১. রেনেসাঁ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁর প্রভাব
রেনেসাঁ (Renaissance) বা পুনর্জাগরণ ১৪শ থেকে
১৭শ শতাব্দী পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া একটি সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক
ও সাহিত্যিক আন্দোলন, যা মধ্যযুগের ধর্মপ্রভাবিত চিন্তাধারার স্থলে ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিনির্ভর
ও মানবকেন্দ্রিক আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি গড়ে তুলেছে ।[bikoallinone]
রেনেসাঁ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
১. সংজ্ঞা ও অর্থ
- রেনেসাঁ ফরাসি শব্দ, যার
অর্থ "পুনর্জন্ম" বা "নবজাগরণ" ।[qualitycando]
- এটি ইউরোপের মধ্যযুগীয় কুসংস্কার, অন্ধকার ও ধর্মান্ধতা থেকে বেরিয়ে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান জ্ঞানচর্চা নতুন করে শুরু করার প্রতীক ।[bikoallinone]
২. উৎপত্তি ও প্রেক্ষাপট
- সময়: ১৪শ শতাব্দী থেকে শুরু, ১৭শ
শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত[bikoallinone]
- কেন্দ্রীয় ভূমিকা: ইতালি (বিশেষ
করে ফ্লোরেন্স) রেনেসাঁর কেন্দ্র ছিল[bikoallinone]
- প্রেক্ষাপট:
- ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর সেখানকার
পণ্ডিতরা ইতালিতে এসে জ্ঞান ও শিল্পচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করেন[bikoallinone]
- ভূমধ্যসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় ইতালি
ব্যবসা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়[bikoallinone]
৩. রেনেসাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো
|
বৈশিষ্ট্য |
বিবরণ |
|
মানবতাবাদ (Humanism) |
মানুষের জ্ঞান, সৃজনশীলতা
ও সম্ভাবনার উপর জোর; দান্তে, পেত্রার্ক, বোক্কাচিও
প্রচার করেন [bikoallinone] |
|
শিল্পের পুনর্জাগরণ |
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (মোনালিসা, শেষ ভোজ),
মাইকেল এঞ্জেলো, রাফায়েল যুগান্তকারী চিত্রকর্ম তৈরি করেন [bikoallinone] |
|
বিজ্ঞানের বিকাশ |
কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্ব, গ্যালিলিওর
জ্যোতির্বিজ্ঞান আবিষ্কার [bikoallinone] |
|
মুদ্রণযন্ত্রের উদ্ভাবন |
জোহানেস গুটেনবার্গ ১৪৫০ সালে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার;
বই প্রকাশ সহজ হয় [bikoallinone] |
|
ধর্মীয় সংস্কার |
মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার
শুরু, ক্যাথলিক চার্চের প্রভাব হ্রাস [bikoallinone] |
৪. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
- শিক্ষার প্রসার: বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধর্মীয় গণ্ডি থেকে বেরিয়ে
বিজ্ঞান, শিল্প ও দর্শনে জোর দেয়[bikoallinone]
- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য: মানুষ চিন্তায় আরও স্বাধীন হয়, গির্জার প্রভাব কমে[bikoallinone]
- জাতীয় রাষ্ট্রের বিকাশ: সামন্তবাদ থেকে বেরিয়ে আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্রের
বিকাশ ঘটে[bikoallinone]
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁর প্রভাব
রেনেসাঁ রাষ্ট্রদর্শনের ইতিহাসে
যুগান্তকারী প্রভাব পরিলক্ষিত
করেছে—মধ্যযুগের ধর্মপ্রভাবিত রাষ্ট্রদর্শনের স্থলে ধর্মনিরপেক্ষ নতুন
রাষ্ট্রদর্শন গড়ে তোলা ।[bibortonpoth]
১. মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রদর্শন vs রেনেসাঁর
রাষ্ট্রদর্শন
|
মধ্যযুগীয় চিন্তা |
রেনেসাঁর চিন্তা |
|
চার্চের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, রাষ্ট্র
চার্চের অধীন [bibortonpoth] |
ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় রাষ্ট্রের
অভ্যুদয় [bibortonpoth] |
|
স্কলাস্টিক চিন্তাবিদরা (টমাস একুইনাস, সেন্ট
অগাস্টিন) ধর্মযাজকদের পার্থিব ক্ষমতা সমর্থন [bibortonpoth] |
চার্চের ক্ষমতা হ্রাস, রাষ্ট্রতত্ত্ব
ধর্মতত্ত্ব থেকে পৃথক [bibortonpoth] |
|
রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস ঐশ্বরিক |
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব জনগণের
মধ্যে নিহিত [bibortonpoth] |
২. নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭) — আধুনিক
রাষ্ট্রতত্ত্বের পথিকৃৎ
ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন আধুনিক
জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ও আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের পথিকৃৎ ।[bibortonpoth]
|
ম্যাকিয়াভেলির মূল মতাদর্শ |
বিবরণ |
|
রাজনীতি ও নীতিশাস্ত্র পৃথক |
রাজনীতিকে নীতিশাস্ত্র ও ধর্ম থেকে পৃথক করে ঘোষণা;
'প্রিন্স' গ্রন্থে প্রচলিত নৈতিকতাকে নাকচ করে [bibortonpoth] |
|
ক্ষমতাই পরম লক্ষ্য |
কি নীতি, কি ধর্ম—কোনোরই নিজস্ব মূল্য নেই; উদ্দেশ্য
সাধনের উপায়মাত্র; রাজনীতি ও ক্ষমতাই শাসকের পরম লক্ষ্য [bibortonpoth] |
|
শৃগালের বুদ্ধি + সিংহের শক্তি |
শাসকের মধ্যে শৃগালের চতুরতা ও সিংহের দুর্ধর্ষতা
সমন্বয় ঘটা উচিত; প্রয়োজনবোধে ধর্মবিশ্বাসের ভান বা নাস্তিক্য সাজতে
হবে [bibortonpoth] |
|
তথ্যবাস্ত্যবাদ |
ইতালির দুর্নীতি ও হানাহানি মোকাবেলায় শক্তিকে শক্তি
দিয়ে, কৌশলকে কৌশল দিয়ে মোকাবেলা অপরিহার্য [bibortonpoth] |
ম্যাকিয়াভেলির চিন্তাধারায় ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও
তিনি বাস্তববাদী চিন্তাবিদ ও নিবেদিতপ্রাণ
দেশপ্রেমিক ছিলেন ।[bibortonpoth]
৩. অন্যান্য রেনেসাঁ চিন্তাবিদদের প্রভাব
|
চিন্তাবিদ |
গ্রন্থ |
মূল অবদান |
|
স্যার টমাস মোর (১৪৭৮-১৫৩৫) |
'ইউটোপিয়া' (১৫১৮) |
রাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক আদর্শের পরিকল্পনা [bibortonpoth] |
|
জ্যা বোঁদা (১৪৩০-১৫৯৬) |
'Six livres de la Republique' (১৫৫৭) |
ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, রাষ্ট্র ও
সার্বভৌমত্বের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা [bibortonpoth] |
|
এলবোরিকো জেন্টাইল (১৫২১-১৬১১) |
'De Jure Belli' (১৫৫৮) |
ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, মানবপ্রকৃতি-ভিত্তিক
মানবিক আইন [bibortonpoth] |
|
হুগো গ্রোসিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫) |
'The Law of War and Peace' |
আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্বের
গোড়াপত্তন, আন্তর্জাতিক আইনের জনক [bibortonpoth] |
৪. রেনেসাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় সর্বাধিক প্রভাব
- ধর্মনিরপেক্ষতা: রাষ্ট্রতত্ত্ব ধর্মতত্ত্বের অধীনস্থ দাসস্বরূপ
নয়—এটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র[bibortonpoth]
- জাতীয়তাবাদ: প্রতিটি রাষ্ট্র তার প্রতিবেশী থেকে নিজেকে
স্বতন্ত্র বলে দাবি করে[bibortonpoth]
- সার্বভৌমত্বের ধারণা: রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব জনগণের মধ্যে নিহিত, কোনোমতেই বিভক্ত বা
হস্তান্তর করা চলে না[bibortonpoth]
- সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র: এলথুসিয়াস, লক,
রুশোর চিন্তায় একচ্ছত্রবাদের বিরুদ্ধে
প্রতিক্রিয়া সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও আধুনিক গণতন্ত্রের বিকাশ সহায়ক[bibortonpoth]
- প্রাকৃতিক আইন: গ্রোসিয়াসের মতে প্রাকৃতিক আইন অলিখিত, মনুষের প্রজ্ঞাসম্মত প্রকৃতিই ভিত্তি, সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়[bibortonpoth]
উপসংহার
রেনেসাঁ শুধু একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন নয়—এটি মানুষের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও
সম্ভাবনার সীমাহীন সম্ভাবনা উপলব্ধি করার প্রেরণা । আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তায় এর প্রভাব অপরিসীম: ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় রাষ্ট্র, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য,
যুক্তিবাদ, সার্বভৌমত্বের জনগণকেন্দ্রিক ধারণা, ও আধুনিক
গণতন্ত্রের ভিত্তি রেনেসাঁই স্থাপন করেছে ।[shikhaprotidin]
রেনেসাঁ: বিস্তারিত আলোচনা (রেনেসাঁ: উৎপত্তি থেকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা)
রেনেসাঁ কী?
রেনেসাঁ (Renaissance) একটি ফরাসি
শব্দ, যার অর্থ "পুনর্জন্ম"। এটি মূলত চতুর্দশ
শতাব্দী থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে সংঘটিত একটি বৌদ্ধিক, সাংস্কৃতিক
ও শৈল্পিক আন্দোলন। মধ্যযুগের ধর্মকেন্দ্রিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্তি
পেয়ে মানুষ ক্লাসিক গ্রিক-রোমান জ্ঞান-বিজ্ঞানের পুনরাবিষ্কারে মনোযোগ দেয়।
উৎপত্তি ও বিস্তার
ইতালীয় রেনেসাঁ (১৩০০–১৫০০): ফ্লোরেন্স শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। মেদিচি পরিবারের
পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনের বিকাশ ঘটে। দান্তে, পেত্রার্ক ও
বোকাচ্চো সাহিত্যে; লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও মিকেলাঞ্জেলো শিল্পকলায় নতুন
দিগন্ত উন্মোচন করেন।
উত্তরের রেনেসাঁ (১৪৫০–১৬০০): গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র (১৪৫০) আবিষ্কারের পর জ্ঞান
ছড়িয়ে পড়ে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসে। এরাসমাস,
টমাস মোর, শেকসপিয়র এই ধারাকে নতুন রূপ দেন।
মানবতাবাদ — রেনেসাঁর মূলকথা
রেনেসাঁর কেন্দ্রীয় দর্শন হলো মানবতাবাদ
(Humanism)। এর মূলকথা:
ঈশ্বর নয়, মানুষই বিশ্বের কেন্দ্রে। মানুষের যুক্তিবুদ্ধি, সৃজনশীলতা ও
বিকাশই সর্বোচ্চ লক্ষ্য। পৃথিবীর জীবনেরও মূল্য আছে — শুধু পরকালের চিন্তাই জীবনের
একমাত্র উদ্দেশ্য নয়।
প্রধান চিন্তাবিদ ও তাদের অবদান
পেত্রার্ক (১৩০৪–১৩৭৪) — মানবতাবাদের
জনক। ল্যাটিন ও গ্রিক ক্লাসিকের পুনরুজ্জীবন ঘটান।
নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯–১৫২৭) — রাষ্ট্রচিন্তায়
বিপ্লবী। "দ্য প্রিন্স" গ্রন্থে ধর্মীয় নৈতিকতার বাইরে গিয়ে
বাস্তববাদী রাজনীতির কথা বলেন। রাষ্ট্রকে ধর্মের অধীনতা থেকে মুক্ত করেন।
টমাস মোর (১৪৭৮–১৫৩৫) — "ইউটোপিয়া"
রচনা করেন। আদর্শ রাষ্ট্রের কল্পনা করেন যেখানে সম্পদের সুষম বণ্টন থাকবে।
ইরাসমাস (১৪৬৬–১৫৩৬) —
গির্জার দুর্নীতির সমালোচনা করেন। ব্যক্তির বিবেক ও যুক্তির স্বাধীনতার কথা
বলেন।
জ্যাঁ বোদাঁ (১৫৩০–১৫৯৬) — আধুনিক
সার্বভৌমত্বের তত্ত্বের প্রবর্তক।
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁর প্রভাব
১. ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণা মধ্যযুগে রাষ্ট্র ছিল চার্চের অধীন। রেনেসাঁ এই
সম্পর্ককে উল্টে দেয়। ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্রকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখেন
যার নিজস্ব নীতি ও যুক্তি আছে। এটিই আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রের ভিত্তি।
২. সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের পটভূমি রেনেসাঁর মানবতাবাদী চিন্তা সরাসরি হবস, লক ও রুশোর
সামাজিক চুক্তি তত্ত্বকে অনুপ্রাণিত করে। মানুষের স্বাভাবিক অধিকার ও
যুক্তিবুদ্ধির ধারণা না থাকলে "সামাজিক চুক্তি" অসম্ভব ছিল।
৩. ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার মানুষকে কেন্দ্রে রেখে রেনেসাঁ মতাদর্শ পরবর্তীতে নাগরিক
স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার এবং সাংবিধানিক শাসনের ধারণার জন্ম
দেয়। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও ফরাসি বিপ্লবের মানবাধিকারের ঘোষণায় এই
ছাপ সুস্পষ্ট।
৪. জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব ম্যাকিয়াভেলি
ও বোদাঁর রাষ্ট্রচিন্তা জাতি-রাষ্ট্র (Nation-State) ধারণার পথ
খুলে দেয়। সার্বভৌম রাষ্ট্র যেখানে পোপ বা চার্চের নয়, জনগণের বা
রাজার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
৫. ক্ষমতার বিভাজন তত্ত্বের ভূমিকা রেনেসাঁর যুক্তিবাদী ঐতিহ্য থেকেই মন্টেস্কুর
ক্ষমতাবিভাজন তত্ত্ব বিকশিত হয়, যা আধুনিক গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড।
উত্তরাধিকার
রেনেসাঁ → আলোকায়ন (Enlightenment)
→ আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৬) → ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) → আধুনিক সাংবিধানিক গণতন্ত্র। এই ধারাবাহিক যাত্রায় রেনেসাঁই ছিল প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ — যেখানে মানুষ প্রথমবার ঘোষণা করল: মানুষই তার নিজের ভাগ্যের নির্মাতা।
রেনেসাঁ
(পুনর্জাগরণ) ছিল ইউরোপের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী সাংস্কৃতিক, শৈল্পিক, বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক আন্দোলন, যা মধ্যযুগের অবসান ঘটিয়ে আধুনিক যুগের সূচনা
করে। এটি মূলত ১৪শ শতকের শেষভাগ থেকে ১৭শ শতক পর্যন্ত ইতালিতে শুরু হয়ে সমগ্র
ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। নিচে রেনেসাঁ ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় এর প্রভাব বিস্তারিত
আলোচনা করা হলো:
### রেনেসাঁ সম্পর্কে
বিস্তারিত আলোচনা
#### ১. মূল বৈশিষ্ট্য
ও দর্শন:
- **মানবতাবাদ (Humanism):**
মানবকেন্দ্রিক চিন্তাধারা,
যেখানে ব্যক্তির মর্যাদা,
যুক্তি, সৃজনশীলতা ও পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেওয়া
হয়। ধর্মীয় গোঁড়ামির পরিবর্তে ধ্রুপদী গ্রেকো-রোমান সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পের পুনরুদ্ধার ঘটে।
- **যুক্তি ও
পর্যবেক্ষণ:** বিজ্ঞানের উন্নতি ঘটে (গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস)। কারণ ও প্রমাণের ভিত্তিতে জ্ঞান
অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়।
- **ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য:**
ব্যক্তির প্রতিভা, দক্ষতা ও স্বাধীন
চিন্তাকে মূল্য দেওয়া হতো। ‘রেনেসাঁ মানব’ ধারণাটি বহুমুখী প্রতিভার প্রতীক।
- **ধর্মনিরপেক্ষতা:**
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কমে যায় এবং রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিল্পকলায় ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার
উন্মেষ ঘটে।
#### ২. শিল্প ও
সাহিত্য:
- **শিল্প:**
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেলএঞ্জেলো,
রাফায়েল প্রমুখের হাতে
বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, দৃষ্টিভ্রম (perspective),
মানবশরীরের সঠিক অঙ্কন ও
আবেগের প্রকাশ ঘটে। ‘মোনালিসা’, ‘দ্য লাস্ট সাপার’,
‘ডেভিড’ ও ‘সিস্টিন
চ্যাপেল’-এর মতো অবিস্মরণীয় সৃষ্টি হয়।
- **সাহিত্য:**
দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’, পেত্রার্কের সনেট,
বোকাচ্চিওর ‘ডেকামেরন’
এবং পরবর্তীতে শেকসপিয়রের নাটক সাহিত্যে ধ্রুপদী আদর্শ ও ভাষার বিকাশ ঘটায়।
#### ৩. বিজ্ঞান ও
আবিষ্কার:
- কোপার্নিকাসের
সূর্যকেন্দ্রিক মত, গ্যালিলিওর
টেলিস্কোপ পর্যবেক্ষণ, ভেসালিয়াসের
আধুনিক শারীরবিদ্যা চর্চা।
- গুটেনবার্গের
ছাপাখানা জ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটায়, যা সংস্কার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে।
#### ৪. রাজনীতি ও
অর্থনীতি:
- ম্যাকিয়াভেলির
‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে বাস্তববাদী ক্ষমতার বিশ্লেষণ, নৈতিকতা থেকে রাজনীতিকে পৃথককরণ।
- ব্যাংকিং ও
বাণিজ্যের প্রসার (মেডিচি পরিবার), পুঁজিবাদী
অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন।
### আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁর প্রভাব
রেনেসাঁ আধুনিক
রাষ্ট্রব্যবস্থা, সার্বভৌমত্ব,
আইন ও প্রশাসনের ধারণাকে
আমূল বদলে দেয়। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো:
#### ১. সার্বভৌম
রাষ্ট্রের ধারণা:
- মধ্যযুগের জটিল
সামন্ততান্ত্রিক ও পোপের অধীনস্থ রাজনৈতিক কাঠামোর বিপরীতে রেনেসাঁর চিন্তাবিদরা
**একক, কেন্দ্রীভূত ও সার্বভৌম
রাষ্ট্রের** পক্ষে মত দেন। ম্যাকিয়াভেলি ও পরে জঁ বোদাঁ (Jean Bodin) সার্বভৌমত্বের তত্ত্ব দেন – রাষ্ট্রের
অভ্যন্তরে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা (যেমন গির্জা বা সামন্ত প্রভু) থাকবে না।
#### ২. রাজনৈতিক
বাস্তবতা ও নৈতিকতার বিচ্ছেদ:
- ম্যাকিয়াভেলি
দেখান যে, শাসকের মূল
লক্ষ্য রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা – এর জন্য ধূর্ততা, শক্তি ব্যবহার, এমনকি প্রতারণাও জায়েজ। এটি আধুনিক
**রিয়েলপলিটিক (বাস্তবনীতি)**-এর ভিত্তি স্থাপন করে।
#### ৩. আইনের শাসন ও
প্রশাসনিক সংস্কার:
- রেনেসাঁর
মানবতাবাদী আইনবিদরা (যেমন ফ্রান্সিসকো সুয়ারেজ) যুক্তি দেন যে রাষ্ট্র আইনের
ভিত্তিতে চলে এবং শাসকও আইনের ঊর্ধ্বে নন। ধীরে ধীরে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রেও
আইনকেন্দ্রিক প্রশাসন গড়ে ওঠে।
#### ৪. নাগরিকত্ব ও
প্রজাতান্ত্রিক চিন্তা:
- ইতালীয়
নগর-রাষ্ট্রগুলো (ফ্লোরেন্স, ভেনিস) থেকে
গণতান্ত্রিক চর্চা ও নাগরিক সক্রিয়তার আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে। রেনেসাঁর মানবতাবাদ
নাগরিকের কর্তব্য, স্বাধীনতা ও
অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে, যা পরবর্তীতে
লকের সামাজিক চুক্তি ও রুশোর সাধারণ ইচ্ছার ধারণাকে প্রভাবিত করে।
#### ৫. ধর্মনিরপেক্ষ
রাষ্ট্রের ভিত্তি:
- ধর্মীয়
কর্তৃত্বের অবক্ষয় ও যুক্তির উত্থান রাষ্ট্র ও গির্জাকে পৃথক করার পথ প্রস্তুত
করে। আধুনিক **ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার** বীজ রোপিত হয় রেনেসাঁয়।
#### ৬. কূটনীতি ও
আন্তর্জাতিক আইন:
- রেনেসাঁর ইতালীয়
নগর-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক চর্চা ব্যাপক বিকাশ লাভ করে। স্থায়ী দূতাবাস,
রাষ্ট্রদূতের অনাক্রম্যতা,
চুক্তি ও সন্ধির প্রথা
তৈরি হয় – যা আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি।
#### ৭. সামরিক বিপ্লব
ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ:
- রেনেসাঁয় ব্যারুদ
ও স্থায়ী সেনাবাহিনীর ব্যবহার সামন্ততান্ত্রিক সেনাদলের অবসান ঘটায়। এটি রাষ্ট্রকে
একক সামরিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে – আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
### উপসংহার:
রেনেসাঁ শুধু
শিল্প ও সাহিত্যের উন্মেষ ঘটায়নি; এটি আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তার ভিত গড়ে দেয় – সার্বভৌমত্ব, আইনের শাসন, ধর্মনিরপেক্ষতা, কূটনীতি, বাস্তববাদী রাজনীতি ও নাগরিকত্বের ধারণা
রেনেসাঁর ঋণী। পরবর্তীতে হবস, লক, রুশো ও মন্টেস্কুর মতো দার্শনিকরা এই ভিত্তির
উপর দাঁড়িয়ে সামাজিক চুক্তি, ক্ষমতা
স্বতন্ত্রীকরণ ও গণতন্ত্রের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাই আধুনিক রাষ্ট্রের মূল
উপাদানগুলো বুঝতে রেনেসাঁকে অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক।
রেনেসাঁ: পরিচয়, বৈশিষ্ট্য ও
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় এর প্রভাব
রেনেসাঁ কী?
রেনেসাঁ (Renaissance) শব্দটির
অর্থ "পুনর্জাগরণ" বা "নবজন্ম"। এটি ছিল ইউরোপে মধ্যযুগের
অবসান ও আধুনিক যুগের সূচনার মধ্যবর্তী একটি বৌদ্ধিক, সাংস্কৃতিক,
সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক এবং শিল্পকলা-ভিত্তিক আন্দোলন। সাধারণভাবে ১৪শ
থেকে ১৭শ শতাব্দীর সময়কালকে রেনেসাঁ যুগ বলা হয়।
রেনেসাঁর সূচনা হয় Florence-এ, পরে তা
সমগ্র Italy এবং ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।
রেনেসাঁর পটভূমি
রেনেসাঁ সৃষ্টির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল—
১. প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার পুনরাবিষ্কার
মধ্যযুগে উপেক্ষিত গ্রিক ও রোমান জ্ঞানভাণ্ডার পুনরায়
অধ্যয়ন করা হয়। মানুষের মধ্যে যুক্তিবাদ ও অনুসন্ধিৎসা বৃদ্ধি পায়।
২. কনস্টান্টিনোপলের পতন (১৪৫৩)
Fall of Constantinople-এর পর বহু গ্রিক পণ্ডিত ইতালিতে আশ্রয় নিয়ে
প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও জ্ঞান ইউরোপে ছড়িয়ে দেন।
৩. বাণিজ্য ও নগরায়ণের বিকাশ
ব্যবসায়ী শ্রেণির উত্থান ঘটে এবং তারা শিক্ষা, সাহিত্য ও
শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতা করে।
৪. মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার
Johannes Gutenberg-এর মুদ্রণযন্ত্র জ্ঞান বিস্তারে বিপ্লব ঘটায়।
৫. ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রশ্নবিদ্ধতা
মানুষ চার্চের অন্ধ কর্তৃত্বের পরিবর্তে যুক্তি ও
অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
রেনেসাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য
মানবতাবাদ (Humanism)
মানুষ, তার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও
মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মানুষের পার্থিব জীবনকে মূল্যবান হিসেবে বিবেচনা
করা হয়।
যুক্তিবাদ (Rationalism)
অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ
ও বিশ্লেষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Individualism)
ব্যক্তির স্বাধীনতা, প্রতিভা ও
সৃজনশীলতার বিকাশকে উৎসাহিত করা হয়।
ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism)
ধর্মের পাশাপাশি জাগতিক বিষয় ও মানবকল্যাণকে গুরুত্ব
দেওয়া হয়।
বৈজ্ঞানিক মনোভাব
প্রকৃতি ও সমাজকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করার
প্রবণতা গড়ে ওঠে।
রেনেসাঁর উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব
Leonardo da Vinci
চিত্রকলা, বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে অসামান্য অবদান রাখেন।
Michelangelo
ভাস্কর্য ও চিত্রকলার মহান শিল্পী।
Niccolò Machiavelli
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ।
Galileo Galilei
বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁর প্রভাব
রেনেসাঁ কেবল সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল না; এটি আধুনিক
রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১. ধর্মীয় কর্তৃত্ব থেকে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা
মধ্যযুগে চার্চ রাজনীতির উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করত।
রেনেসাঁ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ ঘটায়। রাষ্ট্রকে ধর্মীয়
প্রতিষ্ঠানের অধীন না রেখে স্বাধীন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাবা শুরু হয়।
ফলাফল: আধুনিক
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণা গড়ে ওঠে।
২. জাতিরাষ্ট্র (Nation-State) ধারণার
বিকাশ
রেনেসাঁ মানুষের মধ্যে জাতীয় চেতনা জাগিয়ে তোলে।
সামন্ততন্ত্র দুর্বল হয়ে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী হয়।
পরবর্তীতে England, France এবং Spain-এ আধুনিক
জাতিরাষ্ট্রের বিকাশ ঘটে।
৩. মানবকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দর্শনের উত্থান
মধ্যযুগে রাজনীতি ধর্মকেন্দ্রিক ছিল। রেনেসাঁ রাজনীতিকে
মানবজীবনের বাস্তব সমস্যার আলোকে বিশ্লেষণ করতে শেখায়।
এর ফলে রাষ্ট্রকে মানুষের কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য
প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়।
৪. ম্যাকিয়াভেলির বাস্তববাদী রাষ্ট্রচিন্তা
Niccolò Machiavelli-এর The Prince আধুনিক
রাজনৈতিক চিন্তার একটি মাইলফলক।
তার মতে—
- রাজনীতিকে ধর্ম ও নৈতিকতা থেকে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ
করা উচিত।
- রাষ্ট্রের স্থিতি ও নিরাপত্তা সর্বাধিক
গুরুত্বপূর্ণ।
- ক্ষমতা অর্জন ও সংরক্ষণের বাস্তব কৌশল প্রয়োজন।
এ কারণে ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক
বলা হয়।
৫. ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ভিত্তি
রেনেসাঁ ব্যক্তির মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়।
পরবর্তীকালে এই চিন্তা—
- প্রাকৃতিক অধিকার তত্ত্ব,
- নাগরিক স্বাধীনতা,
- গণতন্ত্র,
- মানবাধিকার
ইত্যাদির বিকাশে সহায়ক হয়।
৬. বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা
রেনেসাঁ যুক্তি ও বিজ্ঞানের উপর গুরুত্ব আরোপ করে। এর
ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায়—
- পরিকল্পনা,
- প্রশাসনিক দক্ষতা,
- আইনের শাসন,
- তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত
গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
৭. আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম
রেনেসাঁর প্রভাবে পরবর্তীকালে Thomas Hobbes,
John Locke এবং Jean-Jacques Rousseau-এর মতো চিন্তাবিদদের রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশ
ঘটে।
তাদের চিন্তা থেকে—
- সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব,
- জনগণের সার্বভৌমত্ব,
- সাংবিধানিক সরকার,
- গণতন্ত্র
ইত্যাদি ধারণা শক্তিশালী হয়।
উপসংহার
রেনেসাঁ ছিল ইউরোপের বৌদ্ধিক মুক্তির আন্দোলন, যা মানুষকে
অন্ধবিশ্বাস থেকে যুক্তি, বিজ্ঞান ও মানবতাবাদের পথে পরিচালিত করে। এর ফলেই আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতিরাষ্ট্র,
ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং বাস্তববাদী রাজনৈতিক
দর্শন—বিকশিত হয়। তাই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বৌদ্ধিক ভিত্তি নির্মাণে রেনেসাঁর
অবদান অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
**রেনেসাঁ (Renaissance):**
একটি বিস্তারিত আলোচনা
রেনেসাঁ শব্দের
অর্থ **"পুনর্জাগরণ"** বা **"Rebirth"**। এটি ১৪শ শতাব্দীর
মাঝামাঝি থেকে ১৭শ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত ইউরোপে (বিশেষ করে ইতালিতে) সংঘটিত একটি
সাংস্কৃতিক, শৈল্পিক, বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। এটি
মধ্যযুগের ধর্মকেন্দ্রিক, অন্ধবিশ্বাসী ও
স্থবির সমাজ থেকে মানুষকে মুক্ত করে মানবকেন্দ্রিক (human-centric) চিন্তাধারার পথ খুলে দেয়।
### ১. রেনেসাঁর
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
- **উৎপত্তি**:
ইতালির ফ্লোরেন্স, ভেনিস, রোম প্রভৃতি নগর-রাষ্ট্রে (city-states)। ধনী বণিক পরিবার (মেডিসি, ফার্নেসি
ইত্যাদি) শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
- **কারণসমূহ**:
- বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের পর গ্রিক-রোমান
পণ্ডিতদের ইতালিতে আগমন এবং প্রাচীন গ্রন্থের পুনরুদ্ধার।
- বাণিজ্যের প্রসার (ক্রুসেড ও মঙ্গোলদের মাধ্যমে
পূর্ব-পশ্চিম যোগাযোগ)।
- মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার (গুটেনবার্গ, ১৪৫০) — জ্ঞানের দ্রুত বিস্তার।
- মধ্যযুগীয় গির্জার কর্তৃত্বের প্রতি
প্রতিক্রিয়া।
### ২. রেনেসাঁর মূল
বৈশিষ্ট্য
- **হিউম্যানিজম (Humanism)**:
মানুষকে বিশ্বের
কেন্দ্রবিন্দু মনে করা। পেট্রার্ক, ডান্তে, এরাসমুস প্রমুখ হিউম্যানিস্টরা প্রাচীন
গ্রিক-ল্যাটিন সাহিত্য অধ্যয়নের উপর জোর দেন। “Man is the measure of all
things” — প্রোটাগোরাসের এই দর্শন
পুনরুজ্জীবিত হয়।
- **শিল্পকলা**:
- দৃষ্টিভঙ্গি (perspective), আলো-ছায়া (chiaroscuro), মানবদেহের বাস্তবতা।
- লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (*মোনালিসা*, *ভিট্রুভিয়ান ম্যান*), মাইকেলেঞ্জেলো (*ডেভিড*, সিস্টিন চ্যাপেল), রাফায়েল।
- **সাহিত্য**:
ডান্তের *ডিভাইন কমেডি*, শেক্সপিয়রের নাটক,
ম্যাকিয়াভেল্লির *The
Prince*।
- **বিজ্ঞান ও
অনুসন্ধান**: কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ, গ্যালিলিওর দূরবীক্ষণ যন্ত্র, ভেসালিয়াসের শারীরবিদ্যা। এটি বৈজ্ঞানিক
বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করে।
- **ধর্মীয়
সংস্কার**: রেনেসাঁর মুক্তচিন্তা পরোক্ষভাবে প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনকে (মার্টিন
লুথার) প্রভাবিত করে।
### ৩. আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁর প্রভাব
রেনেসাঁ সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে **রাজনৈতিক দর্শন ও আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণায়**।
মধ্যযুগে রাষ্ট্র ছিল ধর্ম ও রাজার ঐশ্বরিক অধিকারের অধীন। রেনেসাঁ এই ধারণা ভেঙে
**ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক ও
বাস্তববাদী** রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা করে।
#### প্রধান চিন্তাবিদ
ও ধারণা:
- **নিকোলো
ম্যাকিয়াভেল্লি (১৪৬৯-১৫২৭)**:
- *The Prince* (১৫১৩) — আধুনিক রাজনৈতিক বিজ্ঞানের জনক বলা হয়।
- মূল বক্তব্য: রাজনীতি ধর্ম বা নৈতিকতা থেকে
আলাদা। শাসককে **বাস্তববাদী** (realist) হতে হবে। “Ends justify the means” — উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যেকোনো উপায় গ্রহণযোগ্য।
- প্রভাব: আধুনিক **রাষ্ট্রবাদ** (statism),
ক্ষমতার রাজনীতি, কূটনীতি ও যুদ্ধকৌশলের ভিত্তি। হবস, লক, রুশো, এমনকি ২০শ
শতাব্দীর বাস্তববাদী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্ব (Realism — হ্যান্স মর্গেন্থাউ) এর দ্বারা প্রভাবিত।
- **ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism)**:
রাষ্ট্রের ক্ষমতা গির্জার
উপর নির্ভরশীল না হয়ে জনগণের সম্মতির উপর নির্ভর করে — এই ধারণা রেনেসাঁ থেকে আসে।
পরবর্তীকালে এটি আধুনিক গণতন্ত্র ও জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি হয়।
- **ব্যক্তিস্বাধীনতা
ও ব্যক্তিত্ববাদ (Individualism)**: মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার, যুক্তি ও
স্বাধীনতার উপর জোর। এটি পরে জন লকের প্রাকৃতিক অধিকার তত্ত্ব, ফরাসি বিপ্লবের “Liberty, Equality,
Fraternity” এবং আধুনিক সাংবিধানিকতায়
প্রতিফলিত হয়।
- **জাতিরাষ্ট্রের
ধারণা**: ইতালির নগর-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার লড়াই রেনেসাঁকে
প্রভাবিত করে। এটি পরবর্তীতে ইউরোপে সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের (sovereign
nation-state) ধারণা জন্ম দেয়, যা ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি (১৬৪৮) এর মাধ্যমে
সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
#### দীর্ঘমেয়াদি
প্রভাব:
- **আধুনিক
গণতন্ত্র**: জনগণের সম্মতি, আইনের শাসন,
মানবাধিকার — এসব ধারণা
রেনেসাঁর হিউম্যানিজম থেকে উদ্ভূত।
- **পুঁজিবাদ ও
আধুনিক অর্থনীতি**: বাণিজ্য, ব্যাংকিং ও
ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রসার।
- **বৈজ্ঞানিক
চিন্তা**: আধুনিক রাষ্ট্র যুক্তি ও প্রমাণের উপর নির্ভর করে, অন্ধবিশ্বাস নয়।
- **উপনিবেশবাদ ও
বিশ্বায়ন**: রেনেসাঁর অনুসন্ধানী মনোভাব কলম্বাস, ভাস্কো দা গামার যুগ শুরু করে, যা পরবর্তীকালে আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে
গঠন করে।
### সমালোচনা
রেনেসাঁকে কেউ
কেউ শুধুমাত্র অভিজাত শ্রেণির আন্দোলন বলে সমালোচনা করেন। এটি সাধারণ মানুষের
জীবনে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেনি। এছাড়া ম্যাকিয়াভেল্লিয়ান চিন্তা নৈতিকতাহীন
রাজনীতির জন্যও দায়ী বলা হয়।
### উপসংহার
রেনেসাঁ মধ্যযুগ
থেকে আধুনিক যুগে সেতুবন্ধন। এটি শুধু শিল্প-সাহিত্য নয়, বরং **মানুষের চিন্তার মুক্তি** ঘটিয়েছে।
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় এর সবচেয়ে বড় অবদান হলো **ধর্মনিরপেক্ষ সার্বভৌম রাষ্ট্র**,
**বাস্তববাদী রাজনীতি** এবং
**ব্যক্তির অধিকারের** উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র গঠনের ধারণা। আজকের গণতান্ত্রিক,
মানবাধিকারভিত্তিক ও
বৈজ্ঞানিক রাষ্ট্রব্যবস্থা রেনেসাঁর এই উত্তরাধিকার ছাড়া কল্পনা করা যায় না।
রেনেসাঁ (Renaissance)
ছিল ১৪শ থেকে ১৭শ
শতাব্দীর মধ্যে ইউরোপে ঘটে যাওয়া এক সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলন।
"রেনেসাঁ" শব্দটি ফরাসি ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ "পুনর্জন্ম"।
১. রেনেসাঁর কারণ
- প্রাচীন
গ্রিক-রোমান জ্ঞানের পুনরুজ্জীবন: তুর্কিদের কনস্টান্টিনোপল দখলের পর গ্রিক
পণ্ডিতরা ইউরোপে পালিয়ে আসেন, যারা প্রাচীন
গ্রিক-রোমান জ্ঞান নিয়ে আসেন।
- প্রিন্টিং
প্রেসের আবিষ্কার: জোহান গুটেনবার্গ ১৪৫০ সালে প্রিন্টিং প্রেস আবিষ্কার করেন,
যা জ্ঞান প্রচারে বিপ্লব
আনে।
- বাণিজ্যিক
বিপ্লব: ইউরোপে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে, যা নতুন ধ্যানধারণাকে উৎসাহিত করে।
২. রেনেসাঁর
বৈশিষ্ট্য
- মানবতাবাদ (Humanism):
মানুষের মূল্য, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, এবং যুক্তিবাদের উপর গুরুত্ব আরোপ।
- শিল্প ও
সাহিত্যের বিকাশ: লেওনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো, শেক্সপিয়ারের
মতো মহান শিল্পী ও সাহিত্যিকদের আবির্ভাব।
- বৈজ্ঞানিক
চিন্তার বিকাশ: গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস,
নিউটনের মতো বিজ্ঞানীদের
গবেষণা।
৩. আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁর প্রভাব
- রাষ্ট্রের ধারণা:
রেনেসাঁর সময়ে আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা গড়ে ওঠে। ম্যাকিয়াভেল্লির "দ্য
প্রিন্স" গ্রন্থে রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে পৃথক একটি সত্ত্বা হিসেবে দেখানো হয়।
- ধর্মনিরপেক্ষতা:
রেনেসাঁ ধর্মনিরপেক্ষতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্র ও ধর্মকে
পৃথক করা হয়।
- যুক্তিবাদ ও
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য: রেনেসাঁ যুক্তিবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে উৎসাহিত করে,
যা আধুনিক গণতান্ত্রিক
রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে।
রেনেসাঁ ছিল এক
যুগান্তকারী আন্দোলন, যা ইউরোপকে
মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে নিয়ে আসে।
ইউরোপের ইতিহাসে চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত
বিস্তৃত সময়কালকে রেনেসাঁ (Renaissance)
বা নবজাগরণ বলা হয়। ফরাসি শব্দ 'Renaissance' এর আক্ষরিক
অর্থ "পুনর্জন্ম" বা "নবজাগরণ"। মধ্যযুগের জড়তা, অন্ধবিশ্বাস
এবং চার্চের কঠোর অনুশাসন থেকে মুক্ত হয়ে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা
এবং মুক্তচিন্তার যে মহাবিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা-ই
রেনেসাঁ নামে পরিচিত।
নিচে রেনেসাঁর মূল বৈচিত্র্য, পটভূমি এবং
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় এর গভীর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. রেনেসাঁর মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
রেনেসাঁ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি ছিল
মানুষের চিন্তাভাবনার আমূল পরিবর্তন। এর মূল ভিত্তিগুলো ছিল:
- মানবতাবাদ (Humanism): মধ্যযুগে চিন্তার কেন্দ্রে ছিল ঈশ্বর এবং পরকাল।
রেনেসাঁ মানুষের ইহজাগতিক জীবন, তার মেধা ও
সম্ভাবনাকে কেন্দ্রে নিয়ে আসে। "মানুষই সকল কিছুর পরিমাপক"—এই
দর্শন ছড়িয়ে পড়ে।
- যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতা: অন্ধ বিশ্বাসের বদলে কোনো কিছুকে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে গ্রহণ করার প্রবণতা
তৈরি হয়। কোপারনিকাস, গ্যালিলিও এবং ফ্রান্সিস বেকনের হাত ধরে আধুনিক
বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি হয়।
- ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism): ধর্মকে জীবনের একমাত্র নিয়ামক না ভেবে শিল্প,
সাহিত্য ও রাজনীতিকে ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত করার
চেতনা জাগ্রত হয়।
২. আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁর প্রভাব
রেনেসাঁর সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল মানুষের
রাজনৈতিক চেতনা এবং রাষ্ট্র গঠনের ধারণায়। মধ্যযুগীয় "ঐশ্বরিক অধিকার
তত্ত্ব" (Divine Right Theory), যেখানে রাজাকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি ভাবা হতো,
রেনেসাঁ তা ভেঙে চুরমার করে দেয়।
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁর প্রধান প্রভাবগুলো নিচে
আলোচনা করা হলো:
ক) রাজনীতি ও ধর্মের পৃথকীকরণ (Secular Politics)
রেনেসাঁর আগে রাষ্ট্র ও চার্চ (ধর্ম) ছিল অবিচ্ছেদ্য।
রেনেসাঁ প্রথম এই ধারণা দেয় যে, রাজনীতি একটি সম্পূর্ণ ইহজাগতিক বিষয়। নিকোলো
ম্যাকিয়াভেলি তাঁর বিখ্যাত 'দ্য প্রিন্স'
(The Prince) গ্রন্থে রাজনীতিকে নৈতিকতা ও ধর্মের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ
মুক্ত করেন। তিনি দেখান যে, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা এবং জনকল্যাণের জন্য রাজনীতিকে
বাস্তবসম্মত ও ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে।
খ) ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ ও নাগরিক অধিকার (Individualism)
মানবতাবাদের প্রভাবে রাষ্ট্রচিন্তায় "ব্যক্তি"
বা নাগরিকের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্র যে কেবল শাসকের ইচ্ছায় চলবে না, বরং
নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব—এই চিন্তার বীজ রেনেসাঁই বপন
করেছিল। পরবর্তীতে জন লক, রুশোর মতো দার্শনিকদের "সামাজিক চুক্তি মতবাদ"
(Social Contract Theory) রেনেসাঁর এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের ওপর ভিত্তি করেই
গড়ে ওঠে।
গ) জাতীয়তাবাদের উত্থান (Rise of Nationalism)
মধ্যযুগে ইউরোপে মানুষের আনুগত্য ছিল মূলত চার্চ বা কোনো
স্থানীয় সামন্ত প্রভুর প্রতি। রেনেসাঁর ফলে ভাষা, সংস্কৃতি
এবং ভৌগোলিক ঐক্যের ভিত্তিতে 'জাতি-রাষ্ট্র' (Nation-State) গঠনের ধারণা
শক্তিশালী হয়। মানুষ নিজেদের একটি নির্দিষ্ট জাতি বা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে
ভাবতে শুরু করে, যা আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
ঘ) ঐশ্বরিক ক্ষমতার অবসান ও সার্বভৌমত্ব
রেনেসাঁর প্রভাবে ফরাসি চিন্তাবিদ জঁ বোঁদা (Jean
Bodin) এবং ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবসের লেখায় 'সার্বভৌমত্ব'
(Sovereignty) ধারণার বিকাশ ঘটে। তারা দেখান যে, রাষ্ট্রের
চূড়ান্ত ক্ষমতা কোনো অদৃশ্য ঐশ্বরিক শক্তির হাতে নয়, বরং
রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিহিত।
সংক্ষেপে রেনেসাঁর প্রভাব কাঠামো
|
মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক চিন্তা |
রেনেসাঁ ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা |
|
রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি ছিল ধর্ম ও চার্চের অনুশাসন। |
রাষ্ট্রের ভিত্তি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ এবং
যুক্তিভিত্তিক। |
|
শাসককে ঈশ্বরের প্রতিনিধি মনে করা হতো (জবাবদিহিতা ছিল
না)। |
শাসক ও রাষ্ট্র জনগণের কল্যাণের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। |
|
সমাজ ও রাষ্ট্রে যৌথ বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ই প্রধান
ছিল। |
ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারকে প্রাধান্য
দেওয়া হয়। |
সারসংক্ষেপ: রেনেসাঁ
মানুষকে শেখায় প্রশ্ন করতে। আর এই প্রশ্ন করার মানসিকতাই মধ্যযুগের
সামন্ততান্ত্রিক এবং চার্চ-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে আধুনিক, গণতান্ত্রিক
ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার পথ সুগম করেছিল। আজকের আধুনিক গণতান্ত্রিক
রাষ্ট্র, সংবিধান এবং নাগরিক অধিকারের যে রূপ আমরা দেখি, তার আদি উৎস
লুকিয়ে আছে রেনেসাঁর এই বৌদ্ধিক বিপ্লবের মধ্যেই।
ইউরোপীয় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ছিল চতুর্দশ থেকে ষোড়শ
শতাব্দীতে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান দর্শন, শিল্পকলা
এবং সাহিত্যের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে মধ্যযুগীয় অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে যুক্তি
ও মানবতাবাদ নির্ভর আধুনিক সভ্যতায় প্রবেশের এক বৈপ্লবিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন।
[1,
2,
3]
রেনেসাঁর সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও উৎস
- উৎস: ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও
পরে তা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। [1, 2]
- মানবতাবাদ: রেনেসাঁর মূল দর্শন ছিল 'মানবতাবাদ'
(Humanism), যা ঈশ্বর বা ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে এসে
মানুষকে কেন্দ্র করে চিন্তাভাবনা করতে শেখায়।
[1,
2]
- মুক্তচিন্তা: মধ্যযুগের চার্চ ও ধর্মযাজকদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও
কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মানুষ প্রশ্ন করতে এবং যুক্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করতে
শুরু করে। [1,
2,
3]
- বিজ্ঞান ও শিল্পকলা: লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর মতো
শিল্পীরা শিল্পের জগতে বিপ্লব ঘটান। গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের
ফলে জ্ঞান সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়।
[1,
2,
3]
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁর প্রভাব
আধুনিক গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার
ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল রেনেসাঁর হাত ধরেই। রাষ্ট্রচিন্তায় এর প্রধান প্রভাবগুলো
নিচে দেওয়া হলো:
- ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতি: রেনেসাঁর পূর্বে রাষ্ট্র ও রাজনীতি ধর্মীয় অনুশাসন
দ্বারা পরিচালিত হতো। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি সর্বপ্রথম রাজনীতিকে ধর্ম ও
নৈতিকতা থেকে আলাদা করে তাকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
[1,
2]
- সার্বভৌমত্বের ধারণা: মধ্যযুগের সামন্ততন্ত্র ভেঙে গিয়ে শক্তিশালী ও
এককেন্দ্রিক জাতীয় রাষ্ট্রের (Nation State) উত্থান
ঘটে, যা আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করে।
[1,
2]
- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মানবাধিকার: ব্যক্তির নিজস্ব মতামত, স্বাধীনতা
এবং মর্যাদার ধারণার বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে
আধুনিক গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করে।
[1,
2]
- চুক্তিভিত্তিক সরকার: ঐশ্বরিক বা বংশগত অধিকারের ধারণার পরিবর্তে মানুষ রাষ্ট্র ও শাসকের সম্পর্ককে একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। [1]
দ্যা প্রিন্স (The
Prince) হলো নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি
রচিত একটি বিখ্যাত রাজনৈতিক গ্রন্থ, যা ১৫১৩ সালে লেখা হয়। এ গ্রন্থে ম্যাকিয়াভেলি একজন শাসকের কী কী গুণাবলি
থাকা উচিত তা আলোচনা করেছেন।
১. দ্যা প্রিন্স
অনুযায়ী একজন শাসকের গুণাবলি
- নৈতিকতা ও
নীতিহীনতা: ম্যাকিয়াভেলি বলেন, শাসককে সময় ও
পরিস্থিতি অনুযায়ী নৈতিক ও নীতিহীনতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।
- সাহস ও
বুদ্ধিমত্তা: শাসককে সাহসী ও বুদ্ধিমান হতে হবে।
- কঠোরতা ও দয়া:
শাসককে সময়ে কঠোর ও দয়ালু হতে হবে।
- ভাগ্য ও সৌভাগ্য:
শাসককে ভাগ্য ও সৌভাগ্যের উপর নির্ভর না করে নিজের কর্মের উপর নির্ভর করতে হবে।
২. কেন আধুনিক
রাষ্ট্র চিন্তার জনক বলা হয় ম্যাকিয়াভেলিকে
- রাষ্ট্রকে ধর্ম
থেকে পৃথক করা: ম্যাকিয়াভেলি প্রথম ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে পৃথক করে
দেখেন।
- রাষ্ট্রের
স্বার্থ: তিনি রাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।
- বাস্তববাদী
দৃষ্টিভঙ্গি: ম্যাকিয়াভেলি রাজনীতিকে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখেন,
যা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার
ভিত্তি স্থাপন করে।
৩. মানব প্রকৃতি
সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা
- মানুষ খারাপ:
ম্যাকিয়াভেলি মনে করেন, মানুষ স্বভাবতই
খারাপ এবং স্বার্থপর।
- ভয় ও ভালোবাসা:
শাসককে ভালোবাসার চেয়ে ভয় পাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
- পরিবর্তনশীল:
মানুষ পরিবর্তনশীল, তাই শাসককে
সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে হবে।
ম্যাকিয়াভেলির
দর্শন বিতর্কিত হলেও, আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তায় তার প্রভাব অনস্বীকার্য।
নেকোলো ম্যাকিয়াভেলির (১৪৬৯-১৫২৭) দ্য প্রিন্স গ্রন্থের
আলোকে একজন শাসকের গুণাবলি আলাদাভাবে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো এবং কেন তিনি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক, তার মানব
প্রকৃতি ধারণা উদ্ধৃত ।[banglalecturesheet]
দ্য প্রিন্স এর আলোকে একজন শাসকের গুণাবলি
ম্যাকিয়াভেলি দ্য প্রিন্সে (১৩টি অধ্যায়) শাসককে ক্ষমতা অর্জন ও স্থায়িত্ব লাভের কৌশল
পরামর্শ দিয়েছেন ।[degreesuggestion]
একজন শাসকের থাকা উচিত গুণাবলিগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো:
|
গুণাবলি |
বিস্তারিত বিবরণ |
|
১. শৃগালের বুদ্ধি + সিংহের শক্তি |
শাসকের মধ্যে শৃগালের
চতুরতা ও সিংহের দুর্ধর্ষতা সমন্বয়
ঘটা উচিত; প্রয়োজনবোধে ধর্মবিশ্বাসের ভান বা নাস্তিক্য সাজতে
হবে [banglalecturesheet] |
|
২. ক্ষমতাই পরম লক্ষ্য (উপযােগবাদী) |
নীতি, ধর্ম—কোনোরই নিজস্ব মূল্য নেই; উদ্দেশ্য
সাধনের উপায়মাত্র; রাজনীতি ও ক্ষমতাই শাসকের
পরম লক্ষ্য [banglalecturesheet] |
|
৩. তথ্যবাস্ত্যবাদ (প্র্যাকটিক্যাল ছিল) |
ইতালির দুর্নীতি ও হানাহানি মোকাবেলায় শক্তিকে শক্তি দিয়ে, কৌশলকে
কৌশল দিয়ে মোকাবেলা
অপরিহার্য [banglalecturesheet] |
|
৪. বদান্যতা, দয়াধর্ম
ও ন্যায়পরায়ণতা |
শাসকের পক্ষে বদান্যতা বলে পরিচিত হওয়া ভালো; যথারীতি
দয়া ও ন্যায়পরায়ণতা প্রদর্শন করা উচিত [banglatribune] |
|
৫. ভয় ও ভালোবাসার সমন্বয় |
ভয় ও ভালোবাসা—দুই প্রভাবশালী; কিন্তু
মানুষের আচরণের স্বাভাবিক প্রবণতা ভীতিপ্রদ
মানুষের আনুগত্য স্বীকার করা [banglalecturesheet] |
|
৬. আইনের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস |
একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে শক্তিশালী আইন প্রণেতার প্রয়ােজন
[banglalecturesheet] |
|
৭. রাষ্ট্রের কল্যাণ > ব্যক্তিগত
কল্যাণ |
শাসক ব্যক্তিগত
কল্যাণ অপেক্ষা রাষ্ট্রের কল্যাণকে সর্বদা
বড় করে দেখবে [banglalecturesheet] |
|
৮. অভিজ্ঞতাবাদী ও উপযােগবাদী |
অভিজ্ঞতার নিরিখে প্রতিটি
বিষয় যাচাই করে দেখার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া; অভিজ্ঞতাই
বিচার করবে প্রয়ােজনীয়তা
আছে কিনা [banglalecturesheet] |
|
৯. সর্বাত্মক ক্ষমতা |
রাষ্ট্রের প্রয়ােজনে শাসককে চরম
ক্ষমতার অধিকারী করেছেন;
সর্বাত্মকবাদের জন্ম দেবে [banglalecturesheet] |
ম্যাকিয়াভেলির মতে, শাসক প্রয়োজনে কুটার্গ্যaha, কঠিন ও
ভয়ংকর হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের কল্যাণে সর্বাত্মক
ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে ।[banglalecturesheet]
কেন ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয়?
ম্যাকিয়াভেলী ছিলেন আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তার অগ্রদূত; তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনার
বেড়াজাল থেকে বাস্তবধর্মী
চিন্তার সমাহার ও আধুনিক কিছু মতবাদের ভিত্তি স্থাপন
করেন ।[info-journal]
ম্যাকিয়াভেলির আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক হিসেবে অবদান:
|
অবদান |
বিস্তারিত বিবরণ |
|
১. জাতীয় রাষ্ট্রের প্রথম প্রবক্তা |
ম্যাকিয়াভেলি জাতীয়
রাষ্ট্রের ধারণা দিলে তা
সমগ্র ইউরোপে আলােড়ন সৃষ্টি করে; বহুধাবিভক্ত ইতালিকে একত্রিত করতে শক্তিশালী জাতীয় রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রদান [banglalecturesheet] |
|
২. রাজনীতি ও নীতিশাস্ত্র পৃথক |
তিনিই প্রথম দুন্যদার্শনিক যিনি রাজনীতিকে নীতিশাস্ত্র ও ধর্ম থেকে পৃথক করে ঘোষণা; 'প্রিন্স'
গ্রন্থে প্রচলিত নৈতিকতাকে নাকচ করে [banglalecturesheet] |
|
৩. অভিজ্ঞতাবাদী |
অভিজ্ঞতার নিরিখে প্রতিটি
বিষয় যাচাই করে দেখার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হতেন; তৎকালীন
ইতালির আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনা পর্যাবেক্ষণ [banglalecturesheet] |
|
৪. উপযােগবাদী |
অভিজ্ঞতাই বিচার করবে কোনাে
কিছুর উপযােগিতা বা প্রয়ােজনীয়তা আছে কিনা [banglalecturesheet] |
|
৫. সর্বাত্মকবাদী |
রাষ্ট্রের প্রয়ােজনে শাসককে চরম
ক্ষমতার অধিকারী করেছেন;
রাষ্ট্রের কল্যাণ > ব্যক্তিগত কল্যাণ; সর্বাত্মকবাদের
জন্ম দেবে [banglalecturesheet] |
|
৬. রাজনীতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি |
তিনিই সর্বপ্রথম রাজনীতিকে
বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন;
এরিস্টটলের মতাে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মিল পাওয়া যায় [banglalecturesheet] |
|
৭. আইনের শাসন |
আইনের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী;
শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে শক্তিশালী
আইন প্রণেতার প্রয়ােজন
[banglalecturesheet] |
|
৮. ধর্ম ও নৈতিকতা পৃথক |
ধর্ম ও নৈতিকতাকে রাজনীতি থেকে পৃথক করা ম্যাকিয়াভেলীর পূর্বে অপর কোন দার্শনিকের পক্ষে
সম্ভবপর হয়নি [banglalecturesheet] |
যদি ষোড়শ শতাব্দীতে ম্যাকিয়াভেলির আবির্ভাব না হতো,
তবে হয়তো আধুনিক
চিন্তার জগত আরও দীর্ঘদিন বিলম্ব করত ।[info-journal]
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা
ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম
ভিত্তি হলাে মানব প্রকৃতি ও মানুষের মনােভাব
সম্পর্কে তার ধারণা ।[banglalecturesheet]
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা:
|
ধারণা |
বিস্তারিত বিবরণ |
|
ধারণা |
বিস্তারিত বিবরণ |
|
১. মানুষ অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল,
ভীরু, শঠ, লােভী |
ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, প্রকৃতিগতভাবেই
মানুষ খারাপ; মানুষের মধ্যে কোন ভাল গুণ নেই; মানুষকে অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল,
ভীরু, শঠ ও লােভী রূপে
চিহ্নিত করেছেন [banglalecturesheet] |
|
২. ভয়, ক্ষমতা,
লিপ্সা, দম্ভ, স্বার্থপরতা |
তার মতে, ভয়,
ক্ষমতা, লিপ্সা, দম্ভ এবং
স্বার্থপরতা প্রভৃতি
মানুষকে যাবতীয় কাজকর্মের প্রেরণা যােগায়; মানুষ
নিজের স্বার্থের দ্বারা পরিচালিত হলেও নির্বুদ্ধিতা ও যুক্তিহীনতার ফলে সেই
স্বার্থ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেই [banglalecturesheet] |
|
৩. চরম স্বার্থপর ও আক্্রমণপ্রবণ |
মানুষের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য চরম স্বার্থপরতা ও আক্রমণ প্রবণতা; সকল
ক্ষেত্রে চরম প্রাপ্তি লাভের বাসনা সীমাহীন; ক্ষমতা বা
সম্পদের আকাঙ্ক্ষার কারণে মানুষ অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছে [banglalecturesheet] |
|
৪. কাপুরুষ ও অযােগ্য |
মানুষ নিজের কাপুরুষতা
ও অযােগ্যতার কারণে
নিজেকে অপরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়; শাসনব্যবস্থার
সৃষ্টি হয়েছে এই কারণেই [banglalecturesheet] |
|
৫. স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা |
মানুষের উচ্চাশার মধ্যে স্বাধীনতার
আকাক্ষা; মানুষ অপরের অধীনতা থেকে মুক্তি পেতে চায়; অন্যকে
অধীন করার বাসনা পিছনে
রয়েছে; নিজের স্বাধীনতা চাওয়া এবং অন্যের ওপর প্রভুত্ব
বিস্তার এ দু'য়ে মিলে সংঘাত
সষ্টি হয় [banglalecturesheet] |
|
৬. ভয় ও ভালোবাসা |
মানুষের আচরণের মাঝে ভয় ও
ভালােবাসা পরিলক্ষিত
হয়; যে ব্যক্তি ভালােবাসা লাভের অধিকারী এবং যে ব্যক্তি
ভীতিপ্রদ তারা উভয়ই প্রভাবশালী; কিন্তু মানুষের আচরণের স্বাভাবিক প্রবণতা ভীতিপ্রদ মানুষের আনুগত্য স্বীকার করা [banglalecturesheet] |
ম্যাকিয়াভেলি তার সমকালীন মানুষকে যেমন দেখেছেন,
তাদের চরিত্রকে তিনি সেভাবেই
অংকন করেছেন ।[banglalecturesheet]
নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি ও "দ্য প্রিন্স"
পটভূমি
ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯–১৫২৭) ছিলেন ফ্লোরেন্সের একজন
কূটনীতিক ও রাজনৈতিক দার্শনিক। মেদিচি পরিবারের পতনের পর তিনি বন্দী ও নির্বাসিত
হন এবং সেই অবসরেই লেখেন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ "Il
Principe" বা "দ্য প্রিন্স" (১৫১৩)। এটি কোনো আদর্শ
রাজ্যের স্বপ্ন নয় — বরং ক্ষমতার কঠোর বাস্তবতার একটি ঠান্ডা বিশ্লেষণ।
এক. দ্য প্রিন্সে শাসকের গুণাবলি
১. ভার্চু (Virtù) — শাসকের
অন্তর্নিহিত শক্তি
ম্যাকিয়াভেলির "Virtù" খ্রিস্টীয়
নৈতিকতার "সদগুণ" নয়। এটি হলো শাসকের সেই বিশেষ ক্ষমতা যা দিয়ে তিনি
পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে আনতে পারেন — সাহস, দূরদর্শিতা,
দৃঢ় সংকল্প এবং প্রয়োজনে নিষ্ঠুরতা। Virtù সম্পন্ন
শাসক "Fortuna" অর্থাৎ ভাগ্যের ঘূর্ণিকে বশ করতে পারেন।
"ভাগ্য একজন নারীর মতো — তাকে প্রশমিত করতে হলে তাকে আঘাত
করা ও টেনে ধরা দরকার।" — ম্যাকিয়াভেলি
২. সিংহ ও শেয়াল — দ্বৈত চরিত্র
ম্যাকিয়াভেলি বলেন একজন শাসককে একই সঙ্গে সিংহ ও শেয়াল
হতে হবে। সিংহ দেয় শক্তি ও ভয়, আর শেয়াল দেয় চালাকি ও কূটবুদ্ধি। শুধু
সিংহ হলে ফাঁদে পড়তে হয়, শুধু শেয়াল হলে নেকড়ের কাছে মার খেতে হয়।
৩. ভয় না ভালোবাসা — কোনটি শ্রেষ্ঠ?
এটি "দ্য প্রিন্স"-এর সবচেয়ে বিখ্যাত প্রশ্ন।
ম্যাকিয়াভেলির উত্তর স্পষ্ট — দুটি একসাথে থাকলে ভালো, কিন্তু যদি
একটাই বেছে নিতে হয় তাহলে ভয়ই শ্রেষ্ঠ। কারণ মানুষ ভালোবাসার চেয়ে ভয়ের বন্ধন
বেশি মানে। তবে শাসক যেন ঘৃণার পাত্র না হন — এটি সর্বনাশা।
৪. বাহ্যিক চরিত্র প্রদর্শন
শাসককে দয়ালু, বিশ্বস্ত,
মানবিক, সরল ও ধার্মিক দেখাতে হবে — কিন্তু প্রয়োজনে এর বিপরীত
আচরণ করার মানসিক প্রস্তুতিও রাখতে হবে। ম্যাকিয়াভেলি বলেন, মানুষ চোখ
দিয়ে বিচার করে, বুদ্ধি দিয়ে নয়।
৫. নিজস্ব সেনাবাহিনী
ভাড়াটে সৈন্য (mercenaries) বা মিত্রের
সৈন্যের উপর নির্ভর করা বিপজ্জনক। শাসকের নিজস্ব সেনা থাকা আবশ্যক — কারণ এটিই
ক্ষমতার ভিত্তি।
৬. ক্রূরতার সঠিক ব্যবহার
ম্যাকিয়াভেলি "নিষ্ঠুরতাকে ভালোভাবে ব্যবহার
করা" (cruelties well used) এবং "খারাপভাবে ব্যবহার করা"-র
মধ্যে পার্থক্য করেন। একবারে এবং দ্রুত ক্রূরতা করলে তা ভুলে যায়; ধীরে ধীরে
করলে তা ঘৃণার জন্ম দেয়।
৭. উপদেষ্টা নির্বাচন
ম্যাকিয়াভেলি বলেন একজন শাসকের চরিত্র বোঝা যায় তাঁর
উপদেষ্টাদের দেখে। চাটুকারদের এড়িয়ে সত্যিকারের পরামর্শদাতা রাখতে হবে — তবে
পরামর্শ নেওয়ার ক্ষমতা শাসকেরই থাকা চাই।
দুই. কেন ম্যাকিয়াভেলি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক?
ম্যাকিয়াভেলিকে "আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের
জনক" বলা হয় কারণ তিনিই প্রথম রাজনীতিকে ধর্ম ও নৈতিকতার বাইরে নিয়ে গিয়ে
একটি স্বাধীন বিষয় হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন।
মধ্যযুগের ধারণা: রাষ্ট্র
ঈশ্বরের বিধানের অধীন। রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি। পোপের কর্তৃত্ব সর্বোচ্চ।
ম্যাকিয়াভেলির বিপ্লব: রাষ্ট্র
একটি স্বাধীন সত্তা। এর নিজস্ব যুক্তি ও স্বার্থ আছে। রাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হলো
ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ও রাষ্ট্রের মঙ্গল নিশ্চিত করা — স্বর্গীয় পুরস্কার পাওয়া
নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি তৈরি করে
দেয়:
Raison d'État (রাষ্ট্রের কারণ): রাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ যেকোনো ব্যক্তিনৈতিকতার
ঊর্ধ্বে। এই ধারণাটি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হয়।
ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি: ম্যাকিয়াভেলিই
প্রথমবারের মতো পরিষ্কারভাবে বলেন যে ধর্ম রাষ্ট্রের হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু
রাষ্ট্র ধর্মের হাতিয়ার নয়। এই চিন্তাধারাই পরবর্তীতে লক, হবস,
রুশো ও মন্টেস্কুর ধারায় প্রবাহিত হয়।
অভিজ্ঞতাভিত্তিক পদ্ধতি: তিনি ইতিহাস
ও বাস্তব ঘটনা থেকে রাজনৈতিক তত্ত্ব তৈরি করেছেন — ধর্মগ্রন্থ থেকে নয়। এটি
সামাজিক বিজ্ঞানের আধুনিক পদ্ধতির পূর্বসূরি।
তিন. মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা
ম্যাকিয়াভেলির সমগ্র রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তিতে রয়েছে
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে একটি গভীর নৈরাশ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর মতে:
মানুষ মূলত অকৃতজ্ঞ
— সুদিনে বিশ্বস্ত, বিপদে পালিয়ে যায়। মানুষ স্বার্থপর
— সবসময় নিজের লাভের কথা ভাবে। মানুষ ভীরু
— ভয়ের কাছে মাথা নোয়ায়। মানুষ লোভী
— পিতার মৃত্যু ভুলতে পারে, সম্পত্তির ক্ষতি ভুলতে পারে না। মানুষ পরিবর্তনশীল — অবস্থার
সাথে মত বদলায়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তাঁর সকল রাজনৈতিক পরামর্শ বের
হয়েছে। শাসক যদি মানুষকে সৎ ও বিশ্বস্ত ভেবে কাজ করেন, তাহলে
অনিবার্যভাবে ধ্বংস হবেন। তাই শাসককে মানুষকে যেমন আছে তেমনভাবেই দেখতে হবে — যেমন
হওয়া উচিত তেমন নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে টমাস হবসের "Leviathan"-এ আরো তীব্র
হয় — যেখানে হবস বলেন মানুষের প্রকৃতিগত জীবন "solitary, poor,
nasty, brutish and short"।
সমালোচনা ও পুনর্মূল্যায়ন
ম্যাকিয়াভেলি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিন্দিত হয়েছেন।
"Machiavellian" শব্দটি আজও চালাক ও নিষ্ঠুর রাজনীতির প্রতীক। তবে আধুনিক
পণ্ডিতরা বলেন তিনি আসলে রাজনীতির কুৎসিত সত্যটিকে সাহসের সাথে উন্মোচন করেছেন —
উদ্ভাবন করেননি। তিনি ছিলেন বাস্তবতার নির্মম পর্যবেক্ষক, নৈতিকতার
শত্রু নন।
নিচে **‘দ্যা
প্রিন্স’** গ্রন্থের আলোকে শাসকের গুণাবলি, ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলার
কারণ এবং মানবপ্রকৃতি সম্পর্কে তার ধারণা আলোচনা করা হলো।
### ১. ‘দ্যা
প্রিন্স’-এর আলোকে শাসকের কাঙ্ক্ষিত গুণাবলি
ম্যাকিয়াভেলি তার
গ্রন্থে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শাসকের জন্য নিচের গুণাবলি অপরিহার্য বলে মনে করেন:
- **বাস্তববাদী ও
নৈতিকতাহীন (Amoral) ক্ষমতার
ব্যবহার:** শাসককে খ্রিস্টান নৈতিকতা বা আদর্শবাদী কল্পনা ছেড়ে দিতে হবে।
রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাই মূল লক্ষ্য – সফল হতে হলে প্রয়োজনে প্রতারণা,
নিষ্ঠুরতা ও বিশ্বাসভঙ্গ
করা যেতে পারে।
- **সিংহ ও শেয়ালের
গুণ:** শাসকের মধ্যে থাকবে সিংহের মতো শক্তি ও ভীতি সৃষ্টির ক্ষমতা, আবার শেয়ালের মতো কৌশলী ও প্রতারণাপ্রবণ
বুদ্ধি। সরল শক্তি যথেষ্ট নয়, বিপদ বুঝে ফাঁদ
এড়ানোর ক্ষমতা জরুরি।
- **ভালোবাসার চেয়ে
ভয় জাগানো ভালো:** প্রজাদের ভালোবাসা অনিশ্চিত, কিন্তু ভয় স্থায়ী। তবে শাসক যেন ঘৃণার পাত্র না
হয় – তাই সম্পদ বা সম্মানহানি না করে, প্রয়োজনে কাউকে শাস্তি দিলেও তা ন্যায়সংগত ও সীমিত আকারে করতে হবে।
- **নমনীয়তা ও
পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ:** শাসক যেন নির্দিষ্ট কোনো নৈতিক কাঠামোতে আবদ্ধ না
থাকেন। উদার বা কৃপণ, দয়ালু বা নিষ্ঠুর
– সবই প্রয়োজনে হতে পারে। সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী স্বভাব বদলানোর ক্ষমতাই সফল
শাসকের চাবিকাঠি।
- **সেনাবাহিনীর ওপর
পূর্ণ কর্তৃত্ব:** ভাড়াটে বা মিত্রবাহিনী নয়, শাসকের নিজস্ব শক্তিশালী ও অনুগত সেনাবাহিনী
থাকা আবশ্যক। অন্যথায় রাষ্ট্র অস্থির।
- **জনগণের সমর্থন
ধরে রাখা:** যদিও ভয় জাগানো জরুরি, তবু গণবিরোধী
আচরণ নয়। সাধারণ মানুষ স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা চায় – শাসক যদি তা দিতে পারেন তবে
তারা তাকে মেনে নেবে।
### ২. কেন
ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয়?
১. **রাজনীতিকে
নৈতিকতা ও ধর্ম থেকে পৃথককরণ:** তার আগে রাজনীতি ধর্মতত্ত্বের অধীন ছিল (যেমন
আউগুস্তিনুস, আควিনাস)। ম্যাকিয়াভেলিই প্রথম দেখান যে রাষ্ট্রের
লক্ষ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং তা নৈতিকতার মাপকাঠিতে বিচার্য নয়। এটিই আধুনিক রাজনীতি
বিজ্ঞানের সূচনা।
২. **বাস্তববাদী
রাষ্ট্রচিন্তা (Realism):** তিনি ‘রাষ্ট্র
কেমন হওয়া উচিত’ নয় বরং ‘রাষ্ট্র কীভাবে প্রকৃতপক্ষে কাজ করে’ তা বিশ্লেষণ করেন।
ক্ষমতার বাস্তব কৌশল, ছলচাতুরি,
প্রয়োজনে নিষ্ঠুরতা –
সবকিছুকে স্বীকার করে নেন। এটিই পরবর্তী আধুনিক কূটনীতি ও রিয়েলপলিটিকের ভিত্তি।
৩. **সার্বভৌম
রাষ্ট্রের ধারণা:** তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রতিযোগী
কোনো ক্ষমতা (গির্জা, সামন্ত প্রভু)
থাকবে না। শাসকের একচ্ছত্র ও সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব থাকবে – যা পরে জঁ বোদাঁ ও হবসের
সার্বভৌমত্ব তত্ত্বকে প্রভাবিত করে।
৪. **রাজনীতি
বিজ্ঞানকে যুক্তির ভিত্তিতে বিশ্লেষণ:** ধর্মীয় ব্যাখ্যার পরিবর্তে ইতিহাস ও
সমসাময়িক ঘটনার যৌক্তিক বিশ্লেষণ দিয়ে তিনি রাজনৈতিক সাফল্য-ব্যর্থতা ব্যাখ্যা
করেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এটিই মূল পদ্ধতি।
### ৩. মানবপ্রকৃতি
সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা
ম্যাকিয়াভেলির
মানবপ্রকৃতি বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি **নেতিবাচক ও বাস্তববাদী**:
- **মানুষ স্বভাবতই
অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল, ভণ্ড ও লোভী:** তিনি মনে করেন মানুষ সহজে বিপদ
এড়ায় কিন্তু সুযোগ পেলে লাভের আশায় প্রতারণা করে। প্রয়োজনে তারা সহজেই পূর্বের
আনুগত্য ভুলে যায়।
- **স্বার্থপরতা ও
ভয়প্রবণতা:** মানুষ মূলত নিজের স্বার্থ দেখে। ভালোবাসার চেয়ে ভয় তাদের বেশি
নিয়ন্ত্রণ করে – কারণ ভয়ের বাস্তব শাস্তি আছে, ভালোবাসা কেবল মানসিক বন্ধন।
- **প্রাপ্তির ইচ্ছা
অশেষ:** মানুষের কখনো সীমিত সম্পদে তুষ্টি নেই – তারা সব সময় বেশি পাওয়ার
আকাঙ্ক্ষা করে। তাই শাসক কখনো জনগণের ভালোবাসার ওপর নির্ভর করতে পারেন না।
- **ভরসা করা যায়
না:** শাসকের প্রতি জনগণের আনুগত্য যতক্ষণ উপকার পায় ততক্ষণ। বিপদ এলে বা অন্য
কোনো লোভনীয় সুযোগ এলে তারা সহজেই শাসকের বিরুদ্ধে যায়।
**উপসংহার:** এই
নেতিবাচক মানবদর্শনের ওপর ভিত্তি করেই ম্যাকিয়াভেলি শাসককে সতর্ক করেন – কাউকে
অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে বরং ভয় ও শক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্র চালাতে হবে। তার এই
যুক্তিই আধুনিক রাজনীতিতে বাস্তবনীতির পথিকৃত।
দ্য প্রিন্স–এর আলোকে
একজন শাসকের গুণাবলি
The Prince গ্রন্থে Niccolò Machiavelli আদর্শবাদী
নয়, বরং বাস্তববাদী শাসকের চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে রাষ্ট্রের স্থিতি,
নিরাপত্তা ও ক্ষমতা রক্ষা সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য
একজন শাসকের মধ্যে নিম্নলিখিত গুণাবলি থাকা উচিত—
১. বাস্তববাদিতা (Pragmatism)
শাসককে বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কল্পনা বা নৈতিক আদর্শের চেয়ে বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২. দৃঢ়তা ও সাহস
সংকটকালে দ্রুত ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকতে
হবে। দুর্বলতা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
৩. কৌশলী ও বিচক্ষণ হওয়া
ম্যাকিয়াভেলি বলেন, শাসককে
"শিয়ালের মতো ধূর্ত" এবং "সিংহের মতো শক্তিশালী" হতে হবে।
শিয়ালের মতো ষড়যন্ত্র বুঝতে হবে এবং সিংহের মতো শত্রুকে দমন করতে হবে।
৪. জনগণের সমর্থন অর্জন
শাসকের প্রতি জনগণের সমর্থন থাকলে রাষ্ট্র অধিক
স্থিতিশীল হয়। তাই জনগণের আস্থা বজায় রাখা জরুরি।
৫. প্রয়োজনে কঠোরতা প্রদর্শন
ম্যাকিয়াভেলির মতে, কখনও কখনও
রাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর বা নিষ্ঠুর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন হতে পারে।
৬. দূরদর্শিতা
সম্ভাব্য বিপদ ও ষড়যন্ত্র আগে থেকেই অনুমান করে
ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে।
৭. সুনাম ও ভাবমূর্তি রক্ষা
শাসকের উচিত দয়ালু, ন্যায়পরায়ণ,
ধর্মপরায়ণ ও বিশ্বস্ত বলে পরিচিত হওয়া, যদিও
প্রয়োজনে বাস্তব রাজনৈতিক কারণে ভিন্ন আচরণ করতে হতে পারে।
৮. সামরিক দক্ষতা
রাষ্ট্ররক্ষার জন্য শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও সামরিক
নেতৃত্ব অপরিহার্য। ম্যাকিয়াভেলি ভাড়াটে সৈন্যের পরিবর্তে জাতীয় সেনাবাহিনীর
উপর জোর দিয়েছিলেন।
কেন ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয়?
Niccolò Machiavelli-কে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয়
কয়েকটি কারণে।
১. রাজনীতিকে ধর্ম ও নৈতিকতা থেকে পৃথক করেন
মধ্যযুগে রাজনীতি ধর্মীয় নীতির অধীন ছিল। ম্যাকিয়াভেলি
প্রথম রাজনীতিকে একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে বিশ্লেষণ করেন।
২. বাস্তববাদী রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
তিনি "রাষ্ট্র কী হওয়া উচিত" তা নয়, বরং
"রাষ্ট্র বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হয়" তা ব্যাখ্যা করেছেন।
৩. রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেন
চার্চ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে রাষ্ট্রকে
রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
৪. ক্ষমতার বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ
ক্ষমতা অর্জন, সংরক্ষণ ও
সম্প্রসারণের কৌশল নিয়ে তিনি পদ্ধতিগত আলোচনা করেন।
৫. জাতিরাষ্ট্র ধারণার বিকাশে অবদান
তাঁর চিন্তা শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থার
পক্ষে ছিল, যা পরবর্তীকালে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনে প্রভাব ফেলে।
৬. আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তি নির্মাণ
পরবর্তীকালে Thomas Hobbes, John Locke এবং Jean-Jacques
Rousseau-এর রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে তাঁর বাস্তববাদী পদ্ধতির প্রভাব দেখা যায়।
সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন
ম্যাকিয়াভেলি রাজনীতিকে ধর্মীয় ও নৈতিক আদর্শের গণ্ডি
থেকে বের করে বাস্তব, স্বতন্ত্র ও বৈজ্ঞানিক আলোচনার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা
করেন। এজন্যই তাঁকে "আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক" বলা হয়।
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা
ম্যাকিয়াভেলির মানব প্রকৃতির ধারণা ছিল তুলনামূলকভাবে
নৈরাশ্যবাদী (pessimistic)।
১. মানুষ স্বার্থপর
মানুষ মূলত নিজের স্বার্থ ও লাভের জন্য কাজ করে।
২. মানুষ অকৃতজ্ঞ
উপকার পেলে মানুষ তা দ্রুত ভুলে যায়, কিন্তু
ক্ষতি হলে দীর্ঘদিন মনে রাখে।
৩. মানুষ ভীতু ও সুযোগসন্ধানী
বিপদের সময় অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়।
৪. মানুষ পরিবর্তনশীল
পরিস্থিতি বদলালে মানুষের আনুগত্য ও মতামতও পরিবর্তিত
হতে পারে।
৫. সম্পদের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেশি
ম্যাকিয়াভেলি উল্লেখ করেন যে মানুষ প্রায়ই পিতার
মৃত্যুর চেয়ে সম্পত্তি হারানোর বিষয় বেশি মনে রাখে—এর মাধ্যমে তিনি সম্পদের
প্রতি মানুষের প্রবল আসক্তি বোঝাতে চেয়েছেন।
৬. ভয় ভালোবাসার চেয়ে বেশি কার্যকর
তাঁর বিখ্যাত মত হলো:
যদি উভয়টি একসঙ্গে সম্ভব না হয়, তবে শাসকের
জন্য ভালোবাসার চেয়ে ভয়ের পাত্র হওয়া অধিক নিরাপদ।
তবে তিনি এটাও বলেন যে শাসকের এমন আচরণ করা উচিত নয়
যাতে জনগণ তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে।
উপসংহার
ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা
ও ক্ষমতার সংরক্ষণ। দ্য প্রিন্স-এ তিনি এমন
একজন শাসকের কথা বলেছেন যিনি বাস্তববাদী, কৌশলী,
দৃঢ়চেতা ও দূরদর্শী। মানব প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল যে মানুষ মূলত
স্বার্থপর, পরিবর্তনশীল ও সুযোগসন্ধানী। রাজনীতিকে ধর্ম ও নৈতিকতার
প্রভাবমুক্ত করে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করার কারণে ম্যাকিয়াভেলি
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক হিসেবে স্বীকৃত।
**ম্যাকিয়াভেল্লির
*দ্যা প্রিন্স* (The Prince) এর আলোকে শাসকের
গুণাবলি, আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তায় তার অবদান এবং মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা**
নিকোলো
ম্যাকিয়াভেল্লি (১৪৬৯–১৫২৭) তার বিখ্যাত গ্রন্থ *দ্যা প্রিন্স* (১৫১৩)-এ
বাস্তববাদী (realist) রাজনীতির এক
অসাধারণ চিত্র তুলে ধরেছেন। এটি কোনো নৈতিক উপদেশমূলক গ্রন্থ নয়, বরং ক্ষমতা ধরে রাখা ও ব্যবহার করার বাস্তব
কৌশলের নির্দেশিকা।
### ১. *দ্যা
প্রিন্স*-এর আলোকে একজন শাসকের গুণাবলি
ম্যাকিয়াভেল্লি
মনে করতেন, একজন আদর্শ
শাসককে **সিংহ ও শৃগাল** উভয়ের গুণ থাকতে হবে — শক্তি ও কৌশলের সমন্বয়। শাসকের
প্রধান লক্ষ্য হলো **ক্ষমতা অর্জন, ধরে রাখা এবং
বৃদ্ধি করা**। নৈতিকতা বা ধর্ম এখানে গৌণ।
#### প্রধান গুণাবলি:
- **বাস্তববাদিতা (Pragmatism)**:
“Ends justify the means” — উদ্দেশ্য সাধনের
জন্য যেকোনো উপায় (ভালো বা মন্দ) গ্রহণযোগ্য। শাসককে পরিস্থিতি অনুসারে নমনীয় হতে
হবে।
- **Fortuna (ভাগ্য) ও Virtù
(গুণ/ক্ষমতা)**: ভাগ্যকে
নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শাসকের ব্যক্তিগত দক্ষতা (virtù) থাকতে হবে। ভাগ্য নারীর মতো — যে তাকে জোর করে
নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে-ই সফল।
- **Lion & Fox (সিংহ ও শৃগাল)**:
শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি চাতুর্য ও প্রতারণার ক্ষমতা। শাসককে মানুষের সামনে
**দয়ালু, সৎ, ধার্মিক ও বিশ্বস্ত** দেখাতে হবে, কিন্তু প্রয়োজনে এসব গুণ ত্যাগ করতে পারতে হবে।
- **Fear vs Love**: শাসককে ভালোবাসার
চেয়ে **ভয়** সৃষ্টি করা উচিত। কারণ ভালোবাসা পরিবর্তনশীল, কিন্তু ভয় নির্ভরযোগ্য। তবে ঘৃণা এড়িয়ে চলতে
হবে।
- **সেনাবাহিনী ও
আইন**: নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তোলা (ভাড়াটে সৈন্য নয়) এবং আইনের মাধ্যমে শৃঙ্খলা
রক্ষা।
- **দৃষ্টান্তমূলক
নেতৃত্ব**: শাসককে দৃঢ়, সিদ্ধান্তমূলক ও
দূরদর্শী হতে হবে। তিনি যুদ্ধকৌশল, কূটনীতি ও
অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে পারদর্শী হবেন।
- **চরিত্রের
নমনীয়তা**: “A prince must be a great simulator and dissimulator” — শাসককে চমৎকার অভিনেতা হতে হবে।
ম্যাকিয়াভেল্লি
সিজার বোর্জিয়া-কে আদর্শ শাসকের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যিনি নিষ্ঠুরতা ও কৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতা
প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
### ২. কেন
ম্যাকিয়াভেল্লিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয়?
ম্যাকিয়াভেল্লি
রাজনীতিকে **ধর্ম ও নৈতিকতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা** একটি বিজ্ঞানে পরিণত করেন। এটিই
তাঁকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক করে তোলে।
- **ধর্মনিরপেক্ষ
রাজনীতি**: মধ্যযুগে রাষ্ট্র ছিল ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্বকারী (Divine Right
of Kings)। ম্যাকিয়াভেল্লি বললেন — রাজনীতি মানুষের জন্য,
ঈশ্বরের জন্য নয়। এটি
পরবর্তীকালে হবস, লক, রুশো প্রমুখ চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করে।
- **বাস্তববাদী
বিশ্লেষণ (Political Realism)**: তিনি ইতিহাস ও
বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাজনীতি বিশ্লেষণ করেন, আদর্শবাদী কল্পনা নয়। এই পদ্ধতি আধুনিক
রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভিত্তি।
- **রাষ্ট্রের
সার্বভৌমত্ব**: শাসকের ক্ষমতা অসীম এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ সর্বোচ্চ — এই ধারণা
জাতিরাষ্ট্রের (Nation-State) আধুনিক ধারণাকে
শক্তিশালী করে।
- **ক্ষমতার
রাজনীতি**: ক্ষমতা কীভাবে অর্জিত হয়, ধরে রাখা হয় এবং ব্যবহৃত হয় — এই বিষয়গুলোকে তিনি প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষভাবে
আলোচনা করেন।
- **প্রভাব**: তার
চিন্তা ১৯শ ও ২০শ শতাব্দীর বাস্তববাদী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্ব (Hans
Morgenthau), আধুনিক কূটনীতি, এমনকি রাজনৈতিক প্রচার ও নেতৃত্বশৈলীতে এখনও
প্রতিফলিত হয়।
তিনি রাজনীতিকে
“যা আছে” তা নিয়ে চিন্তা করতে শিখিয়েছেন, “যা হওয়া উচিত” নিয়ে নয়। এটিই আধুনিকতার সারকথা।
### ৩. মানব প্রকৃতি
সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেল্লির ধারণা
ম্যাকিয়াভেল্লির
মতে মানুষ মূলত **স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ, পরিবর্তনশীল ও দুর্বল**।
- মানুষ স্বভাবতই
**দুষ্ট** (wicked) এবং সুযোগ পেলে
নিজের স্বার্থের জন্য অন্যায় করবে।
- তারা **ভয়** ও
**স্বার্থ** দিয়ে নিয়ন্ত্রণযোগ্য, ভালোবাসা বা
আদর্শ দিয়ে নয়।
- মানুষ অকৃতজ্ঞ ও
বিশ্বাসঘাতক — আজ যে তোমাকে সমর্থন করে, কাল সে-ই বিপক্ষে চলে যেতে পারে।
- তাই শাসককে সবসময়
সতর্ক থাকতে হবে এবং মানুষের দুর্বলতাগুলোকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে।
এই নৈরাশ্যবাদী
মানবদর্শন থেকেই তার বাস্তববাদী রাজনীতির উদ্ভব। তিনি বলেন, যে শাসক মানুষকে ভালো মনে করে শাসন করে,
সে শীঘ্রই ধ্বংস হয়।
### উপসংহার
*দ্যা প্রিন্স*
একটি নির্মম বাস্তবতার গ্রন্থ। এটি নৈতিকতাহীন বলে সমালোচিত হলেও, এর মাধ্যমে ম্যাকিয়াভেল্লি রাজনীতিকে একটি
স্বাধীন বিজ্ঞানে রূপান্তরিত করেন। আজকের বিশ্বে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার খেলা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার
জন্য তার চিন্তা এখনও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
তবে তিনি নিজে
ছিলেন প্রজাতান্ত্রিক (republican)। *Discourses
on Livy* গ্রন্থে তিনি
প্রজাতন্ত্রের গুণকীর্তন করেছেন। *দ্যা প্রিন্স* মূলত অস্থির সময়ে একজন শক্তিশালী
শাসকের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য প্রিন্স' (The Prince)-এ আদর্শবাদী
বা কাল্পনিক কোনো রাষ্ট্রের কথা বলেননি, বরং রাষ্ট্র
যেভাবে চলে—অর্থাৎ বাস্তব রাজনীতির (Realpolitik) এক নির্মম ও
নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছেন। মানব প্রকৃতি, শাসকের
গুণাবলি এবং রাজনীতির চালচিত্র নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ তৎকালীন সমাজকে কাঁপিয়ে
দিয়েছিল।
আপনার প্রশ্নোত্তরে ম্যাকিয়াভেলির এই তিনটি মূল দর্শন
নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. 'দ্য প্রিন্স' এর আলোকে
একজন শাসকের গুণাবলি
ম্যাকিয়াভেলির মতে, একজন শাসকের
প্রধান লক্ষ্য হলো—যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা এবং রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য
অর্জনের জন্য একজন প্রিন্স বা শাসকের মধ্যে নিম্নলিখিত গুণাবলি থাকা আবশ্যক:
- সিংহ ও শৃগালের গুণ (The Lion and the Fox):
ম্যাকিয়াভেলি বলেন, একজন
শাসককে একই সাথে সিংহ এবং শিয়ালের মতো হতে হবে। সিংহের মতো শক্তিশালী ও সাহসী
হতে হবে যেন সে নেকড়েদের (শত্রুদের) ভয় দেখাতে পারে; আবার শিয়ালের মতো চতুর হতে হবে যেন সে পাতা ফাঁদ বা
ষড়যন্ত্র চিনে তা এড়াতে পারে। কেবল শক্তি দিয়ে বা কেবল বুদ্ধি দিয়ে শাসন করা
সম্ভব নয়।
- ভালো মানুষের মুখোশ ধারণ: শাসককে বাইরে দয়ালু, বিশ্বস্ত,
মানবিক এবং ধার্মিক হিসেবে প্রদর্শন করতে হবে।
কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজনে বা ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে এই গুণগুলোর বিপরীত কাজ
করতেও দ্বিধাবোধ করা চলবে না। অর্থাৎ, গুণের
চেয়ে গুণের "প্রদর্শন" বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
- ভাগ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ (Virtù vs. Fortuna):
ম্যাকিয়াভেলির দর্শনে 'ফরচুনা'
বা ভাগ্য হলো একটি অশান্ত নদীর মতো। একজন দক্ষ শাসক
তাঁর মেধা, সাহস ও কৌশল (Virtù) দিয়ে
এই ভাগ্যের নদীকে বাঁধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন।
- নিষ্ঠুরতার সঠিক প্রয়োগ: ম্যাকিয়াভেলি নিষ্ঠুরতাকে পুরোপুরি বর্জন করতে
বলেননি। তাঁর মতে, ক্ষমতা দখলের শুরুতে যদি নিষ্ঠুরতা দেখাতেই হয়,
তবে তা একবারে এবং দ্রুত শেষ করতে হবে, যেন জনগণ প্রতিদিন ভয়ে না বাঁচে। প্রতিদিন ছোট ছোট
অত্যাচার করার চেয়ে একবারে কঠোর হওয়া ভালো।
"রাজনীতিতে শেষ কথা হলো ফলাফল। যদি শাসক রাষ্ট্র রক্ষা
করতে পারেন, তবে তার গৃহীত সব উপায়ই জনগণের কাছে গৌরবময় ও বৈধ বলে
গণ্য হবে।" — নিকোলো
ম্যাকিয়াভেলি (দ্য প্রিন্স)
২. মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা
ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর চরম নেতিবাচক ও হতাশাবাদী ধারণা। তিনি মানুষকে
জন্মগতভাবেই ত্রুটিপূর্ণ মনে করতেন। তাঁর মতে, মানুষ
স্বভাবগতভাবেই:
১. স্বার্থপর ও
লোভী: মানুষ সবসময় নিজের লাভ খোঁজে।
২. অকৃতজ্ঞ ও
চঞ্চল: সুসময়ে তারা শাসকের অনুগত থাকে, কিন্তু বিপদ
এলে পিঠ টান দেয়।
৩. ভীরু ও
প্রতারক: তারা নিজেদের চামড়া বাঁচাতে অন্যকে ধোঁকা
দিতে পারে।
ভালোবাসার চেয়ে ভয় শ্রেয় (Loved vs. Feared)
মানুষের এই স্বার্থপর প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করেই
ম্যাকিয়াভেলি শাসকের জন্য একটি অমর তত্ত্ব দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন—শাসকের জন্য
কোনটি ভালো? জনগণের ভালোবাসা পাওয়া, নাকি তাদের
মনে ভয় তৈরি করা?
ম্যাকিয়াভেলির উত্তর: উভয়টি হওয়াই
সবচেয়ে ভালো, তবে যদি যেকোনো একটি বেছে নিতে হয়, তবে 'ভালোবাসা
পাওয়ার' চেয়ে 'ভীতি প্রদর্শন' অনেক বেশি
নিরাপদ। কারণ, মানুষ নিজের
স্বার্থে যেকোনো সময় ভালোবাসা ভুলে যেতে পারে বা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে, কিন্তু
শাস্তির "ভয়" মানুষকে সবসময় শাসকের নিয়ন্ত্রণে রাখে। তবে শাসককে মনে
রাখতে হবে, তিনি যেন জনগণের মনে ভয়ের সঞ্চার করেন, কিন্তু
কোনোভাবেই যেন তাদের "ঘৃণার" পাত্র না হন। ঘৃণা এড়ানোর সহজ উপায় হলো
নাগরিকদের সম্পত্তি এবং নারীদের সম্মানহানি না করা।
৩. কেন ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয়?
ম্যাকিয়াভেলির পূর্ববর্তী সমস্ত দার্শনিক (যেমন প্লেটো,
অ্যারিস্টটল বা সেন্ট অগাস্টিন) রাষ্ট্রকে দেখতেন নৈতিকতা, ধর্ম এবং
ন্যায়ের আলোকেই। কিন্তু ম্যাকিয়াভেলিই প্রথম এই ধারা ভেঙে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার
সূচনা করেন। এর মূল কারণগুলো হলো:
ক) রাজনীতি ও ধর্মের চূড়ান্ত বিচ্ছেদ (Secularization
of Politics)
ম্যাকিয়াভেলিই প্রথম সাহসের সাথে দাবি করেন যে, রাজনীতি ও
ধর্মের পথ সম্পূর্ণ আলাদা। চার্চ বা বাইবেলের বাণী দিয়ে রাষ্ট্র চালানো সম্ভব নয়।
রাষ্ট্র একটি মানবসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং এর নিয়ম সম্পূর্ণ ইহজাগতিক। রাজনীতিকে ধর্ম
ও নৈতিকতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার এই ধর্মনিরপেক্ষ ধারণাই তাকে আধুনিক
রাষ্ট্রচিন্তার জনকের মর্যাদা দেয়।
খ) বাস্তববাদ বা রিয়ালপলিটিক (Realpolitik)
তিনি আদর্শ রাষ্ট্র কেমন হওয়া "উচিত" (What
ought to be), তা নিয়ে কাল্পনিক গল্প ফাঁদেননি। বরং সমাজ ও রাষ্ট্র
বাস্তবে কেমন (What is), তা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে,
ক্ষমতার লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে বাস্তববাদী ও কৌশলগত হতে হয়, আদর্শবাদী
হলে পতন অনিবার্য।
গ) জাতীয়তাবাদের আদি রূপ
ইতালি যখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে অভ্যন্তরীণ
কোন্দল ও বিদেশী আক্রমণে জর্জরিত ছিল, তখন ম্যাকিয়াভেলি একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ
ইতালীয় জাতি-রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের
ধারণাই পরবর্তীতে আধুনিক 'জাতি-রাষ্ট্র' (Nation-State) গঠনে
নেতৃত্ব দেয়।
ম্যাকিয়াভেলির দর্শনের সারসংক্ষেপ
|
বিষয়ের ক্ষেত্র |
ম্যাকিয়াভেলির মূল বার্তা |
|
মানব চরিত্র |
মানুষ মূলত স্বার্থপর, চঞ্চল ও
অকৃতজ্ঞ; তাই কেবল ভালোবাসা দিয়ে তাদের শাসন করা যায় না। |
|
শাসকের নীতি |
উদ্দেশ্য যদি সৎ হয় (রাষ্ট্র রক্ষা), তবে
যেকোনো উপায়ই (ছলচাতুরী বা বলপ্রয়োগ) বৈধ। |
|
রাজনীতির ভিত্তি |
রাজনীতি ধর্মের অধীন নয়; এটি
সম্পূর্ণ যুক্তি, শক্তি এবং বাস্তবতার খেলা। |
ম্যাকিয়াভেলিকে প্রায়শই "শয়তানের শিক্ষক" বা
অনৈতিক শাসক তৈরির কারিগর বলে ভুল বোঝা হয়। তবে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন,
তিনি কোনো অনৈতিকতার প্রচার করেননি; বরং
রাজনীতির আড়ালে শাসকরা যে সমস্ত গোপন কৌশল চিরকাল ধরে ব্যবহার করে আসছিল, তিনি কেবল
তার ওপর থেকে ভণ্ডামির পর্দাটি সরিয়ে সত্যকে উন্মোচন করেছিলেন।
নিকলো ম্যাকিয়াভেলি তাঁর 'দ্যা
প্রিন্স' গ্রন্থে একজন শাসকের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে রাষ্ট্র ও
ক্ষমতার স্থায়িত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন。 তাঁর মতে, শাসককে হতে
হবে সিংহের মতো সাহসী ও শিয়ালের মতো ধূর্ত, নৈতিকতার
চেয়ে বাস্তববাদী (Pragmatism) হতে হবে, এবং ক্ষমতা রক্ষায় প্রয়োজনে ছলনা ও
নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নিতে হবে。 [1,
2,
3,
4]
'দ্যা প্রিন্স' এর আলোকে
একজন শাসকের গুণাবলি:
- বাস্তববুদ্ধি ও উপযোগিতাবাদ: শাসককে আদর্শবাদী কল্পনার জগতে বাস না করে বাস্তব
পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে。 [1]
- সিংহ ও শিয়ালের গুণাবলি: শত্রুর মোকাবিলায় শাসকের শক্তি (সিংহ) এবং চাতুর্য
(শিয়াল) উভয়ই থাকতে হবে。 [1]
- প্রয়োজনে নিষ্ঠুরতার আশ্রয়: ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন, অহেতুক
নিষ্ঠুরতা না চালিয়ে, রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য
সময়মতো কঠোর ও দ্রুত শাস্তি প্রদানের সক্ষমতা শাসকের থাকতে হবে。
[1]
- ভয় ও ভালোবাসার ভারসাম্য: শাসক যাতে ভালোবাসার চেয়ে ভয়ের পাত্র হন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ ভালোবাসা পরিবর্তনশীল
হলেও ভয় সবসময় অনুগত রাখে。 [1]
- ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভণ্ড নীতি: শাসক নিজে নৈতিকতার তোয়াক্কা না করলেও, প্রজাদের সামনে নিজেকে ধার্মিক, দয়ালু ও বিশ্বস্ত হিসেবে তুলে ধরতে হবে。
[1]
কেন ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয়:
- ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণ: মধ্যযুগে রাষ্ট্র পরিচালিত হতো চার্চ ও ধর্মের
নির্দেশে। ম্যাকিয়াভেলিই প্রথম রাষ্ট্রকে ধর্ম ও নৈতিকতার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে
এক ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ভিত্তি স্থাপন করেন。 [1, 2,
3]
- ক্ষমতার রাজনীতি: তিনি রাষ্ট্রকে ক্ষমতা অর্জন ও ধরে রাখার একটি
যন্ত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন。 কীভাবে
ক্ষমতার বিস্তৃতি ঘটে, তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তাঁর লেখনীতে ফুটে ওঠে。
[1,
2,
3]
- ইতিহাস ও বাস্তবতার সমন্বয়: কী হওয়া উচিত (What ought to be) – এই কাল্পনিক দর্শনের বদলে প্রকৃত অর্থে কী হয়ে থাকে
(What is) – তার ওপর ভিত্তি করে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা নীতি
প্রণয়ন করেন, যা আধুনিক বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি。
[1,
2, 3]
- জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা: তৎকালীন খণ্ডিত ইতালিকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি
শক্তিশালী জাতীয় রাষ্ট্রের (Nation-State) ধারণা
দেন, যা আধুনিক ইউরোপের রূপরেখা তৈরি করে。
[1,
2]
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা:
- স্বার্থপরতা ও অকৃতজ্ঞতা: ম্যাকিয়াভেলির মতে, মানব
প্রকৃতি মূলত স্বার্থপর ও সুবিধাবাদী。 মানুষ
স্বভাবতই অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল, মিথ্যাবাদী এবং
লোভী。
- ভয়ের বশবর্তী: মানুষ নিজের স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো সময়
বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে。 তাই
ভালোবাসা নয়, একমাত্র শাস্তির ভয়ই মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে。
- ভিত্তিহীন আনুগত্য: মানুষ ততদিন পর্যন্ত শাসকের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে,
যতদিন তাদের ব্যক্তিগত কোনো ক্ষতি না হয় বা স্বার্থ
বিঘ্নিত না হয়。 [1,
2,
3,
4,
5]
ম্যাকিয়াভেলি ও তাঁর রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে Stanford Encyclopedia of Philosophy ভিজিট করতে পারেন।
৩) মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য টমাস হবসের ধারণা
টমাস হব্স (ইংরেজি Thomas
Hobbes টমাস্ হব্জ়্, এপ্রিল ৫, ১৫৮৮-ডিসেম্বর ৪, ১৬৭৯) ষোড়শ শতকের ইংরেজ দার্শনিক যিনি বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক
দর্শনের বিষয়ে তার
তত্ত্ব ও বিশ্লেষণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। টমাস হব্স আধুনিক যুগের দার্শনিক
ছিলেন। ১৬৫১ সালে প্রকাশিত লেভিয়েথন গ্রন্থে তিনি সামাজিক
চুক্তি তত্ত্বের
ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তিতে পাশ্চাত্যের
রাজনৈতিক দর্শনের গোড়াপত্তন করে।[১]
জন্ম ও কর্মজীবন
থমাস হবস ১৫৮৮ সালের ৫ এপ্রিল ইংল্যান্ডের Malmesbury-এর এক ধর্মযাজক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
কথিত আছে,
স্পেনীয় নৌবাহিনী যে
সময় ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে, সে সময় হবসের
গর্ভধারিনী মাতা ভয়ে ভীত হয়ে জন্মের নির্ধারিত সময়ের আগেই হবসকে জন্ম দেন। এ
কারণে পণ্ডিতগণের মতে, সমকালীন
পরিবেশ ও পরিস্থিতি তার উপর বেশ প্রভাব ফেলেছিল।[২]
হবস খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৬০৮ সালে হবস
মাত্র ২০বছর বয়সে অক্সফোর্ড হতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। অতঃপর তিনি ইংল্যান্ডের
অন্যতম অভিজাত ও প্রসিদ্ধ কেভেনসিস পরিবারের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন। হবস ফরাসি ও
ইতালিয় ভাষায় শিক্ষকতা করেন। তিনি প্রথমে কেভেনডিসের এবং আর্ল অব ডিভেনশায়ারের
পুত্রের সাথে সমগ্র ইউরোপ পরিভ্রমণ করেন। ফ্রান্সে ভ্রমণকালে প্রথমে রনে দেকার্তের সাথে, পরে
ফ্লোরেন্সে গ্যালিলিওর সাথে পরিচিতি ঘটে এবং তাদের চিন্তাধারায়
বিশেষভাবে প্রভাবিত হন।[২]
হব্স ১৬৩১ সালের দিকে পুনরায় ইউরোপ ভ্রমণে
যান এবং ১৬৩৭ সালে দেশে ফিরে আসেন। এ সময় তার দেশে গৃহযুদ্ধ চলছিল। সে সময়ও তিনি
শারীরিকভাবে খুব বলিষ্ঠ ছিলেন। কথিত আছে যে তিনি ৭০ বছর বয়সেও দিব্যি টেনিস
খেলতেন। ১৬৭৯ সালের ৪ ডিসেম্বর তিনি ইংল্যান্ডে ৯০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ
করেন।[২]
প্রকাশিত গ্রন্থাবলী
- The Media of Europides
- Decorpore
- Hoprinc
- Decive
- The elements of Laws
- লেভিয়াথন
টমাস হবস (Thomas Hobbes) ছিলেন একজন ইংরেজ দার্শনিক, যিনি ১৭শ শতাব্দীতে বসবাস করতেন। তিনি মানব
প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছেন।
১. মানব প্রকৃতি সম্পর্কে হবসের ধারণা
- মানুষ স্বার্থপর: হবস মনে করেন, মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর এবং নিজের স্বার্থ
রক্ষার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত।
- ভয় ও আত্মরক্ষা: মানুষের প্রধান উদ্দেশ্য হলো
নিজের জীবন রক্ষা করা এবং ভয় থেকে মুক্ত থাকা।
- ক্ষমতার লিপ্সা: মানুষ ক্ষমতার লিপ্সায় ভোগে
এবং অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়।
২. প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature)
- যুদ্ধের রাজ্য: হবসের মতে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল "সকলের
বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ" (War of All Against All)।
- অধিকার ও নিরাপত্তাহীনতা: এ অবস্থায় কারো
অধিকার নিরাপদ ছিল না, কারণ প্রত্যেকেই
নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য লিয়ল ছিল।
- জীবন কষ্টকর: হবসের ভাষায়, "মানুষের জীবন ছিল নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, নোংরা, নিষ্ঠুর এবং সংক্ষিপ্ত" (Solitary, Poor, Nasty, Brutish, and
Short)।
৩. সামাজিক চুক্তি (Social Contract)
- লিভিয়াথান: হবস মনে করেন, মানুষ এই কষ্টকর অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে একটি
শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ বা লিভিয়াথান (Leviathan) প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হয়।
- অধিকার হস্তান্তর: মানুষ নিজেদের অধিকার এই
কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে, যাতে তারা শান্তি ও নিরাপত্তা পায়।
হবসের এই ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি
স্থাপন করে এবং রাজনৈতিক দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
টমাস হবসের
মতে, মানব প্রকৃতি মৌলিকভাবে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক এবং প্রকৃতির
রাজ্য (State of Nature) হলো "সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ" এর একটি অরাজক ও ভয়াবহ অবস্থা ।[suggetion]
মানব
প্রকৃতি সম্পর্কে হবসের ধারণা
|
বৈশিষ্ট্য |
বিবরণ |
|
স্বার্থপরতা |
মানুষ
স্বাভাবিকভাবে নিজের স্বার্থের প্রতি মনোযোগী; ব্যক্তিগত
নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তার প্রাথমিক লক্ষ্য [suggetion] |
|
আত্মকেন্দ্রিকতা |
মানুষ
জন্মগতভাবে সামাজিক বা রাজনৈতিক নয়, বরং নিজেদের স্বার্থ ও নিরাपত্তা
রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট [facebook] |
|
অন্যান্য
বৈশিষ্ট্য |
মানুষ
অহংকারী, নিষ্ঠুর, পরধন লোলুপ ও কলহপ্রিয় [sattacademy] |
|
আবেগের
বশবর্তী |
প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষ যুক্তি বা বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হত না; আকাঙ্ক্ষা
ও আবেগের বশবর্তী হয়ে কাজ করত [rastrobiggandarpon] |
প্রকৃতির
রাজ্য সম্পর্কে হবসের ধারণা
|
বৈশিষ্ট্য |
বিবরণ |
|
বৈশিষ্ট্য |
বিবরণ |
|
সংজ্ঞা |
কোনো
প্রাতিষ্ঠানিক শাসন বা আইন নেই এমন অবস্থা; প্রাক্-সামাজিক
ও প্রাক্-রাজনৈতিক [suggetion] |
|
মূল ধারণা |
"সবার
বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ" (Bellum omnium contra omnes) [suggetion] |
|
জীবনের
বর্ণনা |
মানবজীবন
ছিল "নিঃসঙ্গতায় পরিপূর্ণ, অসহায়, নোংরা,
পাশবিক এবং সংক্ষিপ্ত" [sattacademy] |
|
প্রধান
উদ্বেগ |
নিরাপত্তার
অভাব ও চরম ভয় [suggetion] |
|
বিশৃঙ্খলা |
মানুষ একে
অপরের শত্রুরূপে দিন কাটাত; বলবান দুর্বলদের পরাজিত করত [rastrobiggandarpon] |
সামাজিক
চুক্তির প্রয়োজনীয়তা
হবসের মতে,
প্রকৃতির রাজ্যের এই ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে মানুষ সামাজিক
চুক্তি এর মাধ্যমে নিজেদের অধিকার এক শক্তিশালী
কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব (লেভিয়াথান)-এর হাতে তুলে দেয় । এই শক্তিশালী সার্বভৌম
কর্তৃপক্ষই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ও বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে ।[facebook]
হবস এই
ধারণাগুলো মূলত তার বিখ্যাত গ্রন্থ "লেভিয়াথান"
(১৬৫১)-এ তুলে ধরেছেন ।[suggetion]
টমাস হবসের
রাজনৈতিক দর্শনের দুটি মূল স্তম্ভ হলো মানব প্রকৃতির একটি অন্ধকার দৃষ্টিভঙ্গি এবং
সেই প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত "প্রকৃতির রাজ্য" — যা শেষ পর্যন্ত সামাজিক
চুক্তি ও রাষ্ট্র গঠনের ন্যায্যতা প্রমাণ করে।
মানব প্রকৃতি
মানব
প্রকৃতি সম্পর্কে হবসের দৃষ্টিভঙ্গি
হবস মানুষকে
মূলত স্বার্থপর ও ক্ষমতালোভী সত্তা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে মানব প্রকৃতির তিনটি
মূল চালিকাশক্তি হলো প্রতিযোগিতা (সীমিত সম্পদের জন্য), অবিশ্বাস
(নিজের নিরাপত্তার ভয় থেকে) এবং গৌরবলিপ্সা (সম্মান ও কর্তৃত্বের প্রতি
আকাঙ্ক্ষা)। হবস মনে করতেন এটি মানুষের দোষ নয়, বরং তার
স্বাভাবিক প্রকৃতি।
প্রকৃতির
রাজ্য (State of Nature)
কোনো
রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষ ছাড়া মানুষ যে কাল্পনিক অবস্থায় থাকত, হবস তাকে
বলেছেন "প্রকৃতির রাজ্য"। এই অবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- কোনো লিখিত আইন নেই, ফলে
কোনো কিছুই "অন্যায়" নয়
- প্রত্যেকের প্রতিটি জিনিসের উপর অধিকার আছে,
এমনকি অন্যের শরীরেরও
- ক্রমাগত যুদ্ধের আতঙ্ক, ফলে
শিল্প, কৃষি, বিজ্ঞান — কোনো
কিছুই গড়ে উঠতে পারে না
- মানুষের জীবন তাঁর বিখ্যাত ভাষায়: "solitary, poor, nasty, brutish, and
short"
সামাজিক
চুক্তি ও লেভিয়াথান
এই ভয়াবহ
অবস্থা থেকে বাঁচতে মানুষ যুক্তির আলোয় পারস্পরিক চুক্তিতে আসে এবং নিজেদের
স্বাধীনতা একটি শক্তিশালী সার্বভৌমের হাতে অর্পণ করে — এটিই হবসের লেভিয়াথান। এই সার্বভৌম হতে পারে একজন রাজা বা একটি
পরিষদ, তবে তার ক্ষমতা প্রায় নিরঙ্কুশ হওয়া প্রয়োজন, কারণ দুর্বল
সরকার মানে প্রকৃতির রাজ্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি।
হবসের এই
তত্ত্ব পরবর্তীকালে লক, রুশো ও অন্যান্য চিন্তাবিদরা চ্যালেঞ্জ করেছেন — বিশেষত
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর অতিরিক্ত নৈরাশ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।
টমাস হবসের মতে, মানব প্রকৃতি মূলত স্বার্থপর, প্রতিযোগিতাপ্রবণ এবং সংঘাতমুখী। তিনি মনে
করতেন যে মানুষ স্বভাবতই নিজের সংরক্ষণ ও ইচ্ছাপূরণে উদ্বুদ্ধ, যা তাকে অপরের সাথে বিরোধে লিপ্ত করে। এই কারণে,
প্রকৃতির রাজ্য বলতে তিনি
এমন একটি পরিস্থিতি বোঝাতেন যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব নেই — সেটি হলো ‘সবের
বিরুদ্ধে সবের যুদ্ধ’ (bellum omnium contra omnes)। এমন অবস্থায়
জীবন হয় ‘একাকী, দরিদ্র, নোংরা, পশুসুলভ ও সংক্ষিপ্ত’। প্রকৃতির রাজ্যে কোন ন্যায়-অন্যায় নেই, কারণ নিয়ম বা আইন তখন কাজ করে না যখন কোনো
শক্তিশালী কর্তা থাকে না। তাই হবসের মতে, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মানুষ একটি সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র
(লেভিয়াথান) সৃষ্টি করে, যেখানে তারা
নিজেদের স্বাধীনতা ছেড়ে দেয় একটি সার্বভৌম কর্তৃত্বের হাতে, যাতে প্রকৃতির রাজ্যের বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায়।
টমাস হবসের
(Thomas Hobbes) মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature)
সম্পর্কে ধারণা
Thomas Hobbes আধুনিক
রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Leviathan-এ তিনি মানব
প্রকৃতি এবং প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেছেন।
১. মানব
প্রকৃতি (Human Nature)
হবসের মতে,
মানুষ স্বভাবতই:
- স্বার্থপর — প্রত্যেকে
নিজের কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়।
- ক্ষমতালোভী — মানুষ
ক্রমাগত আরও ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব অর্জন করতে চায়।
- ভয় ও নিরাপত্তার চাহিদা দ্বারা পরিচালিত
— মৃত্যুভয় এবং নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা মানুষের আচরণকে
প্রভাবিত করে।
- মৌলিকভাবে সমান — শারীরিক
ও মানসিক সক্ষমতায় কিছু পার্থক্য থাকলেও মানুষ এমনভাবে সমান যে কেউ অন্যকে
ক্ষতি করতে সক্ষম।
হবস মানুষের
প্রকৃতিকে আশাবাদী দৃষ্টিতে দেখেননি; বরং তিনি মনে করতেন যে মানুষের স্বার্থপর
প্রবৃত্তি সংঘাতের জন্ম দেয়।
২. প্রকৃতির
রাজ্য (State of Nature)
প্রকৃতির
রাজ্য বলতে হবস এমন একটি কাল্পনিক অবস্থাকে বুঝিয়েছেন যেখানে কোনো রাষ্ট্র,
সরকার বা আইন নেই।
এই
অবস্থায়:
- কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব নেই।
- কোনো আইন বা বিচারব্যবস্থা নেই।
- প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার
জন্য স্বাধীন।
হবসের মতে,
এই পরিস্থিতিতে তিনটি কারণে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়:
- প্রতিযোগিতা (Competition) — লাভের জন্য।
- অবিশ্বাস বা ভয় (Diffidence) — আত্মরক্ষার জন্য।
- গৌরব বা খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা (Glory) — সম্মান অর্জনের জন্য।
ফলে
প্রকৃতির রাজ্য হয়ে ওঠে "সবার
বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ" (war of all against all)।
৩. প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষের জীবন
হবসের
বিখ্যাত বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন হবে:
"solitary,
poor, nasty, brutish, and short"
অর্থাৎ—
- নিঃসঙ্গ,
- দরিদ্র,
- কষ্টকর,
- হিংস্র,
- এবং স্বল্পস্থায়ী।
৪. সামাজিক
চুক্তি (Social Contract)
এই অরাজক
অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র
বা সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। হবসের মতে, শান্তি ও
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মানুষের কিছু স্বাধীনতা রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা
প্রয়োজন।
সংক্ষেপে
- মানব প্রকৃতি: স্বার্থপর, নিরাপত্তাকামী
ও ক্ষমতালোভী।
- প্রকৃতির রাজ্য: আইন ও সরকারের অনুপস্থিতিতে সংঘাতপূর্ণ অবস্থা।
- সমাধান: সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী রাষ্ট্র
প্রতিষ্ঠা।
এ কারণেই
হবসকে আধুনিক সামাজিক
চুক্তি তত্ত্বের অন্যতম
প্রধান প্রবক্তা হিসেবে গণ্য করা হয়।
**টমাস হবসের ধারণায় মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির
রাজ্য (State of Nature)**
টমাস হবস (১৫৮৮–১৬৭৯) তার বিখ্যাত গ্রন্থ *Leviathan*
(১৬৫১)-এ মানব প্রকৃতি ও
সমাজের উৎপত্তি নিয়ে একটি বাস্তববাদী (materialist) ও নৈরাশ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। তাঁর
মতে, মানুষের আচরণকে বোঝার
জন্য ধর্মীয় বা নৈতিক আদর্শের চেয়ে বৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বেশি
গুরুত্বপূর্ণ।
### ১. মানব প্রকৃতি (Human Nature)
হবস মানুষকে মূলত **স্বার্থপর (self-interested)**
ও **যান্ত্রিক প্রাণী**
হিসেবে দেখেন। তাঁর প্রধান ধারণাগুলো:
- **স্বাভাবিক সমতা (Natural Equality)**: সকল মানুষ প্রায় সমান ক্ষমতাসম্পন্ন। কেউ কাউকে
স্থায়ীভাবে দমন করতে পারে না। এই সমতাই সংঘাতের কারণ, কারণ কেউ নিজেকে অন্যের চেয়ে উন্নত মনে করে না।
- **প্রধান চালিকাশক্তি**: তিনটি মূল আকাঙ্ক্ষা —
1. **প্রতিযোগিতা (Competition)**
— সম্পদ ও সম্মানের জন্য।
2. **অস্থিরতা/অনিশ্চয়তা
(Diffidence)** — নিজের নিরাপত্তার
জন্য অন্যকে আগে থেকে আক্রমণ করা।
3. **গৌরব/খ্যাতি (Glory)**
— অন্যের উপর প্রাধান্য
দেখানো।
- মানুষ **যুক্তিবাদী (rational)** কিন্তু **আবেগপ্রবণ**। সে সবসময় নিজের সংরক্ষণ
(self-preservation) ও আরামের সন্ধান
করে।
- নৈতিকতা স্বাভাবিক নয়; এটি সমাজে গড়ে ওঠে। প্রকৃতিতে “ভালো-মন্দ” বলতে
শুধু যা আমার জন্য লাভজনক বা ক্ষতিকর তাই বোঝায়।
### ২. প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature)
হবসের সবচেয়ে বিখ্যাত ধারণা। এটি একটি
**কাল্পনিক অবস্থা**, যেখানে কোনো
সরকার, আইন, বিচার বা সামাজিক চুক্তি নেই।
**প্রকৃতির রাজ্যের বৈশিষ্ট্য**:
- **সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ (War of all
against all)**: “*bellum omnium contra omnes*”।
- জীবন **“solitary, poor, nasty,
brutish, and short”** — অর্থাৎ একাকী,
দরিদ্র, নোংরা, পাশবিক এবং সংক্ষিপ্ত।
- কোনো নৈতিক বা আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। প্রত্যেকে
যা খুশি করতে পারে (Right of Nature)।
- সবচেয়ে বড় অধিকার হলো **নিজেকে রক্ষা করার
অধিকার**।
হবস বলেন, এই অবস্থায় মানুষ সবসময় ভয়ে থাকে। কারণ যে কেউ
যে কোনো সময় আক্রমণ করতে পারে। ফলে কেউ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারে না,
শিল্প-সংস্কৃতি বিকশিত হয়
না।
### ৩. কেন প্রকৃতির রাজ্য থেকে বেরিয়ে আসা দরকার?
মানুষ যুক্তিবাদী বলে বুঝতে পারে যে এই যুদ্ধের
অবস্থা তার নিজের স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর। তাই সে **সামাজিক চুক্তি (Social
Contract)** করে সার্বভৌম ক্ষমতা (Sovereign/Leviathan)-এর কাছে নিজের কিছু স্বাধীনতা সমর্পণ করে।
- সার্বভৌম ক্ষমতা (রাজা বা সরকার) **অসীম ও
অবিভক্ত** হতে হবে, যাতে সে শান্তি
বজায় রাখতে পারে।
- নাগরিকরা আনুগত্যের বিনিময়ে নিরাপত্তা পায়।
### গুরুত্ব ও সমালোচনা
হবসের এই ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি
স্থাপন করেছে। তিনি প্রথম যিনি রাষ্ট্রকে **মানুষের তৈরি কৃত্রিম সত্তা** হিসেবে
ব্যাখ্যা করেন।
**সমালোচনা**:
- জন লক ও রুশো তাঁর নৈরাশ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির
বিরোধিতা করেন। লকের মতে প্রকৃতির রাজ্য শান্তিপূর্ণ ছিল।
- অনেকে বলেন, হবস মানুষের সহযোগিতামূলক দিক (যেমন পরিবার,
সম্প্রদায়) উপেক্ষা
করেছেন।
- তাঁর চিন্তা **রাজতন্ত্রের সমর্থক** বলে
সমালোচিত হয়েছে।
**সারসংক্ষেপ**: হবসের মতে মানুষের স্বাভাবিক
অবস্থা ভয়ানক। শান্তি আসে শুধুমাত্র শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে। এই
ধারণা আজও রাজনৈতিক দর্শন, আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক (realism) ও মানববিজ্ঞানে
প্রভাব ফেলে।
১৭ শতকের
বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবস
(Thomas Hobbes) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'লেভিয়াথান'
(Leviathan)-এ মানব প্রকৃতি এবং প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে একটি
অত্যন্ত বাস্তববাদী, কিছুটা অন্ধকার এবং প্রভাবশালী ধারণা প্রদান করেছেন।
রাষ্ট্র ও সমাজ সৃষ্টির পূর্বে মানুষ কেমন ছিল, তা ব্যাখ্যা
করতে গিয়ে তিনি এই তত্ত্বগুলো আলোচনা করেছেন।
হবসের এই
দুটি মূল ধারণার বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো:
১. মানব
প্রকৃতি (Human Nature)
হবসের মতে,
মানুষের সমস্ত আচরণ ও চিন্তাভাবনা পরিচালিত হয় তার নিজস্ব আবেগ, ইচ্ছা এবং
ভয় দ্বারা। মানব প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর প্রধান পর্যবেক্ষণগুলো হলো:
- স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা: হবস বিশ্বাস করতেন মানুষ স্বভাবগতভাবেই স্বার্থপর।
মানুষ সর্বদা নিজের আনন্দ, লাভ এবং ক্ষমতা খোঁজে। অন্যের কল্যাণ করাও অনেক সময়
নিজের মানসিক শান্তির জন্য বা স্বার্থেই হয়ে থাকে।
- ক্ষমতার লোভ: মানুষের আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হয় না। হবস লিখেছেন,
মানুষ সারাজীবন ধরে কেবল একের পর এক ক্ষমতা চেয়ে
যায়, যা কেবল মৃত্যুর মাধ্যমেই শান্ত হয়।
- সমতা: হবসের মতে, প্রকৃতিগতভাবে
সব মানুষই প্রায় সমান শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতার অধিকারী। একজন দুর্বল মানুষও
বুদ্ধি খাটিয়ে বা অন্য কারও সাথে জোট বেঁধে একজন শক্তিশালী মানুষকে হত্যা
করতে পারে। এই সমতাই মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়, কারণ সবাই একই জিনিস পাওয়ার আশা করে।
- ভয় ও আত্মরক্ষা: মানুষের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো মৃত্যুর ভয়,
বিশেষ করে অন্যের হাতে আকস্মিক মৃত্যুর ভয়।
আত্মরক্ষার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে পরবর্তীতে সমাজ গঠনে বাধ্য করে।
২. প্রকৃতির
রাজ্য (State of Nature)
'প্রকৃতির
রাজ্য' বলতে হবস এমন এক কাল্পনিক অবস্থার কথা বুঝিয়েছেন,
যেখানে কোনো রাষ্ট্র, সরকার, আইন বা কোনো নিয়ন্তক কর্তৃপক্ষ ছিল না।
রাষ্ট্র গঠনের পূর্বে মানুষ যেভাবে বসবাস করত, সেটাই
প্রকৃতির রাজ্য। হবসের দৃষ্টিতে এই অবস্থাটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ:
- সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ (War of all
against all): যেহেতু কোনো আইন বা পুলিশ ছিল না, তাই প্রত্যেকেই নিজের স্বার্থে যা খুশি তা-ই করতে
পারত। এর ফলে প্রকৃতির রাজ্য রূপান্তরিত হয়েছিল এক চিরস্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে।
প্রত্যেকেই অন্যকে শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত।
- কোনো ন্যায়-অন্যায় নেই: এই রাজ্যে কোনো আইন ছিল না, তাই ভালো-মন্দ বা ন্যায়-অন্যায়ের কোনো ধারণা ছিল
না। যার যা শক্তি, সে তা-ই কেড়ে নিতে পারত। "জোর যার মুল্লুক
তার"—এটাই ছিল নীতি।
- উন্নয়ন ও সভ্যতার অনুপস্থিতি: জীবন যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে
কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, শিল্পকলা বা সাহিত্যের কোনো সুযোগ ছিল না। মানুষ
সবসময় আতঙ্কে থাকত।
প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষের জীবনের বর্ণনা:
হবসের ভাষায়,
প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল অত্যন্ত করুণ। তাঁর বিখ্যাত উক্তি
অনুযায়ী, সেখানকার জীবন ছিল:
"Solitary,
poor, nasty, brutish, and short."
(একাকী,
দরিদ্র, নোংরা, পাশবিক এবং ক্ষণস্থায়ী।)
এই অবস্থা
থেকে উত্তরণ: সামাজিক চুক্তি (Social Contract)
হবস বলেন,
মানুষ এই নরককূল অবস্থা এবং মৃত্যুর ভয় থেকে বাঁচতে নিজেদের বুদ্ধি ও
যৌক্তিকতাকে কাজে লাগায়। তারা বুঝতে পারে যে, শান্তিতে
বাঁচতে হলে একটি সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রয়োজন, যা সবাইকে
নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
এই উপলব্ধি
থেকেই মানুষ নিজেদের মধ্যে একটি 'সামাজিক
চুক্তি' (Social Contract) করে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সবাই তাদের
সমস্ত ক্ষমতা ও অধিকার একজন শাসক বা সার্বভৌম শক্তির (যাকে হবস 'লেভিয়াথান' বা একচ্ছত্র
রাজতন্ত্র বলেছেন) হাতে তুলে দেয়। বিনিময়ে সেই শাসক সবাইকে নিরাপত্তা ও শান্তি
প্রদান করে। এভাবেই প্রকৃতির রাজ্যের অবসান ঘটে এবং রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজের জন্ম হয়।
সংক্ষেপে: টমাস হবসের মতে, মানুষ
স্বভাবগতভাবে স্বার্থপর এবং আইনহীন 'প্রকৃতির রাজ্যে' মানুষের
জীবন ছিল নরকতুল্য। এই ভয়াবহতা থেকে বাঁচতেই মানুষ নিজেদের ক্ষমতা ত্যাগ করে
রাষ্ট্র ও আইন ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
টমাস হবস (Thomas
Hobbes) তাঁর ১৬৫১ সালে প্রকাশিত 'লেভিয়াথান'
(Leviathan) গ্রন্থে মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে এক
কালজয়ী ও বাস্তববাদী রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র
সৃষ্টির পূর্বে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বাস করত এবং মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিই সমাজ
ও রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি। [1,
2,
3,
4,
5]
হবসের এই
ধারণাগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. মানব
প্রকৃতি (Human Nature)
হবস মানব
প্রকৃতিকে মূলত স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক এবং পাশবিক বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে:
[1]
- আত্মস্বার্থ ও অহংকার:
মানুষ স্বভাবতই নিজের স্বার্থ এবং আত্মরক্ষা নিয়ে
ব্যস্ত থাকে। প্রত্যেকেই নিজেকে ভালোবাসে এবং নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চায়।
- ভয় ও প্রতিযোগিতা: মানুষের মধ্যে সম্পদ ও ক্ষমতার জন্য সব সময়
প্রতিযোগিতা কাজ করে। এছাড়া, সবাই মৃত্যুভয়ে ভীত
থাকে। [1,
2]
- শারীরিক ও মানসিক সমতা: হবসের মতে, প্রকৃতির
রাজ্যে সব মানুষ দৈহিক ও মানসিক দিক থেকে কমবেশি সমান। একজন দুর্বল মানুষও
কৌশল বা বুদ্ধির মাধ্যমে একজন শক্তিশালী মানুষকে হত্যা করতে পারে।
[1,
2]
২. প্রকৃতির
রাজ্য (State of Nature)
যেহেতু
মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর, তাই রাষ্ট্র বা কোনো নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (সার্বভৌম
শক্তি) না থাকলে সমাজে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে হবস 'প্রকৃতির
রাজ্য' বা 'প্রকৃতির অবস্থা' (State of Nature) বলেছেন।
[1,
2]
- যুদ্ধের অবস্থা: প্রকৃতির রাজ্যে কোনো আইন, আদালত বা নৈতিকতা থাকে না। ফলে সেখানে "সকলের
বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ" (War of all against all) চলতে থাকে। [1,
2]
- জীবনযাত্রার অবস্থা: এই অবস্থায় মানুষের জীবন ছিল অত্যন্ত করুণ। হবস
তাঁর বিখ্যাত উক্তিতে এই অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন:
"জীবন ছিল
একাকী, দরিদ্র, কদর্য,
পাশবিক এবং ক্ষণস্থায়ী।" (Solitary, poor, nasty, brutish,
and short.)
৩. সামাজিক
চুক্তি ও রাষ্ট্র গঠন (Social Contract & State)
প্রকৃতির
রাজ্যের এই অবর্ণনীয় দুর্দশা ও মৃত্যুভয় থেকে মুক্তি পেতে মানুষ বুদ্ধি খাটিয়ে
একটি সামাজিক চুক্তি (Social Contract)
করে। [1,
2]
- মানুষ নিজেদের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা একজনের হাতে বা
একটি গোষ্ঠীর হাতে সমর্পণ করে।
- এই চুক্তির মাধ্যমেই জন্ম হয় 'লেভিয়াথান' বা
রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের প্রধান বা সার্বভৌম শক্তির আদেশই তখন হয়ে ওঠে চূড়ান্ত
আইন।
No comments:
Post a Comment