Search This Blog

Tuesday, August 26, 2025

সংক্ষিপ্ত POL(A)-210 Political History of The Modern World: From French Revolution to the demise of Soviet Union আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাস: ফরাসি বিপ্লব থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর্যন্ত (Dr. Md. Adnan Arif Salim)

 


১নং প্রশ্নের উত্তর

দ্য গলের (Charles de Gaulle) পররাষ্ট্রনীতি ছিল এক বৈপ্লবিক কূটনৈতিক কৌশল, যা ফ্রান্সের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গৌরব এবং স্বাধীনতাকে রক্ষার লক্ষ্যে গড়ে উঠেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ফ্রান্সকে বিশ্বমঞ্চে একটি স্বাধীন ও মর্যাদাসম্পন্ন শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে হলে তাকে অবশ্যই কোনো পরাশক্তির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেই উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সকে NATO’র সামরিক কাঠামো থেকে প্রত্যাহার করেন, যদিও জোটের রাজনৈতিক অংশে সদস্যপদ বজায় রাখেন। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা ফ্রান্সের নিজস্ব প্রতিরক্ষা নীতির সূচনা করে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের উপর নির্ভর না করে ফ্রান্সের নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা—যাকে বলা হয় "Force de frappe"—উন্নয়নের ওপর জোর দেন, যাতে ফ্রান্স যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

 

দ্য গল বহুধ্রুবীয় (multipolar) বিশ্বব্যবস্থার পক্ষপাতী ছিলেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমেরু আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিশ্ব রাজনীতি যেন একক কোনো পরাশক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভর না করে বরং বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে পারে। ইউরোপের ক্ষেত্রে তিনি চেয়েছিলেন একটি আমেরিকান প্রভাবমুক্ত, ফরাসি নেতৃত্বাধীন ইউরোপ গড়ে তুলতে। এই উদ্দেশ্যে তিনি যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ে (EEC) যোগদানের বিরোধিতা করেন, কারণ তার মতে, যুক্তরাজ্যের মাধ্যমে আমেরিকান প্রভাব ইউরোপে প্রবেশ করতে পারে। তার স্বপ্ন ছিল একটি স্বাধীন ইউরোপ, যার বিস্তার হবে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে উরাল পর্বতমালা পর্যন্ত।

 

উপনিবেশবাদ থেকে বেরিয়ে আসার প্রশ্নে দ্য গল বাস্তববাদী ও দূরদর্শী ছিলেন। তিনি আলজেরিয়াকে স্বাধীনতা দিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন এবং আফ্রিকা ও এশিয়ার নবগঠিত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেন। এসব অঞ্চলের দেশগুলোর উন্নয়নে সহযোগিতা করে তিনি ফ্রান্সের প্রভাব ও অবস্থানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী করেন। একই ধারাবাহিকতায়, ১৯৬৪ সালে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধিতা উপেক্ষা করে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে স্বীকৃতি দেন। এটি ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপ, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফ্রান্সের স্বাধীন অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করে।

 

দ্য গল শুধু ভূরাজনৈতিক কৌশলে নয়, সংস্কৃতি ও ভাষার প্রসারে ফ্রান্সের ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতেও আগ্রহী ছিলেন। তিনি “Francophonie” আন্দোলনের সূচনা করেন, যার মাধ্যমে ফরাসি ভাষাভাষী দেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক সংযোগ ও ঐক্য গড়ে তোলা হয়। তার এই কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সমন্বিত রূপকল্প—যেখানে ফ্রান্স রাজনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক এবং কৌশলগতভাবে একাধারে নেতৃত্বে থাকছে। সব মিলিয়ে, দ্য গলের পররাষ্ট্রনীতি ছিল তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে, যা ফ্রান্সকে শুধু একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি গৌরবময় জাতি হিসেবেও বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছিল।

 

 

 

 

২নং প্রশ্নের উত্তর

চিয়াং কাইশেক (Chiang Kai-shek) ছিলেন একজন চীনা রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা, যিনি ২০শ শতকের প্রথমার্ধে চীনের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৮৮৭ সালের ৩১ অক্টোবর চীনের চেচিয়াং প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৫ সালের ৫ এপ্রিল তাইওয়ানে মৃত্যুবরণ করেন। চিয়াং কাইশেক ছিলেন চীনা জাতীয়তাবাদী দল কুওমিনতাং (Kuomintang - KMT)-এর নেতা এবং তিনি দীর্ঘ সময় ধরে চীনের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সুন ইয়াত সেনের মৃত্যুর পর চিয়াং কাইশেক দলটির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সামরিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে সংগঠিত করতে শুরু করেন।

 

চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বে কুওমিনতাং ১৯২৮ সালে পুরো চীনকে একত্রিত করে ন্যাশনালিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করে। তিনি কমিউনিজমের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) সঙ্গে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হন। এই সংঘর্ষ চীনকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে, চিয়াং কাইশেক মিত্রশক্তির অন্যতম অংশীদার হিসেবে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তবে তার সরকারের দুর্নীতি, কর্তৃত্ববাদী মনোভাব এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা তাকে জনগণের দৃষ্টিতে অপ্রিয় করে তোলে।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে চীনে আবারও গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯৪৯ সালে মাও সে তুং-এর নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বিজয়ী হয়। পরাজিত চিয়াং কাইশেক তার অনুসারীদের নিয়ে চীন ত্যাগ করে তাইওয়ানে (তৎকালীন ফরমোসা) আশ্রয় নেন এবং সেখানে “রিপাবলিক অব চায়না” নামে একটি পৃথক সরকার গঠন করেন। তিনি তাইওয়ানে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চিয়াং কাইশেক পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন লাভ করেন, কারণ সে সময় তিনি "কমিউনিজম বিরোধী" শক্তি হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।

 

তাঁর শাসনামলে তাইওয়ানে অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ও শিল্পোন্নয়ন ঘটলেও গণতন্ত্রের চর্চা ছিল সীমিত এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করা হতো। তাঁর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে তাইওয়ানে গণতান্ত্রিক সংস্কার শুরু হয়। চিয়াং কাইশেক চীনের আধুনিক ইতিহাসে একজন বিতর্কিত চরিত্র—তিনি একদিকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, অন্যদিকে কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে বিবেচিত। তাঁর রাজনৈতিক জীবন চীন ও তাইওয়ানের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।


৩নং প্রশ্নের উত্তর

 


৪নং প্রশ্নের উত্তর

জার্মানির একত্রীকরণ (Unification of Germany) উনিশ শতকের ইউরোপীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়েছিল। ১৮৭১ সালে জার্মানির একীকরণ সম্পন্ন হয়, যার মূল স্থপতি ছিলেন প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ওটো ভন বিসমার্ক (Otto von Bismarck)তিনি “রক্ত ও লোহা” (Blood and Iron) নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাধীন জার্মান রাজ্যকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী জার্মান সাম্রাজ্য গঠন করেন।

 

ঐ সময়ে ইউরোপে প্রায় ৩৯টি স্বাধীন জার্মান রাজ্য ছিল, যেগুলো একদিকে অস্ট্রিয়া এবং অন্যদিকে প্রুশিয়ার প্রভাবাধীন ছিল। অস্ট্রিয়া ঐতিহাসিকভাবে জার্মান জনগণের নেতৃত্বের দাবিদার ছিল, কিন্তু প্রুশিয়া তখন সামরিক ও শিল্প ক্ষেত্রে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। বিসমার্ক বুঝতে পেরেছিলেন যে, একত্রীকরণের পথে অস্ট্রিয়াকে সরিয়ে দেওয়াই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রথমে তিনি ১৮৬৪ সালে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ করেন এবং শ্লেসভিগ-হলস্টেইন অঞ্চল জয় করেন। এরপর ১৮৬৬ সালে অস্ট্রো-প্রুশিয়ান যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে প্রুশিয়া বিজয়ী হয়ে অস্ট্রিয়াকে জার্মান রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

 

এরপর বিসমার্ক উত্তর জার্মান সংঘ (North German Confederation) গঠন করেন, যেখানে অস্ট্রিয়ার অংশগ্রহণ ছিল না। দক্ষিণের কিছু জার্মান রাজ্য তখনো প্রুশিয়ার নেতৃত্ব মানতে চাইছিল না। বিসমার্ক তাদের একত্রিত করতে ফ্রান্সকে যুদ্ধের উস্কানি দেন। ১৮৭০ সালে ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধ শুরু হয় এবং এতে প্রুশিয়া ও তার মিত্ররা ফ্রান্সকে পরাজিত করে। এই বিজয়ের ফলে জাতীয়তাবাদী আবেগ আরও তীব্র হয় এবং দক্ষিণ জার্মান রাজ্যগুলো প্রুশিয়ার নেতৃত্বে একত্রীকরণে সম্মত হয়।

 

১৮৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি, ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে জার্মান সম্রাট প্রথম উইলহেল্মকে (Wilhelm I) জার্মানির ক্যাইজার (সম্রাট) ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে একীকৃত জার্মান সাম্রাজ্যের (German Empire) জন্ম হয়। এটি ছিল প্রুশিয়া-নেতৃত্বাধীন একটি ফেডারেল সাম্রাজ্য, যেখানে বিসমার্ক চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

জার্মানির একত্রীকরণের ফলে ইউরোপে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। একটি নতুন শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে জার্মানির উত্থান ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জন্য একপ্রকার হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। একইসঙ্গে, এটি ইউরোপের সামরিকীকরণ ও পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধের বীজ রোপণ করে। বিসমার্কের কৌশলী নেতৃত্ব, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং সামরিক বিজয় এই ঐতিহাসিক একত্রীকরণ সম্ভব করেছে। এটি শুধু জার্মান জাতির জন্য নয়, ইউরোপের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।


৫নং প্রশ্নের উত্তর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতি ছিল একাধারে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, সামরিক আধিপত্য এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বিস্তারের একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপকে একটি "বাফার জোন" বা প্রতিরক্ষামূলক অঞ্চল হিসেবে দেখতে শুরু করে, যা পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রক্ষা দেওয়ার কৌশলগত ভূখণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ফলে, যুদ্ধশেষে পূর্ব ইউরোপের যেসব দেশ নাৎসি জার্মানির দখল থেকে মুক্ত হয়েছিল, সেগুলোর ওপর সোভিয়েত সেনাবাহিনী কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এই অঞ্চলের দেশগুলোতে সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্ট সরকার গঠন করা হয় এবং একদলীয় শাসন চালু করা হয়।

 

প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন নিশ্চিত করে যে পূর্ব ইউরোপের প্রতিটি দেশে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় থাকবে। ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে কারচুপি, বিরোধীদলীয় নেতাদের নিপীড়ন এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার অভাব ছিল সাধারণ চিত্র। হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া এবং পূর্ব জার্মানিতে একইরকম কাঠামোর সরকার গঠিত হয়, যেগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করত।

 

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন এনে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তন করা হয়। শিল্প ও কৃষি খাতে ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রীয় মালিকানা চালু করা হয়। পরিকল্পিত অর্থনীতি, পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা এবং কেন্দ্রীভূত উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল এর মূল বৈশিষ্ট্য। COMECON (Council for Mutual Economic Assistance) গঠন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার নিয়ন্ত্রিত দেশগুলোর অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিজেদের স্বার্থে পরিচালিত করত।

 

তৃতীয়ত, সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য Warsaw Pact গঠন করা হয় ১৯৫৫ সালে, যা ছিল NATO-এর প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক জোট। এই জোটের মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সেনাবাহিনীকে সোভিয়েত মডেলে রূপান্তর করা হয় এবং মস্কোর নির্দেশে পরিচালিত হতো। কোনো দেশ এই কাঠামো থেকে সরে আসার চেষ্টা করলে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিক হস্তক্ষেপ করত—যেমন ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরি এবং ১৯৬৮ সালে প্রাগ বসন্ত (চেকোস্লোভাকিয়া) দমন।

 

চতুর্থত, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও সোভিয়েত আদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয় এবং সাহিত্য, সিনেমা ও সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করে দেওয়া হয় এবং সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করা হতো।

 

এইভাবে, সোভিয়েত নীতি পূর্ব ইউরোপে একটি নিয়ন্ত্রিত, সমমনস্ক সমাজতান্ত্রিক ব্লক গড়ে তোলে, যা ১৯৮৯-৯১ সালের কমিউনিজম পতনের আগ পর্যন্ত টিকে ছিল। যদিও এই নীতির ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বল্পমেয়াদে একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি জনঅসন্তোষ, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়, যার ফলশ্রুতিতে শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে।


৬নং প্রশ্নের উত্তর

ভার্সাই চুক্তি (Treaty of Versailles) ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এক গুরুত্বপূর্ণ শান্তিচুক্তি, যা ১৯১৯ সালের ২৮ জুন ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে জার্মানি এবং মিত্র শক্তিগুলোর মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করে। চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধপরবর্তী ইউরোপীয় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা, তবে বাস্তবে এটি জার্মানির উপর একতরফাভাবে কঠোর শর্ত আরোপ করে এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয়।

 

চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল জার্মানির প্রতি দায় আরোপ। ২৩১ নম্বর ধারা, যা ‘War Guilt Clause’ নামে পরিচিত, তাতে বলা হয় যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার জন্য একমাত্র দায়ী দেশ হলো জার্মানি। এর ফলে জার্মানিকে বিশাল পরিমাণ যুদ্ধক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানির জন্য এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব, যার ফলে দেশের মধ্যে চরম অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্ব দেখা দেয়।

 

চুক্তির আওতায় জার্মানির ভূখণ্ডেরও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। আলসেস-লোরেন অঞ্চল ফ্রান্সকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, পোল্যান্ড লাভ করে পশ্চিম প্রুশিয়া এবং পসেন অঞ্চল, এবং রাইনল্যান্ডকে একটি নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যেখানে জার্মান সেনাবাহিনী মোতায়েন করা নিষিদ্ধ ছিল। এছাড়াও, জার্মানির ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নিয়ে মিত্রশক্তিগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।

 

এই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির সামরিক শক্তিকেও কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়। সেনাবাহিনীর সংখ্যা ১ লাখের বেশি হতে পারবে না, নৌবাহিনী সীমিত থাকবে এবং বিমানবাহিনী গঠন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। এতে জার্মানির সামরিক গর্বে আঘাত লাগে এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা দানা বাঁধে।

 

চুক্তির ফলে ইউরোপের মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য ভেঙে নতুন জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়, যেমন চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া ও ইউগোস্লাভিয়া। জাতিপুঞ্জ (League of Nations) গঠন করা হয় ভবিষ্যতের যুদ্ধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিজের তৈরি এই সংগঠনে শেষ পর্যন্ত যোগ দেয়নি।

 

ভার্সাই চুক্তিকে অনেকেই মনে করেন "একটি অসম শান্তিচুক্তি", যা একদিকে যেমন জার্মান জনমনে গভীর ক্ষোভ, অপমান ও প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি করে, অন্যদিকে ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। এই ক্ষোভের সুযোগ নিয়েই পরবর্তীতে অ্যাডলফ হিটলার রাজনৈতিক উত্থান ঘটান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত হয়। সুতরাং, ভার্সাই চুক্তি কেবল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তিই নয়, বরং পরবর্তী সংঘাতের বীজও বপন করেছিল।


৭নং প্রশ্নের উত্তর

সুয়েজ সংকট (Suez Crisis) ছিল ১৯৫৬ সালে সংঘটিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনা, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ঘটেছিল। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সুয়েজ খাল, একটি কৌশলগত জলপথ যা ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং মূলত ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৫৬ সালের জুলাই মাসে, মিশরের রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। মূলত ব্রিটিশ ও ফরাসি মালিকানাধীন একটি কোম্পানি তখন খাল পরিচালনা করছিল। নাসের এই পদক্ষেপ মিশরের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু ব্রিটেন ও ফ্রান্স এটিকে তাদের স্বার্থের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করে।

 

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স একটি গোপন চুক্তি করে ইসরায়েলের সঙ্গে, যা ইতিহাসে “সেভর চুক্তি” নামে পরিচিত। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েল প্রথমে মিশরের সিনাই উপদ্বীপে আক্রমণ চালাবে এবং এরপর ব্রিটেন ও ফ্রান্স “শান্তি রক্ষা” ও খাল নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে মিশরে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে। অক্টোবর ১৯৫৬ সালে ইসরায়েল আক্রমণ চালায় এবং দ্রুত অগ্রসর হয়, এরপর ব্রিটেন ও ফ্রান্স বিমান হামলা শুরু করে। এই আগ্রাসন মিশরের বিরুদ্ধে ছিল সরাসরি ঔপনিবেশিক শক্তির শক্তি প্রদর্শনের একটি প্রয়াস।

 

তবে এই হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়ে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন—যারা শীতল যুদ্ধের বিপরীত দুই শক্তি—দু’জনেই এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েলকে পিছু হটতে বাধ্য করেন। একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন হুমকি দেয় যে, তারা মিশরকে সমর্থন করতে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে। এই জোটবদ্ধ আন্তর্জাতিক চাপের ফলে অবশেষে আগ্রাসন থেমে যায় এবং খাল আবার মিশরের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে।

 

সুয়েজ সংকটের তাৎপর্য ছিল বহুস্তরীয়। একদিকে এটি দেখিয়ে দেয় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য আর বজায় নেই এবং নতুন পরাশক্তিগুলো—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন—বিশ্ব রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অপরদিকে, এটি নাসের ও মিশরের জন্য এক রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তাকে আরব জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিশ্বমঞ্চে মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এবং তারা বুঝতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়া আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

 

সুয়েজ সংকট ছিল শুধুই একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক যুগের পতনের প্রতীক এবং আধুনিক ভূরাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদে আরব জাতীয়তাবাদ, পশ্চিমা হস্তক্ষেপবিরোধী মনোভাব এবং তৃতীয় বিশ্বের আত্মনির্ভরতার ধারণা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।


৮নং প্রশ্নের উত্তর

বান্দুং সম্মেলন (Bandung Conference) ছিল ১৯৫৫ সালের এপ্রিল মাসে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং শহরে অনুষ্ঠিত একটি ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক সম্মেলন, যা এশিয়া ও আফ্রিকার ২৯টি নবস্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনকে তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার পথচলার একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব যখন শীতল যুদ্ধের মেরুকরণের মধ্যে পড়ে—যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী পশ্চিমা ব্লক ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক পূর্বা ব্লকের মুখোমুখি অবস্থানে—তখন এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক নবস্বাধীন দেশ এই দ্বৈত আধিপত্যের বাইরে থেকে নিজেদের আলাদা অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে বান্দুং সম্মেলনের গুরুত্ব অপরিসীম।

 

সম্মেলনের প্রধান উদ্যোক্তারা ছিলেন ইন্দোনেশিয়া, ভারত, মিশর, ঘানা এবং যুগোস্লাভিয়া, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে সুকর্ণো, জওহরলাল নেহরু, গামাল আবদেল নাসের, কোয়ামে এনক্রুমা এবং টিটো। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সদ্য মুক্তপ্রাপ্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংহতি ও সহযোগিতা গড়ে তোলা এবং একটি নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। সম্মেলনে উপনিবেশবাদ, বর্ণবৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ এবং সংস্কৃতিগত আধিপত্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করা হয়।

 

বান্দুং সম্মেলনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল "দশ দফা বান্দুং ঘোষণা", যেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মান, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতিগুলোর মধ্যে সমতা ও অ-হস্তক্ষেপের নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই নীতিমালা ভবিষ্যতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (Non-Aligned Movement)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক জোটের সদস্য না হয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা এবং তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন ও মর্যাদা রক্ষা করা।

 

বান্দুং সম্মেলনের গুরুত্ব কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। এতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিনিময় উৎসাহিত হয়। একইসঙ্গে, পশ্চিমা বিশ্বের সাংস্কৃতিক প্রভাব মোকাবিলায় নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়াস দেখা যায়।

 

এছাড়া, বান্দুং সম্মেলন ছিল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূলধারায় তুলে আনার একটি উদ্যোগ। এটি দেখিয়েছে যে, ছোট বা দুর্বল দেশগুলো একত্রিত হয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাবের বাইরে গিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। সম্মেলনটি ঔপনিবেশিক যুগের অবসান এবং নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সূচনার প্রতীক হয়ে ওঠে।

 

সার্বিকভাবে, বান্দুং সম্মেলন তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক আত্মনির্ভরতা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের ভিত্তি তৈরি করে দেয়, যা পরবর্তী কয়েক দশকজুড়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

No comments:

Post a Comment