এটি কেবল নির্বাচন নয়, বরং নাগরিক
অধিকার, আইনের শাসন, ক্ষমতার ভারসাম্য ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল
একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংস্কৃতি।[bn.wikipedia][bn.wikipedia][biplobit][sathee.iitk.ac][prothomalo][roddure]
গণতান্ত্রিক
শাসনের সংজ্ঞা
বিভিন্ন
চিন্তাবিদ ও প্রতিষ্ঠান গণতান্ত্রিক শাসনকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন:
- আব্রাহাম লিঙ্কন: “গণতন্ত্র
হলো জনগণের, জনগণ দ্বারা এবং জনগণের জন্য শাসনব্যবস্থা।”[biplobit]
- জন স্টুয়ার্ট মিল: “যে
সরকারে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সম্প্রদায়ের সকল সদস্যের হাতে ন্যস্ত
থাকে।”[devlibrary]
- শুম্পিটার: “গণতন্ত্র
হলো এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তিরা প্রতিযোগিতামূলক
নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করে।”[roddure]
- সাধারণ সংজ্ঞা: যে শাসনব্যবস্থায় শাসনক্ষমতা এক বা মুষ্টিমেয়
লোকের হাতে না থেকে সমগ্র জনসাধারণের হাতে ন্যস্ত থাকে এবং অধিকাংশ জনগণকে
মতামত প্রকাশ করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাকে
গণতন্ত্র বলে।[biplobit][devlibrary]
সহজ ভাষায়,
গণতান্ত্রিক শাসন = জনগণের সার্বভৌমত্ব + নির্বাচিত প্রতিনিধি + সংবিধান ও
আইনের শাসন + নাগরিক অধিকার।[bn.wikipedia][sathee.iitk.ac][prothomalo]
গণতান্ত্রিক
শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য
গণতান্ত্রিক
শাসনব্যবস্থার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
|
বৈশিষ্ট্য |
ব্যাখ্যা |
|
জনগণের
সার্বভৌমত্ব |
সর্বোচ্চ
ক্ষমতা জনগণের হাতে; তারা ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন ও পরিবর্তন করে।
[bn.wikipedia][prothomalo][bhugolshiksha] |
|
নির্বাচিত
প্রতিনিধিত্ব |
জনগণ
তাদের প্রতিনিধি (সংসদ সদস্য, মেয়র) নির্বাচনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে শাসনকার্যে অংশ
নেয়। [bn.wikipedia][biplobit][bhugolshiksha] |
|
সংখ্যাগরিষ্ঠের
শাসন ও সংখ্যালঘুর অধিকার |
সিদ্ধান্ত
সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে গৃহীত হয়, কিন্তু সংখ্যালঘুর অধিকার সংরক্ষিত থাকে।
[sathee.iitk.ac][bhugolshiksha] |
|
অবাধ ও
নিরপেক্ষ নির্বাচন |
নিয়মিত,
অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। [bn.wikipedia][roddure][archive.roar] |
|
নাগরিক
অধিকার ও স্বাধীনতা |
বাকস্বাধীনতা,
সংগঠনের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, আইনের
সামনে সমতা ইত্যাদি নিশ্চিত থাকে। [bn.wikipedia][sathee.iitk.ac][roddure] |
|
আইনের
শাসন |
সবাই
আইনের অধীন; সরকারও সংবিধান ও আইনের সীমার মধ্যে কাজ করে। [sathee.iitk.ac][prothomalo] |
|
ক্ষমতার
পৃথকীকরণ ও ভারসাম্য |
আইন,
শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। [prothomalo] |
|
বহুদলীয়
ব্যবস্থা |
একাধিক
রাজনৈতিক দল প্রতিযোগিতা করে; বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা ও তদারকি করে। [bhugolshiksha] |
|
স্বাধীন
গণমাধ্যম |
গণমাধ্যম
সরকারি কাজের তদারকি ও জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। [sathee.iitk.ac][dailyamardesh] |
|
দায়বদ্ধতা
ও জবাবদিহিতা |
সরকার
জনগণের কাছে তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি থাকে। [sathee.iitk.ac][prothomalo] |
গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
গণতন্ত্র
শুধু একটি ধারণা নয়; এটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।
নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও তাদের ভূমিকা আলোচনা করা হলো:
১. সংসদ (Jatiya
Sangsad)
- আইন প্রণয়ন: জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ দেশের আইন তৈরি করে।[bhugolshiksha][bn.wikipedia]
- বাজেট অনুমোদন: সরকারি রাজস্ব ও ব্যয়ের অনুমোদন সংসদের মাধ্যমে
হয়।[bn.wikipedia]
- সরকারের তদারকি: প্রশ্নোত্তর, বিতর্ক,
কমিটির মাধ্যমে সরকারি কাজের সমালোচনা ও মূল্যায়ন।[bhugolshiksha][bn.wikipedia]
- জনমতের প্রতিনিধিত্ব: বিভিন্ন এলাকার সমস্যা ও চাহিদা সংসদে উত্থাপন।[bhugolshiksha]
২. নির্বাচন
কমিশন
- অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন: সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করে গণতন্ত্রের ভিত্তি
শক্তিশালী করে।[bn.wikipedia][archive.roar]
- ভোটার তালিকা প্রণয়ন:
যোগ্য ভোটারদের তালিকা তৈরি ও হালনাগাদ করে।[archive.roar]
- দলীয় নিবন্ধন ও তদারকি: রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ।[archive.roar]
৩. বিচার
বিভাগ (সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, অধস্তন
আদালত)
- সংবিধানের প্রহরী: সংবিধানের ব্যাখ্যা ও লঙ্ঘন রোধ করে।[sathee.iitk.ac][sathee.iitk.ac]
- আইনের শাসন নিশ্চিত: নাগরিক অধিকার রক্ষা, সরকারি
সিদ্ধান্তের বৈধতা যাচাই।[sathee.iitk.ac][sathee.iitk.ac]
- ক্ষমতার ভারসাম্য: আইন ও শাসন বিভাগের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি।[prothomalo]
৪. রাজনৈতিক
দল
- জনমত গঠন: বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচির মাধ্যমে জনমত তৈরি করে।[bhugolshiksha][wbschool]
- নেতৃত্ব তৈরি: দেশ পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতা তৈরি ও প্রশিক্ষণ
দেয়।[wbschool]
- বিকল্প সরকার: বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করে এবং বিকল্প নীতি
উপস্থাপন করে।[bhugolshiksha]
- নাগরিক শিক্ষা: ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ায়।[wbschool]
৫. স্থানীয়
সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি
কর্পোরেশন)
- গণতন্ত্রের ভিত্তি: তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ তৈরি করে।[bhugolshiksha]
- জনগণের অংশগ্রহণ: স্থানীয় সমস্যার সমাধানে নাগরিকদের সরাসরি
অংশগ্রহণ।[bhugolshiksha]
- ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: কেন্দ্রীয় ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়।[prothomalo]
৬. গণমাধ্যম
(চতুর্থ স্তম্ভ)
- তদারকি: সরকারি দুর্নীতি, অনিয়ম
ও অপকর্ম প্রকাশ করে।[sathee.iitk.ac][dailyamardesh]
- জনমত গঠন: বিভিন্ন বিষয়ে জনমত তৈরি ও নাগরিকদের সচেতন করে।[dailyamardesh]
- তথ্যের প্রবাহ: সরকারি সিদ্ধান্ত ও নীতি জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়।[sathee.iitk.ac]
গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় সিভিল সোসাইটির (নাগরিক সমাজ) ভূমিকা
সিভিল
সোসাইটি হলো রাষ্ট্র, বাজার ও পরিবারের বাইরে এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে
নাগরিকরা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, এনজিও, পেশাজীবী সমিতি, ধর্মীয়
প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে
সম্মিলিতভাবে কাজ করে। গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় এর ভূমিকা অপরিসীম:[dailyamardesh]
১. সরকারের
তদারকি ও জবাবদিহিতা আদায়
- এনজিও, গবেষণা প্রতিষ্ঠান
ও নাগরিক সংগঠন সরকারি নীতি, বাজেট ও
কর্মকাণ্ডের সমালোচনা ও মূল্যায়ন করে।[sathee.iitk.ac][dailyamardesh]
- দুর্নীতি, মানবাধিকার
লঙ্ঘন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে।[dailyamardesh]
২. নাগরিক
শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি
- ভোটার শিক্ষা, নাগরিক
অধিকার বিষয়ক কর্মশালা, আলোচনা সভার মাধ্যমে নাগরিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা
বাড়ায়।[dailyamardesh][wbschool]
- গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ (সহনশীলতা, সংলাপ, আইনের শাসন) প্রচার
করে।[dailyamardesh]
৩.
প্রান্তিক গোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ
- নারী, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র
ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অধিকার ও চাহিদা তুলে ধরে।[dailyamardesh]
- সরকারি নীতি প্রণয়নে এদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।[dailyamardesh]
৪. সংলাপ ও
ঐকমত্য তৈরি
- বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সরকার
ও নাগরিকদের মধ্যে সংলাপের সেতুবন্ধন তৈরি করে।[dailyamardesh]
- সামাজিক দ্বন্দ্ব নিরসনে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন
করে।[dailyamardesh]
৫. নীতি
প্রণয়নে প্রভাব
- গবেষণা, নীতি সুপারিশ ও আইন
প্রণয়নে সরকারকে পরামর্শ দেয়।[sathee.iitk.ac][dailyamardesh]
- জনমত গঠনের মাধ্যমে সরকারি নীতিতে পরিবর্তন আনে।[dailyamardesh]
৬.
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চা
- স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা, গণশুনানি, বাজেট
অধিবেশনের মাধ্যমে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ তৈরি করে।[dailyamardesh]
- সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের
দাবি তোলে।[dailyamardesh]
৭. নির্বাচন
পর্যবেক্ষণ
- নির্বাচনে স্বাধীন পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করে
সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করে।[archive.roar]
- ভোট কেনা, ভয়
প্রদর্শন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে।[archive.roar]
বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকা মিশ্রিত:
ইতিবাচক
দিক:
- নির্বাচন কমিশন: ডিজিটাল ভোটার তালিকা, ইভিএম
প্রবর্তন।[archive.roar]
- সুপ্রিম কোর্ট: সংবিধানের ব্যাখ্যা, নির্বাচনী
রিট, মানবাধিকার মামলা।[sathee.iitk.ac]
- সিভিল সোসাইটি: টিআইবি, আইন ও সালিশ
কেন্দ্র, ব্র্যাক, গণমাধ্যমের
সক্রিয়তা।[dailyamardesh]
- স্থানীয় সরকার: ইউনিয়ন পরিষদে সরাসরি নির্বাচন, নারী সংরক্ষিত আসন।[bhugolshiksha]
চ্যালেঞ্জ:
- সংসদের কার্যকারিতা: বিরোধী দলের অনুপস্থিতি, কমিটির
সীমিত ভূমিকা।[bhugolshiksha]
- রাজনৈতিক দল: দলীয়করণ, অভ্যন্তরীণ
গণতন্ত্রের অভাব।[wbschool]
- গণমাধ্যম: স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা
ঝুঁকি।[dailyamardesh]
- সিভিল সোসাইটি: রাজনৈতিক চাপ, তহবিল
সংকট।[dailyamardesh]
উপসংহার
গণতান্ত্রিক
শাসন কেবল একটি সরকারি কাঠামো নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া যেখানে রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠান (সংসদ, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ,
রাজনৈতিক দল) এবং সিভিল সোসাইটি (এনজিও, গণমাধ্যম,
নাগরিক সংগঠন) একসঙ্গে কাজ করে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে হলে এই
প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও জনমুখী করে তোলা প্রয়োজন।[sathee.iitk.ac][prothomalo][bhugolshiksha][archive.roar][sathee.iitk.ac][dailyamardesh]
গণতান্ত্রিক
শাসন: অর্থ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকা
ভূমিকা
মানুষ
চিরকালই এমন একটি শাসনব্যবস্থা খুঁজেছে, যেখানে
শাসকের খেয়ালখুশির বদলে জনগণের ইচ্ছাই রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হবে। এই সন্ধানের
ফসলই গণতন্ত্র। বর্তমান বিশ্বে অধিকাংশ রাষ্ট্র নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে,
কিন্তু গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের নাম নয়। এটি একটি জীবনধারা, একটি
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং ক্ষমতার জবাবদিহিমূলক চর্চা। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও
টিকিয়ে রাখার জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সক্রিয় সিভিল সোসাইটি
অপরিহার্য।
গণতান্ত্রিক
শাসনের অর্থ
গণতন্ত্র (Democracy)
শব্দটি গ্রিক demos (জনগণ) ও kratos (শাসন) থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক
অর্থ জনগণের শাসন। আব্রাহাম লিংকনের বিখ্যাত সংজ্ঞায় গণতন্ত্র হলো "জনগণের,
জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য শাসন"।
গণতান্ত্রিক
শাসন বলতে এমন শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ,
সরকার জনগণের সম্মতিতে ও নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়, এবং শাসকগণ
আইন, সংবিধান ও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন। এখানে নাগরিকের মৌলিক
অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গুরুত্ব পেলেও
সংখ্যালঘুর অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে।
গণতান্ত্রিক
শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. জনগণের
সার্বভৌমত্ব: ক্ষমতার উৎস
জনগণ, এবং সরকার জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
২. নিয়মিত
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন: প্রাপ্তবয়স্ক
সব নাগরিকের ভোটাধিকার এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন ও পরিবর্তন।
৩. আইনের
শাসন: সবার জন্য সমান আইন এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ।
৪. মৌলিক
অধিকার ও স্বাধীনতা: বাক্স্বাধীনতা,
সংগঠনের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমতার নিশ্চয়তা।
৫. বহুদলীয়
ব্যবস্থা ও বিরোধী দলের স্বীকৃতি: একাধিক
রাজনৈতিক দলের প্রতিযোগিতা এবং বিরোধী দলের বৈধ ভূমিকা।
৬. ক্ষমতার
পৃথকীকরণ ও ভারসাম্য: আইন,
শাসন ও বিচার বিভাগের পৃথক ও পরস্পর নিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম।
৭.
জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা: সরকার তার
কাজের জন্য সংসদ, আদালত ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
৮.
সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষা: সংখ্যাগরিষ্ঠের
শাসন যেন সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্রে পরিণত না হয়।
৯. স্বাধীন
গণমাধ্যম: তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা ও সরকারের সমালোচনার
সুযোগ।
গণতন্ত্রের
প্রকারভেদ
গণতন্ত্র
প্রধানত দুই ধরনের। প্রত্যক্ষ
গণতন্ত্রে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়,
যেমন প্রাচীন গ্রিক নগররাষ্ট্র এথেন্স বা বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের কিছু
ক্যান্টনে। পরোক্ষ বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে শাসনকার্যে অংশ নেয়,
যা আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রে প্রচলিত।
গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠান বলতে বোঝায় সেই সব কাঠামো ও সংস্থা, যার মাধ্যমে
রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জিত, প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দল,
সংসদ, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ,
নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার।
১. রাজনৈতিক
দল: দল গণতন্ত্রের প্রাণ। দলগুলো জনগণের বিভিন্ন
স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষাকে একত্র করে নীতিতে রূপ দেয়, নেতৃত্ব
তৈরি করে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং জনগণকে রাজনৈতিকভাবে
সচেতন করে। বিরোধী দল সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখে। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চা ও
স্বচ্ছ অর্থায়ন দলের গণতান্ত্রিক চরিত্রের জন্য জরুরি।
২. আইনসভা
বা সংসদ: সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান
প্রতিষ্ঠান। এটি আইন প্রণয়ন করে, বাজেট অনুমোদন করে, সরকারের কাজ
তদারকি করে এবং জনগণের সমস্যা নিয়ে বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। সংসদীয় কমিটি
নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
৩. নির্বাহী
বিভাগ: সরকার আইন বাস্তবায়ন ও নীতি কার্যকর করে।
গণতান্ত্রিক সরকার সংবিধান ও আইনের সীমার মধ্যে থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করে এবং
সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে।
৪. স্বাধীন
বিচার বিভাগ: আদালত
সংবিধানের অভিভাবক। এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে, সরকারের
অবৈধ কাজ বাতিল করে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করে। বিচার বিভাগ দুর্বল হলে
গণতন্ত্রের অন্য সব স্তম্ভও ভেঙে পড়ে।
৫. নির্বাচন
কমিশন: একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন
অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে সরকার
গঠনের বৈধতা নিশ্চিত করে। নির্বাচনের প্রতি আস্থাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি
আস্থার ভিত্তি।
৬. স্থানীয়
সরকার প্রতিষ্ঠান: ইউনিয়ন
পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি
কর্পোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠান তৃণমূলে গণতন্ত্রের চর্চা করায়, জনঅংশগ্রহণ
বাড়ায় এবং নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে।
৭.
সাংবিধানিক ও তদারকি প্রতিষ্ঠান: দুর্নীতি
দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক, মানবাধিকার
কমিশন ও ন্যায়পাল ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
৮.
জনপ্রশাসন: নিরপেক্ষ,
পেশাদার ও জনসেবামুখী প্রশাসন গণতান্ত্রিক সরকারের নীতি দক্ষতার সঙ্গে
বাস্তবায়ন করে।
গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় সিভিল সোসাইটির ভূমিকা
সিভিল
সোসাইটি (নাগরিক সমাজ) বলতে রাষ্ট্র, বাজার ও পরিবারের বাইরে স্বেচ্ছাভিত্তিক
সংগঠনগুলোর সমষ্টিকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে এনজিও, পেশাজীবী
সংগঠন, শ্রমিক ও ছাত্র সংগঠন, গবেষণা
প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন এবং নাগরিক আন্দোলন।
ফরাসি চিন্তাবিদ আলেক্সি দ্য তকভিল সিভিল সোসাইটিকে গণতন্ত্রের পাঠশালা হিসেবে
অভিহিত করেছিলেন।
১. সরকারের
ওপর নজরদারি ও জবাবদিহি আদায়: সিভিল
সোসাইটি সরকারের নীতি, ব্যয় ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং অনিয়ম প্রকাশ করে।
বাংলাদেশে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর মতো সংগঠন এ
ভূমিকা পালন করে।
২. নাগরিক
সচেতনতা ও শিক্ষা: ভোটাধিকার,
মৌলিক অধিকার ও নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে। এতে সক্রিয় ও
দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি হয়।
৩. জনমত গঠন
ও অ্যাডভোকেসি: গবেষণা,
প্রচারণা ও সংলাপের মাধ্যমে নীতি-নির্ধারণে প্রভাব ফেলে এবং জনস্বার্থের
বিষয়গুলো এজেন্ডায় আনে।
৪. নির্বাচন
পর্যবেক্ষণ: নির্বাচনী
প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, ভোটার শিক্ষা ও অনিয়ম প্রতিবেদনের মাধ্যমে নির্বাচনের
স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।
৫.
মানবাধিকার সুরক্ষা: মানবাধিকার
লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ, আইনি সহায়তা প্রদান ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়গুলো
তুলে ধরে।
৬.
প্রান্তিক ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর: নারী,
সংখ্যালঘু, আদিবাসী, শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষের দাবি রাষ্ট্রের কাছে
পৌঁছে দেয়, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের জন্য জরুরি।
৭. স্বাধীন
গণমাধ্যমের মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ: গণমাধ্যম
জনগণকে তথ্য দেয়, সরকারের সমালোচনা করে এবং জনমতের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ
করে। একে প্রায়ই গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়।
৮. সামাজিক
পুঁজি ও সহনশীলতা তৈরি: সংগঠনের
মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আস্থা, সহযোগিতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা গড়ে ওঠে, যা
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভিত্তি।
৯. রাষ্ট্র
ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন: সরকার ও
নাগরিকের মধ্যে সংলাপ ও মধ্যস্থতার ক্ষেত্র তৈরি করে এবং সেবা প্রদানে সরকারের
পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
১০.
স্বৈরতন্ত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ: ইতিহাসে বহু দেশে স্বৈরশাসন পতন ও গণতন্ত্রে উত্তরণে
সিভিল সোসাইটি নির্ণায়ক ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশেও ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং
২০২৪ সালের গণআন্দোলনে ছাত্র, পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটির পারস্পরিক সম্পর্ক
গণতন্ত্রের
জন্য দুটিই পরিপূরক। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো দেয়,
আর সিভিল সোসাইটি সেই কাঠামোকে প্রাণবন্ত, জবাবদিহিমূলক
ও জনমুখী রাখে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া সিভিল সোসাইটির দাবি বাস্তবায়িত হয়
না, আবার সক্রিয় সিভিল সোসাইটি ছাড়া প্রতিষ্ঠান সহজেই ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ারে
পরিণত হয়। দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ।
বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের
সংবিধানে গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার ও জনগণের ক্ষমতার নিশ্চয়তা রয়েছে। তবে
বাস্তবে দলীয়করণ, নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট, সংসদের
সীমিত কার্যকারিতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সিভিল
সোসাইটির কাজের পরিসর সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ গণতন্ত্র সুসংহত করার পথে প্রধান
চ্যালেঞ্জ। এসব সীমাবদ্ধতা কাটাতে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক
দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র শক্তিশালী করা এবং সিভিল সোসাইটির জন্য নিরাপদ ও মুক্ত
পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
উপসংহার
গণতান্ত্রিক
শাসন কেবল পাঁচ বছর পরপর ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নয়, এটি জনগণের
অংশগ্রহণ, ক্ষমতার জবাবদিহি ও অধিকারের সুরক্ষার একটি ধারাবাহিক
প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রক্রিয়ার কাঠামো তৈরি করে, আর সিভিল
সোসাইটি তাকে জীবন্ত ও জনমুখী রাখে। দুই শক্তির সমন্বয় ও
পারস্পরিক ভারসাম্যের মধ্য দিয়েই একটি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ও সুসংহত হতে
পারে।
গণতান্ত্রিক শাসন হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা,
যেখানে শাসন পরিচালনার
চূড়ান্ত ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকে এবং নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্বের
মাধ্যমে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ হয়। অন্যদিকে, শুধু নির্বাচন থাকলেই কোনো রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক
হয় না; এর জন্য প্রয়োজন
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভারসাম্য এবং সিভিল সোসাইটির সক্রিয় ভূমিকা।
### 🏛️
গণতান্ত্রিক শাসন বলতে কী
বোঝায়
গণতান্ত্রিক শাসন মানে শুধু নিয়মিত ভোট বা
নির্বাচন নয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে **শাসকদের ক্ষমতা সাংবিধানিক বিধি-নিষেধের অধীন** থাকে এবং তারা জনগণের
কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে । রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডালের মতে, গণতান্ত্রিক শাসনের ন্যূনতম শর্ত হলো
নিম্নলিখিত উপাদানগুলোর উপস্থিতি:
- **মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন**: যেখানে রাজনৈতিক
প্রতিযোগিতা কার্যকর এবং অংশগ্রহণের বাধা কম থাকে।
- **নাগরিক স্বাধীনতা**: সংগঠন, তথ্য ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
- **নীতিনির্ধারণে প্রতিযোগিতা**: নেতৃত্বের দাবি
নিয়মিত বিরতিতে অহিংস উপায়ে যাচাই করা হয় ।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল স্তম্ভগুলো হলো
**জনগণের সার্বভৌমত্ব, প্রতিনিধিত্ব,
জবাবদিহিতা এবং
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা** । আর গণতন্ত্রায়নের প্রকৃত অর্থ হলো ক্ষমতা
ব্যক্তিবিশেষের হাত থেকে বিমূর্ত "নিয়মের সেট"-এর হাতে স্থানান্তর করা,
যা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের
মাধ্যমে টেকসই হয় ।
### 🏗️
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের
ভূমিকা
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গণতন্ত্রের কাঠামো
তৈরি করে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে। এগুলোর ভূমিকা নিম্নরূপ:
- **সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারণ**: সংবিধান ঠিক করে
দেয় কে শাসন করবে, ক্ষমতা ও সম্পদ
কীভাবে বণ্টিত হবে এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কীভাবে নিষ্পত্তি হবে । দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায় যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নকশা সঠিকভাবে না থাকলে
কর্তৃত্ববাদের উত্থান ঘটতে পারে ।
- **প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও দায়বদ্ধতা**:
শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যেমন আইনসভা,
বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন
কমিশন, সরকারের স্বেচ্ছাচারী
ক্ষমতাকে সীমিত করে এবং নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করে ।
- **গণতন্ত্রের স্থায়িত্বে প্রভাব**:
প্রতিষ্ঠানগুলো যখন স্বাধীন ও কার্যকরভাবে কাজ করে, তখন গণতন্ত্র টিকে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা অর্জন করে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে
।
### 🤝
সিভিল সোসাইটির ভূমিকা
সিভিল সোসাইটি হলো রাষ্ট্র ও ব্যক্তিগত
ক্ষেত্রের মধ্যবর্তী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের একটি ক্ষেত্র, যা স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করে ।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এর ভূমিকা multifaceted:
- **ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা**: সিভিল
সোসাইটি সংগঠনগুলো সরকারের কাজের নজরদারি করে, স্বচ্ছতা দাবি করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে
চাপ সৃষ্টি করে। এটি সরকারের সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখে ।
- **রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন**: টোকভিল থেকে
মিল পর্যন্ত অনেক তাত্ত্বিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের গণতান্ত্রিক ভূমিকার ওপর জোর
দিয়েছেন। স্থানীয় ক্লাব, সমবায় বা
ফেডারেশনগুলো নাগরিকদের পারস্পরিক আস্থা তৈরি করে এবং যৌথ সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা
বাড়ায়, যা গণতন্ত্রের
সামাজিক ভিত্তি ।
- **গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা**: সিভিল সোসাইটি
সংগঠনগুলো সদস্যদের মধ্যে সহনশীলতা, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতার চর্চা করায়। তবে এ ক্ষেত্রে একটি সতর্কতা জরুরি—যদি
সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিজেই অগণতান্ত্রিক হয়,
তবে তারা গণতান্ত্রিক
মূল্যবোধ শেখাতে ব্যর্থ হয় ।
- **গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চালিকাশক্তি**: ইতিহাসে
ফিলিপাইন, পানামা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং চেকোস্লোভাকিয়ায় সিভিল
সোসাইটির চাপে সরকার পরিবর্তনের নজির রয়েছে । গণতান্ত্রিক রূপান্তরের শুরুর দিকে
সিভিল সোসাইটি অংশগ্রহণের একাধিক চ্যানেল তৈরি করতে পারে, যা পরবর্তীকালে সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে ।
### 🔗
প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক
ভিত্তির সম্পর্ক
গণতন্ত্র কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি
নয়; এটি **নাগরিক সংস্কৃতি ও
সামাজিক পুঁজির** ওপর নির্ভরশীল। পুটনামের মতে, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ঘন নেটওয়ার্ক ও
পারস্পরিক আস্থার নিয়মাবলী (সামাজিক পুঁজি) উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের কর্মক্ষমতাকে
প্রভাবিত করে । সিভিল সোসাইটি এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পরস্পর পরিপূরক—প্রতিষ্ঠান
আইনি কাঠামো দেয়, আর সিভিল সোসাইটি
সেই কাঠামোকে জীবন্ত করে এবং নাগরিকদের সঙ্গে যুক্ত করে।
যদি শুধু নির্বাচনি আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়
কিন্তু সংসদ, বিচার বিভাগ বা
সিভিল সোসাইটির ভূমিকা দুর্বল থাকে, তাহলে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। শাসকরা নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা পেলেও
দায়বদ্ধ না থাকলে প্রকৃত গণতন্ত্র গড়ে ওঠে না।
**গণতান্ত্রিক শাসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকা**
## গণতান্ত্রিক শাসন বলতে কী বোঝায়
গণতান্ত্রিক শাসন এমন শাসনপ্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস জনগণ, শাসক জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন এবং
শাসন চলে অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা,
আইনের শাসন ও মৌলিক
অধিকারের ভিত্তিতে।
আব্রাহাম লিংকনের ভাষায়, গণতন্ত্র হলো জনগণের, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য সরকার। আধুনিক
অর্থে এটি কেবল ভোট নয়; ভোটের পরও ক্ষমতা
যেন নিয়ন্ত্রিত, স্বচ্ছ ও
অধিকারবান্ধব থাকে—সেই পুরো প্রক্রিয়াই গণতান্ত্রিক শাসন।
রবার্ট ডালের মতে, এমন শাসনে অন্তত এগুলো থাকে: নির্বাচিত শাসক,
অবাধ ও নিয়মিত নির্বাচন,
সর্বজনীন ভোটাধিকার,
প্রার্থী হওয়ার অধিকার,
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা,
তথ্যের বিকল্প উৎস এবং
সংগঠনের স্বাধীনতা।
**মূল বৈশিষ্ট্য**
| বৈশিষ্ট্য | অর্থ |
|---|---|
| জনসার্বভৌমত্ব | চূড়ান্ত ক্ষমতা জনগণের |
| অবাধ নির্বাচন | নিয়মিত, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, বহুদলীয় ভোট |
| আইনের শাসন | সবাই আইনের অধীন; স্বাধীন বিচার |
| জবাবদিহিতা | সরকার সংসদ ও জনগণের কাছে দায়ী |
| অধিকার | মত, সংগঠন, ধর্ম ও
ব্যক্তিস্বাধীনতা |
| সংখ্যালঘুর সুরক্ষা | সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসন করলেও সংখ্যালঘু নিপীড়িত
হয় না |
| ক্ষমতা পৃথকীকরণ | আইন, শাসন ও বিচার একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করে |
| বহুত্ববাদ | ভিন্ন মত, দল ও সংগঠনের বৈধ স্থান |
গণতান্ত্রিক সরকার মানে নির্বাচিত শাসক;
গণতান্ত্রিক শাসন মানে
সেই শাসক যেভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন—অধিকার, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণসহ।
## রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হলো সংবিধান, সংসদ, সরকার, বিচার বিভাগ,
নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় সরকারের মতো স্থায়ী
কাঠামো। এগুলো ছাড়া গণতন্ত্র ব্যক্তিনির্ভর থাকে, নিয়মনির্ভর হয় না।
1. **সংবিধান** — ক্ষমতার সীমা, মৌলিক অধিকার এবং সরকার গঠনের নিয়ম বেঁধে
দেয়। সংবিধানই বলে, কে কত ক্ষমতা
পাবে এবং কাকে জবাব দেবে।
2. **নির্বাচন কমিশন** — ভোটার তালিকা, নিরপেক্ষ ভোট ও ফল ঘোষণা নিশ্চিত করে। সুষ্ঠু
নির্বাচন না হলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই থাকে না।
3. **সংসদ** — আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন, সরকারকে প্রশ্ন করা ও নজরদারি। এটি জনগণের
প্রতিনিধিত্বের মূল মঞ্চ।
4. **নির্বাহী বিভাগ** — নীতি ও আইন বাস্তবায়ন করে,
কিন্তু সংসদের আস্থার ওপর
টিকে থাকে। ক্ষমতা থাকলেও মেয়াদ ও জবাবদিহি সীমিত।
5. **স্বাধীন বিচার বিভাগ** — সংবিধান ও আইনের
রক্ষক। স্বেচ্ছাচারী আইন বা আদেশ বাতিল করে নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে।
6. **রাজনৈতিক দল** — জনমত সংগঠিত করে, প্রার্থী দেয়, বিকল্প নীতি তোলে এবং বিরোধী দল হিসেবে সরকারকে
নিয়ন্ত্রণ করে। দল ছাড়া প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্র চলে না।
7. **স্থানীয় সরকার** — ক্ষমতা নিচে নামায়। মানুষ
নিজ এলাকার সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশ নেয়, তাই গণতন্ত্র কেবল রাজধানীতে আটকে থাকে না।
8. **সাংবিধানিক নজরদারি সংস্থা** — নির্বাচন কমিশন,
মহাহিসাব নিরীক্ষক,
দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো
সংস্থা ক্ষমতাকে হিসাবের মধ্যে রাখে।
প্রতিষ্ঠান দুর্বল বা দলীয়করণের শিকার হলে
নির্বাচন হলেও গণতান্ত্রিক শাসন টিকে না।
## সিভিল সোসাইটির ভূমিকা
সিভিল সোসাইটি হলো রাষ্ট্র ও বাজারের বাইরে
নাগরিকদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন—এনজিও, পেশাজীবী সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন,
নাগরিক মঞ্চ, শিক্ষার্থী ও সামাজিক আন্দোলন, গবেষণা সংস্থা এবং স্বাধীন গণমাধ্যম। এটি
সরকারের অংশ নয়, কিন্তু
গণতন্ত্রের অংশ।
1. **নাগরিক শিক্ষা** — ভোটাধিকার, অধিকার ও দায়িত্ব বোঝায়। সচেতন নাগরিক ছাড়া
ভোট আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যায়।
2. **অংশগ্রহণের পথ** — যে মানুষ দলে নেই, সেও সংগঠনের মাধ্যমে দাবি তুলতে পারে।
3. **স্বার্থ প্রকাশ** — শ্রমিক, কৃষক, নারী, সংখ্যালঘু বা
পেশাজীবীর কথা রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেয়।
4. **নজরদারি** — দুর্নীতি, নির্বাচনি অনিয়ম, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ভুল নীতি প্রকাশ করে
সরকারকে চাপে রাখে।
5. **নীতি প্রভাব** — গবেষণা ও আন্দোলনের মাধ্যমে
আইন ও বাজেটে জনস্বার্থ ঢোকায়।
6. **অধিকার রক্ষা** — সংখ্যালঘু, দরিদ্র ও বিপন্ন মানুষের পক্ষে কথা বলে।
সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন যেন স্বৈরচার না হয়, সেই ভারসাম্য রাখে।
7. **সেবা ও সামাজিক মূলধন** — শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ত্রাণ ও স্থানীয় উদ্যোগে সরকারের ঘাটতি পূরণ
করে এবং মানুষে মানুষে বিশ্বাস বাড়ায়।
8. **গণতন্ত্র রক্ষা** — প্রতিষ্ঠান দখল বা ক্ষমতার
অপব্যবহার হলে নাগরিক প্রতিরোধ ও জনমত তৈরি করে।
সিভিল সোসাইটি সরকারের বিকল্প নয়। এটি দলীয়
স্বার্থে ব্যবহৃত হলে বা স্বচ্ছ না হলে নিজেও গণতন্ত্রের ক্ষতি করে।
## দুইয়ের সম্পর্ক
| রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান | সিভিল সোসাইটি |
|---|---|
| ক্ষমতার নিয়ম ও কাঠামো দেয় | নাগরিকের কণ্ঠস্বর ও নজরদারি দেয় |
| আইন করে ও প্রয়োগ করে | আইনের ফাঁক ও অপপ্রয়োগ ধরিয়ে দেয় |
| নির্বাচন পরিচালনা করে | ভোট সচেতনতা ও পর্যবেক্ষণ করে |
| জবাবদিহির আনুষ্ঠানিক পথ | জনমত ও তথ্যের অনানুষ্ঠানিক চাপ |
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় যখন প্রতিষ্ঠান নিয়ম
মানে এবং সিভিল সোসাইটি সেই নিয়ম জীবন্ত রাখে। প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্র
বিশৃঙ্খল; সিভিল সোসাইটি
ছাড়া প্রতিষ্ঠান জনবিচ্ছিন্ন ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে পড়ে।
গণতান্ত্রিক
শাসন: অর্থ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকা
১.
গণতান্ত্রিক শাসন বলতে কী বোঝায়?
গণতান্ত্রিক
শাসন হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের
ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ এবং জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায়
অংশগ্রহণ করে। এখানে জনগণের
মতামত, ভোটাধিকার, আইনের শাসন,
মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক সমতা, জবাবদিহিতা
ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে।
সহজভাবে বলা
যায়, জনগণের অংশগ্রহণ, সম্মতি ও
প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত শাসনব্যবস্থাই গণতান্ত্রিক শাসন।
গণতান্ত্রিক
শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. জনগণের
সার্বভৌমত্ব
২. অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন
৩. রাজনৈতিক বহুত্ববাদ
৪. আইনের শাসন
৫. মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা
৬. মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
৭. সরকারের জবাবদিহিতা
৮. স্বাধীন বিচারব্যবস্থা
৯. বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা
১০. শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর
২. গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠান বলতে
রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝায়। যেমন—সংসদ, রাজনৈতিক দল,
নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, সরকার ও
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান।
ক. সংসদের
ভূমিকা
- জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে।
- আইন প্রণয়ন করে।
- সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করে।
- বাজেট ও সরকারি ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে।
- জনগণের বিভিন্ন দাবি ও সমস্যা রাষ্ট্রের সামনে তুলে
ধরে।
খ. রাজনৈতিক
দলের ভূমিকা
- জনগণের রাজনৈতিক মতামত ও দাবি সংগঠিত করে।
- নির্বাচনে প্রার্থী ও রাজনৈতিক কর্মসূচি উপস্থাপন
করে।
- জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে।
- সরকার গঠন ও বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের মাধ্যমে
ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করে।
- নেতৃত্ব তৈরিতে সহায়তা করে।
গ. নির্বাচন
কমিশনের ভূমিকা
- নির্বাচন পরিচালনা ও তদারকি করে।
- ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও হালনাগাদ করে।
- নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা ও অংশগ্রহণ
নিশ্চিত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করে।
- শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবেশ তৈরিতে
সহায়তা করে।
ঘ. বিচার
বিভাগের ভূমিকা
- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
- নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে।
- আইন ও সরকারি সিদ্ধান্তের বৈধতা বিচার করতে পারে।
- ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
ঙ. স্থানীয়
সরকারের ভূমিকা
- জনগণের কাছাকাছি পর্যায়ে সেবা প্রদান করে।
- স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে।
- তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক চর্চা ও নেতৃত্ব
বিকাশে সহায়তা করে।
৩. গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় সিভিল সোসাইটির ভূমিকা
সিভিল
সোসাইটি (Civil Society) বলতে রাষ্ট্র ও বাজারের বাইরে নাগরিকদের স্বেচ্ছাসেবী ও
স্বাধীন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্ককে বোঝায়। যেমন—বেসরকারি
সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, মানবাধিকার
সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, গবেষণা
প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও নাগরিক উদ্যোগ।
সিভিল
সোসাইটির প্রধান ভূমিকা
১.
জনসচেতনতা সৃষ্টি
নাগরিকদের অধিকার, দায়িত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন করে।
২. জনগণের
দাবি তুলে ধরা
সাধারণ মানুষের সমস্যা ও দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরে এবং নীতিনির্ধারণে
জনগণের মতামত প্রকাশে সহায়তা করে।
৩. সরকারের
ওপর নজরদারি
সরকারি কর্মকাণ্ড, নীতি ও সেবা সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করে এবং অনিয়ম বা
দুর্বলতা সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করে।
৪.
মানবাধিকার রক্ষা
মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো চিহ্নিত, নথিভুক্ত ও
প্রতিকারের দাবি উত্থাপনে ভূমিকা রাখে।
৫.
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ
সহনশীলতা, মতের ভিন্নতার প্রতি শ্রদ্ধা, সংলাপ ও
শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
৬.
নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ
গবেষণা, মতামত, জনশুনানি ও নীতি-আলোচনার মাধ্যমে সরকারের
নীতি প্রণয়নে অবদান রাখতে পারে।
৭. দুর্নীতি
প্রতিরোধে ভূমিকা
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতা গড়ে
তুলতে পারে।
৮.
গণমাধ্যমের ভূমিকা
স্বাধীন গণমাধ্যম জনগণকে তথ্য প্রদান করে এবং রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে।
৯. দুর্যোগ
ও সামাজিক সংকটে সহায়তা
বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক সংকটে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে
সহযোগিতা করে।
৪. রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটির সম্মিলিত ভূমিকা
গণতন্ত্র
শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।
|
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান |
সিভিল সোসাইটি |
|
আইন ও
নীতি প্রণয়ন করে |
নীতি
সম্পর্কে মতামত প্রদান করে |
|
নির্বাচন
ও সরকার পরিচালনা করে |
জনগণকে
সচেতন ও সংগঠিত করে |
|
রাষ্ট্র
পরিচালনা করে |
রাষ্ট্রের
কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে |
|
জনগণের
প্রতিনিধিত্ব করে |
জনগণের
দাবি ও স্বার্থ তুলে ধরে |
|
জবাবদিহিতা
প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা রাখে |
সামাজিক
জবাবদিহিতা সৃষ্টি করে |
উপসংহার
গণতন্ত্র
কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়;
এর জন্য কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন,
নাগরিক অধিকার, জবাবদিহিতা এবং সক্রিয় নাগরিক সমাজ প্রয়োজন। রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক
গণতান্ত্রিক কাঠামো পরিচালনা
করে, আর সিভিল সোসাইটি জনগণের অংশগ্রহণ, সচেতনতা ও
সামাজিক নজরদারির মাধ্যমে সেই কাঠামোকে কার্যকর রাখতে সহায়তা করে। তাই শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন, সক্রিয়
সিভিল সোসাইটির সমন্বয়ই টেকসই গণতান্ত্রিক শাসনের অন্যতম ভিত্তি।
গণতান্ত্রিক
শাসন (Democratic Governance) হলো এমন এক শাসন ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের
সার্বভৌম ক্ষমতা চূড়ান্তভাবে জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে। এই ব্যবস্থায় জনগণ
প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে (নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে) রাষ্ট্র পরিচালনায়
অংশগ্রহণ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতে, "গণতন্ত্র
হলো জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য সরকার।" গণতান্ত্রিক
শাসনে নিয়মিত নির্বাচন, আইনের শাসন, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা,
এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
গণতন্ত্র
কেবল একটি শাসনপ্রণালী নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি আদর্শ। একটি রাষ্ট্রে
টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সিভিল সোসাইটি বা সুশীল
সমাজ—উভয়েরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরিপূরক ভূমিকা রয়েছে।
গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠান বলতে মূলত রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, আইনসভা
(সংসদ), এবং বিচার বিভাগকে বোঝায়। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
দিতে এদের ভূমিকা অনস্বীকার্য:
- রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব তৈরি: রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের বিভিন্ন দাবি ও চাওয়াকে
একত্রিত করে নীতি বা ইশতেহার আকারে তুলে ধরে। তারা জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন
করে, নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে এবং নির্বাচনে বিকল্প
প্রার্থী ও নীতি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়।
- অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন: একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গণতন্ত্রের
প্রাণভোমরা। পেশিশক্তি বা অর্থের প্রভাব মুক্ত রেখে সবার জন্য সমান সুযোগ (Level
playing field) তৈরি করে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ
নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের প্রধান কাজ।
- সংসদ ও আইনসভার কার্যকারিতা: সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের পক্ষে আইন
প্রণয়ন করেন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিতর্ক করেন। একটি কার্যকর
সংসদ নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের কাজের ওপর নজরদারি করে এবং তাদের জবাবদিহিতা
নিশ্চিত করে।
- বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকা: গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে 'ছায়া
সরকার' বলা হয়। সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া, সংসদে সরকারের স্বেচ্ছাচারী আইনের বিরোধিতা করা এবং
রাজপথে জনগণের দাবি আদায়ে সোচ্চার থেকে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা বিরোধী
দলের দায়িত্ব।
- স্বাধীন বিচার বিভাগের রক্ষাকবচ: বিচার বিভাগ সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে।
সরকারের কোনো আইন বা সিদ্ধান্ত যদি নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করে বা
অগণতান্ত্রিক হয়, তবে বিচার বিভাগ তা বাতিল করে আইনের শাসন ও
গণতন্ত্র সমুন্নত রাখে।
গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় সিভিল সোসাইটির (সুশীল সমাজ) ভূমিকা
সিভিল
সোসাইটি বলতে সরকার ও বাণিজ্যিক খাতের বাইরে অবস্থানকারী নাগরিকদের স্বেচ্ছাসেবী
সংগঠন, এনজিও, পেশাজীবী সংগঠন, মানবাধিকার
কর্মী, বুদ্ধিজীবী মহল এবং স্বাধীন গণমাধ্যমকে বোঝায়।
গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে এদের ভূমিকা বহুমুখী:
- সরকারের ওপর নজরদারি (Watchdog Role): সিভিল সোসাইটি ও স্বাধীন গণমাধ্যম রাষ্ট্রের 'চতুর্থ স্তম্ভ' হিসেবে
কাজ করে। সরকারের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, বাজেট
বা প্রশাসনিক কাজে কোনো দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার
অপব্যবহার হচ্ছে কি না, তা জনসমক্ষে তুলে ধরে তারা সরকারকে জবাবদিহি করতে
বাধ্য করে।
- নাগরিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক শিক্ষা: সাধারণ মানুষকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার, ভোটাধিকারের গুরুত্ব এবং রাষ্ট্রের আইন সম্পর্কে
সচেতন করতে সুশীল সমাজ নিরলস কাজ করে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে ভোটারদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে তারা
সহায়তা করে।
- মানবাধিকার ও সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষা: সমাজের পিছিয়ে পড়া, সুবিধাবঞ্চিত,
নারী বা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার যখন হুমকির
মুখে পড়ে, তখন সিভিল সোসাইটি তাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে।
তারা আইনি সহায়তা দেয় এবং রাষ্ট্রকে বৈষম্যমূলক নীতি থেকে সরে আসতে চাপ
প্রয়োগ করে।
- নীতি-নির্ধারণে প্রভাব ও অ্যাডভোকেসি: সুশীল সমাজের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা রাষ্ট্র পরিচালনার
বিভিন্ন জটিল বিষয়ে (যেমন- পরিবেশনীতি, শিক্ষানীতি,
অর্থনৈতিক সংস্কার) সরকারকে তথ্য-উপাত্ত ও গঠনমূলক
পরামর্শ দেন। জনস্বার্থমূলক আইন পাসের জন্য তারা ক্যাম্পেইন বা লবিং করেন।
- নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে সেতুবন্ধন: জনগণ এবং সরকারের মধ্যে অনেক সময় যে দূরত্ব তৈরি
হয়, সিভিল সোসাইটি তা পূরণে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন
করে। সামাজিক অস্থিরতা বা রাজনৈতিক সংঘাতের সময় তারা আলাপ-আলোচনা ও শান্তির
পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করে।
গণতান্ত্রিক
শাসন হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ক্ষমতা জনগণের হাতে
থাকে এবং প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সরকার গঠন ও
পরিচালনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের
সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের মতে, গণতন্ত্র
হলো "জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের
শাসন" (Government of the people, by the people, for the people)। [1,
2, 3]
গণতান্ত্রিক
শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য
- জনগণের সার্বভৌমত্ব: ক্ষমতার উৎস জনগণ; তারা
ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে।
- মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা: নাগরিকদের বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের
স্বাধীনতা ও আইনের চোখে সমতা থাকে।
- নিয়মিত নির্বাচন: অবাধ, নিরপেক্ষ ও
গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সরকার বদলের সুযোগ থাকে।
- আইনের শাসন: আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং সরকারের কর্মকাণ্ড
জবাবদিহিমূলক হয়। [1, 4, 5, 6, 7, 8, 9, 10]
গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
রাজনৈতিক দল,
সংসদ, নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় সরকার হলো গণতন্ত্রের
প্রধান রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। গণতন্ত্র রক্ষায় এদের ভূমিকা নিচে দেওয়া হলো:
[9, 11, 12]
- জনমত গঠন: রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের চাওয়া-পাওয়া ও সমস্যা
তুলে ধরে জনমত গঠন করে।
- নেতৃত্ব তৈরি: রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে যোগ্য, সচেতন ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব বিকাশ ঘটায়।
- সরকারের জবাবদিহি: বিরোধী দল ও সংসদ সরকারের ভুলত্রুটির সমালোচনা করে
এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
- সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন: নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর
মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা হয়।
- সেতু বন্ধন: রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো
একটি কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।
[5, 8]
গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় সিভিল সোসাইটির (নাগরিক সমাজ) ভূমিকা
সিভিল
সোসাইটি বা নাগরিক সমাজ বলতে বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী
সংগঠন, মানবাধিকার গোষ্ঠী, এনজিও,
সামাজিক আন্দোলন এবং গণমাধ্যমকে বোঝায়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এদের ভূমিকা
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: [7, 8]
- নজরদারি ও প্রহরী (Watchdog): সিভিল সোসাইটি সরকারের ক্ষমতা অপব্যবহার, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে কড়া নজরদারি রাখে।
- নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি: সাধারণ মানুষকে তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে
সচেতন করে।
- নির্বাচন পর্যবেক্ষণ: কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত না থেকে
নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
- প্রান্তিক কণ্ঠস্বর তুলে ধরা: সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দাবি-দাওয়া ও
অধিকার রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরে।
- সংলাপ ও সমঝোতা তৈরি: সংকট নিরসনে এবং সামাজিক ঐক্য বজায় রাখতে
মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। [5, 7, 8, 9,
12]
আপনি কি
গণতন্ত্রের কোনো নির্দিষ্ট দিক (যেমন—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বা সুশাসনের
চ্যালেঞ্জ) সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে চান?
[5] https://stage.teachers.gov.bd
[7] https://unmit.unmissions.org
[8] https://diamond-democracy.stanford.edu
[11] https://www.prothomalo.com
নির্বাহী শাসন ও আমলাতন্ত্র কি? এর ভূমিকা বর্ণনা করুন
নির্বাহী শাসন ও আমলাতন্ত্ররাষ্ট্রের তিনটি
বিভাগ - আইন বিভাগ আইন বানায়, বিচার বিভাগ
বিচার করে, আর নির্বাহী
বিভাগ সেই আইনকে বাস্তবায়ন করে। তাই নির্বাহী বিভাগই হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে
দৃশ্যমান অংশ।১. নির্বাহী বিভাগ (Executive) কি?সংজ্ঞা: রাষ্ট্রের যে বিভাগ আইন প্রয়োগ করে, প্রশাসন পরিচালনা করে এবং রাষ্ট্রের দৈনন্দিন
কাজ চালায়, তাকে নির্বাহী
বিভাগ বলে।নির্বাহী বিভাগ ২ প্রকার:ক) রাজনৈতিক নির্বাহী: যারা ভোটে নির্বাচিত।
যেমন - প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী। এরা নীতি নির্ধারণ করেন। এদের
মেয়াদ ৫ বছর।খ) স্থায়ী নির্বাহী বা আমলাতন্ত্র: যারা পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পায়।
যেমন - সচিব, ডিসি, ইউএনও, এসপি। এরা নীতি বাস্তবায়ন করে। এরা আজীবন চাকরি করে, সরকার বদলালেও থাকে।সহজ উদাহরণ: মন্ত্রী বললেন
"সবাইকে টিকা দিতে হবে" - এটা নীতি। আর সচিব, ডিসি, ডাক্তাররা মাঠে গিয়ে টিকা দিলেন - এটা বাস্তবায়ন। মন্ত্রী হলেন রাজনৈতিক
নির্বাহী, সচিব হলেন
স্থায়ী নির্বাহী বা আমলা।২. আমলাতন্ত্র (Bureaucracy) কি?Bureaucracy শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ Bureau থেকে, যার অর্থ টেবিল।ম্যাক্স ওয়েবারের সংজ্ঞা অনুযায়ী আমলাতন্ত্র হলো: "একটি
সুশৃঙ্খল, পদানুক্রমিক,
নিয়মভিত্তিক ও দক্ষ
প্রশাসন ব্যবস্থা যেখানে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়।"আমলাতন্ত্রের ৬টি
বৈশিষ্ট্য - ওয়েবারের মডেল:পদসোপান (Hierarchy): উপর থেকে নিচ পর্যন্ত স্তর - সচিব > অতিরিক্ত সচিব > যুগ্ম সচিব > ডিসি > ইউএনওনিয়ম-কানুন: সব কাজ লিখিত নিয়মে চলে।
ফাইলে নোট দিতে হয়।যোগ্যতা: BCS পরীক্ষা দিয়ে
মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ।নিরপেক্ষতা: আমলা কোনো দলের নয়, রাষ্ট্রের কর্মচারী।স্থায়িত্ব: সরকার বদলালেও
আমলা থাকে।লিখিত দলিল: সব কাজ নথিভুক্ত থাকে।আমলাতন্ত্র ২ প্রকার:সাধারণ
আমলাতন্ত্র: প্রশাসন ক্যাডার, পুলিশ।বিশেষজ্ঞ
আমলাতন্ত্র: ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার,
কৃষিবিদ।৩. নির্বাহী শাসন
ও আমলাতন্ত্রের ভূমিকাবাংলাদেশে সরকারের ৯০% কাজ এই নির্বাহী বিভাগই করে।ক) নীতি
বাস্তবায়নে ভূমিকা:
সংসদ আইন পাস করে, কিন্তু তা মাঠে নামায় আমলারা। যেমন - শিক্ষা
নীতি পাস হয়েছে, এখন স্কুলে বই
পৌঁছানো, শিক্ষক নিয়োগ সব
করবে আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্র ছাড়া সরকার অচল।খ) উন্নয়ন প্রশাসন:
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, আশ্রয়ণ প্রকল্প - সব বড় উন্নয়ন প্রকল্প
বাস্তবায়ন করে আমলারা। ডিসি অফিস থেকে প্রকল্পের টাকা ছাড় হয়।গ) আইন-শৃঙ্খলা
রক্ষা:
পুলিশ, RAB, আনসার - এরা সব নির্বাহী বিভাগের অংশ। হরতাল,
নির্বাচনে শান্তি রক্ষা
করে।ঘ) রাজস্ব আদায় ও বাজেট বাস্তবায়ন:
NBR, কাস্টমস ট্যাক্স আদায় করে। সেই টাকায় দেশ
চলে। বাজেট কিভাবে খরচ হবে তা সচিবালয় ঠিক করে।ঙ) জনসেবা প্রদান:
জন্ম নিবন্ধন, NID, পাসপোর্ট, ভূমির খাজনা, খাস জমি বণ্টন - সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের কাজ
আমলাতন্ত্রের হাতে।চ) সংকট মোকাবিলা:
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, করোনা মহামারীর
সময় নির্বাহী বিভাগই সামনে থাকে। ২০২০ সালে করোনায় ডিসি-ইউএনওরাই ত্রাণ বিতরণ
করেছে।ছ) সরকারকে পরামর্শ দেওয়া:
মন্ত্রীরা রাজনীতিবিদ, তারা সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন। সচিবরা ফাইল তৈরি
করে, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে
মন্ত্রীকে পরামর্শ দেন। তাই বলা হয় - "মন্ত্রী আসে যায়, সচিব থেকে যায়।"৪. সমস্যা ও সমালোচনা -
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটআমলাতন্ত্রের খারাপ দিকও আছে, যাকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বলে:লাল ফিতার
দৌরাত্ম্য (Red Tapism): ফাইল আটকে রাখা,
এক টেবিল থেকে আরেক
টেবিলে ঘোরা।দুর্নীতি: ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না - এটি সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড়
অভিযোগ।জনবিচ্ছিন্নতা: আমলারা নিজেদের শাসক মনে করে, সেবক মনে করে না।রাজনৈতিকীকরণ: ৯০-এর পর থেকে
আমলাতন্ত্র দলীয় হয়ে গেছে। যে দল ক্ষমতায়, তার অনুগত আমলারা ভালো পদ পায়।দায়িত্ব
এড়ানো: "উপরের নির্দেশ" বলে দায় এড়ানো।উপসংহার:
নির্বাহী বিভাগ ও আমলাতন্ত্র হলো রাষ্ট্রের
ইঞ্জিন। ইঞ্জিন ভালো হলে গাড়ি চলবে, খারাপ হলে থেমে যাবে। বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে কারণ আমলাতন্ত্র কাজ করছে,
কিন্তু সুশাসন হচ্ছে না
কারণ আমলাতন্ত্র জনগণের কাছে জবাবদিহি করছে না, শুধু রাজনৈতিক সরকারের কাছে করছে। তাই প্রয়োজন
- আমলাতন্ত্রকে নিরপেক্ষ, দক্ষ ও জনবান্ধব
করা।
নির্বাহী
শাসন হলো সরকারের সেই শাখা যা আইনসভা কর্তৃক গৃহীত আইন ও নীতিসমূহ বাস্তবায়নের
জন্য দায়ী এবং রাষ্ট্রের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করে। আমলাতন্ত্র হলো রাষ্ট্রের স্থায়ী, বেতনভুক্ত,
দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন, যারা
নির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও ক্রমোচ্চ শ্রেণিকাঠামোর মাধ্যমে সরকারি কার্যাবলি সম্পাদন
করে।[en.wikipedia][sathee.iitk.ac][bn.wikipedia][edunewsbd24][sahajpora]
নির্বাহী
শাসনের সংজ্ঞা ও গঠন
নির্বাহী
শাসন (Executive Branch) সরকারের তিনটি মূল অঙ্গের (আইনসভা, নির্বাহী,
বিচার বিভাগ) মধ্যে একটি। এটি মূলত
দুই অংশে বিভক্ত:[sathee.iitk.ac]
১. রাজনৈতিক
নির্বাহী (Political Executive)
- রাষ্ট্রপ্রধান: বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি (প্রতীকী প্রধান)।[en.wikipedia]
- প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা: প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধান; মন্ত্রিসভা নীতি নির্ধারণ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
গ্রহণ করে।[en.wikipedia][studocu]
- মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী,
উপমন্ত্রী: বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের রাজনৈতিক প্রধান।[en.wikipedia][studocu]
২.
প্রশাসনিক নির্বাহী বা আমলাতন্ত্র (Administrative Executive/Bureaucracy)
- সচিব, অতিরিক্ত
সচিব, যুগ্মসচিব: মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী প্রধান।[en.wikipedia][studocu]
- উপসচিব, সহকারী
সচিব: নীতি
বাস্তবায়নে সহায়ক।[studocu]
- মাঠ পর্যায়ের আমলা: জেলা প্রশাসক, উপজেলা
নির্বাহী অফিসার, পুলিশ সুপার ইত্যাদি।[en.wikipedia][studocu]
বাংলাদেশে
নির্বাহী বিভাগ প্রধানত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা,
মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, সিভিল সার্ভিস এবং বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর ও
সংস্থাকে নিয়ে গঠিত।[en.wikipedia][studocu]
আমলাতন্ত্রের
সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য
আমলাতন্ত্র
(Bureaucracy) শব্দটি ফরাসি 'bureau' (লেখার
টেবিল/দপ্তর) ও 'kratos' (শাসন) থেকে এসেছে; অর্থ
"দপ্তর সরকার"।[edunewsbd24][ittefaq.com]
সংজ্ঞা
- ম্যাক্স ওয়েবার: আমলাতন্ত্র হলো এমন একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক
ব্যবস্থা যা নির্দিষ্ট নিয়ম, শ্রম বিভাজন এবং
স্তরভিত্তিক কর্তৃত্বের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।[edunewsbd24][sattacademy]
- সাধারণ সংজ্ঞা: যে শাসনব্যবস্থায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের
পরিবর্তে স্থায়ী, বেতনভুক্ত ও প্রশিক্ষিত সরকারি কর্মকর্তারা
নির্দিষ্ট নিয়মকানুন এবং ক্রমোচ্চ শ্রেণিকাঠামোর মাধ্যমে সরকারের কার্যাবলি
পরিচালনা করেন, তাকে আমলাতন্ত্র বলে।[edunewsbd24][shikhaprotidin]
আমলাতন্ত্রের
মূল বৈশিষ্ট্য
|
বৈশিষ্ট্য |
ব্যাখ্যা |
|
স্থায়িত্ব |
রাজনৈতিক
সরকার পরিবর্তিত হলেও আমলাগণ পদ হারায় না; ধারাবাহিকতা
বজায় থাকে। [bn.wikipedia][edunewsbd24][dailyjanakantha] |
|
পেশাদারিত্ব |
মেধাভিত্তিক
নিয়োগ, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতাভিত্তিক পদোন্নতি।
[edunewsbd24][shikhaprotidin][sattacademy] |
|
ক্রমোচ্চ
কর্তৃত্ব (Hierarchy) |
স্পষ্ট
পদমর্যাদা ও কর্তৃত্বের শ্রেণিবিন্যাস; নিম্নপদস্থ
ঊর্ধ্বতনের আদেশ মানে। [edunewsbd24][lxnotes][sattacademy] |
|
নিয়মকানুনভিত্তিক |
লিখিত
নিয়ম, বিধি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কাজ; ব্যক্তিগত
পছন্দ-অপছন্দ নয়। [edunewsbd24][ndnanews][sattacademy] |
|
রাজনৈতিক
নিরপেক্ষতা |
আমলাগণ
কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুগত নয়; সরকারি নীতি বাস্তবায়নে নিরপেক্ষ।
[bn.wikipedia][dailyjanakantha][sattacademy] |
|
বেতনভুক্ত |
সরকারি
বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পায়; ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়। [ittefaq.com][edunewsbd24][shikhaprotidin] |
|
বিশেষায়ন |
কাজের ধরন
অনুযায়ী বিভাগ, অধিদপ্তর ও ইউনিটে ভাগ; বিশেষজ্ঞতা
গড়ে ওঠে। [edunewsbd24][ndnanews] |
নির্বাহী
শাসনের ভূমিকা
নির্বাহী
বিভাগ রাষ্ট্র পরিচালনায় বহুমুখী ভূমিকা পালন করে:
১. আইন ও
নীতি বাস্তবায়ন
- আইনসভা কর্তৃক গৃহীত আইন ও নীতিসমূহ বাস্তবায়নের
মূল দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের।[en.wikipedia][sathee.iitk.ac][studocu]
- মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসূচি
বাস্তবায়ন।[en.wikipedia]
২.
প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা
- দেশের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ (ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা) পরিচালনা।[sathee.iitk.ac][studocu]
- সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি ও তদারকি।[studocu]
৩. নীতি
প্রণয়নে সহায়তা
- মন্ত্রীদের তথ্য, বিশ্লেষণ
ও বিকল্প নীতি সুপারিশ প্রদান।[studocu][jetir]
- দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নে সহায়তা।[en.wikipedia][studocu]
৪.
আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষা
- পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তা
ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা।[sathee.iitk.ac][studocu]
- জরুরি অবস্থা বা সংকটে সামরিক ও বেসামরিক ব্যবস্থা
গ্রহণ।[studocu]
৫. আর্থিক
ব্যবস্থাপনা
- জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব
সংগ্রহ ও সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ।[en.wikipedia][studocu]
- অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয়
রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক নীতি পরিচালনা।[en.wikipedia]
৬. জনসেবা
প্রদান
- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো
উন্নয়নসহ জনকল্যাণমুখী সেবা প্রদান।[en.wikipedia][jetir]
- ভূমি সেবা, পাসপোর্ট,
জন্মনিবন্ধন, ট্রেড
লাইসেন্স ইত্যাদি।[studocu]
৭. বৈদেশিক
সম্পর্ক ও কূটনীতি
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক, চুক্তি ও কূটনৈতিক কাজ পরিচালনা।[en.wikipedia]
- আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রতিনিধিত্ব।[en.wikipedia]
৮. জরুরি
ব্যবস্থাপনা
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী,
যুদ্ধ বা সংকটে দ্রুত পদক্ষেপ ও ত্রাণ কার্যক্রম।[studocu]
আমলাতন্ত্রের
ভূমিকা
আমলাতন্ত্র
আধুনিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ; এর ভূমিকা বহুমুখী:[dailyjanakantha][sattacademy]
১. নীতি
বাস্তবায়নের মূল যন্ত্র
- মন্ত্রিসভা ও মন্ত্রীদের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও নীতি
বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব আমলাদের।[en.wikipedia][sattacademy][jetir]
- আইন ও বিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মসূচি পরিচালনা।[jetir]
২.
মন্ত্রীদের পরামর্শদাতা
- মন্ত্রীদের পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক তথ্য প্রদান; নীতি বিকল্প বিশ্লেষণ ও সুপারিশ।[studocu][jetir]
- বাজেট, প্রকল্প ও
কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা।[jetir]
৩. সরকারি
হিসাব ও জবাবদিহিতা
- মন্ত্রীদের ও সংসদের কাছে কাজের হিসাব দেওয়া;
বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা।[studocu][jetir]
- সরকারি তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।[jetir]
৪.
ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা
- রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তিত হলেও আমলাতন্ত্রের
মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।[bn.wikipedia][dailyjanakantha]
- দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রকল্পের ধারাবাহিক
বাস্তবায়ন।[dailyjanakantha]
৫. জনগণের
সাথে সরাসরি যোগাযোগ
- মাঠ পর্যায়ের আমলা (ডিসি, ইউএনও, থানা অফিসার)
জনগণের সমস্যার সমাধান করে।[en.wikipedia][studocu]
- ভূমি জরিপ, দাগনামা,
ত্রাণ বিতরণ, টিকা
কর্মসূচি ইত্যাদি।[studocu]
৬. উন্নয়ন
ও দারিদ্র্য বিমোচন
- সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প (সড়ক, সেতু, বিদ্যালয়, হাসপাতাল) বাস্তবায়ন।[sattacademy][jetir]
- সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি (ভাতা, কর্মসংস্থান, ঋণ)
পরিচালনা।[jetir]
৭. আইন
প্রণয়নে সহায়তা
৮. সংকট
ব্যবস্থাপনা
- দুর্যোগ, মহামারী,
শরণার্থী সংকটে ত্রাণ, পুনর্বাসন
ও সমন্বয় কাজ।[studocu]
বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে
নির্বাহী শাসন ও আমলাতন্ত্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তবে কিছু
চ্যালেঞ্জও রয়েছে:
ইতিবাচক
দিক:
- দ্রুত উন্নয়ন: মেগা প্রকল্প (পদ্মা সেতু, মেট্রো, কর্ণফুলী টানেল)
বাস্তবায়নে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা।[en.wikipedia]
- ডিজিটাল সরকার: ই-নথি, ই-ফাইল, অনলাইন সেবা (৩৩৩, অভিযোগ.গভ.বিডি)।[studocu]
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: ঘূর্ণিঝড়, বন্যায়
দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন।[studocu]
চ্যালেঞ্জ:
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা:
দীর্ঘসূত্রিতা, ফাইল
জট, সেবা গ্রহীতাদের হয়রানি।[ittefaq.com][teachers.gov]
- রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: আমলাদের পদোন্নতি-বদলিতে রাজনৈতিক প্রভাব।[dailyjanakantha]
- দক্ষতার অভাব: প্রশিক্ষণের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত
দক্ষতার কমতি।[ndnanews][teachers.gov]
- দুর্নীতি: ঘুষ, তদবির, অনিয়ম।[ittefaq.com][ndnanews]
উপসংহার
নির্বাহী
শাসন ও আমলাতন্ত্র আধুনিক রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড; এগুলো ছাড়া
আইন বাস্তবায়ন, জনসেবা ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। তবে
আমলাতন্ত্রকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব করে তুলতে
সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।[en.wikipedia][dailyjanakantha][sattacademy][ndnanews][teachers.gov]
নির্বাহী
শাসন ও আমলাতন্ত্র: ধারণা ও ভূমিকা
ভূমিকা
আইন তৈরি
করলেই রাষ্ট্র চলে না, সেই আইন ও নীতি মাঠপর্যায়ে কার্যকর করতে হয়। এই
বাস্তবায়নের দায়িত্ব যে বিভাগের, তাকে বলা হয় নির্বাহী বিভাগ। আর নির্বাহী
বিভাগের প্রশাসনিক যন্ত্র হিসেবে যে সংগঠিত কর্মকর্তা-কর্মচারী কাঠামো কাজ করে,
তা-ই আমলাতন্ত্র। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিক নির্ধারণ করে, আর
আমলাতন্ত্র সেই দিকনির্দেশনাকে বাস্তবে রূপ দেয়।
নির্বাহী
শাসন কী
নির্বাহী
শাসন (Executive Governance) বলতে সরকারের সেই অংশকে বোঝায়, যা আইনসভা
প্রণীত আইন ও গৃহীত নীতি বাস্তবায়ন করে, রাষ্ট্রের
দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করে এবং জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়।
নির্বাহী
বিভাগের দুটি অংশ রয়েছে:
- রাজনৈতিক নির্বাহী: রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভা। এঁরা
নির্বাচিত বা নির্বাচিতদের মধ্য থেকে মনোনীত, নীতি
নির্ধারণ করেন এবং জনগণ ও সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।
- স্থায়ী নির্বাহী: সচিব থেকে শুরু করে নিচের স্তরের সরকারি
কর্মকর্তা-কর্মচারী, অর্থাৎ আমলাতন্ত্র। এঁরা সরকার বদলালেও চাকরিতে
বহাল থাকেন।
বাংলাদেশের
সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর
নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে ন্যস্ত এবং মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে সংসদের কাছে
দায়ী।
নির্বাহী
শাসনের বৈশিষ্ট্য
নির্বাহী
শাসন আইন ও নীতির বাস্তবায়নের ওপর কেন্দ্রীভূত। এটি শ্রেণিবদ্ধ কাঠামোতে পরিচালিত
হয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য রাখে, রাষ্ট্রের
সম্পদ ও বলপ্রয়োগের বৈধ ক্ষমতা ব্যবহার করে এবং সংসদ, আদালত ও
জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।
আমলাতন্ত্র
কী
আমলাতন্ত্র
(Bureaucracy) শব্দটি ফরাসি bureau
(দপ্তর) ও গ্রিক kratos (শাসন) থেকে
এসেছে, অর্থাৎ দপ্তরের শাসন। সংজ্ঞায় বলা যায়, আমলাতন্ত্র
হলো নির্দিষ্ট নিয়মকানুন, শ্রেণিবিন্যাস ও কাজের বিভাজনের ভিত্তিতে গঠিত একটি
সুসংগঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যেখানে নিয়োগপ্রাপ্ত পেশাদার কর্মকর্তারা সরকারি নীতি
বাস্তবায়ন করেন।
জার্মান
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার আমলাতন্ত্রকে আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত
ও দক্ষ প্রশাসনিক রূপ বলে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর মতে আদর্শ আমলাতন্ত্রের
বৈশিষ্ট্য হলো:
১.
শ্রেণিবিন্যাস: উপর থেকে
নিচ পর্যন্ত সুস্পষ্ট কর্তৃত্বের ক্রম, যেখানে অধস্তন ঊর্ধ্বতনের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
২. কাজের
বিশেষায়ন ও শ্রমবিভাজন: প্রতিটি পদ
ও দপ্তরের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও এখতিয়ার।
৩. লিখিত
নিয়ম ও বিধিবিধান: সব কাজ
নির্ধারিত নিয়মে সম্পন্ন হয়, ব্যক্তিগত খেয়ালে নয়।
৪.
নৈর্ব্যক্তিকতা: ব্যক্তিগত
পছন্দ-অপছন্দ নয়, বরং নিয়মের ভিত্তিতে সবার সঙ্গে সমান আচরণ।
৫. মেধা ও
যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ: প্রতিযোগিতামূলক
পরীক্ষা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি।
৬. স্থায়ী
চাকরি ও বেতনভিত্তিক পেশা: নির্দিষ্ট
বেতন কাঠামো, চাকরির নিরাপত্তা ও অবসরের সুবিধা।
৭. লিখিত
নথিপত্র সংরক্ষণ: সিদ্ধান্ত ও
কার্যক্রমের নথি রাখা।
৮. রাজনৈতিক
নিরপেক্ষতা: আমলারা
সরকারি দল নির্বিশেষে আইনসঙ্গত নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন।
নির্বাহী
শাসনের ভূমিকা
১. আইন ও
নীতি বাস্তবায়ন: সংসদ যে আইন
পাস করে, তা মাঠে কার্যকর করা নির্বাহী বিভাগের প্রধান দায়িত্ব।
২. নীতি
প্রণয়নে নেতৃত্ব: মন্ত্রিসভা
অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্রসহ বিভিন্ন খাতে নীতির
খসড়া তৈরি করে সংসদে উপস্থাপন করে। অধিকাংশ বিলই সরকারি উদ্যোগে আসে।
৩.
আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা: পুলিশ ও
অন্যান্য বাহিনীর মাধ্যমে জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৪.
প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র সম্পর্ক পরিচালনা: সশস্ত্র
বাহিনী পরিচালনা, কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা এবং চুক্তি সম্পাদন।
৫. বাজেট
প্রণয়ন ও অর্থ ব্যবস্থাপনা: রাজস্ব
সংগ্রহ, বাজেট তৈরি ও সরকারি অর্থের ব্যয় ব্যবস্থাপনা।
৬.
অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনা: পঞ্চবার্ষিক
পরিকল্পনা, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
পরিচালনা।
৭. নিয়োগ ও
প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনা: উচ্চপদে
নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সমন্বয়।
৮. জরুরি
অবস্থায় সাড়া: দুর্যোগ,
মহামারি বা সংকটে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ।
আমলাতন্ত্রের
ভূমিকা
১. নীতি
বাস্তবায়ন: সরকারের
গৃহীত নীতি ও আইনকে কর্মসূচি ও সেবায় রূপান্তর করা আমলাতন্ত্রের মূল কাজ। বিভাগ,
জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত প্রশাসনিক কাঠামো এ কাজ করে।
২. নীতি
প্রণয়নে পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা: মন্ত্রীরা
সাধারণত বিশেষজ্ঞ নন। আমলারা তথ্য, বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা ও
খসড়া সরবরাহ করে নীতি-নির্ধারণে সহায়তা করেন।
৩. জনসেবা
প্রদান: জন্মনিবন্ধন, ভূমি
রেজিস্ট্রেশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ট্যাক্স ও
লাইসেন্সের মতো সেবা নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
৪.
প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা: সরকার
বদলালেও আমলাতন্ত্র স্থায়ী থাকে বলে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায়
থাকে।
৫.
আইনশৃঙ্খলা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা: জেলা
প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে স্থানীয় শৃঙ্খলা রক্ষা, ভূমি
প্রশাসন ও রাজস্ব আদায়।
৬. উন্নয়ন
প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন: অবকাঠামো,
কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প প্রণয়ন, তদারকি ও
মূল্যায়ন।
৭. নির্বাচন
ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা: নির্বাচন
পরিচালনা, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসনে প্রশাসনের ভূমিকা।
৮. সরকার ও
জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন: জনগণের
সমস্যা ও চাহিদা সরকারের কাছে এবং সরকারি সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
৯.
আন্তর্জাতিক সমন্বয়: উন্নয়ন-সহযোগী
ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে ভূমিকা রাখা।
আমলাতন্ত্রের
সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা
আমলাতন্ত্রের
কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। অতিরিক্ত নিয়মনির্ভরতা থেকে লাল ফিতার
দৌরাত্ম্য ও সিদ্ধান্তে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। ক্ষমতার
অপব্যবহার, দুর্নীতি, জনগণের প্রতি অসংবেদনশীলতা, পরিবর্তনে
অনীহা এবং রাজনৈতিক দলীয়করণের প্রবণতাও দেখা যায়। অনেক সময় নির্বাচিত না হয়েও
আমলারা নীতিনির্ধারণে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করেন, যা
গণতান্ত্রিক জবাবদিহির জন্য উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশে
উপনিবেশিক আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কেন্দ্রীভূত ও শ্রেণিবদ্ধ প্রশাসনিক
কাঠামো, পদোন্নতি ও পদায়নে দলীয় প্রভাব এবং জবাবদিহির দুর্বলতা
আমলাতন্ত্রের কার্যকারিতায় বাধা সৃষ্টি করে।
সংস্কারের
দিকনির্দেশ
আমলাতন্ত্রকে
কার্যকর ও জনমুখী করতে মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ-পদোন্নতি, রাজনৈতিক
প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব, ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ক্ষমতার
বিকেন্দ্রীকরণ, তথ্য অধিকারের কার্যকর প্রয়োগ, নাগরিক সনদ
ও গণশুনানি এবং নৈতিকতা ও সেবামূলক মনোভাব গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ জরুরি।
উপসংহার
নির্বাহী
শাসন ও আমলাতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাণশক্তি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিক নির্ধারণ
করে, আর আমলাতন্ত্র সেই দিককে সেবা ও উন্নয়নে রূপ দেয়। তবে এই ক্ষমতা তখনই
কল্যাণকর, যখন তা আইন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কাঠামোর মধ্যে
প্রয়োগ হয়। দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জনসেবামুখী আমলাতন্ত্র এবং জবাবদিহিমূলক
নির্বাহী বিভাগই সুশাসন ও গণতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তি।
নির্বাহী শাসন ও আমলাতন্ত্র হলো আধুনিক রাষ্ট্র
পরিচালনার দুটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। নির্বাহী শাসন হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা
বাস্তবায়নের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, আর আমলাতন্ত্র
হলো সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো। একটি গণতান্ত্রিক
ব্যবস্থায় নির্বাহী শাসন রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অধীন, আর আমলাতন্ত্র পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার
ভিত্তিতে কাজ করে।
### ⚖️
নির্বাহী শাসন কী
নির্বাহী শাসন (Executive Governance) বলতে রাষ্ট্র পরিচালনার সেই অংশকে বোঝায়,
যা **আইন প্রণয়নের পর তা
বাস্তবায়ন, নীতিমালা
নির্ধারণ এবং দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনার** দায়িত্ব পালন করে। এটি মূলত দুই ধরনের
হতে পারে:
- **রাজনৈতিক নির্বাহী**: রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা—যারা নির্বাচনের
মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে এবং জনগণের কাছে রাজনৈতিকভাবে জবাবদিহি করে।
- **স্থায়ী নির্বাহী (আমলাতন্ত্র)**: সরকারি
কর্মকর্তারা—যারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে থেকে প্রশাসন পরিচালনা করেন এবং
পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করেন।
নির্বাহী শাসনের মূল কাজ হলো **নীতি নির্ধারণ,
বাজেট প্রণয়ন, আইন বাস্তবায়ন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনসেবা নিশ্চিত করা**।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেগ ও হারোপের মতে, নির্বাহী শাসনের ক্ষমতা ক্রমবর্ধমান, কারণ আধুনিক রাষ্ট্রে কল্যাণমূলক কার্যাবলি বৃদ্ধির সঙ্গে নির্বাহীর ভূমিকাও
বেড়েছে।
### 🏛️
আমলাতন্ত্র কী
আমলাতন্ত্র (Bureaucracy) হলো রাষ্ট্রের **স্থায়ী প্রশাসনিক সংগঠন**,
যা নির্বাহী শাসনের
সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে এবং জনগণের সঙ্গে সরকারের সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করে।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার আমলাতন্ত্রের একটি আদর্শ কাঠামো তুলে ধরেছেন,
যার বৈশিষ্ট্য হলো:
- **পদক্রমিক কাঠামো (Hierarchy)**: নির্দিষ্ট পদমর্যাদা ও নিয়ন্ত্রণ-শৃঙ্খল।
- **লিখিত নিয়ম (Written Rules)**: সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুস্পষ্ট বিধি-নিষেধ।
- **পেশাদারিত্ব ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ**: যোগ্যতা ও
পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ।
- **নিরপেক্ষতা ও অরাজনৈতিক ভূমিকা**: রাজনৈতিক
পরিবর্তনেও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা রক্ষা।
- **বেতনভিত্তিক স্থায়ী কর্মজীবন**: নির্দিষ্ট
বেতনক্রম ও অবসর সুবিধা।
### 🎯
নির্বাহী শাসনের ভূমিকা
নির্বাহী শাসনের ভূমিকা নিম্নরূপ:
- **নীতি নির্ধারণ ও পরিকল্পনা**: জাতীয় উন্নয়ন ও
জনস্বার্থে নীতি গ্রহণ এবং বাজেট তৈরি করে।
- **আইন বাস্তবায়ন**: সংসদে পাশ হওয়া আইন
প্রশাসনের মাধ্যমে কার্যকর করে।
- **আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা**: পুলিশ, সেনা ও অন্যান্য বাহিনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের
নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
- **জনসেবা ও কল্যাণ**: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে সেবা পৌঁছে দেয়।
- **আন্তর্জাতিক সম্পর্ক**: কূটনৈতিক ও
পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে।
- **সংকট ব্যবস্থাপনা**: দুর্যোগ, মহামারি বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত
সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা নেয়।
### ⚙️
আমলাতন্ত্রের ভূমিকা
আমলাতন্ত্রের ভূমিকা বহুমুখী:
- **নীতির বাস্তবায়ন**: মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত মাঠ
পর্যায়ে কার্যকর করে।
- **নীতির পরামর্শ**: মন্ত্রীদের কাছে তথ্য,
পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ
সরবরাহ করে নীতি গঠনে সহায়তা করে।
- **প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা**: সরকার পরিবর্তন হলেও
প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
- **জনগণের সেবা**: নাগরিক সেবা, লাইসেন্স, সনদ ও সুবিধা প্রদান করে।
- **স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা**: তথ্য অধিকার, শুদ্ধাচার কৌশল ও অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
- **স্থিতিশীলতার রক্ষক**: রাজনৈতিক সংকটকালে
প্রশাসনিক ব্যবস্থা সচল রাখে।
### 🔗
নির্বাহী শাসন ও
আমলাতন্ত্রের সম্পর্ক
নির্বাহী শাসন ও আমলাতন্ত্র পরস্পর নির্ভরশীল।
নির্বাহী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দেয়, আর আমলাতন্ত্র তা
বাস্তবায়ন করে। তবে দুটির মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন—আমলাতন্ত্র অতিরিক্ত শক্তিশালী
হয়ে স্বেচ্ছাচারী হলে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়; আবার নির্বাহীর অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে
আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সঠিক ভারসাম্য রক্ষা হলে
সুশাসন ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
### 🇧🇩
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে
সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন
বাংলাদেশে নির্বাহী শাসন মূলত প্রধানমন্ত্রী ও
মন্ত্রিসভাকেন্দ্রিক, আর আমলাতন্ত্র
পরিচালিত হয় সচিবালয় ও মাঠ প্রশাসনের মাধ্যমে। চ্যালেঞ্জগুলো হলো: রাজনৈতিক
হস্তক্ষেপ, আমলাতান্ত্রিক
জটিলতা, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার
অভাব। সুশাসন ও উন্নয়নের জন্য নির্বাহীর রাজনৈতিক জবাবদিহিতা এবং আমলাতন্ত্রের
পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা একইসঙ্গে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
**নির্বাহী শাসন ও আমলাতন্ত্র: সংজ্ঞা ও ভূমিকা**
নির্বাহী শাসন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত ও আইন
কার্যকর করার রাজনৈতিক অংশ। আমলাতন্ত্র সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের স্থায়ী
প্রশাসনিক যন্ত্র। নির্বাচিত শাসক নীতি দেন; আমলারা সেই নীতি চালান।
## নির্বাহী শাসন কী
সরকারের যে অঙ্গ আইন প্রণয়ন করে না, বিচারও করে না, বরং আইন, নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে এবং রাষ্ট্রের
দৈনন্দিন শাসন চালায়, তাকে **নির্বাহী
শাসন** বা নির্বাহী বিভাগ বলে।
সংসদীয় ব্যবস্থায় (যেমন বাংলাদেশে) নির্বাহী
দুই স্তরের—
| স্তর | কে | ক্ষমতার ধরন |
|---|---|---|
| নামসর্বস্ব নির্বাহী | রাষ্ট্রপতি | সাংবিধানিক প্রধান; অধিকাংশ ক্ষমতা মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শে |
| প্রকৃত নির্বাহী | প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ | নীতি, প্রশাসন ও সংসদে জবাবদিহির আসল দায়িত্ব |
রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিই প্রকৃত
নির্বাহী; তিনি আইনসভার
কাছে সরাসরি দায়ী নন।
**বৈশিষ্ট্য:** নীতি নির্ধারণ, আইন প্রয়োগ, সমগ্র দেশের ওপর কর্তৃত্ব, সংসদীয় পদ্ধতিতে আইনসভার কাছে জবাবদিহি,
এবং আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে
কাজ সম্পন্ন করা।
### নির্বাহী শাসনের ভূমিকা
1. **নীতি নির্ধারণ** — শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রে রাষ্ট্র কোন দিকে যাবে,
তা ঠিক করে।
2. **আইন বাস্তবায়ন** — সংসদে পাস হওয়া আইন মাঠে
প্রয়োগ করে। আইন নিজে কিছু করে না; নির্বাহী না চালালে তা কাগজেই থাকে।
3. **শান্তি ও শৃঙ্খলা** — পুলিশ, প্রশাসন ও প্রতিরক্ষার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ
শান্তি এবং বহিঃশত্রুর মোকাবিলা করে।
4. **অর্থ ব্যবস্থাপনা** — বাজেট প্রস্তাব, কর আদায়, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প চালায়।
5. **পররাষ্ট্র ও চুক্তি** — অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে
সম্পর্ক, সন্ধি ও
আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রতিনিধিত্ব।
6. **নিয়োগ** — প্রশাসন, কূটনীতি ও সাংবিধানিক পদে নিয়োগের প্রস্তাব বা
সিদ্ধান্ত।
7. **অধ্যাদেশ ও বিধি** — সংসদ অধিবেশনে না থাকলে
জরুরি অধ্যাদেশ এবং আইনের আওতায় বিস্তারিত বিধি তৈরি।
8. **নেতৃত্ব** — সংকট, দুর্যোগ বা যুদ্ধে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও দেশকে
দিকনির্দেশনা।
9. **জবাবদিহি** — সংসদীয় পদ্ধতিতে মন্ত্রিসভা
সংসদের আস্থা হারালে ক্ষমতা ছাড়ে। নির্বাহী ক্ষমতাশালী হলেও মেয়াদ ও জবাবদিহির
বাইরে নয়।
## আমলাতন্ত্র কী
**আমলাতন্ত্র** (Bureaucracy) হলো বেতনভুক্ত, স্থায়ী, স্তরবদ্ধ ও নিয়মবদ্ধ সরকারি
কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমষ্টি, যারা রাজনৈতিক
শাসকের নির্দেশে নীতি বাস্তবায়ন ও প্রশাসন পরিচালনা করে।
ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, আধুনিক রাষ্ট্রের যৌক্তিক সংগঠনই আমলাতন্ত্র।
এর বৈশিষ্ট্য—
- কাজের স্পষ্ট ভাগ ও বিশেষজ্ঞতা
- উচ্চ থেকে নিম্ন স্তরবিন্যাস
- লিখিত নিয়ম ও নথি
- ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, পদের ভিত্তিতে কাজ
- যোগ্যতা ও পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ
- স্থায়ী চাকরি ও পদোন্নতি
- রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা (আদর্শ অনুসারে)
মন্ত্রী বদলান, সরকার বদলায়; আমলাতন্ত্র থাকে। তাই রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা এর
ওপর নির্ভর করে।
### আমলাতন্ত্রের ভূমিকা
1. **নীতি বাস্তবায়ন** — মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত
জেলা, উপজেলা ও মাঠপর্যায়ে রূপ
পায় আমলাদের হাতে।
2. **পরামর্শ** — অভিজ্ঞতা ও তথ্য দিয়ে মন্ত্রীকে
নীতি বানাতে সাহায্য করে। অনেক সময় খসড়া আইন ও নথি আমলারাই তৈরি করেন।
3. **ধারাবাহিকতা** — সরকার পাল্টালেও প্রশাসন,
রাজস্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেমে যায় না।
4. **সেবা প্রদান** — নাগরিক সনদ, লাইসেন্স, ভূমি, পাসপোর্ট, কল্যাণভাতা
ইত্যাদি দৈনন্দিন সেবা।
5. **তথ্য ও রেকর্ড** — সিদ্ধান্ত, হিসাব ও নথি সংরক্ষণ; পরে জবাবদিহির ভিত্তি।
6. **আধা-আইন ও আধা-বিচার** — আইনের অধীনে বিধি তৈরি
এবং লাইসেন্স, আপিল বা শাস্তির
মতো সিদ্ধান্ত।
7. **উন্নয়ন প্রশাসন** — প্রকল্প পরিকল্পনা,
বাস্তবায়ন ও তদারকি।
8. **শৃঙ্খলা রক্ষা** — ম্যাজিস্ট্রেসি ও জেলা
প্রশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় শাসন।
## দুইয়ের সম্পর্ক
| বিষয় | নির্বাহী শাসন | আমলাতন্ত্র |
|---|---|---|
| উৎস | নির্বাচন ও রাজনৈতিক ম্যান্ডেট | নিয়োগ, যোগ্যতা ও
স্থায়ী চাকরি |
| কাজ | নীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত | বাস্তবায়ন,
পরামর্শ ও সেবা |
| মেয়াদ | সীমিত; আস্থা হারালে যায় | স্থায়ী |
| জবাবদিহি | সংসদ ও জনগণের কাছে | মন্ত্রী ও চাকরিবিধির কাছে |
| ধরন | রাজনৈতিক | প্রশাসনিক,
নিরপেক্ষ হওয়ার কথা |
নির্বাহী ইচ্ছা দেয়, আমলাতন্ত্র তা রূপ দেয়। নির্বাহী দুর্বল হলে
আমলারা নীতি নিজেদের মতো চালাতে পারেন; আমলাতন্ত্র দলীয়, অদক্ষ বা
দুর্নীতিগ্রস্ত হলে নির্বাহীর ভালো নীতিও মাঠে পৌঁছায় না। সুশাসনে দরকার রাজনৈতিক
নির্বাহীর জবাবদিহি এবং যোগ্য, নিয়মনিষ্ঠ,
নাগরিকমুখী
আমলাতন্ত্র—দুটোই।
নির্বাহী
শাসন ও আমলাতন্ত্র: সংজ্ঞা ও ভূমিকা
১. নির্বাহী
শাসন কী?
নির্বাহী
শাসন বলতে রাষ্ট্রের আইন ও নীতি বাস্তবায়ন,
প্রশাসন পরিচালনা এবং রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে
থাকা শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়। সাধারণত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি,
প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নির্বাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।
সহজভাবে বলা
যায়, আইনসভা যে আইন প্রণয়ন করে এবং সরকার যে নীতি গ্রহণ করে,
সেগুলো বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রের দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনার প্রক্রিয়াই
নির্বাহী শাসন।
নির্বাহী
শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য
- রাষ্ট্রের নীতি ও আইন বাস্তবায়ন করে।
- রাষ্ট্রের দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করে।
- জনসেবা প্রদান করে।
- আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করে।
- দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।
- আইনসভা ও বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে রাষ্ট্র
পরিচালনা করে।
২.
আমলাতন্ত্র কী?
আমলাতন্ত্র
(Bureaucracy) হলো রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য গঠিত স্থায়ী, পেশাদার ও
নিয়মভিত্তিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠিত ব্যবস্থা।
সহজভাবে,
সরকার পরিবর্তন হলেও যারা স্থায়ীভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে
এবং সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা করে, তাদের
সমন্বিত প্রশাসনিক ব্যবস্থাই আমলাতন্ত্র।
আমলাতন্ত্রের
বৈশিষ্ট্য
১. স্থায়িত্ব — রাজনৈতিক
সরকার পরিবর্তিত হলেও প্রশাসনিক কাঠামো সাধারণত বহাল থাকে।
২. পেশাদারিত্ব — নির্দিষ্ট
যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
৩. পদক্রম বা Hierarchy — ঊর্ধ্বতন ও
অধস্তন কর্মকর্তার সুস্পষ্ট কাঠামো থাকে।
৪. নিয়মভিত্তিক কার্যক্রম — আইন,
বিধি ও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজ পরিচালিত হয়।
৫. নিরপেক্ষতা — রাজনৈতিক
পরিবর্তনের মধ্যেও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যাশা থাকে।
৬. দায়িত্বের বিভাজন — প্রত্যেক
কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকে।
৩. নির্বাহী
শাসনের ভূমিকা
ক. আইন ও
নীতি বাস্তবায়ন
আইনসভা
কর্তৃক প্রণীত আইন এবং সরকারের গৃহীত নীতি বাস্তবায়ন করা নির্বাহী বিভাগের অন্যতম
প্রধান কাজ।
খ. প্রশাসন
পরিচালনা
রাষ্ট্রের
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের
প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখে।
গ. জনসেবা
প্রদান
শিক্ষা,
স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা, পানি,
বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়।
ঘ.
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা
দেশে শান্তি,
নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে নির্বাহী বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে।
ঙ. উন্নয়ন
কার্যক্রম পরিচালনা
সরকারের
উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে।
চ.
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা
রাজস্ব
সংগ্রহ, বাজেট বাস্তবায়ন, সরকারি
ব্যয় পরিচালনা এবং অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে।
ছ. বৈদেশিক
সম্পর্ক
রাষ্ট্রের
পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪.
আমলাতন্ত্রের ভূমিকা
১. সরকারি
নীতি বাস্তবায়ন
রাজনৈতিক
সরকার যে নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, আমলাতন্ত্র তা বাস্তবে বাস্তবায়ন করে।
২.
প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা
সরকার
পরিবর্তন হলেও প্রশাসনিক কার্যক্রম যাতে বন্ধ না হয়, আমলাতন্ত্র
তা নিশ্চিত করে।
৩. নীতি
প্রণয়নে সহায়তা
অভিজ্ঞতা ও
প্রশাসনিক তথ্যের ভিত্তিতে আমলারা সরকারকে নীতি প্রণয়নে পরামর্শ ও তথ্য প্রদান
করেন।
৪. জনসেবা
প্রদান
সরকারি সেবা
জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র সরাসরি কাজ করে।
৫. উন্নয়ন
পরিকল্পনা বাস্তবায়ন
সড়ক,
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক
নিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসন
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৬.
আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
আইন ও
সরকারি বিধি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমলাতন্ত্র কাজ করে।
৭.
রাষ্ট্রের তথ্য ও পরিসংখ্যান সংরক্ষণ
জনসংখ্যা,
অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও
সংরক্ষণ করে, যা নীতি প্রণয়নে সহায়ক।
৮. সংকট
মোকাবিলা
প্রাকৃতিক
দুর্যোগ, মহামারি, অর্থনৈতিক সংকটসহ বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে
প্রশাসন সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫. নির্বাহী
শাসন ও আমলাতন্ত্রের সম্পর্ক
নির্বাহী
শাসন ও আমলাতন্ত্র একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
নির্বাহী বিভাগ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নীতি ও সিদ্ধান্ত
নির্ধারণ করে, আর আমলাতন্ত্র সেই নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে
প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করে।
উদাহরণ
হিসেবে বলা যায়, সরকার যদি সবার জন্য
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়,
তাহলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেই সিদ্ধান্ত
বাস্তবায়নের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, অর্থ বরাদ্দ, উপকারভোগী
নির্বাচন ও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
সংক্ষেপে
নির্বাহী
শাসন = রাষ্ট্রের নীতি ও প্রশাসন পরিচালনা।
আমলাতন্ত্র = সেই নীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে নিয়োজিত স্থায়ী
পেশাদার প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
উপসংহার: একটি কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দক্ষ, নিরপেক্ষ,
জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী নির্বাহী শাসন এবং আমলাতন্ত্র অপরিহার্য। তবে
আমলাতন্ত্রকে স্বচ্ছতা,
জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের আওতায় রেখে
পরিচালনা করা হলে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দক্ষতা ও সুশাসন আরও শক্তিশালী হয়।
নির্বাহী
শাসন (Executive Governance) এবং আমলাতন্ত্র
(Bureaucracy) আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরা একে
অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। নিচে এদের সংজ্ঞা এবং ভূমিকা বিস্তারিত আলোচনা করা
হলো:
১. নির্বাহী
শাসন কী?
রাষ্ট্রের
তিনটি প্রধান অঙ্গের (আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ) মধ্যে যে বিভাগটি আইনসভার প্রণীত
আইনগুলো বাস্তবায়ন করে, রাষ্ট্রের দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করে এবং রাষ্ট্রীয়
নীতি নির্ধারণ করে, তাকে নির্বাহী বা শাসন বিভাগ বলা হয়।
ব্যাপক
অর্থে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি (রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রী)
এবং মন্ত্রিপরিষদ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—সবাই নির্বাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।
নির্বাহী
শাসনের ভূমিকা
- নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন: রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বা নীতি প্রণয়ন করা এবং তা যথাযথভাবে কার্যকর করা
নির্বাহী বিভাগের প্রধান কাজ।
- আইন-শৃঙ্খলা ও শান্তি রক্ষা: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা,
অপরাধ দমন করা এবং নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করা।
- পররাষ্ট্র নীতি ওূটনীতি পরিচালনা: অন্যান্য রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে
সম্পর্ক স্থাপন, চুক্তি সম্পাদন, রাষ্ট্রদূত
নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা।
- জাতীয় প্রতিরক্ষা: দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে পরিচালনা করা এবং
বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশের স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা।
- অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা: রাষ্ট্রের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব (বাজেট)
প্রস্তুত করা, আইনসভায় তা পাসের ব্যবস্থা করা এবং সে অনুযায়ী কর
আদায় ও উন্নয়নমূলক খাতে অর্থ ব্যয় করা।
২.
আমলাতন্ত্র কী?
আমলাতন্ত্র
হলো নির্বাহী বিভাগের একটি স্থায়ী, অরাজনৈতিক এবং পেশাদার কাঠামো। এটি এমন একদল
স্থায়ী ও বেতনভুক্ত সরকারি কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত, যারা
নির্দিষ্ট নিয়মনীতি, দক্ষতা ও পদসোপান (Hierarchy) অনুযায়ী
রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যাবলি পরিচালনা করেন।
রাজনৈতিক
সরকার নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য আসে এবং যায়, কিন্তু
আমলারা স্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত নিজ পদে বহাল
থাকেন। ফরাসি শব্দ 'Bureau' (অফিস বা ডেস্ক) এবং গ্রিক শব্দ 'Kratia' (শাসন) থেকে 'Bureaucracy'
বা আমলাতন্ত্র শব্দটি এসেছে, যার শাব্দিক অর্থ দপ্তর-নির্ভর শাসন।
আমলাতন্ত্রের
ভূমিকা
- সরকারি নীতি বাস্তবায়ন: রাজনৈতিক সরকার (মন্ত্রীপরিষদ) যেসব আইন বা
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেগুলোকে মাঠপর্যায়ে বা বাস্তবে রূপ দেওয়ার মূল
দায়িত্ব আমলাদের। আমলারাই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলোকে সাধারণ মানুষের
দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন।
- তথ্য ও পরামর্শ প্রদান: মন্ত্রীরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ায় সব সময়
প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হন না। তাই যেকোনো নীতি বা আইন
তৈরির আগে আমলারা তাদের অভিজ্ঞতা, তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে
মন্ত্রীদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
- প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা রক্ষা: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের
পালাবদল ঘটে। একটি সরকার বিদায় নেওয়া এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার
মধ্যবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের কাজ যেন স্থবির না হয়, আমলারা
তা নিশ্চিত করেন। তারা রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
- জনসেবা প্রদান (Service Delivery): স্বাস্থ্য, শিক্ষা,
কৃষি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন
প্রয়োজনীয় সরকারি সেবাগুলো সরাসরি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমেই পরিচালিত
হয়।
- নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসন পরিচালনা: ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে নির্দিষ্ট
লিখিত আইন, নিয়ম ও শৃঙ্খলা মেনে কাজ করা আমলাতন্ত্রের
বৈশিষ্ট্য। এটি প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ও সমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সারসংক্ষেপ: রাজনৈতিক নির্বাহী বা সরকার রাষ্ট্রের 'মস্তিষ্ক'
হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, আর আমলাতন্ত্র সেই সরকারের 'হাত-পা'
হিসেবে সিদ্ধান্তগুলোকে বাস্তবে পরিণত করে। একটি সফল ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র
গঠনে দক্ষ নির্বাহী শাসন এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত ও গতিশীল আমলাতন্ত্রের সুসমন্বয়
অপরিহার্য।
49 BCS
Political science বিসিএস ...
আমলাতন্ত্র
কাকে বলে? সংজ্ঞা ...
অধ্যায়৩:আমলাতন্ত্র
লোকপ্রশাসন ...
আমলাতন্ত্রের
বৈশিষ্ট্য সমূহ ...
বাংলাদেশে
আদর্শ আমলাতন্ত্র ...
নির্বাহী
শাসন ও আমলাতন্ত্র আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। নিচে এগুলোর সংজ্ঞা ও ভূমিকা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
নির্বাহী
শাসন (Executive / নির্বাহী বিভাগ)
নির্বাহী
শাসন বা নির্বাহী বিভাগ হলো রাষ্ট্রের এমন একটি অংশ, যার মূল কাজ
হলো আইন প্রণয়নকারী সংস্থা কর্তৃক তৈরি করা আইন অনুযায়ী দেশের শাসনকাজ ও নীতি
বাস্তবায়ন করা। [1, 2]
- প্রকারভেদ: নির্বাহী শাসন মূলত দুই প্রকার—
- রাজনৈতিক নির্বাহী: যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন (যেমন:
প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি,
মন্ত্রীরা) এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ক্ষমতায়
থাকেন।
- স্থায়ী নির্বাহী (আমলাতন্ত্র): যারা স্থায়ীভাবে
নিয়োগপ্রাপ্ত হন। [3, 4]
আমলাতন্ত্র
(Bureaucracy)
আমলাতন্ত্র
হলো রাষ্ট্রের স্থায়ী, পেশাদার ও অ-রাজনৈতিক সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা
পরিচালিত এমন একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যা
নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন, শ্রম বিভাজন এবং স্তরভিত্তিক কর্তৃত্বের ওপর ভিত্তি করে
কাজ করে। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারকে আধুনিক আমলাতন্ত্রের জনক বলা হয়। [5,
6, 7]
নির্বাহী
শাসন ও আমলাতন্ত্রের ভূমিকা
আধুনিক
রাষ্ট্রে এগুলোর ভূমিকা অপরিসীম:
- নীতি ও আইন বাস্তবায়ন:
সংসদ যে আইন তৈরি করে, তা
মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করার মূল দায়িত্ব নির্বাহী শাসন ও
আমলাতন্ত্রের ওপর থাকে। [8, 9]
- প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা: রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হলেও আমলাতন্ত্রের
কর্মকর্তারা তাদের পদে বহাল থাকেন, ফলে
রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কাজ ও প্রশাসনে কোনো স্থবিরতা আসে না।
[3, 9]
- বিশেষায়িত পরামর্শ প্রদান: নীতিনির্ধারণের সময় রাজনৈতিক নেতাদের (মন্ত্রীদের)
প্রয়োজনীয় তথ্য, পরিসংখ্যান ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন
আমলারা। [9]
- জনসেবা প্রদান: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, কর
আদায় এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়
পৌঁছে দেওয়া এদের প্রধান কাজ। [10]
- শৃঙ্খলা ও সমন্বয় রক্ষা: স্তরভিত্তিক কর্তৃত্ব ও নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে
রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কাজের সমন্বয় সাধন করা হয়।
[7, 11]
আমলাতন্ত্র
সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমলাতন্ত্র
- উইকিপিডিয়া দেখতে পারেন। [3]
[1] https://jamaat-e-islami.org
[2] https://m.dailyinqilab.com
[4] https://pubadmin.institute
[10] https://study.com
[11] https://www.britannica.com
No comments:
Post a Comment