### *হবসের সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব - চরম ক্ষমতার পক্ষে যুক্তি*
*টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯)* - ইংল্যান্ডের দার্শনিক।
তার বিখ্যাত বই *"Leviathan" (১৬৫১)*। লেভিয়াথান মানে বিশাল দৈত্য - তিনি রাষ্ট্রকে এই দৈত্যের সাথে তুলনা
করেছেন।
হবসের সময় ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধ চলছিল
(১৬৪২-১৬৫১)। রাজা বনাম পার্লামেন্ট - রক্তারক্তি। চারদিকে অরাজকতা। এই অরাজকতা
দেখে হবস বললেন - মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে একজন চরম ক্ষমতাধর শাসক লাগবে, যার ক্ষমতার কোনো সীমা থাকবে না।
#### *১. হবসের সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের ভিত্তি - ৩টি
ধাপে বুঝো*
হবসের যুক্তি শুরু হয় মানুষ থেকে, শেষ হয় রাষ্ট্রে।
*ধাপ ১: মানব প্রকৃতি*
হবস বলেন, মানুষ স্বার্থপর, লোভী, হিংসুক ও ক্ষমতালোভী। "মানুষ মানুষের জন্য নেকড়ে"।
*ধাপ ২: প্রকৃতির রাজ্য (State of
Nature)*
রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বাস
করতো। সেখানে কোনো আইন, পুলিশ, আদালত ছিল না।
হবসের ভাষায় সেই জীবন ছিল - *"Solitary,
poor, nasty, brutish and short"* অর্থাৎ
"নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, কুৎসিত, পাশবিক ও ক্ষণস্থায়ী।"
সেখানে চলতো *"Bellum omnium
contra omnes"* - সবার বিরুদ্ধে
সবার যুদ্ধ। আজ তুমি আমাকে মারবে, কাল আমি তোমাকে।
*ধাপ ৩: সামাজিক চুক্তি ও লেভিয়াথানের জন্ম*
এই ভয়ঙ্কর জীবন থেকে বাঁচতে মানুষ একটা চুক্তি
করলো।
চুক্তিটি হলো: "আমরা সবাই আমাদের সব
অধিকার ও স্বাধীনতা একজন ব্যক্তি বা সভার হাতে তুলে দিলাম, শর্ত একটাই - সে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা
দেবে।"
যার হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হলো, তিনিই *সার্বভৌম* বা *লেভিয়াথান*।
#### *২. হবসের সার্বভৌমের ৭টি বৈশিষ্ট্য - চরম
ক্ষমতার পক্ষে যুক্তি*
এখানেই হবস চরম ক্ষমতাকে সমর্থন করেন।
*১. সার্বভৌম ক্ষমতা চরম ও নিরঙ্কুশ (Absolute):*
সার্বভৌমের ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। তার আদেশই
আইন। সে আইনের ঊর্ধ্বে। তাকে কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। কারণ, যদি তার ক্ষমতা সীমিত হয়, তাহলে আবার অরাজকতা ফিরে আসবে।
*২. সার্বভৌম ক্ষমতা অবিভাজ্য (Indivisible):*
ক্ষমতাকে ভাগ করা যাবে না। আইন, শাসন, বিচার - সব ক্ষমতা একজনের হাতে থাকবে। মন্টেস্কুর মতো ক্ষমতা ভাগ করলে রাষ্ট্র
দুর্বল হবে।
*৩. সার্বভৌম ক্ষমতা স্থায়ী (Permanent):*
একবার চুক্তি হয়ে গেলে তা আর ভাঙা যাবে না।
জনগণ চাইলেও সার্বভৌমকে সরাতে পারবে না। কারণ চুক্তি জনগণ নিজেদের মধ্যে করেছে,
সার্বভৌমের সাথে নয়।
সার্বভৌম চুক্তির পক্ষ নয়, ফল।
*৪. আইনের উৎস সার্বভৌম:*
সার্বভৌম যা বলবে তাই আইন। ন্যায়-অন্যায়,
ভালো-মন্দ নির্ধারণ করবে
সার্বভৌম। তার আদেশ অমান্য করা মানেই প্রকৃতির রাজ্যে ফিরে যাওয়া।
*৫. সার্বভৌমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না:*
জনগণের বিদ্রোহ করার কোনো অধিকার নেই। এমনকি
সার্বভৌম যদি অত্যাচারীও হয়, তবুও তাকে মেনে
নিতে হবে। কারণ অত্যাচারী শাসকও নৈরাজ্যের চেয়ে ভালো।
*৬. সার্বভৌম যুদ্ধ ও শান্তি ঘোষণা করবে:*
বৈদেশিক নীতি, সেনাবাহিনী, সব তার হাতে।
*৭. সার্বভৌম ধর্মেরও নিয়ন্ত্রক:*
চার্চকেও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ করবে, যাতে ধর্মের নামে গৃহযুদ্ধ না হয়।
#### *৩. চরম ক্ষমতার পক্ষে হবসের যুক্তি - কেন চরম
ক্ষমতা দরকার?*
হবস ৪টি যুক্তি দেন:
১.
*নিরাপত্তার যুক্তি:* মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য শক্তিশালী শাসক ছাড়া
বিকল্প নেই।
2. *শৃঙ্খলার
যুক্তি:* মানুষ স্বভাবত উচ্ছৃঙ্খল। তাদের শৃঙ্খলায় রাখতে ভয় দরকার।
3. *ঐক্যের যুক্তি:*
ক্ষমতা ভাগ হলে গৃহযুদ্ধ হয়। ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ তার প্রমাণ। তাই ক্ষমতা এক
হাতে থাকা দরকার।
4. *চুক্তির যুক্তি:*
জনগণ নিজেরাই তো সব ক্ষমতা দিয়ে দিয়েছে। এখন ফেরত চাইতে পারে না।
#### *৪. সমালোচনা - হবসের তত্ত্বের দুর্বলতা*
১.
*স্বৈরাচারের সমর্থন:* হবসের তত্ত্ব দিয়ে হিটলার, মুসোলিনির মতো স্বৈরাচারকে বৈধতা দেওয়া যায়।
2. *একপাক্ষিক
চুক্তি:* চুক্তি তো দুই পক্ষের মধ্যে হয়। কিন্তু হবসের চুক্তিতে সার্বভৌমের কোনো
দায়িত্ব নেই, শুধু অধিকার আছে।
3. *মানব প্রকৃতির
ভুল ব্যাখ্যা:* মানুষ শুধু খারাপ নয়, মানুষের মধ্যে সহযোগিতা, ভালোবাসাও আছে।
4. *বিপ্লবের অধিকার
অস্বীকার:* জনগণের যদি বিদ্রোহের অধিকার না থাকে, তাহলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানও অন্যায় হয়ে যায় -
যা অযৌক্তিক।
5. *আইনকে শুধু আদেশ
মনে করা:* আইন শুধু শাসকের আদেশ নয়, আইনের পেছনে ন্যায়বোধও থাকে।
#### *৫. তবুও হবস কেন গুরুত্বপূর্ণ?*
হবস প্রথম বলেছেন - রাষ্ট্র ঈশ্বর সৃষ্টি করেনি,
মানুষ নিজের প্রয়োজনে
চুক্তি করে রাষ্ট্র বানিয়েছে। এটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রতত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রথম
আঘাত। এবং তিনি আধুনিক *সার্বভৌমত্বের* ধারণা দিয়েছেন। তার হাত ধরেই জন অস্টিন,
বোদ্যাঁ সার্বভৌমত্বের
তত্ত্ব গড়ে তুলেছেন।
*পরীক্ষায় লেখার জন্য এক লাইনে:*
> "হবসের মতে, নৈরাজ্য থেকে বাঁচতে মানুষ নিজের সব অধিকার
লেভিয়াথানকে দিয়েছে, তাই লেভিয়াথানের
ক্ষমতা চরম, অবিভাজ্য,
স্থায়ী এবং তার বিরুদ্ধে
বিদ্রোহ করা যাবে না - কারণ বিদ্রোহ মানে আবার প্রকৃতির রাজ্যে ফেরা।"
টমাস হবসের
সার্বভৌম তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো: গৃহযুদ্ধ ও সহিংস বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা পেতে
মানুষকে একটি চরম,
অবিভক্ত ও অবিচ্ছিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকতে হবে। তাঁর মতে, শান্তি ও
নিরাপত্তার জন্য সার্বভৌমের ক্ষমতা বিভাজিত, সীমিত বা
জবাবদিহিমূলক করা যায় না।[britannica][plato.stanford]
তত্ত্বের
ভিত্তি
হবসের মতে,
সরকারের অনুপস্থিতিতে মানুষ থাকে প্রকৃতির
রাজ্যে। সেখানে সবার সমান দুর্বলতা, ক্রমাগত ভয়,
প্রতিযোগিতা ও আত্মরক্ষার প্রবণতা থাকায় অবস্থা হয় “সবার বিরুদ্ধে সবার
যুদ্ধ”। এমন অবস্থায় জীবন হয় “একাকী, দরিদ্র, নিষ্ঠুর,
পশুমতো ও সংক্ষিপ্ত”।[en.wikipedia]
এই
বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচতে ব্যক্তিরা পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের প্রাকৃতিক
অধিকার ও ক্ষমতা একটি সাধারণ কর্তৃপক্ষের হাতে অর্পণ করে। এই কর্তৃপক্ষই হলো লেভাইথান বা সার্বভৌম
রাষ্ট্র, যার মূল দায়িত্ব জনগণের জীবন ও শান্তি রক্ষা করা।[britannica][britannica]
চরম ক্ষমতার
পক্ষে যুক্তি
১. শান্তি ও
নিরাপত্তার প্রয়োজন
হবসের মূল
যুক্তি হলো, সার্বভৌম ক্ষমতা যত শক্তিশালী না হয়, তত বেশি
সম্ভাবনা থাকে যে ব্যক্তিরা আবার স্বার্থ ও ভয়ে পরিচালিত হয়ে সংঘাতে জড়িয়ে
পড়বে। তাই শান্তি রক্ষার জন্য একটি সর্বোচ্চ ও কার্যকর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন,
যা আইন প্রণয়ন, বিচার, শাস্তি ও প্রতিরক্ষার ক্ষমতা একত্রে রাখবে।[egyankosh.ac][blogs.lse.ac]
২. ক্ষমতা
বিভাজন বিপজ্জনক
হবস মনে
করতেন, ক্ষমতা আইনসভা, বিচার বিভাগ
ও নির্বাহী বিভাগে বিভক্ত করলে সেগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে। এই দ্বন্দ্ব
রাষ্ট্রকে দুর্বল করবে এবং শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধের পথ খুলে দেবে। তাই সার্বভৌম
ক্ষমতা অবশ্যই অবিভক্ত হতে হবে।[plato.stanford][iep.utm]
৩. সার্বভৌম
চুক্তির বাইরে
হবসের
ব্যাখ্যায় সামাজিক চুক্তিটি হয় ব্যক্তিদের মধ্যে, সার্বভৌমের
সঙ্গে নয়। জনগণ সার্বভৌমকে ক্ষমতা দেয়, কিন্তু
সার্বভৌম নিজে চুক্তির পক্ষ নয়। ফলে সার্বভৌম চুক্তিভঙ্গ করতে পারে না এবং জনগণ
সাধারণভাবে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের অধিকার দাবি করতে পারে না।[rep.routledge][classic.austlii.edu]
৪. সার্বভৌম
ক্ষমতা অহস্তান্তরযোগ্য ও স্থায়ী
হবসের মতে,
সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণ পুনরায় ফিরিয়ে নিতে পারে না; এটি
অহস্তান্তরযোগ্য, অবিচ্ছিন্ন ও চূড়ান্ত। কারণ যদি জনগণ ইচ্ছামতো
সার্বভৌমকে অপসারণ করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে আবার বিশৃঙ্খলার
সৃষ্টি হবে।[egyankosh.ac][egyankosh.ac]
৫.
স্বৈরাচার নয়, বেঁচে থাকার শর্ত
হবসের কাছে
চরম ক্ষমতা কোনো নৈতিক আদর্শ নয়, বরং আত্মরক্ষার যৌক্তিক ব্যবস্থা। তাঁর
যুক্তি: প্রায় যেকোনো সরকার নৈরাজ্য বা গৃহযুদ্ধের চেয়ে ভালো, কারণ
সরকারের অনুপস্থিতিতে সবাই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে।[plato.stanford][iep.utm]
সার্বভৌমের
ক্ষমতা
হবসের
সার্বভৌমের প্রধান ক্ষমতাগুলো হলো:
- আইন প্রণয়ন ও ব্যাখ্যার ক্ষমতা।
- বিচার ও শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা।
- যুদ্ধ ও শান্তি ঘোষণার ক্ষমতা।
- বিদ্রোহ দমন ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা।
- ধর্মীয় ও মতপ্রকাশের বিষয়ে প্রয়োজনীয়
নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা।[en.wikipedia][blogs.lse.ac]
তবে হবসের
মতে এই ক্ষমতার একটি সীমা আছে: সার্বভৌম যদি নাগরিকের জীবন সরাসরি
হুমকির মুখে ফেলে, তবে ব্যক্তি
আত্মরক্ষার প্রাকৃতিক অধিকার ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ সার্বভৌমের অস্তিত্বের মূল
শর্তই হলো জনগণের সুরক্ষা।[britannica][rep.routledge]
মূল্যায়ন
হবসের
তত্ত্ব রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, আইনের শাসন এবং নাগরিক শৃঙ্খলার গুরুত্ব তুলে
ধরে। বিশেষত গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা সহিংস নৈরাজ্যের প্রেক্ষাপটে
তাঁর যুক্তি বাস্তববাদী বলে মনে হয়।[plato.stanford][blogs.lse.ac]
কিন্তু
সমালোচকদের মতে, অযোগ্য বা নিষ্ঠুর সার্বভৌমের বিরুদ্ধে জনগণের কার্যত
কোনো কার্যকর প্রতিরোধের পথ না থাকায় এ তত্ত্ব স্বৈরতন্ত্রের পথ খুলে দিতে পারে।
লক ও রুশোর মতো চিন্তকরা তাই জনগণের অধিকার, সীমিত সরকার
ও জনগণের সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।[iep.utm][classic.austlii.edu]
সংক্ষেপে,
হবসের সার্বভৌম তত্ত্ব বলে—মানুষ স্বাধীনতার একটি বড় অংশ ত্যাগ করেও যদি
একটি চরম ক্ষমতার অধীনে থাকে, তবেই শান্তি, নিরাপত্তা ও সভ্য সমাজ সম্ভব।[britannica][britannica]
হবসের
সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব: চরম ক্ষমতার পক্ষে যুক্তি
ভূমিকা
টমাস হবস
(১৫৮৮–১৬৭৯) ইংল্যান্ডের একজন দার্শনিক, যাঁর
রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ লেভিয়াথান (১৬৫১) রচিত
হয়েছিল ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের (১৬৪২–১৬৫১) পটভূমিতে। রাজা ও পার্লামেন্টের
সংঘাতে দেশ যখন রক্তক্ষয়ী অরাজকতায় ডুবে যাচ্ছিল, তখন হবস
উপলব্ধি করেন যে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি অবিভাজ্য ও চরম ক্ষমতাসম্পন্ন
কর্তৃত্ব অপরিহার্য। যুক্তির ধারাবাহিকতায় তিনি মানব প্রকৃতি, প্রাকৃতিক
অবস্থা, সামাজিক চুক্তি এবং সার্বভৌম ক্ষমতার ধাপগুলো বিশ্লেষণ
করেছেন।
মানব
প্রকৃতি সম্পর্কে হবসের ধারণা
হবস মানুষকে
যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। তাঁর মতে মানুষ আত্মরক্ষা ও আত্মস্বার্থের
তাড়নায় চালিত। মানুষের মধ্যে তিনটি প্রধান কলহের কারণ রয়েছে: প্রতিযোগিতা (লাভের জন্য),
অবিশ্বাস (নিরাপত্তার জন্য) এবং গৌরবলিপ্সা
(খ্যাতির জন্য)। তাঁর বিশ্লেষণে মানুষ শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যে মোটামুটি
সমান। দুর্বলতম মানুষও কৌশল বা জোটবদ্ধতার মাধ্যমে শক্তিশালীতমকে হত্যা করতে পারে।
এই সমতা থেকে জন্ম নেয় সমান আশা, আর সমান আশা থেকে জন্ম নেয় শত্রুতা।
প্রাকৃতিক
অবস্থা
রাষ্ট্র বা
সাধারণ কর্তৃপক্ষ না থাকলে মানুষ যে অবস্থায় থাকত, হবস তাকে
"প্রাকৃতিক অবস্থা" বলেছেন। এটি হলো "সকলের বিরুদ্ধে সকলের
যুদ্ধ"। এই অবস্থায় প্রত্যেকের সবকিছুর উপর অধিকার আছে, এমনকি
অন্যের শরীরের উপরও। ফলে শিল্প, কৃষি, ব্যবসা, জ্ঞানচর্চা কিছুই সম্ভব হয় না, কারণ কোনো
ফসলের নিশ্চয়তা নেই। হবসের সুপরিচিত বর্ণনায়, সেখানে
মানুষের জীবন হয় নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, কদর্য, পাশবিক ও
স্বল্পস্থায়ী। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের ধারণাও অর্থহীন, কারণ আইন না
থাকলে অন্যায়ও থাকে না।
প্রাকৃতিক
আইন ও চুক্তির যুক্তি
এই ভয়াবহ
অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য মানুষের মধ্যে দুটি জিনিস কাজ করে: মৃত্যুভয় এবং
আরামদায়ক জীবনের আকাঙ্ক্ষা। বুদ্ধি তাকে "প্রাকৃতিক আইন"-এর দিকে চালিত
করে, যার মূল কথা হলো শান্তি অন্বেষণ করা এবং অন্যরাও একই করলে নিজের সবকিছুর
উপর অধিকার ত্যাগ করা। কিন্তু হবস বলেন, কেবল
পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। "তলোয়ার ছাড়া চুক্তি কেবল কথার
কথা।" অর্থাৎ চুক্তি ভাঙলে শাস্তি দেওয়ার মতো কোনো শক্তি না থাকলে কেউ
চুক্তি মানবে না।
সামাজিক
চুক্তি ও সার্বভৌমের উৎপত্তি
তাই মানুষ
একে অপরের সঙ্গে চুক্তি করে নিজেদের শাসনের অধিকার এক ব্যক্তি বা এক সভার হাতে
অর্পণ করে। এটি প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের চুক্তি, সার্বভৌমের
সঙ্গে নয়। ফলে সার্বভৌম নিজে চুক্তির পক্ষ নন এবং তাঁর কোনো চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা
নেই। এভাবে জনগণের সমষ্টিগত ইচ্ছা একটি "কৃত্রিম ব্যক্তি" বা কমনওয়েলথ
(লেভিয়াথান) হিসেবে মূর্ত হয়, যাঁর কর্ম সকলের কর্ম বলে গণ্য হয়।
সার্বভৌম
ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য
হবসের
সার্বভৌম ক্ষমতা নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত:
- চরম ও নিঃশর্ত: সার্বভৌমের ক্ষমতা আইনের ঊর্ধ্বে। তিনি যা নির্দেশ
দেন তাই আইন, ফলে তিনি নিজে অন্যায় করতে পারেন না।
- অবিভাজ্য: ক্ষমতা ভাগ করা যায় না। ক্ষমতার বিভাজন বিরোধ ও
গৃহযুদ্ধের জন্ম দেয়, যেমনটি ইংল্যান্ডে ঘটেছে।
- অহস্তান্তরযোগ্য: সার্বভৌম ক্ষমতা চিরস্থায়ী, তা অন্যের হাতে তুলে দেওয়া বা প্রত্যাহার করা যায়
না।
- আইন প্রণয়ন, বিচার
ও দণ্ডদানের একচেটিয়া অধিকার: শান্তি রক্ষার জন্য সার্বভৌম যুদ্ধ-শান্তি, বিচার, সম্পত্তির বিধান
এবং মতামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। হবসের মতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী মতবাদ
নিয়ন্ত্রণ করাও শান্তি রক্ষার অংশ।
চরম ক্ষমতার
পক্ষে মূল যুক্তিসমূহ
১.
নিরাপত্তার যুক্তি। হবসের কাছে
সর্বোচ্চ মঙ্গল হলো আত্মরক্ষা। অরাজকতার চেয়ে স্বৈরশাসনও শ্রেয়, কারণ শাসকের
নিপীড়ন যতই কঠোর হোক, গৃহযুদ্ধের ক্ষতির চেয়ে তা কম। তাঁর মতে প্রজাদের কষ্ট
সার্বভৌমের ক্ষমতার অপরিহার্য অসুবিধা, যা অরাজকতার ধ্বংসের তুলনায় নগণ্য।
২. চুক্তি
বলবৎ করার যুক্তি। শক্তিহীন
চুক্তি অকার্যকর। কেবল সর্বোচ্চ ও ভয় জাগানো ক্ষমতাই মানুষের স্বার্থপর
প্রবৃত্তিকে সংযত করতে পারে।
৩. চূড়ান্ত
বিচারকের যুক্তি। ন্যায়-অন্যায়
নিয়ে মানুষের মতবিরোধ অনিবার্য। কোনো চূড়ান্ত মীমাংসাকারী না থাকলে বিরোধ চলতেই
থাকবে। তাই এমন একজন থাকা চাই যাঁর সিদ্ধান্তই শেষ কথা।
৪.
অবিভাজ্যতার যুক্তি। ক্ষমতা ভাগ
হলে প্রতিটি অংশ নিজেকে চূড়ান্ত দাবি করবে এবং সংঘাত অবশ্যম্ভাবী হবে। তাই মিশ্র
সরকার বা ক্ষমতার পৃথকীকরণ হবসের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র-ধ্বংসের কারণ।
৫. সম্মতির
যুক্তি। হবস কেবল শক্তির দোহাই দেননি। তাঁর মতে মানুষ
নিজেরাই বিবেচনা করে সার্বভৌমকে ক্ষমতা দিয়েছে। তাই সার্বভৌমের প্রতি আনুগত্য
মানুষের নিজেরই যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্তের ফল।
প্রজার
অধিকার ও সীমারেখা
হবসের চরম
ক্ষমতার তত্ত্বেও একটি সীমা আছে, আর তা তাঁর নিজের যুক্তি থেকেই আসে। চুক্তির
উদ্দেশ্য আত্মরক্ষা, তাই কেউ নিজের জীবন রক্ষার অধিকার ছাড়তে পারে না।
সার্বভৌম যদি কাউকে আত্মহত্যা বা আত্মঘাতী কাজের নির্দেশ দেন, সে তা
অমান্য করতে পারে। একইভাবে কোনো ব্যক্তি নিজেকে অভিযুক্ত করতে বাধ্য নয়। আরও একটি
সূক্ষ্ম কথা হলো, সার্বভৌম যদি আর প্রজাদের রক্ষা করতে না পারেন, তবে
আনুগত্যের ভিত্তিই শেষ হয়ে যায়। এর অর্থ, হবসের মতে
আনুগত্যের শর্ত সুরক্ষা, ঐশ্বরিক অধিকার নয়।
সমালোচনা
হবসের
তত্ত্ব নানা দিক থেকে সমালোচিত হয়েছে।
জন লক
বলেছিলেন, স্বৈরাচারী শাসকের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ প্রাকৃতিক
অবস্থা ছেড়েছে, এমন ধারণা অযৌক্তিক। এ যেন শেয়াল-সিংহের ভয় এড়াতে
সিংহের হাতেই নিজেকে সঁপে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, হবসের মানব
প্রকৃতি অতিমাত্রায় নেতিবাচক, মানুষের সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সামর্থ্য তাতে উপেক্ষিত।
তৃতীয়ত, সার্বভৌমের চরম ক্ষমতা সীমিত করার কোনো সাংবিধানিক
ব্যবস্থা না থাকায় এটি ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ। চতুর্থত, ক্ষমতার
বিভাজনকে অনিবার্যভাবে অরাজকতার কারণ বলা ঠিক নয়, কারণ আধুনিক
গণতন্ত্রগুলোয় ক্ষমতার পৃথকীকরণ সফলভাবেই কাজ করছে।
তবুও হবসের
অবদান অস্বীকার করা যায় না। তিনিই প্রথম রাষ্ট্রের বৈধতাকে ঐশ্বরিক ইচ্ছার বদলে
মানুষের সম্মতি ও চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন, যা সামাজিক
চুক্তি তত্ত্বের পথ খুলে দেয়। আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আইনের একচেটিয়া
প্রয়োগের ধারণা তাঁর কাছেই ঋণী। রাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার
নিয়ে ম্যাক্স ভেবারের আলোচনাতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।
উপসংহার
হবসের
সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের মূল যুক্তি হলো, মানুষের স্বভাব যেহেতু প্রতিযোগিতামূলক ও
ভীতিগ্রস্ত, তাই কেবল একটি চরম, অবিভাজ্য ও
সর্বোচ্চ কর্তৃত্বই শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। অরাজকতার ভয়াবহতার
তুলনায় সার্বভৌমের কঠোরতা তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। যদিও তাঁর তত্ত্ব
ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে সমালোচিত এবং লক, রুশো ও
পরবর্তী উদারনৈতিক চিন্তাবিদেরা তার বিপরীতে সীমিত সরকারের ধারণা তুলে ধরেছেন,
তবুও রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বৈধতা ও কর্তৃত্ব নিয়ে আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের
আলোচনায় হবসের লেভিয়াথান একটি অপরিহার্য সূচনাবিন্দু হিসেবে আজও গুরুত্ব বহন করে।
হবসের সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব, যা মূলত তার **"লেভিয়াথান"** (১৬৫১)
গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের
ইতিহাসে চরম ক্ষমতার (absolute power) পক্ষে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত এবং প্রভাবশালী defense হিসেবে বিবেচিত হয়। হবসের যুক্তি কোনো ধর্মীয়
বা ঐশ্বরিক অধিকারের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি; বরং এটি মানব প্রকৃতি এবং যুক্তির (reason)
উপর দাঁড়িয়ে আছে। তার
মূল বক্তব্য হলো: **শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো একজন
সার্বভৌমের কাছে সমস্ত ক্ষমতা অর্পণ করা, যার ক্ষমতা অবিভাজ্য এবং সীমাহীন**।
### ১. মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির অবস্থা (State
of Nature)
হবসের সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের ভিত্তি হলো তার
মানব প্রকৃতি সম্পর্কিত হতাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি মনে করতেন, মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর এবং নিজের নিরাপত্তা
ও ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রবণতা দ্বারা চালিত। যেহেতু সব মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে
মোটামুটি সমান, তাই কেউই নিজেকে
অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করে না। এই অসম্ভাব্য নিরাপত্তার ভয় থেকেই
মানুষ আরও ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করে।
এই অবস্থা থেকে উৎপন্ন হয় **"প্রকৃতির
অবস্থা" (State of Nature)** — একটি কাল্পনিক অবস্থা যেখানে কোনো সরকার বা সার্বভৌম ক্ষমতা নেই। হবস এই
অবস্থাকে বর্ণনা করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভাষায়: **"solitary, poor,
nasty, brutish, and short"** (নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, জঘন্য, পাশবিক এবং স্বল্পস্থায়ী)। এখানে **"সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ" (war
of all against all)** চলে, কারণ প্রত্যেকেরই নিজের জীবন রক্ষার জন্য যা
প্রয়োজন তা করার "প্রাকৃতিক অধিকার" (Right of Nature) রয়েছে, এবং এই অধিকারের সীমা নেই। ফলে কেউই শান্তি বা
নিরাপত্তা ভোগ করতে পারে না।
### ২. সামাজিক চুক্তি (Social Contract) ও ক্ষমতা হস্তান্তর
হবসের মতে, মানুষ তার যুক্তি (reason) ব্যবহার করে এই ভয়াবহ প্রকৃতির অবস্থা থেকে
বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পায়। এই পথ হলো একটি **সামাজিক চুক্তি**। এই চুক্তিতে
প্রত্যেক ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তার প্রাকৃতিক অধিকার (Right of Nature) ত্যাগ করে এবং তা একজন **সার্বভৌম** (Sovereign)-এর কাছে হস্তান্তর করে। এই সার্বভৌম একজন
ব্যক্তি (রাজা) বা একটি সভা (সংসদ) হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চুক্তিটি সাধারণ মানুষের মধ্যে পরস্পরের
মধ্যে হয়, সার্বভৌমের সাথে
নয়। সার্বভৌম চুক্তির পক্ষ হয় না, বরং চুক্তির ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়। তাই সার্বভৌম চুক্তি ভঙ্গ করার প্রশ্নে আসে
না, এবং প্রজারা সার্বভৌমের
অবাধ্য হওয়ার কোনো অধিকার রাখে না।
### ৩. চরম ক্ষমতার পক্ষে যুক্তি (Argument
for Absolute Power)
হবস কেন মনে করতেন এই সার্বভৌমের ক্ষমতা অবশ্যই
চরম (absolute) এবং অবিভাজ্য (indivisible)
হতে হবে, তার কয়েকটি যুক্তি নিচে আলোচনা করা হলো:
* **শান্তি ও
নিরাপত্তার একমাত্র গ্যারান্টি:** প্রকৃতির অবস্থার ভয়াবহতা থেকে বাঁচার একমাত্র
উপায় হলো একজন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের কাছে সম্পূর্ণ আনুগত্য। যদি
সার্বভৌমের ক্ষমতা সীমিত বা বিভক্ত থাকে (যেমন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ এবং ধর্মনিরপেক্ষ
কর্তৃত্বের মধ্যে), তাহলে গৃহযুদ্ধের
আশঙ্কা থেকে যায়। সার্বভৌমের চরম ক্ষমতাই কেবল ব্যক্তিদের মধ্যে সংঘাত দমন করতে
পারে এবং শান্তি বজায় রাখতে পারে।
* **অবিভাজ্য
সার্বভৌমত্ব:** হবস মনে করতেন সার্বভৌমত্বকে ভাগ করা সম্ভব নয়। সার্বভৌম ক্ষমতার
মধ্যে আইন প্রণয়ন, বিচার, যুদ্ধ-শান্তির সিদ্ধান্ত, এবং প্রশাসন—সবই অন্তর্ভুক্ত। এই ক্ষমতা যদি
ভাগ করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের
ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তা প্রকৃতির অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
* **আইন ও নৈতিকতার
উৎস:** সার্বভৌমই আইনের একমাত্র উৎস। তার ক্ষমতার বাইরে কোনো উচ্চতর নৈতিক বা
ধর্মীয় আইন নেই যা প্রজাদের তার অবাধ্য হওয়ার justification দিতে পারে। সার্বভৌম যা আদেশ দেন, তাই ন্যায়সঙ্গত, কারণ তিনি রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তার
চূড়ান্ত বিচারক।
* **ভয়ের ভিত্তিতে
আনুগত্য:** হবস মনে করতেন, মানুষকে প্রকৃতির
অবস্থার ভয় এবং সার্বভৌমের শক্তির ভয়—এই দুই ভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।
সার্বভৌমের চরম ক্ষমতা প্রজাদের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি করে যে অবাধ্য হওয়া বা
বিদ্রোহ করা তাদের জন্য আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে, ফলে তারা শান্তি বজায় রাখতে বাধ্য হয়।
### ৪. সার্বভৌমের ক্ষমতার সীমা ও "প্রকৃত
স্বাধীনতা"
যদিও হবস সার্বভৌমের ক্ষমতাকে চরম বলেছেন,
তবে তার তত্ত্বে একটি
গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে। তিনি মনে করতেন প্রজারা কিছু মৌলিক অধিকার ত্যাগ
করতে পারে না, যাকে তিনি
**"প্রজাদের প্রকৃত স্বাধীনতা" (true liberties of subjects)** বলেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো
**আত্মরক্ষার অধিকার**। যদি সার্বভৌম কোনো প্রজাকে হত্যা করার আদেশ দেন, তাহলে সেই প্রজার সেই আদেশ অমান্য করার এবং
নিজের জীবন রক্ষার অধিকার রয়েছে। এছাড়াও, যদি সার্বভৌম প্রজাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ
হন, তাহলে প্রজাদের আনুগত্যের
বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায়। এই ব্যতিক্রমগুলো নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে—কেউ কেউ মনে
করেন এটি হবসের তত্ত্বের একটি অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, আবার কেউ কেউ এটিকে সার্বভৌমত্বের একটি
প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখেন।
### উপসংহার
সংক্ষেপে, হবসের সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব একটি শক্তিশালী
**রাজনৈতিক বাস্তববাদী (political realist)** যুক্তি। তিনি মানব প্রকৃতির অন্ধকার দিক থেকে
শুরু করে দেখিয়েছেন যে, শান্তি ও
নিরাপত্তার জন্য একটি শক্তিশালী, অবিভাজ্য এবং চরম
ক্ষমতাসম্পন্ন সার্বভৌম অপরিহার্য। তার তত্ত্বে সার্বভৌমের ক্ষমতা কোনো ঐশ্বরিক
অধিকার নয়, বরং মানুষের
যুক্তিসঙ্গত পছন্দের ফল—একটি ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ
স্বেচ্ছায় এই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। এই তত্ত্ব আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি
স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যদিও চরম ক্ষমতার পক্ষে এর যুক্তি নিয়ে নৈতিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক আজও চলমান।
হবসের সার্বভৌম তত্ত্ব
(চরম ক্ষমতার পক্ষে যুক্তি) আলোচনা কর
ভূমিকা
ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবস (Thomas Hobbes) আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Leviathan (১৬৫১)-এ তিনি সার্বভৌমত্ব,
রাষ্ট্রের উৎপত্তি এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। হবসের মতে, সমাজে শান্তি,
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সার্বভৌমের হাতে সর্বোচ্চ ও অবিভাজ্য ক্ষমতা থাকা আবশ্যক। তাই তিনি চরম বা নিরঙ্কুশ সার্বভৌম ক্ষমতার পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন।
হবসের সার্বভৌম তত্ত্বের মূল বক্তব্য
১. প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের অবস্থা
হবসের মতে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে
(State of Nature) বসবাস করত। সেখানে কোনো সরকার, আইন বা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ছিল না। প্রত্যেক মানুষ নিজের স্বার্থ রক্ষা ও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করত।
হবসের ধারণায়, মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা, প্রতিযোগিতা, অবিশ্বাস এবং আত্মরক্ষার আকাঙ্ক্ষা থেকে সংঘাত সৃষ্টি হয়। ফলে প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল অনিরাপদ এবং সেখানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন ছিল।
২. সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
প্রকৃতির রাজ্যের অনিশ্চয়তা ও সংঘাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ পরস্পরের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তি সম্পাদন করে। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রত্যেকে নিজের কিছু স্বাধীনতা ত্যাগ করে এবং একজন ব্যক্তি বা একটি পরিষদের হাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্পণ করে।
এই ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি বা পরিষদই সার্বভৌম (Sovereign)। হবসের মতে,
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য হলো শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা।
৩. সার্বভৌম ক্ষমতা সর্বোচ্চ ও নিরঙ্কুশ
হবসের সার্বভৌম তত্ত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সার্বভৌমের হাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকা। তাঁর মতে,
রাষ্ট্রে একাধিক স্বাধীন ও সমান সর্বোচ্চ ক্ষমতাকেন্দ্র থাকলে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে এবং রাষ্ট্রের ঐক্য নষ্ট হতে পারে।
তাই সার্বভৌমের ক্ষমতার ওপরে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ থাকা উচিত নয়। এ কারণে হবসের সার্বভৌমত্বকে নিরঙ্কুশ বা চরম সার্বভৌমত্ব বলা হয়।
৪. সার্বভৌম ক্ষমতা অবিভাজ্য
হবস মনে করেন,
সার্বভৌম ক্ষমতাকে বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমনভাবে ভাগ করা যায় না, যাতে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান নিজেকে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে দাবি করতে পারে। ক্ষমতা এভাবে বিভক্ত হলে বিরোধ ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা প্রয়োজন। এই কারণেই তিনি অবিভাজ্য সার্বভৌমত্বের পক্ষে যুক্তি দেন।
৫. সার্বভৌমই আইনের উৎস
হবসের মতে, রাষ্ট্রে সার্বভৌম কর্তৃপক্ষই আইন প্রণয়ন করে এবং আইন কার্যকর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আইন ছাড়া মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন।
সুতরাং সার্বভৌমের আদেশ রাষ্ট্রের আইন হিসেবে কার্যকর হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে হবস সার্বভৌমের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে নৈতিকভাবে সঠিক বলে বিবেচনা করেছেন;
তাঁর মূল উদ্বেগ ছিল কার্যকর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
৬. সার্বভৌমের বিচার ও শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা
রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সার্বভৌমের বিচারব্যবস্থা পরিচালনা,
অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ এবং আইন প্রয়োগের ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।
হবসের মতে, সার্বভৌমের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকলে আইন অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং মানুষ আবার সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে পারে। তাই শাস্তি প্রদানের কার্যকর ক্ষমতা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
৭. সার্বভৌমের সামরিক ও প্রতিরক্ষার ক্ষমতা
হবসের মতে, রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য হলো নাগরিকদের জীবন রক্ষা করা এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা। এ জন্য সার্বভৌমের সেনাবাহিনী গঠন,
যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রতিরক্ষা পরিচালনার ক্ষমতা থাকা আবশ্যক।
তিনি মনে করেন,
প্রতিরক্ষা ও সামরিক কর্তৃত্ব বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির হাতে বিভক্ত হলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে।
৮. সার্বভৌমত্বের উৎস সামাজিক চুক্তি
হবসের মতে, সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তি হলো মানুষের পারস্পরিক সামাজিক চুক্তি। মানুষ নিজের নিরাপত্তা ও শান্তির স্বার্থে সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,
হবসের চুক্তিটি মূলত জনগণের প্রত্যেকের সঙ্গে অন্য প্রত্যেকের চুক্তি;
সার্বভৌম নিজে এই চুক্তির সরাসরি পক্ষ নয়। তাই তাঁর তত্ত্বে জনগণ সাধারণভাবে সার্বভৌমকে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকার পায় না।
৯. সার্বভৌমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সীমিত অধিকার
হবস নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের সমর্থক হলেও ব্যক্তির আত্মরক্ষার অধিকার সম্পূর্ণ বিলুপ্ত বলে মনে করেননি। কোনো ব্যক্তি নিজের জীবন রক্ষার স্বাভাবিক অধিকার পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারে না।
সুতরাং সার্বভৌম সরাসরি কোনো ব্যক্তির জীবন বিপন্ন করলে বা তাকে আত্মবিনাশের দিকে বাধ্য করলে সেই ব্যক্তি আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে পারে। তবে এই সীমিত অধিকারকে হবস সাধারণ রাজনৈতিক বিদ্রোহ বা সরকার পরিবর্তনের অবাধ অধিকার হিসেবে স্বীকার করেননি।
চরম সার্বভৌম ক্ষমতার পক্ষে হবসের যুক্তি
হবসের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের পক্ষে প্রধান যুক্তিগুলো হলো—
1. শান্তি প্রতিষ্ঠা: কেন্দ্রীয় ও শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ ছাড়া সমাজে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
2. নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োজন।
3. আইনের কার্যকারিতা: আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ থাকা আবশ্যক।
4. গৃহযুদ্ধ প্রতিরোধ: প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করতে পারে। তাই সার্বভৌম ক্ষমতার ঐক্য প্রয়োজন।
5. রাষ্ট্রের ঐক্য ও স্থিতিশীলতা: সার্বভৌম ক্ষমতা বিভক্ত হলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন দুর্বল হতে পারে।
6. সামাজিক চুক্তির উদ্দেশ্য রক্ষা: মানুষ যে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র গঠন করেছে, সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সার্বভৌমের পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকা দরকার।
হবসের সার্বভৌম তত্ত্বের সমালোচনা
হবসের তত্ত্ব রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কয়েকটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
- স্বৈরাচারের আশঙ্কা: সার্বভৌমের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হলে শাসক স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারেন।
- জনগণের অধিকার সংকুচিত হওয়া: শাসকের ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে নাগরিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- ক্ষমতার ভারসাম্যের অভাব: আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা কঠিন হতে পারে।
- মানব প্রকৃতির একপাক্ষিক ব্যাখ্যা: হবস মানুষের সংঘাতপ্রবণতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন; সহযোগিতা,
সহমর্মিতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ভূমিকাকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছেন।
- জনসম্মতির সীমাবদ্ধতা: সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে সার্বভৌম প্রতিষ্ঠিত হলেও জনগণের পরবর্তী সম্মতি বা শাসকের জবাবদিহির বিষয়টি তাঁর তত্ত্বে সীমিত।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়,
হবসের সার্বভৌম তত্ত্বের মূল লক্ষ্য ছিল গৃহযুদ্ধ,
বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে মানুষকে মুক্ত করা। তাঁর মতে, শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ, অবিভাজ্য ও কার্যকর ক্ষমতাসম্পন্ন সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ থাকা আবশ্যক। যদিও তাঁর তত্ত্বে স্বৈরাচার ও নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তবুও আধুনিক রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব,
আইন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ধারণা বিকাশে হবসের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
থমাস হবস (*Leviathan*, ১৬৫১) সার্বভৌমত্বকে চরম ও অবিভক্ত ক্ষমতা
হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর যুক্তি মূলত প্রকৃতির অবস্থা থেকে রাষ্ট্রের
উৎপত্তি এবং শান্তি রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
## প্রকৃতির অবস্থা
হবসের মতে, রাষ্ট্রহীন অবস্থায় মানুষ সমান শক্তি ও
আকাঙ্ক্ষার অধিকারী। সম্পদ, নিরাপত্তা ও
খ্যাতির জন্য প্রতিযোগিতায় তারা পরস্পরের শত্রু হয়ে ওঠে। এখানে কোনো সাধারণ ক্ষমতা
নেই, তাই “সকলের বিরুদ্ধে
সকলের যুদ্ধ” (*bellum omnium contra omnes*) চলে। জীবন হয় “একাকী, দরিদ্র, কদর্য, পাশবিক ও সংক্ষিপ্ত”। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য মানুষ চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।
## সামাজিক চুক্তি ও সার্বভৌম
ব্যক্তিরা নিজেদের প্রাকৃতিক অধিকার একটি
ব্যক্তি বা পরিষদের কাছে সমর্পণ করে, এই শর্তে যে সে সকলের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এই সমর্পণের মাধ্যমেই
সার্বভৌম জন্ম নেয়। চুক্তির পক্ষ সার্বভৌম নয়—প্রজাগণ পরস্পরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ
হয়ে সার্বভৌমকে ক্ষমতা দেয়। তাই সার্বভৌম চুক্তি ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত হতে পারে
না।
## চরম ক্ষমতার পক্ষে যুক্তি
হবস সার্বভৌম ক্ষমতাকে নিম্নোক্ত কারণে অবিভক্ত
ও চরম বলেছেন:
- **শান্তির শর্ত।** ক্ষমতা ভাগ হলে আবার
গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা ফিরে আসে। সার্বভৌম যদি আইন, বিচার, যুদ্ধ-শান্তি ও নিয়োগের অধিকারে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শৃঙ্খলা ভাঙে।
- **অবিভাজ্যতা।** আইনপ্রণয়ন, বিচার, সেনাবাহিনী ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ একই হাতে না থাকলে সার্বভৌমত্ব অসম্পূর্ণ
থাকে। ভাগ করা সার্বভৌমত্ব আসলে সার্বভৌমত্ব নয়।
- **আইনের উৎস।** ন্যায়-অন্যায় সার্বভৌমের আদেশ
থেকেই নির্ধারিত হয়। সার্বভৌমের আগে কোনো নাগরিক আইন নেই; অতএব তাঁর আদেশের বাইরে ন্যায়ের মানদণ্ড দাঁড়
করানো যায় না।
- **স্থায়িত্ব।** ক্ষমতা ফিরিয়ে নেওয়া বা ভাগ করার
অধিকার প্রজাদের থাকলে চুক্তির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। সার্বভৌমত্ব তাই স্থায়ী ও
অহস্তান্তরযোগ্য।
- **প্রতিরোধের সীমা।** সাধারণভাবে বিদ্রোহ অবৈধ।
একমাত্র ব্যতিক্রম—যখন সার্বভৌম জীবনরক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন আত্মরক্ষার প্রাকৃতিক অধিকার ফিরে আসে।
## সার্বভৌমের অধিকার
হবসের সার্বভৌম আইন প্রণয়ন করেন, বিচার করেন, যুদ্ধ ও শান্তি ঘোষণা করেন, মন্ত্রী ও বিচারক নিয়োগ করেন, এবং শান্তিবিরোধী মতবাদ নিয়ন্ত্রণ করেন।
প্রজারা এই ক্ষমতাকে সমর্থন করেছে বলেই তা বৈধ—জনগণের সম্মতি একবার দেওয়া হলে তা
প্রত্যাহারযোগ্য নয়।
## সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন
হবসের তত্ত্ব ক্ষমতার নৈতিক সীমাকে নয়, বরং বিশৃঙ্খলার ভয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
তিনি মনে করেন, দুর্বল বা ভাগ
করা সরকার অরাজকতার চেয়ে ভালো নয়। পরবর্তী উদারনৈতিক চিন্তা (লক প্রমুখ) এই
চরমতাকে প্রত্যাখ্যান করে অধিকার ও সীমিত সরকারের পক্ষ নিয়েছে, কিন্তু হবসের মূল প্রশ্নটি থেকেই গেছে: শান্তি
রক্ষা করতে হলে ক্ষমতা কতটা কেন্দ্রীভূত হওয়া দরকার।
ইংল্যান্ডের
বিখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক থমাস হবস (Thomas
Hobbes) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'লেভিয়াথান'
(Leviathan - 1651)-এ সার্বভৌমেত্বের এক চরমপন্থী বা অসীম ক্ষমতার তত্ত্ব (Absolute
Sovereignty) প্রদান করেন।
হবসের মতে,
সামাজিক চুক্তির (Social Contract) মাধ্যমে
রাষ্ট্র গঠিত হয় এবং এই চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্যই হলো প্রকৃতির রাজ্যে বিরাজমান 'সকলের
বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ' ও নৈরাজ্য থেকে মানুষকে রক্ষা করা। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত
করার জন্যই তিনি সার্বভৌমকে অসীম ও চরম ক্ষমতা অর্পণ করেছেন।
নিচে হবসের
সার্বভৌম তত্ত্ব এবং চরম ক্ষমতার পক্ষে তাঁর যুক্তিগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. প্রকৃতি
রাজ্য ও চুক্তি সম্পর্কিত যুক্তি (চরম ক্ষমতার উৎস)
হবসের
সার্বভৌমত্ব বোঝার জন্য তাঁর সামাজিক চুক্তির পটভূমি বোঝা জরুরি:
- প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature): প্রকৃতির রাজ্যে কোনো আইন, আদালত বা কেন্দ্রীয় শাসক ছিল না। মানুষ সেখানে চরম
নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, হিংস্র ও
খামখেয়ালী ছিল। ফলে জীবন ছিল "স্বল্পস্থায়ী, করুণ ও
নিরাপত্তাহীন"।
- সামাজিক চুক্তি: এই অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে সব মানুষ নিজেদের
মধ্যে একটি চুক্তি করে। চুক্তির শর্ত ছিল:
"আমি এই
ব্যক্তি বা সভাকে আমার ওপর শাসন করার অধিকার হস্তান্তর করছি, এই শর্তে যে
তুমিও তোমার শাসন করার অধিকার তাকে একইভাবে অর্পণ করবে।"
এই চুক্তির
মাধ্যমে সার্বভৌম শক্তির (Sovereign) জন্ম হয়। সার্বভৌম
স্বয়ং এই চুক্তির কোনো পক্ষ ছিল না, বরং সে ছিল
চুক্তির ফলাফল। ফলে চুক্তি ভঙ্গ করার বা তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুযোগ
প্রজাদের থাকে না।
২. সার্বভৌম
শক্তির চরম ক্ষমতার পক্ষে প্রধান শক্তিসমূহ ও যুক্তি
হবস
সার্বভৌমের অসীম ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার পক্ষে বেশ কিছু মূল যুক্তি তুলে ধরেছেন:
ক. অখণ্ডতা
ও অবিভাজ্যতা (Indivisibility)
হবসের মতে,
সার্বভৌমত্বকে খণ্ডিত বা ভাগ করা যায় না। যদি ক্ষমতাকে আইনসভা, শাসন বিভাগ
ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে তাদের
মধ্যে মতবিরোধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হবে—যা রাষ্ট্রকে আবার নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে
দেবে। তাই সমস্ত শক্তি এক কেন্দ্রেই পুঞ্জীভূত থাকতে হবে।
খ. আইনি ও
নৈতিক দায়বদ্ধতাহীনতা (Legally Absolute)
সার্বভৌম
যেকোনো আইন তৈরি করতে পারে। সে নিজেই আইনের উৎস, তাই সার্বভৌম নিজে আইনের ঊর্ধ্বে।
- কোনো নাগরিক আইন ভঙ্গের জন্য সার্বভৌমের বিরুদ্ধে
মামলা করতে পারবে না।
- সার্বভৌমের কোনো কাজকে 'অন্যায়'
বা 'অবিচার' বলা যাবে না, কারণ
ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড সার্বভৌম নিজেই নির্ধারণ করে।
গ. প্রজাদের
প্রতিবাদের অধিকারহীনতা (No Right to Rebel)
যেহেতু
প্রজারাই স্বেচ্ছায় চুক্তি করে নিজেদের সমস্ত অধিকার সার্বভৌমের হাতে তুলে
দিয়েছে, তাই সার্বভৌমের কোনো কাজের বিরোধিতা করা মানে নিজের
সিদ্ধান্তেরই বিরোধিতা করা। হবস স্পষ্ট বলেছেন—
- প্রজারা রাজাকে বা সার্বভৌমকে পদচ্যুত করতে পারবে
না।
- সার্বভৌমের সিদ্ধান্ত যত কঠোরই হোক না কেন, তা মেনে চলাই প্রজাদের কর্তব্য।
ঘ. নাগরিক
স্বাধীনতা ও ধর্মের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ
হবসের মতে,
নাগরিকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয়
বিশ্বাসের ওপর সার্বভৌমের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। সার্বভৌম ঠিক করবে কোন ধরনের
মতবাদ সমাজে শান্তির জন্য সহায়ক এবং কোনটি ক্ষতিকর। ধর্মীয় সংস্থাও সার্বভৌমের
অধীনস্ত থাকবে।
৩.
সার্বভৌমের ক্ষমতার কি কোনো সীমা আছে? (ব্যতিক্রমী
দিক)
যদিও হবস
সার্বভৌমকে চরম ক্ষমতা দিয়েছেন, তবুও তিনি একটিমাত্র ক্ষেত্রে প্রজার
আত্মরক্ষার বা প্রতিরোধের অধিকার স্বীকার করেছেন:
- আত্মরক্ষার অধিকার (Right to
Self-Preservation): মানুষ চুক্তিই করেছিল নিজের 'জীবন বাঁচানোর' জন্য।
তাই যদি সার্বভৌম শাসক কোনো প্রজাকে নিজেকে হত্যা করার বা নিজের জীবন বিপন্ন
করার নির্দেশ দেয়, অথবা যদি শাসক প্রজার জীবন রক্ষায় পুরোপুরি ব্যর্থ
হয়, তবে প্রজা সেই নির্দেশ অমান্য করতে পারে।
হবসের
সার্বভৌম তত্ত্বের সারসংক্ষেপ
|
বৈশিষ্ট্য |
হবসের ব্যাখ্যা |
|
উৎপত্তি |
মানুষের
পারস্পরিক চুক্তি থেকে সৃষ্ট (সার্বভৌম নিজে চুক্তিভিত্তিক নয়)। |
|
ক্ষমতার
পরিধি |
অসীম,
চরম, অনিয়ন্ত্রিত এবং সর্বোচ্চ। |
|
স্থায়িত্ব |
চিরস্থায়ী
ও হস্তান্তরঅযোগ্য। |
|
দায়বদ্ধতা |
ঈশ্বর
ছাড়া আর কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। |
উপসংহার
পরিশেষে বলা
যায়, থমাস হবস ১৭ শতকের ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের বীভৎসতা ও
অরাজকতা দেখে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা
বজায় রাখা। তিনি মনে করতেন, সীমিত বা দুর্বল শাসক নৈরাজ্য ঠেকাতে পারে না;
কেবল একটি অসীম
শক্তিশালী রাষ্ট্র বা লেভিয়াথান-ই সমাজকে
ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
তাই তাঁর
সার্বভৌম তত্ত্বকে অনেকে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার যৌক্তিকতা
প্রমাণের প্রয়াস বললেও, আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে 'আইনি
সার্বভৌমত্ব' (Legal Sovereignty) ধারণার সূচনা হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
সতেরো শতকের
ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবস তার বিখ্যাত ‘লেভিয়াথান’
(১৬৫১) গ্রন্থে সার্বভৌমত্ব ও চরম ক্ষমতার (Absolute Sovereignty) তত্ত্বটি
তুলে ধরেন। মানুষের
আত্মরক্ষা ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদে তিনি এই তত্ত্ব উপস্থাপন করেন।
[1,
2,
3]
হবসের
সার্বভৌম তত্ত্বের মূল ভিত্তি
- প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature): হবস মনে করতেন, রাষ্ট্র
গঠনের আগে মানুষ এমন এক অবস্থায় বসবাস করত যেখানে কোনো আইন, বিচার বা নিয়ম ছিল না। সেটি ছিল ‘সবার বিরুদ্ধে
সবার যুদ্ধ’—হিংসা, আতঙ্ক ও বর্বরোচিত এক অবস্থা, যেখানে মানুষের জীবন ছিল ‘নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, কদাকার, পশুতুল্য ও স্বল্পস্থায়ী’।
[1]
- সামাজিক চুক্তি (Social Contract): এই অনিরাপদ অবস্থা থেকে বাঁচতে মানুষ নিজেদের মধ্যে
একটি চুক্তি করে। তারা তাদের সব ক্ষমতা ও অধিকার একজন একক ব্যক্তি বা সভাসদের
হাতে তুলে দেয় (যাকে তিনি ‘লেভিয়াথান’ বা সার্বভৌম সত্তা বলেছেন)।
[1,
2,
3,
4]
- চুক্তির প্রকৃতি: এটি ছিল জনগণের মধ্যে পারস্পরিক চুক্তি, সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের সাথে নয়। তাই সার্বভৌম
ক্ষমতার ওপর জনগণের কোনো শর্ত আরোপের অধিকার থাকে না।
[1,
2]
চরম ক্ষমতার
(Absolute Power) পক্ষে হবসের যুক্তি
হবস কেন
সার্বভৌম ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ অবাধ ও চরম করার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, তা নিচে
দেওয়া হলো:
- অবিভাজ্য ও একক ক্ষমতা: হবসের মতে, ক্ষমতা
ভাগ করলে বা বিভাজন করলে দেশে মতবিরোধ ও গৃহযুদ্ধ তৈরি হয়। তাই শান্তি ও
শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সার্বভৌম ক্ষমতা অবশ্যই অবিভাজ্য ও একক হতে হবে।
[1,
2,
3]
- আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান: সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো আইনের অধীন নয়, কারণ সার্বভৌম নিজেই আইনের প্রণেতা। যা খুশি তা
করার বা আইন তৈরি ও বাতিলের সর্বোচ্চ ক্ষমতা তার থাকে।
[1,
2,
3]
- ধর্মীয় ও নৈতিক নিয়ন্ত্রণ: হবস যুক্তি দেন যে, ধর্মীয়
বা নৈতিক কর্তৃত্বকেও রাজনৈতিক সার্বভৌম ক্ষমতার অধীনে থাকতে হবে, নতুবা ধর্মের দোহাই দিয়ে দেশে অশান্তি সৃষ্টি হতে
পারে। [1,
2]
- জননিরাপত্তা সর্বোচ্চ বিধান: সার্বভৌম শাসকের প্রধান কর্তব্য হলো নাগরিকদের জীবন
ও সম্পত্তি রক্ষা করা। এই দায়িত্ব পালনের স্বার্থে শাসকের হাতে চরম বা
সীমাহীন ক্ষমতা থাকা জরুরি। [1, 2,
3,
4]
হবসের
তত্ত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
- চিরস্থায়ী ও অপ্রত্যাহারযোগ্য: একবার ক্ষমতা হস্তান্তর করার পর জনগণ তা ফেরত চাইতে
পারে না।
- সমালোচনামুক্ত: সার্বভৌম যা কিছু করেন, তা
জনগণের নিজেরই কাজের ফল, তাই তার কাজের সমালোচনা বা তাকে শাস্তি দেওয়ার
অধিকার প্রজার নেই।
- ব্যতিক্রম: একমাত্র ব্যতিক্রম হলো—যদি সার্বভৌম সরাসরি কোনো
নাগরিকের জীবননাশ করতে উদ্যত হন, তবে আত্মরক্ষার
খাতিরে সেই নাগরিক প্রতিরোধ করতে পারে। [1,
2,
3,
4]
সমালোচনা
টমাস হবসের
এই চরম ক্ষমতার তত্ত্ব বিভিন্নভাবে সমালোচিত হয়েছে: [1]
- স্বৈরতন্ত্রের লাইসেন্স: সমালোচকদের মতে, এই
তত্ত্ব মানুষের সমস্ত স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে একচ্ছত্র ও স্বেচ্ছাচারী শাসনের পথ
পরিষ্কার করে।
- একতরফা চুক্তি: এটি জনগণের ওপর একতরফা দাসত্বের দলিল চাপিয়ে দেয়।
- অবাস্তব ধারণা: মানুষ জন্ম থেকেই পুরোপুরি স্বার্থপর ও সহিংস—হবসের
এই ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। [1,
2]
টমাস হবসের
সার্বভৌম তত্ত্ব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে বা নির্দিষ্ট কোনো দিক নিয়ে আলোচনা
করতে চাইলে জানাতে পারেন Read Aim। [1]
No comments:
Post a Comment