ক্লাস-০১
মধ্যপ্রাচ্যে: বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু
মধ্যপ্রাচ্যকে
বিশ্ব রাজনীতির
কেন্দ্রবিন্দু বা
ভূ-রাজনৈতিক
অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু
বলা হয়
কারণ এটি
ভৌগোলিক অবস্থান,
জ্বালানি সম্পদ,
ধর্মীয় গুরুত্ব
এবং কৌশলগত
কারণে আন্তর্জাতিক
রাজনীতির অন্যতম
প্রভাবশালী অঞ্চল।
মূলত এই
অঞ্চলের অস্থিরতা
বা স্থিতিশীলতা
পুরো বিশ্বের
অর্থনীতি ও
নিরাপত্তাকে প্রভাবিত
করে।
মধ্যপ্রাচ্যের
বিশ্ব রাজনীতির
কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার
প্রধান কারণগুলো
নিচে দেওয়া
হলো:
- জ্বালানি
সম্পদের কেন্দ্র:
বিশ্বের অন্যতম
প্রধান তেল
ও প্রাকৃতিক
গ্যাস সরবরাহকারী
অঞ্চল হলো
মধ্যপ্রাচ্য। সৌদি
আরব, কুয়েত,
কাতার, ইরান,
ইরাক ও
সংযুক্ত আরব
আমিরাতসহ এ
অঞ্চলের দেশগুলো
বিশ্বের জ্বালানি
বাজারের বড়
অংশ নিয়ন্ত্রণ
করে, যা
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- কৌশলগত
ভৌগোলিক অবস্থান:
এই অঞ্চলটি
এশিয়া, আফ্রিকা
ও ইউরোপের
সংযোগস্থলে অবস্থিত,
যা ঐতিহাসিকভাবে
বাণিজ্য ও
সামরিক যোগাযোগের
জন্য অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। সুয়েজ
খাল এবং
হরমুজ প্রণালীর
মতো গুরুত্বপূর্ণ
সামুদ্রিক পথ
এই অঞ্চলেই
অবস্থিত।
- ধর্মীয়
ও সাংস্কৃতিক
গুরুত্ব:
মধ্যপ্রাচ্য হলো
ইসলাম, খ্রিস্ট
ও ইহুদি
ধর্মের জন্মভূমি।
এই অঞ্চলের
ঐতিহাসিক এবং
ধর্মীয় তাৎপর্য
একে বিশ্বব্যাপী
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে
রাখে।
- ভূ-রাজনৈতিক
সংঘাত ও
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব:
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘকাল
ধরে আঞ্চলিক
ও পরাশক্তিগুলোর
(যেমন- যুক্তরাষ্ট্র,
রাশিয়া) মধ্যে
প্রভাব বিস্তারের
লড়াই চলছে।
ইয়েমেন, সিরিয়া,
ফিলিস্তিন ও
ইরান ইস্যুতে
সৃষ্ট সংঘাত
সরাসরি বিশ্ব
রাজনীতির মেরুকরণকে
প্রভাবিত করে।
- বিদেশী
হস্তক্ষেপ ও
উপনিবেশবাদ:
দীর্ঘ সময়
ধরে বৈশ্বিক
শক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ
বা পরোক্ষ
হস্তক্ষেপ ও
ঔপনিবেশিক প্রভাবের
কারণেও এই
অঞ্চলটি রাজনৈতিকভাবে
অত্যন্ত সংবেদনশীল।
মূলত,
এই অঞ্চলের
তেল নির্ভরতা,
গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ
এবং চলমান
ভূ-রাজনৈতিক
অস্থিরতা মধ্যপ্রাচ্যকে
বিশ্ব রাজনীতির
কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে তার ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, ধর্মীয় গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক জটিলতার কারণে। এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বহু যুগ ধরে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির জন্য অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। পৃথিবী শাসনে যারা সর্বদা সুপারপাওয়ার ছিল, তারা এই অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল, যা বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বিস্তারে সহায়ক ছিল। এখানে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে এর নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব শক্তিগুলোর জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
১. ভৌগোলিক গুরুত্ব
মধ্যপ্রাচ্য একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, যা এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই অঞ্চলের অবস্থান একে বিশ্ব বাণিজ্য এবং শক্তির রাস্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যেমন, সুয়েজ খাল এবং বাব-আল-মানদেব সহ বিভিন্ন প্রধান সাগর এবং স্ট্রেট, যা বিশ্বের বাণিজ্য এবং সামরিক পথের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে, মধ্যপ্রাচ্য প্রায়ই বিশ্ব শক্তিগুলোর পুঁজি ও সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। যখনই কোনো শক্তি পৃথিবী শাসন করতে চেয়েছে, তারা এই অঞ্চলের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
২. পেট্রোলিয়াম রিসোর্স এবং অর্থনৈতিক প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল।
সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইত্যাদি দেশগুলি বিশ্বের তেলের বৃহত্তম রপ্তানিকারক এবং OPEC
(Organization of the Petroleum Exporting Countries) এর সদস্য, যা তেলের উৎপাদন এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। তেলের বাজারের অস্থিরতা কিংবা মূল্য বৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
·
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ: তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাব পড়ে, এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি তাদের তেলের রপ্তানির মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে রাজনৈতিক
leverage অর্জন করে।
৩. ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র, বিশেষত ইসলাম এর জন্মস্থল এবং বর্তমান সময়ে মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্র। মক্কা ও মদিনা মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান এবং সারা বিশ্বে মুসলিম জনগণের উপর ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির ধর্মীয় রাজনৈতিক ভূমিকাও একে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী করে তুলেছে।
·
ধর্মীয় সংকট এবং সংঘর্ষ: ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মতবিরোধ, যেমন শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব, এছাড়া ইরান-সৌদি বিরোধ, ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি করে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
৪. বিশ্ব শক্তির প্রতিযোগিতা
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলির (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন) মধ্যে রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
·
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: আমেরিকা দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র, বিশেষ করে ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং কুর্দিদের সমর্থন দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি এবং অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে তার প্রভাব বজায় রাখে।
·
রাশিয়ার ভূমিকা: রাশিয়া, বিশেষত সিরিয়া সংকটের পর থেকে, মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। রাশিয়ার ভূমিকা ইরান, সিরিয়া এবং তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা পশ্চিমা দেশগুলির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভূমিকা পালন করছে।
·
চীনের প্রভাব: চীনও মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে তার উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে, বিশেষ করে নতুন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI)
মাধ্যমে।
৫. আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তি
মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন শক্তিশালী সামরিক শক্তি রয়েছে, যেমন ইরান, তুরস্ক, ইসরায়েল, এবং সৌদি আরব, যারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে।
·
ইরান এবং সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা: ইরান একটি শক্তিশালী শিয়া রাষ্ট্র এবং সৌদি আরব একটি সুন্নি রাষ্ট্র। এই দুই দেশের মধ্যে শিয়া-সুন্নি প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম শক্তিগুলির (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন) সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে।
·
ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত: এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইসরায়েল এবং আরব দেশগুলির মধ্যে সংঘাতের ফলে বিশ্ব শক্তিগুলোর (বিশেষ করে আমেরিকা) রাজনৈতিক সমর্থন এবং মনোযোগ আকর্ষণ হয়।
৬. বিশ্ব শক্তির নিয়ন্ত্রণ: ইতিহাসের পটভূমি
মধ্যপ্রাচ্য পৃথিবী শাসনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে বহু যুগ ধরে। যখনই কোন শক্তি পৃথিবী শাসন করতে চেয়েছে, তারা এই অঞ্চলের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
1. ফেরাউনদের সময় (প্রাচীন মিশর): ফেরাউনরা মিশর এবং আশপাশের অঞ্চলের শাসক ছিল, এবং মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তাদের সময় থেকেই দৃশ্যমান ছিল। প্রাচীন মিশর ছিল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সভ্যতা, যা এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান নিশ্চিত করেছিল।
2. রোমান সম্রাজ্য: রোমানরা প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য এবং তার আশপাশের দেশগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল। রোমান সাম্রাজ্য তাদের সামরিক শক্তি এবং বাণিজ্যিক রুট নিয়ন্ত্রণ করে পৃথিবীর বৃহত্তম সম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল।
3. ইসলামিক খিলাফত (আব্বাসি এবং উমাইয়া): মুসলিম খিলাফতগুলি বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক এবং সাংস্কৃতিক শক্তি ছিল, যা মধ্যপ্রাচ্যকে একটি অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
4. অটোমান সাম্রাজ্য: অটোমান সাম্রাজ্যও মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাদের শাসনকালে, তারা পুরো মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি অধিকাংশ আরব দেশ, তুরস্ক, ইরান ও অটোমান ভূমধ্যসাগরের অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছিল।
৭. শরণার্থী সংকট
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যেমন সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন ইত্যাদির ফলে ব্যাপক শরণার্থী স্রোত সৃষ্টি হয়েছে। এই শরণার্থী সংকট আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
উপসংহার
মধ্যপ্রাচ্য, তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, ধর্মীয় গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলির মাধ্যমে দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম শক্তিগুলির জন্য একটি কৌশলগত কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, যা তাদের সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ইতিহাসে ফেরাউনদের সময় থেকে শুরু করে রোমান, ইসলামিক খিলাফত, অটোমান সাম্রাজ্য, এবং আধুনিক সুপারপাওয়ারগুলোর মধ্যে, মধ্যপ্রাচ্য সর্বদা একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল, যার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্বের শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
ক্লাস-০২
মধ্যপ্রাচ্যের
রাজনীতির একটি ভূমিকা
মধ্যপ্রাচ্যের
রাজনীতির একটি ভূমিকা
মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘকাল
ধরেই গভীর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি এবং জটিল রাজনৈতিক গতিশীলতার একটি
অঞ্চল। এর কৌশলগত অবস্থান, বিপুল জ্বালানি সম্পদ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে এর প্রভাব
বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক শিকড়, প্রধান কুশীলব,
সংঘাত এবং সমসাময়িক বিষয়গুলো অন্বেষণ করা প্রয়োজন। এই নিবন্ধটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক
প্রেক্ষাপটের একটি ব্যাপক পর্যালোচনা প্রদান করে, যা এর বিবর্তন এবং বর্তমান প্রতিবন্ধকতাগুলোর
উপর আলোকপাত করে।
মধ্যপ্রাচ্যের
রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রাচীন
সভ্যতা এবং রাজনীতির মূল
মধ্যপ্রাচ্যকে প্রায়শই
সভ্যতার আঁতুড়ঘর বলা হয়, যা সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, আসিরীয় এবং মিশরীয়দের মতো প্রাচীনতম
কিছু সমাজের আবাসস্থল। এই প্রাচীন সভ্যতাগুলো নগর-রাষ্ট্র, রাজতন্ত্র এবং সাম্রাজ্যসহ
মৌলিক রাজনৈতিক কাঠামো স্থাপন করেছিল, যা আজও আঞ্চলিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে।
উপনিবেশবাদ
এবং আধুনিক রাষ্ট্র গঠন
উনিশ শতক এবং বিশ শতকের
শুরুতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় শক্তিগুলো ম্যান্ডেট ও উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে
মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিশাল অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের
পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের ফলে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রগুলোর সৃষ্টি হয়, যেগুলো প্রায়শই
জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজনকে উপেক্ষা করে যথেচ্ছ সীমানা অনুসরণ করত এবং যা ভবিষ্যৎ সংঘাতের
বীজ বপন করেছিল।
স্বাধীনতা-পরবর্তী
এবং জাতীয়তাবাদ
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি
সময়ে স্বাধীনতা লাভের পর মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে জাতীয়তাবাদের ঢেউ, বিপ্লব এবং সমাজতন্ত্র,
প্যান-আরবিজম ও ইসলামবাদের মতো রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্থান ঘটে। এই আন্দোলনগুলো সার্বভৌমত্ব,
পরিচয় এবং আঞ্চলিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।
প্রধান
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং ক্ষমতার কাঠামো
রাজ্য
এবং সরকার
মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্র,
প্রজাতন্ত্র এবং মিশ্র শাসনব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান।
- রাজতন্ত্র: সৌদি
আরব, জর্ডান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো রাজতন্ত্র, যেখানে প্রায়শই
বংশানুক্রমিক শাসন এবং উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় প্রভাব বিদ্যমান।
- প্রজাতন্ত্র: মিশর,
তুরস্ক এবং ইরাকের মতো দেশগুলিতে প্রজাতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলিতে
গণতন্ত্রায়ন এবং স্থিতিশীলতার মাত্রা বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যমান।
- সংকর শাসনব্যবস্থা: কিছু
দেশ স্বৈরাচারী ও গণতান্ত্রিক উপাদানের সমন্বয় ঘটায় এবং প্রায়শই নির্বাচন,
দমন-পীড়ন বা উভয় পদ্ধতির মাধ্যমে ক্ষমতা বজায় রাখে।
ধর্মীয়
এবং জাতিগত গোষ্ঠী
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে
ধর্ম ও জাতিসত্তা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে:
- সুন্নি ও শিয়া ইসলাম: সুন্নি-শিয়া
বিভাজন আঞ্চলিক জোট ও সংঘাতকে প্রভাবিত করে, বিশেষত সৌদি আরব (সুন্নি) এবং ইরানের
(শিয়া) মধ্যকার সংঘাতে।
- জাতিগত বিভাজন: আরব,
কুর্দি, পারস্যবাসী, তুর্কি এবং অন্যান্যদের স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে, যাদের মধ্যে
কেউ কেউ স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা চায় (যেমন, কুর্দি আন্দোলন)।
প্রভাবশালী
আঞ্চলিক শক্তি
প্রধান দেশগুলো আঞ্চলিক
রাজনীতি নির্ধারণ করে:
1. সৌদি
আরব: একটি শীর্ষস্থানীয় সুন্নি রাজতন্ত্র, যা ইসলামী
রাজনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় প্রভাবশালী।
2. ইরান:
একটি শিয়া-নেতৃত্বাধীন প্রজাতন্ত্র, যা পরোক্ষ শক্তি ও জোটের
মাধ্যমে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চায়।
3. তুরস্ক:
ন্যাটোর একটি সদস্য দেশ, যা আঞ্চলিক কূটনীতি ও সামরিক হস্তক্ষেপে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
4. মিশর:
একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যা প্রায়শই
আঞ্চলিক বিষয়াবলীতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে।
প্রধান
সংঘাত এবং রাজনৈতিক বিষয়
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন
সংঘাত
এই অঞ্চলের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী
সংঘাতগুলোর মধ্যে এটি একটি, যেখানে ভূমি, সার্বভৌমত্ব ও অধিকার নিয়ে বিরোধ জড়িত।
- ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা
এবং পরবর্তী যুদ্ধসমূহ।
- জেরুজালেম, বসতি স্থাপন এবং শরণার্থীদের
নিয়ে চলমান বিরোধ।
- শান্তি প্রচেষ্টা, আলোচনা এবং মাঝেমধ্যে
সহিংসতা।
আরব-ইসরায়েল
যুদ্ধ এবং জোট
আরব রাষ্ট্রগুলো ঐতিহাসিকভাবে
ইসরায়েলের বিরোধিতা করে আসছে, যার ফলে একাধিক যুদ্ধ এবং পরিবর্তনশীল জোটের সৃষ্টি
হয়েছে:
- ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ
- ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ
- ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ
- সাম্প্রতিক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিগুলো
(যেমন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস)।
সিরিয়ার
গৃহযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা
২০১১ সাল থেকে সিরিয়া
এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীসমূহ (সরকার, বিদ্রোহী,
কুর্দি গোষ্ঠী)।
- রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক
ও ইরানের বৈদেশিক হস্তক্ষেপ।
- মানবিক সংকট ও শরণার্থী প্রবাহ।
ইয়েমেন
সংকট এবং উপসাগরীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ইয়েমেন সরকারি বাহিনী
ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘাতের সম্মুখীন, যা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে
আরও জটিল হয়েছে:
- সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হস্তক্ষেপ।
- মানবিক বিপর্যয় ও অস্থিতিশীলতা।
মধ্যপ্রাচ্যে
সমসাময়িক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
গণতন্ত্রায়ন
এবং শাসনব্যবস্থা
যদিও কিছু দেশ গণতান্ত্রিক
প্রক্রিয়ার দিকে অগ্রগতি করেছে, অনেক দেশই স্বৈরাচারী শাসন, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক
স্বাধীনতার অভাবে জর্জরিত।
অর্থনৈতিক
বিষয় এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা
তেল ও গ্যাস রপ্তানির
ওপর অঞ্চলটির নির্ভরশীলতা বিভিন্ন দুর্বলতা সৃষ্টি করে:
- অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের প্রচেষ্টা।
- বেকারত্ব ও আয় বৈষম্য।
- বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের প্রভাব।
ধর্মীয়
ও জাতিগত উত্তেজনা
গভীর বিভাজনগুলো সংঘাতকে
উস্কে দিচ্ছে এবং জাতীয় ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত করছে।
- সাম্প্রদায়িক সহিংসতা।
- জাতিগত স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন।
- ধর্মীয় চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ।
বাহ্যিক
প্রভাব এবং পররাষ্ট্র নীতি
বিশ্ব শক্তিগুলো নিম্নলিখিত
উপায়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে:
- সামরিক হস্তক্ষেপ।
- কূটনৈতিক জোট।
- অর্থনৈতিক সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞা।
ভবিষ্যৎ
দৃষ্টিভঙ্গি এবং আঞ্চলিক গতিশীলতা
শান্তি
ও স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা
যদিও অসংখ্য সংঘাত বিদ্যমান,
চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা স্থিতিশীলতার
আশা জোগাচ্ছে।
প্রযুক্তি
ও যুবকদের ভূমিকা
ক্রমবর্ধমান যুব জনসংখ্যা
এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি রাজনৈতিক সক্রিয়তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শাসনব্যবস্থাকে
নতুন রূপ দিতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক
পরিবর্তন
উদীয়মান জোট, আঞ্চলিক
ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন এবং বাহ্যিক প্রভাব আগামী দশকগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে
রূপদান করতে থাকবে।
উপসংহার
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি
বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক জটিলতা, বিভিন্ন পক্ষ এবং বহুমাত্রিক সংঘাতকে অনুধাবন করতে হবে।
সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, স্বৈরাচারী শাসন এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো চ্যালেঞ্জগুলো
বিদ্যমান থাকলেও, কূটনীতি ও সংস্কারের জন্য চলমান প্রচেষ্টা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে রূপ
দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বেশি থাকায়, মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা
এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে কাজ
করে চলেছে।
এই সংক্ষিপ্ত বিবরণটি
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা প্রদান করে, যা এর সূক্ষ্ম ও পরিবর্তনশীল
প্রেক্ষাপট আরও গভীরভাবে অনুসন্ধানের জন্য একটি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির
পরিচিতি
মধ্যপ্রাচ্য এমন একটি
অঞ্চল যা তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের
জন্য পরিচিত। এর কৌশলগত গুরুত্ব, প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ—বিশেষ করে তেল ও গ্যাস—এবং
ঐতিহাসিক তাৎপর্য একে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি
বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক শিকড়, প্রধান কুশীলব, সংঘাত এবং ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি, যা
আজও এই অঞ্চলকে রূপদান করে চলেছে, সে সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে হবে। এই নিবন্ধটি মধ্যপ্রাচ্যকে
সংজ্ঞায়িতকারী সম্পর্ক, সংঘাত এবং জোটের জটিল জাল সম্পর্কে একটি বিশদ ভূমিকা ও সুস্পষ্ট
ধারণা প্রদান করে।
মধ্যপ্রাচ্যের
রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রাচীন
সভ্যতা এবং তাদের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্য, যাকে প্রায়শই
"সভ্যতার আঁতুড়ঘর" বলা হয়, বিশ্বের প্রাচীনতম কিছু সভ্যতার আবাসস্থল, যার
মধ্যে রয়েছে সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, অ্যাসিরীয়, পারস্য এবং ফিনিশীয়রা। এই প্রাচীন
সমাজগুলো শাসনব্যবস্থা, সংস্কৃতি এবং ধর্মের প্রাথমিক রূপ প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা এই
অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে। তাদের উত্তরাধিকার আধুনিক রাজনৈতিক
পরিচয়কে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে।
উপনিবেশবাদ
এবং আধুনিক রাষ্ট্র গঠন
উনিশ শতক এবং বিশ শতকের
শুরুতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডের ওপর উল্লেখযোগ্য
নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং প্রায়শই জাতিগত বা ধর্মীয় বিভাজনকে উপেক্ষা করে
সীমানা নির্ধারণ করত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের ফলে সাইকস-পিকট
চুক্তি এবং লীগ অফ নেশনসের ম্যান্ডেট স্থাপিত হয়, যা এই অঞ্চলের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে
উল্লেখযোগ্যভাবে রূপদান করে। এই কৃত্রিম সীমানা এবং ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার দীর্ঘস্থায়ী
উত্তেজনা ও সংঘাতের জন্ম দেয়, যার অনেকগুলো আজও বিদ্যমান।
স্বাধীনতা-পরবর্তী
গতিশীলতা
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি
সময়ে স্বাধীনতা লাভের পর, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো জাতি গঠনের প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়,
যার সাথে প্রায়শই স্বৈরাচারী শাসন, সামরিক অভ্যুত্থান এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
জড়িত ছিল। বিশাল তেল ভান্ডারের আবিষ্কার অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে এবং বিদেশি
প্রভাব বৃদ্ধি করে, যা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রাজনীতিকে আরও জটিল করে তোলে।
প্রধান
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজ্যসমূহ
প্রধান
দেশসমূহ এবং তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা
- সৌদি আরব: ওয়াহাবি ইসলামের শক্তিশালী
ধর্মীয় প্রভাবযুক্ত একটি নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র, যা তার তেল সম্পদের কারণে আঞ্চলিকভাবে
উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রাখে।
- ইরান: একটি ধর্মতান্ত্রিক সরকার-শাসিত
ইসলামী প্রজাতন্ত্র, যা বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন এবং সৌদি আরবের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার
মাধ্যমে আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- ইসরায়েল: ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি
সংসদীয় গণতন্ত্র, যা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়গুলোর
কেন্দ্রবিন্দু।
- তুরস্ক: অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী
হিসেবে ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি সংসদীয় গণতন্ত্র, যা প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের অধীনে
ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলামবাদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করছে।
- মিশর: সামরিক শাসনের ইতিহাস সমৃদ্ধ
একটি প্রজাতন্ত্র, যা আরব রাজনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় প্রভাবশালী।
প্রভাবশালী
বেসরকারি অভিনেতারা
- ফিলিস্তিনি দলসমূহ: হামাস ও ফাতাহ,
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু।
- জঙ্গি গোষ্ঠীসমূহ: হিজবুল্লাহ, আইএসআইএস
এবং অন্যান্য যারা আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলছে।
- ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ: ইরানের সর্বোচ্চ
নেতা এবং সৌদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আঞ্চলিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আলোচনাকে প্রভাবিত
করে।
প্রধান
সংঘাত এবং তাদের অন্তর্নিহিত কারণসমূহ
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন
সংঘাত
এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতটি
ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং পরবর্তী যুদ্ধগুলো থেকে উদ্ভূত ভূখণ্ডগত বিরোধ, শরণার্থী
এবং সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর
মধ্যে রয়েছে:
- গাজা ও পশ্চিম তীরের মতো বিতর্কিত
অঞ্চলসমূহ।
- পবিত্র নগরী হিসেবে জেরুজালেমের ভূমিকা।
- শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টা, যা প্রায়শই
সীমিত সাফল্য লাভ করে।
সুবিধা:
- আন্তর্জাতিক মনোযোগ শান্তি প্রচেষ্টাকে
উৎসাহিত করেছে।
- কয়েক দশক ধরে একাধিক শান্তি উদ্যোগ
গ্রহণ করা হয়েছে।
অসুবিধা:
- গভীর অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক বিভাজন সমাধানের
পথে বাধা সৃষ্টি করে।
- বসতির অব্যাহত সম্প্রসারণ শান্তির
সম্ভাবনাকে জটিল করে তোলে।
আরব-ইসরায়েল
সংঘাত এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
আরব রাষ্ট্রগুলো ঐতিহাসিকভাবে
ইসরায়েলের অস্তিত্বের বিরোধিতা করে এসেছে, যার ফলে একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে (যেমন,
১৯৪৮, ১৯৬৭, ১৯৭৩)। এই অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিশেষত ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার
দ্বন্দ্ব, সিরিয়া, ইয়েমেন ও লেবাননের সংঘাতকে প্রভাবিত করে এবং প্রায়শই তা বৃহত্তর
আদর্শগত বা ধর্মীয় বিভাজনের সঙ্গে মিলে যায়।
সিরিয়ার
গৃহযুদ্ধ
২০১১ সাল থেকে, বাশার
আল-আসাদের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে এই সংঘাতটি একাধিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক
পক্ষকে জড়িত একটি জটিল প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নেয়। মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে:
- রাজনৈতিক দমনপীড়ন।
- সাম্প্রদায়িক বিভাজন।
- রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক,
ইরান ও অন্যান্য দেশের বৈদেশিক হস্তক্ষেপ।
প্রভাব:
- ব্যাপক মানবিক সংকট।
- শরণার্থী প্রবাহ যা প্রতিবেশী দেশ
ও ইউরোপকে প্রভাবিত করছে।
ভূ-রাজনৈতিক
গতিশীলতা এবং জোট
আঞ্চলিক
জোট এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা
- উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি):
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারের মতো উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো নিয়ে গঠিত;
আঞ্চলিক হুমকির বিরুদ্ধে প্রায়শই ঐক্যবদ্ধ থাকলেও কাতারের নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে
সমর্থনের মতো বিষয় নিয়ে বিভক্ত।
- ইরান-সুন্নি প্রতিদ্বন্দ্বিতা: একটি
মূল আদর্শিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, বিশেষত ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে, যা ইয়েমেন,
সিরিয়া ও ইরাকের সংঘাতসমূহকে প্রভাবিত করে।
- ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রসমূহ: সাম্প্রতিক
স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিগুলো (যেমন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস) আঞ্চলিক জোটের ধরনে পরিবর্তন
এনেছে এবং কিছু বৈরিতা হ্রাস করেছে।
বৈশ্বিক
প্রভাব
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে
কৌশলগত মৈত্রী বজায় রেখেছে, বিশেষ করে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সাথে, এবং তাদেরকে
সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করেছে।
- সিরিয়ায় রাশিয়ার হস্তক্ষেপ একটি
উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন চিহ্নিত করেছে এবং এর মাধ্যমে দেশটি তার প্রভাব বিস্তার
করেছে।
- অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার
মাধ্যমে চীন ও ইউরোপ ক্রমবর্ধমানভাবে জড়িত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক
উপাদান এবং সম্পদ
তেল
ও গ্যাসের সম্পদ
এই অঞ্চলের জ্বালানি
সম্পদ একাধারে আশীর্বাদ এবং অস্থিতিশীলতার উৎস হয়ে উঠেছে। তেল সম্পদ উন্নয়নের জন্য
অর্থায়ন করলেও, তা দুর্নীতি ও সংঘাতকেও উস্কে দিয়েছে।
বৈশিষ্ট্য:
- প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে
রয়েছে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত।
- বিশ্ব তেলের মূল্যের উপর ওপেক-এর প্রভাব।
সুবিধা:
- অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উল্লেখযোগ্য
রাজস্ব।
- আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কৌশলগত প্রভাব
অসুবিধা:
- তেলের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা দেশগুলোকে
বাজারের ওঠানামার প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
- সম্পদের প্রাচুর্য বৈষম্য ও দুর্নীতিকে
আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
অর্থনৈতিক
চ্যালেঞ্জ
- উচ্চ বেকারত্বের হার, বিশেষ করে তরুণদের
মধ্যে।
- রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগে
বাধা সৃষ্টি করছে।
- হাইড্রোকার্বন থেকে সরে এসে বৈচিত্র্য
আনার প্রয়োজনীয়তা।
রাজনীতিতে
ধর্ম ও পরিচয়
ধর্মীয়
প্রভাব
রাজনৈতিক পরিচয় ও নীতি
নির্ধারণে ধর্ম একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে:
- সৌদি আরব, মিশরের মতো দেশগুলোতে সুন্নি
ইসলামের প্রাধান্য রয়েছে।
- ইরান, ইরাক ও বাহরাইনে শিয়া ইসলাম
প্রভাবশালী।
- ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ আইন, সামাজিক রীতিনীতি
এবং পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করে।
জাতীয়তাবাদ
এবং জাতিগত পরিচয়
কুর্দি, আসিরীয় এবং
অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা চায় এবং প্রায়শই
দমন-পীড়নের শিকার হয়।
বৈশিষ্ট্য:
- ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কে কুর্দি স্বাধীনতা
আন্দোলন।
- ঐক্যবদ্ধ করার একটি কারণ হিসেবে ফিলিস্তিনি
জাতীয়তাবাদ।
সুবিধা:
- সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে
উৎসাহিত করে।
অসুবিধা:
- জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন প্রায়শই
সহিংসতার জন্ম দেয়।
উপসংহার:
প্রতিবন্ধকতা এবং সুযোগ
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশ্বের অন্যতম জটিল ও অস্থিতিশীল একটি অঞ্চল। এর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, ধর্মীয় ও জাতিগত বৈচিত্র্য, সম্পদের প্রাচুর্য এবং বাহ্যিক প্রভাব এমন এক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে যা সংঘাত ও স্থিতিস্থাপকতা উভয় দ্বারাই চিহ্নিত। যদিও চলমান সংঘাতগুলো উল্লেখযোগ্য মানবিক ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, সাম্প্রতিক কিছু পরিবর্তন—যেমন কিছু আরব রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ এবং সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা—স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার পথ খুলে দিয়েছে। এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ গতিপথ অনুধাবন করতে ইচ্ছুক যে কারো জন্য এই উপাদানগুলোর জটিল পারস্পরিক ক্রিয়া বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা, বিচক্ষণ কূটনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতি সমর্থন অপরিহার্য।
|
প্রশ্ন |
উত্তর |
|
আজকের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে রূপদানকারী
প্রধান ঐতিহাসিক কারণগুলো কী কী? |
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক
প্রেক্ষাপট ঔপনিবেশিক ইতিহাস, অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার, ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা
এবং ভূমি, সম্পদ ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে চলমান সংঘাত দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত।
এই ঐতিহাসিক কারণগুলো চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। |
|
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধের মতো আঞ্চলিক সংঘাতগুলো
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করে? |
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন
সংঘাত একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত
করে, জোটগুলোকে প্রভাবিত করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতিকে রূপ দেয়।
এটি আরব রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনাকেও উস্কে দেয়, যা কূটনৈতিক
সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করে। |
|
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বিদেশি শক্তিগুলো
কী ভূমিকা পালন করে? |
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,
রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশসহ বিদেশি শক্তিগুলো সামরিক হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ
এবং কূটনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। তাদের এই সম্পৃক্ততার
লক্ষ্য প্রায়শই তেল সম্পদ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষিত করা। |
|
আরব বসন্ত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে
কীভাবে প্রভাবিত করেছে? |
২০১০ সালে শুরু হওয়া
আরব বসন্ত অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও অস্থিরতার জন্ম দেয়, যার ফলে শাসনব্যবস্থার
পরিবর্তন, গৃহযুদ্ধ এবং আরও গণতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী শাসন কাঠামোর দিকে ঝোঁক দেখা
যায়। এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এখনও আঞ্চলিক রাজনীতি ও স্থিতিশীলতাকে রূপদান করে চলেছে। |
|
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কোন কোন প্রধান
চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে ? |
প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোর
মধ্যে রয়েছে চলমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ, রাজনৈতিক সংস্কার,
সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং সম্পদের ঘাটতি, বিশেষ করে পানি ও জ্বালানির ব্যবস্থাপনা।
এই বিষয়গুলো এই অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তোলে। |
সম্পর্কিত
মূলশব্দ: মধ্যপ্রাচ্য, ভূ-রাজনীতি, আঞ্চলিক সংঘাত, আরব
বসন্ত, মধ্যপ্রাচ্যের সরকারসমূহ, তেল রাজনীতি, ইসলামী আন্দোলন, বৈদেশিক হস্তক্ষেপ,
শান্তি প্রক্রিয়া, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মধ্যপ্রাচ্যের
রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক
ব্যবস্থাগুলো এক বিস্তৃত পরিসর জুড়ে বিস্তৃত, যার মধ্যে রয়েছে রাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র,
ধর্মতন্ত্র এবং বিভিন্ন সংকর শাসনব্যবস্থা। বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় রাষ্ট্র ঐতিহ্যবাহী
রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বজায় রাখে, যেখানে শাসক পরিবারগুলো উল্লেখযোগ্য ক্ষমতার অধিকারী।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির
প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো এর বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক ব্যবস্থা (রাজতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র,
প্রজাতন্ত্র), ধর্ম ও জাতিসত্তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব , তেল সম্পদের গুরুত্ব
, চলমান আঞ্চলিক সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বহিরাগত শক্তিগুলোর ব্যাপক
সম্পৃক্ততা ।
মূল
বৈশিষ্ট্য
- বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক ব্যবস্থা :
এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান।
- নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র :
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানের মতো দেশগুলিতে শাসক পরিবারগুলি উল্লেখযোগ্য,
প্রায়শই নিরঙ্কুশ, ক্ষমতা রাখে।
- প্রজাতন্ত্র ও সংকর শাসনব্যবস্থা
: মিশর, তুরস্ক এবং ইরাকের মতো দেশগুলিতে
প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা রয়েছে, যদিও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও স্থিতিশীলতার
মাত্রায় যথেষ্ট তারতম্য দেখা যায় এবং প্রায়শই সেখানে স্বৈরাচারী বা সামরিক
শাসন বিদ্যমান থাকে।
- ধর্মতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র
: ইরান একটি অনন্য মডেল, যেখানে নির্বাচিত
কর্মকর্তারা শক্তিশালী, অনির্বাচিত ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি কাজ করে।
- সংসদীয় গণতন্ত্র :
ইসরায়েল এই অঞ্চলের সবচেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত সংসদীয় গণতন্ত্র, যদিও ফিলিস্তিনিদের
প্রতি এর নীতিগুলো একটি বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে।
- ধর্ম ও জাতিসত্তার প্রভাব :
আঞ্চলিক রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত পরিচয় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
- সুন্নি-শিয়া বিভাজন
: আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য সৌদি আরব (সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ)
এবং ইরানের (শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ) মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সিরিয়া, ইয়েমেন
এবং ইরাকের মতো দেশগুলিতে প্রক্সি সংঘাতের জন্ম দেয়।
- জাতিগত বৈচিত্র্য :
আরব, কুর্দি, পারস্যবাসী এবং তুর্কি সহ উল্লেখযোগ্য জাতিগোষ্ঠীগুলোর স্বতন্ত্র
পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, যা কখনও কখনও স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার আন্দোলনের
জন্ম দেয়।
- সম্পদ রাজনীতি (তেল ও গ্যাস) :
এই অঞ্চলের বিশাল জ্বালানি ভান্ডার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি উভয়ের উপরই
ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
- রেন্টিয়ার স্টেটস
(Reentier States) : অনেক তেল-সমৃদ্ধ সরকার
অভ্যন্তরীণ করের পরিবর্তে সম্পদ রপ্তানি থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করে,
যার ফলে তারা নাগরিকদের প্রতি তাদের জবাবদিহিতা কমিয়ে দেয় এবং একই সাথে ব্যাপক
সামাজিক কর্মসূচিতে অর্থায়ন করে।
- বৈশ্বিক স্বার্থ :
জ্বালানি সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিশ্বশক্তিগুলোর আকাঙ্ক্ষা তীব্র
আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ও হস্তক্ষেপের জন্ম দিয়েছে।
- আঞ্চলিক সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা
: মধ্যপ্রাচ্য অসংখ্য দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত
এবং পরিবর্তনশীল জোট দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
- ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত
: এটি ভূখণ্ড, নিরাপত্তা এবং জাতীয় পরিচয়
নিয়ে বিরোধের সাথে জড়িত একটি কেন্দ্রীয় ও বিভাজনমূলক বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
- প্রক্সি যুদ্ধ :
প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা প্রায়শই প্রক্সি সংঘাতের মাধ্যমে প্রকাশ পায়,
যেমনটি সিরিয়া ও ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে দেখা গেছে।
- সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ
: আব্রাহাম চুক্তির মতো সাম্প্রতিক কূটনৈতিক
পরিবর্তনের ফলে কিছু আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে,
যা তাদের ঐতিহ্যবাহী জোটবদ্ধতাকে বদলে দিয়েছে।
- বহিরাগত শক্তির সম্পৃক্ততা :
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো বিশ্বশক্তিগুলো উল্লেখযোগ্য সামরিক
উপস্থিতি ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বজায় রাখে, বিভিন্ন মিত্রকে সমর্থন করে এবং অর্থনৈতিক
ও নিরাপত্তা স্বার্থ অনুসরণ করে।
সমসাময়িক
গতিশীলতা
- স্বৈরাচার বনাম গণতন্ত্রায়ন :
আরব বসন্তের গণজাগরণে যেমনটি ফুটে উঠেছে, স্থিতিশীল স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা এবং
বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য জনগণের দাবির মধ্যকার টানাপোড়েন একটি প্রধান
চালিকাশক্তি হিসেবে রয়ে গেছে।
- সামাজিক আন্দোলন :
বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা, যা প্রায়শই
সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, প্রচলিত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে
ক্রমবর্ধমানভাবে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে।
- অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা :
সম্পদশালী হওয়ার পাশাপাশি এই অঞ্চলটি উচ্চ যুব বেকারত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং
বৈচিত্র্যায়নের প্রয়োজনীয়তার মতো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন, যেগুলো সবই রাজনৈতিক
অস্থিতিশীলতায় অবদান রাখতে পারে।
ফিলিস্তিন সংকটের উৎস এবং সমাপ্তি
-ডঃ মুহাম্মাদ সাইদুল ইসলাম
======================
ফিলিস্তিন সংকট মুসলিম বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সংকট। ইসরাইলী সৈন্য কর্তৃক সেখানে প্রতিনিয়ত মুসলমানদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। মুসলমানদেরকে তাদের স্বীয় জন্মভূমি থেকে তাড়িয়ে তথায় জোরপূবর্ক ইহুদীরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এই সংকটের সুত্রপাত। এ সংকট শুধু ফিলিস্তিনীদের জন্য নয়, বরং সারা মুসলিম উম্মাহকে দাবিয়ে রাখার একটা দীর্ঘ পরিকল্পণার অংশ। পত্র-পত্রিকাসহ অন্যান্য মিডিয়া মারফত আমরা সমকালীন ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে কমবেশী অবগত আছি। এই দীর্ঘ সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মূলসূত্র, এবং ভবিতব্য ঘটনাবলী সংক্রান্ত আমাদের সম্যক ধারণা থাকা একান্ত প্রয়োজন। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এখানে সে ধারণা দেয়া হবে ইনশাল্লাহ।
ধর্মীয়, ঐতিহাসিকও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে ফিলিস্তিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। প্রথমতঃ অত্র এলাকা বা তার আশেপাশেই শুরু হয় মেসোপোটেমিয়ান সভ্যতা যা বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন সভ্যতা। এর অনেক পরে শুরু হয় প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতা। দ্বিতীয়তঃ মানব সভ্যতার জন্মভূমি হওয়ার আল্লাহপাক সেখানে দুই তৃতীয়াশং নবী রসূল প্রেরণ করেন। মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম (আঃ)কেও ফিলিস্তিন এলাকায় দাওয়াতি কাজের জন্য পাঠানো হয়। তৃতীয়তঃ সেখানে রয়েছে হযরত সুলাইমান (আঃ) কর্তৃক নির্মিত মসজিদুল আকসা যা মুসলমানদের প্রথম কেবলা ছিলো। চতুর্থতঃ ভৌগলিক এবং কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এ এলাকাকে বলা হয় মুসলিম বিশ্বের হৃদপিন্ড (Heart of Muslim
Land), কারণ এটা আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের মুসলিম দেশসমূহের মাঝে যোগসূত্র স্থাপন করেছে।
ইহুদী সম্প্রদায়ঃ কিছু প্রাথমিক ধারণাঃ
ইহুদী সম্প্রদায় বিভিন্ন নামে পরিচত। তাদের এক নাম ‘বানি ইসরাইল’। হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর একটা খেতাব ছিলো ‘ইসরাইল’ (আল্লাহর বান্দা); আর এ জন্যই তার বংশধরকে ‘বানি ইসরাইল’ বা ইসরাইলের বংশধর বলা হয়। বর্তমানে তথকাথিত ইসরাইল রাষ্ট্র এ খেতাব থেকেই এসেছে। ইংজেরীতে তাদেরকে JEW এবং তাদের ধর্মকে বলা হয় JUDAISM যা এসেছে ইয়াকুব (আঃ) এর এক পুত্রের নাম থেকে অথবা ‘জুডিস’ নামক এক স্থানের নাম থেকে। পবিত্র কোরআনে তাদেরকে ‘আহলিল কিতাব’, ‘বানি ইসরাইল’, এবং ‘ইহুদী’ এ তিন নামেই সন্বোধন করা হয়েছে। বর্তমানে আরো একটি খেতাবে তাদেরকে আমরা চিনে থাকি, খেতাবটা হলো জায়োনিষ্ট (Zoinist), যা এসেছে Zoin নামক জেরুসালেমে অবস্থিত এক পাহাড়ের নাম থেকে।
১৮৮০ সালে Nathan Birnbaum নামে এক অষ্টেলীয়ান ইহুদী তাদের তথকথিত পবিত্র ভুমিতে ফিরে যাওয়োর জন্য একটি আন্দোলনের প্রস্তাব করেন এবং সেই আন্দোলনের নাম হিসেবে এ নামটি ব্যবহার করেন। ১৮৮৭ সালে Theodore Herzl নামক এক হাংগেরিয়ান ইহুদী Der Judenstaat (The
State of the Jews) নামক একটি বই লেখেন এবং International Zoinst
Organization নামে একটি পূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের রুপরেখা দাঁড় করান। তিনিই এই আন্দোলনের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ইসরাইলী রাষ্ট্র এবং তাদের উপনিবেশ ঐ আন্দোলনেরই ফলশ্রুতি।
ইহুদীরা নিজেদেরকে খোদার ‘পছন্দের একমাত্র বান্দা’ (Chosen people of God) মনে করে এবং এ কারণেই কেউ ধর্মান্তরিত হয়ে ইহুদী হতে চাইলেও ইহুদীরা তাকে গ্রহণ করেনা। আল্লাহপাক বানি ইসরাইলকে এক সময় বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন; কিন্তু তারা তা ধরে রাখতে পারেনি। কারণ পবিত্র কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী তাদের অধিকাংশ ইতিহাসই পাপাচার, হত্যা, লুণ্ঠন, ব্যভিচার, হঠকারিতা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, মিথ্যাচার, শিরক প্রভৃতিতে পরিপূর্ণ। এসবের ফলে তারা তাদের শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা থেকে স্খলিত হয়ে আল্লাহ কর্তৃক “অভিশপ্ত জাতি” হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। তাদের কীর্তিকলাপ এবং অভিশপ্ত হওয়ার কারণে তারা রাষ্ট্রহারা হয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। যুগে যুগে তারা চরম শাস্তিরও সম্মুখীন হয়েছে। ফেরাউন, রোমান, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার কর্তৃক তারা পাইকারিহারে হত্যার শিকার হয়। মনে করা হয়, আল্লাহর অভিশাপের ফলশ্রুতি হিসাবে তারা কখনোই স্থায়ী কোন নিরাপদ বাসস্থানে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। তাদের নিজেদের কিতাব (তাওরাতে) বর্ণিত তাদের জঘন্য পাপাচারের কয়েকটা দৃষ্টান্ত নিম্নরূপঃ
১। হযরত সুলাইমানের (আঃ) পর ইসরাইল সাম্রাজ্য দুইভাগে বিভক্ত হয়ঃ জেরুসালেমের ইহুদীয়া রাষ্ট্র এবং সামারিয়ার ইসরাইল রাষ্ট্র। এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে লড়াই হয়। হানানী নবী ইহুদী রাষ্ট্রের শাসক আশা’কে সতর্ক করলে নবীকে কারারুদ্ধ করা হয়।
২। বা’ল দেবতার পূজার জন্য ইহুদীদের তিরস্কার করলে ইসরাইলী রাজা আখিতাব স্বীয় স্ত্রীর প্ররোচণায় ইলিয়াস নবীকে হত্যার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। নবী তখন সিনাই উপদ্বীপের পর্বতাঞ্চলে আশ্রয় নেন। তিনি বদদোয়া করেনঃ “হে আল্লাহ! বানি ইসরাইল তোমার সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করেছে; তোমার নবীকে হত্যা করেছে তালোয়ারের সাহায্যে এবং একমাত্র আমিই জীবিত আছি। তারা আমার প্রাণ নাশের চেষ্টা করছে...” (১ রাজাবলী, ১৭ অধ্যায়, ১-১০ শ্লোক)।
৩। সত্য ভাষণের অপরাধে মিকাইয়া নামে অপর এক নবীকে কারারুদ্ধ করে তারা (১ রাজাবলী, ২২ অধ্যায়, ২৬-২৭ শ্লোক)।
৪। ইহুদী রাষ্ট্রে যখন প্রকাশ্যে মূর্তিপূজা ও ব্যভিচার চলতে থাকে এবং হযরত যাকারিয়া (আঃ) যখন এ ব্যাপারে সোচ্চার হন, তখন ইহুদি রাজা ইউআস এর নির্দেশে তাকে মূল হাইকেলে সুলাইমানীতে মাকদীস ও জবেহ ক্ষেত্রের মাঝখানে প্রস্তারাঘাতে নিহত করা হয়।
৫। দাওয়াতের কারণে ইয়ারমিয়াহ নবীকে মারধর ও কারাবুদ্ধ করা হয়। এরপর ক্ষুধা ও পিপাসায় শুকিয়ে মেরেফেলার জন্য রশি দিয়ে বেধে কর্দমাক্ত কুয়ার মধ্যো ঝুলিয়ে রাখা হয় (যিরমীয়, ১৫ অধ্যায়)।
৬। ব্যভিচারের সমারোচনা করলে মামুস নবীকে দেশ থেকে বহিস্কারের কড়া নির্দেশ দেয়া হয় (মামুস ৭, ১০-১৩ শ্লোক)।
৭। ইহুদী শাসক হিরোডিয়াসের দরবারে ব্যভিচার ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপের সমালোচান করলে হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) কে প্রথমতঃ কারারুদ্ধ করা হয়। পরে বাদশাহ নিজের প্রেমিকার নির্দেশে তাকে শিরচ্ছেদ করে। এরপর নবীর কর্তিত মস্তক থালায় করে বাদশাহ তার প্রেমিকাকে উপহার দেয় (মার্ক, ৬ অধ্যায়, ১১-১৯ শ্লোক)।
৮। সত্যের দাওয়াতের জন্য হযরত ঈসা (আঃ)কে কারারুদ্ধ করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা তৈরী করা হয়। রোমান শাসক পিতালিস ইহুদীদের বললো, "আজ ঈদের দিন, তোমাদের স্বার্থে ঈসা অথবা বারাব্বাকে মুক্তি দিতে চাই। কাকে দিব?” ইহুদীরা বললো, "বারাব্বাকে মুক্তি দিন আর ঈসাকে ফাসি দিন।" (মথি ২৭, ২০-২৬ শ্লোক)। হযরত ঈসা (আঃ) ইহুদীদের জন্য বদ দোয়া করেনঃ
Ah, sinful nation, A people loaded down with wickedness [with
sin, with injustice, with wrongdoing], Offspring of evildoers, Sons who behave
corruptly! They have abandoned (rejected) the LORD, They have despised the Holy
One of Israel [provoking Him to anger], They have turned away from Him.
৯. ইহুদীদের পরিণতি সম্পর্কে খোদার ভবিষ্যদ্বাণীঃ Just as it pleased the
LORD to make you prosper and multiply, so also it will please Him to annihilate
you and destroy you. And you will be uprooted from the land you are entering to
possess. Then the LORD will scatter you among all the nations, from one end of
the earth to the other, and there you will worship other gods, gods of wood and
stone... Among those nations you will find no repose, not even a resting place
for the sole of your foot. There the LORD will give you a trembling heart,
failing eyes, and a despairing soul.… (Deuteronomy 28:63-65).
জায়োনিস্ট আন্দোলনঃ
ইহুদীরা তাদের কিছু ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দাবীর প্রেক্ষিতে ইসরাইলী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে জায়োনিষ্ট আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটিয়েছে। তাদের ধর্মীয় দাবী হলো তাওরাতের ভাষ্য অনুযায়ী ইব্রাহীমকে বলা হয় ফিলিস্তিন যেতে। তিনি ফিলিস্তিনে পৌঁছার পর খোদা তাকে বলেন, “ইব্রাহীম দাঁড়াও, তোমার ভুখন্ড হলো নীল ও ইউফ্রেটিস নদীর মাঝখানে”। তাওরাতের এ বর্ণনা অনুসারে ইহুদীরা মনে করে ফিলিস্তিন ভুখন্ড হল খোদার পক্ষ থেকে তাদেরকে দান করা ভুখন্ড (Promised land)। কিন্তু তাদের এ ধর্মীয় দাবীর ব্যাপারে যেসব প্রশ্ন আছে তা হলোঃ
১। তাওরাত বর্তমানে অবিকৃত অবস্থায় নেই, কাজেই তাওরাতে যেসব কথা বলা আছে সেগুলোর সবগুলোই যে সত্যিকারে খোদার বাণী তার কোন স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণ নেই। তাওরাতে বর্ণীত ইহুদীদের ধর্মীয় দাবী বিশ্বাস করাও মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
২। ধরে নেয়া হল, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে আল্লাহপাক এ বিশাল ভূখন্ড দেয়ার ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সেটা ইহুদীদের ভাগেই পড়বে। ইব্রাহীম (আঃ) এর দুই সন্তান ছিলো, ইসহাক এবং ইসমাইল। ইহুদীরা এসেছে হযরত ইসহাকের পুত্র ইয়াকুব (আঃ) বংশ থেকে। ইসহাক ও ইসমাইল উভয়ের ভাগ সেখানে থাকার কথা।
৩। আসল ব্যাপার হলো এ ভূখন্ডকে কোন গোত্রের জন্য ওয়াদা করা হয়নি বরং সূরা আল বাকারা থেকে প্রমাণিত হয় যে, এটা সত্যিকার বিশ্বাসী বা ইমানদারদের জন্য আল্লাহপাক ওয়াদা করেছেন। কাজেই সত্যিকার ইমানের দাবী নিয়ে ইহুদীরা কখনোই এ ভূখন্ড পাওয়ার যোগ্য নয়। তাছাড়া এ ওয়াদা ছিল শুধু একটা বিশেষ সময়ের জন্য।
৪। দুনিয়ার ইতিহাস হলো ইমান আর কুফরের মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস। এ দ্বান্দ্বিক ইতিহাসে আল্লাহপাকের তাওহীদের বার্তাবাহক হলেন শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। কাজেই আল্লাহর ওয়াদা অনুসারে শেষ নবীর অনুসারী মুসলমানেরাই উক্ত ভূখন্ডের আসল দাবীদার।
৫। কোন বিশেষ গোত্রের (ইব্রাহীমের পুত্র) জন্য এটা ওয়াদা করা হয়েছে, এটা ধরলেও বতর্মান ইহুদীরা যে সত্যিকারে ইব্রাহীম বা ইয়াকুবের পুত্র তারও প্রমাণের কোন উপায় নেই। কারণ ইব্রাহীম (আঃ) দুনিয়াতে এসেছিলেন ৬০০০ বছর পূর্বে। তাছাড়া ইতিহাস থেকে প্রমাণিত যে ইসরাইলে বর্তমানে যেসব ইহহুদীরা বসবাস করছে, তাদের অধিকাংশই কাম্পিয়ান এবং কৃষ্ণসাগরের মধ্যবর্তী ককেশাস এলাকা থেকে এসেছে। তাদের ৯০ ভাগ নবম ও দশম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খেলাফত এবং খ্রীষ্টানদের দ্বিমুখী চাপের মধ্যে মাঝামাঝি ধর্ম হিসাবে ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করে। খুবই অল্প সংখ্যক ইহুদীই ফিলিস্তিনের আদিবাসী। প্রায় ১৮০০ বছর ধরে ফিলিস্তিন এলাকা ইহুদী শূন্য ছিলো। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় ৭০০০ লোক রাশিয়া থেকে আসে যাদের মধ্যে ৩০ ভাগ ছিলো অইহুদী। তারা চাকুরীর সন্ধানে এসে ইহুদী পরিচয় দিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
ধর্মীয় দাবীর পাশাপাশি ইহুদীদের এতিহাসিক দাবী হলোঃ প্রায় চারশ বছর ধরে তারা এ এলাকা শাসন করেছে, কাজেই এটা তাদেরই ভূখন্ড। খৃষ্টপূর্ব ১০০৪ থেকে ৯৬৩ পর্যন্ত এ এলাকা শাসন করেন হযরত দাউদ (আঃ)। এরপর দাউদ (আঃ) এর পুত্র সোলাইমান (আঃ) শাসন করেন খৃষ্টপূর্ব ৯২৬ পর্যন্ত। হযরত সুলাইমান (আঃ) এর মৃত্যুর পরই ইহুদী রাষ্ট্র দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সব মিলে প্রায় ৪০০ বছরের শাসন ছিলো ইহুদীদের। কিন্তু তাদের এ দাবী মুসলমানদের কাছে অগ্রহণযোগ্য কয়েকটি কারণেঃ
১। দাউদ এবং সোলাইমান (আঃ) আল্লাহর নবী ছিলেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও ছিলেন আল্লাহর নবী এবং রাসুল। কাজেই মুহাম্মদ (সঃ)-ই হলেন এর সত্যিকার উত্তরাধিকারী।
২। ইহুদীরা ইতিহাসের কোন এক সময়ে ৪০০ বছর এ এলাকা শাসন করেছে বলেই এটা তাদের এলাকা যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে এই সাথে এটাও মেনে নেয়া দরকার যে মুসলমানরা ১৩৫০ বছর ধরে ফিলিস্তিন শাসন করেছে, কাজেই এটা মুসলমানদের ভূখন্ড। মুসলমানেরা ইহুদীদের তিনগুনেরও বেশী সময় ধরে ফিলিস্তিন শাসন করেছে।
৩। ইহুদীরা যে ফিলিস্তিনের আদিবাসী তারও কোন প্রমাণ নেই। এ এলাকায় প্রায় ১১,০০০ বছর পূর্বে সভ্যতা শুরু হয়। দুনিয়ার প্রথম শহর হল ফিলিস্তিনের জেরিকো (খৃষ্টপূর্ব ৮০০০)। খৃষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ২,৫০০ এর মাঝে আরব থেকে বনুকেনান (কেনান গোত্র) ফিলিস্তিনে এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে; আর এটা ঘটেছিলো বনি ইসরাইলীদের আসার ১,৫০০ বছর পূর্বে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যখন ফিলিস্তিনে এসেছিলেন, তার আগেই ফিলিস্তিনে জনবসতি ছিলো এবং বনুকেনান ফিলিস্তিন ছেড়ে অন্য কোথাও যায় নাই। ইসলামের আগমণের পর বনুকেনান (ফিলিস্তিনের আদিবাসী) অন্যান্য গোত্রের সাথে মিশে যায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। বতর্মানে ফিলিস্তিনের মুসলমানেরা তাদেরই বংশধর। কাজেই আদিবাসী হিসাবেও ফিলিস্তিন এলাকা মুসলমানদেরই প্রাপ্য।
এখন প্রশ্ন হলো ইহুদীদের ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক দাবী ভূয়া হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপ কেন ইহুদীদের পক্ষ নিলো? এর পিছনে অনেক কারণ রয়েছেঃ
১. ইউরোপে মাটির্ন লুথার এবং জন ক্যালভিন কতৃর্ক প্রণীত ও প্রচারিত প্রটেস্টট্যান্ট আন্দোলন এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ আন্দোলন ইহুদী, খ্রীষ্টান সবাইকে তাদের আসল কিতাব (তাওরাত, ইনজিল) সরাসরি অধ্যয়নের অনুপ্রেরণা যোগায়। তাওরাতে উল্লিখিত ইহুদীদের ধমীর্য় দাবীর বিষয়টি সম্পর্কে ইহুদী খ্রীষ্টান সবাই এ সময় অবগত হয়। অবগতির ক্ষেত্র পার হয়ে পরবতীর্তে এটা একটা সংস্কৃতির রূপ পরিগ্রহ করে।
জেরুসালেমে ফিরে যাওয়ার বিষয় নিয়ে পত্র পত্রিকায় লেখালেখি ছাড়াও বই পুস্তক, উপন্যাস, ফিল্ম, প্রভৃতি রচিত হতে থাকে। অতীত নিয়ে স্মৃতিকাতর (nostalgic) ইহুদীরা নিজেদের এবং পাশ্চাত্য মননে তৈরি করে এক শক্তিশালী diaspora, নিজেদের অতীত ভূমিতে ফিরে আসার অভিপ্রায়ে।
২. নেপোলিয়ানের সময়ে এ সাংস্কৃতিক রূপ পরিবর্ধিত হয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। নেপোলিয়ান ১৭৯৮ সালে মিশরের ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদীদের পুনবার্সনের ঘোষণা দেন।
৩. উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে সারা ইউরোপে জাতীয়তাবাদী চেতনা মারাত্মক রূপ লাভ করে। এ জাতীয়তাবাদী ঢেউ ইহুদীদেরকে চরমভাবে নাড়া দেয় এবং তারা তাদের নিজস্ব এবং আলাদা ভূখন্ড সৃষ্টির দাবীতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ইহুদীবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও ইহুদীদেরকে ইউরোপ থেকে বহিষ্কারের ব্যাপারে সরকারকে বাধ্য করে। ফলে ইহুদীদের জন্য আলাদা বাসস্থানের (রাষ্ট্রের) পথ সুগম করতে অনেক ইউরোপীয় সরকার বাধ্য হয়।
৪. এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জঘন্য ভূমিকা রেখেছে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তি। ওসমানীয়া খেলাফতের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে ব্রিটিশ শক্তি মুসলমানদেরকে সারা জীবনের মত পরাস্ত করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেয়। আর এ নিয়ে ব্রিটেনে অনুঠিত হয় দুই বছর ব্যাপী (১৯০৫-১৯০৭) কনফারেন্স। এটাই বিশ্বের সবচেয়ে দীঘর্মেয়াদী কনফারেন্স। এই কনফারেন্সে মুসলিম বিশ্বকে চিরস্থায়ীভাবে পঙ্গু করার জন্য কতকগুলো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিলোঃ সুয়েজখাল ও ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের হৃদপিন্ডে (অর্থাৎ ফিলিস্তিনে) এমন এক জাতিকে পুনবার্সন করা যারা হবে মুসলমানদের চরমশক্র। কনফারেন্সের এই সুপারিশ অনুসারে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বালফোর জায়োনিষ্ট আন্দোলনের নেতা Lionel Walter
Rothschild কে চিঠি লিখেন যেটা The Balfour
Declaration নামে খ্যাত। চিঠিতে বলা হয়ঃ Britain would use its
best endeavors to facilitate the establishment in Palestine of a national home
for the Jewish People. (অর্থাৎ ফিলিস্তিনে ইহুদী জাতির জন্য একটা জাতীয় বাসস্থান প্রতিষ্ঠান ব্যাপারে ব্রিটেন সবার্ত্মক প্রচেষ্টা চালাবে)। ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বর এ ঘোষণা দেয়া হয় এবং একই বছরের ডিসেম্বরে ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনের অর্ধাংশ দখল করে। ১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তারা পুরো ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। এরপর থেকে সেখানে শুরু হয় ইহুদী পুনর্বাসন। চীন থেকেও ইহুদীরা ফিলিস্তিনে পুনবার্সিত হয়। এ প্রক্রিয়া ব্রিটিশদের তত্ত্বাবধানে পুরোদমে চলতে থাকে এবং ১৯৪৮ সালে ইহুদী আগন্তুকদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ লক্ষ ৫০ হাজারে। ব্রিটিশরা ইহুদীদের জন্য অথর্নৈতিক এবং রাজর্নৈতিক কাঠামো নির্মাণ এবং নানান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। ইহুদীদের মাঝে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী তৈরীরও ব্যবস্থা নেয়া হয়। ১৯৪৮ সালে ইহুদীদের ছিলো অস্ত্রে সজ্জিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৭০ হাজার সৈন্য। সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে সে সময় আরব দেশসমূহের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। যেমন জডার্নের সৈন্য ছিলো মাত্র ৪,৫০০। জডার্নের ৫০ জন কমান্ডারের মধ্যে ৪৫ জন্যই ছিলো ব্রিটিশ। মিশরের সৈন্য সংখ্যা ছিলো ১০ হাজারের মত। সব মিলে পুরো আরব বিশ্বে মাত্র ৩০,০০০ সৈন্য ৭০ হাজার ইসরাইলী সৈন্যের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়, যা প্রয়োজনে তুলনায় ছিলো খুবই নগণ্য। এখান থেকেই যাত্রা শুরু হলো জায়োনিষ্ট উপনিবেশ।
জায়োনিস্ট উপনিবেশ ও ফিলিস্তন সংকটঃ
বিংশ শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া জায়োনিস্ট উপনিবেশের সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক পটভূমিকা নিম্নরূপঃ
১৮৯৫: ফিলিস্তিনের জনসংখ্যা ছিলো পাঁচ লাখ, তার মধ্য মাত্র ৪৭ হাজার ছিলো ইহুদী। ইহুদীরা পুরো ভূখন্ডের মধ্যে ০.৫ ভাগের মালিক ছিলো। এসব ইহুদীরা ফিলিস্তিনের আদিবাসী নয় বরং ১৬০৯ সালে স্পেন থেকে পালিয়ে এসে ফিলিস্তিন এলাকায় বসবাস শুরু করেছিল।
১৮৯৬: থিয়োডোর হারজেল তার রচিত বই The State of the Jews এ জায়োনিস্ট আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়ন করেন।
১৮৯৭: সুইজারল্যান্ডে প্রথম জায়োনিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় এবং ফিলিস্তিনে উপনিবেশ স্থাপনের জন্য World Zionist
Organization (WZO) প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১৯০৪: চতুর্থ জায়োনিস্ট কংগ্রেসে আজের্ন্টিনায় ইহুদীদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
১৯০৬: জায়োনিস্ট কংগ্রেসে মত পরিবতর্ন করে তাদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চূড়ান্ত ভাবে ফিলিস্তিনকে বেছে নেয়া হয়।
১৯১৭: The
Balfour Declaration সম্পন্ন হয়। ঐ সময়ে ফিলিস্তিনের মোট ৭ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ছিলো ৫ লক্ষ ৭৪ হাজার মুসলমান এবং ৭৪ হাজার খ্রীষ্টান। ইহুদী ছিলো ৫৬ হাজার।
১৯১৯: ফিলিস্তিনবাসীরা তাদের প্রথম জাতীয় কনফারেন্সে Balfour Declaration এ বিরোধিতা করে।
১৯২০: The
San Remo conference অনুসারে ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনে নিজেদের উপনিবেশিক প্রশাসন জারি করে এবং হারবার্ট স্যামুয়েল নামে এক স্বঘোষিত জায়োনিস্টকে ফিলিস্তিনে ব্রিটেনের প্রথম হাইকমিশনার নিয়োগ করে।
১৯২২: The
Council of the League of Nations ফিলিস্তিনে ইহুদীদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়।
১৯৩৬: মুসলমানদের জন্য ভূমি বাতিলকরণ এবং ইহুদী পুনবার্সনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনবাসীরা ৬ মাসের জাতীয় ধমর্ঘট পালন করে।
১৯৩৯: ব্রিটিশরা এক শ্বেতপত্র ছাপিয়ে ইহুদী পুনবার্সনের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ পূবর্ক দশ বছরের মধ্যে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। জায়োনিস্টরা এই সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করে এবং এক বিশাল সন্ত্রাসীগ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে ফিলিস্তিনবাসী ইহুদীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সমরাভিযান শুরু করে। উদ্দেশ্যঃ সেখান থেকে সবাইকে সরিয়ে জায়োনিস্ট (ইহুদী) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
১৯৪৭: জাতিসংঘ ফিলিস্তিনবাসীদের জন্য (যারা ছিলো জনসংখ্যার ৭০ ভাগ এবং ৯২ ভাগ ভূখন্ডের মালিক) মোট ভূখন্ডের মাত্র ৪৭ ভাগ অনুমোদন করে (UN Resolution 181)।
১৯৪৮: ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে। জায়োনিস্টরা কোন পরিসীমা নিণর্য় না করেই ইসরাইল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। আরব দেশগুলোর সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনবাসীদের রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে।
১৯৪৯: জায়োনিস্টরা ফিলিস্তিনের ৭৭ ভাগ ভূখন্ড দখল করে নেয়। প্রচুর মুসলমানকে হত্যা করে এবং দশ লক্ষ ফিলিস্তিনবাসীকে (মুসলমান) তাদের স্বীয় বাসভূমি থেকে জোরপূবর্ক বিতাড়িত করে। পশ্চিম তীর (West Bank) জর্ডানের এবং গাজা মিশরের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
১৯৬৪: The
Palestine Liberation Organization (PLO) প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১৯৬৫: আরবদের সাথে ইসরাইল নতুন যুদ্ধ শুরু করে এবং পশ্চিম তীর, গাজা সহ ফিলিস্তিনের বাকী এলাকাটুকু ইহুদীরা দখল করে নেয়। একই সাথে সিরিয়ার গোলান চুড়া এবং মিশরের সিনাই উপদ্বীপও দখল করে।
১৯৭৩: আরবদের সাথে ইসরাইলের আবার যুদ্ধ হয় এবং ইসরাইলীরা প্রথমবারেরমত পরাজয় বরণ করে কিন্তু ভূখন্ড লাভে মুসলমানেরা ব্যর্থ হয়।
১৯৭৪: রাবাতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পিএলওকে পুনর্গঠন করা হয় এবং নিষ্পেষিত ফিলিস্তিনবাসীদের উউদ্ধারের পূর্ণ দায়িত্ব পিএলওকে প্রদান করা হয়। এবছরই জাতিসংঘ পিএলওকে স্বীকৃতি প্রদান করে। পিএলও'র চেয়ারম্যান ইয়াসীর আরাফাত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ প্রদান করেন।
১৯৭৮: আমেরিকার ছত্রছায়ায় ইসরাইল এবং মিশর Camp Devid চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
১৯৮২: PLO
কে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ইসরাইল বাহিনী লেবানন আক্রমন করে এবং নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। হাজার হাজারর মুসলমানদেরকে হত্যা এবং গৃহহারা করা হয়।
১৯৮৩: জাতিসংঘ এক সম্মেলনের ডাক দেয় এবং সেখানে অন্যান্য প্রতিনিধিদের মাঝে পিএলওকেও ফিলিস্তিনবাসীদের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদানের আহবান করা হয়।
১৯৮৭: অধিকৃত ভূখন্ডে ফিলিস্তিনবাসীরা ‘ইনতিফাদা’ (পূনর্জাগরণ) আন্দোলন শুরু করে।
১৯৮৮: ফিলিস্তিন নেতা, আবুজিহাদ কে তার তিউনিসের বাসগৃহে হত্যা করা হয়। ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক তাকে হত্যা করেন (১৪ই এপ্রিল)। ৩১ শে জুলাই জডার্নের রাজা হুসেন ঘোষণা করেন যে তিনি আর পশ্চিম তীরকে নিজের রাজ্যের অংশবিশেষ মনে করেন না। ১৫ই নভেম্বর UN Partition Plan 181 অনুসারে Palestine National
Council আলজিয়ার্সে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রদান করে। ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে যোগদানের জন্য ইয়াসির আরাফাতকে আহবান করা হলেও ইহুদী লবীর কারণে আমেরিকা তাকে ভিসা প্রদানে বিরত থাকে। ফলে ফিলিস্তিনের জন্য জেনেভাতে বিশেষ সেশনের আয়োজন করা হয়। এরপর শুরু হয় আমেরিকা ও পিএলও’র মধ্যে মতবিনিময়।
১৯৮৯: মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত The European Economic
Community (EEC) সম্মেলনে শান্তি আলোচনার জন্য পিএলও’র প্রতি আহবান জানানো হয়।
১৯৯০: গাজার ৭ জন ফিলিস্তিনি মুসলমানকে তেলআবিবের নিকট ইহুদী কতৃর্ক নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় (মে ২০)। ইয়াসীর আরাফাত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিকট ফিলিস্তিনবাসীদের জানমাল এবং পবিত্র স্থানসমূহের নিরাপত্তার জন্য জরুরী বাহিনী প্রেরণের আবেদন করেন। ফিলিস্তিনে জরুরী নিরাপত্তা বাহিনী প্রেরণের বিরুদ্ধে আমেরিকা ভেটো প্রদান করে। অধিকৃত এলাকার ফিলিস্তিন নেতৃবর্গ তাদের অনশন ধমর্ঘট শেষে আমেরিকাকে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। বাগদাদে অনুষ্ঠিত আরব সম্মেলনে ফিলিস্তিনী ইনতিফাদাকে জোর সমথর্নপূবর্ক অধিকৃত এলাকায় সোভিয়েত ইহুদীদের পুনবার্সনের বিরোধিতা ও নিন্দা করা হয়। ২০শে জুন পিএলও আমেরিকার সামরিক অভিযানকে বিরোধিতা এবং প্রত্যাখ্যান করে। আমেরিকা পিএলও’র সাথে আলোচনা বাতিল ঘোষণা করে। ২৬ শে জুন ডাবলিন সম্মেলনে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ইসরাইলকে দায়ী করা হয় এবং সোভিয়েত ইহুদীদের অধিকৃত এলাকায় পুনবার্সনের নিন্দা করা হয়। ২রা আগস্ট শুরু হয় উপসাগরীয় সংকট।
১৯৯১: ১৬ই জানুয়ারী উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হয়। ২৩ শে সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রাচ্য শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য PNC আলজিয়ার্সে উপস্থিত হয়। ৩০ শে অক্টোবর মাদ্রীদে মধ্যপ্রাচ্য শাস্তি সম্মেলন শুরু হয়। ওয়াশিংটনে ডিসেম্বরের ৩ তারিখে ইসরাইল এবং ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জডার্ন ও লেবাননের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
১৯৯২: ২৩ শে জুন ইসরাইলের নিবার্চনে লেবার পার্টি জয়লাভ করে এবং লেবার পার্টি কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। আগস্ট ২৫ তারিখে ৬ষ্ঠ বারের মত ওয়াশিংটনে আরব-ইসরাইলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলতে থাকে।
১৯৯৩: সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে পিএলও এবং ইসরাইল একে অপরকে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৯৪: ৪ঠা মে কায়রোতে গাজা এবং জেরিকো চুক্তি সম্পন্ন হয়, ২৯ শে আগষ্ট সম্পন্ন হয় ক্ষমতা হস্তান্তর চুক্তি। এরপর হেবরনের মসজিদ ৪৭ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ফলে শান্তিচুক্তির অনেক কিছুই ভেস্তে যায়।
১৯৯৫: সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখে ওয়াশিংটনে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যকার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৯৬: জানুয়ারীতে ফিলিস্তিনে নিবার্চন সম্পন্ন হয়।
১৯৯৭: নেতানিয়াহুর সরকার নতুন করে পুনবার্সন কমর্কান্ড শুরু করে এবং পরিস্থিতি খারাপের দিকে মোড় নেয়। শান্তি আলোচনা ব্যহত হয়।
এরপর থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে খারাপের দিকেই অগ্রসর হতে হতে এখন চরম আকার ধারণ করেছে।
এখন প্রায় প্রতিদিনই ইসরাইলী সৈন্যদের গুলীতে প্রাণ হারাচ্ছে অধিকারহারা ফিলিস্তিনী আবাল বৃদ্ধবণিতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পতুর্গীজ, ডাচ, ইংরেজ, ইটালিয়ান, স্প্যানিশ, ফরাসী, রাশিয়ান, জামার্নী প্রভৃতি উপনিবেশিক শক্তিগুলো নিজেদের প্রশস্ত এবং প্রত্যক্ষ হাত গুটিয়ে নেয়। বহাল থাকে জায়োনিস্ট উপনিবেশে। এরা অন্যান্য উপনিবেশিক শক্তি থেকে ভিন্ন। এদের মোটামুটি বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপঃ
১. জায়োনিস্টদের উপনিবেশের পশ্চাতে রয়েছে তাদের ধমীর্য় এবং ঐতিহাসিক দাবী।
২. তাদের পলিসি হলো মুসলমানদের হত্যা করে বা বহিস্কার করে তথায় নিজেদের পুনবার্সন। ১৯৪৮ সালে তারা ৭০% মুসলমানকে জোর করে তাদের স্বীয় বাসভূমি ত্যাগে বাধ্য করে।
৩. এরা আগ্রাসনবাদে বিশ্বাসী। তাদের জাতীয় পতাকাই তার বাস্তব প্রমাণ। পতাকায় দুইটি নদীর মাঝখানে তারকার চিহৃ, অথাৎ State between two
rivers (নীল এবং ইউফ্রেটিস)। তাদের পরিকল্পণা ফিলিস্তিনসহ সিরিয়া, মদিনা, মিশর, উত্তর কুয়েত, ইরাক এবং খায়বরসহ বিশাল এলাকা নিয়ে বৃহৎ ইসরাইলী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকরণ।প্রায় একশ বছর আগে তাদের এই ম্যাপ উদঘাটিত হয়েছিল।
৪. তারা উপনিবেশ শুরু করেছে ব্রিটিশদের সহযোগিতায়। ব্রিটিশদের মতো জায়োনিষ্টদের উদ্দেশ্য মুসলমানদেরকে নিশ্চিহৃ করা বা পঙ্গু করে রাখা। ১৯৮১ সালে তারা ইরাকের পরমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে হামলা করে। সুদান তাদের থেকে ২০০০ কিঃমিঃ দূরে হলেও তথাকার বিদ্রোহীদের ইসরাইল সাহায্য করে আসছে।কয়েক বছর আগে পাকিস্তানে দুইজন ইহুদী গ্রেফতার হয়েছিলো। তারা পাকিস্তানের পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করার জন্য গিয়েছিল।
৫. দুনিয়ার বড় বড় শক্তির সাথে তাদের রয়েছে বৃহৎ যোগসূত্র।আমেরিকা, কানাডা, জার্মানী, ফ্রান্স, রাশিয়া ব্রিটেন, প্রভূতি দেশে তারা প্রচন্ড প্রভাবশালী।
৬. তাদের রয়েছে দুইশো’র বেশী পারমানবিক বোমা যা পুরো মুসলিমবিশ্ব ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। আন্তজার্তিক রাজনীতি, অথর্নীতি, সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে অসামান্য প্রভাব। তারা মুসলিম বিশ্বে সমস্যা সৃষ্টিতে তৎপর। ১৯৯৭ সালের দিকে জর্জ সরোস নামে একজন ধরকুবের ইহুদীর কারণেই মালয়েশিয়াসহ পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চরম অর্থনৈতিক সংকটে নিপাতিত হয়।
৭. জায়োনিস্ট উপনিবেশই বতর্মান বিশ্বে প্রত্যক্ষভাবে চলমান একমাত্র উপনিবেশ।
৮. নিষ্ঠুরতা এবং ববরর্তায়ও তারা অগ্রসর। ১৯৪৮ সালের হত্যাকন্ড তার জ্বলন্ত প্রমাণ। যুবক ছাড়াও তারা মহিলা এবং নিষ্পাপ শিশুদেরকে হত্যা করে, তাদের চক্ষু উৎপাটন করে এবং গর্ভবর্তী মহিলাদের পেট কেটে বাচ্চা বের করে পা দিয়ে মথিত করে। বতর্মানের হত্যাকান্ডও তাদের ববরর্তার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
ইসরাইল রাষ্ট্রের ভবিষ্যত ও ইহুদীদের পরিণতিঃ
তাওরাত এবং পবিত্র কোরআন থেকে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যেঃ (ক) কিয়ামত পযর্ন্ত ইহুদীরা বিভিন্ন কঠোর শাসক দ্বারা নিস্পেষিত ও শাস্তি পেতে থাকবে, (খ) তারা সম্পূর্ণ নিজেদের শক্তিতে কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, বতর্মানে ইসরাইল রাষ্ট্রের মযার্দা আমেরিকা ও ব্রিটেনের গোলাম বৈ আর কিছু নয়। কখনোই ইসরাইল রাষ্ট্র স্থিতিশীল হবে না। এ রাষ্ট্র নিজস্ব সম্পদ ও শক্তির উপর নির্ভর করে একমাসও টিকে থাকতে পারবে কিনা সন্দেহ। এ রাষ্ট্রটি আমেরিকা ও ইউরোপীয়দের দৃষ্টিতে একটা অনুগত আজ্ঞাবহ “ষড়যন্ত্র কেন্দ্র” ছাড়া অন্য কোন গুরুত্ব বহন করেনা। পাশ্চ্যত্য শক্তিবলয়, বিশেষ করে আমেরিকার সাথে নানা ধরনের প্রকাশ্য ও গোপন চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে তাদের মদদপুষ্ট ও আশ্রিত হয়ে নিছক ক্রীড়ানক রূপে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। ইসলামকে দুবর্ল করার জন্যই পাশ্চাত্য শক্তি ইহুদীদের সমথর্ন দিয়ে যাচ্ছে। কাজেই রাষ্ট্র হিসাবে ইসরাইল কখনোই স্থিতিশীল হবেনা।
হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, পুরো জেরুজালেম মুসলমানদের হাতে আসবে এবং ইহুদীরা সমূলে ধ্বংস হবে। অধিকাংশ উলামাদের মতে ইহুদীরা সমূলে ধ্বংস হবে বলেই তারা ফিলিস্তিনে একত্রিত হচ্ছে। রাসূলে করীম (সাঃ) বলেনঃ
১) কিয়ামতের পূর্বে তোমরা ছয়টা জিনিস গণনায় রেখঃ ক) আমার মৃত্যু (খ) জেরুসালেম জয়, (গ) তোমাদের এমন গণমৃত্যু যেমন মহামারীতে ভেড়া গণহারে মরে, (ঘ) সম্পদের এমন প্রাচুর্যতা যে একজনকে একশ দীনার দান করলেও সে খুশী থাকবে না, (ঙ) কোন আরবগৃহ সাধারণ দুর্যোগ ও রক্তক্ষয় থেকে রেহাই পাবে না, (চ) তোমাদের এবং বনি আসফার (রোমনদের) মাঝে চুক্তি হবে। পরে তারা চুক্তি ভঙ্গ করে তোমাদের উপর আক্রমণ করবে। তাদের সেনাবাহিনী আট পতাকাধারী হবে এবং প্রত্যেক পতাকার অধীনে থাকবে বার হাজার সৈন্য।
২) সে সময় (কিয়ামত) ততক্ষণ আসবেনা যতক্ষণ না তোমরা (মুসলমানেরা) ইহুদীদের সাথে যুদ্ধ করবে এবং তাদেরকে হত্যা করতে করতে এমন হবে যে তারা (ইহুদীরা) গাছ ও পাথরের পশ্চাতে আশ্রয় গ্রহণ করবে, আর পাথর ও গাছ বলবেঃ “হে আল্লাহর বান্দা (মুসলিম)! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে, তুমি এসে তাকে হত্যা কর”।
৩) দাজ্জাল ইসফাহান এলাকার (ইরানে) আবিভূর্ত হবে এবং তার অনুসারী হবে সত্তুর হাজার ইহুদী।
মুসলিম বিশ্বের হৃদপিন্ডে অবস্থিত ইসরাইল রাষ্ট্রকে কিছু মুসলিম শাসক মেনে নিলেও মুসলিম উম্মাহ সম্ভবত কখনোই মেনে নিবে না, অন্যদিকে ইহুদীরাও তাদের স্বঘোষিত রাষ্ট্র ছেড়ে যাবেনা। ফলে ফিলিস্তিন সংকটের আশু সমাধান পুরো অন্ধকারে ঢেকে আছে। ‘দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান’ নিয়ে পূর্বে অনেক আলোচনা চললেও বিশ্বমোড়লদের এ ব্যাপারে আগ্রহ অনেক কম।
বিশ্লেষকদের ধারণা, অশান্তি, অরাজকতা, আর রক্তক্ষয় চলতে থাকবে বছরের পর বছর যতদিন না মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়।মুসলমানদের বতর্মানে নাজুক পরিণতির পিছনে রয়েছে তাদের অনৈক্যতা। আমেরিকা আজ সামান্য ইসরাইল নামক অবৈধ রাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে গিয়ে পুরো আরব বিশ্ব সহ সারা বিশ্বের প্রায় দুইশো কোটি মুসলমানের বিরাগভাজন হচ্ছে। অনেকের মতে, মুসলমানদের এ নাজুকে পরিস্থিতির সমাধান হচ্ছে তাদের একতা, মজবুত ইমানী জজবা, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং সে অনুসারে শক্তি সঞ্চয়। অন্যথায়, তাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে ইমাম মেহেদীর আগমণ পর্যন্ত যখন জয় হবে জেরুসালেম, ধ্বংস হবে ইহুদী রাষ্ট্র, দূর হবে ফিলিস্তিন সংকট, এবং প্রতিষ্ঠিত হবে পরম শান্তি।
ক্লাস - ০৪
সৌদি
আরবের রাজনৈতিক ব্যবস্থা
সৌদি আরবে একটি একক
নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র রয়েছে, যেখানে আল সৌদ পরিবারের রাজা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী
এবং তিনি রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশটি সংবিধান হিসেবে
ইসলামী আইন (শরিয়া) অনুসারে শাসন করে। এখানে কোনো রাজনৈতিক দল বা জাতীয় নির্বাচন
নেই, যদিও শুরা পরিষদের মতো পরামর্শমূলক সংস্থা এবং সীমিত পৌরসভা নির্বাচন বিদ্যমান।
তবে কার্যত শাসক হলেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, যিনি ভিশন ২০৩০-এর অধীনে গুরুত্বপূর্ণ
সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার পরিচালনা করছেন।
রাজনৈতিক
ব্যবস্থার মূল দিকসমূহ:
- রাজতন্ত্র: সরকার
একটি বংশানুক্রমিক নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র, যা প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের পুত্র
ও পৌত্রদের মাধ্যমে উত্তরাধিকারসূত্রে চলে আসছে।
- ইসলামী আইন (শরিয়া): কুরআন
ও সুন্নাহ (নবীর ঐতিহ্য) সংবিধান হিসেবে কাজ করে, যা সকল আইন ও শাসনব্যবস্থাকে
পরিচালিত করে।
- কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা: যদিও
রাজপরিবারের সদস্য, ধর্মীয় নেতা এবং গোত্রীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে পরামর্শ করা
হয়, ক্ষমতা রাজার অধীনে অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত থাকে।
- কোনো রাজনৈতিক দল নেই: এখানে
কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নেই এবং জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না।
- শুরা পরিষদ: রাজা
কর্তৃক নিযুক্ত একটি পরামর্শমূলক পরিষদ, যা জনবিতর্কে একটি সীমিত ভূমিকা পালন
করছে এবং এতে নারী সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
- পৌরসভা নির্বাচন: ২০০৫
সালে স্থানীয় পরিষদের জন্য সীমিত ও নির্দলীয় নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা হয়,
যার ফলে ২০১৫ সালে নারীরা ভোট দিতে ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হন।
- ভিশন ২০৩০ সংস্কার: নারীর
গাড়ি চালানোর অধিকার ও বৃহত্তর স্বাধীনতাসহ উল্লেখযোগ্য সামাজিক পরিবর্তনগুলো
অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ প্রচেষ্টার অংশ।
বর্তমান
নেতৃত্ব:
- বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল
সৌদ: বর্তমান শাসক।
- যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস):
কার্যত শাসক, যিনি বড় ধরনের সংস্কারগুলো
পরিচালনা করছেন।
মূলত, সৌদি আরব ঐতিহ্যবাহী
রাজতন্ত্রের সাথে ইসলামী শাসনের সমন্বয় ঘটিয়েছে এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের
অধীনে আধুনিকীকরণ ও সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সৌদি আরব ইসলামী
আইন (শরিয়া) অনুসারে পরিচালিত একটি একক নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র । ১৯৯২ সালে রাজকীয়
ফরমান দ্বারা গৃহীত ‘ শাসনের মৌলিক আইন ’ একটি
সংবিধান-সদৃশ সনদ হিসেবে কাজ করে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে কুরআন
এবং সুন্নাহ (নবী মুহাম্মদের শিক্ষা) হলো দেশটির আনুষ্ঠানিক
সংবিধান।
মূল
শাসন কাঠামো
- রাজা: ২০২৬
সাল থেকে, রাজা সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ হলেন রাষ্ট্রপ্রধান এবং
সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। রাজা নির্বাহী, আইন প্রণয়নকারী এবং বিচারিক কার্যাবলী সমন্বিতভাবে
নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী।
- প্রধানমন্ত্রী: ২০২২
সালে, রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রধানমন্ত্রী
নিযুক্ত হন। তিনি কার্যত শাসক হিসেবে নীতি নির্ধারণকে কেন্দ্রীভূত করেন এবং রাষ্ট্রের
দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করেন।
- মন্ত্রী পরিষদ (মন্ত্রিসভা): রাজা
কর্তৃক নিযুক্ত এবং তাঁর কাছে দায়বদ্ধ এই পরিষদ সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক
নীতি পরিচালনা করে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী এর সভাপতিত্ব করেন।
আইন
প্রণয়নকারী এবং উপদেষ্টা সংস্থা
- পরামর্শদাতা পরিষদ (মজলিস আল-শুরা):
রাজা কর্তৃক প্রতি চার বছর অন্তর নিযুক্ত
১৫০ সদস্যের একটি
সংস্থা। যদিও এটি আইন প্রস্তাব ও পর্যালোচনা করতে পারে, এর কোনো স্বাধীন আইন
প্রণয়ন ক্ষমতা নেই এবং এটি শুধুমাত্র রাজাকে পরামর্শ প্রদান করে।
- আনুগত্য পরিষদ: ২০০৬
সালে প্রতিষ্ঠিত, রাজপরিবারের সদস্যদের এই পরিষদ পরবর্তী রাজা ও যুবরাজ নির্ধারণ
এবং সাউদ রাজবংশের মধ্যে একটি স্থিতিশীল উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছে।
বিচার
ব্যবস্থা
আইন ব্যবস্থা শরিয়া
আইনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ।
- স্বাধীনতা: বিচার
বিভাগ তাত্ত্বিকভাবে স্বাধীন হলেও, সর্বোচ্চ বিচারিক পরিষদের সুপারিশক্রমে রাজা
কর্তৃক বিচারপতিগণ নিযুক্ত হন।
- সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ: রাজা
হলেন চূড়ান্ত আপিল আদালত এবং ক্ষমা মঞ্জুর করার একমাত্র ক্ষমতা তাঁরই রয়েছে।
রাজনৈতিক
অধিকার এবং স্থানীয় শাসন
- রাজনৈতিক দলসমূহ: সকল
রাজনৈতিক দল অবৈধ ।
- নির্বাচন: কোনো
জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। ২০০৫, ২০১১ এবং ২০১৫ সালে স্থানীয় উপদেষ্টা
পরিষদের আংশিক আসনের জন্য পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে, ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য
নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল।
- আঞ্চলিক প্রশাসন: রাজ্যটি ১৩টি প্রদেশে
বিভক্ত , যার প্রত্যেকটির নেতৃত্বে থাকেন
রাজা কর্তৃক নিযুক্ত একজন গভর্নর (সাধারণত একজন জ্যেষ্ঠ রাজপুত্র)।
- আবেদনপত্র (মজলিস): সকল নাগরিকের মজলিস
নামে পরিচিত একটি প্রকাশ্য সভার মাধ্যমে
সরাসরি রাজা এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন করার ঐতিহ্যগত অধিকার
রয়েছে ।
সৌদি আরবের আইনি কাঠামোটি
‘শাসনের মৌলিক আইন’ দ্বারা
প্রতিষ্ঠিত , যা ১৯৯২ সালে জারি করা একটি সংবিধান-সদৃশ সনদ এবং এতে রাষ্ট্রের গঠন ও
নাগরিকদের অধিকারের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। তবে, এই রাজ্যের ভিত্তিগত "সংবিধান"
ধর্মীয়ভাবে পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহ (নবী
মুহাম্মদের শিক্ষা) হিসেবে সংজ্ঞায়িত ।
১.
শাসনের মৌলিক আইন (১৯৯২)
৮৩টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত
এই দলিলটি রাজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক কাঠামো হিসেবে কাজ করে। এর প্রধান বিধানগুলো হলো:
- রাজতন্ত্র: সৌদি
আরবকে প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের পুত্র ও পৌত্রদের দ্বারা শাসিত একটি রাজতন্ত্র
হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
- কর্তৃত্বের উৎস: অনুচ্ছেদ
৭-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, শাসনব্যবস্থা তার কর্তৃত্ব কুরআন ও সুন্নাহ থেকে
লাভ করে, যা “এই আইন এবং রাষ্ট্রের অন্য সকল আইনকে নিয়ন্ত্রণ করে”।
- শাসনব্যবস্থা: ইসলামী
শরীয়ত অনুযায়ী ন্যায়বিচার, পরামর্শ ( শুরা ) এবং সমতার ভিত্তি স্থাপন
করে ।
- অধিকার ও কর্তব্য: ব্যক্তিগত
সম্পত্তির অধিকার (অনুচ্ছেদ ১৮) এবং সামাজিক সুরক্ষার (অনুচ্ছেদ ২৭) নিশ্চয়তা
প্রদান করে, পাশাপাশি ইসলাম ধর্ম ও মাতৃভূমির প্রতিরক্ষার মতো কর্তব্য বাধ্যতামূলক
করে।
২.
সম্পূরক সাংবিধানিক আইন
যদিও মৌলিক আইনটি কেন্দ্রীয়
সনদ, অন্যান্য বিশেষায়িত আইনগুলো মূল সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করে:
- মন্ত্রী পরিষদ আইন: এই আইন মন্ত্রিসভার
ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো নির্ধারণ করে, যার সভাপতিত্ব করেন রাজা (এবং বর্তমানে
যার নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী)।
- শুরা পরিষদ আইন: এই আইন পরামর্শদাতা পরিষদের
গঠন ও উপদেষ্টা কার্যাবলীর রূপরেখা প্রদান
করে , যা জাতীয় নীতি নিয়ে আলোচনা করে এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি পর্যালোচনা করে।
- আনুগত্য পরিষদের আইন: উত্তরাধিকার
প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং রাজা ও যুবরাজের নির্বাচন নির্ধারণের জন্য প্রতিষ্ঠিত।
- প্রাদেশিক আইন: রাজ্যের
১৩টি প্রশাসনিক অঞ্চলকে সংগঠিত করে, যার প্রত্যেকটির নেতৃত্বে থাকেন একজন গভর্নর।
৩.
বিচার বিভাগীয় ও আইন প্রণয়নমূলক সংস্কার (২০২১-২০২৬)
ভিশন
২০৩০-এর অধীনে , সৌদি আরব স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের
আস্থা বাড়ানোর জন্য একটি আরও বিধিবদ্ধ আইনি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
- শরিয়ার সংবিধিবদ্ধকরণ: সরকার
প্রচলিত শরিয়ার ব্যাখ্যাসমূহের পরিপূরক হিসেবে দেওয়ানি লেনদেন আইন (যা
দেওয়ানি আইনের মূলনীতিসমূহকে সংবিধিবদ্ধ করে) এবং ফৌজদারি কার্যবিধি আইনসহ
বেশ কিছু প্রধান সংবিধি প্রবর্তন করেছে।
- নতুন নিয়ন্ত্রক মাইলফলক: ২০২৬
সালের জানুয়ারি মাস থেকে ‘অ-সৌদিদের দ্বারা স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা আইন’ কার্যকর
হয়েছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এবং এর মাধ্যমে বিদেশী ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলো
নির্দিষ্ট অঞ্চলে সম্পত্তির মালিক হতে পারবে।
- সাম্প্রতিক হালনাগাদ: ২০২৫ সালের শেষের
দিকে এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে, নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক
খাতগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নতুন ক্রীড়া আইন এবং ২০২৬ সালের কোম্পানি
আইনের মতো নতুন বিশেষায়িত আইনগুলোকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
পেট্রোডলার কূটনীতি
পেট্রোডলার কূটনীতি বলতে ৫০ বছর পুরোনো একটি ভূ-রাজনৈতিক
ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত ১৯৭০-এর দশকে
সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তেল বিক্রির মূল্য শুধুমাত্র মার্কিন
ডলারে নির্ধারণ নিশ্চিত করেছিল। তেল লেনদেনের জন্য ডলারকে একমাত্র মুদ্রা হিসেবে নির্ধারণ
করার বিনিময়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোকে সামরিক সুরক্ষা, অস্ত্রশস্ত্র
এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদান করেছিল।
কৌশলগত অধ্যয়ন, গবেষণা ও বিশ্লেষণ ইনস্টিটিউট (ISSRA) +৩
পেট্রোডলার ব্যবস্থার মূল দিকসমূহ:
উৎপত্তি: ১৯৭১ সালে
ব্রেটন উডস ব্যবস্থার পতনের পর (ডলারের সাথে স্বর্ণের বিনিময়যোগ্যতার অবসান), মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র ডলারের জন্য একটি নতুন ভিত্তি খুঁজছিল। ১৯৭৪ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
এবং সৌদি আরব এই চুক্তিটি স্থাপন করে।
কার্যপ্রণালী: তেল উৎপাদনকারী
দেশগুলো (ওপেক) তেলের জন্য বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলার পায়, যা পরবর্তীতে মার্কিন ট্রেজারি
বন্ড, স্টক এবং রিয়েল এস্টেট কেনার মাধ্যমে মার্কিন অর্থনীতিতে পুনরায় বিনিয়োগ করা
হয়।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধাসমূহ: এই
ব্যবস্থা ডলারের জন্য ব্যাপক ও স্থিতিশীল বৈশ্বিক চাহিদা তৈরি করেছিল, মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রকে স্বল্প সুদের হারে তার ঘাটতির অর্থায়ন করার সুযোগ করে দিয়েছিল
এবং ডলারকে বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল।
সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং পেট্রোডলার কূটনীতির
পতন (২০২৪-২০২৫):
২০২৪ সালের ৯ জুন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর ভিত্তিপ্রস্তরস্বরূপ মার্কিন-সৌদি পেট্রোডলার
চুক্তিটি নবায়ন করা হয়নি, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
- বৈচিত্র্যকরণ: সৌদি আরব 'ভিশন ২০৩০'-এর অধীনে
সক্রিয়ভাবে তার অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনছে এবং চীনা ইউয়ান, ইউরো ও ইয়েনসহ অন্যান্য
মুদ্রায় তেল লেনদেন নিষ্পত্তি করতে চাইছে।
- বহুমেরুতা: ব্রিকস-এ সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্তি
এবং চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীলতা
থেকে সরে আসার একটি পদক্ষেপকে প্রতিফলিত করে।
- ডিজিটাল মুদ্রা: সৌদি আরব ‘প্রজেক্ট এমব্রিজ’-এ
অংশগ্রহণ করছে। এটি একটি বহু-কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রা (সিবিডিসি)
প্ল্যাটফর্ম, যা আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং এর লক্ষ্য
হলো প্রচলিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমানো।
- অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
একটি প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর তার
নিজস্ব নির্ভরতা কমেছে এবং মূল চুক্তির কৌশলগত প্রয়োজনীয়তাও বদলে গেছে।
সম্ভাব্য প্রভাবসমূহ:
এই ব্যবস্থার পতনের ফলে মার্কিন ডলারের আধিপত্য দুর্বল
হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক
প্রভাব হ্রাস পেতে পারে। এটি আরও একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব অর্থনীতির দিকে পরিবর্তনের
ইঙ্গিত দেয়, যেখানে পেট্রোডলার আর একমাত্র মানদণ্ড থাকবে না।
বিশ্ব অর্থনীতিতে পেট্রোডলারের গুরুত্ব
পেট্রোডলার হলো তেল এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য
বিক্রির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের অর্জিত মার্কিন ডলার। মার্কিন অর্থনীতি এবং ডলারের শক্তির
উপর এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। এর তাৎপর্যের কয়েকটি দিক নিচে দেওয়া হলো:
- মার্কিন ডলারে বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্য : ১৯৭০-এর
দশক থেকে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক তেল লেনদেন মার্কিন ডলারে পরিচালিত হয়ে আসছে।
ফলে, তেল কেনার জন্য দেশগুলোকে মার্কিন ডলার ধরে রাখতে হয়, যা এই মুদ্রার জন্য
একটি ধারাবাহিক চাহিদা তৈরি করে।
- পেট্রোডলারের পুনর্ব্যবহার : তেল
রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রায়শই তাদের অতিরিক্ত মার্কিন ডলার মার্কিন ট্রেজারি
সিকিউরিটিজ এবং অন্যান্য ডলার-মূল্যের সম্পদে বিনিয়োগ করে, যাতে সেগুলো সুরক্ষিত
থাকার পাশাপাশি মুনাফাও অর্জন করা যায়। পেট্রোডলার পুনর্ব্যবহার নামে পরিচিত
এই প্রক্রিয়াটি মার্কিন সরকারের বাজেট এবং বাণিজ্য ঘাটতির অর্থায়নে সহায়তা
করে ।
- মার্কিন ডলারের বর্ধিত চাহিদা : বৈশ্বিক তেল
বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা এর চাহিদা বাড়িয়েছে, যা বিশ্বের প্রধান
রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে এর
মূল্য ও মর্যাদা বজায় রাখতে সাহায্য করছে।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঋণের খরচ হ্রাস : তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো থেকে মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজের বর্ধিত
চাহিদা মার্কিন সুদের হারকে স্বাভাবিকের চেয়ে কম রাখতে সাহায্য করে, যা মার্কিন
সরকার এবং ভোক্তাদের জন্য লাভজনক। এর কারণ হলো, বন্ডের দাম বাড়লে সেগুলোর ইল্ড
স্বাভাবিকভাবেই কমে যায় ।
- ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব : পেট্রোডলার ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে
তেল-রপ্তানিকারী দেশগুলোর ওপর এক ধরনের সুবিধা দেয়, যারা মার্কিন ডলারের স্থিতিশীলতার
ওপর নির্ভরশীল এবং এর শক্তি বজায় রাখার ব্যাপারে তাদের বিশেষ স্বার্থ রয়েছে।
পেট্রোডলার ব্যবস্থা মার্কিন অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে
লাভবান করেছে এবং বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের মূল্য ও মর্যাদা বজায়
রাখতে সাহায্য করেছে।
পেট্রোডলার ব্যবস্থার উদ্ভব
মুদ্রা বিনিময় হারের
ব্রেটন উডস ব্যবস্থা ১৯৭১ সালে ভেঙে পড়ে, কারণ বিশ্ব অর্থনীতি এবং নিরাপদ সম্পদের
চাহিদা স্বর্ণের উপলব্ধ সরবরাহকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ৩৪
"পেট্রোডলার" পরিভাষাটি সর্বপ্রথম ১৯৭৩
সালে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ইব্রাহিম ওওয়াইস দ্বারা উদ্ভাবিত
হয়েছিল ।
একমাত্র ডলারই বাস্তবিকভাবে সেই শূন্যস্থান পূরণ
করতে পারত। মার্কিন বাণিজ্য ও বাজেট ঘাটতির কারণে বিশ্বব্যাপী ডলারের সরবরাহ বাড়ার
সাথে সাথে, অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য থেকে লাভবান হওয়া তেল রপ্তানিকারকদের অর্জিত
পেট্রোডলারের সঞ্চয়ও বৃদ্ধি পেয়েছিল। 6
রপ্তানিকারীরা ডলার গ্রহণ করেছিল কারণ তাদের আর কোনো
বিকল্প ছিল না: এটি ছিল তাদের প্রধান গ্রাহকের মুদ্রা এবং, আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, আন্তর্জাতিক
বাণিজ্য ও অর্থায়নের মুদ্রা । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যকার জোট
১৯৭৪ সালে মার্কিন ট্রেজারিতে সৌদি পেট্রোডলারের পুনঃবিনিয়োগ এবং ১৯৭৯ সালে সৌদি আরবে
মার্কিন-পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছিল ।
১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে তেল
ও গ্যাসের মজুদের বিকাশের ফলে পেট্রোডলার অবশেষে নরওয়ের মতো নতুন রপ্তানিকারকদের মধ্যে
ছড়িয়ে পড়ে, যাদের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মূল্য ২০২১ সালের শেষে ছিল ১.৪ ট্রিলিয়ন
ডলার এবং যা বিশ্বব্যাপী প্রকাশ্যে তালিকাভুক্ত সমস্ত শেয়ারের প্রায় ১.৫% ধারণ করত।
৮৯
পেট্রোডলার পুনর্ব্যবহারের সুবিধা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিদেশে পেট্রোডলার পুনঃবিনিয়োগের
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, এটি ব্যবসা-বাণিজ্যকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিয়েছে।
বিদেশী তেল রপ্তানিকারকরা অপরিশোধিত তেল সরবরাহ চালিয়ে যেতে পারত এবং সবচেয়ে সহজে
বিনিময়যোগ্য মুদ্রায় অর্থ পেত, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক, আর্থিক,
প্রযুক্তিগত এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল ।
পেট্রোডলারের উত্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তার
জ্বালানি সরবরাহকারী উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগি
করতে বাধ্য করেছিল। উন্নয়ন প্রকল্প এবং আন্তঃসীমান্ত বিনিয়োগ প্রবাহের পাশাপাশি,
পেট্রোডলার মার্কিন অস্ত্র রপ্তানিতে অর্থায়ন করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে
ত্বরান্বিত করেছিল। ৭
ইউরোডলার বাজারে,
ডলার-ভিত্তিক বিনিয়োগের চাহিদা বাড়িয়ে ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যকে আরও প্রসারিত করেছিল
। ১০
৮৮৮ বিলিয়ন ডলার
মার্কিন জ্বালানি তথ্য সমিতির তথ্য অনুযায়ী,
২০২২ সালে ওপেক সদস্য দেশগুলো থেকে বিশ্বব্যাপী মোট তেল রপ্তানি আয়। ১১
পেট্রোডলার ব্যবস্থার সম্মুখীন চ্যালেঞ্জসমূহ
তবে, ঝুঁকিও রয়েছে। যদি তেল-রপ্তানিকারী দেশগুলো
তেলের জন্য অন্য মুদ্রা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয় অথবা তাদের রিজার্ভ অন্য সম্পদে
বিনিয়োগ করে, তাহলে তা মার্কিন ডলারের চাহিদা দুর্বল করে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক রিজার্ভ
মুদ্রা হিসেবে এর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
এবং তেল-রপ্তানিকারী দেশগুলোর মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে এমনটা হতে পারে,
কারণ এই দেশগুলো মার্কিন ডলারের ওপর তাদের নির্ভরতা কমাতে চাইতে পারে।
এটি ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ২০১৮ সালে, চীন পেট্রোডলার
ব্যবস্থার একটি বিকল্প "পেট্রোইউয়ান" তৈরি করার জন্য ইউয়ানে তার প্রথম
অপরিশোধিত তেলের ফিউচার চুক্তি চালু করে। ১২ রাশিয়াও মার্কিন ডলারের উপর
তার নির্ভরতা কমাতে কাজ করে চলেছে, ২০১৯ সালে রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন
যে দেশটি তার অর্থনীতিকে "ডলারমুক্ত" করার লক্ষ্য নিয়েছে। এই পরিকল্পনাটি
এক প্রকার মার্কিন সমর্থন লাভ করে যখন ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসন রাশিয়ার
বিরুদ্ধে একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা চালু করতে প্ররোচিত
করে, যা রাশিয়াকে ডলার এবং ইউরো-ভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
১৩ এরপর থেকে রাশিয়ার অর্থনীতি অনেক বিশ্লেষকের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো
করেছে, কিন্তু কোনো দেশই চাইবে না যে তার অর্থনীতি এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যে বিপর্যয়ের
সম্মুখীন হয়েছে তা ঘটুক।
গত দশকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়ে ইরান
ও ভেনিজুয়েলা তেল লেনদেনের জন্য অন্যান্য মুদ্রার দিকে ঝুঁকেছে। ইরান বহু বছর ধরে
তার তেলের জন্য ইউরো, ইউয়ান এবং অন্যান্য মুদ্রা গ্রহণ করে আসছে, অন্যদিকে ভেনিজুয়েলা
ইউরো এবং চীনা ইউয়ান ব্যবহার করেছে। ডলারাইজেশনের রাজনৈতিকীকরণ—তথাকথিত " দুর্বৃত্ত
" শাসনব্যবস্থাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য শক্তিশালী ডলারের মার্কিন ব্যবহার—একটি
প্রতিকূল প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, কিন্তু পেট্রোডলার ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে বহাল রয়েছে।
ভূ-রাজনীতি এবং বিদেশে ডলার-বর্জনের পাশাপাশি, বিশ্ব
যখন পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের দিকে ঝুঁকবে, তখন সময়ের
সাথে সাথে তেলের চাহিদাও হ্রাস পাবে। এর ফলে তেলের চাহিদা এবং বৈশ্বিক প্রধান জ্বালানি
পণ্য হিসেবে এর গুরুত্ব কমে যাওয়ায়, অবশেষে পেট্রোডলার প্রবাহও হ্রাস পেতে পারে।
পেট্রোডলারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বাভাস মূল্যায়ন
অর্থনীতিতে, ট্রিফিন
দ্বিধা নামে একটি বিষয় রয়েছে , যার নামকরণ করা হয়েছে অর্থনীতিবিদ রবার্ট ট্রিফিনের
নামে, যিনি ১৯৬০ সালে প্রথম এটি প্রস্তাব করেছিলেন। ১৬ ট্রিফিন দ্বিধা বলতে
এমন একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাতকে বোঝায়, যার মুদ্রা বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা
হিসেবে কাজ করে। বিশেষত, এটি নিম্নলিখিত বিষয়গুলির মধ্যেকার টানাপোড়েনকে বর্ণনা করে:
- বৈশ্বিক বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধি সহজতর করার জন্য বিশ্বকে পর্যাপ্ত পরিমাণে
রিজার্ভ মুদ্রা সরবরাহ করার প্রয়োজনীয়তা।
- সেই মুদ্রার মূল্য ও স্থিতিশীলতার ওপর আস্থা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা।
এই উভয়সঙ্কট দেখা দেয় কারণ এই দুটি লক্ষ্য প্রায়শই
পরস্পরবিরোধী হয়: আরও মুদ্রা জারি করলে তার মূল্য হ্রাস পেতে পারে, আবার এর মূল্য
বজায় রাখলে বৈশ্বিক তারল্য সীমিত হতে পারে। যদি এর মূল্য খুব বেশি হয়, তবে এটি বৈশ্বিক
মুদ্রা হিসেবে ভালো নয়; যদি এর মূল্য কমে যায়, তবে তা তারল্যের জন্য ভালো হলেও অন্য
দিক থেকে কম আকর্ষণীয়।
বাস্তবে, একটি প্রভাবশালী রিজার্ভ মুদ্রার সুবিধাগুলো
ব্যবহারকারীরা তাৎক্ষণিকভাবেই পেয়ে থাকেন, অপরদিকে ট্রিফিন যে অসুবিধাটি চিহ্নিত করেছিলেন,
তা যদি ঘটেও, তবে তা অত্যন্ত ধীর গতিতে এবং অনির্দিষ্ট সময়ে ঘটে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে যুক্তরাজ্যকে প্রতিস্থাপন করার প্রায় এক শতাব্দী
পরেও, ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ পাউন্ড বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৩০% এর অধিকারী
ছিল। ১৭
২০২৩ সাল পর্যন্ত, মার্কিন অর্থনীতি তখনও বৈশ্বিক
মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের অধিকারী ছিল—এবং এর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী
চীনের চেয়ে ৪০%-এরও বেশি বড় ছিল। ১৮১৯ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম
চলতি হিসাবের ঘাটতিও বজায় রাখে। ২০ যেমন ট্রিফিন উল্লেখ করেছেন, একটি রিজার্ভ
মুদ্রার ইস্যুকারীর জন্য একটি বড় চলতি হিসাবের ঘাটতি অনিবার্য ।
বিশ্ব অর্থনীতি এমনভাবে বিকশিত হচ্ছে যা এই ব্যবস্থার
উপর চাপ কমাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তেল
এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের একটি নিট রপ্তানিকারক দেশ হয়ে উঠেছে, যা টেক্সাসের মতো তেল
উৎপাদনকারী রাজ্যগুলিতে ডলার জমা হওয়ার পক্ষে 'পেট্রোডলার'-এর প্রবাহ হ্রাস করেছে।
২১ কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সৃষ্ট সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাতের মধ্যে অতিরিক্ত
গতি লাভ করা রিসোরিং প্রক্রিয়াটি অবশেষে মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতির বৃদ্ধিকে ধীর করতে
বা এমনকি বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।
সৌদি আরব ও পেট্রোডলার সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণা
খণ্ডন
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে, অসঠিক শিরোনামে দাবি
করা হয়েছিল যে সৌদি আরব ডলারে তেলের মূল্য বজায় রাখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
সাথে একটি গোপন ৫০ বছরের চুক্তি নবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২২ ১৯৭৪ সালে,
পেট্রোডলার যুগের সূচনা হয়েছিল যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব একটি জোটে সম্মত
হয়েছিল—এই চুক্তিটি ২০১৬ সাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে গোপন ছিল। এটি সর্বজনবিদিত। তবে,
এমনটা কখনোই ছিল না যে সৌদি আরব তার তেল একচেটিয়াভাবে মার্কিন ডলারে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত
নিয়েছিল; উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এর প্রধান মুদ্রা ছিল ব্রিটিশ
পাউন্ড।
তবে, পরবর্তী দশকগুলিতে সৌদি আরব তার তেল লেনদেনের
একটি বড় অংশ ক্রমবর্ধমানভাবে মার্কিন ডলারে নির্ধারণ করেছিল। ২০২0-এর দশকের শুরুতে
এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, যখন দেশটি অন্যান্য মুদ্রায় তেল বিক্রির জন্য আলোচনা শুরু
করে। ২৩ কিন্তু এটি আরেকটি ভিন্ন বিষয়: সৌদি রিয়াল ডলারের সাথে সংযুক্ত
রয়েছে, এবং দেশটির আর্থিক সম্পদও প্রধানত ডলারে নির্ধারিত। ডলারের রিজার্ভ মর্যাদা
লেনদেনের মুদ্রা নির্ধারণের চেয়ে অর্থ কীভাবে সংরক্ষণ করা হয় তার উপর বেশি নির্ভর
করে।
ভাইরাল হওয়া এই গল্পটি, যার উৎপত্তি ক্রিপ্টো জগৎ
থেকে বলে মনে হচ্ছে, তা ডলারের পতন দেখতে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে থাকা ‘কনফার্মেশন
বায়াস’-এর একটি উদাহরণ; যদি অন্যদেরকে তাদের ডলার সেখানে রাখতে রাজি করানো যায়, তবে
ক্রিপ্টো এবং অন্যান্য সম্পদে থাকা অনেকেরই লাভ রয়েছে। এই ধরনের গল্পকে সবসময় সংশয়ের
চোখে দেখুন: যদিও ঘটনা ঘটে, মার্কিন ডলারের এমন কিছু আছে যা ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর
সহজে থাকবে না, বা আদৌ থাকবে না—এর সাফল্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি বিশাল বৈশ্বিক
ব্যবস্থা। তবুও, এই ধরনের গল্পগুলোই অসংখ্য কেলেঙ্কারির পটভূমি তৈরি করে, যার ফলে ইউএস
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস আইন প্রয়োগকারী
পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ২৪
পেট্রোডলার ব্যবস্থার পতন আসন্ন নয় এবং বৈশ্বিক
রিজার্ভের ক্রমান্বয়িক বৈচিত্র্যকরণ সত্ত্বেও মার্কিন ডলারের শক্তি অটুট রয়েছে। ২৫
প্রথমত, বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্য কীভাবে মার্কিন
ডলারে নিষ্পত্তি হয়েছিল?
১৯৭১ সালে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার পতনের পর, যা মার্কিন
ডলারের স্বর্ণে রূপান্তরযোগ্যতার অবসান ঘটায়, ডলারের মূল্য হ্রাস পেতে শুরু করে। ডলারকে
স্থিতিশীল করতে এবং বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বজায় রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব
এবং অন্যান্য ওপেক দেশগুলোর সাথে একাধিক কৌশলগত চুক্তি করে। যদিও তেল লেনদেনের জন্য
ডলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়নি, এই চুক্তিগুলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছিল
যেখানে তেল-রপ্তানিকারী দেশগুলো ডলারে তাদের তেলের মূল্য নির্ধারণ করবে, তাদের উদ্বৃত্ত
ডলার রিজার্ভ মার্কিন ট্রেজারিতে বিনিয়োগ করবে এবং মার্কিন পণ্য ও পরিষেবা ক্রয় করবে।
বিনিময়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে সামরিক সুরক্ষা এবং তার বাজারে প্রবেশের
সুযোগ প্রদান করে। ফলস্বরূপ , ডলার তেল লেনদেনের জন্য ডিফল্ট মুদ্রায় পরিণত
হয়।
বিশ্বের তেল বাণিজ্যের কত অংশের মূল্য মার্কিন ডলারে
নির্ধারিত হয়?
২০২৩ সাল পর্যন্ত, বিশ্বের প্রায় ৮০% তেল লেনদেনের
মূল্য মার্কিন ডলারে নির্ধারিত হয়। ২৩
পেট্রোডলার কি মার্কিন ডলার থেকে একটি পৃথক মুদ্রা?
না। তেল রপ্তানির বিনিময়ে প্রাপ্ত ডলারকে পেট্রোডলার
বলা হয়।
মূল কথা
পেট্রোডলার ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যকে
মার্কিন ডলারের সাথে যুক্ত করে, মুদ্রা ও ট্রেজারি সিকিউরিটিজের চাহিদা উচ্চ রেখে এবং
সুদের হার কম রাখতে সাহায্য করার মাধ্যমে মার্কিন অর্থনৈতিক শক্তিকে সমর্থন করে আসছে।
ডলার-ভিত্তিক তেল বাণিজ্য থেকে সরে আসা মার্কিন ডলারের
চাহিদা দুর্বল করতে পারে, ঋণের খরচ বাড়াতে পারে এবং বিশ্বকে আরও বহুকেন্দ্রিক আর্থিক
ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। যদিও বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের অংশ কমে গেছে, এটি কোনো
গুরুতর প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই প্রভাবশালী মুদ্রা হিসেবে রয়ে গেছে। ২৮
১০০,০০০ ডলার ভার্চুয়াল ক্যাশ জিতে ঝুঁকিহীনভাবে
প্রতিযোগিতা করুন।
বিনামূল্যের স্টক সিমুলেটরের মাধ্যমে আপনার ট্রেডিং দক্ষতা পরীক্ষা
করুন । ইনভেস্টোপিডিয়ার হাজার হাজার ট্রেডারের সাথে প্রতিযোগিতা করুন এবং ট্রেড করে
শীর্ষস্থানে পৌঁছান! নিজের টাকা ঝুঁকিতে ফেলার আগে একটি ভার্চুয়াল পরিবেশে ট্রেড জমা
দিন। ট্রেডিং কৌশল অনুশীলন করুন , যাতে আপনি যখন আসল বাজারে প্রবেশ
করতে প্রস্তুত হবেন, তখন আপনার প্রয়োজনীয় অনুশীলন সম্পন্ন হয়ে যায়। আজই আমাদের স্টক সিমুলেটরটি ব্যবহার করে দেখুন >>
পেট্রোডলার ব্যবস্থা কি ভেঙে পড়ছে
প্রকাশ:
০৫ মে ২০২৬,
২৩:
০০/প্রথম আলো
একসময় বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা বেশ সহজভাবেই ব্যাখ্যা করা যেত। সেটা হলো,
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি হতো আর ডলার ফিরে যেত ওয়াশিংটনে।
১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে গড়ে ওঠা এ ব্যবস্থার কল্যাণে ডলার বিশ্বের অপরিহার্য মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়—হাইড্রোকার্বন ও মার্কিন ট্রেজারি বন্ড পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তথাকথিত
‘পেট্রোডলার’
ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। খবর অ্যারাবিয়ান বিজনেসের।
বছরের পর বছর ধরে এই কাঠামো বিস্ময়কর স্থিতিশীলতা নিয়ে টিকে ছিল। তেলের দাম নির্ধারিত হতো ডলারে,
লেনদেন হতো ডলারে,
সেই ডলারই আবার পুনর্ব্যবহৃত হতো। এ ব্যবস্থা যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি তা নয়,
অনেক সময় শক্ত চ্যালেঞ্জ এসেছে,
কিন্তু বাস্তব তেমন একটা প্রভাব পড়েনি। ডি-ডলারাইজেশন যতটা না ছিল বাস্তবতা,
তার চেয়ে বেশি অভিপ্রায় বা আকাঙ্ক্ষার বিষয়।
কিন্তু গত দুই মাসের ঘটনাপ্রবাহে সেই ভারসাম্য বদলে গেছে,
এমনটাই মনে হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে এই ঘটনাপ্রবাহের সূত্রপাত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি এই পেট্রোডলার ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
জ্বালানিবাজারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে,
ভূগোল দীর্ঘদিন ধরেই একধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল;
কিন্তু এখন তা যেন নতুন রূপ নিয়েছে। আর্থিক বাজারের ক্ষেত্রেও ভূগোল একধরনের প্রতিবন্ধকতা বা চাপ হয়ে উঠেছে।
একটি প্রণালি,
একটি ব্যবস্থা
মার্চের শুরুতেই ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। শত্রু দেশের জাহাজ নয়,
শুধু এমন জাহাজগুলোই তারা চলাচলের অনুমতি দেয়। তবে এই প্রবেশাধিকারের জন্য
‘অশত্রু দেশগুলোকে’
খরচ করতে হয়েছে। প্রতি যাত্রায় প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ট্রানজিট ফি দিয়ে ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তাসহায়তা দিয়ে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। কিছু ক্ষেত্রে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে। এই অর্থ আদায় করেছে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস
(আইআরজিসি)।
এ ব্যবস্থার ধরন দ্রুতই বদলাতে থাকে। দেখা গেল,
মার্চের শেষ নাগাদ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচলের জন্য যে অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে,
তা ডলারবহির্ভূত ভিন্ন মুদ্রায় পরিশোধের ব্যবস্থা নেয় ইরান। বিশেষ করে যেসব কার্গো চীনা মুদ্রা ইউয়ানে এই মাশুল পরিশোধ করেছে,
তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ পরিশোধের খবরও পাওয়া যায়।
বাস্তবতা হলো,
রাশিয়ার তেল কেনার জন্য এশিয়ার পরিশোধনাগারগুলো আগে থেকেই বিকল্প মুদ্রা ব্যবহার শুরু করেছে,
এ ঘটনার পর তা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকি প্রিমিয়াম যুক্ত হয়। জাহাজ চলাচল ও বিমার খরচ বেড়ে যায়।
এপ্রিলের শুরুতে এ পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছু জাহাজ ইউয়ান বা ডিজিটাল মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সুযোগ পায়। অন্যদিকে কিছু জাহাজ ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই নিষেধাজ্ঞার কারণে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে বৈশ্বিক তেলবাজার ধীরে ধীরে ভূরাজনৈতিক ও আর্থিক বিভাজনের ভিত্তিতে ভাগ হতে শুরু করে।
জিওপলিটিক্যাল বিজনেস ইনকের প্রতিষ্ঠাতা আবিশুর প্রকাশ অ্যারাবিয়ান বিজনেসকে বলেন,
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে কার্যত ভাঙন দেখা যাচ্ছে। ডি-ডলারাইজেশনের ধারণা এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে,
বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থার মাধ্যমে ভূগোল একধরনের অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এ পরিবর্তনের কারণে ইতিমধ্যে ঠিক হয়েছে,
কে তেল পরিবহন করতে পারবে,
কীভাবে এর দাম নির্ধারিত হবে এবং কোন মুদ্রায় লেনদেন হবে। অর্থাৎ তেল কেনাবেচার সঙ্গে ডলার ব্যবহারের যে আবশ্যিক বন্ধন ছিল,
তা ভেঙে পড়ে।
যেভাবে পেট্রোডলারের উত্থান
পেট্রোডলার ব্যবস্থার উত্থান ১৯৭০-এর দশকে। এই ব্যবস্থার সঙ্গে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে। এই যুদ্ধ ছিল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মিসর ও সিরিয়ার নেতৃত্বে আরব রাষ্ট্রগুলোর সামরিক অভিযান। ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর শুরু হয়ে ২৫ অক্টোবর শেষ হয় এই যুদ্ধ।
এই যুদ্ধে সৌদি আরবসহ অধিকাংশ তেলসমৃদ্ধ আরব দেশ মিসর ও সিরিয়াকে সমর্থন দেয়,
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ায়। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব তেল উৎপাদনকারী দেশ পশ্চিমাদের কাছে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এই তেল অবরোধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতেতি গভীর প্রভাব পড়ে। কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২ দশমিক ৯০ ডলার থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ৬৫ ডলারে পৌঁছে যায়। এতে পশ্চিমা দেশগুলো উপলব্ধি করে,
মধ্যপ্রাচ্যের তেল শুধু বাণিজ্যিক পণ্য নয়;
বরং শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক হাতিয়ারও।
অন্যদিকে সৌদি আরবসহ তেল রপ্তানিকারী দেশগুলো তেল বিক্রি থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার আয় করতে থাকে। তখন প্রশ্ন ওঠে,
এই বিপুল ডলার কোথায় বিনিয়োগ হবে এবং কীভাবে ব্যবহৃত হবে। এখানেই আসে
‘পেট্রোডলার’
ব্যবস্থার বিষয়টি।
১৯৭৪ সালের ৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম সায়মন সৌদি আরব সফর করেন। তেল ও বন্ড বাজারে তাঁর ছিল গভীর অভিজ্ঞতা। তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে গোপন সমঝোতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে যা
‘পেট্রোডলার চুক্তি’
নামে পরিচিতি পায়। যদিও এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সরকারি বিবৃতি বা পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশিত হয়নি,
১৯৭৪ সালে
‘জয়েন্ট কমিশন অন ইকোনমিক কো-অপারেশন’-এর মাধ্যমে দুই দেশের যে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা গড়ে ওঠে,
সেখান থেকেই এ ব্যবস্থার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এ প্রক্রিয়ায় সে সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি গোপনে মধ্যপ্রাচ্য সফরও করেছিলেন বলে জানা যায়।
সমান্তরাল বাজার,
অসম ক্ষমতা
সেই ১৯৭০-এর দশকে গড়ে ওঠা ব্যবস্থায় এখন চিড় দেখা যাচ্ছে। সংবাদে বলা হয়েছে,
তেলবাজারের কাঠামোয় এই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরবরাহ ও চাহিদার পাশাপাশি এখন জোটভিত্তিক অবস্থানও তেল প্রাপ্তি ও দামের নির্ধারক হয়ে উঠছে।
প্রকাশ বলেন,
এতে ডি-ডলারাইজেশন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং ব্রিকস জোট নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। সংঘাত যত বেড়েছে,
ব্রিকস সদস্যরা তত বেশি সুবিধা পেয়েছে,
যেমন হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশাধিকার,
ব্রিকস-বহির্ভূত দেশগুলোর যা নেই।
এই জোটের সদস্য হওয়া এখন প্রত্যক্ষভাবে বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহন করছে। এই পথে প্রবেশাধিকার,
লেনদেনে নমনীয়তা বা নিষেধাজ্ঞা থেকে সুরক্ষা—সবই বাস্তব সুবিধা হয়ে উঠছে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়,
এই পরিবর্তনের বিষয়টি দামের তারতম্য ও সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিফলিত হচ্ছে। এফএক্সইএমের মার্কেট রিসার্চ ও ফিনটেক স্ট্র্যাটেজি ম্যানেজার আবদেল আজিজ আলবোগদাদি বলেন,
বাজারে এখন একাধিক ধারা;
বাজার আর একমুখী নয়।
আবদেল আজিজ আরও বলেন,
তেলবাজারে সমান্তরাল ধারা তৈরি হচ্ছে,
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল ডলার ভিন্ন অন্য মুদ্রায় লেনদেন,
পরিবহন ও মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে। এই সমান্তরাল বাজারে এখন দামের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে আর বিষয়টি কেবল সেই দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত,
যারা বর্তমান নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন,
জাহাজ জব্দ করা ও অবরোধ পরিস্থিতির কারণে তেলবাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে শুধু দাম নয়,
মুদ্রা,
হরমুজে প্রবেশাধিকার ও রাজনৈতিক অবস্থানও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডলারের বৈপরীত্য
এর অর্থ এই নয় যে ডলার অনেকটা শক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাস্তবতা হলো,
বিকল্প পথ ও মুদ্রার উত্থান সত্ত্বেও ডলার এখনো বৈশ্বিক ব্যবস্থায় শক্ত অবস্থানেই আছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
প্রকাশ বলেন,
ডলারের বৈশ্বিক চাহিদা আছে,
শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়;
বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ও বাজারের অস্থিরতার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে ডলারের কদর বেড়েছে। বাজারে অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ডলারভিত্তিক সম্পদের বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছেন। ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা বেড়েছে। ফলে রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলার আরও শক্তিশালী হয়েছে।
অনেক বিশ্লেষক অবশ্য বৃহত্তর প্রবণতা সম্পর্কে সতর্ক অবস্থানে। তাঁদের ভাষ্য,
অনেক বছর ধরে বহুমুখী আর্থিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চলছে,
সব দেশই ডলারনির্ভরতা কমাতে চায়। বর্তমান সংকটে সেই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে,
যদিও যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এই পুনর্গঠন চলছে,
তা মোটেও শক্তিশালী নয়।
সংবাদে বলা হয়েছে,
সম্প্রতি কয়েক বছরে ডলারে লেনদেন বেড়েছে,
তবে পরিমাণগত দিক থেকে তা সামান্য,
উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু নয়। এখনো ডলার বিশ্বের প্রধান লেনদেনব্যবস্থা ও মুদ্রা।
ডলারের কাঠামোগত শক্তি এখনো অটুট। এর গভীরতা,
তারল্য ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার বিকল্প সহজে তৈরি করা সম্ভব নয়। এমনকি ব্রিকসের যৌথ মুদ্রার প্রস্তাবও বড় বাধার মুখে। এর জন্য প্রয়োজন গভীর অর্থনৈতিক একীভবন,
বিষয়টি এখনো সুদূরপরাহত।
তবু চাপের জায়গাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ডলারবহির্ভূত প্রতিটি লেনদেন এবং বিকল্প মুদ্রায় সম্পাদিত প্রতিটি চুক্তি ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থার কাঠামো বদলে দিচ্ছে।
আলবোগদাদি বলেন,
এই সংকটের কারণে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে পেট্রোডলার ব্যবস্থা দুর্বল হতে পারে। যখনই কোনো বিঘ্ন ঘটছে,
তখনই বাজার ডলারের বাইরে লেনদেনে বাধ্য হচ্ছে। ফলে সমান্তরাল অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে এবং মার্কিনকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমছে।
শিথিল হয়ে আসছে কাঠামো
বাস্তবতা হলো,
তেল খাতের পরিচালনব্যবস্থায়ও এই চাপ ছড়িয়ে পড়ছে। ২৮ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দেয়,
তারা ওপেক ত্যাগ করবে। ১ মে থেকে তা কার্যকর হয়েছে। উৎপাদন সীমা নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের প্রতিফলন হচ্ছে এ সিদ্ধান্ত।
পেট্রোডলারের ক্ষেত্রে এর সরাসরি প্রভাব না থাকলেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো ডলারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত,
তবে অধিকতর স্বাধীনতার অর্থ হলো,
বাণিজ্য ও লেনদেনে আরও বৈচিত্র্যের সুযোগ।
প্রকাশ বলেন,
মূল প্রশ্ন হলো,
দেশগুলো কোন দিকে ঝুঁকবে। ওপেক-পরবর্তী সময়ে ইউএই কি ডলারের সঙ্গেই থাকবে,
বিশেষ করে যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময়ের চুক্তি করে,
অন্যদিকে কাতার কি ইউয়ান বা রুপির দিকে ঝুঁকবে—এসব প্রশ্ন থেকেই যায়। এসব পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ বিষয়,
তবে তার গতিমুখ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এখনই বিলুপ্ত হচ্ছে না পেট্রোডলার
বৈশ্বিক জ্বালানিবাজার এখনো ডলারকেন্দ্রিক। এই বাস্তবতায় পেট্রোডলার ব্যবস্থা এখনই বিলুপ্ত হচ্ছে না,
তা স্পষ্ট। তবে এ ব্যবস্থা এখন আর অতটা নিশ্ছিদ্র নয়।
তেল আর এখন একক চ্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে এর দাম ভিন্নভাবে নির্ধারিত হচ্ছে,
লেনদেন হচ্ছে ভিন্ন মুদ্রায়,
পরিবহন হচ্ছে বিকল্প পথে। এসবের মধ্য দিয়ে যে রাতারাতি ডলারের বিকল্প তৈরি হচ্ছে,
বিষয়টি মোটেও তা নয়,
কিন্তু বিকল্প যে আছে,
তা নিশ্চিত হচ্ছে।
ডলারের বাইরে যত লেনদেন হচ্ছে,
সেই লেনদেনের মধ্য দিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা আরও পরিচিতি পাচ্ছে। প্রতিটি সংকটে তা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
পরিবর্তন আসতে সময় লাগে সত্য,
কিন্তু তা শুরু হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা,
গত কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম পেট্রোডলার ব্যবস্থা আগের মতো স্থিতিশীল মনে হচ্ছে না।
ক্লাস-০৬
হরমুজ প্রণালী
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ, যা বিশ্বের প্রায় ২০% পেট্রোলিয়াম এবং ২০% তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর দৈনিক চলাচল সহজ করে। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সাথে সংযুক্ত করে, এটি সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং ইরাকের মতো প্রধান উপসাগরীয় রপ্তানিকারকদের জন্য একমাত্র সামুদ্রিক পথ হিসেবে কাজ করে।
মূল বৈশিষ্ট্য
• ভৌগোলিক অবস্থান: এটি একটি সংকীর্ণ জলপথ, যা এর সবচেয়ে সংকুচিত অংশে মাত্র ২৪ মাইল (৩৯ কিলোমিটার) চওড়া।
• পরিমাণ: প্রতিদিন ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম তরল পরিবহন করে।
কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
• বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা: এশীয় বাজারগুলো (যেমন চীন ও ভারত) এর উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং এটি ইউরোপের সরবরাহের জন্য অপরিহার্য। আঞ্চলিক অবরোধ বা সামরিক উত্তেজনার মতো যেকোনো ধরনের ব্যাঘাত ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের দাম এবং পরিবহন খরচে তাৎক্ষণিক উল্লম্ফন ঘটিয়েছে।
• কৃষি সরবরাহ: জ্বালানি ছাড়াও, এটি ইউরিয়ার বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৩০% সম্পন্ন করে—যা সার উৎপাদনের একটি প্রধান উপাদান এবং বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহের জন্য অপরিহার্য।
• ভূ-রাজনীতি: উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান/সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত হওয়ায়, এটি একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রয়ে গেছে। যেসব দেশের পাইপলাইনের বিকল্প ব্যবস্থা নেই, তারা অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য সম্পূর্ণরূপে এর উপর নির্ভরশীল।
দৈনিক কার্গোর পরিমাণ এবং ট্রানজিট পরিসংখ্যানের বিস্তারিত, রিয়েল-টাইম তথ্যের জন্য, দেখুন
প্রণালীটি বন্ধ করার প্রভাব কী ছিল এবং ইরান কীভাবে কার্যকরভাবে এটি বন্ধ করেছিল?
সাধারণত প্রতি মাসে প্রায় ৩,০০০ জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে, কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছিল, কারণ ইরান ট্যাঙ্কার এবং অন্যান্য জাহাজে হামলা করার হুমকি দিয়েছিল।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, দেশগুলো তাদের উপকূলরেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (১৩.৮ মাইল) পর্যন্ত আঞ্চলিক সমুদ্রের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে পারে।
হরমুজ প্রণালী এবং এর নৌপথগুলো এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে সম্পূর্ণভাবে ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত।
ইরানের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগামী আক্রমণকারী নৌকা এবং সম্ভাব্য মাইন এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী নৌকাগুলোর জন্য একটি গুরুতর প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল।
২ এপ্রিল পর্যন্ত, অলাভজনক সংস্থা ‘ইউনাইটেড এগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান’ জানায় যে অন্তত ২৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে এবং আরও তিনটি অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে।
জ্বালানি বাজারের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’-এর প্রধান বিশ্লেষক আর্নে লোমান রাসমুসেন এই অস্থিতিশীলতার সময় বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে বলেন, "আপনি আক্রান্ত হতে পারেন, এবং আপনি বীমা করাতে পারবেন না অথবা তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।"
যুদ্ধক্ষেত্রের প্রান্তে: হরমুজ প্রণালীর নিকটবর্তী এলাকা থেকে বিবিসির প্রতিবেদন।
ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আয়ের জন্য জ্বালানি রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
এই প্রণালীর অচলাবস্থা এশিয়াকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে; ধারণা করা হয়, ইরান বিশ্ববাজারে যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করে, তার প্রায় ৯০ শতাংশই শুধু চীন কিনে থাকে।
এশিয়ায় জ্বালানি সংকট দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে। সরকারগুলো তাদের সরবরাহ সংরক্ষণের জন্য কর্মচারীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে, কর্মসপ্তাহ সংক্ষিপ্ত করেছে, জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সময়ের আগেই বন্ধ করে দিয়েছে।
আফ্রিকায়, দক্ষিণ সুদান এবং মরিশাস উভয়ই বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করার পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে।
ইউরোপে, স্লোভেনিয়া জ্বালানি রেশনিং বাস্তবায়নকারী প্রথম ইইউ সদস্য রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের প্রায় ২০% তেল ও গ্যাস হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রণালীটি পুনরায় খোলার চেষ্টা করেছিল?
যুক্তরাষ্ট্র প্রণালীটিতে কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠায়নি, বরং তাদের সামরিক প্রতিক্রিয়া ইরানের নৌবাহিনীসহ দেশটির ওপর বিমান হামলায় সীমাবদ্ধ রেখেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ১৮ মার্চ মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রণালী বরাবর অবস্থিত ইরানের জাহাজ-বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে বোমা হামলার খবর দিয়েছে।
ট্রাম্প এর আগে মার্কিন মিত্র ও চীনসহ অন্যান্য দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে হরমুজকে সুরক্ষিত করতে সাহায্য করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু তার অনুরোধে তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি। এরপর তিনি বলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের আসলে তাদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।
যুক্তরাষ্ট্র অতীতে প্রণালীটির মধ্য দিয়ে সামুদ্রিক যান চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে তার সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে।
১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে, আট বছরব্যাপী ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়, তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা একটি "ট্যাঙ্কার যুদ্ধে" পরিণত হয়, যেখানে উভয় দেশই অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের জন্য নিরপেক্ষ জাহাজ আক্রমণ করত।
ইরাকি তেল বহনকারী কুয়েতি ট্যাঙ্কারগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। অবশেষে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো উপসাগরের মধ্য দিয়ে সেগুলোকে এসকর্ট করা শুরু করে, যা ইউএস নেভাল ইনস্টিটিউটের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অন্যতম বৃহত্তম নৌ-সারফেস যুদ্ধ অভিযানে পরিণত হয়।
যুদ্ধবিরতির আগে কি জাহাজগুলো পার হতে পেরেছিল?
২৪ মার্চ জাতিসংঘে তার মিশনের পোস্ট করা এক বার্তায় ইরান বলেছে যে, তারা "অশত্রুভাবাপন্ন জাহাজগুলোকে" হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেবে, যদি তারা "সংশ্লিষ্ট ইরানি কর্তৃপক্ষের" সাথে সমন্বয় করে।
এই মাসের শুরুতে বিবিসি ভেরিফাই-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১ মার্চ থেকে ২০ মার্চের মধ্যে প্রায় ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী
সংকট মূলত পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বারে সৃষ্ট একটি বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক
অচলাবস্থা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর, ইরান হরমুজ প্রণালী
সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ
আরোপ করে।
সংকটটির প্রধান
দিকগুলো হলো:
- আঞ্চলিক সংঘাত: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান
হামলার জবাবে ইরান প্রণালীটিতে নৌ-মাইন স্থাপন করে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার
মাধ্যমে অননুমোদিত বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল কার্যত রুদ্ধ করে দেয়।
- বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব: বিশ্বের প্রায় ২০% অপরিশোধিত তেল
ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালী বন্ধ থাকায়
জ্বালানি পরিবহনে বড় বিপর্যয় ঘটেছে এবং তেলের দাম লাগামহীন বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি
হয়েছে।
- বাংলাদেশি প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের মোট জ্বালানি আমদানির
প্রায় ২০% হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। এই সংকটের ফলে এরই মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়
প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
- বর্তমান পরিস্থিতি: বিশ্বব্যাপী শিপিং জায়ান্টরা
(যেমন মার্স্ক, এমএসসি) এই রুটে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায়
শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চলছে, তবে উভয়পক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে
সংকট নিরসনের পথ এখনো অনিশ্চিত।
হরমুজ প্রণালী
সংকট: বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি
একবিংশ
শতাব্দীতে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি একে
অপরের পরিপূরক। মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো অস্থিরতা মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
বদলে দেয়। বর্তমানে ইরান,
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার
সংঘাত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের
রূপ নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে
ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (যুক্তরাষ্ট্র)
ও ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ (ইসরায়েল) শুরু করে।
এই
যুদ্ধের মূল লক্ষ্য হিসেবে
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং শাসক পরিবর্তনের
কথা জানানো হয়েছে। যুদ্ধের শুরুতেই তেহরানে বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী
খামেনীসহ শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা
নিহত হয়েছেন। বর্তমানে যুদ্ধটি দ্বিতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে এবং ইসরায়েলি বাহিনী
ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ
কেন্দ্রগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ ধ্বংস
করার দাবি করেছে। ইরান
পাল্টা জবাবে কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব
আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
চালাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালী
বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
বর্তমানে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার
চলমান যুদ্ধ এবং ইরান কর্তৃক
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ দুর্যোগের
বার্তা দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল এবং
আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই সংকট
কেবল তেলের দাম বৃদ্ধি নয়,
বরং শিল্প উৎপাদন, বাণিজ্য এবং সামগ্রিক সরবরাহ
ব্যবস্থার ওপর এক অশনিসংকেত
হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতিকে ‘নিয়ন্ত্রণের
বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
হরমুজ
প্রণালীকে বলা হয় বিশ্বের
জ্বালানি সরবরাহের ‘ধমনি’। ওমান
ও ইরানের মধ্যবর্তী পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের
সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালীটি মাত্র
২১ থেকে ৩৩ মাইল
প্রশস্ত । এই সরু
সমুদ্রপথটি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে
যুক্ত করেছে। ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা কেবল সামরিক কোনো
পদক্ষেপ নয়, বরং এটি
একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্ত্র।
চলমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইরানের এই কৌশলের পেছনে
গভীর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত
উদ্দেশ্য রয়েছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রজাত তেলের
প্রায় ২১ শতাংশ এবং
এলএনজির শতাংশ এই সরু পথ
দিয়ে যায়। ইরান জানে
যে এই পথটি বন্ধ
করলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি
১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে,
যা আমেরিকা ও তার মিত্রদের
অর্থনীতিতে ধস নামাবে।
ইরান
এই পথটিকে অসম যুদ্ধের কৌশল
হিসেবেও ব্যবহার করছে। আমেরিকার বিশাল নৌবহরের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জেতা কঠিন হলেও,
ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থানের
সুবিধা নিয়ে ছোট বোট,
ড্রোন এবং মাইন ব্যবহার
করে সহজেই এই পথটি অকেজো
করে দিতে পারে এবং
ইরান সেই পদক্ষেপই গ্রহণ
করেছে। এটি ইরানকে একটি
‘বারগেইনিং চিপ’ বা দর
কষাকষির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারেও এই পদক্ষেপটি গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ
প্রণালী বন্ধের মাধ্যমে ইরান মূলত সৌদি
আরব, কুয়েত, কাতার এবং আরব আমিরাতকে
বার্তা দিতে চায় যে,
তারা যদি আমেরিকাকে সহায়তা
করে, তবে তাদের প্রধান
বাণিজ্যিক পথটি অনিরাপদ হয়ে
পড়বে। যুদ্ধাবস্থায় এই পথটি বন্ধ
হওয়া মানে বৈশ্বিক জ্বালানি
বাজারে বড় ধরনের ধস
নামা। বর্তমান সংঘাতে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতোমধ্যেই ১০
শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেল
প্রতি ৮০-৮২ ডলারে
পৌঁছেছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে
১২০-১৫০ ডলার ছাড়িয়ে
যেতে পারে বলে আশঙ্কা
করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর এই পথটি অনিরাপদ
হওয়ার সাথে সঙ্গে জাহাজগুলোর
ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম কয়েক গুণ বেড়ে
যাবে। অনেক কোম্পানি তাদের
জাহাজ এই পথে পাঠাতে
চাচ্ছে না, ফলে সাপ্লাই
চেইন ভেঙে পড়তে শুরু
করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং ভারতের মতো
আমেরিকার মিত্ররা তাদের জ্বালানির বড় অংশের জন্য
এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। এটি
বন্ধ হওয়া মানে এই
দেশগুলোর শিল্প উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়া, যা
পরোক্ষভাবে আমেরিকার বৈশ্বিক মিত্র জোটকে দুর্বল করে দিবে।
সামুদ্রিক
পরিবহন ব্যয় বা শিপিং চার্জ বেড়ে গেলে রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে সবজি ও হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি ব্যাহত হলে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকেরাও উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।
বর্তমানে
যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার
চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জ্বালানি ও অর্থনীতির ওপর
নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি
তেলের প্রায় ১০০ শতাংশ এবং
এলএনজির একটি বড় অংশ
আমদানির মাধ্যমে মেটায়। বিশেষ করে সৌদি আরব,
কুয়েত ও কাতার থেকে
আসা জ্বালানি এই হরমুজ প্রণালী
দিয়েই বাংলাদেশে পৌঁছায়।
বর্তমানে
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস এই প্রণালীর বিভিন্ন
পয়েন্টে সামরিক নজরদারি বৃদ্ধি করায় আন্তর্জাতিক শিপিং
কোম্পানিগুলো তাদের জাহাজের রুট পরিবর্তন করে
আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড
হোপ’ দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে,
তবে এটি মূল পথের
চেয়ে প্রায় ৮ হাজার-১০
হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ, যা বাংলাদেশের মতো
আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ ৪০ শতাংশ
বাড়িয়ে দেবে। তেলের উচ্চমূল্যের কারণে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বহুগুণ বেড়ে
যাবে। বর্তমান বাংলাদেশ যখন বৈদেশিক মুদ্রার
রিজার্ভ স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে,
তখন জ্বালানি বাবদ অতিরিক্ত ডলার
পরিশোধ করতে গিয়ে রিজার্ভের
ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে।
জ্বালানির
মূল্যবৃদ্ধি একটি ‘ডোমিনো ইফেক্ট’ তৈরি করে। বাংলাদেশের
জ্বালানির বড় অংশ আমদানিনির্ভর।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন অনুযায়ী দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি
বিদেশ থেকে আমদানি করতে
হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে
অস্থিরতা বা সরবরাহ ব্যাহত
হলে দেশের বাজারে দ্রুত চাপ তৈরি হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের
এই সংঘাতের কারণে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ
পথ হরমুজ প্রণালী বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশে আতঙ্কজনিত কেনাকাটা শুরু হয়েছে এবং
সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি বিক্রিতে দৈনিক সীমা নির্ধারণ করে
দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে যাতে জ্বালানির সংকট
না হয়, তাই ৮
মার্চ রবিবার থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে
জ্বালানি তেল বিক্রি করা
হবে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি
প্রতি মন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তাই বলা যায়
যে জ্বালানি সংকট কেবল দাম
নয়, সরবরাহ ব্যবস্থাকেও অস্থির করে তোলবে।
ডিজেল
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি।
মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৭৩ শতাংশ ডিজেল।
পরিবহন খাতের ৯০ শতাংশের বেশি
যানবাহন ডিজেলনির্ভর, ফলে ডিজেলের দাম
বাড়লে তাৎক্ষনিক প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে।
এর প্রভাবে বাস ও ট্রাক
ভাড়া, পণ্য পরিবহন ব্যয়
ও লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধি পায়।
ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে যে জ্বালানির দাম
বাড়লে ফ্রেইট খরচ বেড়ে যাবে
এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয়
পণ্যের দাম বাড়বে। বাংলাদেশের
বাজারে অধিকাংশ পণ্য গ্রাম থেকে
শহরে আসে। পরিবহন ব্যয়
বাড়লে সেই খরচ সরাসরি
পণ্যের দামে যুক্ত হয়।
ভোক্তা
অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, জ্বালানির দাম
বাড়লে সব ধরনের পণ্যের
দাম বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে
সবজি, ফল, চাল, ডাল
ইত্যাদি খাদ্যপণ্যের মূল্য দ্রুত বাড়ে। কারণ ব্যবসায়ীরা পরিবহন
খরচ বৃদ্ধিকে মূল্য বৃদ্ধির যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। বাংলাদেশের কৃষি খাতে ডিজেলের
ব্যবহার ব্যাপক। ডিজেল ব্যবহার হয়-সেচ পাম্পে,ধান মাড়াই মেশিনে,
কৃষিযন্ত্রে। ফলে ডিজেলের দাম
বাড়লে সেচ ব্যয় ও
কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়ে, যা
শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধি করে। এর ফলে
সম্ভাব্য প্রভাবে খাদ্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষকের
লাভ কমে যাওয়া, খাদ্য
নিরাপত্তার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
শিল্প
খাতেও জ্বালানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জ্বালানির
দাম বৃদ্ধি পেলে অনেক ক্ষেত্রে
শিল্প উৎপাদন ব্যয় ১০-১৫ শতাংশ
পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বিদ্যুৎ
সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বহু কারখানাকে
বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটরের উপর নির্ভর করতে
হয়, যা উৎপাদন খরচকে
আরও বাড়িয়ে তোলে। এর ফলশ্রুতিতে রপ্তানি
পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়,
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পায় এবং শিল্প
খাতে কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ সৃষ্টি
হয়।
বাংলাদেশের
বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ
প্রাকৃতিক গ্যাস ও আমদানিকৃত জ্বালানিনির্ভর।
বিশেষত আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ফার্নেস অয়েল
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হরমুজ
প্রণালীতে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি সরবরাহ
বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন
পরিস্থিতিতে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন
কমে যেতে পারে এবং
গ্রীষ্ম মৌসুমে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি
ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদনশীল খাতে,
বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতির
প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে।
তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত
জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। জ্বালানির
দাম বাড়লে এই বিকল্প ব্যবস্থার
ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা পোশাক উৎপাদনের
মোট খরচ বাড়িয়ে দেয়।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবহৃত অনেক সিনথেটিক ফাইবার
বা কৃত্রিম তন্তু মূলত পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক হওয়ায় তেলের
দাম বাড়লে এসব কাঁচামালের দামও
বৃদ্ধি পায়। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের
তৈরি পোশাকের মূল্য প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার শংকা
রয়েছে। যদিও বাংলাদেশের পোশাক
রপ্তানির প্রধান নৌপথ সরাসরি হরমুজ
প্রণালীর উপর নির্ভরশীল নয়,
তবুও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংকটের কারণে বৈশ্বিক শিপিং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
সামুদ্রিক
পরিবহন ব্যয় বা শিপিং চার্জ
বেড়ে গেলে রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত
ব্যয় বহন করতে হয়।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে সবজি ও হিমায়িত
খাদ্য রপ্তানি ব্যাহত হলে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকেরাও
উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।
জ্বালানির
মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক
মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করে। কারণ পরিবহন
খরচ, উৎপাদন খরচ, খাদ্যদ্রব্যের দাম
এবং শিল্প খাতে ব্যয় বাড়ে।
এই সম্মিলিত প্রভাবকে অর্থনীতিবিদরা ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’
(উৎপাদন ব্যয়জনিত মুদ্রাস্ফীতি) বলে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো
সতর্ক করেছে যে জ্বালানির দাম
বৃদ্ধি সমগ্র অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করবে।
শেষ পর্যন্ত এই সব প্রভাব
এসে পড়ে সাধারণ মানুষের
ওপর। যার ফলে বাস
ভাড়া, বাজার খরচ, বিদ্যুৎ ও
ভাড়াবাড়ির খরচ বৃদ্ধি পাবে
এবং প্রকৃত আয় কমে যাবে।
যদি মজুরি একই থাকে, তাহলে
বাস্তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে।
হরমুজ
প্রণালীর সংকট বাংলাদেশের সামনে
এক বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এই
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি
সংগ্রহের পরিকল্পনা করতে হবে। পাশাপাশি
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে
সাশ্রয়ী হতে হবে। ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতা যদি
দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বাংলাদেশের
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কূটনৈতিক
তৎপরতা ও সঠিক অভ্যন্তরীণ
নীতি প্রণয়নের কোনো বিকল্প নেই।
No comments:
Post a Comment