Search This Blog

Wednesday, November 4, 2026

আইয়ুব খানের ‘ইকোনমিক পলিসি’ (Ayub Khan’s Economic Policy)

 ### আইয়ুব খানের ‘ইকোনমিক পলিসি’ (Ayub Khan’s Economic Policy) ১৯৫৮-১৯৬৯

 

আইয়ুব খানকে বলা হয় - *"উন্নয়নের স্বৈরশাসক"*। তার ১০ বছরের শাসনকে পশ্চিমা দুনিয়া বলতো - *"Decade of Development" (উন্নয়নের দশক)*। আর বাঙালিরা বলতো - *"Decade of Disparity" (বৈষম্যের দশক)*।

 

দুটোই সত্যি। তিনি পাকিস্তানকে উন্নত করেছেন, কিন্তু সেই উন্নতির ৮০% গেছে পশ্চিম পাকিস্তানে, আর ২০% এসেছে পূর্ব পাকিস্তানে।

 

#### ১. আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির মূল দর্শন কি ছিল?

 

তার নীতি ছিল - *"Growth First, Distribution Later"* - আগে প্রবৃদ্ধি, পরে বন্টন।

 

তার যুক্তি ছিল:

> "গরিব দেশে সবাইকে সমান ভাগ দিলে সবাই গরিব থাকবে। আগে কিছু লোককে বড়লোক হতে দাও, তারা কারখানা করবে, চাকরি দেবে, তারপর সম্পদ সবার কাছে যাবে।"

 

এই তত্ত্বকে অর্থনীতিতে বলে - *Trickle-Down Theory* - উপর থেকে চুইয়ে চুইয়ে নিচে পড়বে।

 

*কিন্তু বাস্তবে কি হয়েছিল?* উপরে টাকা জমেছে, নিচে পড়েনি। ২২টি পরিবার পাকিস্তানের ৬৬% শিল্পের মালিক হয়ে গেছে।

 

#### ২. আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির ৫টি স্তম্ভ

 

*১) পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (Five Year Plans)*

 

- *২য় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৬০-৬৫):* এটি ছিল তার সবচেয়ে সফল পরিকল্পনা। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬% - যা তখন দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

- *৩য় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৬৫-৭০):* ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে ব্যর্থ হয়।

 

*কিন্তু সমস্যা:* পরিকল্পনায় লেখা ছিল - পূর্ব ও পশ্চিমে সমান বরাদ্দ হবে। বাস্তবে পূর্ব পাকিস্তান পেয়েছে ৩২%, পশ্চিম পাকিস্তান পেয়েছে ৬৮%।

 

*২) সবুজ বিপ্লব (Green Revolution) - কৃষিতে বিপ্লব*

 

আইয়ুব খান কৃষিতে উচ্চ ফলনশীল বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ আনেন।

 

- পশ্চিম পাকিস্তানে - পাঞ্জাবে গমের উৎপাদন ৩ গুণ বেড়ে যায়। মঙ্গলা, তারবেলা বাঁধ বানিয়ে সেচ দেওয়া হয়।

- পূর্ব পাকিস্তানে - কাপ্তাই বাঁধ বানানো হয় (যা চাকমাদের ক্ষতি করে), কিন্তু সার, বীজ পূর্ব পাকিস্তানের কৃষকরা পায়নি। কারণ কৃষি ঋণ দেওয়া হতো বড় জমিদারদের, গরিব কৃষকদের নয়।

 

*ফলাফল:* পাঞ্জাবের কৃষক ধনী হলো, বাংলার কৃষক গরিবই থাকলো।

 

*৩) শিল্পায়ন ও "২২ পরিবার" (Industrialization & 22 Families)*

 

এটি আইয়ুব খানের সবচেয়ে বিতর্কিত নীতি।

 

তিনি *PICIC, PIDC, IDBP* নামে ৩টি ব্যাংক বানান। এই ব্যাংক থেকে নামমাত্র সুদে (২-৩%) কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হতো।

 

*কে পেলো এই ঋণ?*

- আদমজী, দাউদ, সায়গল, হাবিব, ভুট্টো - এই ২২টি পরিবার।

- এদের মধ্যে ২১টি পরিবার ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি, ১টি ছিল পূর্ব পাকিস্তানি (আদমজী - তাও তারা করাচিতে থাকতো)।

 

*ড. মাহবুব উল হক* (আইয়ুব খানেরই পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ) ১৯৬৮ সালে বলেন - "পাকিস্তানের ৬৬% শিল্প, ৭০% ব্যাংক, ৮০% বীমা - এই ২২টি পরিবারের হাতে"।

 

এই বক্তব্যই আইয়ুব খানের পতনের শুরু।

 

*৪) বিদেশি সাহায্য ও মার্কিন নির্ভরতা*

 

আইয়ুব খান আমেরিকার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি পাকিস্তানকে *SEATO ও CENTO* জোটে ঢোকান। বিনিময়ে আমেরিকা থেকে প্রচুর ডলার, অস্ত্র, খাদ্য সাহায্য (PL-480) আসে।

 

- ১৯৬০-৬৫ সালে পাকিস্তান মোট ২.৫ বিলিয়ন ডলার সাহায্য পায়।

- এই সাহায্যের ৮০% খরচ হয় পশ্চিম পাকিস্তানে, ২০% পূর্বে।

 

*ফলাফল:* পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি।

 

*৫) মৌলিক গণতন্ত্র (Basic Democracy) - অর্থনীতির সাথে রাজনীতি*

 

আইয়ুব খান গণতন্ত্র বন্ধ করে *Basic Democracy* চালু করেন - ৮০,০০০ মেম্বার (৪০,০০০ পূর্বে, ৪০,০০০ পশ্চিমে) নির্বাচিত হতো। এরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতো, উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা পেতো।

 

*বাস্তবে:* এই মেম্বাররা ছিল আইয়ুব খানের দালাল। উন্নয়নের টাকা গ্রামের মানুষের কাছে যেতো না, মেম্বারদের পকেটে যেতো। গ্রামে দুর্নীতি বাড়ে।

 

#### ৩. পূর্ব পাকিস্তানের উপর প্রভাব - কেন বাঙালিরা ক্ষেপে গেল?

ক্ষেত্র | পূর্ব পাকিস্তান | পশ্চিম পাকিস্তান

**পঞ্চবার্ষিকী বরাদ্দ** | ৩২% | ৬৮%

**বৈদেশিক সাহায্য** | ২০% | ৮০%

**বড় শিল্প কারখানা** | ১২টি | ৮৮টি

**সরকারি চাকরি** | ১৫% | ৮৫%

**মাথাপিছু আয় (১৯৬৯)** | ২৮০ টাকা | ৪২০ টাকা

*সবচেয়ে বড় উদাহরণ - পাট বনাম তুলা:*

পূর্ব পাকিস্তান পাট বিক্রি করে ৬০% বৈদেশিক মুদ্রা আনতো। কিন্তু সেই মুদ্রা দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে তুলা চাষের জন্য সেচ প্রকল্প, টেক্সটাইল মিল বানানো হতো। পূর্ব পাকিস্তানের পাটকলগুলো (আদমজী জুট মিল) মালিক ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি। বাঙালি শ্রমিকরা কাজ করতো, লাভ যেত করাচিতে।

 

*অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান* বলেন - "আইয়ুব খানের আমলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে ২.৬ বিলিয়ন টাকা পাচার হয়েছে।"

 

#### ৪. আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির সফলতা ও ব্যর্থতা

 

*সফলতা (যা পরীক্ষায় লিখতে হবে):*

১.  জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬% - তখন এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

২.  করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদ (নতুন রাজধানী) - আধুনিক শহর হয়।

৩.  খাদ্য উৎপাদন বাড়ে, পাকিস্তান খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়।

৪.  রাস্তা, বাঁধ, বিদ্যুৎ - অবকাঠামো উন্নত হয়।

 

*ব্যর্থতা (যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ):*

১.  *বৈষম্য:* ধনী-গরিবের বৈষম্য আকাশ ছোঁয়া হয়।

২.  *আঞ্চলিক বৈষম্য:* পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্য ২ গুণ বেড়ে যায়।

৩.  *দুর্নীতি:* ২২ পরিবার ও Basic Democracy মেম্বাররা দেশ লুট করে।

৪.  *বিদেশি নির্ভরতা:* দেশের অর্থনীতি আমেরিকার হাতে চলে যায়।

 

#### ৫. পরিণতি - আইয়ুব খানের পতন কেন হলো?

 

১৯৬৮ সালে ড. মাহবুব উল হকের ২২ পরিবারের বক্তব্য, ১৯৬৯ সালে ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন, এবং পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বঞ্চনার ক্ষোভ - সব মিলিয়ে আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

 

#### উপসংহার -

 

"আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতি ছিল - 'উন্নয়ন ছাড়া গণতন্ত্র'। তিনি গণতন্ত্রকে হত্যা করে উন্নয়ন আনতে চেয়েছিলেন। তিনি উন্নয়ন এনেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই উন্নয়ন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন, ২২ পরিবারের উন্নয়ন, পাঞ্জাবি সেনা অফিসারদের উন্নয়ন। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র সেই উন্নয়নের ভাগ পায়নি। তাই আইয়ুব খানের 'উন্নয়নের দশক'ই হয়ে গেল বাংলাদেশের জন্মের দশক। কারণ বাঙালিরা বুঝে গিয়েছিল - পাকিস্তানে থেকে উন্নয়ন হবে না, উন্নয়ন চাইলে আলাদা দেশ লাগবে। আইয়ুব খান নিজের অজান্তেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন - বৈষম্য দেখিয়ে।"

 

 

 

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতি (১৯৫৮–৬৯) ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনা, বেসরকারি শিল্পায়ন, বিদেশি সাহায্য, রপ্তানি উৎসাহ ও কৃষি আধুনিকায়নের একটি মডেল। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশ দ্রুত হলেও সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানের ওপর আঞ্চলিক বৈষম্য আরও গভীর হয়।[journal.psc.edu][ojs.ucp.edu][megalecture]

মূল বৈশিষ্ট্য

আইয়ুব খানের শাসনামলকে “উন্নয়নের দশক” বলা হয়, কারণ এ সময় শিল্প, কৃষি ও অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। তাঁর নীতির মূল ভিত্তি ছিল কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা, বেসরকারি বিনিয়োগের উৎসাহ এবং বিদেশি ঋণ ও সাহায্যের ওপর নির্ভরতা।[journal.psc.edu][scribd]

প্রধান উপাদানগুলো ছিল:

  • বেসরকারি খাতকে উৎসাহ: বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মূল্য ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়; দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা দিয়ে বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হয়।[slideshare]
  • রপ্তানি উৎসাহ: ১৯৫৯ সালে এক্সপোর্ট বোনাস ভাউচার স্কিম চালু করা হয়, যা রপ্তানিকারকদের বিদেশি মুদ্রা আয়ের বিনিময়ে আমদানির সুবিধা দেয়।[scribd][ru.scribd]
  • শিল্পায়ন: বড় শিল্প প্রকল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়; এতে পাকিস্তানের অর্থনীতি দ্রুত প্রবৃদ্ধি পায়।[journal.psc.edu][ojs.ucp.edu]
  • সবুজ বিপ্লব: উন্নত জাতের বীজ, সার, সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।[ojs.ucp.edu][studocu]
  • ভূমি সংস্কার: জমিদারি প্রথার সীমিত সংস্কার করা হলেও তা মূলত বড় জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের জন্য নতুন মাঝারি জমির মালিকানা তৈরি করে।[scribd]

অর্জন

আইয়ুব আমলে পাকিস্তানের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। ১৯৫৮–৬৯ সময়ে গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৫.৮ শতাংশ; কোনো কোনো হিসাবে ১৯৬০–৬৫ সময়ে এটি ৬.৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে।[scribd][ru.scribd]

মোট স্থায়ী বিনিয়োগও বাড়ে—১৯৫৮–৫৯ সালে জিডিপির ৮.৫ শতাংশ থেকে ১৯৬৮–৬৯ সালে প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছায়। করাচি ও লাহোরের মতো শহরে শিল্প ও নগর উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়।[ojs.ucp.edu][slideshare]

প্রধান সমালোচনা

এই প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো এর বিতরণ ছিল অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। অর্থনীতিবিদ মাহবুবুল হক ১৯৬৮ সালে প্রকাশ করেন যে দেশের ২২টি পরিবার প্রায় ৬৬ শতাংশ শিল্পসম্পদ, ৮০ শতাংশ ব্যাংকিং ও ৭৯–৯৭ শতাংশ বীমা খাত নিয়ন্ত্রণ করছিল।[slideshare][scribd][studocu]

এই “২২ পরিবার” মূলত পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত ছিল। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ অনুভব করে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তাদের কাছে পৌঁছায়নি; বরং তাদের পাট, চা, কৃষিপণ্য ও রপ্তানি আয় দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্প ও পুঁজিপতি শ্রেণি সুবিধাভোগী হয়।[ojs.ucp.edu][megalecture][megalecture]

সবুজ বিপ্লবও সমান সুবিধা দেয়নি। বড় জমিদার ও ধনী কৃষকরা সেচ, সার, যন্ত্র ও ঋণের সুবিধা পায়; কিন্তু ক্ষুদ্র কৃষকরা ঋণের বোঝা ও উৎপাদন খরচের চাপে পড়ে।[ojs.ucp.edu][scribd]

পূর্ব পাকিস্তানে প্রভাব

আইয়ুব খান দাবি করতেন যে পূর্ব পাকিস্তানের ধীর প্রবৃদ্ধির কারণ ছিল বিনিয়োগের সুযোগ, দক্ষ শ্রম ও অবকাঠামোর অভাব। কিন্তু এই যুক্তি বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না, কারণ তারা মনে করত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও সুযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছিল।[thedailystar]

ফলে পূর্ব-পশ্চিম জিএনপির ব্যবধান বাড়তে থাকে এবং এটি ছয় দফা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। আইয়ুবের নীতি আসলে পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতার দাবিকে আরও শক্তিশালী করে।[studocu][thedailystar][journal.psc.edu]

মূল্যায়ন

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতি ছিল উচ্চ প্রবৃদ্ধির নীতি, কিন্তু ন্যায্য বণ্টনের নীতি নয়। এটি শিল্পায়ন, অবকাঠামো ও কৃষি উৎপাদনে সাফল্য দেখালেও সম্পদের কেন্দ্রীভবন, কৃষকের দারিদ্র্য এবং পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়।[journal.psc.edu][ojs.ucp.edu][megalecture]

তাই এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিণতি ছিল: অর্থনৈতিক বৈষম্য বাঙালি জাতীয়তাবাদকে জোরদার করে এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অন্যতম কাঠামোগত কারণ হয়ে দাঁড়ায়।[studocu][journal.psc.edu]

 

 

 

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতি (১৯৫৮-১৯৬৯)

কাঠামো: দর্শন ও কৌশল, প্রধান নীতিগুলো, অর্জন, ক্ষতিকর দিক (বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য), এবং মূল্যায়ন। যেখানে আমি স্মৃতি থেকে বলছি, সেখানে তা জানিয়ে দিয়েছি।

১. সামগ্রিক পরিচয়

আইয়ুবের শাসনকাল সরকারিভাবে "উন্নয়নের দশক" নামে পরিচিত। একটি বিশ্লেষণে বলা হয়, এই সময়েই পাকিস্তান একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভিত্তি পায় এবং ১৯৬৮ সালে সরকার যখন "উন্নয়নের দশক" উদযাপন করছিল, তখনই শাসনের বিরুদ্ধে বিরোধিতা বাড়ছিল। এই বৈপরীত্যই বিষয়টির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।

দর্শন: প্রবৃদ্ধি আগে, বণ্টন পরে। এই ধারণা গুস্তাভ পাপানেকের নেতৃত্বাধীন হার্ভার্ড উপদেষ্টা গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত, যাঁরা সূত্রমতে আইয়ুবের উন্নয়ন-মডেলের রূপকার ছিলেন। তাঁদের যুক্তি (স্মৃতি থেকে) ছিল, পুঁজি জমা হতে হলে প্রাথমিক পর্যায়ে ধনী ও শিল্পোদ্যোগীদের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়া "কার্যকরী অসমতা" হিসেবে মেনে নিতে হবে।

২. প্রধান নীতিগুলো

ক. শিল্পনীতি: আমদানি-বিকল্প ও রপ্তানি-প্রণোদনা।

  • মডেলটি ছিল উচ্চ আমদানি শুল্ক, কর-ছাড়, বোনাস ভাউচারের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা, অতিমূল্যায়িত বিনিময় হার, আমদানি লাইসেন্স ও ভর্তুকির ওপর দাঁড়ানো আমদানি-বিকল্প কৌশল।
  • ১৯৫৯-এর রপ্তানি বোনাস স্কিম এর কেন্দ্রে ছিল। এতে রপ্তানিকারকরা বিনিময় হারে প্রিমিয়াম, অগ্রাধিকারমূলক ঋণ ও নানা রাজস্ব-সুবিধা পেত।
  • বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বেসরকারি খাতের প্রকল্প-অর্থায়নের জন্য PICIC ও IDBP প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প উন্নয়নে সরকারি সংস্থা ছিল (পিআইডিসির পূর্বাঞ্চলীয় শাখা, পরে ইপিআইডিসি, স্মৃতি থেকে), কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগের বড় অংশ পশ্চিমে কেন্দ্রীভূত হয়।

খ. কৃষিনীতি: ভূমি সংস্কার ও সবুজ বিপ্লব।

  • ১৯৫৯-এর ভূমি সংস্কারে জমির মালিকানার সীমা বেঁধে দেওয়া হয়, তবে (স্মৃতি থেকে) বড় জমিদারদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন ফাঁক দিয়ে জমি ধরে রাখে। পশ্চিমে এতে কৃষক-ক্ষমতায়নের তুলনায় বড় ও মাঝারি কৃষকদের লাভই বেশি হয়।
  • সেচ, নলকূপ ও উচ্চফলনশীল বীজে সবুজ বিপ্লব হয়, যা খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে নিয়ে যায়। এই সাফল্য ছিল বিশেষভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধু অঞ্চলকেন্দ্রিক। সিন্ধু পানি চুক্তি (১৯৬০) এবং সেচ-অবকাঠামো বিনিয়োগও এর সঙ্গে সংযুক্ত (স্মৃতি থেকে)।

গ. পরিকল্পনা ও প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় (১৯৬০-৬৫) ও তৃতীয় (১৯৬৫-৭০) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিনিয়োগ বাড়ানো হয়। পারভেজ হাসানের মতে এই দশক বিনিয়োগ ও প্রতিষ্ঠানগত ভিত্তি, যেমন স্টেট ব্যাংক ও ওয়াপদা, শক্ত করেছিল।

ঘ. আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর ঘোষণা। আইয়ুব মাথাপিছু আঞ্চলিক আয়ের "সমতা"-কে সংবিধানিক আদেশে পরিণত করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানকে আগের দশকের চেয়ে ভালো আচরণের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু একই সূত্র বলে, সাধারণভাবে এসব নীতি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি কিছু সাড়া দিলেও তা যথেষ্ট ছিল না এবং বাঙালিদের সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। এটি আমেরিকান ছাত্রপত্রে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ, তাই সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ হিসেবে পড়া উচিত, চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়।

৩. অর্জন

  • প্রবৃদ্ধি: ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানের জিডিপি বার্ষিক প্রায় ৫-৬% হারে বেড়েছিল (স্মৃতি থেকে; ছবিটি ভিন্ন উৎসে কিছুটা ভিন্ন), শিল্প প্রবৃদ্ধি ছিল আরও বেশি।
  • নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণি: কর-প্রণোদনা ও রপ্তানি বোনাস নতুন শিল্পোদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের উৎসাহিত করে। একটি ব্যবসায়ী ও শ্রমিক শ্রেণি গড়ে ওঠে, কৃষিতে সম্পদ তৈরি হয়।
  • কাঠামোগত রূপান্তর: এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী আইয়ুবের "উন্নয়নের দশক" পাকিস্তানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো সুস্পষ্টভাবে বদলে দিয়েছিল।

৪. ক্ষতিকর দিক ও সমালোচনা

ক. সম্পদের কেন্দ্রীকরণ: "বাইশ পরিবার"।

  • ১৯৬৮ সালে অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল হক (স্মৃতি থেকে) প্রকাশ্যে বলেন, দেশের শিল্প ও আর্থিক সম্পদ অল্প কয়েকটি পরিবারের হাতে। এই স্লোগানের বক্তব্য ছিল ২২টি পরিবার শিল্পের ৬৬ শতাংশ এবং ব্যাংকিং ও বিমার ৮৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই সংখ্যা সেই সময়ের জনপ্রিয় প্রচার-ভাষ্য, এর যথার্থতা নিয়েও আলোচনা আছে, তবে প্রবণতাটি স্বীকৃত।
  • ইশরাত হুসেনের বিশ্লেষণে সম্পদ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা অল্প কয়েকজনের হাতে জড়ো হওয়ায় আয়ের ও আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়েছিল।

খ. পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা।

  • জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব প্রদেশ কার্যত অবহেলিত ছিল, কারণ বাইশ পরিবারের কেউ সেখান থেকে ছিল না। একই সূত্র বলছে, ১৯৭০ নাগাদ পশ্চিমের মাথাপিছু আয় পূর্বের চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়, এবং বহু পর্যবেক্ষক এই আঞ্চলিক বৈষম্যকে ১৯৭১-এ বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ মনে করেন।
  • বাঙালি অর্থনীতিবিদদের "দুই অর্থনীতি" তত্ত্ব (রেহমান সোবহান, নূরুল ইসলাম প্রমুখ, স্মৃতি থেকে) বলত, পূর্বের রপ্তানি-আয় (বিশেষত পাটের) পশ্চিমের আমদানি-বিকল্প শিল্প ও আমদানি-ব্যয় মেটাতে সরে গেছে। বিনিময় হার ও আমদানি লাইসেন্স ব্যবস্থায় সুবিধাপ্রাপ্তরা বেশির ভাগই পশ্চিমের। কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় (প্রতিরক্ষা, রাজধানী ইসলামাবাদের নির্মাণ) পশ্চিমকেন্দ্রিক ছিল।
  • সূত্র আরও বলে, আইয়ুবের অর্থনৈতিক নীতির সাফল্যে নতুন সামাজিক শক্তির জন্ম হয়, কিন্তু তাদের ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়নি। উন্নয়ন ও গণতন্ত্রহীনতার এই সংমিশ্রণ বিস্ফোরক ছিল।

গ. নীতির অন্তর্গত বিকৃতি। রপ্তানি বোনাস স্কিমের ফলে তৈরি বহু-বিনিময়-হার ব্যবস্থায় বস্ত্র-রপ্তানিতে কার্যকর ভর্তুকি ১০০ শতাংশেরও বেশি হয়, আর কৃষিজ রপ্তানির ওপর কার্যত কর বসে। ফলে শিল্পের গভীরতা বাড়েনি এবং প্রতিযোগিতামূলক বৈচিত্র্যময় রপ্তানি-ভিত্তি তৈরি হয়নি। কৃষিজ পণ্য, বিশেষত পাট, যার বড় অংশ পূর্বের, তাই পরোক্ষে বঞ্চিত হয়েছিল।

ঘ. ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ। বিশ্লেষকরা মনে করেন, আইয়ুবের কর্তৃত্ববাদী ও নির্ভরশীল উন্নয়ন-মডেলের সংকট গভীর সামাজিক ও আঞ্চলিক বৈষম্য তৈরি করে, যা দেশ ভাঙার পরিস্থিতি জোগায়। ১৯৬৮-৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় শ্রমিক, ছাত্র ও মধ্যবিত্তের বিক্ষোভে এর প্রতিফলন দেখা যায়। পশ্চিমেও জুলফিকার আলী ভুট্টোর রাজনীতি এই বৈষম্য-বিরোধী অনুভূতিকেই কাজে লাগায়।

৫. মূল্যায়ন

সমর্থনের যুক্তি। কেউ কেউ বলেন, ১৯৫০-এর দশকের অস্থিরতার পর আইয়ুব স্থিতিশীল নীতি-কাঠামো ও প্রবৃদ্ধির ভিত্তি দিয়েছিলেন। কিছু অর্থনীতিবিদ (পাপানেক ঘরানা) যুক্তি দেন, পূর্বও কিছুটা এগিয়েছে, পূর্বের পিছিয়ে থাকার কারণ ছিল প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা (বন্যা, জনঘনত্ব), প্রাথমিক শিল্পভিত্তির অভাব ও বিনিয়োগকারী শ্রেণির দুর্বলতা। এটি আংশিক সত্য, তবে বৈষম্যের গতি ও কাঠামো (লাইসেন্স, বিদেশি মুদ্রা, ঋণ, সরকারি ব্যয়) ব্যাখ্যা করতে এটি যথেষ্ট নয়, এটাই অধিকাংশ বাঙালি ও অনেক পশ্চিম পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদের পাল্টা অবস্থান।

আমার মূল্যায়ন। এটি আমার বিশ্লেষণ, পূর্ণ ঐকমত্যের বিষয় নয়। আইয়ুব-মডেল উৎপাদন বাড়িয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, বণ্টন ও আঞ্চলিক ন্যায্যতার কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। নীতিগুলো আলাদাভাবে অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত ধরা গেলেও, একটি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান সিদ্ধান্ত-গ্রহণের কেন্দ্রে ছিল না। তাই "বৈষম্য" শুধু পরিসংখ্যানগত বিষয় থাকেনি, হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ক্ষোভের ভাষা। এতে জাহানের কাঠামোর (ভূগোল, ভাষা ইত্যাদির সঙ্গে ক্ষমতা-কাঠামো মিলিয়ে দেখা) সঙ্গে সংগতি পাওয়া যায়, আর ছয় দফা ও ১৯৬৯-এর আন্দোলনের অর্থনৈতিক ভিত্তিও স্পষ্ট হয়।

সূত্র সম্পর্কে: আমি মূলত ইশরাত হুসেন ও পারভেজ হাসানের মতো অর্থনীতিবিদদের লেখা এবং সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছি। কয়েকটি সূত্র পরীক্ষার-প্রস্তুতির ওয়েবসাইট বা ছাত্রপত্র, সেগুলো কেবল সাধারণ বর্ণনার জন্য। সংখ্যাগত তথ্যের জন্য রেহমান সোবহানের Basic Democracies, Works Programme and Rural Development in East Pakistan, গুস্তাভ পাপানেকের Pakistan's Development: Social Goals and Private Incentives এবং নূরুল ইসলামের লেখা মিলিয়ে দেখলে ভালো হবে।

 

 

 

আইয়ুব খানের শাসনামল (১৯৫৮-১৯৬৯) পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ইতিহাসে 'উন্নয়নের দশক' (Decade of Development) নামে পরিচিত। তাঁর অর্থনৈতিক নীতির মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত শিল্পায়ন ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন, যার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা হবে। কিন্তু এই নীতির কাঠামোগত বৈষম্য—বিশেষত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে—পরবর্তীতে পাকিস্তানের ভাঙনকে ত্বরান্বিত করে।

 

### 🎯 মূল লক্ষ্য ও কৌশল: 'কার্যকরী বৈষম্য' তত্ত্ব

 

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তি ছিল **'কার্যকরী বৈষম্য' (Functional Inequality)** তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য প্রথমে কিছুটা আয়বৈষম্য সহ্য করা প্রয়োজন, কারণ ধনী ও উদ্যোক্তা শ্রেণির হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হলে তা সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়াবে, এবং শেষ পর্যন্ত এর সুফল নিচের স্তরেও 'গড়িয়ে পড়বে' (trickle-down effect)। পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশনের হার্ভার্ড উপদেষ্টা গুস্তাভ পাপানেক এটিকে আরও স্পষ্ট করে 'লোভের সামাজিক উপযোগিতা' (social utility of greed) বলে অভিহিত করেছিলেন।

 

### 🏭 প্রধান নীতিসমূহ ও তার বাস্তবায়ন

 

1.  **শিল্পায়নে জোর ও আমদানি-প্রতিস্থাপন:** সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্পায়নকে উৎসাহিত করা হয়। ট্যাক্স ছাড়, সহজ ঋণ, আমদানি লাইসেন্স ও বৈদেশিক মুদ্রার সুবিধা দিয়ে উদ্যোক্তা শ্রেণিকে গড়ে তোলা হয়। ১৯৫৯ সালে প্রবর্তিত **'এক্সপোর্ট বোনাস স্কিম'** রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহিত করে।

2.  **ভূমি সংস্কার ও সবুজ বিপ্লব:** জমিদারি প্রথার প্রভাব কমাতে irrigated জমির জন্য ৫০০ একর এবং non-irrigated জমির জন্য ১০০০ একর সিলিং নির্ধারণ করা হয়। তবে আইনগত ফাঁকফোকর থাকায় প্রকৃত ভূমিহীনরা তেমন উপকৃত হয়নি। কৃষিতে উন্নত বীজ, সার, ট্রাক্টর ও সেচের ব্যবহার বাড়িয়ে **সবুজ বিপ্লব** আনা হয়, কিন্তু এর সুফলও মূলত পাঞ্জাবের বড় কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

3.  **বাণিজ্য উদারীকরণ ও বিদেশি সহায়তা:** আমদানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে বাজারমুখী নীতি গ্রহণ করা হয়। বিশ্বব্যাংক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক সহায়তা এই نموذجকে সমর্থন জোগায়।

 

### 📈 অর্জন: উচ্চ প্রবৃদ্ধির 'মিথ'

 

আইয়ুবের অর্থনৈতিক নীতির ফলাফল হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো প্রবৃদ্ধি ঘটে:

- **জিডিপি প্রবৃদ্ধি:** গড়ে প্রায় **৬%** বা তার বেশি ছিল।

- **উৎপাদন খাত:** শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ছিল অসাধারণ, বার্ষিক গড়ে প্রায় **১৭%** (কিছু সূত্রে ৮.৫১%)।

- **অবকাঠামো:** বড় বাঁধ ও সেচ প্রকল্প নির্মিত হয়, যা কৃষি ও শিল্পে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ করে।

 

### ⚖️ সমালোচনা: প্রবৃদ্ধির ছায়ায় বৈষম্যের প্রাচীর

 

এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির পেছনে ছিল গভীর ও স্থায়ী বৈষম্য, যা তিনটি স্তরে প্রকট ছিল:

 

- **শ্রেণিগত বৈষম্য ও '২২ পরিবার':** রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সম্পদ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। আইয়ুবের নিজের পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মেহবুব-উল-হক ১৯৬৯ সালে স্বীকার করেন যে, পাকিস্তানের অর্থনীতি কার্যত **'২২টি পরিবার'** নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ফলে সাধারণ শ্রমিক ও কৃষকের প্রকৃত মজুরি কমে যায় এবং তারা দারিদ্র্যের কবলে পড়ে।

- **আঞ্চলিক বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানের শোষণ:** সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্য ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে। পূর্ব পাকিস্তান দেশের রপ্তানি আয়ের অর্ধেকেরও বেশি জোগান দিলেও, উন্নয়ন ব্যয়ের সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হয়। ১৯৬১-৬৭ সময়কালে পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশনের (PICIC) মাত্র **২২%** ঋণ পূর্ব পাকিস্তানে যায়।

- **মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান:** আইয়ুব ক্ষমতা নেওয়ার সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান ছিল **৩০%**। তাঁর শাসনামলের শেষে এই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় **৬১%**-এ। অর্থাৎ, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ৪২% বেড়েছিল, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানে তা বেড়েছিল মাত্র ১৭%।

- **সামাজিক খাতে অবহেলা:** শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক খাতে বিনিয়োগ ছিল অপ্রতুল। এই খাতগুলোর প্রতি সরকারের উদাসীনতা সরাসরি স্বীকৃত হয়।

 

### 💎 পরিণতি: ১৯৭১-এর পথ তৈরি

 

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতি একটি দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী ছিল। এটি পাকিস্তানে একটি শিল্প ভিত্তি তৈরি করেছিল এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি এনেছিল, কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুফল অসমভাবে বণ্টিত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তারা কেবল একটি রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নয়, বরং একটি **অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উপনিবেশ**—যার সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতিই ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। তাই বলা যায়, আইয়ুবের 'উন্নয়নের দশক' আসলে পূর্ব পাকিস্তানে 'বঞ্চনার দশক' ছিল, যা বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে তুলেছিল।

 

 

 

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতি (Ayub Khan’s Economic Policy), ১৯৫৮–১৯৬৯: সাফল্য, বৈষম্য ও পূর্ব পাকিস্তানের ওপর প্রভাব

ভূমিকা

পাকিস্তানের ইতিহাসে জেনারেল মুহাম্মদ আইয়ুব খানের শাসনামল (১৯৫৮–১৯৬৯) অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈষম্যের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর শাসনামলকে পাকিস্তানের ইতিহাসে ‘উন্নয়নের দশক’ (Decade of Development) অথবা ‘Golden Sixties’ বলা হয়।

আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর পূর্ণ সামরিক ক্ষমতা গ্রহণের পর পাকিস্তানের অর্থনীতিকে দ্রুত শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন।

তাঁর অর্থনৈতিক নীতির মূল লক্ষ্য ছিল একটি আধুনিক, শিল্পায়িত ও উৎপাদনমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে তিনি রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি পুঁজির বিকাশকে বিশেষ গুরুত্ব দেন।

তাঁর শাসনামলে পাকিস্তানের সামগ্রিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণি এবং পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয়নি।

বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে, তাদের শ্রম, সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

সুতরাং, আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতিকে দুটি দিক থেকে মূল্যায়ন করতে হবে:

1. পাকিস্তানের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও কৃষির আধুনিকীকরণে তাঁর অবদান।

2. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অসম বণ্টন, সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য।

১. আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির মূল দর্শন

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনানির্ভর উন্নয়ন এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নেতৃত্বে শিল্পায়ন।

তিনি মনে করতেন, পাকিস্তানের মতো উন্নয়নশীল দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন:

  • দ্রুত শিল্পায়ন।
  • কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।
  • দেশি-বিদেশি পুঁজির বিনিয়োগ।
  • বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদান।
  • আমদানি বিকল্প শিল্পের বিকাশ।
  • রপ্তানি বৃদ্ধি।
  • অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
  • অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি।

তাঁর অর্থনৈতিক নীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সহযোগিতা এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও উপদেষ্টাদের প্রভাব ছিল।

এ সময় পাকিস্তানের Planning Commission অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

১৯৬০–৬৫ সালের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (Second Five-Year Plan) এবং ১৯৬৫–৭০ সালের তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (Third Five-Year Plan) ছিল তাঁর অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশলের প্রধান হাতিয়ার।

Journal of International Affairs+2

২. শিল্পায়ননীতি (Industrialization Policy)

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দ্রুত শিল্পায়ন।

তিনি মনে করতেন, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি দিয়ে পাকিস্তানকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব নয়। এজন্য একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি তৈরি করতে হবে।

তাঁর শিল্পায়ননীতির প্রধান কৌশলগুলো ছিল:

ক. আমদানি বিকল্প শিল্পায়ন (Import Substitution Industrialization)

পাকিস্তান আগে যেসব শিল্পপণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করত, সেগুলো দেশে উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বিশেষত নিম্নলিখিত শিল্পের বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়:

  • বস্ত্রশিল্প (Textile Industry)।
  • পাট ও পাটজাত শিল্প।
  • সিমেন্ট শিল্প।
  • সার ও রাসায়নিক শিল্প।
  • চিনি শিল্প।
  • ভোগ্যপণ্য ও হালকা প্রকৌশল শিল্প।

বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ ও আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়।

খ. বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ

আইয়ুব খান রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মালিকানার পরিবর্তে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের শিল্পায়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

এজন্য সরকার বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করে:

1. শিল্প স্থাপনে সহজ শর্তে ঋণ।

2. শিল্পের জন্য কর ছাড় ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা।

3. যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সুবিধা।

4. নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য লাইসেন্স ও বিনিয়োগের সুযোগ।

5. বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ প্রদান।

এ ক্ষেত্রে Pakistan Industrial Credit and Investment Corporation (PICIC) এবং Industrial Development Bank of Pakistan (IDBP)-এর মতো প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিল্পপতিদের ঋণ ও বিনিয়োগের অর্থ সরবরাহ করা হতো।

SOAS Eprints+1

গ. Export Bonus Scheme বা রপ্তানি বোনাস ব্যবস্থা

১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার Export Bonus Scheme চালু করে।

এটি ছিল আইয়ুব খানের শিল্প ও বাণিজ্যনীতিের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

এর উদ্দেশ্য ছিল শিল্পপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি করা।

এই ব্যবস্থায় রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের জন্য বিশেষ বোনাস ভাউচার দেওয়া হতো। এসব ভাউচারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত পণ্য আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা যেত অথবা ভাউচার বিক্রি করা যেত।

এর ফলে রপ্তানিকারকরা অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পেতেন এবং শিল্পপণ্য বিদেশে রপ্তানিতে উৎসাহিত হতেন।

এই ব্যবস্থার ফলে পাকিস্তানের বস্ত্র ও পাটজাত শিল্পের রপ্তানি বৃদ্ধি পায়।

PIDE+2

ঘ. বৈদেশিক পুঁজি ও সাহায্য গ্রহণ

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

পাকিস্তান বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে খাদ্য, প্রযুক্তি, সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য লাভ করে।

বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকেও ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতা পাওয়া যায়।

এসব অর্থ শিল্পায়ন, কৃষি, বিদ্যুৎ, সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হয়।

তবে বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের ওপর নির্ভরতা পাকিস্তানের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের চাপ সৃষ্টি করেছিল।

SJBIPP+1

৩. কৃষির আধুনিকীকরণ ও সবুজ বিপ্লব (Green Revolution)

File:Wheat Crop, E Canal Rd, Faisalabad, Pakistan - panoramio.jpg - Wikimedia Commons

小麦畑の灌漑|写真で辿る100年

United Nations Photo - Final Phase Digital

6

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কৃষির আধুনিকীকরণ।

তিনি মনে করতেন, কৃষির উৎপাদনশীলতা না বাড়ালে শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, কাঁচামাল ও উদ্বৃত্ত পুঁজি অর্জন করা সম্ভব নয়।

এজন্য কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ক. উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার

১৯৬০-এর দশকে উচ্চফলনশীল গম ও ধানের জাত (High Yielding Varieties বা HYV) পাকিস্তানে ব্যবহার করা শুরু হয়।

বিশেষত মেক্সিকো থেকে উন্নত গমের বীজ আমদানি করা হয়।

এর ফলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

খ. আধুনিক সেচব্যবস্থা

কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য:

  • গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন।
  • খাল ও সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
  • বাঁধ নির্মাণ।
  • বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প ব্যবহার।

এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

১৯৬৭ সালে মংলা বাঁধ (Mangla Dam) চালু হওয়া পশ্চিম পাকিস্তানের সেচ ও বিদ্যুৎব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

গ. রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার

কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ানো হয়। এর ফলে উচ্চফলনশীল বীজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হয়।

ঘ. কৃষির যান্ত্রিকীকরণ

ট্রাক্টর, আধুনিক কৃষিযন্ত্র এবং যান্ত্রিক সেচব্যবস্থা ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়।

ঙ. খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের উদ্যোগ

১৯৬৬ সালে খাদ্যশস্যের উৎপাদন পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। তখন আইয়ুব সরকার ১৯৬৭ সালে Food Self-Sufficiency Programme গ্রহণ করে।

এই কর্মসূচির ফলে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বৃদ্ধি পায়।

পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ পারভেজ হাসানের স্মৃতিকথা অনুসারে, ১৯৬৫–৭০ সালের মধ্যে গম ও ধানের উৎপাদন প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়; সার ব্যবহার প্রায় পাঁচগুণ হয় এবং নতুন জাতের বীজ সেচনির্ভর গম ও ধান চাষের প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকায় বিস্তার লাভ করে।

SJBIPP+1

সীমাবদ্ধতা: সবুজ বিপ্লবের সুবিধা প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহৎ ও মাঝারি কৃষকরা বেশি পেয়েছিল। কারণ সেখানে বড় সেচব্যবস্থা, ভূমির মালিকানা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ও কৃষিঋণ পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

পূর্ব পাকিস্তানেও উচ্চফলনশীল ধানের চাষের বিস্তার ঘটেছিল, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের মতো ব্যাপক সেচ অবকাঠামো ও গম উৎপাদনকেন্দ্রিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুবিধা সেখানে সমানভাবে পাওয়া যায়নি।

ফলে কৃষির আধুনিকীকরণ হলেও দুই অঞ্চলের উৎপাদন ও আয়ের ব্যবধান পুরোপুরি কমেনি।

World Bank+1

৪. ভূমি সংস্কার (Land Reforms), ১৯৫৯

আইয়ুব খান কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জমিদারি ও সামন্তীয় ভূস্বামী কাঠামোর কিছু পরিবর্তনের জন্য ১৯৫৯ সালে ভূমি সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

এই কর্মসূচি ছিল Land Reforms Regulation, 1959 বা Martial Law Regulation No. 64।

এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল:

1. একজন ব্যক্তির জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা।

2. সেচযুক্ত জমির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০০ একর এবং সেচবিহীন জমির ক্ষেত্রে ১,০০০ একর সীমা নির্ধারণ করা।

3. নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত জমি সরকার অধিগ্রহণ করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা।

4. প্রজাদের কিছু অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

5. কিছু প্রচলিত সামন্তীয় ভূমিস্বত্ব বিলোপ করা।

flc.gov.pk+1

ভূমি সংস্কারের সীমাবদ্ধতা

এই সংস্কার কার্যকরভাবে ভূমির মালিকানা কাঠামো পরিবর্তন করতে পারেনি।

কারণ:

  • জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা ছিল অনেক বেশি।
  • জমি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে মালিকানা সীমা এড়ানোর সুযোগ ছিল।
  • বিভিন্ন বিশেষ বিধান ও ছাড়ের কারণে বড় ভূস্বামীরা অনেক জমি ধরে রাখতে সক্ষম হন।
  • ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টনের পরিমাণ ছিল সীমিত।

অর্থাৎ ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে কৃষির আধুনিকীকরণে কিছু সহায়তা দেওয়া হলেও গ্রামীণ সমাজের ক্ষমতা ও সম্পদের কাঠামোগত বৈষম্য দূর হয়নি।

বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানের বড় ভূস্বামী শ্রেণির সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বহাল ছিল।

Taylor & Francis Online+2

৫. অবকাঠামোগত উন্নয়ন (Infrastructure Development)

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতিতে বিদ্যুৎ, সড়ক, বাঁধ, সেচব্যবস্থা, বন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।

প্রধান উদ্যোগগুলোর মধ্যে ছিল:

ক্ষেত্র

গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ

বিদ্যুৎ

জলবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামোর সম্প্রসারণ

সেচ

মংলা বাঁধ ও ইন্দুস বেসিন উন্নয়ন প্রকল্প

পরিবহন

জাতীয় সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ

শিল্প

শিল্পাঞ্চল ও শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা

নগর উন্নয়ন

ইসলামাবাদকে নতুন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা

কৃষি

খাল, নলকূপ ও সেচ প্রকল্পের সম্প্রসারণ

এসব উদ্যোগ পাকিস্তানের উৎপাদন ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

তবে অবকাঠামোগত বিনিয়োগের ভৌগোলিক বণ্টনেও দুই অঞ্চলের মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল। বিশেষত ইন্দুস বেসিন ও বৃহৎ সেচ প্রকল্পের বড় অংশ পশ্চিম পাকিস্তানে বাস্তবায়িত হয়েছিল।

৬. আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির ফলে ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটে।

ক. জাতীয় আয় বৃদ্ধি

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের Journal of International Affairs-এ প্রকাশিত অর্থনীতিবিদ ইশরাত হোসেনের বিশ্লেষণ অনুসারে, আইয়ুব আমলে পাকিস্তানের জিডিপির গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশে উন্নীত হয়। পঞ্চাশের দশকে এই হার ছিল প্রায় ৩ শতাংশ।

খ. শিল্পায়নের গতি বৃদ্ধি

উৎপাদনশীল শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রায় ৯ শতাংশে পৌঁছায়।

নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় এবং পাকিস্তান শিল্পপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও অগ্রগতি অর্জন করে।

১৯৬৯ সালের মধ্যে পাকিস্তানের প্রস্তুতকৃত শিল্পপণ্যের রপ্তানি থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সম্মিলিত রপ্তানির চেয়েও বেশি ছিল বলে ইশরাত হোসেন উল্লেখ করেন।

Journal of International Affairs+1

গ. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি

সবুজ বিপ্লবের কারণে গম ও ধানের উৎপাদন বাড়ে।

কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে পাকিস্তান খাদ্য উৎপাদনে অধিকতর স্বনির্ভর হওয়ার দিকে অগ্রসর হয়।

ঘ. আধুনিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা

Planning Commission, PICIC, IDBP এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে পাকিস্তানে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিকাশ ঘটে।

ঙ. নতুন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী শ্রেণির বিকাশ

আইয়ুব খানের নীতির ফলে পাকিস্তানে একটি শক্তিশালী শিল্পপতি ও উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে ওঠে।

রাষ্ট্রীয় ঋণ, ভর্তুকি, বৈদেশিক মুদ্রার সুবিধা এবং বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী দ্রুত সম্প্রসারিত হয়।

৭. আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও আইয়ুব খানের নীতির কিছু গুরুতর সীমাবদ্ধতা ছিল। বিশেষত বৈষম্য, সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের অসম বণ্টন তাঁর অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি করে।

ক. সম্পদের কেন্দ্রীভবন: ২২ পরিবারের আধিপত্য (Twenty-Two Families)

’بیس گھرانے ہیں آباد اور کروڑوں ہیں ناشاد‘ | Independent Urdu

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত সমালোচনা ছিল পাকিস্তানের সম্পদ অল্প কয়েকটি পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া।

১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল হক (Mahbub ul Haq) ‘২২ পরিবার’ (Twenty-Two Families) ধারণাটি সামনে আনেন।

তাঁর আলোচিত হিসাব অনুসারে, ২২টি শিল্পপতি পরিবার পাকিস্তানের:

  • প্রায় ৬৬ শতাংশ শিল্পসম্পদ।
  • প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যাংকিং সম্পদ।
  • প্রায় ৭৯ শতাংশ বিমা ব্যবসা

নিয়ন্ত্রণ করত।

এই বক্তব্য পাকিস্তানে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

Dawn+2

এই সম্পদ কেন্দ্রীভবনের কারণ কী ছিল?

1. সরকারের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শিল্পঋণ।

2. বৃহৎ শিল্পপতিদের জন্য আমদানি লাইসেন্স ও বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ।

3. কর ছাড় ও বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা।

4. বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে রাষ্ট্রীয় নীতির পক্ষপাত।

5. শ্রমিক ও কৃষকদের তুলনায় পুঁজিপতিদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগত বিষয় রয়েছে। পরবর্তী গবেষণায় ২২ পরিবারের সংখ্যাটি ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের হার নিয়ে আরও সতর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আমজাদের একটি গবেষণায় শীর্ষ ১৮টি শিল্পগোষ্ঠীর হাতে প্রায় ৩৫ শতাংশ শিল্পসম্পদ এবং শীর্ষ ৪৪টির হাতে প্রায় ৫০ শতাংশ থাকার হিসাব পাওয়া যায়। মাহবুব উল হক নিজেও পরবর্তী সময়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন, ২২টি পরিবার সমস্যার মূল কারণ নয়; বরং বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার একটি লক্ষণ।

SOAS Eprints+1

ঐতিহাসিক তাৎপর্য: পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধারণ জনগণের মধ্যে সমভাবে বণ্টিত হয়নি। ফলে শিল্পায়নের সুফল প্রধানত সীমিতসংখ্যক শিল্পপতি ও পুঁজিপতির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল।

খ. পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমস্যা ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য।

পূর্ব পাকিস্তান জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শিল্পায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, বৈদেশিক সাহায্য এবং মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান অনেক এগিয়ে যায়।

মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান

পারভেজ হাসানের গবেষণা ও স্মৃতিকথায় ব্যবহৃত পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুসারে:

সময়

পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় বেশি

১৯৫৯–৬০

৩২%

১৯৬৬–৬৭

৫৪%

১৯৬৯–৭০

৬২%

তবে একই সময় পশ্চিম পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদদের ব্যবহৃত বিকল্প হিসাব অনুযায়ী ব্যবধান ছিল যথাক্রমে ২৪%, ৩১.২% এবং ৩৮%। এই পার্থক্য এসেছে ব্যবহৃত হিসাবপদ্ধতি ও তুলনার ভিত্তি থেকে। উভয় হিসাবেই ব্যবধান বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট।

SJBIPP+1

মাথাপিছু আয়ের আঞ্চলিক ব্যবধান

পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় কত শতাংশ বেশি—পূর্ব পাকিস্তান প্যানেলের হিসাব।

Chart

সূত্র: Planning Commission, Fourth Plan Economists’ Panel; Parvez Hasan, My Life and My Country.

উন্নয়ন ব্যয়ের অসম বণ্টন

দুই অঞ্চলের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের পার্থক্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে:

  • পশ্চিম পাকিস্তানে বেসরকারি শিল্প বিনিয়োগ বেশি ছিল।
  • পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পপতি ও উদ্যোক্তা শ্রেণি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল।
  • পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্প ও কৃষির অবকাঠামোতে দীর্ঘদিন ধরে বেশি বিনিয়োগ হয়েছিল।
  • পূর্ব পাকিস্তানের পাট রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার যথাযথ সুফল পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়নি।

তবে এখানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা রয়েছে।

আইয়ুব সরকারের আমলে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি উন্নয়ন ব্যয় একেবারে বাড়েনি—এমন দাবি সঠিক নয়। পারভেজ হাসানের বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৬০–৬১ থেকে ১৯৬৭–৬৮ সালের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি উন্নয়ন ব্যয় প্রকৃত মূল্যে প্রায় ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে এই বৃদ্ধির হার ছিল ৪০ শতাংশের কম।

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইন্দুস বেসিন রিপ্লেসমেন্ট প্রকল্প বাদ দিলে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি উন্নয়ন ব্যয় পশ্চিম পাকিস্তানকে ছাড়িয়েও যায়।

কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে বেসরকারি বিনিয়োগ পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম থাকায় মোট বিনিয়োগের ব্যবধান বজায় থাকে।

SJBIPP+2

এ কারণে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নটিকে শুধু সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের হিসাব দিয়ে বিচার করলে সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

গ. বৈদেশিক মুদ্রার অসম ব্যবহার ও সম্পদ স্থানান্তর

পূর্ব পাকিস্তান পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা পালন করত।

কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অভিযোগ ছিল, তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ অভিযোগের একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল।

পারভেজ হাসানের পরবর্তী গবেষণামূলক মূল্যায়ন অনুসারে, ১৯৫০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদ স্থানান্তর ঘটেছিল, যার পরিমাণ পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপির বছরে প্রায় ১ শতাংশের সমান ছিল। তবে তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের পর এই ধরনের নিট প্রকৃত সম্পদ স্থানান্তর আর অব্যাহত ছিল না। কিন্তু ষাটের দশকে পশ্চিম পাকিস্তান অধিক বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ ও বিনিয়োগের সুবিধা পেতে থাকে।

SJBIPP+1

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা প্রয়োজন:

1. পূর্ব পাকিস্তানের উৎপাদিত বৈদেশিক মুদ্রার মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি উপকৃত হয়েছিল—এমন ঐতিহাসিক অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।

2. ষাটের দশকের প্রতিটি বছরেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে সমপরিমাণ সম্পদ সরাসরি পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়েছিল—এমন বক্তব্য অর্থনৈতিক গবেষণায় সমর্থিত নয়।

তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে না, তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঘ. কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির বঞ্চনা

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল প্রধানত শিল্পপতি, বড় ব্যবসায়ী, ভূস্বামী ও অপেক্ষাকৃত সচ্ছল কৃষকদের কাছে পৌঁছেছিল।

কৃষির আধুনিকীকরণে প্রয়োজনীয় উচ্চমূল্যের বীজ, সার, ট্রাক্টর ও সেচপ্রযুক্তি ব্যবহারের সামর্থ্য ক্ষুদ্র কৃষকদের অনেকের ছিল না।

অন্যদিকে শিল্পায়নের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকদের মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা একই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি।

ফলে প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও শ্রেণিগত বৈষম্য বিদ্যমান ছিল।

ঙ. বিদেশি সাহায্য ও ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা

আইয়ুব খানের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি বড় অংশ বিদেশি সাহায্য ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য পাকিস্তানের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

ফলে খাদ্য ও উন্নয়ন সাহায্যের ওপর নির্ভরতা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

অন্যদিকে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য সমস্যা তৈরি করেছিল।

SJBIPP+1

৮. পূর্ব পাকিস্তানের ওপর আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির রাজনৈতিক প্রভাব

এখন প্রশ্ন হলো, উপরোক্ত অর্থনৈতিক নীতিগুলো পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত?

আমার মতে, এই সম্পর্কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে শুধু দৃশ্যমান করেনি; বরং সেটিকে একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছিল।

ক. দুই অর্থনীতির ধারণার বিকাশ (Two Economies Theory)

১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা যুক্তি দিতে থাকেন যে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও কাঠামো পৃথক।

পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান ও আনিসুর রহমান বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

তাঁরা দেখান যে, একক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে দুই অঞ্চলের জন্য পৃথক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও ন্যায়সংগত সম্পদ বণ্টন প্রয়োজন।

এই চিন্তাধারাই পরবর্তীকালে ছয় দফা কর্মসূচির অর্থনৈতিক ভিত্তি গঠনে সাহায্য করে।

খ. ছয় দফা আন্দোলনের অর্থনৈতিক ভিত্তি

১৯৬৬ সালের ছয় দফা শুধু রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না। এর মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের সুস্পষ্ট কর্মসূচি ছিল।

বিশেষ করে:

  • কর ও রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে দেওয়া।
  • বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও ব্যবহারের ওপর প্রাদেশিক নিয়ন্ত্রণ।
  • দুই অঞ্চলের মধ্যে পুঁজি পাচার বন্ধ।
  • পৃথক বা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাব্যবস্থা।
  • পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

এই দাবিগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা।

অর্থাৎ, আইয়ুব খানের আমলে অর্থনৈতিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে অর্থনৈতিক মুক্তির ধারণাকে যুক্ত করে।

গ. ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান

আইয়ুব খানের উন্নয়ননীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে সমান সুযোগ ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি।

রাজনৈতিক স্বৈরশাসন, শ্রেণিগত বৈষম্য এবং আঞ্চলিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে গণঅসন্তোষ বৃদ্ধি পায়।

এই অসন্তোষ ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম পটভূমি ছিল।

ঘ. ১৯৭০ সালের নির্বাচন

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছয় দফার ভিত্তিতে নির্বাচনী প্রচারণা চালায়।

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিপুলভাবে ছয় দফার পক্ষে রায় দেয়।

এতে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছিল।

পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া এবং ১৯৭১ সালের সামরিক অভিযান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়।

৯. আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির সামগ্রিক মূল্যায়ন

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির মূল্যায়নে একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ঠিক হবে না।

ইতিবাচক দিক

নেতিবাচক দিক

জাতীয় অর্থনীতিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি

প্রবৃদ্ধির সুফল অসমভাবে বণ্টিত

দ্রুত শিল্পায়ন

সম্পদের কেন্দ্রীভবন

কৃষির আধুনিকীকরণ

বড় কৃষকদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা

খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি

আঞ্চলিক কৃষি উন্নয়নে অসমতা

অবকাঠামোর উন্নয়ন

পূর্ব-পশ্চিম বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবধান

বেসরকারি বিনিয়োগের সম্প্রসারণ

২২ পরিবারের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর আধিপত্য

পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা

বিদেশি সাহায্য ও ঋণের ওপর নির্ভরতা

শিল্পপতি শ্রেণির বিকাশ

শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সীমিত অংশগ্রহণ

আমার মতামত

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতিকে আমি প্রবৃদ্ধিমুখী কিন্তু অসমতাভিত্তিক উন্নয়ন মডেল হিসেবে মূল্যায়ন করব।

তাঁর আমলে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে বাস্তব প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল। শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। এগুলো অস্বীকার করা যায় না।

কিন্তু উন্নয়নের প্রশ্নে শুধু জাতীয় আয় বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। কারা এই উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে, কোন অঞ্চলে বিনিয়োগ হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কী পরিবর্তন ঘটছে—সেগুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক মডেলের তিনটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা ছিল:

প্রথমত, সম্পদের অসম বণ্টন: অল্পসংখ্যক শিল্পপতি ও ভূস্বামী বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার যথাযথ প্রতিফলন পায়নি। পশ্চিম পাকিস্তানের দ্রুততর শিল্পায়ন ও কৃষি উন্নয়নের ফলে দুই অঞ্চলের মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান বৃদ্ধি পায়।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অভাব: অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির ওপর জনগণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আমার বিবেচনায়, আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল পাকিস্তানের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুই অঞ্চলের মধ্যে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সংহতিতে রূপান্তর করতে না পারা।

অর্থাৎ, আইয়ুব খানের শাসনামলে পাকিস্তানের অর্থনীতি উন্নত হয়েছিল, কিন্তু পাকিস্তানি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঐক্য শক্তিশালী হয়নি। বরং উন্নয়নের অসম বণ্টন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষাকে আরও জোরালো করে তুলেছিল।

১০. নির্বাচিত গবেষণাগ্রন্থ ও তথ্যসূত্র

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে একাডেমিকভাবে পড়ার জন্য নিচের বই ও গবেষণাপত্রগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক

গ্রন্থ/প্রবন্ধ

বিষয়

Mahbub ul Haq

The Strategy of Economic Planning (1963)

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কৌশল

Mahbub ul Haq

Pakistan’s 22 Families (1968; পরবর্তী সংকলন)

সম্পদের কেন্দ্রীভবন

Rounaq Jahan

Pakistan: Failure in National Integration (1972)

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য

Mushtaq H. Khan

The Political Economy of Industrial Policy in Pakistan 1947–1971

শিল্পায়ন, রাষ্ট্রীয় নীতি ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন

Parvez Hasan

My Life and My Country (2010)

আইয়ুব আমলের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য

Rehman Sobhan

Basic Democracies, Works Programme and Rural Development in East Pakistan

গ্রামীণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কাঠামো

গবেষণার জন্য লিংক:

বিশেষভাবে পড়ার পরামর্শ: রওনক জাহানের Pakistan: Failure in National Integration গ্রন্থের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় সংহতিবিষয়ক অধ্যায় এবং পারভেজ হাসানের My Life and My Country গ্রন্থের ১১ ও ১২ নম্বর অধ্যায় পাশাপাশি পড়ুন। প্রথমটি রাজনৈতিক বৈষম্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখায়, দ্বিতীয়টি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বিভাগের একজন অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক বৈষম্যের জটিলতা তুলে ধরে।

এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গি একত্রে পড়লে আইয়ুব খানের ‘Golden Sixties’ কেন একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পটভূমি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—তা ভালোভাবে বোঝা যাবে।

 

 

 

আইয়ুব খানের অর্থনীতি (১৯৫৮–৬৯) ছিল প্রবৃদ্ধি-অগ্রাধিকারের নীতি: বেসরকারি শিল্পকে রাষ্ট্রীয় সুবিধা দিয়ে দ্রুত জাতীয় আয় বাড়ানো, বণ্টন ও আঞ্চলিক সমতা পরে। দাতারা একে উন্নয়নের মডেল বলে। পূর্ব পাকিস্তানে একই নীতি বৈষম্য বাড়িয়ে ছয় দফা ও ১৯৬৯-এর ধসের জমি তৈরি করে।

 

## দর্শন

 

সামরিক শাসনের প্রতিশ্রুতি ছিল রাজনীতি সরিয়ে ‘উন্নয়ন’ দেখানো। পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ মাহবুবুল হক এবং হার্ভার্ড অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (গুস্তাভ পাপানেক) যে যুক্তি দেন, তা হলো কার্যকর অসমতা: সঞ্চয় ও বিনিয়োগ গড়তে শুরুতে সম্পদ কয়েক হাতে জমা হতেই হবে; সমতা পরে আসবে। হকের নিজের বাক্য—চূড়ান্ত সমতার রাস্তা অনিবার্যভাবে প্রাথমিক অসমতার ভেতর দিয়ে যায়। রওনক জাহানের ভাষায়, এটা রাষ্ট্রগঠন ও জিডিপিকে জাতিগঠনের উপরে রাখা। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল রাখা হয়, কারণ গণতন্ত্র পূর্বের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে বাজেটের মালিক বানিয়ে দিত।

 

## নীতির হাতিয়ার

 

দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৬০–৬৫) এই দশকের মুখ। তৃতীয় পরিকল্পনা (১৯৬৫–৭০) যুদ্ধ ও সাহায্য-সংকটে থমকে যায়।

 

- **আমদানি-প্রতিস্থাপন।** শুল্ক, লাইসেন্স ও সস্তা ঋণে ভোগ্যপণ্যের দেশীয় কারখানা। মুনাফা নিশ্চিত, প্রতিযোগিতা নয়।

- **রপ্তানি বোনাস ভৌচার (১৯৫৯)।** কার্যত বহুমুখী বিনিময়হার। শিল্পপণ্যের রপ্তানিকারক বেশি বোনাস পান; পাটের মতো প্রাথমিক পণ্য কম। সুবিধা পশ্চিমের কারখানার দিকে ঝোঁকে, যেখানে পূর্বের রপ্তানি আয়ের উৎস।

- **অতিমূল্যায়িত রুপি।** মূলধনী যন্ত্র সস্তায় আমদানি হয়। কাচামাল-রপ্তানিকারক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

- **পিআইসিআইসি, আইডিবিপি, এনআইটি।** নির্দেশিত ঋণ ও শেয়ারবাজার ঘরানা-পুঁজিকে বড় করে। পিআইডিসি-র কারখানা বেসরকারি হাতে ছাড়া হয়; ক্রেতা প্রায় সব অবাঙালি।

- **কর-অবকাশ ও শিল্পলাইসেন্স।** নতুন শিল্পের ভরকেন্দ্র করাচি ও পাঞ্জাব।

- **বিদেশি সাহায্য।** মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এড-কনসোর্টিয়াম বিনিয়োগের বড় অংশ জোগায়। ১৯৬৫-এর যুদ্ধের পর সাহায্য কমে, তৃতীয় পরিকল্পনার ভিত নড়ে।

- **কৃষি।** পশ্চিমে ব্যক্তিগত নলকূপ, উচ্চফলনশীল গম, সার-পানি ভর্তুকি—সবুজ বিপ্লবের প্রথম ঢেউ। পূর্বে বন্যা-প্রবণ ধান-পাটের অর্থনীতিতে তুলনীয় রূপান্তর হয় না। পূর্বে গ্রামীণ পূর্ত কর্মসূচি (১৯৬২ সালের পর) ও কুমিল্লার সমবায় পরীক্ষা স্থানীয় খাতা দেখায়; জাতীয় বরাদ্দের কাঠামো বদলায় না।

 

## যা ‘সফল’ দেখাল, যা ভেতরে ভাঙল

 

ষাটের দশকের প্রথমার্ধে জাতীয় আয় বছরে মোটামুটি ৬ শতাংশের ওপরে বাড়ে, শিল্প তার চেয়ে দ্রুত। দাতাদের কাছে পাকিস্তান তৃতীয় বিশ্বের সাফল্যকাহিনি।

 

একই সময়ে তিনটি ফাটল:

 

**সম্পদের কেন্দ্রীভবন।** ১৯৬৮-এর এপ্রিলে হক নিজেই বলেন, ২২টি পরিবার শিল্পসম্পদের প্রায় ৬৬ শতাংশ, বীমার প্রায় ৭০ এবং ব্যাংকের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তালিকা কার্যত পাঞ্জাবি ও মুহাজির ঘরানা—দাউদ, সাইগল, আদমজি, ইস্পাহানি, হাবিব, ভালিচা প্রমুখ। বাঙালি মুসলমানের নাম নিচের দিকে গোনা যায়। নীতি ‘উদ্যোক্তা’ তৈরি করেছিল; উদ্যোক্তার জাত পশ্চিমাঞ্চলীয়।

 

**মজুরি ও খাদ্য।** প্রবৃদ্ধির সুফল প্রকৃত মজুরিতে পৌঁছায় কম। দশকের শেষে দ্রব্যমূল্য ও খাদ্যসংকট শহরের নিম্নমধ্যবিত্তকে রাজনীতিতে নামিয়ে আনে। হক পরে স্বীকার করেন, বিশ্ব যখন মডেল দেখছে, ১৯৬৮-এ ব্যবস্থাটা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষে ফেটে যায়।

 

**আঞ্চলিক বৈষম্য।** দীর্ঘ মেয়াদে উন্নয়নব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ পশ্চিমে, ৩০ পূর্বে—জনসংখ্যার অনুপাত উল্টো। দ্বিতীয় পরিকল্পনাতেও সরকারি বিনিয়োগের বড় ভাগ পশ্চিমে (মোটামুটি ৫৫ শতাংশ), অথচ রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ আসত পূর্ব থেকে। মাথাপিছু আয়ের ফারাক এই ‘সফল’ দশকে কমেনি; ঢাকার পরিকল্পনাবিদদের হিসাবে দশকের শেষে পূর্বের মানুষ গড়ে পশ্চিমের চেয়ে স্পষ্টতই পিছিয়ে। পাটের ডলার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিমের কলকারখানায় ঢোকানো হয়। একেই পূর্বের অর্থনীতিবিদেরা **দুই অর্থনীতি** বলেন—ভূগোলের কারণে বাজার আলাদা, নীতির কারণে একটি অন্যটির উদ্বৃত্তে বাড়ে।

 

## পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক উত্তর

 

আইয়ুব বৈষম্য অস্বীকার করেননি। ১৯৬১-এর মে মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদদের ডেকে শোনেন। তাঁদের কথা ছিল সংবিধানে দুই অঞ্চলের সমান উন্নয়নকে কেন্দ্রের দায় করা এবং বিনিয়োগের ভাগ ক্রমে পূর্বের দিকে নাড়ানো। তিনি কথা নেন, ক্ষমতা দেন না। বরাদ্দে সামান্য ছাড় আসে; মুদ্রা, লাইসেন্স, সেনা ও আমলাতন্ত্র থাকে পশ্চিমে।

 

ছয় দফা (৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬) এই নীতির সরাসরি প্রতিপত্র। আলাদা রাজস্ব, আলাদা মুদ্রা বা মূলধন-পাচার রোধ, বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব অঞ্চলের হাতে, কেন্দ্রে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র—অর্থাত্ যে কেন্দ্রীভূত প্রবৃদ্ধি পূর্বকে উপনিবেশ বানিয়েছিল, তার প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন। আগরতলা মামলা অর্থনৈতিক দাবিকে রাষ্ট্রদ্রোহ বানাতে চায়। ১৯৬৮–৬৯-এর আন্দোলন ‘উন্নয়নের দশক’-এর রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা।

 

## মূল্যায়ন

 

সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির অঙ্কে নীতিটি ব্যর্থ নয়। ব্যর্থ সেই জায়গায়, যেখানে উন্নয়নকে জাতীয় সংহতির বিকল্প ভাবা হয়েছিল। তিনটি কাঠামোগত পক্ষপাত একসঙ্গে কাজ করে: অতিমূল্যায়িত মুদ্রা ও বোনাসভৌচার শিল্পপণ্যকে প্রাথমিক রপ্তানির উপরে রাখে; লাইসেন্স-ঋণ-বেসরকারিকরণ সম্পদ অবাঙালি ঘরানায় জমায়; কৃষিপ্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা-সাহায্যের ভূগোল পশ্চিমকে এগিয়ে দেয়। পূর্বে যা দেওয়া হয়—পূর্ত কর্মসূচি, কিছু কল, বক্তৃতা—তা এই কাঠামোর ভাঙাচোরা।

 

জাহানের রায় এখানে খাটে। বাইরে থেকে আশাব্যাঞ্জক প্রাতিষ্ঠানিক নতুনত্ব ভেতরে ছিল ভাঙনের ভূমিকা: বাঙালি ভার্নাকুলার অভিজাত সিদ্ধান্তের বাইরে থাকেন, প্রবৃদ্ধির মালিক হন না, আর ‘পরে সমতা আসবে’ এই প্রতিশ্রুতি ১৯৬৯ পর্যন্ত আসে না। আইয়ুবের অর্থনীতি পাকিস্তানকে ধনী করেনি; একটি অঞ্চলের অল্প পরিবারকে শক্তিশালী করে অন্য অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করেছে। ছয় দফা থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত যে পথ, তার অর্থনৈতিক অর্ধেক এই নীতি।

 

 

 

১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসা জেনারেল আইয়ুব খানের ১০ বছরের শাসনকালকে (১৯৫৮–১৯৬৯) পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষ থেকে "উন্নয়নের দশক" (Decade of Development) হিসেবে অভিহিত করা হলেও, বাস্তবে এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ লুটপাট এবং ধনবৈষম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর এক বিতর্কিত পর্ব।

 

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতি মূলত মুক্তবাজার পুঁজিবাদ, দ্রুত শিল্পায়ন এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধনকুবের শ্রেণি (Oligarchy) তৈরির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ছিল।



১. আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির প্রধান দিকসমূহ

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক মডেল ছিল প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ গুস্তাভ পাপনিক (Gustav Papanek) এবং হার্ভার্ড অ্যাডভাইজরি গ্রুপের অনুকরণে তৈরি। এর মূল দর্শন ছিল: "আগে প্রবৃদ্ধি অর্জন কর, পুনর্বণ্টন পরে হবে।"



  • ধনকুবের তোষণ ও ২২ পরিবারের উত্থান: আইয়ুব সরকারের নীতি ছিল বেসরকারি খাতকে লাইসেন্স, সরকারি ঋণ ও বিশেষ ভর্তুকি দিয়ে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এর ফলে পাকিস্তানের সমগ্র শিল্প ও ব্যাংকিং খাতের দুই-তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মাত্র বাইশটি (২২) পরিবারের হাতে (যেমন: আদমজী, ইস্পাহানি, বাওয়ানি, সািগল প্রভৃতি), যাদের সিংহভাগই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি।

 

  • রপ্তানি বোনাস স্কিম (Export Bonus Scheme - 1959): শিল্পপতিদের রপ্তানিতে উৎসাহিত করতে এই স্কিম চালু করা হয়। এর মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হতো, যা মূলত পশ্চিম পাকিস্তানি উদ্যোক্তাদের কোটিপতি হওয়ার পথ সুগম করে।

 

  • সবুজ বিপ্লব (Green Revolution): কৃষি খাতে আধুনিকীকরণ, সেচ ব্যবস্থা, উচ্চ ফলনশীল বীজ ও ভর্তুকিমূল্যে সার সরবরাহের নীতি নেওয়া হয়। তবে এর সুফল সিন্ধু ও পাঞ্জাবের বড় বড় জমিদারেরা পেলেও পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য বদলায়নি।

 

  • বিদেশি ঋণ ও সাহায্যনির্ভরতা: এই সময়ে পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ গ্রহণ করে, যার বড় অংশই পশ্চিম পাকিস্তানের মেগা প্রজেক্টগুলোতে (যেমন: মংলা বাঁধ, তক্ষশীলা শিল্প ও নতুন রাজধানী ইসলামাদের নির্মাণ) ব্যয় হয়।

 

২. পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ও চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য

আইয়ুব খানের নীতিই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ব্যবধানকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। এটিকে অর্থনীতিবিদরা "দুই অর্থনীতি তত্ত্ব" (Two Economies Theory) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন:



  • সম্পদের প্রচার ও পাচার: পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান উৎপন্ন দ্রব্য—পাট ও চা বিক্রি করে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ (প্রায় ৬০%-৭০%) অর্জিত হতো। অথচ সেই বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করে পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হতো এবং কাঁচামাল বা বিদেশি পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়া হতো পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের।

 

  • উন্নয়ন বাজেটে বৈষম্য: প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় মোট উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হতো পশ্চিম পাকিস্তানে এবং মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ আসত পূর্ব পাকিস্তানে।

 

  • আমলাতন্ত্র ও রাজস্ব খাতে বঞ্চনা: কেন্দ্রীয় ব্যাংক, পরিকল্পনা কমিশন এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সবই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন এবং বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান ক্রমাগত বঞ্চনার শিকার হয়।

 

৩. সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিণতি

  • শ্রমিক ও কৃষক অসন্তোষ: ধনকুবেরদের জন্য কর ছাড় এবং সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা চাপানোর ফলে সমাজে আয়বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে। মজুরি না বাড়ায় সাধারণ শ্রমিক ও নিম্নবিত্তদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

 

  • বাঙালি ধনকুবের শ্রেণির বিকাশে বাধা: রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কেবল নন-বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের দেওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানে একটি শক্তিশালী দেশীয় ধনকুবের বা উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে উঠতে পারেনি।

 

  • ৬ দফার অর্থনৈতিক ভিত্তি: আইয়ুবী অর্থনৈতিক শোষণের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়াতেই ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। ৬ দফার কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রা বা হিসাব সংরক্ষণ এবং রাজস্ব আদায়ের পূর্ণ ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করা।

 

মূল্যায়ন

আইয়ুব খানের 'ইকোনমিক পলিসি' বাহ্যিকভাবে পাকিস্তানের জিডিপি প্রবৃদ্ধি (GDP Growth) বাড়ালেও এবং পশ্চিম পাকিস্তানে আধুনিক শিল্প অবকাঠামো তৈরি করলেও, এটি ছিল একটি চরম অসম ও শোষকমূলক নীতি। এটি পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের একটি অর্থনৈতিক কলোনি বা বাজারে পরিণত করেছিল।

 

এই অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনাই শেষ পর্যন্ত বাঙালিকে উপলব্ধি করায় যে, পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি অসম্ভব—যা ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

 

 

 

 

১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের সামরিক শাসক ও প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের শাসনামলকে দেশটির অর্থনৈতিক ইতিহাসে ‘উন্নয়নের দশক’ (Decade of Development) বলা হয়। তার অর্থনৈতিক নীতির মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত শিল্পায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো। [1, 2]

আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক নীতির প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. শিল্পায়ন ও বেসরকারি খাত

  • বেসরকারি খাতের প্রাধান্য: আইয়ুব খান রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের পরিবর্তে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করেন। ছোট ও মাঝারি শিল্প স্থাপন এবং বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) ওপর জোর দেওয়া হয়। [1, 2]
  • এক্সপোর্ট বোনাস স্কিম (Export Bonus Scheme): রপ্তানিকারকদের উৎসাহিত করতে এই স্কিম চালু করা হয়। [1]
  • ২২ পরিবারের উত্থান: তার নীতির ফলে পাকিস্তানের জাতীয় সম্পদের বড় একটি অংশ মুষ্টিমেয় কিছু শিল্পপতি পরিবারের (যাদের ‘২২ পরিবার’ বলা হতো) হাতে কুক্ষিগত হয়, যার ফলে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়। [1, 2]
  • অবকাঠামো উন্নয়ন: করাচিতে তেল শোধনাগার স্থাপন এবং কার্তাই বাঁধ ও মঙ্গল্লা বাঁধের মতো বড় বড় জলবিদ্যুৎ ও সেচ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। [1, 2]

২. কৃষি ও ‘সবুজ বিপ্লব’ (Green Revolution)

  • কৃষি সংস্কার: ১৯৫৯ সালের ভূমি সংস্কার আইনের মাধ্যমে মাথাপিছু জমির সর্বোচ্চ সীমা ৫০০ থেকে ১,০০০ একর নির্ধারণ করা হয়।
  • সবুজ বিপ্লব: গম ও চালের উচ্চফলনশীল বীজ, সার, কীটনাশক এবং নলকূপের প্রসারের ফলে কৃষিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি ঘটে (১৯৬৫-৭০ সালে বার্ষিক ৬.৩% প্রবৃদ্ধি)। [1, 2, 3, 4]

৩. সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

  • জিডিপি প্রবৃদ্ধি: ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানের বার্ষিক গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭% এ পৌঁছায়, যা সে সময়ে উন্নয়নশীল বিশ্বে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।
  • কম মূল্যস্ফীতি: এ সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে (প্রায় ৩.৩%) রাখা সম্ভব হয়েছিল। [1, 2]

নীতিটির নেতিবাচক প্রভাব ও ব্যর্থতা

  • পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য: অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, বাজেট বরাদ্দ এবং শিল্পায়ন মূলত পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত ছিল। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সঙ্গে চরম বৈষম্য তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে গণআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে। [1, 2, 3]
  • বিদেশি সাহায্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা: শিল্পায়ন ও মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন করতে গিয়ে পাকিস্তানকে বিদেশি ঋণ ও সাহায্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভর করতে হয় (আমদানির বড় অংশ বিদেশি সাহায্যনির্ভর হয়ে পড়ে)। [1, 2]
  • সামাজিক খাত অবহেলিত: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান ভালো দেখালেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন সম্পূর্ণভাবে অবহেলিত ছিল। [1, 2]

আইয়ুব খানের এই সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপরেখা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে Scribd Report on Ayub Khan's Economic Reforms অথবা উইকিপিডিয়ার Ayub Khan Wikipedia Page দেখতে পারেন। [1, 2]

No comments:

Post a Comment