### *জ্যাঁ জ্যাঁক রুশোর প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে ধারণা*
*জ্যাঁ জ্যাঁক রুশো (১৭১২-১৭৭৮)* - ফ্রান্সের
দার্শনিক। তার বিখ্যাত বই *"The Social Contract" (১৭৬২)*।
রুশোর বিখ্যাত উক্তি:
> "Man
is born free, and everywhere he is in chains."
> "মানুষ মুক্ত হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।"
এই শৃঙ্খল কোথা থেকে এলো, তা বুঝতে রুশো প্রকৃতির রাজ্যের গল্প বলেছেন।
রুশোর প্রকৃতির রাজ্য হবস ও লকের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
#### *১. রুশোর প্রকৃতির রাজ্য - স্বর্গরাজ্য*
হবস বলেন - প্রকৃতির রাজ্য ছিল যুদ্ধের রাজ্য,
নরক।
লক বলেন - প্রকৃতির রাজ্য শান্তির ছিল, তবে অসুবিধা ছিল।
*রুশো বলেন - প্রকৃতির রাজ্য ছিল স্বর্গ,
শান্তি ও সুখের রাজ্য।*
রুশোর মতে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ ছিল:
*১. সরল ও সুখী বর্বর (Noble Savage):*
মানুষ ছিল সহজ, সরল, প্রকৃতির সন্তান। হিংসা, লোভ, অহংকার ছিল না। বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতো,
ফলমূল খেতো, সুখে থাকতো।
*২. স্বনির্ভর ও স্বাধীন:*
কেউ কারো উপর নির্ভরশীল ছিল না। কারো কাছে মাথা
নত করতে হতো না। পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল।
*৩. আত্মপ্রেম ও দয়া - ২টি প্রবৃত্তি:*
রুশো বলেন, মানুষের মধ্যে ২টি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ছিল:
- *আত্মপ্রেম (Amour de soi):* নিজেকে ভালোবাসা, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা - এটি ভালো।
- *দয়া / করুণা (Pity):* অন্যের কষ্ট দেখে কষ্ট পাওয়া। প্রকৃতির রাজ্যে
মানুষ অন্যের কষ্ট দেখে সাহায্য করতো। তাই যুদ্ধ হতো না।
হবসের মানুষ ছিল হিংস্র নেকড়ে, রুশোর মানুষ ছিল দয়ালু হরিণ।
*৪. সাম্য ছিল, সম্পত্তি ছিল না:*
সবাই সমান ছিল। কেউ ধনী-গরিব ছিল না। কারণ
ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না।
#### *২. প্রকৃতির রাজ্য নষ্ট হলো কিভাবে? - ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্ম*
রুশোর মতে, মানবজাতির পতনের মূল কারণ - *ব্যক্তিগত
সম্পত্তি*।
তিনি বলেন:
> "প্রথম যে ব্যক্তি এক টুকরো জমি ঘিরে বলেছিল 'এটা আমার', এবং কিছু বোকা লোক তা বিশ্বাস করেছিল, সেই ব্যক্তিই নাগরিক সমাজের প্রকৃত
প্রতিষ্ঠাতা।"
কিভাবে পতন হলো - ৩টি ধাপে:
*ধাপ ১: ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবিষ্কার:*
একজন চালাক মানুষ জমি ঘিরে বললো - এটা আমার।
এখান থেকেই আমার-তোমার ধারণা এলো।
*ধাপ ২: অসমতার জন্ম:*
সম্পত্তি থেকে - ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক, প্রভু-দাস - বৈষম্য তৈরি হলো।
*ধাপ ৩: অহংকার ও লোভ (Amour propre):*
আগে মানুষ নিজেকে ভালোবাসতো (আত্মপ্রেম)। এখন
মানুষ অন্যের চেয়ে নিজেকে বড় দেখাতে চায়। আমার বাড়ি তোমার চেয়ে বড়, আমার টাকা তোমার চেয়ে বেশি - এই অহংকার থেকে
হিংসা, চুরি, যুদ্ধ শুরু হলো।
ফলে স্বর্গের প্রকৃতির রাজ্য নরকে পরিণত হলো।
মানুষের স্বাধীনতা হারালো, শৃঙ্খলিত হলো।
#### *৩. প্রকৃতির রাজ্য থেকে মুক্তির উপায় -
সামাজিক চুক্তি*
এই নরক থেকে বাঁচতে মানুষ আবার চুক্তি করলো।
কিন্তু রুশোর চুক্তি হবস-লকের মতো নয়।
- *হবসের চুক্তি:* সব অধিকার রাজাকে দিয়ে দাও।
- *লকের চুক্তি:* কিছু অধিকার সরকারকে দাও।
- *রুশোর চুক্তি:* কাউকে অধিকার দিও না, সবাই সবার কাছে সব অধিকার সমর্পণ করো, তৈরি হবে *সাধারণ ইচ্ছা (General Will)*।
*সাধারণ ইচ্ছা কি?* সবাই মিলে সবার ভালোর জন্য যে ইচ্ছা - সেটাই
সাধারণ ইচ্ছা। এটি সবসময় সঠিক ও জনকল্যাণমুখী। এই সাধারণ ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ
করলে মানুষ আবার স্বাধীন হবে। কারণ সাধারণ ইচ্ছা মানে তো নিজেরই ইচ্ছা।
#### *৪. হবস, লক, রুশোর প্রকৃতির রাজ্যের তুলনা - পরীক্ষায় ১০০% আসে*
এই ছকটি মুখস্থ রাখো, ১০ নম্বর নিশ্চিত:
বিষয় | হবস | লক | রুশো
**প্রকৃতির রাজ্য কেমন ছিল?** | যুদ্ধের রাজ্য, নরক। জীবন ছিল - নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, পাশবিক ও ক্ষণস্থায়ী | শান্তির রাজ্য, তবে নিরাপত্তাহীন। প্রাকৃতিক আইন ছিল | স্বর্গরাজ্য, সুখের রাজ্য। মানুষ ছিল Noble Savage
**মানব প্রকৃতি** | স্বার্থপর, হিংস্র, নেকড়ে | বিবেকবান, সহযোগী | সরল, দয়ালু, সুখী বর্বর
**সম্পত্তি ছিল?** | ছিল না, সবাই সবকিছুর জন্য যুদ্ধ করতো | ছিল, কিন্তু নিরাপদ ছিল না | ছিলই না, সম্পত্তিই সব নষ্টের মূল
**চুক্তির ফল** | লেভিয়াথান / চরম রাজা | সীমিত সরকার | সাধারণ ইচ্ছা / প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র
**স্লোগান** | নিরাপত্তা দাও, স্বাধীনতা নাও | জীবন, স্বাধীনতা, সম্পত্তি রক্ষা
করো | মানুষ মুক্ত হয়ে জন্মায়,
কিন্তু সর্বত্র শৃঙ্খলিত
#### *৫. সমালোচনা*
১.
*কল্পনাপ্রসূত:* ইতিহাসে এমন সুখী প্রকৃতির রাজ্য কখনো ছিল না। নৃতত্ত্ব
বলে, আদিম মানুষের জীবনও কঠিন
ছিল।
2. *সম্পত্তিই সব
নষ্টের মূল - এটি ভুল:* সম্পত্তি সভ্যতার ভিত্তি। সম্পত্তি ছাড়া বিজ্ঞান, শিল্পকলা হতো না।
3. *সাধারণ ইচ্ছা
বিপজ্জনক:* সাধারণ ইচ্ছার নামে সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘুকে দমন করতে পারে। হিটলারও
বলেছিল - আমি জার্মান জাতির সাধারণ ইচ্ছা। রুশোর তত্ত্ব থেকে স্বৈরাচারের জন্ম হতে
পারে।
#### *৬. তবুও কেন রুশো গুরুত্বপূর্ণ?*
১.
ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) মূল মন্ত্র - *স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব* - রুশোর বই থেকেই এসেছে।
2. প্রত্যক্ষ
গণতন্ত্র, গণভোট (Referendum)
- রুশোর সাধারণ ইচ্ছার
ধারণা থেকেই এসেছে।
3. তিনি প্রথম
বৈষম্যের বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছেন। আজকের সমাজতন্ত্রের বীজ রুশোর হাতেই বোনা।
*পরীক্ষায় শেষ করার জন্য এক লাইনে:*
> "হবসের মানুষ ছিল নেকড়ে, লকের মানুষ ছিল ভদ্রলোক, আর রুশোর মানুষ ছিল সরল শিশু - যে ব্যক্তিগত
সম্পত্তির কারণে শয়তান হয়ে গেছে, এবং সাধারণ
ইচ্ছার মাধ্যমে আবার মানুষ হতে চায়।"
জ্যাঁ-জ্যাক
রুশোর প্রকৃতির রাজ্য হলো একটি
কাল্পনিক অবস্থা, যেখানে মানুষ সমাজ, রাষ্ট্র,
আইন ও সম্পত্তির বাইরে স্বাধীন, সমান ও স্বাভাবিকভাবে সৎ ছিল। তাঁর মতে,
মানুষ স্বভাবগতভাবে ভালো; কিন্তু সভ্যতা, সম্পত্তি ও
অসম সামাজিক ব্যবস্থা তাকে দুর্নীতিগ্রস্ত করেছে।[plato.stanford][bn.wikipedia]
প্রকৃতির
রাজ্যের ধারণা
রুশোর Discourse on the Origin of Inequality (১৭৫৪)-এ
প্রকৃতির রাজ্যের বিবরণ পাওয়া যায়। তাঁর মতে, এটি কোনো
নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুগ নয়; বরং মানুষের প্রাকৃতিক প্রকৃতি ও সমাজের প্রভাব বোঝার
জন্য ব্যবহৃত একটি তাত্ত্বিক
অনুমান।[bibortonpoth][encyclopedia]
প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষ ছিল একাকী, সরল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার চাহিদা ছিল সীমিত—খাদ্য,
আশ্রয় ও আত্মরক্ষা—এবং প্রকৃতি সেই চাহিদা পূরণের যথেষ্ট সুযোগ দিত। ফলে
তার মধ্যে অতিরিক্ত লোভ, প্রতিযোগিতা বা ক্ষমতার লোভ ছিল না।[encyclopedia][tfreeman]
প্রাকৃতিক
মানুষের বৈশিষ্ট্য
রুশোর মতে
প্রাকৃতিক মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- স্বাধীনতা: তিনি কোনো শাসক, আইন বা
সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অধীন ছিলেন না।[philarchive][dgilesphd.substack]
- সমতা: সম্পত্তি, মর্যাদা
ও ক্ষমতার পার্থক্য ছিল না বললেই চলে; তাই
সামাজিক শ্রেণিভেদও ছিল না।[bn.wikipedia][philarchive]
- প্রাকৃতিক সদ্ভাব: তিনি স্বাভাবিকভাবে অন্যের কষ্ট দেখলে করুণাবোধ
অনুভব করতেন; এটিই রুশোর “প্রাকৃতিক সহানুভূতি” বা pity-র ধারণা।[encyclopedia][en.wikipedia]
- নৈতিক নিরপেক্ষতা: প্রাকৃতিক মানুষ ভালো-মন্দের সম্পূর্ণ সচেতন ছিল না;
তিনি নৈতিকভাবে অপরাধী ছিলেন না, তবে সচেতনভাবে পুণ্যবানও ছিলেন না।[plato.stanford][iep.utm]
- সন্তোষ ও সুখ: সীমিত চাহিদা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যের কারণে
তিনি তুলনামূলকভাবে সন্তুষ্ট ছিলেন।[bn.wikipedia][encyclopedia]
হবস ও লকের
সঙ্গে পার্থক্য
রুশোর
প্রকৃতির রাজ্য হবস ও লকের ধারণা থেকে ভিন্ন। হবসের মতে প্রকৃতির রাজ্য ছিল “সবার
বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ”; কিন্তু রুশোর মতে সেখানে মানুষ শান্তিপ্রিয়, স্বাধীন ও
সহানুভূতিশীল ছিল।[courses.lumenlearning][fulkibaz]
লক
প্রাকৃতিক মানুষকে যুক্তিবাদী ও সম্পত্তির অধিকারসম্পন্ন মনে করেন; রুশোর
প্রাকৃতিক মানুষ তুলনামূলকভাবে সরল, সীমিত চাহিদাসম্পন্ন এবং সম্পত্তির ধারণা
থেকে মুক্ত ছিলেন।[encyclopedia][tfreeman]
সভ্যতা ও
অসমতার উদ্ভব
রুশোর মূল
যুক্তি হলো, মানুষের অধঃপতনের কারণ প্রকৃতি নয়, বরং সমাজ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি,
সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানা, বিভাজন ও প্রতিযোগিতার ফলে মানুষ পরস্পরের
সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে।[encyclopedia][ebsco]
তিনি
বিখ্যাতভাবে বলেন, প্রথম ব্যক্তি যিনি জমিতে বেড়া দিয়ে বললেন “এটি আমার”
এবং অন্যরা তা বিশ্বাস করল, সভ্য সমাজের অন্যায়ের সূচনা হলো। সম্পত্তির বৈষম্য
থেকেই ধনী-দরিদ্র, শাসক-শাসিত ও শোষক-শোষিত সম্পর্কের জন্ম হয়।[encyclopedia][ebsco]
রাজনৈতিক
তাৎপর্য
রুশোর
প্রকৃতির রাজ্য তত্ত্ব তাঁর সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের ভিত্তি। যেহেতু সম্পত্তি ও
সামাজিক অসমতা মানুষের প্রাকৃতিক স্বাধীনতা নষ্ট করেছে, তাই একটি
ন্যায্য রাষ্ট্র গঠনের জন্য জনগণকে নতুন চুক্তির মাধ্যমে সাধারণ
ইচ্ছা বা general will-এর অধীনে
একত্রিত হতে হবে।[dgilesphd.substack][ebsco]
এই নতুন
চুক্তিতে ব্যক্তি প্রাকৃতিক স্বাধীনতা ত্যাগ করে সমষ্টিগত সার্বভৌমত্বের অংশ হয়,
কিন্তু বিনিময়ে তিনি নাগরিক
স্বাধীনতা, নৈতিক স্বাধীনতা ও সমান রাজনৈতিক অধিকার লাভ করেন।[dgilesphd.substack][lah.elearningontario]
মূল্যায়ন
রুশোর
প্রকৃতির রাজ্য তত্ত্ব মানবিক স্বাধীনতা, সাম্য ও
সামাজিক অসমতার সমালোচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী। এটি ফরাসি বিপ্লব, আধুনিক
গণতন্ত্র, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তাকে প্রভাবিত
করেছে।[bn.wikipedia][ebsco]
তবে
সমালোচকরা বলেন, রুশোর বিবরণ ঐতিহাসিকভাবে যথেষ্ট প্রমাণিত নয় এবং
প্রাকৃতিক মানুষকে অতিরিক্ত আদর্শায়িত করা হয়েছে। তবু তাঁর মূল অবদান হলো—তিনি
দেখিয়েছেন যে সামাজিক অসমতা স্বাভাবিক নয়; এটি
নির্দিষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সৃষ্টি।[plato.stanford][encyclopedia]
সংক্ষেপে,
রুশোর প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ ছিল স্বাধীন, সমান ও
সহজাতভাবে সৎ; কিন্তু সম্পত্তি ও সভ্য সমাজ তাকে অসমতা, লোভ ও
দাসত্বের দিকে নিয়ে গেছে।[plato.stanford][ebsco]
জ্যাঁ-জ্যাক
রুশোর প্রকৃতির রাজ্য (প্রাকৃতিক অবস্থা) ধারণা
ভূমিকা
জ্যাঁ-জ্যাক
রুশো (১৭১২–১৭৭৮) জেনেভায় জন্মগ্রহণকারী ফরাসি ভাষার দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ,
যিনি আলোকায়ন যুগের অন্যতম প্রভাবশালী কিন্তু সবচেয়ে বিতর্কিত চিন্তাবিদ।
সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের তিন প্রধান প্রবক্তার মধ্যে হবস ও লকের পর রুশো তৃতীয়
এবং সবচেয়ে মৌলিক। তাঁর অসমতার
উৎপত্তি ও ভিত্তি সম্পর্কিত বক্তৃতা (১৭৫৫) এবং সামাজিক চুক্তি (১৭৬২)
গ্রন্থে প্রকৃতির রাজ্যের ধারণাটি বিস্তারিতভাবে এসেছে। রুশোর বিশেষত্ব হলো,
তিনি প্রাকৃতিক অবস্থাকে সভ্যতার সমালোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার
করেছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, অথচ সর্বত্র
সে শৃঙ্খলিত।
পদ্ধতিগত
প্রসঙ্গ: কাল্পনিক অনুমান
রুশো স্পষ্ট
করেছেন যে প্রকৃতির রাজ্য কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ নয়। এটি এমন এক অবস্থার
যুক্তিনির্ভর অনুমান, যা হয়তো কখনো ছিল না, হয়তো কখনো
থাকবেও না, কিন্তু বর্তমান সমাজ ও মানুষকে সঠিকভাবে বিচার করতে এই
অবস্থা সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ সমাজের আবরণ সরিয়ে মানুষের মূল
স্বভাব কী, তা বোঝাই এর উদ্দেশ্য।
প্রকৃতির
রাজ্যের বৈশিষ্ট্য
১. আদিম
মানুষের জীবনযাত্রা। রুশোর
কল্পিত আদিম মানুষ বিচ্ছিন্ন, স্বনির্ভর ও বনে বিচরণশীল। সে সহজ প্রয়োজন মেটায় ফলমূল,
শিকার ও প্রকৃতির দানে, এবং তার চাহিদা সীমিত। ফলে অভাব বা প্রতিযোগিতা প্রায়
নেই। সে শারীরিকভাবে সবল ও সুস্থ, কারণ কৃত্রিম বিলাসিতা ও রোগ-ব্যাধি তার
জীবনে অনুপস্থিত। তার জীবন সরল, শান্ত ও সন্তুষ্ট।
২. দুটি
সহজাত প্রবৃত্তি। রুশো
মানুষের মধ্যে দুটি আদি নীতি দেখেন:
- আত্মপ্রেম (amour de soi): নিজের টিকে থাকা ও কল্যাণের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।
এটি স্বার্থপরতা নয়, বরং আত্মরক্ষার সহজ তাগিদ।
- করুণা (pitié): অন্যের
কষ্ট দেখে স্বাভাবিক অস্বস্তি ও সহানুভূতি। এটি এমন এক সহজাত অনুভূতি যা
অকারণ নিষ্ঠুরতা থেকে মানুষকে বিরত রাখে।
৩. যুক্তি ও
নৈতিকতার অনুপস্থিতি। প্রাকৃতিক
মানুষ নৈতিকভাবে ভালোও নয়, মন্দও নয়, কারণ ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা তখনও গড়ে
ওঠেনি। সে "মহৎ বর্বর" (noble savage) নামে পরিচিত,
যদিও এই শব্দবন্ধটি রুশো নিজে ব্যবহার করেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, মানুষ
স্বভাবে মন্দ নয়, সমাজই তাকে নষ্ট করে।
৪.
স্বাধীনতা ও আপেক্ষিক সাম্য। এই অবস্থায়
মানুষ কারও অধীন নয়, কারণ নির্ভরতার সম্পর্কই তখন নেই। যেসব বৈষম্য ছিল,
তা কেবল শারীরিক, যেমন বয়স বা শক্তির পার্থক্য। সামাজিক বা রাজনৈতিক
অসমতা তখন অজানা।
৫.
আত্মোন্নতির সামর্থ্য। রুশো
মানুষের একটি বিশেষ গুণ চিহ্নিত করেন: নিজেকে উন্নত করার ক্ষমতা (perfectibility)। এই ক্ষমতাই
মানুষকে ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে বের করে এনেছে, কিন্তু একই
ক্ষমতা তার অবনতিরও কারণ হয়েছে।
প্রকৃতির
রাজ্যের পতন: সভ্যতার অগ্রগতি ও অধঃপতন
রুশো দেখান,
কীভাবে মানুষ ধাপে ধাপে এই সুখী অবস্থা থেকে সরে এসেছে।
- জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চাপে মানুষ
একত্রে বাস করতে ও সহযোগিতা করতে শেখে। গড়ে ওঠে পরিবার, ভাষা ও ছোট সমাজ।
- এই পর্যায়ে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে নিজেকে তুলনা
করতে শুরু করে। এখান থেকে জন্ম নেয় আত্মগরিমা (amour-propre), অর্থাৎ অন্যের চোখে মর্যাদা ও সম্মান পাওয়ার
আকাঙ্ক্ষা। এটি ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা ও অহংকারের উৎস।
- কৃষি ও ধাতুবিদ্যার উদ্ভবে শ্রমবিভাজন শুরু হয়।
জমি ও সম্পত্তির ধারণা আসে।
রুশোর অমর
বাক্য: যে ব্যক্তি প্রথম একটি জমির টুকরো ঘিরে বলল "এটি আমার" এবং
লোকজনকে তা বিশ্বাস করানোর মতো সরল পেল, সে-ই ছিল
সভ্য সমাজের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। এখান থেকেই ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য জন্ম নেয়।
- বৈষম্য ও সম্পত্তি নিয়ে সংঘাত এমন এক যুদ্ধাবস্থা
তৈরি করে, যা প্রকৃতির আদি অবস্থা নয়, বরং সমাজের সৃষ্ট অবস্থা। ধনীরা তখন ছলনার আশ্রয়
নেয়: সবাইকে নিরাপত্তার নামে আইন ও সরকারের অধীনে আসার প্রস্তাব দেয়।
দরিদ্ররা তা মেনে নেয়, কিন্তু বাস্তবে এই আইন ধনীর সম্পত্তি রক্ষা করে এবং
বৈষম্যকে স্থায়ী রূপ দেয়।
ফলে রুশোর
মতে প্রচলিত সমাজ ও সরকার ন্যায়ের ভিত্তিতে নয়, বরং
প্রতারণা ও বৈষম্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
হবস ও লকের
সঙ্গে তুলনা
|
বিষয় |
হবস |
লক |
রুশো |
|
প্রাকৃতিক
অবস্থা |
সকলের
বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ |
শান্তিপূর্ণ,
তবে অনিরাপদ |
সরল,
শান্ত ও সুখী |
|
মানব
প্রকৃতি |
স্বার্থপর,
ভীত |
যুক্তিবাদী |
সহজাতভাবে
ভালো (করুণাময়) |
|
মূল
সমস্যা |
নিরাপত্তার
অভাব |
নিরপেক্ষ
বিচারকের অভাব |
সমাজই
সমস্যার উৎস |
|
সমাজের
ভূমিকা |
মুক্তিদাতা |
অধিকার
রক্ষক |
অধঃপতনের
কারণ |
রুশোর
সমালোচনা ছিল, হবস সভ্য সমাজের মানুষকে প্রাকৃতিক মানুষ বলে ভুল
করেছেন। অর্থাৎ যে লোভ, প্রতিযোগিতা ও হিংসা হবস মানুষের স্বভাব বলে দেখেছেন,
তা প্রকৃতপক্ষে সমাজেরই সৃষ্টি।
প্রকৃতির
রাজ্য থেকে সামাজিক চুক্তি
রুশো জানতেন,
আদি অবস্থায় ফেরা সম্ভব নয়। তাই তিনি সামাজিক
চুক্তি-তে এমন এক বৈধ রাজনৈতিক ব্যবস্থার রূপরেখা দেন, যেখানে
মানুষ সমাজে বাস করেও স্বাধীন থাকতে পারে। এর সমাধান সাধারণ
ইচ্ছা (general will): প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমষ্টির কাছে
সমর্পণ করে, কিন্তু যেহেতু সবাই একই কাজ করে, প্রকৃতপক্ষে
সে কারও অধীন হয় না, বরং নিজেরই তৈরি আইন মেনে চলে। রুশো একে "নাগরিক
স্বাধীনতা" ও "নৈতিক স্বাধীনতা" বলেন, যা
প্রাকৃতিক স্বাধীনতার বিকল্প। তাঁর কথায়, আইনের প্রতি
আনুগত্যই স্বাধীনতা, যদি সেই আইন নিজেদের সাধারণ ইচ্ছার প্রকাশ হয়।
সমালোচনা
প্রথমত,
রুশোর প্রাকৃতিক অবস্থা কাল্পনিক, এর কোনো
ঐতিহাসিক বা নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। আধুনিক নৃবিজ্ঞান দেখায় আদিম মানুষ ছিল
দলবদ্ধ ও সামাজিক, নিঃসঙ্গ নয়। দ্বিতীয়ত, তিনি
মানুষের সহজাত ভালোত্ব ও সমাজের মন্দ প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করেছেন, ফলে সভ্যতার
অর্জন, যেমন জ্ঞান, বিজ্ঞান ও নৈতিকতার বিকাশ, তাঁর
বিশ্লেষণে অবমূল্যায়িত। তৃতীয়ত, ভলতেয়ার তাঁকে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, তাঁর লেখা
পড়ে চার পায়ে হাঁটতে ইচ্ছে করে। যদিও এটি ব্যঙ্গাত্মক অতিরঞ্জন, তবু এতে
প্রকাশ পায় যে রুশো সভ্যতাকে প্রত্যাখ্যান করছেন, এমন ধারণা
অনেকেই পেয়েছিলেন। রুশো নিজে অবশ্য আদিম জীবনে ফেরার কথা বলেননি। চতুর্থত,
তাঁর সাধারণ ইচ্ছার ধারণা ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে,
কারণ "মানুষকে স্বাধীন হতে বাধ্য করা"-র মতো বক্তব্যকে কেউ কেউ
সর্বগ্রাসী শাসনের ভিত্তি বলে সমালোচনা করেছেন।
প্রভাব
তবে রুশোর
প্রভাব অপরিসীম। তাঁর ধারণা ফরাসি বিপ্লবের নেতাদের, বিশেষত
জ্যাকোবিনদের, গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাম্য ও
গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ধারণা আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি। তাঁর সামাজিক বৈষম্যের
সমালোচনা পরবর্তীকালে মার্ক্সসহ সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করেছে।
রোমান্টিক আন্দোলন, প্রকৃতিবাদ এবং আধুনিক শিক্ষাতত্ত্ব, বিশেষত তাঁর এমিল (১৭৬২), রুশোর কাছে
ঋণী।
উপসংহার
রুশোর
প্রকৃতির রাজ্য একটি কাল্পনিক কিন্তু দার্শনিকভাবে শক্তিশালী ধারণা। এতে মানুষ সরল,
স্বাধীন, করুণাময় ও সন্তুষ্ট, আর সভ্যতা,
সম্পত্তি ও বৈষম্যের উদ্ভবই তাকে নৈতিকভাবে অধঃপতিত করেছে। হবসের মতো তিনি
মানুষকে স্বভাবে হিংস্র মনে করেননি, বরং সমাজের কাঠামোগত অন্যায়কে দায়ী করেছেন।
যদিও তাঁর বিশ্লেষণ ঐতিহাসিকভাবে অসম্পূর্ণ ও কিছুটা আবেগনির্ভর, তবুও
সম্পত্তি, বৈষম্য ও স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে তাঁর প্রশ্ন আজও
প্রাসঙ্গিক। প্রকৃতির রাজ্যের মাধ্যমে রুশো আমাদের মনে করিয়ে দেন, প্রচলিত
সমাজব্যবস্থাই চূড়ান্ত নয়, তাকে প্রশ্ন করা ও আরও ন্যায়সংগত করে গড়ে তোলা সম্ভব।
জ্যাঁ জ্যাঁক রুশোর "প্রকৃতির রাজ্য"
(State of Nature) ধারণা তার
রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি, যা মূলত **"Discourse
on the Origin of Inequality"** (১৭৫৫) এবং
পরবর্তীতে **"The Social Contract"** (১৭৬২)-এ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত। রুশোর
প্রকৃতির রাজ্য কোনো ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি **"সত্য কল্পনা" (true
fiction)** বা **অনুমানভিত্তিক (conjectural)**
অবস্থা, যা বর্তমান সমাজের কৃত্রিমতা ও বৈষম্যকে তুলে
ধরার জন্য একটি বিশ্লেষণী মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে।
### 🏛️
প্রকৃতির রাজ্যের
প্রকৃতি: কেন এটি "কল্পনা"?
রুশো স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন যে তার বর্ণিত
প্রকৃতির রাজ্য **অতীতে কখনো বাস্তবে বিদ্যমান ছিল না**; ভবিষ্যতেও তা ফিরে আসার আদর্শ নয়। এর উদ্দেশ্য
হলো মানব প্রকৃতির মূল উপাদানগুলোকে পৃথক করে দেখানো—কী natürally (স্বাভাবিক) এবং কী কৃত্রিম (artificial)
বা প্রথাগত (conventional)। তিনি তার আলোচনাকে **"অনুমানভিত্তিক"** বলে অভিহিত করেন, কারণ এই "বিশুদ্ধ প্রকৃতির রাজ্য" (pure
state of nature) বর্তমানে নেই,
সম্ভবত অতীতেও ছিল না,
তবুও মানব প্রকৃতি বুঝতে
এর একটি স্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন।
### 🕊️
মানব প্রকৃতি:
স্বার্থপ্রেম (Amour de Soi) ও সহানুভূতি (Pitié)
রুশোর মতে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষকে চালিত করে দুটি মৌলিক
মনস্তাত্ত্বিক নীতি:
1. **স্বার্থপ্রেম (Amour
de soi):** এটি নিজের কল্যাণ ও
আত্মসংরক্ষণের প্রতি একটি স্বাভাবিক, নিষ্কলুষ আগ্রহ। এটি স্বার্থপরতা (amour-propre) নয়; বরং এটি একটি ইতিবাচক প্রবৃত্তি, যা মানুষকে নিজের প্রয়োজন মেটাতে উদ্বুদ্ধ করে।
2. **সহানুভূতি (Pitié):**
এটি অন্য কোনো সংবেদনশীল
প্রাণীর (বিশেষত নিজের মতো প্রাণীর) দুঃখ-কষ্ট দেখে স্বাভাবিক বিরূপতা বা ঘৃণা। এই
সহানুভূতিই প্রকৃতির মানুষকে অপ্রয়োজনীয় হিংসা থেকে বিরত রাখে।
এই দুটি নীতির কারণে রুশো মনে করতেন প্রকৃতির
রাজ্যের মানুষ **"স্বভাবতই শান্তিপ্রিয়" (naturally
peaceable)** । তিনি হবসের এই ধারণাকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান
করেন যে মানুষ স্বভাবতই যুদ্ধপ্রবণ বা আক্রমণাত্মক। হবসের "সবার বিরুদ্ধে
সবার যুদ্ধ" অবস্থার আগে রুশো একটি **"বিশুদ্ধ" প্রকৃতির রাজ্যের**
কল্পনা করেন, যেখানে `amour
de soi` এখনো `amour-propre`-এ পরিণত হয়নি।
### ⚖️
ভারসাম্য ও
স্বয়ংসম্পূর্ণতা
প্রকৃতির রাজ্যের মূল বৈশিষ্ট্য হলো **চাহিদা,
ক্ষমতা ও সম্পদের মধ্যে
ভারসাম্য**। এখানে প্রত্যেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ (self-sufficient); যতক্ষণ এই ভারসাম্য বজায় থাকে, ততক্ষণ কেউ নিজের অবস্থা পরিবর্তনের তাড়না বোধ
করে না। এমনকি হবসের মতো "সবকিছুর প্রতি প্রাকৃতিক অধিকার" থাকলেও,
এই ভারসাম্যের কারণে তা
যুদ্ধে পরিণত হয় না। এই ভারসাম্য রক্ষা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াতেই কাজ করে
**"পারফেক্টিবিলিটি" (Perfectibility)**—যা রুশোর মতে মানব প্রজাতির специфический
বৈশিষ্ট্য।
### 🔄
প্রকৃতির রাজ্য থেকে
সমাজে উত্তরণ
রুশো প্রশ্ন তোলেন: প্রকৃতির রাজ্য যদি
শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়, তাহলে মানুষ তা
ছেড়ে বেরিয়ে এল কেন? তার উত্তর
হলো—**পরিবেশগত পরিবর্তন**, যেমন বন্যা,
ভূমিকম্প বা অন্যান্য
প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যা বিচ্ছিন্ন
ব্যক্তিদের কাছাকাছি আসতে বাধ্য করে। এই নৈকট্য থেকেই প্রথম সমাজ গঠনের সূত্রপাত
ঘটে, এবং ক্রমে সম্পত্তির
ধারণা, শ্রম বিভাজন ও তুলনা জন্ম
নেয়।
রুশো প্রকৃতির রাজ্যকে **তিনটি ধাপে** বিভক্ত
করেন, যা "বিপ্লব" (revolutions)
দ্বারা পৃথক। প্রথম ধাপ
হলো বিশুদ্ধ প্রকৃতির রাজ্য; দ্বিতীয় ধাপে
অধিকাংশ পরিচিত "বর্বর" জাতি অবস্থান করে; তৃতীয় ধাপে সমাজ ও বৈষম্যের বিকাশ ঘটে। এই
উত্তরণের সাথে সাথেই **`amour de soi` (স্বাস্থ্যকর আত্মপ্রেম) `amour-propre` (তুলনামূলক ও প্রতিযোগিতামূলক অহং)-এ
রূপান্তরিত** হয়, যা বৈষম্য,
হিংসা ও সামাজিক
অসন্তোষের মূল উৎস হয়ে ওঠে।
### 💎
উপসংহার: প্রকৃতির
রাজ্যের তাৎপর্য
রুশোর প্রকৃতির রাজ্য কোনো "সোনালি যুগে
ফিরে যাওয়ার" আহ্বান নয়; বরং এটি একটি
**সমালোচনামূলক হাতিয়ার**। এর মাধ্যমে তিনি দেখান যে বর্তমান সমাজের বৈষম্য,
শোষণ ও অস্বাধীনতা কোনো
"স্বাভাবিক" বা "ঐশ্বরিক" ব্যবস্থা নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে সৃষ্ট ও কৃত্রিম। প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষ স্বাধীন ও সুখী ছিল বলে তিনি দাবি করেন না; বরং সেখানে মানুষ ছিল **স্বয়ংসম্পূর্ণ,
প্রায় নিষ্কলুষ এবং
বর্তমানের তুলনায় কম দুঃখী**। রুশোর মতে, প্রকৃতির রাজ্যের এই ধারণাটিই আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে সমাজে বৈষম্য ও
অস্বাধীনতা কেন এবং কীভাবে জন্ম নিল—এবং তা থেকে মুক্তির পথ কী হতে পারে।
জ্যাঁ জ্যাক রুশোর প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে আলোচনা কর
ভূমিকা
জ্যাঁ জ্যাক রুশো
(Jean-Jacques Rousseau) ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক,
রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও সমাজচুক্তি মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature)। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Discourse on the Origin and Basis of
Inequality Among Men (১৭৫৫) এবং
The Social Contract (১৭৬২)-এ মানব প্রকৃতি, প্রাকৃতিক স্বাধীনতা,
বৈষম্য ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। রুশোর মতে, মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সরল, স্বাধীন ও শান্তিপ্রিয় ছিল;
কিন্তু সমাজের বিকাশ,
ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও সামাজিক বৈষম্যের ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবন পরিবর্তিত হয়।
প্রকৃতির রাজ্যের অর্থ
প্রকৃতির রাজ্য বলতে এমন একটি কাল্পনিক প্রাক্-রাষ্ট্রীয় অবস্থাকে বোঝায়,
যেখানে কোনো সুসংগঠিত সরকার, রাষ্ট্রীয় আইন বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রুশো এই অবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বে মানুষের স্বভাব এবং জীবনযাত্রা কেমন ছিল, তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
রুশোর প্রকৃতির রাজ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সরল ও স্বাধীন
রুশোর মতে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ ছিল স্বাভাবিক, সরল ও স্বাধীন। সে অন্যের অধীন ছিল না এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাপন করত। সামাজিক মর্যাদা,
কৃত্রিম প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রভাব তখনও মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
রুশোর মতে, মানুষ জন্মগতভাবে দুষ্ট নয়;
বরং সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কৃত্রিম বৈষম্য মানুষের মধ্যে অনেক নেতিবাচক প্রবণতা সৃষ্টি করে।
২. মানুষ স্বভাবতই শান্তিপ্রিয়
রুশো মনে করেন,
প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ মূলত নিজের জীবনধারণের প্রয়োজন মেটাতে ব্যস্ত ছিল। তার চাহিদা ছিল সীমিত এবং অন্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষে জড়ানোর প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
এ কারণে তিনি হবসের ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। হবস প্রকৃতির রাজ্যকে সংঘাতপূর্ণ ও অনিরাপদ হিসেবে বর্ণনা করলেও রুশো মনে করেন,
প্রকৃতির রাজ্যের মানুষকে স্বভাবগতভাবে হিংস্র বা যুদ্ধপ্রিয় হিসেবে বিবেচনা করা যথার্থ নয়।
৩. মানুষের চাহিদা ছিল সীমিত
রুশোর মতে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের চাহিদা ছিল অল্প। খাদ্য, আশ্রয় ও আত্মরক্ষার মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।
সমাজের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিলাসিতা, সম্পদ, সম্মান ও সামাজিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। এসব অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা,
ঈর্ষা ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।
৪. মানুষ ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ
প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য অন্যের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল ছিল না। সে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জীবনধারণ করত এবং সামাজিক সহযোগিতার জটিল ব্যবস্থার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না।
রুশোর মতে, সভ্য সমাজে মানুষ ক্রমশ অন্যের শ্রম,
সম্পদ ও স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতা সামাজিক বৈষম্য ও অধীনতার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
৫. আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি ও সহমর্মিতা
রুশো মানুষের প্রকৃতিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতার কথা উল্লেখ করেন।
- আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি (Amour de soi): নিজের জীবন ও অস্তিত্ব রক্ষা করার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা।
- সহমর্মিতা বা করুণাবোধ (Pitié): অন্যের কষ্ট দেখে স্বাভাবিকভাবে দুঃখ অনুভব করা এবং তার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।
রুশোর মতে, এই দুটি প্রবণতা প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করত। তাই মানুষ কেবল স্বার্থপরতা বা সংঘাতের দ্বারা পরিচালিত হতো—এমন ধারণা তিনি গ্রহণ করেননি।
৬. প্রকৃতির রাজ্যে সামাজিক বৈষম্য ছিল না
রুশোর মতে, প্রকৃতির রাজ্যে পরবর্তী সময়ের মতো ধনী-দরিদ্র,
প্রভু-ভৃত্য কিংবা শাসক-শাসিতের সুসংগঠিত সামাজিক বিভাজন ছিল না। মানুষের মধ্যে শারীরিক ও প্রাকৃতিক ক্ষমতার কিছু পার্থক্য থাকলেও সেগুলো তখনও স্থায়ী সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যে রূপ নেয়নি।
পরবর্তীকালে ব্যক্তিগত সম্পত্তি,
শ্রমবিভাগ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশের ফলে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
৭. ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব বৈষম্যের সূচনা করে
রুশোর রাজনৈতিক চিন্তায় ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁর মতে,
মানুষ যখন জমি ও অন্যান্য সম্পদের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে,
তখন সামাজিক বৈষম্যের বিকাশ ঘটে।
সম্পত্তির মালিক ও সম্পত্তিহীন মানুষের মধ্যে স্বার্থের পার্থক্য তৈরি হয়। এর ফলে প্রতিযোগিতা,
ক্ষমতার অসমতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়।
রুশো তাঁর Discourse on Inequality গ্রন্থে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশকে সামাজিক বৈষম্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
৮. প্রকৃতির রাজ্য থেকে সভ্য সমাজে উত্তরণ
রুশোর মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি,
মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, শ্রমবিভাগ, কৃষি,
ধাতুশিল্প এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশের মাধ্যমে সমাজের কাঠামো পরিবর্তিত হয়। মানুষ ক্রমশ জটিল সামাজিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়।
এই পরিবর্তনের ফলে একদিকে সভ্যতা ও উৎপাদনব্যবস্থার বিকাশ ঘটে,
অন্যদিকে সম্পদ ও ক্ষমতার অসম বণ্টন,
প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক অধীনতার সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীকালে সম্পত্তিশালী ব্যক্তিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। রুশোর বিশ্লেষণে, এ প্রক্রিয়া বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।
রুশোর প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে ধারণার মূল্যায়ন
রুশোর প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে ধারণার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।
প্রথমত,
তিনি মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতা ও মর্যাদার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত,
তিনি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছেন।
তৃতীয়ত,
তিনি হবসের মতো মানুষের প্রকৃতিকে মূলত সংঘাতপ্রবণ হিসেবে দেখেননি;
বরং মানুষের সহমর্মিতা ও সরলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে তাঁর তত্ত্বের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রকৃতির রাজ্য একটি দার্শনিক ও কাল্পনিক ধারণা;
একে মানবজাতির ইতিহাসের প্রমাণিত কোনো নির্দিষ্ট পর্যায় হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। এ ছাড়া ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে বৈষম্যের কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সামাজিক পরিবর্তনের সব কারণ কেবল এগুলোর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়,
রুশোর প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কিত ধারণা তাঁর সামগ্রিক রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি। তিনি মনে করেন,
মানুষ প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন,
সরল ও সহমর্মিতাপূর্ণ;
কিন্তু সভ্যতার বিকাশ,
ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তাঁর এই বিশ্লেষণ পরবর্তীকালে সামাজিক চুক্তি, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং বৈষম্যবিষয়ক রাজনৈতিক চিন্তাধারায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
সুতরাং,
প্রকৃতির রাজ্যের মাধ্যমে রুশো মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতার ধারণা প্রতিষ্ঠা এবং সভ্য সমাজে বৈষম্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।
জ্যাঁ-জাক রুশো প্রকৃতির রাজ্যকে হবস বা লকের
মতো যুদ্ধ বা সম্পত্তির বাজার হিসেবে দেখেননি। *Discourse on the Origin of
Inequality* (১৭৫৫)-এ তিনি একে এমন এক
অবস্থা বলেছেন, যেখানে মানুষ একা,
স্বাধীন ও তুলনামূলকভাবে
শান্তিপূর্ণ ছিল। দুর্নীতি এসেছে সমাজ, সম্পত্তি ও তুলনা থেকে—প্রকৃতি থেকে নয়।
## প্রাকৃতিক মানুষ
রুশোর প্রাকৃতিক মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী নয়। সে
জঙ্গলে ছড়িয়ে থাকে, সহজ প্রয়োজন
মেটায়, এবং অন্যের ওপর স্থায়ী
নির্ভরতা গড়ে তোলে না। তার দুটি সহজাত প্রবণতা আছে:
- **আত্মপ্রেম (amour de soi)** — নিজের জীবন ও সুস্থতা রক্ষার স্বাভাবিক চিন্তা।
এটা লোভ নয়।
- **সহানুভূতি (pitié)** — অন্যের কষ্ট দেখে স্বাভাবিক বিচলন। এটা নৈতিক
আইন নয়, সহজাত বাধা, যা নিষ্ঠুরতাকে সীমা দেয়।
এই অবস্থায় ভাষা, সম্পত্তি, স্থায়ী পরিবার ও রাষ্ট্র নেই। মানুষ বুদ্ধিমান
নাগরিক নয়; সে স্বয়ংসম্পূর্ণ
ও তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের প্রাণী। রুশো বলেন, এই মানুষ “মহৎ বন্য” নয়—সে নৈতিকভাবে উন্নতও নয়, পতিতও নয়। সে কেবল এখনো নষ্ট হয়নি।
## হবস ও লকের সঙ্গে পার্থক্য
| চিন্তক | প্রকৃতির রাজ্য | মূল সমস্যা |
|---|---|---|
| হবস | সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ | নিরাপত্তার অভাব |
| লক | অসুবিধাজনক কিন্তু নৈতিক; প্রাকৃতিক অধিকার
আছে | নিরপেক্ষ বিচারকের অভাব |
| রুশো | একাকী, শান্ত, অসমতাহীন | সমাজের ভেতরে জন্ম নেওয়া তুলনা ও নির্ভরতা |
হবস যে হিংসা ও গৌরবকে প্রকৃতির মধ্যেই
বসিয়েছেন, রুশো সেগুলোকে
সমাজের ফল বলেন। লক যে প্রাকৃতিক সম্পত্তিকে প্রায় চিরন্তন অধিকার করেন, রুশো বলেন সম্পত্তিই অসমতার সূচনা।
## অসমতার জন্ম
রুশো দুই ধরনের অসমতা আলাদা করেন।
- **প্রাকৃতিক** — বয়স, স্বাস্থ্য, শক্তির পার্থক্য। এটা সীমিত।
- **নৈতিক বা রাজনৈতিক** — সম্পদ, মর্যাদা ও ক্ষমতার পার্থক্য, যা মানুষ নিজে তৈরি করে এবং প্রথা দিয়ে স্থায়ী
করে।
ধাপগুলো মোটামুটি এমন:
১. সহযোগিতা, ভাষা ও স্থায়ী বসতি মানুষকে পরস্পরের মুখোমুখি
করে।
২. তুলনা শুরু হয়। আত্মপ্রেমের বদলে জাগে
**আত্মাভিমান (amour-propre)** — অন্যের চোখে
নিজেকে বড় দেখার ইচ্ছা। এখান থেকে ঈর্ষা, অপমান ও প্রতিযোগিতা।
৩. কৃষি ও ধাতুর ব্যবহার সম্পদ বাড়ায়।
৪. কেউ জমি ঘিরে বলে, “এটা আমার”—এবং অন্যেরা বিশ্বাস করে। রুশো একে
সভ্য সমাজের প্রকৃত সূচনা বলেন। সম্পত্তি বৈধ হয় জোর ও প্রতারণায়, পরে আইন দিয়ে তা পাকা হয়।
৫. ধনীরা বিদ্রোহের ভয়ে একটি চুক্তির প্রস্তাব
দেয়, যা দুর্বলকে রক্ষা করার
নামে আসলে ধনীর সম্পত্তি রক্ষা করে। এই প্রথম রাষ্ট্র তাই স্বাধীনতার চুক্তি নয়;
এটা অসমতাকে আইনি রূপ
দেয়।
## স্বাধীনতা হারানো
প্রকৃতিতে মানুষ নিজের ইচ্ছার অধীন ছিল,
কারণ তার প্রয়োজন কম এবং
অন্যের ওপর নির্ভরতা ছিল না। সমাজে প্রয়োজন বাড়ে, শ্রম ভাগ হয়, বিলাসিতা অভ্যাস হয়। মানুষ অন্যের মতামত ছাড়া
বাঁচতে পারে না। রুশোর বিখ্যাত সূত্র: মানুষ স্বাধীন জন্মায়, অথচ সর্বত্র শৃঙ্খলে বন্দী। শৃঙ্খল প্রকৃতির নয়;
এটা সম্পত্তি, অসমতা ও কৃত্রিম চুক্তির।
## পরের বইয়ের সঙ্গে যোগ
*Social
Contract* (১৭৬২)-এ রুশো প্রকৃতির
রাজ্যে ফিরে যাওয়ার ডাক দেননি। তিনি খোঁজেন এমন এক সমিতি, যেখানে প্রত্যেকে নিজেকে সামগ্রিক ইচ্ছার (*volonté
générale*) অধীন করেও আগের মতো
স্বাধীন থাকে। বৈধ রাষ্ট্র সেটাই, যা ব্যক্তিগত
সম্পত্তির ছদ্মচুক্তি নয়, বরং সকলের সাধারণ
স্বার্থের আইন। প্রকৃতির রাজ্য তাই তাঁর কাছে আদর্শ সরকার নয়; এটা এক মানদণ্ড—যা দিয়ে তিনি দেখান, বিদ্যমান সমাজ স্বাধীনতা নষ্ট করেছে।
## সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন
রুশোর প্রকৃতির রাজ্য ইতিহাসের বিবরণ হিসেবে
দুর্বল; তিনি নিজেও একে অনুমান
বলেছেন। তত্ত্ব হিসেবে এটা তীক্ষ্ণ। হবস বলেন, ভয় থেকে রাষ্ট্র দরকার। লক বলেন, অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র দরকার। রুশো বলেন,
মানুষ স্বভাবে পাশবিক নয়;
অসমতা, তুলনা ও “এটা আমার” বলার মুহূর্ত থেকেই সে
নিজের স্বাধীনতা হারায়। তাঁর প্রশ্ন পরবর্তী গণতন্ত্রকে তাড়া করেছে: কোন চুক্তি
স্বাধীনতা ফেরায়, আর কোন চুক্তি
কেবল শৃঙ্খলকে আইন বানায়।
ফরাসি
রেনেসাঁসের প্রখ্যাত রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও দার্শনিক জ্যাঁ
জ্যাঁক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) তাঁর
বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য সোশ্যাল
কন্ট্রাক্ট' (The Social Contract - 1762) এবং 'ডিসকোর্স অন দ্য অরিজিন অফ ইনইকুয়ালিটি'
(Discourse on Inequality - 1755)-এ 'প্রকৃতির
রাজ্য' (State of Nature) সম্পর্কে অত্যন্ত মৌলিক, মানবতাবাদী
ও প্রাঞ্জল ধারণা উপস্থাপন করেছেন।
রুশোর
পূর্বে থমাস হবস ও জন লক প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে আলোচনা করলেও রুশোর দৃষ্টিকোণ
ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। হবস যেখানে প্রকৃতির রাজ্যকে 'হিংস্র ও
নৈরাজ্যময়' এবং লক 'মোটামুটি শান্তিময় কিন্তু নিরাপত্তাহীন'
হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন, সেখানে রুশো প্রকৃতির রাজ্যকে মানুষের 'স্বর্ণযুগ' (Golden Age) হিসেবে
বিবেচনা করেছেন।
নিচে রুশোর
প্রকৃতির রাজ্যের ধারণা বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:
১. 'মহৎ
বন্যমানুষ' (Noble Savage) ও আদিম মানবপ্রকৃতি
রুশোর মতে,
প্রকৃতির রাজ্যে বসবাসকারী আদিম মানুষ আধুনিক সভ্য মানুষের মতো জটিল,
স্বার্থপর বা চতুর ছিল না। তারা ছিল নিছকই নিঃসঙ্গ, স্বাধীন ও
নিষ্পাপ। রুশো প্রকৃতির রাজ্যের এই সরল মানুষকে "মহৎ
বন্যমানুষ" (Noble Savage) বলে অভিহিত করেছেন।
প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষের আচরণ মূলত দুটি মৌলিক অনুভূতি বা আবেগ দ্বারা পরিচালিত হতো:
- আত্মপ্রেম বা আত্মরক্ষা (Self-Preservation
/ Amour de soi): নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ও মৌলিক প্রয়োজন
(খাদ্য, ঘুম, আশ্রয়) মেটানোর
স্বাভাবিক প্রবণতা।
- সহানুভূতি বা সমবেদনা (Pity / Compassion):
অন্যের কষ্ট বা যন্ত্রণা দেখে ব্যথিত হওয়ার একটি
প্রাক-যুক্তিসিদ্ধ মানসিক বোধ। এই গুণটির কারণেই আদিম মানুষ একে অপরের ওপর
অহেতুক অত্যাচার বা হিংসা করত না।
২. প্রকৃতির
রাজ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
রুশোর আঁকা
প্রকৃতির রাজ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
- পূর্ণ স্বাধীনতা ও সমতা (Freedom and
Equality): প্রকৃতির রাজ্যে কোনো শাসন বা দাসত্ব ছিল না। সবাই
সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সমান ছিল। কারো ওপর কারো প্রভুত্ব ছিল না।
- সম্পত্তি ও অহংকারের অনুপস্থিতি: সেখানে কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি, আইন, আদালত বা মুদ্রা
ছিল না। 'আমার' এবং 'তোমার'—এই ধারণার জন্ম না
হওয়ায় হিংসা ও সংঘাতও ছিল না।
- প্রকৃতির সাথে একাত্মতা: মানুষ প্রকৃতির কোলে অন্যান্য প্রাণীর মতোই সরল ও
প্রাকৃতিক জীবনযাপন করত। সেখানে কোনো সামাজিক নিয়মকানুনের জটিলতা ছিল না।
- নীতি-নৈতিকতাহীন কিন্তু নিষ্পাপ জীবন: রুশোর মতে, প্রকৃতির
মানুষ 'নৈতিক' বা 'অনৈতিক' কোনোটিই ছিল না;
তারা ছিল 'প্রাক-নৈতিক'
(Pre-moral)। পাপ-পুণ্য বা ন্যায়-অন্যায়ের কোনো ধারণা না
থাকায় তারা নিষ্পাপ ছিল।
৩. প্রকৃতির
রাজ্যের পতন ও বৈষম্যের সূচনা
রুশো
ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে এই শান্তিময় ও সুখী প্রকৃতির রাজ্য ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে
গেল এবং মানুষকে কৃত্রিম ও অশান্তিপূর্ণ সমাজে প্রবেশ করতে হলো:
ক.
ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব (Origin of Private Property)
রুশোর মতে,
ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টিই হলো মানুষের পতন ও সমস্ত বৈষম্যের মূল কারণ।
রুশোর
কালজয়ী উক্তি:
"যে ব্যক্তি
প্রথম একখণ্ড জমি ঘেরা দিয়ে বলেছিল 'এটি আমার',
এবং অপর সরল মানুষদের পেয়েছিল যারা তার কথা বিশ্বাস করেছিল—সেই ব্যক্তিই
ছিল সুশীল বা সভ্য সমাজের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। সেদিন যদি কেউ ঘেরা তুলে ফেলে
চিৎকার করে বলত, 'এই প্রতারকের কথা শুনো না; মাটির ফল
সবার, আর জমি কারো একার নয়', তবে
মানবজাতি কত অপরাধ, যুদ্ধ, হত্যাকাণ্ড
ও দুর্দশা থেকে রক্ষা পেত!"
খ.
ধাতুবিদ্যা ও কৃষিকাজের বিকাশ
ধাতু
ব্যবহার ও কৃষিকাজ শেখার ফলে খাদ্য মজুত এবং সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
এর ফলে সমাজের মানুষ দুটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে:
- ধনী বা মালিক শ্রেণি
- দরিদ্র বা বঞ্চিত শ্রেণি
গ. কৃত্রিম
বৈষম্য ও 'সবাই সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ'
সম্পত্তি ও
সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে মানুষের মধ্যে লোভ, হিংসা ও
অহংকার (Amour-propre) রূপ নেয়। এর ফলে সমাজে যুদ্ধ, চুরি,
খুন ও অরাজকতা দেখা দেয়। হবস প্রকৃতির রাজ্যকে শুরুতে যেভাবে হিংস্র
বলেছিলেন, রুশোর মতে প্রকৃতির রাজ্য শেষের দিকে এসে ঠিক সেরকম সহিংস রূপ ধারণ করে।
৪. সামাজিক
চুক্তি ও সমাধান
প্রকৃতির
রাজ্য যখন আর বসবাসের যোগ্য রইল না এবং ধ্বংসের মুখে পড়ল, তখন
ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল মানুষ নিজেদের রক্ষা করার জন্য একটি চুক্তি করতে বাধ্য
হয়।
তবে রুশো
প্রকৃতির রাজ্যে ফিরে যাওয়াকে অসম্ভব মনে করতেন। তাই তিনি প্রস্তাব করেন, হারিয়ে
যাওয়া স্বাধীনতা ও সমতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে মানুষকে একটি 'সামাজিক চুক্তি' (Social Contract)-র মাধ্যমে
একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে, যা পরিচালিত হবে "সাধারণ
ইচ্ছা" (General Will) বা জনগণের যৌথ ইচ্ছার দ্বারা।
রুশোর
ভাবনার সংক্ষেপণ
সরল
প্রকৃতির রাজ্য (স্বর্ণযুগ)
➔ ব্যক্তিগত
সম্পত্তি ও কৃষির উদ্ভব
➔ ধনী-দরিদ্র
বৈষম্য ও অরাজকতা
➔ সামাজিক
চুক্তি (সমাধান)
➔ 'সাধারণ
ইচ্ছা' চালিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
উপসংহার
পরিশেষে বলা
যায়, জ্যাঁ জ্যাঁক রুশোর প্রকৃতির রাজ্যের ধারণা কেবল একটি
রূপক বা কাল্পনিক ইতিহাস নয়, বরং এটি ছিল তাঁর সময়কালের কৃত্রিম ফরাসি সমাজ ও
বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি এক তীব্র সমালোচনা।
তাঁর
বিখ্যাত বাণী—"মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু
সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত" (Man is born free, and everywhere he is
in chains)—এই প্রকৃতির রাজ্যের দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে
উঠেছে। তাঁর এই চিন্তাধারা ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব এবং পরবর্তীতে
বিশ্বজুড়ে রোমান্টিসিজম ও গণতান্ত্রিক ভাবধারাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
ফরাসি
দার্শনিক জাঁ-জ্যাক রুশো (Jean-Jacques
Rousseau) তার রাষ্ট্রদর্শন ও সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে 'প্রকৃতির
রাজ্য' (State of Nature) সম্পর্কে এক অনন্য ধারণা তুলে ধরেছেন। টমাস হবস বা জন
লক-এর ধারণার বিপরীতমুখী ছিল রুশোর এই মতবাদ। [1,
2,
3]
নিচে রুশোর
প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. প্রকৃতির
রাজ্যের মূল বৈশিষ্ট্য
- স্বাধীন ও মুক্ত জীবন:
রুশোর মতে, প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মুক্ত ছিল। তাঁর বিখ্যাত উক্তি হলো— "মানুষ স্বাধীন হয়ে
জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলে আবদ্ধ"।
[1,
2]
- আদর্শ বর্বর বা 'নোবল
স্যাভেজ' (Noble Savage): এই রাজ্যে মানুষ
কোনো জটিল জ্ঞান বা যুক্তির নাগপাশে আবদ্ধ ছিল না। তারা পশুর মতো সরল
জীবনযাপন করত, যাদের জীবন পরিচালিত হতো সহজাত প্রবৃত্তি ও আবেগের
মাধ্যমে। [1,
2]
- দুটি মৌলিক প্রবৃত্তি:
রুশোর মতে, প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষ দুটি মৌলিক প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত হতো:
১. আত্মসংরক্ষণ বা আত্মপ্রেম (Amour de soi): নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বাভাবিক ইচ্ছা।
২. সহানুভূতি বা পরদুঃখকাতরতা (Pitié): অন্য মানুষের বা জীবের কষ্ট দেখলে ব্যথিত হওয়া। [1, 2] - শান্তিপূর্ণ ও দ্বন্দ্বহীন অবস্থান: এ অবস্থায় কোনো যুদ্ধ, হিংসা,
শত্রুতা বা লোভ ছিল না। মানুষের প্রয়োজন ছিল
অত্যন্ত সামান্য (খাদ্য, সামান্য আশ্রয় ও ঘুম)।
[1,
2,
3]
- অমরত্ব বা মৃত্যুর ভয়হীনতা: মানুষ তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিল না কিংবা
মৃত্যুর ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে ধারণা রাখত না। ফলে তারা এক আনন্দময় ও
নিরিবিলি জীবন কাটাত। [1,
2]
২. সমাজের
উদ্ভব ও প্রকৃতির রাজ্যের অবসান
- ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভব: রুশোর মতে, যে
মুহূর্তে কোনো ব্যক্তি কোনো এক টুকরো জমিকে ঘিরে বলল— "এটি আমার",
সেই মুহূর্তেই প্রকৃত সভ্যতার বা অসমতার সূচনা হলো।
[1]
- কৃত্রিমতার প্রভাব: মানুষ যখন দলবদ্ধ হতে শুরু করল এবং বিজ্ঞান,
শিল্প ও বুদ্ধিমত্তা বিকাশ লাভ করল, তখন মানুষের মধ্যে অহংকার, লালসা ও কৃত্রিম চাহিদা (Amour-propre)
তৈরি হলো। [1,
2]
- বৈষম্য ও শৃঙ্খল: এই ব্যক্তিমালিকানা এবং বুদ্ধির বিকাশের ফলে সমাজে
ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ, শোষণ এবং পারস্পরিক নির্ভরতা সৃষ্টি হলো যা
প্রকৃতির রাজ্যের সরল ও সুন্দর শান্তিকে নষ্ট করে দিল।
[1,
2]
৩. প্রকৃতির
রাজ্যের তাৎপর্য
রুশো
প্রকৃতির রাজ্যকে কোনো ঐতিহাসিক কাল বলে দাবি করেননি, বরং এটি ছিল
তাঁর একটি দার্শনিক অনুকল্প বা হাইপোথিসিস। এর মাধ্যমে
তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে— মানুষ জন্মগতভাবে সৎ ও সরল, কিন্তু
মানুষ যখন সমাজ ও সভ্যতার সংস্পর্শে আসে, তখন সেই
কৃত্রিমতাই মানুষকে কলুষিত করে। [1, 2,
3]
এই হারানো
স্বাধীনতা ও সমতা পুনরুদ্ধারের জন্যই পরবর্তীতে তিনি তার বিখ্যাত 'সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' বা 'সামাজিক
চুক্তি' তত্ত্বের প্রস্তাব করেন। [1,
2]
No comments:
Post a Comment