### *টমাস হবসের প্রকৃতির রাজ্য ও মানব প্রকৃতি*
*টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯)* - ইংল্যান্ডের দার্শনিক।
তার বিখ্যাত বই *"Leviathan" (১৬৫১)*।
হবসের সময় ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধ চলছিল - রাজা
বনাম পার্লামেন্ট, রক্তের বন্যা।
হবস এই রক্তপাত দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন - মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে একটা
ভয়ংকর শক্তিশালী সরকার দরকার, না হলে মানুষ
মানুষকে মেরে ফেলবে। এই ভয় থেকেই তার প্রকৃতির রাজ্য ও মানব প্রকৃতির তত্ত্ব।
#### *১. মানব প্রকৃতি সম্পর্কে হবসের ধারণা - মানুষ
আসলে কি?*
হবসের মতে মানুষ মোটেও ভালো প্রাণী নয়।
মানুষের প্রকৃতিতে ৩টি জিনিস আছে:
*১. অহংকার বা গৌরবের আকাঙ্ক্ষা (Desire
for Glory):*
মানুষ চায় অন্যের চেয়ে নিজেকে বড় দেখাতে।
"আমি ওর চেয়ে ভালো" - এই প্রতিযোগিতা থেকেই হিংসা।
*২. নিরাপত্তাহীনতা ও ভয় (Diffidence):*
মানুষ সবসময় ভয়ে থাকে - ওই লোকটা আমাকে মারবে
না তো? আমার জিনিস কেড়ে নেবে না
তো? তাই ভয়ের কারণে সে আগেই
অন্যকে আক্রমণ করে।
*৩. ক্ষমতার প্রতি অবিরাম আকাঙ্ক্ষা (Perpetual
Desire for Power):*
> "মানুষের মধ্যে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা মৃত্যু
পর্যন্ত চলে।"
মানুষের চাহিদা কখনো শেষ হয় না। আজ ১০০ টাকা
চায়, কাল ১০০০ টাকা, পরশু পুরো দুনিয়া।
*আরও ২টি বৈশিষ্ট্য:*
*৪. মানুষ যন্ত্রের মতো:* হবস বলেন, মানুষ কোনো আত্মা নয়, মানুষ হলো যন্ত্র - যেমন ঘড়ি। ঘড়ি যেমন
ব্যাটারিতে চলে, মানুষ চলে কামনা
ও ভয়ে।
*৫. মানুষ স্বার্থপর, সমান ও যুক্তিবাদী:*
- স্বার্থপর: সবাই নিজের লাভ দেখে।
- সমান: প্রকৃতিতে সবাই সমান শক্তিশালী। দুর্বলতম
মানুষও সবলতম মানুষকে ঘুমের মধ্যে মেরে ফেলতে পারে। তাই কেউ নিরাপদ নয়।
- যুক্তিবাদী: মানুষ বোকা নয়, সে হিসাব করে - কিভাবে বাঁচা যায়।
*হবসের বিখ্যাত উক্তি:*
> "Homo
homini lupus" - মানুষ মানুষের
নেকড়ে।
#### *২. প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature) - হবসের নরকের বর্ণনা*
রাষ্ট্র, সরকার, পুলিশ, আইন, আদালত - কিছুই নেই। মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বাস
করছে। সেই রাজ্য কেমন হবে?
হবসের মতে প্রকৃতির রাজ্য হবে *"সকলের
বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ" (War of all against all - Bellum omnium
contra omnes)*
*প্রকৃতির রাজ্যের ৬টি বৈশিষ্ট্য:*
*১. যুদ্ধের রাজ্য:*
কেউ কারো বন্ধু নয়। সবাই সবার শত্রু। আজ বন্ধু,
কাল শত্রু। কারণ সম্পদ
সীমিত, চাহিদা অসীম।
*২. নৈতিকতা, আইন, ন্যায়-অন্যায় নেই:*
হবস বলেন - যেখানে রাষ্ট্র নেই, সেখানে ন্যায়-অন্যায় নেই।
>
"Where there is no common power, there is no law, where no law, no
justice."
আইন বানানোর কেউ নেই, তাই চুরি, খুন - কোনোটাই অন্যায় নয়। যে পারে, সে করবে।
*৩. সম্পত্তির নিরাপত্তা নেই:*
আজ তুমি ফসল ফলালে, কাল আরেকজন এসে কেড়ে নেবে। তাই কেউ কষ্ট করে
কিছু বানাবে না। ফলে শিল্প, কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা - কিছুই থাকবে না।
*৪. জীবন ছিল - নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, পাশবিক, কুৎসিত ও ক্ষণস্থায়ী:*
হবসের সবচেয়ে বিখ্যাত বর্ণনা:
> "Life
in the state of nature was solitary, poor, nasty, brutish and short."
- Solitary - নিঃসঙ্গ (কেউ কারো নয়)
- Poor - দরিদ্র (কিছুই নেই)
- Nasty - কুৎসিত
- Brutish - পাশবিক
- Short - ক্ষণস্থায়ী (যে কোনো সময় মৃত্যু)
*৫. প্রাকৃতিক অধিকার (Right of
Nature):*
প্রকৃতির রাজ্যে প্রত্যেকের সবকিছুর উপর অধিকার
আছে। এমনকি অন্যের জীবনের উপরও। নিজেকে বাঁচানোর জন্য তুমি যে কাউকে মারতে পারো।
*৬. প্রাকৃতিক আইন (Laws of Nature) - বাঁচার জন্য যুক্তি:*
এই নরক থেকে বাঁচতে মানুষের যুক্তি তাকে ৩টি
আইন শেখায়:
- *১ম আইন:* শান্তি খোঁজো। যুদ্ধ থেকে বাঁচার
চেষ্টা করো।
- *২য় আইন:* শান্তির জন্য তুমি তোমার সব অধিকার
ছেড়ে দাও, যদি অন্যরাও
ছাড়ে।
- *৩য় আইন:* চুক্তি মেনে চলো।
এই প্রাকৃতিক আইন মেনেই মানুষ সামাজিক চুক্তি
করে।
#### *৩. প্রকৃতির রাজ্য থেকে মুক্তি - সামাজিক
চুক্তি ও লেভিয়াথান*
এই ভয়ংকর প্রকৃতির রাজ্য থেকে বাঁচতে মানুষ কি
করলো?
সবাই মিলে এক জায়গায় বসলো। সিদ্ধান্ত নিলো:
"আমরা সবাই আমাদের সব অধিকার একজন ব্যক্তি বা
সভার হাতে তুলে দেবো। সে হবে লেভিয়াথান - এক ভয়ংকর দৈত্য, যার হাতে থাকবে অসীম ক্ষমতা। সে আমাদের শান্তি
দেবে, বিনিময়ে আমরা তার সব কথা
মানবো।"
*চুক্তির শর্ত:*
১. সবাই সব অধিকার ছেড়ে দেবে, একটি অধিকার ছাড়া - আত্মরক্ষার অধিকার।
2. চুক্তি হবে মানুষে মানুষে, শাসকের সাথে নয়। তাই শাসক চুক্তি ভাঙলেও প্রজা
কিছু বলতে পারবে না।
3. একবার চুক্তি হলে, আর ফিরে যাওয়া যাবে না।
ফলে জন্ম হলো রাষ্ট্রের - যে রাষ্ট্র হবে চরম,
নিরঙ্কুশ, সার্বভৌম।
#### *৪. হবস, লক, রুশোর প্রকৃতির রাজ্যের তুলনা - এই ছকটি মুখস্থ রাখো*
বিষয় | হবস | লক | রুশো
**প্রকৃতির রাজ্য** | যুদ্ধের রাজ্য, নরক | শান্তির রাজ্য, তবে অসুবিধা ছিল |
সুখের স্বর্গরাজ্য,
Noble Savage
**মানব প্রকৃতি** | স্বার্থপর, হিংস্র, নেকড়ে | বিবেকবান, শান্তিপ্রিয় | সরল, দয়ালু, সুখী
**সমস্যা কি ছিল?** | জীবনের নিরাপত্তা ছিল না | প্রাকৃতিক অধিকার ব্যাখ্যার ও বিচারের নিরপেক্ষ
বিচারক ছিল না | ব্যক্তিগত
সম্পত্তি এসে বৈষম্য তৈরি করলো
**সমাধান** | সব ক্ষমতা রাজাকে দাও | কিছু ক্ষমতা সরকারকে দাও, মৌলিক অধিকার নিজের কাছে রাখো | সবাই সব অধিকার সমাজকে দাও, তৈরি হবে সাধারণ ইচ্ছা
#### *৫. সমালোচনা*
১.
*মানুষ এত খারাপ নয়:* হবস মানুষকে শুধু খারাপ হিসেবে দেখেছেন। মানুষের
মধ্যে ভালোবাসা, সহযোগিতাও আছে।
2. *ইতিহাসে এমন
প্রকৃতির রাজ্য ছিল না:* নৃতত্ত্ববিদরা বলেন, আদিম মানুষও দল বেঁধে থাকতো, সম্পূর্ণ যুদ্ধের রাজ্য কখনো ছিল না।
3. *স্বৈরাচারের
দাল:* হবসের তত্ত্ব দিয়ে যে কোনো স্বৈরাচার বৈধতা পায়। হিটলার, মুসোলিনি হবসকে পছন্দ করতেন।
*পরীক্ষায় শেষ করার জন্য:*
হবসের গুরুত্ব কোথায়? তিনি প্রথম বলেন - রাষ্ট্র ঈশ্বর বানায়নি,
মানুষ বানিয়েছে নিজের
প্রয়োজনে। এবং তিনি প্রথম আধুনিক সার্বভৌমত্বের ধারণা দেন।
> হবস ভয় থেকে রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন। তাই তার
রাষ্ট্র - ভয়ের রাষ্ট্র, শৃঙ্খলার
রাষ্ট্র। লক জন্ম দিয়েছেন অধিকার থেকে, তাই তার রাষ্ট্র - স্বাধীনতার রাষ্ট্র।
*এক লাইনে মনে রাখো:*
"হবসের মানুষ = স্বার্থপর নেকড়ে, প্রকৃতির রাজ্য = সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ,
সমাধান = ভয়ংকর
লেভিয়াথানকে সব ক্ষমতা দিয়ে দাও, যাতে সে পিটিয়ে
মানুষকে ঠিক রাখে।"
টমাস হবসের
মতে, প্রকৃতির রাজ্য হলো রাষ্ট্র,
সরকার, আইন ও সাধারণ কর্তৃত্ববিহীন একটি কাল্পনিক অবস্থা।
সেখানে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন হলেও নিরাপত্তাহীন; ফলে জীবন
পরিণত হয় “সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধে” (war of all against all)।[oyc.yale][rug]
মানব
প্রকৃতিবাদ
হবসের
মানব-দর্শন ছিল মূলত বাস্তববাদী
ও ব্যক্তিবাদী। তিনি মানুষকে স্বভাবতই সৎ বা সামাজিক নয়; বরং
আত্মরক্ষা, ভয়, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত সত্তা
হিসেবে দেখেন।[academic.oup][d.umn]
- আত্মরক্ষার প্রবণতা: মানুষের সবচেয়ে মৌলিক প্রবণতা হলো নিজের জীবন
রক্ষা করা এবং কষ্ট এড়ানো।[academic.oup][worldhistory]
- স্বার্থপরতা: মানুষ খাদ্য, সম্পদ,
সম্মান ও ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা করে; প্রয়োজনে অন্যের ক্ষতি করতেও পিছপায় না।[worldhistory]
- সমতা ও পারস্পরিক আশঙ্কা: হবসের মতে, মানুষ
শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতায় মোটামুটি সমান। ফলে কেউ চিরস্থায়ীভাবে অন্যের ওপর
আধিপত্য নিশ্চিত করতে পারে না; এ থেকে জন্ম নেয়
পারস্পরিক ভয় ও সংঘাত।[d.umn][research.engineering.nyu]
- অসীম আকাঙ্ক্ষা: মানুষ কেবল বর্তমান চাহিদা পূরণে থামে না; সে ক্রমাগত নিরাপত্তা, সম্পদ
ও ক্ষমতা বাড়াতে চায়। এই অসীম আকাঙ্ক্ষাই প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব তৈরি করে।[academic.oup][worldhistory]
প্রকৃতির
রাজ্যের চিত্র
প্রকৃতির
রাজ্যে কোনো সরকার নেই, তাই কোনো সাধারণ আইন, বিচারক বা
শাস্তিদানকারী কর্তৃত্বও নেই। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের অধিকার ও অপরাধের বিচারক
নিজেই হয়; ফলে বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো নিরপেক্ষ পথ থাকে না।[oyc.yale][plato.stanford]
এ অবস্থায়
হবস তিনটি প্রধান কারণে যুদ্ধ দেখতে পান:
- প্রতিযোগিতা—দুর্বল
বা সীমিত সম্পদের জন্য মানুষ একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ে।
- অবিশ্বাস—প্রত্যেকে
ভয় পায় যে অন্যরা আগে আক্রমণ করতে পারে।
- গৌরব বা কীর্তির আকাঙ্ক্ষা—সম্মান, খ্যাতি ও ক্ষমতার
প্রতিযোগিতা সংঘাত বাড়ায়।[worldhistory]
তাই হবসের
বিখ্যাত বর্ণনায়, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন হয় “নিঃসঙ্গ, দরিদ্র,
নোংরা, পাশবিক এবং ক্ষণস্থায়ী”।[d.umn][research.engineering.nyu][ebsco]
প্রাকৃতিক
অধিকার ও প্রাকৃতিক বিধান
হবসের মতে,
প্রকৃতির রাজ্যে প্রত্যেক মানুষের একটি প্রাকৃতিক
অধিকার (right of nature) আছে: নিজের জীবন রক্ষার জন্য যা প্রয়োজন,
তা ব্যবহার করার স্বাধীনতা। কিন্তু সবাই এই অধিকার অসীমভাবে প্রয়োগ করলে
সবাই অনিরাপদ হয়ে পড়ে।[rug][d.umn]
এর বিপরীতে প্রাকৃতিক বিধান (law of nature) হলো
যুক্তিনির্দেশিত নিয়ম: যে কাজ শান্তি ও আত্মরক্ষার পথ খোলে, তা করতে হবে;
আর যা শান্তি নষ্ট করে, তা পরিহার করতে হবে। অর্থাৎ, বেঁচে থাকার
ইচ্ছা ও যুক্তিবোধ মানুষকে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখায়।[d.umn]
সামাজিক
চুক্তি ও লেভায়াথান
হবসের
সমাধান হলো সামাজিক চুক্তি। মানুষ
নিজেদের প্রাকৃতিক স্বাধীনতার একটি অংশ ত্যাগ করে একটি সার্বভৌম কর্তৃত্বের হাতে
ক্ষমতা সমর্পণ করে, যাতে শান্তি, নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত হয়।[rug][worldhistory]
এই
সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রকর্তৃত্বকে তিনি বলেন লেভায়াথান। লেভায়াথান
হতে পারে একজন রাজা, পরিষদ বা অন্য কোনো সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ; মূল কথা হলো,
তার কাছে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকতে হবে যাতে সে সকলকে আইন মানতে বাধ্য করতে
পারে।[d.umn][worldhistory]
মূল্যায়ন
হবসের
তত্ত্ব দেখায় যে রাষ্ট্রের ভিত্তি কেবল নৈতিক আদর্শ নয়, বরং
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার প্রয়োজন। তাঁর মতে, সার্বভৌম
কর্তৃত্ব দুর্বল হলে সমাজ আবার বিশৃঙ্খলার দিকে ফিরে যেতে পারে।[rug][rep.routledge]
তবে
সমালোচকেরা বলেন, হবস মানুষের সহযোগিতা, সামাজিকতা ও
নৈতিকতাকে অতিরিক্ত অবমূল্যায়ন করেছেন; এবং তাঁর
পরম সার্বভৌমত্বের ধারণা স্বৈরতন্ত্রের পথ খুলে দিতে পারে। তবু আধুনিক রাষ্ট্র,
সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের আলোচনায় হবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।[d.umn][worldhistory]
সংক্ষেপে: হবসের মতে মানুষ স্বার্থপর, ভীত ও
আত্মরক্ষাপরায়ণ; তাই রাষ্ট্রবিহীন প্রকৃতির রাজ্য যুদ্ধের রাজ্য। এই
বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তির জন্যই মানুষ সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী
সার্বভৌম রাষ্ট্র—লেভায়াথান—গড়ে তোলে।[rug][worldhistory][research.engineering.nyu]
প্রকৃতির
রাজ্য ও মানব প্রকৃতি সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা
ভূমিকা
টমাস হবস
(১৫৮৮–১৬৭৯) ছিলেন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক। ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের
(১৬৪২–১৬৫১) অস্থির সময়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, কর্তৃত্বহীন
সমাজ কীভাবে অরাজকতায় ডুবে যায়। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মাস্টারপিস লেভিয়াথান (১৬৫১) রচিত
হয়। এই গ্রন্থে তিনি মানুষের স্বভাব, প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature) এবং রাষ্ট্র
সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছেন। হবসের পুরো রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হলো
তাঁর মানব প্রকৃতি বিশ্লেষণ, তাই প্রথমে সেটি আলোচনা করা প্রয়োজন।
হবসের মানব
প্রকৃতিবাদ
হবস
যান্ত্রিক বস্তুবাদে বিশ্বাস করতেন। গ্যালিলিও ও আধুনিক বিজ্ঞানের প্রভাবে তিনি
মানুষকে এমন এক জটিল যন্ত্র হিসেবে দেখেছেন, যা বাইরের
উদ্দীপনায় সাড়া দেয়। তাঁর মতে মানুষের সমস্ত আচরণের মূলে রয়েছে দুটি
প্রবৃত্তি: আকর্ষণ (appetite), যা মানুষকে সুখকর বস্তুর দিকে টানে, এবং
বিতৃষ্ণা (aversion), যা কষ্টদায়ক বস্তু থেকে দূরে সরায়।
মানুষের
স্বভাবের বৈশিষ্ট্য
১.
আত্মরক্ষা ও স্বার্থপরতা: হবসের মতে
মানুষ স্বভাবগতভাবে আত্মকেন্দ্রিক। নিজের টিকে থাকা ও সুখ অর্জনই তার প্রধান
লক্ষ্য। পরোপকার বা সামাজিকতা মানুষের সহজাত গুণ নয়; এগুলো
স্বার্থ থেকেই জন্ম নেয়। এখানে তিনি অ্যারিস্টটলের "মানুষ সামাজিক জীব"
ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
২. ক্ষমতার
অবিরাম আকাঙ্ক্ষা: হবস বলেন,
মানুষের মধ্যে ক্ষমতার জন্য এক অবিরাম ও অতৃপ্ত তৃষ্ণা আছে, যা
মৃত্যুতেই শেষ হয়। এর কারণ এই নয় যে মানুষ সবসময় বেশি সুখ চায়; বরং আজকের
সুখ ধরে রাখার জন্য আগামীকালের ক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হয়।
৩. সমানতা: শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যে মানুষ মোটামুটি সমান।
সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিও কৌশল বা জোটের মাধ্যমে সবচেয়ে শক্তিশালীকে হত্যা করতে
পারে। এই সমানতাই আশার সমতা তৈরি করে, আর একই লক্ষ্যে সবাই প্রতিযোগিতায় নামে।
৪.
যুক্তিবাদিতা ও আবেগ: মানুষ আবেগ
দ্বারা চালিত হলেও তার যুক্তিবোধ আছে। এই যুক্তিই তাকে শেখায় যে শান্তি কাম্য এবং
তা অর্জনের উপায় হলো চুক্তি।
৫. সন্দেহ ও
ভীতি: মানুষ পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারে না।
মৃত্যুভয়, বিশেষত সহিংস মৃত্যুর ভয়, মানুষের
সবচেয়ে প্রবল আবেগ।
প্রকৃতির
রাজ্য
হবসের
"প্রকৃতির রাজ্য" একটি কাল্পনিক অবস্থা, যেখানে কোনো
রাষ্ট্র, সরকার, আইন বা সর্বজনীন কর্তৃপক্ষ নেই। এটি ঐতিহাসিক
বাস্তবতা নয়, বরং চিন্তাপরীক্ষা: রাষ্ট্র না থাকলে মানুষের জীবন কেমন
হতো, তা দেখানোর জন্যই এই ধারণা।
সংঘর্ষের
তিনটি কারণ
হবস দেখান,
মানুষের স্বভাবেই কলহের তিনটি মূল কারণ নিহিত:
১. প্রতিযোগিতা: সীমিত
সম্পদের জন্য লাভের আশায় মানুষ আক্রমণ করে।
২. অবিশ্বাস: নিরাপত্তার
জন্য মানুষ আগেভাগে আক্রমণ করে।
৩. গৌরব: সম্মান ও
খ্যাতির জন্য মানুষ লড়ে।
সবার
বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ
প্রকৃতির
রাজ্যে সর্বজনীন কর্তৃপক্ষ না থাকায় সবাই সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধাবস্থায় থাকে (bellum
omnium contra omnes)। এই যুদ্ধ মানে সবসময় সংঘর্ষ নয়, বরং
সংঘর্ষের নিরন্তর আশঙ্কা, যেমন আকাশ মেঘলা থাকলে বৃষ্টি না হলেও বৃষ্টির সম্ভাবনা
থাকে।
জীবনের
চিত্র
এই অবস্থায়
শিল্প, কৃষি, ব্যবসা, বিজ্ঞান, সাহিত্য বা
সমাজ গড়ে ওঠে না, কারণ শ্রমের ফল ভোগের নিশ্চয়তা নেই। হবসের বিখ্যাত
বর্ণনায় মানুষের জীবন তখন হবে নিঃসঙ্গ, দরিদ্র,
কুৎসিত, পাশবিক ও স্বল্পস্থায়ী।
নৈতিকতা ও
অধিকার
প্রকৃতির
রাজ্যে ন্যায়-অন্যায় বা ধর্মাধর্মের কোনো ধারণা নেই, কারণ এসব
ধারণা আইনের ওপর নির্ভর করে, আর আইন আসে রাষ্ট্র থেকে। সেখানে প্রত্যেকের আছে
"প্রাকৃতিক অধিকার", অর্থাৎ নিজের জীবন রক্ষার জন্য যা প্রয়োজন তা করার
স্বাধীনতা। এমনকি অন্যের ওপরও সবার অধিকার থাকে, যা সংঘর্ষকে
আরও বাড়ায়।
প্রকৃতির
রাজ্য থেকে মুক্তি
মৃত্যুভয় ও
আরামদায়ক জীবনের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে যুক্তির পথে চালিত করে। যুক্তি তাকে কিছু
"প্রাকৃতিক আইন" বোঝায়, যার প্রথমটি হলো শান্তি খোঁজা, আর
দ্বিতীয়টি হলো শান্তির স্বার্থে নিজের কিছু অধিকার ছেড়ে দেওয়া। এভাবে মানুষ সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে
নিজেদের অধিকার একজন সার্বভৌম শাসক বা পরিষদের হাতে অর্পণ করে। এই সার্বভৌম
"লেভিয়াথান" নামক কৃত্রিম দানবের মতো, যার হাতে
আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকে। হবসের মতে এই সার্বভৌমের ক্ষমতা
অবিভাজ্য ও নিরঙ্কুশ; প্রজারা কেবল আত্মরক্ষার অধিকার ধরে রাখে।
মূল্যায়ন
হবসের
দর্শনের গুরুত্ব হলো, তিনি রাষ্ট্রের উৎপত্তিকে ঐশ্বরিক অধিকারের বদলে মানুষের
সম্মতি ও যুক্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন, যা পরবর্তীকালে লক ও রুশোর চুক্তিতত্ত্বের পথ
খুলে দেয়। তবে সমালোচকদের মতে মানুষ সম্পর্কে তাঁর ধারণা অতিমাত্রায় নেতিবাচক;
মানুষের মধ্যে সহযোগিতা, সহানুভূতি ও সামাজিকতার সহজাত দিকও আছে। তাঁর নিরঙ্কুশ
সার্বভৌমত্বের তত্ত্ব স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করে বলেও সমালোচিত। লক মনে করতেন
প্রকৃতির রাজ্য মূলত শান্তিপূর্ণ ও যুক্তিনির্ভর, আর রুশো একে
সরল ও মুক্ত অবস্থা বলে দেখেছেন, যা হবসের চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত।
উপসংহার
হবসের মতে
মানুষ স্বভাবতই আত্মরক্ষাপরায়ণ, ক্ষমতালোভী ও ভীতিগ্রস্ত। এই স্বভাবের কারণে
কর্তৃপক্ষহীন প্রকৃতির রাজ্য হয়ে ওঠে নিরন্তর দ্বন্দ্ব ও আতঙ্কের স্থান। এই
ভয়াবহ অবস্থা থেকে বাঁচতেই মানুষ যুক্তি দিয়ে চুক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী রাষ্ট্র
গড়ে তোলে। যদিও তাঁর মানব প্রকৃতির চিত্র ও নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের ধারণা
বিতর্কিত, আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের ভিত্তি নির্মাণে হবসের অবদান
অনস্বীকার্য।
টমাস হবসের রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হলো তাঁর
মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কিত এক নির্মম বাস্তববাদী ও নৈরাশ্যবাদী
মূল্যায়ন। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ **'লেভিয়াথান' (Leviathan, 1651)** -এ দেখাতে চেয়েছেন যে, মানুষ স্বভাবতই
সহিংস ও স্বার্থপর, এবং রাষ্ট্র ও
সরকারব্যবস্থা ছাড়া মানুষের জীবন অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। এই ধারণা থেকেই তিনি
শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্রের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করেন।
### 🧬
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে
হবসের ধারণা
হবসের মতে, মানুষ জন্মগতভাবেই **স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক এবং ক্ষমতার লোভী**। মানুষের
প্রতিটি কাজের পেছনে থাকে নিজের স্বার্থ এবং আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি। তাঁর মতে,
মানব প্রকৃতিতে এমন তিনটি
প্রধান প্রবণতা রয়েছে যা মানুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘাতে ঠেলে দেয়:
1. **প্রতিযোগিতা (Competition):**
মানুষ সম্পদ, সম্মান এবং ক্ষমতার জন্য একে অপরের সাথে
নিরন্তর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। এই প্রতিযোগিতা থেকেই জন্ম নেয় সহিংসতা।
2. **অবিশ্বাস (Diffidence):**
মানুষ জানে যে অন্যরা
যেকোনো মুহূর্তে তার সম্পদ বা জীবন কেড়ে নিতে পারে। এই অবিশ্বাসের কারণে মানুষ
নিজের সুরক্ষার জন্য আগে থেকেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
3. **গৌরব (Glory):**
মানুষ চায় অন্যরা তাকে
সম্মান করুক এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করুক। এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের আকাঙ্ক্ষা
থেকে জন্ম নেয় অহংকার এবং অপরের উপর আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা।
এই তিনটি প্রবৃত্তি একত্রে মানুষকে একটি
চিরস্থায়ী সংঘাতের দিকে নিয়ে যায়।
### 🌍
প্রকৃতির রাজ্য (State
of Nature)
এই মানব প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিণতিই হলো **'প্রকৃতির রাজ্য'**। হবসের মতে, রাষ্ট্র বা সরকার গঠনের আগে মানুষ এই অবস্থায়
বাস করত। এটি ছিল একটি **অরাজক, বিশৃঙ্খল এবং
হিংস্র** অবস্থা, যেখানে কোনো আইন,
বিচারব্যবস্থা বা
নৈতিকতার অস্তিত্ব ছিল না।
এই অবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:
- **সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ:** যেহেতু কোনো
সার্বভৌম শক্তি নেই যে শৃঙ্খলা বজায় রাখবে, তাই প্রত্যেক ব্যক্তিই প্রত্যেকের সাথে যুদ্ধে
লিপ্ত থাকে। হবস এটিকে বলেছেন **"সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ" (War
of all against all)**।
- **জীবনের ভয়াবহতা:** এই অবস্থায় মানুষের জীবন
ছিল অত্যন্ত অনিশ্চিত ও নিকৃষ্ট। হবস তাঁর বিখ্যাত উক্তিতে এই জীবনকে বর্ণনা
করেছেন ως **"নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, কদর্য, পাশবিক এবং সংক্ষিপ্ত" (solitary, poor, nasty, brutish, and
short)**।
- **ন্যায়-অন্যায়ের অনুপস্থিতি:** যেহেতু কোনো
আইন নেই, তাই এই অবস্থায়
**ন্যায় বা অন্যায়, ঠিক বা ভুল** বলে
কিছু নেই। প্রত্যেকেরই সবকিছুর উপর একটি "প্রাকৃতিক অধিকার" (Natural
Right) রয়েছে, যা অনিবার্যভাবে সংঘাতের দিকে নিয়ে যায়।
### 🔗
উপসংহার
হবসের মতে, মানব প্রকৃতির এই ভয়াবহ বাস্তবতা এবং প্রকৃতির
রাজ্যের অসহনীয় দুর্দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই মানুষ **আত্মরক্ষার সহজাত
প্রবৃত্তি** থেকে একটি **সামাজিক চুক্তির (Social Contract)** মাধ্যমে নিজেদের স্বাধীনতা একটি শক্তিশালী
সার্বভৌম শাসকের (লেভিয়াথান) হাতে তুলে দেয়। এই শাসকই শান্তি ও নিরাপত্তা
প্রতিষ্ঠা করেন। তাই হবসের মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্যের ধারণা মূলত একটি
শক্তিশালী, কেন্দ্রীভূত
রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তাকে যৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই গৃহীত হয়েছিল।
প্রকৃতির রাজ্য ও মানব প্রকৃতিবাদ সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা
ভূমিকা
টমাস হবস (Thomas Hobbes) ছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত ইংরেজ রাজনৈতিক দার্শনিক। তিনি ১৫৮৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৭৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ
Leviathan (১৬৫১) আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা ও সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হবসের রাজনৈতিক দর্শনের দুটি মৌলিক বিষয় হলো মানব প্রকৃতি এবং প্রকৃতির রাজ্য। মানুষের স্বভাব, স্বার্থ, ভয় ও নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা কীভাবে রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজন সৃষ্টি করে, তা তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।
১. মানব প্রকৃতি সম্পর্কে হবসের ধারণা
হবসের মতে, মানুষের আচরণ বুঝতে হলে তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও স্বার্থকে বুঝতে হবে। তাঁর মানব প্রকৃতিবাদ মূলত বস্তুবাদী ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
মানব প্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য
ক. আত্মস্বার্থপরতা: হবস মনে করতেন,
মানুষ সাধারণত নিজের স্বার্থ, সুখ ও সুবিধা অর্জনের জন্য কাজ করে। নিজের জীবন ও স্বার্থ রক্ষা মানুষের আচরণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
খ. আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি: মানুষের মধ্যে নিজের জীবন রক্ষার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। বিপদ ও মৃত্যুর ভয় মানুষকে নিরাপত্তা খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করে।
গ. ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা: হবসের মতে,
মানুষ ভবিষ্যতে নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণের উপায় নিশ্চিত করতে ক্ষমতা অর্জন করতে চায়। ফলে মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়।
ঘ. প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব: সীমিত সম্পদ, লাভের আকাঙ্ক্ষা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।
ঙ. সমতার ধারণা: হবস মনে করতেন, মানুষ শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতায় সম্পূর্ণ সমান না হলেও এতটা সমান যে দুর্বল ব্যক্তিও কৌশল বা সহযোগিতার মাধ্যমে শক্তিশালী ব্যক্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
চ. যুক্তিবোধ: মানুষ কেবল প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত হয় না; সে যুক্তির সাহায্যে নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার উপায়ও নির্ধারণ করতে পারে। এই যুক্তিবোধই মানুষকে শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় অনুসন্ধানে সাহায্য করে।
সুতরাং,
হবসের মতে, মানুষ স্বার্থসচেতন, ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী এবং আত্মরক্ষায় আগ্রহী। তবে মানুষ যুক্তির সাহায্যে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য নিয়ম প্রতিষ্ঠা করতেও সক্ষম।
২. প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে হবসের ধারণা
প্রকৃতির রাজ্য কী?
হবসের মতে, প্রকৃতির রাজ্য
(State of Nature) হলো এমন একটি কাল্পনিক অবস্থা, যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় সরকার,
কার্যকর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ বা বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতাসম্পন্ন সার্বভৌম শক্তি থাকে না। এ অবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করে এবং নিজের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব নিজেই পালন করে।
Stanford
Encyclopedia of Philosophy
+1
প্রকৃতির রাজ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য
ক. সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ
হবসের প্রকৃতির রাজ্য তত্ত্বের মূল কথা হলো
War of All Against All বা সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ। সাধারণ কর্তৃত্ব না থাকায় প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্যের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।
খ. মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা
প্রত্যেকে আশঙ্কা করে যে অন্য কেউ তাকে আক্রমণ করতে পারে। ফলে পারস্পরিক অবিশ্বাস,
ভয় ও আত্মরক্ষার প্রবণতা মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলে।
গ. সীমাহীন প্রাকৃতিক অধিকার
হবসের মতে, প্রকৃতির রাজ্যে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের জীবন রক্ষার জন্য যা প্রয়োজন বলে মনে করে, তা করার অধিকার দাবি করে। কিন্তু সবাই যখন সবকিছুর ওপর অধিকার দাবি করে, তখন সংঘাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
ঘ. আইন ও ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি
প্রকৃতির রাজ্যে কার্যকর সাধারণ আইন এবং তা প্রয়োগ করার মতো কর্তৃপক্ষ নেই। তাই হবসের বিশ্লেষণে,
সেখানে প্রতিষ্ঠিত আইনি অর্থে ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকে না। এটি অবশ্য এই অর্থে নয় যে মানুষের মধ্যে যুক্তি বা শান্তির কোনো ধারণাই নেই।
ঙ. জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা
নিরাপত্তার অভাবে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন,
ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ ও জ্ঞানচর্চায় নিশ্চিন্তে মনোযোগ দিতে পারে না। হবস তাঁর
Leviathan গ্রন্থে এই জীবনকে নিঃসঙ্গ,
দরিদ্র, কষ্টকর, হিংস্র ও স্বল্পস্থায়ী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
Stanford
Encyclopedia of Philosophy
+1
৩. প্রকৃতির রাজ্য থেকে মুক্তির উপায়
হবস মনে করতেন,
মানুষ চিরকাল সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় থাকতে চায় না। তার মধ্যে যুক্তিবোধ ও আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি রয়েছে। তাই মানুষ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি উপায় গ্রহণ করতে পারে।
1. শান্তির আকাঙ্ক্ষা: মানুষ উপলব্ধি করে যে যুদ্ধের চেয়ে শান্তিপূর্ণ জীবন অধিক নিরাপদ।
2. প্রাকৃতিক আইন অনুসরণ: যুক্তির সাহায্যে মানুষ বুঝতে পারে যে শান্তি বজায় রাখা এবং পারস্পরিক অধিকার সীমিত করা সবার স্বার্থের জন্য উপকারী।
3. সামাজিক চুক্তি সম্পাদন: মানুষ পরস্পরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নিজেদের ক্ষমতা ও অধিকার প্রয়োগের একটি সাধারণ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে।
4. সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা: চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ আইন প্রয়োগ করে,
অপরাধ দমন করে এবং শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখে।
এভাবেই হবসের মতে,
প্রকৃতির রাজ্যের অনিশ্চয়তা থেকে মানুষ রাজনৈতিক সমাজ ও রাষ্ট্রের অধীনে প্রবেশ করে।
Stanford
Encyclopedia of Philosophy
+1
৪. মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক
হবসের মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কিত ধারণা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
|
মানব প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য |
প্রকৃতির রাজ্যে এর প্রভাব |
|
আত্মস্বার্থপরতা |
ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে সংঘাত সৃষ্টি হয় |
|
ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা |
ক্ষমতা ও সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ে |
|
আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি |
অন্যের আক্রমণের ভয়ে মানুষ আগে আঘাত করতে পারে |
|
পারস্পরিক অবিশ্বাস |
নিরাপত্তাহীনতা ও যুদ্ধের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায় |
|
যুক্তিবোধ |
শান্তি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হয় |
এই সম্পর্ক থেকেই বোঝা যায়,
হবসের কাছে রাষ্ট্র কেবল শাসনের প্রতিষ্ঠান নয়;
এটি মানুষের জীবন,
নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় একটি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ।
Stanford
Encyclopedia of Philosophy
+1
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়,
টমাস হবসের মানব প্রকৃতিবাদ ও প্রকৃতির রাজ্য তত্ত্ব তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি। তাঁর মতে, মানুষের আত্মস্বার্থ,
ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা,
ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে,
যেখানে প্রত্যেকের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য মানুষ সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। তাই হবসের দর্শনে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য হলো শান্তি, শৃঙ্খলা ও মানুষের জীবন রক্ষা করা।
পরীক্ষার প্রস্তুতির টিপস: এই প্রশ্নের উত্তরে বিশেষভাবে মনে রাখবে—মানব প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য,
State of Nature, War of All Against All, প্রাকৃতিক আইন,
সামাজিক চুক্তি এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা। এই বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে ব্যাখ্যা করলে উত্তরটি পূর্ণাঙ্গ হবে।
**টমাস হবসের (১৫৮৮–১৬৭৯)** রাষ্ট্রচিন্তার
কেন্দ্রে আছে দুটি ধারণা: **মানব প্রকৃতি** এবং **প্রকৃতির রাজ্য** (state
of nature)। এ দুটিই তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ *Leviathan*
(১৬৫১)-এর ভিত্তি।
### মানব প্রকৃতি
হবস মানুষকে যান্ত্রিক ও বস্তুবাদী দৃষ্টিতে
দেখেন। তাঁর মতে মানুষ মূলত **আত্মস্বার্থপর**।
- মানুষের কর্মের চালিকাশক্তি হলো **ইচ্ছা (appetite)**
ও **বিরাগ (aversion)**। মানুষ যা ভালো মনে করে তা চায়, যা খারাপ মনে করে তা এড়ায়।
- সবচেয়ে মৌলিক প্রবণতা হলো **আত্মরক্ষা**।
মৃত্যুর ভয় এবং সুখী জীবনের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে চালিত করে।
- মানুষ ক্রমাগত **ক্ষমতা** চায়—“power
after power”—কারণ বর্তমান ক্ষমতা
ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।
- শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতায় মানুষ প্রায় সমান।
দুর্বলও চতুরতা বা জোটের মাধ্যমে শক্তিশালীকে হত্যা করতে পারে। এই সমতাই অবিশ্বাস
ও সংঘাতের জন্ম দেয়।
হবস মানুষকে স্বভাবতই খারাপ বলেন না, কিন্তু বলেন যে বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে
স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য।
### প্রকৃতির রাজ্য
প্রকৃতির রাজ্য হলো এমন একটি কাল্পনিক অবস্থা
যেখানে কোনো সার্বভৌম শাসক, আইন বা রাষ্ট্র
নেই। সেখানে—
- প্রত্যেকের **প্রাকৃতিক অধিকার** আছে নিজের
জীবন রক্ষার জন্য যা খুশি তাই করার, এমনকি অন্যের জিনিসের ওপরও।
- কোনো সাধারণ আইন না থাকায় **ন্যায়-অন্যায়,
ন্যায়বিচার বা
সম্পত্তির** ধারণা থাকে না।
- ফলে সৃষ্টি হয় **সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ**
(*bellum omnium contra omnes*)।
- হবসের বিখ্যাত বর্ণনা: এমন জীবন **“একাকী,
দরিদ্র, নোংরা, পশুসুলভ ও স্বল্পস্থায়ী”** (*solitary, poor, nasty, brutish, and
short*)।
এই অবস্থায় নিরাপত্তা নেই, শিল্প-বাণিজ্য-জ্ঞানচর্চা বিকশিত হয় না,
কারণ কেউ নিশ্চিত নয় যে
তার শ্রমের ফল সে ভোগ করতে পারবে।
### দুই ধারণার সম্পর্ক
মানব প্রকৃতির আত্মস্বার্থ ও ক্ষমতালিপ্সাই
প্রকৃতির রাজ্যকে যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করে। কিন্তু মানুষের মধ্যে **যুক্তি**ও
আছে। মৃত্যুর ভয় ও শান্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে তারা বুঝতে পারে যে প্রাকৃতিক অধিকার
ত্যাগ করে একটি চুক্তির মাধ্যমে সর্বশক্তিমান সার্বভৌম (*Leviathan*) তৈরি করাই একমাত্র উপায়। এই চুক্তি থেকেই
রাষ্ট্রের জন্ম—যার কাজ হলো প্রকৃতির রাজ্যের বিশৃঙ্খলা থেকে মানুষকে রক্ষা করা।
সংক্ষেপে, হবসের কাছে প্রকৃতির রাজ্য মানব প্রকৃতির
যৌক্তিক পরিণতি, আর রাষ্ট্র হলো
সেই প্রকৃতি থেকে বাঁচার জন্য মানুষের যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
সতেরো শতকের
বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবস (Thomas
Hobbes, ১৫৮৮–১৬৭৯) তাঁর অমূল্য
গ্রন্থ 'লেভিয়াথান'
(Leviathan, ১৬৫১)-এ
মানবপ্রকৃতি এবং রাষ্ট্রের উৎপত্তির পূর্ববর্তী অবস্থা বা
"প্রকৃতির রাজ্য" (State of Nature) সম্পর্কে এক
যুগান্তকারী ও মৌলিক ধারণা প্রদান করেছেন।
হবসের
রাষ্ট্রদর্শন বুঝতে হলে তাঁর 'মানব
প্রকৃতি' এবং 'প্রকৃতির
রাজ্য' সংক্রান্ত আলোচনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই
দুটি ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তিনি তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক চুক্তির (Social
Contract) তত্ত্ব গড়ে তুলেছেন।
১. মানব
প্রকৃতি (Human Nature) সম্পর্কে হবসের ধারণা
হবস মানব
প্রকৃতিকে অত্যন্ত বাস্তববাদী, মনস্তাত্ত্বিক এবং কিছুটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে
বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে:
- স্বার্থপরতা ও আত্মরক্ষা: মানুষ জন্মগতভাবেই স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক এবং নিজের স্বার্থ রক্ষায় সদা তৎপর।
মানুষের প্রতিটি কাজের মূল চালিকাশক্তি হলো আত্মরক্ষা (Self-preservation)
এবং সুখ ভোগ বা আনন্দ লাভ।
- ক্ষমতার সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা: হবস মনে করতেন, মানুষের
মধ্যে ক্ষমতার জন্য এক চিরন্তন ও অবিরাম আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান। একটি ক্ষমতা
লাভের পর মানুষ আরও বড় ক্ষমতার পেছনে ছোটে, যার
শেষ হয় কেবল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
- প্রাকৃতিক সমতা: হবস বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃতিগতভাবে সব মানুষই
প্রায় সমান। শারীরিক বা মানসিকভাবে কেউ কারও চেয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারে,
কিন্তু সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও কৌশল বা জোটবদ্ধ
হয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষকে হত্যা করার ক্ষমতা রাখে। এই 'সমতা' মানুষের মধ্যে
নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি না করে বরং পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও প্রতিযোগিতা তৈরি করে।
- সংঘাতের তিনটি প্রধান কারণ: হবসের মতে, মানুষের
এই প্রকৃতির কারণে সমাজে সংঘাতের তিনটি মূল কারণ দেখা দেয়:
- প্রতিযোগিতা (Competition): সম্পদ ও লাভ অর্জনের জন্য।
- অবিশ্বাস বা ভয় (Diffidence/Distrust):
নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
- মহিমা বা অহংকার (Glory): সুনাম ও সম্মান অর্জনের জন্য।
২. প্রকৃতির
রাজ্য (State of Nature)
'প্রকৃতির
রাজ্য' বলতে হবস এমন একটি সময় বা কাল্পনিক অবস্থাকে বুঝিয়েছেন,
যেখানে কোনো সরকার,
আইন, পুলিশ, আদালত বা
রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা ছিল না। মানুষ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়মে ও পূর্ণ স্বাধীনতায়
বসবাস করত।
প্রকৃতির
রাজ্য সম্পর্কে হবসের প্রধান পর্যবেক্ষণসমূহ:
ক. সবার
বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ ("War of all against all")
যেহেতু কোনো
সর্বোচ্চ শাসনকর্তা বা আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ছিল না, তাই প্রতিটি
মানুষ ছিল অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। হবস প্রকৃতির রাজ্যকে বর্ণনা করেছেন "Homo homini lupus" (মানুষ
মানুষের জন্য নেকড়ে) এবং "Bellum omnium
contra omnes" (সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ) অবস্থা হিসেবে।
খ. জীবনের
অনিশ্চয়তা ও ভয়
প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল চরম অনিরাপদ। কে কখন কার সম্পদ কেড়ে নেবে বা কাকে হত্যা
করবে—তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ফলে মানুষ সর্বদা মৃত্যুর ভয়ে ভীত থাকত।
গ. আইন ও
ন্যায়-অন্যায়ের অনুপস্থিতি
হবসের মতে,
যেখানে কোনো সার্বভৌম ক্ষমতা নেই, সেখানে কোনো
আইন নেই; আর যেখানে আইন নেই, সেখানে
ন্যায় (Justice) বা অন্যায় (Injustice) বলে কিছু
থাকে না। জোর যার মুলুক তার—এটাই ছিল প্রকৃতির রাজ্যের মূল নীতি।
ঘ. সভ্যতার
বিকাশের অভাব
আইন-শৃঙ্খলা
না থাকায় প্রকৃতির রাজ্যে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য,
সংস্কৃতি, বিজ্ঞান বা কোনো প্রকার সভ্যতার বিকাশ সম্ভব ছিল না।
মানুষ কেবল টিকে থাকার চরম লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকত।
হবসের
বিখ্যাত উক্তি:
প্রকৃতির
রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল "solitary, poor,
nasty, brutish, and short" (একাকী, দরিদ্র, নোংরা,
পশুতুল্য এবং ক্ষণস্থায়ী)।
৩. প্রকৃতির
রাজ্য থেকে উত্তরণ: প্রাকৃতিক আইন ও চুক্তি
যদিও
মানুষের প্রকৃতি স্বার্থপর, তবে হবসের মতে মানুষের মধ্যে 'যুক্তি'
(Reason) এবং 'মৃত্যুভয়'
বিদ্যমান।
- মানুষ বুঝতে পারে যে প্রকৃতির রাজ্যে বাস করলে
যেকোনো মুহূর্তে তার জীবন বিনষ্ট হতে পারে।
- এই ভয় থেকে মুক্ত হতে এবং শান্তিতে বেঁচে থাকার
জন্য মানুষ তার যুক্তি প্রয়োগ করে নিজেদের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তি (Social Contract) সম্পাদন করে।
- এই চুক্তির মাধ্যমে তারা তাদের নিজেদের শাসন করার
প্রাকৃতিক অধিকারগুলো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির (রাজা) বা একটি নির্দিষ্ট
প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয় এবং জন্ম হয় পরম শক্তিশালী 'লেভিয়াথান' বা
রাষ্ট্রব্যবস্থার।
সারসংক্ষেপ
|
বিষয় |
হবসের মূল ভাবনা |
|
মানব
প্রকৃতি |
স্বার্থপর,
ক্ষমতালোভী, আত্মরক্ষাকামী এবং প্রাকৃতিক দিক থেকে সমান। |
|
প্রকৃতির
রাজ্য |
আইন ও
শাসকহীন এক নৈরাজ্যময় অবস্থা, যেখানে সবাই সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। |
|
জীবনের
রূপ |
একাকী,
দরিদ্র, নোংরা, পশুতুল্য এবং সংক্ষিপ্ত। |
|
সমাধান |
সার্বভৌম
কর্তৃপক্ষের অধীনে সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন। |
সংক্ষেপে,
টমাস হবস মানব প্রকৃতির নৈরাজ্যিক রূপ এবং প্রকৃতির রাজ্যের চরম বিশৃঙ্খলা
তুলে ধরে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও
ব্যক্তির নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য একটি শক্তিশালী
পরম সার্বভৌম রাষ্ট্র বা সরকারের উপস্থিতি অপরিহার্য।
সপ্তদশ
শতাব্দীর ইংলিশ দার্শনিক টমাস হবস (Thomas Hobbes) তাঁর
বিখ্যাত 'লেভিয়াথান'
(Leviathan) (১৬৫১) গ্রন্থে মানব প্রকৃতি এবং প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে
বিস্তারিত মতবাদ তুলে ধরেছেন। নিচে তাঁর ধারণা সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো: [1]
১. মানব
প্রকৃতি (Human Nature)
হবসের মতে,
মানুষ জন্মগতভাবে সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রাণী নয়; বরং মানুষের
স্বভাব ও আচরণ পরিচালিত হয় সম্পূর্ণ বস্তুবাদী, যান্ত্রিক ও
আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। মানব প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর প্রধান ধারণাগুলো
হলো: [1,
2,
3]
- স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা: মানুষ মূলত নিজের স্বার্থ, আত্মরক্ষা এবং সুখ অর্জনের পেছনে ছোটে। অন্যের
কল্যাণ বা নৈতিকতার চেয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা তার কাছে প্রধান।
[1,
2]
- ক্ষমতার স্পৃহা: হবস মনে করতেন, মানুষের
মধ্যে ক্ষমতা লাভের এক অন্তহীন ও চিরন্তন ইচ্ছা থাকে, যা মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে।
- ভয় ও সমতা: হবসের মতে, দৈহিক
ও মানসিক শক্তির দিক থেকে মানুষের মধ্যে একধরনের প্রাকৃতিক সমতা রয়েছে।
সবচেয়ে দুর্বল মানুষটাও কৌশলে বা অন্যের সাথে মিলে সবচেয়ে সবল মানুষকে মেরে
ফেলতে পারে। এছাড়া মানুষের মনে সবচেয়ে বড় ভয় হলো **‘সহিংস মৃত্যু’**র ভয়।
[1,
2,
3]
- আবেগের প্রাধান্য: মানুষের বিবেক বা যুক্তির চেয়ে তার আবেগ, লোভ, ভয় এবং অহংকার তার
আচরণ বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। [1,
2]
২. প্রকৃতির
রাজ্য (State of Nature)
রাষ্ট্র
কিংবা কোনো আইন সৃষ্টির আগের অবস্থাকে টমাস হবস ‘প্রকৃতির রাজ্য’ বা ‘প্রাকৃতিক
অবস্থা’ বলে অভিহিত করেছেন। এই রাজ্য ছিল সম্পূর্ণ প্রাক্-সামাজিক এবং প্রাক্-রাজনীতিমুক্ত। প্রকৃতির
রাজ্যের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো: [1,
2]
- সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ (War of All
Against All): যেহেতু ওপরের কোনো নিয়ন্ত্রণকারী বা সার্বভৌম
ক্ষমতা ছিল না, তাই প্রত্যেকে নিজের নিরাপত্তার জন্য এবং একই
সম্পদের ওপর লোভের বশবর্তী হয়ে অন্যের শত্রু হয়ে ওঠে। ফলে সেখানে অবিরাম
সংঘাত ও যুদ্ধ লেগেই থাকত। [1]
- জীবন ছিল দুর্বিষহ: এই অবস্থায় মানুষের জীবন সম্পর্কে হবসের বিখ্যাত
উক্তিটি হলো— মানুষের জীবন ছিল “একাকী, দীনহীন,
হীনম্মন্য, পাশবিক
এবং সংক্ষিপ্ত” (solitary, poor, nasty, brutish and short)।
[1]
- নৈতিকতার অভাব: প্রকৃতির রাজ্যে ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পুণ্য বা বৈধ-অবৈধ বলতে কিছু ছিল না। যার যা
ইচ্ছা সে তা করতে পারত এবং যার যতটুকু শক্তি ছিল, সে
ততটুকু সম্পদের মালিক হতে পারত (জোর যার মুলুক তার)।
[1]
- উন্নয়নের সুযোগহীনতা: সার্বক্ষণিক আতঙ্ক ও লড়াইয়ের কারণে সেখানে কৃষি,
শিল্প, বাণিজ্য, বিজ্ঞান বা শিল্পকলার বিকাশের কোনো সুযোগ ছিল না।
[1]
৩. প্রকৃতির
রাজ্য থেকে পরিত্রাণ ও সামাজিক চুক্তি
প্রকৃতির
রাজ্যের এই চরম ভয়ংকর ও অরাজক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ নিজেদের
বুদ্ধিমত্তা ও আত্মরক্ষার তাগিদে একত্রিত হয়। সবাই মিলে একটি সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে
নিজেদের সমস্ত ক্ষমতা ও স্বাধীনতা একজন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী শাসক বা সার্বভৌম
কর্তৃপক্ষের (লেভিয়াথান) হাতে সমর্পণ করে। এই চুক্তির মাধ্যমেই সৃষ্টি হয় রাষ্ট্র
এবং আইনের শাসন। [1,
2,
3,
4]
No comments:
Post a Comment