### *মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা*
*নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭)* - ইতালির
ফ্লোরেন্সে জন্ম। তাকে বলা হয় আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক। তার বিখ্যাত বই
*"The Prince" (১৫১৩)*।
ম্যাকিয়াভেলির আগে দার্শনিকরা মানুষকে ভালো,
নৈতিক, ঈশ্বরভক্ত হিসেবে দেখতেন। ম্যাকিয়াভেলি প্রথম
বললেন - "বইয়ের মানুষ আর বাস্তবের মানুষ এক নয়।" তিনি যেমন মানুষকে
বাস্তবে দেখেছেন, তেমনই লিখেছেন।
তাই তার মানব প্রকৃতির ধারণা অত্যন্ত বাস্তববাদী, নির্মম ও নেতিবাচক।
#### *১. ম্যাকিয়াভেলির মতে মানব প্রকৃতির ৭টি
বৈশিষ্ট্য*
*১. মানুষ স্বার্থপর ও লোভী:*
ম্যাকিয়াভেলি বলেন, "মানুষ তার বাবার মৃত্যুর চেয়ে সম্পত্তি
হারানোর শোক বেশি দিন মনে রাখে।"
মানুষ সবসময় নিজের লাভ খোঁজে। সুযোগ পেলেই
অন্যের সম্পত্তি দখল করতে চায়।
*২. মানুষ অকৃতজ্ঞ ও বিশ্বাসঘাতক:*
তিনি বলেন, মানুষকে ভালোবাসা দিয়ে বশ করা যায় না। মানুষ
ভয়ের কাছে নত হয়, ভালোবাসার কাছে
নয়।
> "মানুষ প্রয়োজনে তোমার জন্য জীবন দেবে বলবে,
কিন্তু বিপদে পড়লে
প্রথমে তোমাকেই ছেড়ে যাবে।"
*৩. মানুষ ভীরু ও লোভী:*
মানুষ সাহসী নয়, ভীরু। শক্তিশালীকে ভয় পায়। তাই শাসকের উচিত
ভালোবাসা নয়, ভয় দেখিয়ে শাসন
করা। কারণ ভয় স্থায়ী, ভালোবাসা
অস্থায়ী।
*৪. মানুষ চঞ্চল ও ভানকারী:*
মানুষ মুখে এক কথা বলে, মনে আরেক কথা ভাবে। সকালে এক দলকে সমর্থন করে,
বিকেলে আরেক দলকে। তারা
বাইরে সাধু, ভেতরে শয়তান।
ম্যাকিয়াভেলি একে বলেন - "মানুষ ভান করতে ওস্তাদ।"
*৫. মানুষ হিংসুক ও ক্ষমতালোভী:*
মানুষ অন্যের উন্নতি সহ্য করতে পারে না। সবসময়
আরও ক্ষমতা, আরও টাকা চায়।
তার চাহিদার শেষ নেই।
*৬. মানুষ বোকা ও অনুকরণপ্রিয়:*
সাধারণ মানুষ বোকা। তারা চাকচিক্য দেখে ভোলে।
একজন শাসক যদি বাইরে ধার্মিক সেজে থাকে, ভেতরে অধার্মিক হলেও মানুষ তাকে বিশ্বাস করবে। মানুষ বিচার করে ফলাফল দিয়ে,
উদ্দেশ্য দিয়ে নয়।
*৭. মানুষ ভালো-মন্দের মিশ্রণ, কিন্তু মন্দের পাল্লা ভারী:*
তিনি বলেন, মানুষ জন্মগতভাবে খারাপ নয়, কিন্তু পরিস্থিতি তাকে খারাপ বানায়। আইন ও
শাস্তি না থাকলে মানুষ পশুর মতো আচরণ করবে।
#### *২. এই মানব প্রকৃতি থেকে ম্যাকিয়াভেলির
রাজনৈতিক শিক্ষা - শাসকের জন্য উপদেশ*
মানুষ যেহেতু খারাপ, তাই শাসককেও খারাপ হতে হবে - এটাই "The
Prince" বইয়ের মূল কথা।
*ক) শাসক হবেন শিয়াল ও সিংহের মতো:*
- *শিয়ালের মতো ধূর্ত:* ফাঁদ চিনতে।
- *সিংহের মতো শক্তিশালী:* নেকড়েকে ভয় দেখাতে।
শুধু ভালো হলে চলবে না।
*খ) শাসক ভয়ঙ্কর হবেন, ঘৃণিত হবেন না:*
মানুষ তোমাকে ভয় পাবে - এটা ভালো। কিন্তু ঘৃণা
করবে - এটা বিপজ্জনক। তাই মানুষের সম্পত্তি ও নারীর দিকে হাত দেবে না। সম্পত্তি
কেড়ে নিলে মানুষ কখনো ক্ষমা করে না।
*গ) উদ্দেশ্য সফল হলেই উপায় বৈধ (End
justifies the means):*
এটি ম্যাকিয়াভেলির সবচেয়ে বিতর্কিত উক্তি।
রাষ্ট্র রক্ষার জন্য শাসক মিথ্যা বলতে পারে, প্রতিশ্রুতি ভাঙতে পারে, হত্যাও করতে পারে। কারণ মানুষ ফলাফল দেখে।
*ঘ) ধর্মকে ব্যবহার করো, বিশ্বাস করো না:*
শাসক বাইরে ধার্মিক সাজবে, কিন্তু ভেতরে বাস্তববাদী থাকবে। ধর্ম মানুষকে
নিয়ন্ত্রণ করার হাতিয়ার।
#### *৩. সমালোচনা*
১.
*অতিরিক্ত নেতিবাচক:* সব মানুষ খারাপ নয়। মাদার তেরেসা, গান্ধীজির মতো ভালো মানুষও আছে। ম্যাকিয়াভেলি
মানুষের ভালো দিক দেখেননি।
2. *অনৈতিকতাকে
উৎসাহ:* তার তত্ত্ব স্বৈরাচারী শাসকদের উৎসাহ দিয়েছে। হিটলার, মুসোলিনি তার ভক্ত ছিল।
3. *মধ্যযুগের ইতালির
প্রেক্ষাপট:* ইতালি তখন ৫টি ছোট রাজ্যে বিভক্ত, মারামারি, হত্যা চলতো। সেই অস্থির সমাজ দেখে তিনি মানুষকে
খারাপ ভেবেছেন।
#### *৪. তবুও কেন ম্যাকিয়াভেলি গুরুত্বপূর্ণ?*
কারণ তিনি প্রথম রাজনীতিকে ধর্ম ও নৈতিকতা থেকে
আলাদা করেছেন। তিনি বলেছেন - রাজনীতি হলো ক্ষমতার খেলা, এখানে নীতি কথা চলে না। এই বাস্তববাদী
দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক করেছে।
*পরীক্ষায় লেখার জন্য এক লাইনে:*
> "ম্যাকিয়াভেলির মতে, মানুষ অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল, ভানকারী, লোভী ও ভীরু -
তাই মানুষকে ভালোবাসা দিয়ে নয়, ভয় ও শাস্তি
দিয়ে শাসন করতে হয়।"
নিকোলো
ম্যাকিয়াভেলির মানব-প্রকৃতি সংক্রান্ত ধারণা মূলত নৈরাশ্যবাদী
ও বাস্তববাদী। তাঁর মতে, মানুষ স্বার্থপর, লোভী,
চঞ্চল, ভীরু ও প্রতারণাপ্রবণ; তাই রাষ্ট্র
ও শাসককে নৈতিক আদর্শের বদলে মানুষের বাস্তব প্রবৃত্তির ভিত্তিতে শাসন করতে হবে।[readaim][bibortonpoth]
মূল ধারণা
ম্যাকিয়াভেলি
মানুষকে আদর্শ বা নৈতিক সত্তা হিসেবে নয়, বরং যেমন
আছে সেভাবে দেখেছেন। The Prince-এ তিনি বলেন,
মানুষ সাধারণভাবে অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল, ভণ্ড,
প্রতারক, বিপদভীত এবং লাভের পেছনে উন্মত্ত।[bibortonpoth]
তাঁর
বিশ্লেষণে মানব-প্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- স্বার্থপরতা: মানুষ প্রথমত নিজের সুবিধা, সম্পদ, ক্ষমতা ও
নিরাপত্তার কথা ভাবে। সমষ্টিগত কল্যাণ সাধারণত ব্যক্তিগত স্বার্থের অধীন
থাকে।[readaim][polsci]
- অসীম আকাঙ্ক্ষা ও অসন্তোষ: মানুষের ইচ্ছা অসীম, কিন্তু
প্রাপ্তি সীমিত। ফলে মানুষ কখনো পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হয় না এবং নতুন সম্পদ,
মর্যাদা ও ক্ষমতার জন্য সংগ্রাম করে।[readaim][studocu]
- লোভ ও সম্পদপ্রিয়তা: ম্যাকিয়াভেলির মতে, মানুষ
সম্পদ ও বস্তুগত সুবিধাকে প্রায়ই মানবিক সম্পর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।[studocu]
- ভীরুতা ও অস্থিরতা: মানুষ বিপদে পালিয়ে যায় এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী
আনুগত্য বদলে ফেলতে পারে। তাই জনগণের সমর্থন স্থায়ী নয়।[bibortonpoth][scribd]
- প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রবণতা: মানুষ প্রয়োজনে কথা বলে, প্রতিশ্রুতি
ভঙ্গ করে এবং নিজের স্বার্থে অন্যকে ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না।[scribd][scribd]
রাজনীতিতে
এর প্রয়োগ
ম্যাকিয়াভেলির
মানব-প্রকৃতি তত্ত্ব তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি। যেহেতু মানুষ স্বভাবগতভাবে
বিশ্বস্ত নয়, শাসকের কাজ হলো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, শৃঙ্খলা ও
ক্ষমতা রক্ষা করা।[polsci][polsci]
এজন্য তিনি
শাসককে বলেছেন—জনগণের ভালোবাসার চেয়ে ভয় অধিকতর নির্ভরযোগ্য, কারণ
ভালোবাসা পরিবর্তনশীল, কিন্তু ভয় তুলনামূলকভাবে স্থায়ী হতে পারে। তবে শাসককে
এমনভাবে ভীতিপ্রদর্শন করতে হবে যাতে তা ঘৃণা জন্ম না দেয়।[readaim]
তিনি আরও
মনে করতেন, শাসককে প্রয়োজনে সাধারণ নৈতিকতার নিয়ম থেকে বিচ্যুত
হতে পারে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও ক্ষমতা রক্ষার জন্য কৌশল, বাস্তববাদ
এবং প্রয়োজনে কঠোরতা গ্রহণ করা যুক্তিসঙ্গত। এ কারণেই তাঁকে রাজনৈতিক বাস্তববাদের
অন্যতম প্রবক্তা বলা হয়।[polsci]
মূল্যায়ন
ম্যাকিয়াভেলির
ধারণা মানুষের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে দেখায়। তিনি দেখিয়েছেন
যে, রাষ্ট্র শুধু নৈতিক আশা বা জনগণের সৎ ইচ্ছার ওপর দাঁড়াতে পারে না; এর জন্য
দৃঢ় আইন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও সক্ষম নেতৃত্ব প্রয়োজন।[polsci]
তবে
সমালোচকরা বলেন, তাঁর বিশ্লেষণ মানুষের সহযোগিতা, সংহতি,
ন্যায়বোধ ও নৈতিকতার দিককে অতিরিক্ত উপেক্ষা করে। তবু তাঁর মূল অবদান
হলো—তিনি রাজনীতিকে ধর্ম ও আদর্শবাদ থেকে আলাদা করে মানব-প্রকৃতি ও ক্ষমতার বাস্তব
বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছেন।[polsci][fulkibaz]
সংক্ষেপে,
ম্যাকিয়াভেলির চোখে মানুষ স্বার্থ ও ভয়ে পরিচালিত এক অস্থির প্রাণী;
আর শাসকের দায়িত্ব হলো সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করে রাষ্ট্রের শক্তি ও
স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।[readaim][bibortonpoth]
মানব
প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা
ভূমিকা
নিকোলো
ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯–১৫২৭) রেনেসাঁ যুগের ইতালির একজন কূটনীতিক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ
ও ইতিহাসবিদ। তাঁকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের
ভিত্তি হলো মানুষ সম্পর্কে এক বাস্তববাদী, এমনকি
নিরাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। দ্য প্রিন্স
(১৫১৩) ও ডিসকোর্সেস
অন লিভি-তে তিনি মানুষকে আদর্শ বা ধর্মীয় নীতির আলোকে নয়,
বরং বাস্তবে সে যেমন আচরণ করে সেভাবেই বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, রাজনীতি
বুঝতে হলে আগে মানুষের স্বভাব বুঝতে হবে।
ম্যাকিয়াভেলির
পদ্ধতি: "যা হওয়া উচিত" নয়, "যা
আছে"
মধ্যযুগীয়
চিন্তাবিদেরা মানুষকে ঈশ্বরের সৃষ্টি ও নৈতিক পূর্ণতার দিকে ধাবমান সত্তা হিসেবে
দেখতেন। ম্যাকিয়াভেলি এই ধারা থেকে সরে এসে বলেন যে, মানুষ কেমন
হওয়া উচিত তা নিয়ে কল্পনা করা নিরর্থক; বরং মানুষ
বাস্তবে কেমন তা-ই শাসকের জানা প্রয়োজন। দ্য প্রিন্স-এর ১৫তম
অধ্যায়ে তিনি স্পষ্ট করেন, যে ব্যক্তি "যা করা উচিত" তার জন্য "যা
করা হয়" তা উপেক্ষা করে, সে নিজের রক্ষার চেয়ে ধ্বংসই ডেকে আনে। ইতিহাস ও নিজের
কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে মানুষের স্বভাব সব যুগে
মোটামুটি একই থাকে।
মানব
প্রকৃতির মূল বৈশিষ্ট্য
১.
স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা। ম্যাকিয়াভেলির
মতে মানুষ মূলত নিজের স্বার্থ দ্বারা চালিত। সে বন্ধুত্ব, আনুগত্য বা
কৃতজ্ঞতা দেখায় যতক্ষণ তাতে তার লাভ থাকে। তিনি লিখেছেন, মানুষ
সম্পত্তি হারানোর শোক ভুলতে পারে, কিন্তু পিতার মৃত্যুর শোক তার চেয়ে দ্রুত
ভুলে যায়। এর দ্বারা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে মানুষের কাছে বস্তুগত স্বার্থ
প্রায়শই আবেগের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
২.
অকৃতজ্ঞতা ও অবিশ্বস্ততা। দ্য প্রিন্স-এর সতেরোতম
অধ্যায়ে তিনি মানুষকে অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল, ভণ্ড, কপট এবং
বিপদ এড়াতে ও লাভের জন্য লোভী বলে বর্ণনা করেছেন। যতদিন শাসক উপকার করেন, ততদিন
প্রজারা রক্ত, সম্পদ, জীবন এমনকি সন্তান পর্যন্ত উৎসর্গের
প্রতিশ্রুতি দেয়; কিন্তু প্রয়োজন সত্যিই এসে পড়লে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।
৩. লোভ ও
উচ্চাকাঙ্ক্ষা। মানুষের
আকাঙ্ক্ষা অসীম, অথচ তার সামর্থ্য সীমিত। এই ব্যবধানই তাকে অতৃপ্ত রাখে।
মানুষ যা পেয়েছে তাতে সন্তুষ্ট না থেকে সবসময় আরও বেশি চায়, ফলে সমাজে
দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। ম্যাকিয়াভেলি
ডিসকোর্সেস-এ বলেন, প্রতিটি সমাজে দুটি মনোভাব বিদ্যমান:
অভিজাতরা শাসন ও কর্তৃত্ব করতে চায়, আর সাধারণ মানুষ শাসিত বা নিপীড়িত না হতে
চায়।
৪. ভয় ও
নিরাপত্তাহীনতা। মানুষ ভীতু
ও নিরাপত্তার প্রত্যাশী। ম্যাকিয়াভেলির বিশ্লেষণে ভয় মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার
সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়। তিনি বলেন, মানুষ নিজেকে যে ভালোবাসে তাকে আঘাত করতে
যতটা দ্বিধা করে, যাকে ভয় করে তাকে আঘাত করতে ততটা দ্বিধা করে না,
কারণ ভালোবাসা কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ, আর মানুষ
স্বার্থপর বলে সুযোগ পেলেই সেই বন্ধন ছিন্ন করে; কিন্তু ভয়
শাস্তির আশঙ্কায় টিকে থাকে।
৫.
পরিবর্তনশীলতা ও আত্মপ্রবঞ্চনা। মানুষ
বাইরের চেহারা দেখে বিচার করে, গভীরে যায় না। ম্যাকিয়াভেলির ভাষায়, সবাই তোমাকে
দেখে, কিন্তু অল্প মানুষই তোমাকে স্পর্শ করে বা প্রকৃতপক্ষে
বোঝে। তাই জনগণ ফলাফল ও বাহ্যিক ভাবমূর্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়।
রাজনৈতিক
শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক
মানুষ
সম্পর্কে এই ধারণা থেকেই ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক উপদেশগুলো উৎসারিত।
- ভালোবাসার চেয়ে ভয় নিরাপদ। শাসক যদি দুটোই একসঙ্গে পেতে না পারেন, তবে ভয় জাগানো শ্রেয়, তবে
ঘৃণার পাত্র হওয়া চলবে না। জনগণের সম্পত্তি ও নারীদের সম্মানে হাত না দিলে
ভয় ঘৃণায় রূপ নেয় না।
- প্রতিশ্রুতি রক্ষা সবসময় আবশ্যক নয়। মানুষ নিজেরাই যেহেতু অবিশ্বস্ত, তাই শাসক নিজের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে প্রতিশ্রুতি
রাখতে বাধ্য নন। তিনি শাসককে সিংহের শক্তি ও শেয়ালের ধূর্ততার সমন্বয় ঘটাতে
বলেন।
- ভাবমূর্তির গুরুত্ব। যেহেতু মানুষ বাহ্যিক রূপে প্রভাবিত হয়, তাই শাসককে গুণবান দেখাতে হবে, যদিও প্রয়োজনে গুণের বিরুদ্ধে কাজ করার সক্ষমতাও
থাকতে হবে।
- শক্তিশালী আইন ও প্রতিষ্ঠান। ডিসকোর্সেস-এ তিনি
বলেন, মানুষ বাধ্য না হলে ভালো হয় না। তাই আইন ও
প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়তে হবে যাতে মানুষের মন্দ প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা
যায় এবং তা সমাজের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।
ভাগ্য
(ফোর্তুনা) ও গুণ (ভিরতু)
ম্যাকিয়াভেলি
মানুষকে নিছক পরিস্থিতির শিকার মনে করেননি। তাঁর মতে, মানুষের
জীবনের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে ভাগ্য (ফোর্তুনা), আর বাকিটা
মানুষের নিজের সামর্থ্য বা ভিরতু-র উপর
নির্ভরশীল। ভাগ্যকে তিনি বন্যাকবলিত নদীর সঙ্গে তুলনা করেন, যা বিধ্বংসী,
কিন্তু বাঁধ নির্মাণের মতো আগাম প্রস্তুতি নিলে তার ক্ষতি কমানো যায়।
এখানে মানুষের সাহস, বুদ্ধি ও সাহসী উদ্যোগের ইতিবাচক ভূমিকা স্বীকৃত হয়েছে।
সমালোচনা
ম্যাকিয়াভেলির
মানব-প্রকৃতি ধারণা বহু সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে।
প্রথমত,
তাঁকে অতিমাত্রায় নিরাশাবাদী বলা হয়। মানুষের মধ্যে যে ত্যাগ, সহমর্মিতা ও
নৈতিক আদর্শ রয়েছে, তিনি তা যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। দ্বিতীয়ত, তিনি সব
মানুষকে একই ছাঁচে ফেলেছেন এবং মানুষের আচরণে সংস্কৃতি, শিক্ষা ও
পরিবেশের প্রভাব উপেক্ষা করেছেন। তৃতীয়ত, তাঁর দর্শন
নীতিকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে ক্ষমতার অপব্যবহারকে বৈধতা দিতে পারে বলে মনে করা
হয়। "ম্যাকিয়াভেলিবাদ" শব্দটি তাই ধূর্ততা ও নীতিহীন ক্ষমতালিপ্সার
প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে
সমর্থকেরা বলেন, ম্যাকিয়াভেলি অনৈতিকতার প্রচারক ছিলেন না; তিনি
রাজনীতির নির্মম বাস্তবতাকে খোলাখুলি তুলে ধরেছেন। তাঁর ডিসকোর্সেস-এ
প্রজাতন্ত্র, স্বাধীনতা ও নাগরিক গুণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ
পায়, যা দেখায় যে তাঁর লক্ষ্য ছিল একটি স্থিতিশীল ও
শক্তিশালী রাষ্ট্র।
উপসংহার
ম্যাকিয়াভেলির
মতে মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর, লোভী, ভীতু, অকৃতজ্ঞ ও পরিবর্তনশীল। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি এমন এক
রাষ্ট্রচিন্তা গড়ে তোলেন, যেখানে শাসককে মানুষের দুর্বলতা বুঝে কৌশলে ও প্রয়োজনে
কঠোরভাবে শাসন করতে হয়। যদিও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি একপেশে ও নিরাশাবাদী বলে সমালোচিত,
তবুও রাজনীতিকে ধর্ম ও নীতিশাস্ত্র থেকে স্বতন্ত্র করে বাস্তব অভিজ্ঞতার
ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করার যে ধারা তিনি শুরু করেছিলেন, তা আধুনিক
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিত্তি রচনা করেছে। মানব প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর এই বাস্তববাদী
বিশ্লেষণ আজও রাজনীতি, ক্ষমতা ও নেতৃত্ব বোঝার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।
ম্যাকিয়াভেলির মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা
অত্যন্ত জটিল এবং প্রায়শই ভুল বোঝা যায়। তিনি সাধারণত "মানুষ স্বভাবতই
মন্দ" এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার চিন্তাধারা আরও
সূক্ষ্ম: তিনি মানব প্রকৃতির **অপরিবর্তনীয়তা** স্বীকার করেছেন, কিন্তু একই সাথে জোর দিয়েছেন যে এই প্রকৃতি
মূলত **অসন্তুষ্ট আকাঙ্ক্ষা** এবং **স্বার্থপরতা** দ্বারা চালিত, এবং এই প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত অনিবার্য
অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য শাসককে অবশ্যই কার্যকর উপায় অবলম্বন করতে
হবে।
### ১. মূল দৃষ্টিভঙ্গি: মানব প্রকৃতি অপরিবর্তনীয়,
কিন্তু তা
"মন্দ" এর দিকে ঝুঁকে আছে
ম্যাকিয়াভেলি বিশ্বাস করতেন যে মানব প্রকৃতি
সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় না। তিনি "লিভি'র প্রথম দশ বইয়ের উপর আলোচনা" এর
ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, মানব প্রকৃতি
অপরিবর্তনীয়, কারণ এটি একটি
অপরিবর্তনীয় মহাবিশ্বের অংশ। এই অপরিবর্তনীয় প্রকৃতির মূল বিষয়বস্তু হলো
স্বার্থপরতা এবং অবিরাম আকাঙ্ক্ষা।
তিনি "দ্য প্রিন্স"-এ মানব প্রকৃতির
"মন্দ" দিকটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন: মানুষ **কৃতঘ্ন,
পরিবর্তনশীল, ভণ্ড, বিপদ এড়াতে আগ্রহী এবং লাভের প্রতি লোভী**। তাই একজন শাসক যদি সম্পূর্ণভাবে他人的 কথার উপর নির্ভর করেন, তাহলে তিনি অনিবার্যভাবে ধ্বংস হবেন। এই কারণে,
তিনি যুক্তি দেন যে,
যেহেতু মানুষ
"মন্দ" এবং চুক্তি রক্ষা করে না, তাই শাসককেও প্রয়োজনে চুক্তি ভঙ্গ করতে হবে।
এই ধরনের বর্ণনা ম্যাকিয়াভেলিকে "নৃশংস" হিসাবে চিহ্নিত করেছে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতাকে
প্রকাশ করা, নৈতিকতার শিক্ষা
দেওয়া নয়।
### ২. গভীর প্রেরণা: অসন্তুষ্ট আকাঙ্ক্ষা এবং
স্বার্থপরতা
ম্যাকিয়াভেলি মানব প্রকৃতিকে কেবল স্থির
"মন্দ" হিসাবে দেখেননি, বরং আরও গভীরে
বিশ্বাস করতেন যে মানব প্রকৃতির মূল চালিকাশক্তি হলো **অসন্তুষ্ট আকাঙ্ক্ষা**।
ফরাসি পণ্ডিতদের গবেষণা উল্লেখ করে যে, ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন মানুষ সহজে যা পেয়েছে তাতে ক্লান্ত হয়ে যায়,
এবং সর্বদা আরও বেশি riches
এবং ক্ষমতা অর্জনের
চেষ্টা করে, এই ধরনের
"অবিরাম অধিগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা" মানুষের অস্থিরতার উৎস। এই আকাঙ্ক্ষা
শুধুমাত্র শাসকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমস্ত শ্রেণীর মধ্যে বিদ্যমান: অভিজাতরা তাদের ক্ষমতা সম্প্রসারিত করতে
চায়, সাধারণ মানুষ তাদের
বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করতে চায়, এই ধরনের পারস্পরিক সংঘর্ষ শহর-রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ এবং অস্থিতিশীলতার
দিকে পরিচালিত করে।
### ৩. রাজনৈতিক পরিণতি: "কার্যকর সত্য"
এর প্রতি শ্রদ্ধা
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে এই হতাশাবাদী ধারণা
সরাসরি ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক পদ্ধতিকে নির্ধারণ করেছে। তিনি "কল্পনায়
বেঁচে থাকা" এর বিরোধিতা করেছেন, এবং পরিবর্তে "**বস্তুর কার্যকর সত্য**" অনুসরণ করার পক্ষে ছিলেন।
যেহেতু মানুষ স্বভাবতই ভাল নয়, তাই শাসক যদি
সর্বদা নৈতিকতা অনুযায়ী কাজ করেন, তাহলে তিনি কেবল
নিজের সর্বনাশ ডেকে আনবেন। তাই, শাসককে অবশ্যই
শিখতে হবে "মন্দ হতে", এবং পরিস্থিতি
অনুযায়ী নমনীয়ভাবে সৎ বা প্রতারক হতে হবে। ম্যাকিয়াভেলির কাছে, রাষ্ট্রের স্থিতি এবং শাসকের ক্ষমতা রক্ষা করা
সর্বোচ্চ লক্ষ্য, এবং ঐতিহ্যবাহী
নৈতিকতা এই লক্ষ্যের অধীনস্থ।
### ৪. একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন: মানব প্রকৃতি কি
সম্পূর্ণরূপে "অপরিবর্তনীয়"?
যদিও ম্যাকিয়াভেলি মানব প্রকৃতির
অপরিবর্তনীয়তার কথা বলেছেন, কিন্তু আধুনিক
শিক্ষাবিদরা উল্লেখ করেছেন যে, তার চিন্তাধারায়
একটি দ্বন্দ্ব রয়েছে। কিছু পণ্ডিত যুক্তি দেন যে, ম্যাকিয়াভেলি আসলে **স্থির সারমর্ম** ধারণাকে
অস্বীকার করেছেন, তিনি মনে করতেন
মানুষের কোনো পূর্বনির্ধারিত "সারমর্ম" নেই, বরং বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশ এবং কর্মের মাধ্যমে
মানব প্রকৃতি প্রকাশ পায় বা পুনর্গঠিত হয়। এর অর্থ হলো, "মানুষ স্বভাবতই মন্দ" হয়তো একটি সরলীকৃত
সারাংশ, ম্যাকিয়াভেলি আরও দেখতে
চেয়েছিলেন যে, নির্দিষ্ট
রাজনৈতিক কাঠামো এবং শাসন পদ্ধতির মাধ্যমে, এই স্বার্থপর প্রবণতাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ বা
পরিচালনা করে রাষ্ট্রীয় স্থিতি অর্জন করা যায়।
সংক্ষেপে, ম্যাকিয়াভেলির মানব প্রকৃতি ধারণা একটি
**বিশ্লেষণমূলক হাতিয়ার**। তিনি মানব প্রকৃতিকে "মন্দ" বলে চিহ্নিত
করেন, যাতে শাসককে বিভ্রম ত্যাগ
করতে এবং ক্ষমতা রক্ষার জন্য কঠোর বাস্তব নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য করা যায়। এটি
একটি নৈতিক নিন্দা নয়, বরং রাজনৈতিক
বাস্তবতাবাদী পর্যবেক্ষণ।
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা আলোচনা কর
ভূমিকা
ইতালীয় রেনেসাঁ যুগের বিশিষ্ট রাষ্ট্রচিন্তাবিদ নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি
(Niccolò Machiavelli) আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম জনক হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Prince (১৫৩২)-এ তিনি মানব প্রকৃতি, রাষ্ট্র পরিচালনা,
ক্ষমতা ও শাসকের কর্তব্য সম্পর্কে বাস্তববাদী মতবাদ তুলে ধরেন। ম্যাকিয়াভেলির মতে,
মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর,
লোভী, অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল এবং ক্ষমতা ও সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট। তাই রাজনীতি বিশ্লেষণ করতে হলে মানুষের প্রকৃত স্বভাবকে আদর্শের পরিবর্তে বাস্তবতার আলোকে বিচার করতে হবে।
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির প্রধান ধারণাসমূহ
১. মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর
ম্যাকিয়াভেলির মতে, মানুষ সাধারণত নিজের স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। ব্যক্তিগত লাভ, নিরাপত্তা ও সুবিধা অর্জনের জন্য মানুষ অনেক সময় অন্যের স্বার্থ উপেক্ষা করে। তাই শাসককে মানুষের নিঃস্বার্থ আচরণের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা উচিত নয়।
২. মানুষ অকৃতজ্ঞ ও অবিশ্বস্ত
ম্যাকিয়াভেলি মনে করেন,
মানুষ প্রায়ই উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা ধরে রাখতে পারে না। ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তন হলে মানুষ তার পূর্বের আনুগত্যও ত্যাগ করতে পারে। এ কারণে শাসকের উচিত শুধু মানুষের প্রতিশ্রুতি বা আনুগত্যের ওপর নির্ভর না করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩. মানুষ লোভী ও সম্পদপ্রিয়
তাঁর মতে, মানুষের আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই। মানুষ সম্পদ,
সম্মান, ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন করতে চায়। বিশেষ করে মানুষের সম্পত্তির প্রতি আকর্ষণ অত্যন্ত প্রবল। তাই একজন শাসকের উচিত প্রজাদের সম্পত্তি ও অধিকার অযথা হরণ না করা, কারণ এতে শাসকের বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।
৪. মানুষ ভীরু ও বিপদে পরিবর্তনশীল
ম্যাকিয়াভেলির মতে, মানুষ সাধারণত নিরাপত্তা ও সুবিধাকে প্রাধান্য দেয়। বিপদ দেখা দিলে অনেকেই পূর্বের আনুগত্য থেকে সরে যেতে পারে। সুসময়ে যারা শাসকের পাশে থাকে,
দুর্দিনে তাদের সবাইকে পাশে পাওয়া যায় না। তাই শাসককে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে হবে।
৫. মানুষ পরিবর্তনশীল ও অস্থির
মানুষের মনোভাব, আনুগত্য ও স্বার্থ পরিস্থিতি অনুসারে পরিবর্তিত হয়। ম্যাকিয়াভেলি মনে করেন,
মানুষের আচরণ সব সময় স্থিতিশীল নয়। ফলে শাসককে মানুষের পরিবর্তনশীল মনোভাব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
৬. মানুষ ভয় ও ভালোবাসা—উভয়ের দ্বারা পরিচালিত হয়
ম্যাকিয়াভেলির মতে, একজন শাসকের পক্ষে একই সঙ্গে প্রজাদের ভালোবাসা ও ভয় অর্জন করা সম্ভব হলে তা সর্বোত্তম। কিন্তু দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে হলে,
তিনি ভালোবাসার চেয়ে ভয়কে অধিক নিরাপদ মনে করেন।
তবে তিনি বলেননি যে শাসকের নিষ্ঠুর বা ঘৃণিত হওয়া উচিত। বরং শাসককে এমনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে,
যাতে মানুষ তাকে ভয় করে,
কিন্তু তাকে ঘৃণা না করে।
৭. মানুষ বাহ্যিক চাকচিক্য ও প্রদর্শনে প্রভাবিত হয়
ম্যাকিয়াভেলির মতে, মানুষ অনেক সময় বাস্তব গুণাবলির চেয়ে বাহ্যিক আচরণ ও দৃশ্যমান ভাবমূর্তি দেখে বেশি প্রভাবিত হয়। সাধারণ মানুষ শাসকের প্রকৃত চরিত্র সব সময় গভীরভাবে বিচার করতে পারে না। তাই শাসকের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা, দয়া,
সততা ও ধর্মপরায়ণতার ভাবমূর্তি থাকা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে তিনি শাসককে সব সময় নৈতিকতার বিরোধিতা করতে বলেননি;
বরং প্রয়োজনে নৈতিকতার প্রচলিত নিয়ম থেকে সরে এসে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার বাস্তববাদী কৌশল গ্রহণের কথা বলেছেন।
৮. মানুষ স্বার্থের ভিত্তিতে আনুগত্য প্রকাশ করে
ম্যাকিয়াভেলির মতে, মানুষের আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রেই স্বার্থ, সুবিধা ও নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল। শাসক যদি জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হন, তবে তাঁর প্রতি সমর্থন কমে যেতে পারে। তাই শাসকের উচিত নিজের ক্ষমতা সুসংহত করার পাশাপাশি জনগণের অসন্তোষের কারণগুলোও বিবেচনা করা।
৯. মানুষকে বাস্তবতার আলোকে বিচার করতে হবে
ম্যাকিয়াভেলি মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে কোনো কল্পনাপ্রসূত বা অতিরিক্ত আদর্শবাদী ধারণা গ্রহণ করেননি। তিনি মানুষ যেমন,
তাকে তেমনভাবেই বিচার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে,
রাজনীতির উদ্দেশ্য শুধু নৈতিক আদর্শ প্রচার করা নয়;
বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা,
নিরাপত্তা ও ক্ষমতা বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাকিয়াভেলির মানব প্রকৃতিবিষয়ক ধারণার মূল্যায়ন
ম্যাকিয়াভেলির মানব প্রকৃতিবিষয়ক ধারণা রাজনৈতিক বাস্তববাদ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর চিন্তার কয়েকটি ইতিবাচক দিক হলো—
- তিনি মানুষের স্বার্থপরতা, ক্ষমতালিপ্সা ও পরিবর্তনশীল আচরণের বাস্তব দিক তুলে ধরেছেন।
- রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সতর্কতা ও বাস্তব পরিস্থিতির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।
- শাসকের ক্ষমতা ও জনগণের আনুগত্যের সম্পর্ক বিশ্লেষণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন।
তবে তাঁর ধারণার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তিনি মানুষের স্বার্থপরতা ও নেতিবাচক প্রবণতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষের পরোপকারিতা, সহমর্মিতা, নৈতিকতা,
সহযোগিতা ও আত্মত্যাগের প্রবণতা তাঁর আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। এ ছাড়া সব মানুষকে একই ধরনের স্বার্থপর হিসেবে বিবেচনা করলে মানব প্রকৃতির বৈচিত্র্য যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়,
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা মূলত বাস্তববাদী ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতানির্ভর। তিনি মানুষকে স্বার্থপর,
অকৃতজ্ঞ, লোভী, ভীরু ও পরিবর্তনশীল হিসেবে দেখেছেন এবং মনে করেছেন,
একজন দক্ষ শাসককে মানুষের এই বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। তাঁর ধারণার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক বাস্তববাদ বিকাশে এর গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষকে আদর্শিক কল্পনার পরিবর্তে বাস্তব আচরণের ভিত্তিতে বিচার করাই ম্যাকিয়াভেলির মানব প্রকৃতিবিষয়ক চিন্তার মূল কথা।
ম্যাকিয়াভেলির (Niccolò Machiavelli) মানব প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা মূলত তাঁর বিখ্যাত
গ্রন্থ *দ্য প্রিন্স* (*The Prince*) এবং *ডিসকোর্সেস অন লিভি* (*Discourses on Livy*)-তে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি মানব প্রকৃতিকে
আদর্শবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বাস্তববাদী ও হতাশাবাদী (pessimistic) দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন।
### মূল ধারণাসমূহ
ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন, মানুষ স্বভাবতই **স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল, ভীরু এবং লোভী**। মানুষ নিজের স্বার্থ রক্ষায় সবসময় সচেষ্ট থাকে এবং পরিস্থিতি
অনুযায়ী সহজেই পক্ষ পরিবর্তন করে। তিনি লিখেছেন:
> মানুষ এতই সরল এবং বর্তমান প্রয়োজনের এতই অধীন
যে, যে কেউ প্রতারণা করতে চায়,
সে সহজেই এমন কাউকে পেয়ে
যায় যে নিজেকে প্রতারিত হতে দেয়।
তাঁর মতে, মানুষ ভালোবাসার চেয়ে **ভয়**কে বেশি
নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। কারণ ভালোবাসা মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে, কিন্তু ভয় শাসকের হাতে থাকে। তাই তিনি
বলেছেন—যদি ভালোবাসা ও ভয় দুটোই একসাথে রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে **ভয়কেই বেছে নেওয়া উচিত**।
### মানব প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য (ম্যাকিয়াভেলির
দৃষ্টিতে)
| বৈশিষ্ট্য | ব্যাখ্যা
|
|--------------------|--------------------------------------------------------------------------|
| স্বার্থপরতা | মানুষ নিজের লাভ ও ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
দেয়। |
| অকৃতজ্ঞতা | উপকার পাওয়ার পরও মানুষ সহজেই ভুলে যায়। |
| চঞ্চলতা | পরিস্থিতি বদলালে মানুষের আনুগত্যও বদলে
যায়। |
| ভীরুতা | মানুষ সাধারণত ঝুঁকি এড়াতে চায় এবং নিরাপত্তা
খোঁজে। |
| লোভ | সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি মানুষের অদম্য আকর্ষণ
থাকে। |
### রাজনৈতিক প্রভাব
ম্যাকিয়াভেলি এই মানব প্রকৃতির ধারণা থেকেই
তাঁর রাজনৈতিক উপদেশ দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, একজন শাসককে মানুষের এই স্বভাবকে মেনে নিয়েই
কাজ করতে হয়। নৈতিকতা বা ধর্মের আদর্শ দিয়ে নয়, বরং **প্রয়োজন ও বাস্তবতা** দিয়ে রাষ্ট্র
পরিচালনা করতে হয়। শাসকের উচিত প্রয়োজনে কঠোর, ছলনাময় ও নিষ্ঠুর হওয়া—যদি তা রাষ্ট্রের
স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন হয়।
তিনি “সিংহ ও শিয়ালের” উপমা ব্যবহার করে
বলেছেন—একজন শাসককে সিংহের মতো শক্তিশালী এবং শিয়ালের মতো চালাক হতে হয়। কারণ
মানুষের প্রকৃতি এমন যে, কেবল শক্তি বা
কেবল কূটনীতি কোনোটাই যথেষ্ট নয়।
### সংক্ষেপে মূল্যায়ন
ম্যাকিয়াভেলির মানব প্রকৃতি বিষয়ক ধারণা আধুনিক
রাজনৈতিক বাস্তববাদ (political realism)-এর ভিত্তি স্থাপন করেছে। তিনি মানুষকে “যেমন আছে তেমন” দেখেছেন, “যেমন হওয়া উচিত” তেমন নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি
অনেকের কাছে নৈতিকভাবে সমালোচিত হলেও, রাজনীতি ও ক্ষমতার বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে এটি এখনো অত্যন্ত প্রভাবশালী।
ইতালীয়
রেনেসাঁসের বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (Niccolò
Machiavelli) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য প্রিন্স'
(The Prince) এবং 'ডিসকোর্সেস'
(Discourses)-এ মানব প্রকৃতি সম্পর্কে একটি অত্যন্ত বাস্তববাদী,
মৌলিক ও চরম হতাশাবাদী (Pessimistic) ধারণা
প্রদান করেছেন।
মধ্যযুগীয়
নীতিশাস্ত্র ও ধর্মীয় চিন্তাভাবনা থেকে বের হয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে বাস্তবতার
মাটিতে দাঁড় করানোর জন্য তিনি মানবের বাস্তব মনস্তাত্ত্বিক আচরণকে ভিত্তি হিসেবে
গ্রহণ করেছিলেন।
নিচে
ম্যাকিয়াভেলির মানব প্রকৃতি সম্পর্কিত মূল ভাবনাসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. চরম
স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা
ম্যাকিয়াভেলির
মতে, মানুষ জন্মগতভাবেই চরম স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক
এবং নিজের স্বার্থ রক্ষায় সদা প্রস্তুত। মানুষ কেবল নিজের সুবিধা ও লাভ বোঝে।
তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ অবস্থায় মানুষ ভালোবাসার চেয়ে ভয়ের দ্বারা
বেশি চালিত হয়। কারণ ভালোবাসা একটি নৈতিক সম্পর্কের ওপর টিকে থাকে, যা
স্বার্থের দ্বন্দ্বে মানুষ সহজেই ভেঙে ফেলে; কিন্তু
শাস্তির ভয় মানুষকে বাধ্য করে রাখে।
ম্যাকিয়াভেলির
বিখ্যাত উক্তি:
"মানুষ কতটা
অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল, মিথ্যাবাদী,
প্রতারক, বিপদে ভীতু এবং লাভের আশায় লোভী—তা বলে শেষ করা যায়
না।"
২.
বস্তুবাদী ও সম্পদের প্রতি তীব্র মোহ
ম্যাকিয়াভেলি
মানব প্রকৃতির বস্তুগত দিকটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছেন। তিনি মনে করতেন,
মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতার সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটে তার সম্পত্তি ও ধনের
প্রতি মোহে। মানুষ সম্পত্তি হারানোর কষ্ট সহজে ভুলতে পারে না।
তিনি সতর্ক
করে শাসক বা রাজাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন:
"একজন শাসক
তার প্রজাদের জীবন কেড়ে নিলেও নিতে পারেন, কিন্তু
তাদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ মানুষ তার পিতার মৃত্যুর
শোক সহজে ভুলে গেলেও, পৈতৃক সম্পত্তি হারানোর শোক কখনো ভোলে না।"
৩. অসীম
আকাঙ্ক্ষা ও অসন্তোষ
ম্যাকিয়াভেলির
মতে, মানুষের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা অসীম, কিন্তু তা
পূরণের ক্ষমতা বা সম্পদ সীমিত। এই দুইয়ের পার্থক্যের কারণে মানুষ কখনোই পুরোপুরি
সন্তুষ্ট হতে পারে না। ফলে মানুষের মধ্যে সর্বদা অসন্তোষ, হিংসা,
প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। এক আকাঙ্ক্ষা
পূরণ হলে মানুষ অন্য আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছোটে।
৪.
সুযোগসন্ধানী ও পরিবর্তনশীল আচরণ (Inconstancy)
মানুষের
নীতিবোধ পরিবর্তনশীল ও স্থায়িত্বহীন। যখন
পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে এবং সুবিধা পাওয়ার আশা থাকে, তখন তারা
শাসকের প্রতি চরম আনুগত্য দেখায়। কিন্তু যখনই বিপদ আসে বা নিজস্ব স্বার্থ বিপন্ন
হয়, তারা মুহূর্তের মধ্যে রূপ বদলায় এবং শাসককে ত্যাগ করতে বা বিদ্রোহ করতে
দ্বিধা করে না।
৫.
অনুকরণপ্রিয়তা ও অন্ধ আবেগ
সাধারণ
মানুষ যুক্তি বা প্রজ্ঞার চেয়ে আবেগ ও বহিঃপ্রকাশ দ্বারা বেশি পরিচালিত হয়।
ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন, অধিকাংশ মানুষ বাহ্যিক চেহারা বা চাকচিক্য দেখে বিচার
করে, গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে চতুর ও বুদ্ধিমান শাসক খুব সহজেই মানুষকে
চালিত করতে পারেন।
রাজনীতির
ওপর এই ধারণার প্রভাব
মানব
প্রকৃতি সম্পর্কে এই বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করেই ম্যাকিয়াভেলি তাঁর রাষ্ট্র
পরিচালনা ও শাসননীতি গড়ে তুলেছেন:
- ভয় বনাম ভালোবাসা: একজন শাসকের জন্য একই সাথে ভালোবাসার পাত্র ও ভয়ের
পাত্র হওয়া সবচেয়ে ভালো। তবে দুটি একসাথে সম্ভব না হলে, 'ভালোবাসার পাত্র' হওয়ার
চেয়ে 'ভয়ের
পাত্র' হওয়া অনেক বেশি নিরাপদ।
- সিংহের শক্তি ও শেয়ালের চতুরতা: মানুষ যেহেতু চতুর ও বিশ্বাসঘাতক, তাই শাসককে প্রজাদের নিয়ন্ত্রণ করতে এবং শত্রুদের
দমন করতে সিংহের মতো শক্তিশালী এবং শেয়ালের মতো চতুর ও কৌশলী হতে হবে।
- রাজনীতি ও নৈতিকতার পৃথকীকরণ: মানুষের খামখেয়ালী ও স্বার্থপর প্রকৃতিকে কঠোর
হস্ত এবং রাষ্ট্রের আইন ও ক্ষমতার মাধ্যমে দমন করতে হয়। তাই রাষ্ট্র ও
ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নৈতিকতা বা ধর্মীয় নিয়ম কিছুটা লঙ্ঘন করা
হলেও তা গ্রহণযোগ্য।
উপসংহার
পরিশেষে বলা
যায়, ম্যাকিয়াভেলির মানব প্রকৃতির ধারণা কেবল একপেশে বা কেবল
নেতিবাচক নয়, বরং তা ছিল তৎকালীন ইতালির রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানুষের
রাজনৈতিক আচরণের একটি বাস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ। তিনি মানব প্রকৃতির শুভ দিক অপেক্ষা
অশুভ ও দুর্বল দিকগুলোর প্রতি বেশি আলোকপাত করেছেন, যাতে একজন
প্রজ্ঞাবান শাসক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা ও শৃঙ্খলা রক্ষা
করতে পারেন।
ইতালীয়
রাজনৈতিক চিন্তাবিদ নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (Niccolò Machiavelli) তাঁর
বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য প্রিন্স'
(The Prince)-এ মানব প্রকৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত বাস্তববাদী ও কিছুটা
নৈরাশ্যবাদী ধারণা পোষণ করেছেন। তিনি মানুষকে যেমনটি 'হওয়া উচিত'
সেভাবে না দেখে, মানুষ আসলে 'যেমন' সেভাবেই
বিশ্লেষণ করেছেন। [1,
2,
3]
ম্যাকিয়াভেলির
মতে মানব প্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. মানুষ
স্বভাবগতভাবেই স্বার্থপর ও লোভী
ম্যাকিয়াভেলির
মতে, মানুষ মূলত আত্মকেন্দ্রিক এবং স্বার্থপর। প্রতিটি মানুষ নিজের স্বার্থ ও
সুবিধা সবার আগে দেখে। মানুষ তার নিজের পরিবারের সদস্যদের চেয়েও সম্পত্তি বা
বস্তগত জিনিস বেশি ভালোবাসে। তিনি বলেছেন, মানুষ তার
পিতার মৃত্যুর কথা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু তার সম্পত্তি হারানোর কথা সহজে ভোলে
না। [1]
২. অকৃতজ্ঞ
ও চঞ্চলমনা
মানুষের
কৃতজ্ঞতাবোধ স্থায়ী নয়। সুযোগ পেলেই মানুষ উপকারকারীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে
দ্বিধা করে না। ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন, মানুষ খুব
চঞ্চল বা পরিবর্তনশীল; তারা একমুখী থাকে না এবং দ্রুতই পুরনো বিষয় বা নেতৃত্ব
ছেড়ে নতুন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয়। [1,
2, 3]
৩. কাপুরুষ
ও ভীরু
বিপদ বা
সংকটের সময় মানুষের আসল রূপ প্রকাশ পায়। ম্যাকিয়াভেলির মতে, সাধারণ
মানুষ সহজাতভাবেই ভীরু ও কাপুরুষ। নিজের জীবন ও স্বার্থ যখন সংকটে পড়ে, তখন সাধারণ
মানুষ যেকোনো নীতি বা আদর্শ বিসর্জন দিয়ে নিজের সুরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। [1,
2, 3]
৪. লোভ এবং
ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা অন্তহীন
মানুষের
উচ্চাশা ও লোভের কোনো শেষ নেই। মানুষ যা পায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকে না; সে আরও বেশি
পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে। এই অনন্ত লোভ ও ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণেই সমাজে সবসময়
দ্বন্দ্ব ও হানাহানি লেগেই থাকে। [1,
2]
৫.
ভালোবাসার চেয়ে ভয়ের প্রভাব বেশি
মানব
প্রকৃতির এই নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করেই ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্র
পরিচালনার কৌশল বাতলেছেন। তাঁর মতে, মানুষ ভালোবাসার চেয়ে ভয়কে বেশি মানে। মানুষ
যখন দেখে শাস্তির বা ক্ষতির ভয় আছে, তখন তারা অনুগত থাকে। তাই একজন শাসকের জন্য
প্রজাদের ভালোবাসা পাওয়ার চেয়ে তাদের মনে ভয় জাগিয়ে রাখা বেশি নিরাপদ ও কার্যকর।
[1,
2]
রাষ্ট্র
পরিচালনায় এর প্রভাব
ম্যাকিয়াভেলি
বিশ্বাস করতেন, যেহেতু মানব প্রকৃতি জন্মগতভাবেই দুষ্ট, অবিশ্বস্ত
এবং দুর্নীতিপরায়ণ, তাই একজন আদর্শ শাসককে কখনো অতিরিক্ত নৈতিকতা বা
আদর্শবাদী হওয়ার চেষ্টা করলে চলবে না। রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে এবং ক্ষমতা বজায়
রাখতে প্রয়োজন হলে শাসককে শঠতা, বলপ্রয়োগ এবং ছলের আশ্রয় নিতে হতে পারে। [1,
2]
No comments:
Post a Comment