Search This Blog

Wednesday, November 4, 2026

১৯৪৭-১৯৭১ এই কাল পর্বে পূর্ব পাকিস্তানে কি এমন ঘটনা ঘটেছিল যার জন্য ১৯৪৭ এ স্বাধীন না হয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অনিবার্য অভ্যুদয় ঘটলো (বাংলাদেশের অভ্যুদয় কিভাবে ঘটলো)

 ### ১৯৪৭-১৯৭১: ১৯৪৭ এ নয়, ১৯৭১ এ কেন বাংলাদেশ? - অভ্যুদয়ের অনিবার্য পথ

 

এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। *১৯৪৭ সালে আমরা স্বাধীন হইনি কেন? ১৯৭১ সালে কেন হলাম?*

 

*সহজ উত্তর:* ১৯৪৭ সালে আমরা মনে করেছিলাম - "আমরা মুসলমান, তাই পাকিস্তানই আমাদের দেশ"। ১৯৭১ সালে আমরা বুঝলাম - "আমরা মুসলমান হলেও আমরা আগে বাঙালি, আর পাকিস্তান আমাদের শোষক"। এই বোঝাটা আসতে ২৪ বছর লেগেছে, ২৪ বছরে ৬টি ধাক্কা লেগেছে।

 

এই ৬টি ধাক্কা পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে লিখবে - একে বলে *"ধাপে ধাপে স্বাধীনতা"*।

 

#### ধাক্কা ১: ভাষার ধাক্কা - ১৯৪৮-১৯৫২ ভাষা আন্দোলন

 

*১৯৪৭ সালে:* পূর্ববঙ্গের মানুষ ভেবেছিল - পাকিস্তান মানে আমাদের দেশ, আমাদের অধিকার।

 

*১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ:* জিন্নাহ ঢাকায় এসে বলেন - "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা"।

 

বাঙালিরা স্তব্ধ। আমরা ৯৮% মানুষ বাংলা বলি, আর রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, যা ৭% মানুষ বলে?

 

*১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি:* ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করে। পুলিশ গুলি করে - *রফিক, জব্বার, বরকত, সালাম শহীদ হন।*

 

*ফলাফল:* বাঙালিরা প্রথম বুঝলো - পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের ভাষাকে, আমাদের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করে। এই প্রথম *"বাঙালি জাতীয়তাবাদ"* জন্ম নিলো। দ্বি-জাতি তত্ত্বে প্রথম ফাটল ধরলো।

 

> *এটি ছিল মানসিক স্বাধীনতা - আমরা বাঙালি, এটা বোঝা।*

 

#### ধাক্কা ২: রাজনৈতিক ধাক্কা - ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন

 

*১৯৫৪ সালের নির্বাচন:* পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট (আওয়ামী লীগ + কৃষক প্রজা পার্টি) ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পায়। মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি। বাঙালিরা গণতান্ত্রিকভাবে পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে।

 

কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার ৯২(ক) ধারা জারি করে *ফজলুল হকের সরকারকে ১ মাসের মধ্যে ভেঙে দেয়।*

 

বাঙালিরা বুঝলো - *"ভোট দিয়েও লাভ নেই, পশ্চিম পাকিস্তানিরা গণতন্ত্র মানবে না"*।

 

*১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর:* জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করেন। সংবিধান বাতিল, রাজনীতি নিষিদ্ধ। বাঙালি নেতা শেখ মুজিব, সোহরাওয়ার্দীকে জেলে ঢোকানো হয়।

 

*ফলাফল:* বাঙালিরা বুঝলো - পাকিস্তানে গণতন্ত্র আসবে না, সেনাশাসনই চলবে। সেনাবাহিনীতে বাঙালি মাত্র ৫%, তাই সেনাশাসন মানে পাঞ্জাবি শাসন।

 

#### ধাক্কা ৩: অর্থনৈতিক ধাক্কা - বৈষম্যের পরিসংখ্যান (১৯৪৭-১৯৭০)

 

এটি ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা - পেটের ধাক্কা।

বিষয় | পূর্ব পাকিস্তান | পশ্চিম পাকিস্তান

**জনসংখ্যা** | ৫৫% | ৪৫%

**রাজস্ব আয়** | ৬০% (পাট থেকে) | ৪০%

**উন্নয়ন ব্যয়** | ৩০% | ৭০%

**বৈদেশিক সাহায্য** | ২০% | ৮০%

**চাকরি (কেন্দ্রীয়)** | ১৫% | ৮৫%

**সেনাবাহিনী** | ৫% | ৯৫%

*উদাহরণ:* পূর্ব পাকিস্তান পাট বিক্রি করে ডলার আনতো, সেই ডলার দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে করাচিতে ইস্পাত কারখানা, লাহোরে রাস্তা হতো। ঢাকায় একটি ভালো রাস্তা হতো না।

 

*বঙ্গবন্ধুর বিখ্যাত উক্তি:* "আমরা পাট বিক্রি করি, টাকা পায় পাঞ্জাবিরা। আমরা সোনার বাংলা, ওরা সোনা নিয়ে যায়।"

 

*ফলাফল:* কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র সবাই বুঝলো - এটি *অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদ*। পাকিস্তান ব্রিটিশদের মতোই আমাদের শোষণ করছে।

 

#### ধাক্কা ৪: সাংস্কৃতিক ধাক্কা - ১৯৬০ এর দশকে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ, পহেলা বৈশাখ বন্ধ

 

আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খান চাইলেন - বাঙালিকে "খাঁটি মুসলমান" বানাতে।

 

- রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করা হলো - বলা হলো এটি হিন্দুদের গান।

- পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষকে "হিন্দুয়ানি" বলা হলো।

- বাংলা বই থেকে সংস্কৃত শব্দ বাদ দিয়ে আরবি-উর্দু শব্দ ঢোকানোর চেষ্টা হলো।

- পাকিস্তানি সিনেমায় বাঙালি মেয়েদের শাড়ি পরাকে খারাপ বলা হলো।

 

*ফলাফল:* বাঙালিরা ক্ষেপে গেল। তারা বললো - "আমরা মুসলমান, কিন্তু আমরা রবীন্দ্রনাথকে ছাড়বো না, বৈশাখকে ছাড়বো না। আমাদের সংস্কৃতি আমাদের পরিচয়।"

 

এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনই বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করে।

 

#### ধাক্কা ৫: রাজনৈতিক দলিল - ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান

 

*১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি:* শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে *৬ দফা* দাবি পেশ করেন। একে বলা হয় - *"বাঙালির মুক্তির সনদ" (Magna Carta)*।

 

৬ দফার মূল কথা:

১.  পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন

২.  কেন্দ্রের হাতে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র থাকবে

৩.  আলাদা মুদ্রা, আলাদা বৈদেশিক বাণিজ্য

৪.  আলাদা সেনাবাহিনী / মিলিশিয়া

 

*পশ্চিম পাকিস্তানিরা বললো:* "৬ দফা মানে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র"। মুজিবকে *আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়* ফাঁসিতে ঝোলানোর চেষ্টা হলো।

 

*১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান:* ছাত্ররা *১১ দফা* দেয় (৬ দফা + ছাত্রদের ৫ দফা)। সারা পূর্ব পাকিস্তানে আগুন জ্বলে ওঠে। আসাদ, মতিউর, ড. শামসুজ্জোহা শহীদ হন। আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, মুজিব মুক্তি পান এবং *"বঙ্গবন্ধু"* উপাধি পান।

 

*ফলাফল:* বাঙালিরা এখন আর পাকিস্তানের ভেতরে থাকতে চায় না, তারা *স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতার দিকে* এগিয়ে যায়।

 

> *১৯৬৬ সালের ৬ দফা ছিল স্বাধীনতার খসড়া, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল স্বাধীনতার মহড়া।*

 

#### ধাক্কা ৬: চূড়ান্ত ধাক্কা - ১৯৭০ এর নির্বাচন, ঘূর্ণিঝড় ও ১৯৭১ এর গণহত্যা

 

*১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর:* ভোলায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ মানুষ মারা যায়। ইয়াহিয়া খান সাহায্য পাঠাননি, এমনকি খবরও নেননি। বাঙালিরা বললো - "এরা আমাদের মানুষই মনে করে না।"

 

*১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর:* পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ফলাফল:

- *আওয়ামী লীগ:* ১৬৯টি আসন (পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি) - সংখ্যাগরিষ্ঠ

- *পিপলস পার্টি (ভুট্টো):* ৮১টি আসন (পশ্চিম পাকিস্তানে)

 

নিয়ম অনুযায়ী শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু ভুট্টো বলেন - "মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেবো না"। ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন।

 

*১৯৭১ সালের ৭ মার্চ:* বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন - *"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"*। এটি ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা।

 

*১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত:* পাকিস্তানি সেনাবাহিনী *অপারেশন সার্চলাইট* চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ, পিলখানায় হাজার হাজার বাঙালিকে হত্যা করে।

 

*১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ:* বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ শহীদ।

 

*১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর:* পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। *স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।*

 

#### কেন ১৯৪৭ এ নয়, ১৯৭১ এ? - উপসংহার

 

*১৯৪৭ সালে আমরা স্বাধীন হইনি, কারণ:*

১.  আমরা তখনো বাঙালি হিসেবে জাগিনি, আমরা মুসলমান হিসেবে জেগেছিলাম।

২.  আমাদের নেতা ছিল না - বঙ্গবন্ধু তখনো তৈরি হননি।

৩.  আমাদের আলাদা অর্থনীতি, আলাদা সেনাবাহিনী, আলাদা কূটনীতি ছিল না।

৪.  আন্তর্জাতিক সমর্থন ছিল না - ব্রিটিশ, আমেরিকা পাকিস্তানকে চাইতো।

 

*১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীন হলাম, কারণ:*

১.  ২৪ বছরে আমরা বুঝে গেছি - ধর্ম দিয়ে জাতি হয় না, ভাষা-সংস্কৃতি-অর্থনীতি দিয়ে হয়।

২.  আমাদের একটি রাজনৈতিক দলিল তৈরি হয়েছে - ৬ দফা।

৩.  আমাদের একটি শত্রু চিহ্নিত হয়েছে - পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী।

 

*"১৯৪৭ সালে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ধর্মের গর্ভে, কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পুনর্জন্ম হয়েছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মুক্তির গর্ভে। ১৯৪৭ ছিল পাকিস্তানের স্বাধীনতা, ১৯৭১ ছিল বাঙালির স্বাধীনতা। তাই ১৯৭১ অনিবার্য ছিল - কারণ পাকিস্তান নামের কৃত্রিম রাষ্ট্রটি ১৯৪৭ সালেই মৃত ছিল, ১৯৭১ সালে শুধু তার দাফন হয়েছে।"*

 

 

 

হ্যাঁ, ১৯৪৭–৭১ সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক শাসন ও নির্বাচনী অধিকার—এই পর্যায়ে ধারাবাহিক বঞ্চনা ও দমন-পীড়ন ঘটে। এগুলো মিলে বাঙালিদের মধ্যে আলাদা জাতীয় পরিচয় ও স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি তৈরি করে; ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক অভিযান ও গণহত্যার পর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।[britannica][pastpaperhero][modeldiplomat]

১৯৪৭–৫২: ভাষার সংকট

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা বাঙালিদের সাংস্কৃতিক অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করে। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা, কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে।[britannica][en.wikipedia]

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালালে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ কয়েকজন শহিদ হন। এই ঘটনা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করে এবং ভাষাকে রাজনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে রূপান্তরিত করে।[modeldiplomat]

১৯৫৪–৫৮: রাজনৈতিক প্রত্যাখ্যান

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় অর্জন করে, যা প্রমাণ করে যে বাঙালিরা কেন্দ্রীয় শাসকদের নীতি প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার শীঘ্রই যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করে এবং গভর্নর শাসন জারি করে।[ajkerbongo]

১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করে গণতন্ত্র স্থগিত করেন। এর ফলে বাঙালিদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব আরও দুর্বল হয় এবং পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে।[britannica]

১৯৬৬: ছয় দফা

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেন। এর মূল দাবি ছিল ফেডারেল কাঠামো, প্রাদেশিক কর ও রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ, আলাদা মুদ্রা বা রাজকোষীয় ক্ষমতা, বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব মিলিশিয়া।[pastpaperhero][modeldiplomat]

এটি আসলে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি নয়, বরং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসনের একটি সংবিধানিক প্রস্তাব ছিল। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একে “বিচ্ছিন্নতাবাদী” ষড়যন্ত্র বলে দমন করে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবসহ নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করে।[pastpaperhero]

১৯৬৯–৭০: গণঅভ্যুত্থান ও নির্বাচন

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসেন। এরপর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি জিতে জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।[britannica][pastpaperhero][modeldiplomat]

এই ফলাফল স্পষ্ট করে যে বাঙালিরা ছয় দফার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিল। কিন্তু ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানান।[pastpaperhero][modeldiplomat]

১৯৭১: সশস্ত্র প্রতিরোধ ও স্বাধীনতা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী “অপারেশন সার্চলাইট” শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক কর্মী, হিন্দু সংখ্যালঘু ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর নির্মম হামলা চালানো হয়।[britannica][modeldiplomat][bn.wikipedia]

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। নয় মাসের যুদ্ধে ভারতের সমর্থন ও মুক্তিবাহিনীর সশস্ত্র প্রতিরোধের ফলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।[bn.wikipedia][bn.wikipedia]

কেন অনিবার্য ছিল

বাংলাদেশের অভ্যুদয় কোনো একক ঘটনার ফল ছিল না; এটি ছিল ধারাবাহিক বঞ্চনার ফল। ভাষা আন্দোলন সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলে, ছয় দফা রাজনৈতিক দাবি স্পষ্ট করে, ১৯৭০-এর নির্বাচন গণতান্ত্রিক জনমত প্রমাণ করে এবং ২৫ মার্চের গণহত্যা সংলাপের সব পথ বন্ধ করে দেয়।[britannica][pastpaperhero][modeldiplomat]

অর্থনৈতিক দিক থেকেও পূর্ব পাকিস্তান ছিল অত্যন্ত বঞ্চিত। ১৯৪৭–৭১ পর্বে পূর্ব বাংলাকে কার্যত অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হিসেবে শোষণ করা হয়; ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ কম ছিল।[prothomalo][ajkerpatrika]

সংক্ষেপে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার পর বাঙালিরা ভাষা, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের জন্য ধারাবাহিকভাবে সংগ্রাম করেছে। কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী প্রতিটি ধাপে সমঝোতার বদলে দমন বেছে নেওয়ায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।[britannica][pastpaperhero][modeldiplomat]

 

 

 

১৯৪৭-১৯৭১: পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ

প্রশ্নের ধারণা নিয়ে একটি টীকা। প্রশ্নে "অনিবার্য" শব্দটি আছে। ঐতিহাসিকরা এ নিয়ে একমত নন, তাই শেষে এ বিষয়ে আমার মূল্যায়ন দেব। প্রধান ঘটনার তারিখগুলো ডন ও ডেইলি স্টারের কালপঞ্জি এবং অন্যান্য সূত্র থেকে নিয়েছি। ব্যাখ্যামূলক অংশ আমার বিশ্লেষণ।

১. মূল ধারাক্রম

ক. ১৯৪৭-৫২: ভাষা ও পরিচয়ের প্রশ্ন।

  • ১৯৪৭-এ পূর্ব বাংলা পাকিস্তানে যোগ দেয়। সে সময় বাঙালি মুসলমানের সামনে রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান। "স্বাধীন বাংলা" ধারণা আগের পর্বে ব্যর্থ হয়েছিল।
  • ১৯৪৮ সালের মার্চে বাংলাকে সরকারি ভাষা করার দাবিতে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা পূর্ববঙ্গে বিক্ষোভ জাগায়। ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর পর আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী আন্দোলনগুলো শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছায়। আগের আলোচনার সঙ্গে সংযোগ: রওনক জাহানের "ভাষা" কারণটি এখানে নীতিগত সংঘাতে পরিণত হয়।

খ. ১৯৫৪-৫৮: গণতান্ত্রিক পথের বন্ধ হওয়া।

  • ১৯৫৪-র প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের হাতে মুসলিম লীগ পূর্ববঙ্গে পরাজিত হয়, যা বাংলাপিডিয়ার সোহরাওয়ার্দী ভুক্তিতেও উল্লেখ আছে। এক কালপঞ্জির ভাষ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকার বরখাস্ত হয়। ১৯৫৫-র "এক ইউনিট" ও "সমতা"-নীতি পূর্বের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা হিসেবে অনেকে দেখেন (স্মৃতি থেকে)।
  • ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখল করেন। এর ফলে নির্বাচনভিত্তিক ক্ষমতা-বণ্টনের পথ কার্যত বন্ধ হয়।

গ. ১৯৫৮-৬৮: অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বৈষম্য।

  • সামরিক-আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে বাঙালির অংশ ছিল কম। পূর্বের রপ্তানি-আয় (বিশেষত পাট) ও বিনিয়োগ-বণ্টন নিয়ে "দুই অর্থনীতি" তত্ত্ব ও বৈষম্যের অভিযোগ বাঙালি অর্থনীতিবিদদের লেখায় স্পষ্ট হয়। ১৯৬২-র সংবিধানে বৈষম্য কমানোর বিধান থাকলেও সেটি বাস্তবে পূর্বের প্রত্যাশা মেটায়নি।
  • ১৯৬২-র ছাত্র আন্দোলন এবং ১৯৬৫-র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ (যখন পূর্ব অংশ কার্যত অরক্ষিত ছিল, স্মৃতি থেকে) বাঙালির মধ্যে অনিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ বাড়ায়।

ঘ. ১৯৬৬-৬৯: ছয় দফা, আগরতলা মামলা ও গণঅভ্যুত্থান।

  • ১৯৬৬-তে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দেন। এতে ছিল পৃথক মুদ্রা-ব্যবস্থা, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যের স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক সামরিক কাঠামো। পরবর্তীকালে অনেকে একে স্বাধীন বাংলাদেশের নীলনকশা বলেছেন, কিন্তু তখন এটি ছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি, বিচ্ছেদের নয়।
  • ১৯৬৮-তে মুজিবসহ অন্যদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়। উল্টো ফল হয়: মামলাটি মুজিবকে জাতীয় নেতা করে তোলে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুবের পতন হয়। ১৯৬৯ সালের মার্চে ইয়াহিয়া খান প্রধান সামরিক প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট হন।

ঙ. ১৯৭০: নির্বাচন ও ম্যান্ডেট।

  • ১৯৭০-এর নভেম্বরে ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এক গবেষকের মতে ঘূর্ণিঝড় ও সরকারের অপর্যাপ্ত সাড়া ভোটারদের আওয়ামী লীগের দিকে ঠেলে দেয়।
  • ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের জাতীয় পরিষদে ১৬০টি আসন পেয়ে ভূমিধস জয় পায়। ফলে শুধু পূর্বে নয়, গোটা পাকিস্তানে সরকার গঠনের বৈধ অধিকার আওয়ামী লীগের হাতে আসে, ছয় দফার ভিত্তিতে। পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রশ্নে এটিই ছিল নির্ধারক মোড়।

চ. ১৯৭১: সংকট থেকে যুদ্ধ।

  • ক্ষমতা হস্তান্তরের আলোচনা ইয়াহিয়া-ভুট্টো-মুজিবের মধ্যে ভেঙে পড়ে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হয় (১ মার্চ, স্মৃতি থেকে), অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৭ মার্চ মুজিব ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।
  • ২৫-২৬ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী "অপারেশন সার্চলাইট" শুরু করে, মুজিব গ্রেপ্তার হন। এই অভিযান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করেছিল। আপনার প্রথম প্রশ্নের প্রসঙ্গ এখানে ফিরে আসে: প্রতিষ্ঠানটি একসময় সামাজিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক ছিল, এখন তা সংঘাতের কেন্দ্রস্থল।
  • এক বিশ্লেষণ বলে, অপারেশনের নির্মমতা প্রতিরোধ জাগায়, যা ভারতের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়। যুদ্ধ চলে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত; লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়, যা সংঘাতকে আন্তর্জাতিক করে তোলে।

২. কেন ১৯৪৭ নয়, ১৯৭১?

আমার ব্যাখ্যায় এই বিলম্বের তিনটি স্তর আছে।

১. পরিচয়ের রূপান্তর। ১৯৪৭-এ পূর্ববঙ্গের বেশির ভাগ মুসলমানের কাছে "মুসলমান" পরিচয় রাজনৈতিকভাবে প্রধান ছিল। বাঙালি পরিচয় প্রধান হয়ে ওঠে ১৯৪৭-পরবর্তী অভিজ্ঞতায়: ভাষা-দমন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামরিক শাসন। পাকিস্তান রাষ্ট্র-ই এই রূপান্তর ঘটিয়েছে, আর ধর্মীয় ঐক্যের প্রতিশ্রুতি তার কাছে শর্ত ছিল।

২. একের পর এক সাংবিধানিক পথ বন্ধ। প্রতিটি দাবি ক্রমে বড় হয়েছে:

পর্ব

দাবি

রাষ্ট্রের জবাব

১৯৪৮-৫২

ভাষার স্বীকৃতি

দমন, গুলি

১৯৫৪

নির্বাচনী ম্যান্ডেট

সরকার বরখাস্ত

১৯৬৬

স্বায়ত্তশাসন

আগরতলা মামলা

১৯৭০

সরকার গঠনের অধিকার

সামরিক অভিযান

প্রতিবার বৈধ পথ বন্ধ হওয়ায় সমাধান-ভাবনা স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতার দিকে সরেছে।

৩. ২৫ মার্চ ছিল নির্ধারক মোড়। আমার পাঠে ১৯৭০-এর ম্যান্ডেট স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ছিল, বিচ্ছেদের পক্ষে নয় (স্মৃতি থেকে; ছাত্র সংগঠনের কিছু অংশ আগেই স্বাধীনতার দাবি তুলেছিল)। যুদ্ধ ও গণহত্যার অভিজ্ঞতাই স্বাধীনতাকে ব্যাপক জনসমর্থনের দাবিতে পরিণত করে।

৩. "অনিবার্য" কি?

  • গঠনগত দিক থেকে ভিন্ন ভাষা, ভূগোল, অর্থনৈতিক বৈষম্য, গণতন্ত্রের অভাব ও সামরিক আধিপত্য ছিল। এতে বিচ্ছেদ অত্যন্ত সম্ভাব্য হয়ে ওঠে। আগের একটি রিভিউয়ে কেউ কেউ জাহানের থিসিসকে এভাবেই পড়েছেন, অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান শুরু থেকেই বিচ্ছেদের পথে ছিল। এটি রিভিউয়ারের পাঠ, জাহানের নিজের ভাষা নয়।
  • তবে আমার মতে এটি কঠোর অর্থে অনিবার্য ছিল না। ১৯৭০-এর ফল মেনে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে কনফেডারেশন-ধরনের কোনো ব্যবস্থায় পাকিস্তান টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা অন্তত তাত্ত্বিকভাবে ছিল। ইয়াহিয়ার সামরিক বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত, ভুট্টোর অবস্থান ও মুজিবের কৌশল, এসব ব্যক্তিগত ও আকস্মিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে নির্ধারণ করেছে। "অনিবার্য" শব্দটি তাই পরে ফিরে তাকিয়ে বলা ব্যাখ্যা। সমকালে বিকল্প ছিল, কিন্তু ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছিল।

৪. যেসব বিষয়ে এখনও বিতর্ক আছে

  • প্রাণহানির সংখ্যা। অধিকাংশ হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৩ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষের মধ্যে, আর ধর্ষণের শিকার ২ থেকে ৪ লক্ষ নারী। বাংলাদেশ সরকারি হিসাবে ৩০ লক্ষ। পাকিস্তানের হামুদুর রহমান কমিশন ২৬ হাজারের হিসাব দিয়েছিল। শর্মিলা বোস তাঁর Dead Reckoning (২০১১) বইয়ে ৫০ থেকে ১ লক্ষ মৃত্যুর হিসাব দেন এবং বাঙালিদের হাতে অবাঙালি ও উর্দুভাষী সংখ্যালঘুদের হত্যার প্রসঙ্গও তোলেন। অন্যদিকে সমালোচকরা বলেন, তিনি হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টের ওপর বেশি নির্ভর করেছেন, যা যুদ্ধোত্তর পাকিস্তান সরকারের তৈরি। বাংলাদেশি ঐতিহাসিকরা তাঁর দাবি গ্রহণ করেননি। আরেক গবেষণা-আলোচনায় বলা হয়েছে, নিহতদের নাম-সংখ্যার নির্ভরযোগ্য নথির অভাবে ৩০ লক্ষ সংখ্যাটির উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
  • আমার অবস্থান এখানে: সামরিক অভিযানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বেসামরিক মানুষের ওপর ব্যাপক ও পরিকল্পিত সহিংসতা সংঘটিত হয়েছিল, এ ব্যাপারে গবেষকদের মধ্যে বিস্তৃত ঐকমত্য আছে। বিতর্কটি মূলত সংখ্যা, দায়ের বিভাজন এবং "গণহত্যা" পরিভাষার ব্যবহার নিয়ে। বাঙালি গোষ্ঠীগুলোর হাতে বিহারিসহ অবাঙালিদের ওপর সহিংসতাও নথিভুক্ত। এটি স্বীকার করা আর মূল ঘটনার দায় অস্বীকার করা এক নয়।
  • ভারতের ভূমিকা। ভারতের কৌশলগত স্বার্থ ছিল শরণার্থী-চাপ কমানো ও পাকিস্তানকে দুর্বল করা। এটি একটি সূত্রেও উল্লেখ আছে। পাকিস্তানি ভাষ্যে ভারতীয় হস্তক্ষেপকে বিচ্ছেদের মূল কারণ বলা হয়। বাংলাদেশি ও অধিকাংশ নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে ভারতের হস্তক্ষেপ বিচ্ছেদের কারণ নয়, বরং অভ্যন্তরীণ সংকট ও শরণার্থী-সংকটের পরিণতি।

 

 

 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মের সময় পূর্ববঙ্গের মানুষ স্বাধীনতা পায়নি, বরং পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে চলে গিয়েছিল। পরবর্তী ২৪ বছরে ভাষাগত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের যে ধারাবাহিকতা তৈরি হয়, তা ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে তোলে। নিচে সেই পথচলার মূল ধাপগুলো তুলে ধরা হলো।

 

### 🗣️ ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত: জাতীয়তাবাদের প্রথম স্ফুলিঙ্গ

 

পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬% ছিল বাঙালি, কিন্তু ১৯৪৮ সালে গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ ঘোষণা করেন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা"। এই ঘোষণা পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর সরাসরি আক্রমণ ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করলে পুলিশ গুলি চালায় এবং সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। এই ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপনকারী ঘটনা—এটি প্রমাণ করে দিয়েছিল যে ধর্মের ভিত্তিতে গড়া রাষ্ট্রে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির কোনো নিরাপদ স্থান নেই।

 

### 💰 অর্থনৈতিক শোষণ: উপনিবেশিক সম্পর্কের স্পষ্ট প্রমাণ

 

পাকিস্তানের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের একটি অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। তথ্য-প্রমাণ এই বৈষম্যকে স্পষ্ট করে:

 

- **রপ্তানি আয় বনাম বরাদ্দ:** ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের ৭০% এসেছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে, কিন্তু সেই অর্থের মাত্র ২৫% পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় করা হয়েছিল।

- **আমদানি বৈষম্য:** ১৯৪৭-১৯৭০ সময়কালে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের ৫৫% রপ্তানি আয় তৈরি করলেও তার আমদানির অংশ ছিল মাত্র ৩১%।

- **মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান:** ১৯৪৯/৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ছিল ২৮৮ টাকা, যা ১৯৬৯/৭০ সালে এসে দাঁড়ায় মাত্র ৩৩১ টাকায়; অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে একই সময়ে তা ৫৩৩ টাকায় উন্নীত হয়।

 

এই অর্থনৈতিক শোষণ প্রমাণ করেছিল যে পূর্ব বাংলার সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়নে বিনিয়োগ করা হচ্ছিল, এবং বাঙালিরা কেবল কাঁচামাল সরবরাহকারীর ভূমিকায় অবনমিত হয়েছিল।

 

### ⚖️ রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ: ক্ষমতা থেকে বঞ্চনা

 

অর্থনীতির মতোই প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতেও পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব ছিল অত্যন্ত কম। পাঞ্জাবি জমিদার ও শিল্পপতিরা কেন্দ্রীয় রাজনীতি ও ক্ষমতা কাঠামোয় আধিপত্য বিস্তার করেছিল, এবং সরকার সেনাবাহিনী, সিভিল সার্ভিস ও আমলাতন্ত্রে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অসম অনুপাতে নিয়োগ দিয়েছিল। এই কাঠামোগত বৈষম্য বাঙালিদের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে শুধু ভোট দিয়ে বা আইনি পথে এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।

 

### 📜 ছয় দফা: স্বায়ত্তশাসনের স্পষ্ট রূপরেখা

 

এই পটভূমিতে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান **ছয় দফা কর্মসূচি** উপস্থাপন করেন, যা কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসনের খসড়া ছিল। এর মূল দাবিগুলোর মধ্যে ছিল:

 

- পাকিস্তানকে একটি সত্যিকার ফেডারেশন হিসেবে গড়া এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকার

- প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রাখা

- পৃথক কিন্তু বিনিময়যোগ্য মুদ্রা এবং দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক হিসাব

- কর ও শুল্ক আদায়ের ক্ষমতা আঞ্চলিক সরকারের হাতে

- পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা

 

এই দাবিগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে বাঙালিরা আর কেবল ভাষাগত অধিকার নয়, বরং **রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টন** চাইছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এটিকে 'পৃথক রাষ্ট্রের পরিকল্পনা' হিসেবে দেখে ভীত হয়ে পড়ে এবং ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবসহ বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু জনগণ এই মামলাকে প্রতিহত করে এবং শেখ মুজিব 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত হন。

 

### 🗳️ ১৯৭০ সালের নির্বাচন: চূড়ান্ত রাজনৈতিক পরীক্ষা

 

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ **১৬৭টি** আসন জয়লাভ করে, যা সমগ্র পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট ছিল। এই ফলাফল ছিল বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল এবং এটি প্রমাণ করেছিল যে বাঙালিরা একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতা দাবি করার অধিকার রাখে।

 

### 🚫 ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি: বিশ্বাসভঙ্গের চূড়ান্ত বিন্দু

 

কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) নির্বাচনের ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এই সিদ্ধান্ত ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। এর প্রতিক্রিয়ায় শেখ মুজিবুর রহমান ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করেন, যা থেকে **অসহযোগ আন্দোলন** শুরু হয়।

 

### ✊ অসহযোগ আন্দোলন: রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ভাঙন

 

১৯৭১ সালের ২ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত চলা এই অসহযোগ আন্দোলন ছিল কার্যত পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সরকারের কর্তৃত্বের সম্পূর্ণ ভাঙন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সরকারি অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়; জনগণ কর দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু কার্যত স্বাধীনতার ডাক দেন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির নির্দেশনা দেন। এই ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি স্পষ্টভাবে বুঝে যায় যে পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে তাদের মুক্তি নেই।

 

### 🔥 সামরিক Crackdown এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

 

এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে। এই সামরিক আক্রমণের মাধ্যমেই পাকিস্তান সরকার প্রমাণ করে দেয় যে তারা রাজনৈতিক সমাধানে বিশ্বাসী নয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, যা দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয়ে culminates।

 

### 💎 উপসংহার: অনিবার্যতার যুক্তি

 

সংক্ষেপে, ১৯৪৭ সালে স্বাধীন না হয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় অনিবার্য হয়েছিল কারণ পাকিস্তানের কাঠামোটি শুরু থেকেই **অসম ও অগণতান্ত্রিক** ছিল। ভাষার ওপর আক্রমণ বাঙালিকে তার সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার জন্য লড়তে শিখিয়েছিল; অর্থনৈতিক শোষণ তাকে দেখিয়েছিল যে সে একটি উপনিবেশ; রাজনৈতিক বঞ্চনা তাকে ক্ষমতা দখলের পথ দেখিয়েছিল; ছয় দফা তাকে স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা দিয়েছিল; ১৯৭০ সালের নির্বাচন তাকে তার সংখ্যাগত শক্তি সম্পর্কে সচেতন করেছিল; এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি তাকে বুঝিয়েছিল যে শান্তিপূর্ণ উপায়ে মুক্তি অসম্ভব। এই ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহই ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্মকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

 

 

 

১৯৪৭–১৯৭১: পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়—কারণ, ঘটনাপ্রবাহ ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

ভূমিকা: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ কেন?

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল দুটি ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড নিয়ে—পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। দুই অঞ্চলের মধ্যে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ডের ব্যবধান ছিল। তাদের মধ্যে প্রধান সংযোগ ছিল ইসলাম ধর্ম; কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, অর্থনৈতিক কাঠামো ও সামাজিক বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

Office of the Historian+2

১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল, ব্রিটিশ শাসন ও কলকাতাকেন্দ্রিক সামাজিক-অর্থনৈতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে তারা নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেখা যায়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও পূর্ববঙ্গের জনগণ নতুন একটি কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

পরবর্তী ২৪ বছরে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে, যা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রাজনৈতিক চেতনাকে পরিবর্তিত করে।

এই ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল:

  • ১৯৪৮–১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন।
  • ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন ও সরকার বরখাস্ত।
  • ১৯৫৫ সালের One Unit ব্যবস্থা এবং ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন।
  • ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন।
  • ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ।
  • ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন।
  • ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।
  • ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান।
  • ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জাতীয় নির্বাচন।
  • ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলন, গণহত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধ।

এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন থেকে রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে পরিণত হয়।

আমার বিশ্লেষণে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ছিল দীর্ঘ ২৪ বছরের রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবিরোধী আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পরিণতি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল অস্বীকার এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক অভিযান এই প্রক্রিয়াকে চূড়ান্ত স্বাধীনতাযুদ্ধে রূপান্তরিত করে।

তবে একটি ঐতিহাসিক সতর্কতা জরুরি: ১৯৪৭ সাল থেকেই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অবধারিত ছিল—এমন বলা সঠিক নয়। ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্বের পাশাপাশি আকস্মিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ঐতিহাসিক সুযোগের সম্মিলিত ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

Cambridge Core+1

১. ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৪৭ সালে বাংলায় একটি বিকল্প সম্ভাবনা ছিল—অবিভক্ত ও স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা।

তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎচন্দ্র বসু এবং আবুল হাশিমসহ কয়েকজন নেতা একটি স্বাধীন ও অবিভক্ত বাংলার পরিকল্পনা সামনে এনেছিলেন।

এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল বাংলা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। এর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, হিন্দু মহাসভার একটি অংশ এবং কলকাতাকেন্দ্রিক কিছু হিন্দু অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী অবস্থান নেয়। বাংলার সাম্প্রদায়িক মেরুকরণও পরিকল্পনাটির পক্ষে সর্বজনীন জনসমর্থন গড়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে।

dspace.mit.edu+2

ফলে ১৯৪৭ সালে বাংলাকে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভাগ করা হয়।

পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয়।

পূর্ববঙ্গের মুসলমান নেতৃত্ব ও জনগণের একটি বড় অংশ তখন পাকিস্তানকে তাদের রাজনৈতিক মুক্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনের সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

তাদের ধারণা ছিল, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠার পর দেখা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের হাতে প্রকৃত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়নি।

অর্থাৎ, ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গ স্বাধীন হয়নি, কারণ তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতৃত্ব একটি পৃথক বাঙালি রাষ্ট্রের পরিবর্তে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রকল্পে অংশ নিয়েছিল।

১৯৪৭ সালের সিদ্ধান্ত এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মধ্যে এই পার্থক্যটিই পরবর্তী ইতিহাসের সূচনা।

২. ১৯৪৮–১৯৫২: ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ

File:21 Feb 1953 Dhaka University female students procession.png - Wikimedia Commons

Roar বাংলা - শহীদ মিনারের ইতিকথা

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত: আমাদের কালের চোখে | প্রথম আলো

11

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম বড় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ছিল ভাষা আন্দোলন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

কিন্তু পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। সে কারণে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি ওঠে।

১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

তাঁর যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়ায় গণপরিষদে বাংলা ব্যবহারের অধিকার থাকা উচিত।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পূর্ববঙ্গে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ২১ মার্চ ঢাকায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

এই ঘোষণার প্রতিবাদে পূর্ববঙ্গের ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

Banglapedia+2

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকার পল্টন ময়দানে পুনরায় ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

এর বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ আন্দোলন শুরু করে।

২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল বের করে। পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়।

শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে। পরদিনও বিক্ষোভ ও পুলিশের দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকে।

এই ঘটনা পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে একটি গভীর উপলব্ধি তৈরি করে:

ধর্মীয়ভাবে একই রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের অধিকার স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।

১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়।

Banglapedia+1

ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব তিনটি ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

1. বাঙালি মুসলমানদের রাজনৈতিক পরিচয় শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না; বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি তাদের আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠল।

2. ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যের নতুন ভিত্তি তৈরি হলো।

3. রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তৈরি হলো।

এ কারণে ভাষা আন্দোলনকে বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

৩. ১৯৪৯–১৯৫৪: আওয়ামী মুসলিম লীগ ও যুক্তফ্রন্টের উত্থান

ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক সংগঠন ও আন্দোলনের নতুন বিকাশ ঘটতে থাকে।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। শেখ মুজিবুর রহমানও প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।

পরবর্তী সময়ে দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ রাখা হয়।

এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দলটি শুধু মুসলমানদের রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করে।

The Daily Star+1

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন

১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল।

এর প্রধান নেতাদের মধ্যে ছিলেন:

  • শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক।
  • মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
  • হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন লাভ করে। মুসলিম লীগ নির্বাচনে ব্যাপকভাবে পরাজিত হয়।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচিতে রাষ্ট্রভাষা বাংলা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, শিক্ষা ও কৃষকের অধিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কিন্তু নির্বাচনের মাত্র দুই মাসের মধ্যে ১৯৫৪ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় সরকার এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করে এবং পূর্ববঙ্গে গভর্নরের শাসন জারি করে।

Banglapedia+2

ঐতিহাসিক তাৎপর্য: এই ঘটনা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি করে যে নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জন করলেও কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

১৯৫৪ সালের ঘটনা পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈধতার সংকটকে আরও গভীর করে।

৪. ১৯৫৫ সালের One Unit ব্যবস্থা ও ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন: গণতন্ত্রের সংকট

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয় এবং যুক্তফ্রন্টের সরকার বরখাস্তের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে।

One Unit ব্যবস্থা (১৯৫৫)

১৯৫৫ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানকে একত্র করে একটি প্রশাসনিক ইউনিট গঠন করা হয়। এর নাম দেওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তান।

অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয়।

এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে আইনসভায় সমসংখ্যক প্রতিনিধিত্ব বা Parity প্রতিষ্ঠা করা।

অর্থাৎ, জনসংখ্যার বিচারে পূর্ব পাকিস্তান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের সমান প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়।

১৯৫৬ সালের সংবিধানে এই রাজনৈতিক কাঠামো স্বীকৃতি পায়। একই সংবিধানে বাংলা ও উর্দু রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাও লাভ করে।

Banglapedia+1

পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এই ব্যবস্থাকে জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধিকার খর্ব করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিল।

১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থান

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানের সংবিধান বাতিল করে সামরিক শাসন জারি করেন। পরে ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন।

এর ফলে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা হয় এবং বিরোধী নেতাদের গ্রেফতার করা হয়।

এই সামরিক শাসন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে একটি বড় উপলব্ধি তৈরি করে: পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে সামরিক-বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

National Assembly of Pakistan+2

ঐতিহাসিক তাৎপর্য: ১৯৫৪ সালে নির্বাচিত সরকার বরখাস্ত এবং ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে।

৫. ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশক: অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতার ধারণা

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পূর্ব পাকিস্তান ছিল পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। বিশেষত পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো।

কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অভিযোগ ছিল, কেন্দ্রীয় সরকার অর্জিত সম্পদ ও বৈদেশিক সহায়তার যথাযথ অংশ পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করছে না।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রধান ক্ষেত্র

১. উন্নয়ন ব্যয়: কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তান কম বরাদ্দ পেত বলে অভিযোগ ছিল। বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণায় পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে দুই অঞ্চলের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য তুলে ধরা হয়েছে।

The Cambridge Economic History of India+2

২. বৈদেশিক মুদ্রা: পূর্ব পাকিস্তানের পাট রপ্তানির মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যবহৃত হলেও পূর্ব পাকিস্তানের প্রয়োজন অনুসারে তার পুনর্বিনিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়।

৩. শিল্পায়ন: পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুততর হলেও পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পায়নের গতি তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

৪. মাথাপিছু আয়: ১৯৪৯–৫০ সালে দুই অঞ্চলের মাথাপিছু আয়ের পার্থক্য তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ১৯৬৯–৭০ সালের হিসাবে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি ছিল বলে তৎকালীন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।

UK Parliament+1

৫. সামরিক ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব: সামরিক বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনে বাঙালিদের অংশগ্রহণ জনসংখ্যার অনুপাতে ছিল না। ফলে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে পূর্ব পাকিস্তানের প্রভাব সীমিত ছিল।

এই পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটি ধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে একটি কেন্দ্র-প্রান্ত অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যেখানে পূর্ব পাকিস্তান সম্পদ উৎপাদন করছে কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা ভোগ করছে।

অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান পরবর্তী সময়ে এই বৈষম্যকে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও দুই অর্থনীতির ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন।

তাঁর মতে, দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও উন্নয়নের প্রয়োজন এতটাই ভিন্ন ছিল যে, একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি দিয়ে উভয়ের ন্যায়সংগত উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছিল না।

ঐতিহাসিক তাৎপর্য: ভাষা আন্দোলন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপান্তরিত করেছিল; অর্থনৈতিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা সেই রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যুক্ত করে।

ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধীরে ধীরে ভাষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক অধিকার এবং সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে পরিণত হয়।

৬. ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন ও ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন

আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে শরীফ শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রসমাজের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এবং শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির আশঙ্কায় ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ শুরু করে।

১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা আন্দোলনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন আন্দোলনকারী নিহত হন।

এই আন্দোলন ছাত্রসমাজকে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আরও সংগঠিত করে।

বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন কলেজ এবং ছাত্রসংগঠন রাজনৈতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

এই যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি বড় দুর্বলতা প্রকাশ করে।

যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান কার্যত সামরিকভাবে অরক্ষিত অবস্থায় ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক সামরিক পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ উপলব্ধি করতে থাকে যে, জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রশ্নেও তাদের অঞ্চল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সমান গুরুত্ব পাচ্ছে না।

এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনকে শক্তিশালী করে।

The Daily Star+1

৭. ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন: স্বায়ত্তশাসন থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণের পথে

ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস আজ

বাঙালির মুক্তি সনদের ভিত্তিপ্রস্তর

প্রধানমন্ত্রী: ছয় দফা ছিল মুক্তির সনদ - 24 Live Newspaper - Bangla

6

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন।

ছয় দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের একটি সুসংগঠিত কর্মসূচি।

ছয় দফার মূল বিষয়গুলো

দফা

মূল দাবি

প্রথম

লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংসদীয় সরকার ও প্রকৃত ফেডারেল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা

দ্বিতীয়

কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় রাখা

তৃতীয়

দুই অঞ্চলের জন্য পৃথক মুদ্রা অথবা পুঁজি পাচার রোধে কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা

চতুর্থ

কর আরোপ ও রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করা

পঞ্চম

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও বাণিজ্যের ওপর প্রাদেশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

ষষ্ঠ

পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব মিলিশিয়া বা আধাসামরিক বাহিনী গঠন

Bangladesh Genocide Archive+2

ছয় দফার মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানকে একটি প্রকৃত ফেডারেল রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা, যেখানে দুই অংশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত হবে।

এটি সরাসরি স্বাধীনতার দাবি ছিল না। বরং পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ছিল।

কিন্তু আইয়ুব সরকার ছয় দফাকে পাকিস্তানের অখণ্ডতার জন্য হুমকি মনে করে।

শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৬ সালের ৮ মে গ্রেফতার করা হয়। ছয় দফার পক্ষে ৭ জুন পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়।

এই আন্দোলন ধীরে ধীরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।

Banglapedia+1

ছয় দফার ঐতিহাসিক গুরুত্ব

আমার মতে, ছয় দফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

কারণ এর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দাবিগুলো প্রথমবার একটি সুসংগঠিত সাংবিধানিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ পায়।

এটি বাঙালির সামনে একটি বিকল্প রাষ্ট্রীয় কাঠামোর রূপরেখা তুলে ধরে।

রাজনৈতিক অর্থে ছয় দফা ছিল পাকিস্তানের প্রচলিত কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের সনদ।

৮. ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে।

সরকারের অভিযোগ ছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ভারতের সহায়তায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করেছিলেন।

এই মামলায় সামরিক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মচারী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অভিযুক্ত করা হয়।

মামলাটি পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক প্রতিবাদের সৃষ্টি করে।

বাঙালিরা মনে করে, ছয় দফার মতো একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে দমন করার জন্য সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।

বিশেষ করে সার্জেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা সেনানিবাসে আটক অবস্থায় গুলি করে হত্যার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ছাত্রসমাজ, শ্রমিক, কৃষক, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে।

সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই কর্মসূচির মধ্যে ছয় দফার পাশাপাশি শিক্ষা সংস্কার, শ্রমিকের অধিকার, কৃষকের স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি যুক্ত হয়।

আন্দোলনের সময় ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান, কিশোর মতিউর রহমানসহ অনেকে নিহত হন।

১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার গণআন্দোলনের মুখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। শেখ মুজিবুর রহমানসহ অভিযুক্তরা মুক্তি পান।

পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করে সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ইয়াহিয়া খান পুনরায় সামরিক শাসন জারি করেন।

Banglapedia+2

Mass Upsurge 1969: On this day, the future beckoned | The Business Standard

tbsnews.net

ঐতিহাসিক তাৎপর্য: ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করে যে, পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন আর কোনো একক রাজনৈতিক দল বা নেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ও জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল।

৯. ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়: কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আস্থার চূড়ান্ত সংকট

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ ভোলা ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে।

এটি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রচুর মানুষ প্রাণ হারায়, অসংখ্য ঘরবাড়ি ও সম্পদ ধ্বংস হয় এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

কিন্তু দুর্যোগ মোকাবিলায় পাকিস্তান সরকারের বিলম্বিত ও অপর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

বিশেষ করে দুর্গত অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অগ্রাধিকারের অভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের Modern Asian Studies জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নকে আরও তীব্র করে এবং পাকিস্তানি সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।

Cambridge Core+2

আমার মূল্যায়ন: ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা করেনি। কিন্তু এটি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বহীনতা ও বৈষম্যের একটি অত্যন্ত দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে ওঠে।

এই দুর্যোগের অভিজ্ঞতা ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে।

১০. ১৯৭০ সালের নির্বাচন: বাঙালির গণতান্ত্রিক বিজয় এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংকট

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছয় দফার ভিত্তিতে নির্বাচনী প্রচারণা চালায়।

নির্বাচনের ফলাফল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

নির্বাচনী ফলাফল

সংখ্যা

জাতীয় পরিষদের সাধারণ আসন

৩০০

পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ আসন

১৬২

আওয়ামী লীগের বিজয়ী আসন (পূর্ব পাকিস্তান)

১৬০

আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোটের হার (পূর্ব পাকিস্তান)

৭৪.৯%

পশ্চিম পাকিস্তানে পাকিস্তান পিপলস পার্টির আসন

৮১

আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৬০টি জয়লাভ করে। এর মাধ্যমে দলটি সমগ্র পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

Banglapedia+2

File:Sheikh Mujibur Rahman election rally 1970.jpg - Wikimedia Commons

commons.wikimedia.org

এই নির্বাচনের তাৎপর্য কী ছিল?

প্রথমত, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছয় দফা কর্মসূচির পক্ষে বিপুল সমর্থন প্রদান করে।

দ্বিতীয়ত, বাঙালিরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের সুযোগ পায়।

তৃতীয়ত, নির্বাচনের ফল অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের সাংবিধানিক অধিকার তৈরি হয়।

কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এই ফল মেনে নিতে পারেনি।

জুলফিকার আলী ভুট্টো ও তাঁর পাকিস্তান পিপলস পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতা ও সংবিধান নিয়ে সমঝোতা ছাড়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করে।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।

এই সিদ্ধান্ত পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ সৃষ্টি করে।

The Daily Star+2

এখানেই পাকিস্তানের সংকট একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে।

এতদিন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছিল। কিন্তু নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও যদি রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর না করা হয়, তাহলে পাকিস্তানের ঐক্য বজায় রাখার সাংবিধানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

আমার মতে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল অস্বীকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাঁকগুলোর একটি।

১১. ১৯৭১ সালের মার্চ: অসহযোগ আন্দোলন ও স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রস্তুতি

With solemn pride, Bangladesh celebrates 56th Independence Day today | The Business Standard

১৩ মার্চ ১৯৭১: সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল পূর্ব বাংলা

7

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানে এক নজিরবিহীন গণআন্দোলন শুরু হয়।

১ মার্চ: অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।

পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়।

ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের নির্দেশনায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে।

২ মার্চ: স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

৭ মার্চ: ঐতিহাসিক ভাষণ

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।

তিনি বলেন:

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

এই ভাষণে তিনি অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন এবং বাঙালি জনগণকে সম্ভাব্য সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেন।

তিনি সামরিক আইন প্রত্যাহার, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।

এই ভাষণকে স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে ঐতিহাসিকভাবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন: ৭ মার্চের ভাষণ ছিল স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক আহ্বান; আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা আসে ২৫ মার্চের রাত পেরিয়ে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে।

Liberation War Museum+2

৭ মার্চের পর থেকে ২৫ মার্চ

ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন।

কিন্তু আলোচনার পাশাপাশি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে।

রাজনৈতিক সমঝোতার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

১২. ২৫ মার্চ ১৯৭১: অপারেশন সার্চলাইট ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

অপারেশন সার্চ লাইট – DW – 23.03.2017

dw.com

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র জনগণের ওপর ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে।

এই অভিযানের নাম ছিল অপারেশন সার্চলাইট (Operation Searchlight)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তর এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়।

ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ, বাঙালি সামরিক সদস্য, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

এই সামরিক অভিযান ছিল মূলত বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলনকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করার প্রচেষ্টা।

কিন্তু এর ফল হয়েছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সামনে পাকিস্তানের সঙ্গে সাংবিধানিক সমঝোতার সম্ভাবনা কার্যত ভেঙে পড়ে।

২৬ মার্চ: স্বাধীনতার ঘোষণা

২৫ মার্চের রাত পেরিয়ে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠান।

এই ঘোষণা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয়।

পরবর্তী সময়ে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষিত রয়েছে।

B Laws+2

১৩. মুজিবনগর সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

মুজিবনগরে উদীয়মান সূর্যের রশ্মিতে বাংলাদেশের ইতিহাস | প্রথম আলো

prothomalo.com

স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি সংগঠিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দেয়।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়।

১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় এই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর।

Banglapedia+1

সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন:

পদ

ব্যক্তি

রাষ্ট্রপতি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি

সৈয়দ নজরুল ইসলাম

প্রধানমন্ত্রী

তাজউদ্দীন আহমদ

অর্থমন্ত্রী

ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী

স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী

এ এইচ এম কামারুজ্জামান

পররাষ্ট্রমন্ত্রী

খন্দকার মোশতাক আহমদ

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। যুদ্ধক্ষেত্রকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে মুক্তিবাহিনীর সামরিক কার্যক্রম সংগঠিত করা হয়।

Banglapedia+1

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বৈশিষ্ট্য

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বহুমাত্রিক জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম।

এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল:

  • মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধ।
  • সামরিক প্রতিরোধ।
  • ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণ।
  • কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা।
  • সাংস্কৃতিক কর্মীদের জনমত গঠন।
  • প্রবাসী বাঙালিদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।
  • আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠিত করার প্রচেষ্টা।

পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন এবং প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ভারত মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ, আশ্রয় ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করে।

Office of the Historian+1

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান ভারতের বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ করলে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সরাসরি শুরু হয়। তখন ভারতীয় সামরিক বাহিনী ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড আত্মসমর্পণ করে।

এর মধ্য দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হয়।

Office of the Historian+1

50 Years of Bangladesh: Retrospect and Prospects | Prothom Alo

en.prothomalo.com

১৪. ১৯৪৭–১৯৭১: বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ধারাবাহিকতার সংক্ষিপ্ত কালপঞ্জি

সাল

গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

ঐতিহাসিক তাৎপর্য

১৯৪৭

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা

পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়

১৯৪৮

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা

সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন সামনে আসে

১৯৪৯

আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা

পূর্ব পাকিস্তানের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে

১৯৫২

ভাষা আন্দোলন

বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি হয়

১৯৫৪

যুক্তফ্রন্টের বিজয় ও সরকার বরখাস্ত

গণতান্ত্রিক অধিকারের সংকট প্রকাশ পায়

১৯৫৫

One Unit ব্যবস্থা

জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতার বদলে Parity প্রতিষ্ঠা

১৯৫৮

সামরিক শাসন

গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ সংকুচিত হয়

১৯৬২

শিক্ষা আন্দোলন

স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিস্তার

১৯৬৫

পাক-ভারত যুদ্ধ

পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তাহীনতা প্রকাশ

১৯৬৬

ছয় দফা আন্দোলন

স্বায়ত্তশাসনের সুসংগঠিত কর্মসূচি

১৯৬৮

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বকে দমনের প্রচেষ্টা

১৯৬৯

গণ-অভ্যুত্থান

স্বৈরাচারবিরোধী গণজাগরণ

১৯৭০

ভোলা ঘূর্ণিঝড়

কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আস্থার সংকট বৃদ্ধি

১৯৭০

সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়

বাঙালির গণতান্ত্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠা

১৯৭১

অসহযোগ আন্দোলন

পূর্ব পাকিস্তানে কার্যত স্বশাসনের সূচনা

২৫ মার্চ ১৯৭১

অপারেশন সার্চলাইট

রাজনৈতিক সমঝোতার পথ ভেঙে পড়ে

২৬ মার্চ ১৯৭১

স্বাধীনতার ঘোষণা

স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় যাত্রার সূচনা

১০ এপ্রিল ১৯৭১

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি

১৭ এপ্রিল ১৯৭১

মুজিবনগর সরকারের শপথ

মুক্তিযুদ্ধের প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১

পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ

স্বাধীন বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়

১৫. সমালোচনামূলক মূল্যায়ন: বাংলাদেশের অভ্যুদয় কি অনিবার্য ছিল?

এখন আপনার প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অংশে আসা যাক।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে দীর্ঘমেয়াদি ও তাৎক্ষণিক—দুই ধরনের কারণ কাজ করেছিল।

ক. দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত কারণ

প্রথমত, রাজনৈতিক বৈষম্য: জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যথাযথ অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, সাংস্কৃতিক আধিপত্য: বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর উর্দু ও পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

চতুর্থত, সামরিক-বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য: পাকিস্তানের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাতদের প্রাধান্য ছিল।

পঞ্চমত, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ: ১৯৫৪ সালের নির্বাচিত সরকার বরখাস্ত, ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল অস্বীকার—এসব ঘটনা গণতান্ত্রিক সমাধানের পথ সংকুচিত করে।

খ. তাৎক্ষণিক কারণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায় তিনটি ঘটনা:

1. ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি।

2. ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা।

3. ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যামূলক অভিযান।

এই তিনটি ঘটনার সম্মিলিত প্রভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সাংবিধানিক সমঝোতার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়।

Office of the Historian+2

গ. কেন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাকে অনিবার্য বলা পুরোপুরি সঠিক নয়?

আমার মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ১৯৪৭ সাল থেকেই অবশ্যম্ভাবী হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসের জটিলতাকে সরল করে ফেলে।

কারণ:

  • পাকিস্তানের মধ্যে একটি প্রকৃত ফেডারেল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে দুই অঞ্চলের রাজনৈতিক সহাবস্থান সম্ভব হতে পারত।
  • ছয় দফা বাস্তবায়িত হলে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা পেতে পারত।
  • ১৯৭০ সালের নির্বাচন মেনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলে রাজনৈতিক সংকটের ভিন্ন সমাধান হতে পারত।
  • ১৯৭১ সালের মার্চে সামরিক অভিযান চালানোর পরিবর্তে রাজনৈতিক সমঝোতা করা হলে ইতিহাস অন্য পথে যেতে পারত।

সুতরাং, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের সম্ভাব্য পরিণতি হলেও তা ইতিহাসের শুরু থেকেই অবধারিত ছিল না।

কিন্তু ২৫ মার্চের সামরিক অভিযান এবং পরবর্তী গণহত্যা, দমন-পীড়ন ও সশস্ত্র প্রতিরোধের পর পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক রাজনৈতিক সহাবস্থানের সম্ভাবনা প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এ পর্যায়ে স্বাধীনতা শুধু একটি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ছিল না; বাঙালি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার বাস্তব প্রয়োজনেও পরিণত হয়।

১৬. আমার চূড়ান্ত বক্তব্য: বাংলাদেশ কি শুধু ভাষার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?

না। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে শুধু ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এর প্রকৃত ঐতিহাসিক তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে পাঁচটি প্রধান উপাদান কাজ করেছিল।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পাঁচটি ভিত্তি

১. সাংস্কৃতিক মুক্তি

বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

২. রাজনৈতিক মুক্তি

গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব, ভোটাধিকার এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

৩. অর্থনৈতিক মুক্তি

সম্পদের ওপর ন্যায্য অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং স্বনির্ভর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।

৪. সামাজিক মুক্তি

সামাজিক মর্যাদা, সমতা, মানবিক অধিকার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা।

৫. জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ

নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সার্বভৌমত্ব নিজেরাই নির্ধারণ করার অধিকার প্রতিষ্ঠা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও এই আকাঙ্ক্ষাগুলোর প্রতিফলন ঘটেছে। ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।

উইকিসংকলন একটি মুক্ত পাঠাগার+1

১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনাতেও জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে মুক্তিসংগ্রামের মৌলিক আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

B Laws

উপসংহার

১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গের মানুষ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিল, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক নীতি সেই স্বপ্নকে ক্রমশ ভেঙে দেয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে রাজনৈতিক চেতনায় রূপান্তরিত করে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের সুসংগঠিত দাবি তুলে ধরে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এই দাবিকে গণআন্দোলনে রূপান্তরিত করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি জনগণ তাদের রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে।

কিন্তু সেই গণরায় অস্বীকার করে ২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর আক্রমণ চালালে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন স্বাধীনতার যুদ্ধে পরিণত হয়।

আমার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হলো, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতার বিপরীতে বাঙালি জনগণের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের সফল প্রতিষ্ঠা। এটি শুধু পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা নয়; বরং ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে একটি স্বতন্ত্র জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।

আরও গভীর অধ্যয়নের জন্য নির্বাচিত বই ও গবেষণা

এই বিষয়টি নিয়ে একাডেমিক গবেষণা করতে নিচের গ্রন্থগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক

গ্রন্থ

আলোচনার গুরুত্ব

Rounaq Jahan

Pakistan: Failure in National Integration (1972)

পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির ব্যর্থতা

Badruddin Umar

The Emergence of Bangladesh: Class Struggles in East Pakistan (1947–1958)

শ্রেণিসংগ্রাম, রাজনৈতিক বঞ্চনা ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রাথমিক ভিত্তি

Srinath Raghavan

1971: A Global History of the Creation of Bangladesh (2013)

মুক্তিযুদ্ধের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

Willem van Schendel

A History of Bangladesh

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস

Rehman Sobhan

Collected Works of Rehman Sobhan: Milestones to Bangladesh

অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ

Richard Sisson and Leo E. Rose

War and Secession: Pakistan, India, and the Creation of Bangladesh (1990)

১৯৭১ সালের যুদ্ধ, কূটনীতি ও রাষ্ট্রের বিভাজন

বিশেষভাবে পড়ার জন্য:

একাডেমিক আলোচনার জন্য একটি বিশেষ পরামর্শ: আপনার আগের প্রশ্নগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত, হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণি এবং রওনক জাহানের রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যহীনতার আলোচনা এসেছে। এগুলোকে এক সূত্রে আনলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়:

ঔপনিবেশিক বাংলায় সামাজিক ও শিক্ষাগত ক্ষমতার বৈষম্য → পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা → পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বঞ্চনা → বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ → স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন → গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রাম → মুক্তিযুদ্ধ → স্বাধীন বাংলাদেশ।

এই ধারাবাহিকতাই ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের ইতিহাস বোঝার একটি কার্যকর বিশ্লেষণী কাঠামো।

 

 

 

১৯৪৭-এ বাংলাদেশের জন্ম হয়নি, কারণ পূর্ববঙ্গের মুসলমানেরা তখন আলাদা রাষ্ট্র চাননি। তাঁরা চেয়েছিলেন পাকিস্তান—হিন্দু ভদ্রলোকের রাজনৈতিক আধিপত্য থেকে বেরোনোর রাষ্ট্র। ১৯৭১ অনিবার্য হয়ে ওঠে এই রাষ্ট্রটি যখন সেই প্রতিশ্রুতি ভাষা, ভোট, অর্থ ও নিরাপত্তায় বারবার ভঙ্গ করে, শেষে নির্বাচনি রায়কে সামরিক অভিযানে উত্তর দেয়। এক ঘটনা নয়; দরজাগুলো একে একে বন্ধ হওয়ার ইতিহাস।

 

## ১৯৪৭-এ স্বাধীন বাংলা কেন হয়নি

 

১৯৪৬-এর নির্বাচনে বাংলার মুসলিম আসন মুসলিম লীগের হয় পাকিস্তানের দাবিতে। সোহরাওয়ার্দি–শরৎ বসুর অখণ্ড বাংলা শেষ মুহূর্তের বিকল্প ছিল; হিন্দু রাজনৈতিক শ্রেণি ও জিন্নাহ দুই দিক থেকেই তা টেকে না। পূর্ববাংলার নতুন মুসলিম মধ্যবিত্তের হিসাব ছিল অন্য: অখণ্ড বাংলায় কলকাতা ও ভদ্রলোক কর্তৃত্ব থাকবে, পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে নিজেরাই রাজনৈতিক শ্রেণি হবেন। ১৯৪৭ তাই ব্যর্থ স্বাধীনতা নয়, সচেতন পছন্দ। রওনক জাহানের ভাষায়, রাষ্ট্রটি ধরে নিয়েছিল একক ভারতীয় মুসলিম জাতি আছে। বাঙালি সেই ধারণায় স্বাক্ষর দিয়ে ঢুকেছিলেন।

 

## যে শৃঙ্খলে পছন্দটি খালি হয়ে যায়

 

প্রতিটি সংকটে দাবি ছিল পাকিস্তানের ভেতরে স্বীকৃতি। উত্তর আসে কেন্দ্র থেকে প্রত্যাখ্যান। প্রত্যাখ্যানই বাঙালি জাতীয়তাকে আলাদা প্রকল্প বানায়।

 

**ভাষা, ১৯৪৮–৫২।** ১৯৪৮-এ গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বললে প্রস্তাব নাকচ হয়। ২১ মার্চ ঢাকায় জিন্নাহ বলেন রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা রাষ্ট্রের বাইরে। ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিতে সেই বিতর্ক রক্ত পায়। ইসলাম যে জাতীয় আঠা হতে পারছে না, এটাই প্রথম গণপ্রমাণ। দাবি তখনও বিচ্ছিন্নতা নয়—সমমর্যাদা।

 

**ভোট বাতিল, ১৯৫৪।** যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা নিয়ে প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগকে প্রায় মুছে দেয়। ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা মাস দুয়েকের মধ্যে বাতিল, কেন্দ্রের শাসন চাপে। শিক্ষাটা স্থায়ী হয়: পূর্ব পাকিস্তানের রায় করাচি মানতে বাধ্য নয়। ১৯৫৫-এর ওয়ান ইউনিট পশ্চিমের চার প্রদেশকে এক করে ‘প্যারিটি’ চাপায়—জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে রাজনৈতিকভাবে অর্ধেক, বাস্তবে কম, করে দেওয়া।

 

**সেনাশাসন ও দুই অর্থনীতি, ১৯৫৮–৬৯।** ১৯৫৮-এর সামরিক আইন গণতন্ত্রের পথ দশ বছর বন্ধ রাখে। আইয়ুব রাষ্ট্রগঠন ও প্রবৃদ্ধিকে জাতিগঠনের উপরে রাখেন। পরিকল্পনা কমিশনের হিসাবে ১৯৫০–৭০ পর্বে উন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ যায় পশ্চিমে, পূর্বে প্রায় ৩০—যেখানে মানুষ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ, রপ্তানির বড় অংশ (পাট) আসত পূর্ব থেকে। মুদ্রা, সাহায্য, শিল্পলাইসেন্স পশ্চিমে জমে। সেনা ও উচ্চ আমলায় বাঙালি প্রায় নেই। ১৯৬৫-এর যুদ্ধে পূর্ব রণাঙ্গন অরক্ষিত: পাকিস্তানের নিরাপত্তা পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা নয়, এই বোধ ছড়িয়ে পড়ে।

 

**ছয় দফা, ১৯৬৬।** ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে শেখ মুজিবুর রহমান যে কর্মসূচি দেন তা স্বাধীনতার ঘোষণা নয়। এখনও পাকিস্তান—কিন্তু লাহোর প্রস্তাবের মতো প্রকৃত ফেডারেশন: কেন্দ্রের হাতে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র; দুই অঞ্চলের আলাদা অর্থনীতি, কর, বৈদেশিক মুদ্রা; পূর্বে নিজস্ব আঞ্চলিক রক্ষীবাহিনী। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক কেন্দ্র ভেঙে চরম স্বায়ত্তশাসন। আগরতলা মামলা (১৯৬৮) এই দাবিকে ষড়যন্ত্র বানাতে চায়। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে মামলা তুলে নিতে হয় (২২ ফেব্রুয়ারি), মুজিব মুক্ত হন, আইয়ুব পড়েন। রাষ্ট্র তখনও ভাঙেনি; ভেঙেছে শাসকের বৈধতা।

 

**নির্বাচন, ঘূর্ণিঝড়, অস্বীকার—১৯৭০–৭১।** ১২ নভেম্বর ১৯৭০-এর ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষাধিক মানুষ মারা যান; কেন্দ্রের উদাসীনতা বিচ্ছিন্নতাকে নৈতিক রূপ দেয়। ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের পূর্বাঞ্চলের ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০ পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়। পশ্চিমে ভুট্টোর পিপিপি পায় ৮১। এক দেশে দুই জাতির ভোট। ছয় দফা এবার ম্যান্ডেট। ভুট্টোর ‘ইধার হাম, উধার তুম’ এবং ইয়াহিয়ার অধিবেশন পিছিয়ে দেওয়া (১ মার্চ ১৯৭১) সেই ম্যান্ডেট অস্বীকার। ৭ মার্চের ভাষণ স্বাধীনতার লড়াই ঘোষণা করে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ তখনও শেষ কথা নয়—অসহযোগ কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন আওয়ামী লীগের হাতে তুলে দেয়।

 

## যেখানে বিকল্প শেষ

 

অনিবার্যতার মুহূর্ত ২৫–২৬ মার্চ ১৯৭১। অপারেশন সার্চলাইট নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে আলোচনার পক্ষ বানানোর বদলে সামরিক লক্ষ্য বানায়। মুজিব গ্রেপ্তার। ছাত্র-যুবক-সেনা-পুলিশের একাংশ প্রতিরোধে নামে। ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (প্রজ্ঞাপন) ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর ধরা হয়; ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রবাসী সরকার। এর পর ‘স্বায়ত্তশাসিত পাকিস্তান’ আর রাজনৈতিক বিকল্প থাকে না। যারা ছয় দফা পর্যন্ত পাকিস্তানের ভেতরে ছিলেন, গণহত্যার পর স্বাধীনতা ছাড়া তাদের সামনে পথ থাকে না।

 

যুদ্ধের রূপটাও এই রাজনীতিরই জের। মুক্তিবাহিনী, প্রায় এক কোটি শরণার্থী, এবং ডিসেম্বরে ভারতের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ ঘটায়। ভারত বিজয়কে সম্ভব ও দ্রুত করে; বিচ্ছিন্নতার কারণ নয়। কারণ আগেই তৈরি: রায় অস্বীকার ও ২৫ মার্চ।

 

## রায়

 

| সময় | দাবি | রাষ্ট্রের উত্তর | ফল |

|---|---|---|---|

| ১৯৪৮–৫২ | ভাষার সমমর্যাদা | উর্দু, গুলি | ধর্মীয় জাতীয়তা ভাঙল |

| ১৯৫৪–৫৮ | নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার | মন্ত্রিসভা বাতিল, ওয়ান ইউনিট, সামরিক আইন | ভোট অবিশ্বাস |

| ১৯৫৮–৬৬ | অর্থ ও নিরাপত্তায় অংশ | ব্যয়ের ~৭০% পশ্চিমে, ১৯৬৫-এ পূর্ব অরক্ষিত | ‘দুই অর্থনীতি’ |

| ১৯৬৬–৬৯ | ছয় দফা | মামলা, তারপর পতন | স্বায়ত্তশাসনই সর্বোচ্চ আলোচ্য |

| ১৯৭০–৭১ | সেই দাবির নির্বাচনি রায় | অধিবেশন বাতিল, সার্চলাইট | স্বাধীনতাই একমাত্র পথ |

 

১৯৪৭-এ স্বাধীন বাংলাদেশ অনিবার্য ছিল না। অনিবার্য হয় এক দীর্ঘ প্রত্যাখ্যানের শেষে—যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল দেখে, পাকিস্তানে থেকে ভাষা, ভোট, উদ্বৃত্ত ও জীবন কোনোটাই নিশ্চিত নয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয় তাই হঠাৎ বিদ্রোহ নয়। ১৯৪৭-এর পছন্দকে যারা ক্ষমতা ভাগ না করে উপনিবেশে পরিণত করেন, ১৯৭১ তাঁদের রাজনীতিরই বিপরীত ফল।

 

 

 

 

১৯৪৭ সালের দেশভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র ২৪ বছরের মাথায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং চরম বৈষম্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি।

 

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কালপর্বে পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া প্রধান ঐতিহাসিক ঘটনা ও মোড় পরিবর্তনকারী পর্যায়গুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:



১. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-১৯৫২): সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের সূচনা

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই জিন্নাহ ও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা ঘোষণা করেন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা"। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা।



  • মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় বাঙালি ছাত্রসমাজ ও আপামর জনসাধারণ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।

 

  • ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাজপথে রক্ত ঝরার মাধ্যমে বাঙালি উপলব্ধি করে যে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কেবল রাজনৈতিকভাবেই নয়, বরং বাঙালিদের সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানছে। এই ভাষা আন্দোলনই পরবর্তীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

 

২. ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও মুসলিম লীগের পতন

পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে প্রথম বড় আঘাত আসে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে। এ নির্বাচনে ফজলুল হক, শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত 'যুক্তফ্রন্ট' মুসলিমলীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।



  • এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় যে, পূর্ব বাংলার মানুষ পশ্চিম কেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে।

 

  • যদিও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সেই যুক্তফ্রন্ট সরকার বেশি দিন টিকতে দেওয়া হয়নি, তবুও এটি বাঙালি মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক শক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছিল।

 

৩. স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬)

আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের দীর্ঘ দশকে পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে চরমভাবে বঞ্চিত করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন।



  • ছয় দফাকে বলা হয় বাঙালির 'মুক্তিসনদ', যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, আলাদা অর্থনীতি, মুদ্রা ব্যবস্থা এবং আধা-সামরিক বাহিনী রাখার দাবি জানানো হয়।

 

  • এই দাবি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত কাঁপিয়ে দেয় এবং তারা বুঝতে পারে যে এটি একচ্ছত্র আধিপত্যের পতন ঘটাবে।

 

৪. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯)

৬ দফার জনপ্রিয়তায় আতঙ্কিত হয়ে আইয়ুব খান সরকার বঙ্গবন্ধসহ ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে।



  • এর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় তীব্র গণবক্ষোভ ও গণঅভ্যুত্থান গড়ে ওঠে। ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন এবং বন্দী অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধুকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পতন ঘটে আইয়ুব খানের দীর্ঘ একনায়কতন্ত্রের।

 

৫. ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ম্যান্ডেট লাভ

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় সামরিক সরকার।



  • এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে (জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পায়)।

 

  • গণতান্ত্রিক নিয়মে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা পাওয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধুর। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও জুলফিকার আলী ভুট্টো এই গণতান্ত্রিক রায় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করেন।

 

৬. অসহযোগ আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মার্চ

ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানার প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।



  • ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেন— "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম", যা কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের অঘোষিত স্বাধীনতার নির্দেশিকায় পরিণত হয়।

 

৭. ২৫শে মার্চ গণহত্যা ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' নামের বর্বরোচিত সামরিক অভিযਾਨ চালিয়ে ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর ওপর আধুনিক অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নারকীয় গণহত্যা চালায়।



  • এই বর্বর আক্রমণ শুরু হওয়ার পরই ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

 

  • এরপর দীর্ঘ ৯ মাস ধরে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও দুই লাখ মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

 

উপসংহার

১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠিত হলেও সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নাগরিক অধিকার, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬ দফা এবং ১৯৭০-এর নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাঙালিরা সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে অধিকার আদায়ের চেষ্টা করলেও শাসকগোষ্ঠী তা বলপ্রয়োগ করে দমন করতে চেয়েছে। ফলে উপনিবেশিক শৃঙ্খল ভেঙে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম নেওয়া ছাড়া পূর্ব বাংলার মানুষের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না।

 

 

 

 

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তৎকালীন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান) ধর্মীয় ঐক্যের আবেগে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে হাজার মাইলের ব্যবধানে থাকা পশ্চিম পাকিস্তান শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর শাসন, শোষণ ও বৈষম্যমূলক নীতি চাপিয়ে দেয়। ফলে ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় মোহে যে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল, মাত্র ২৪ বছরের মাথায় ১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। [1] (https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A6%BE_%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7), [2] (https://www.bbc.com/bengali/news-56562959), [3] (https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A4_%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%A8), [4] (https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AA%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%AC%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97), [5] (https://translate.google.com/translate?u=https://www.nationalarchives.gov.uk/education/teaching-resources/independence-of-bangladesh/&hl=bn&sl=en&tl=bn&client=sge)

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া প্রধান ঘটনাবলি ও পটভূমি নিচে আলোচনা করা হলো, যা বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে তুলেছিল:

 

১. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন (১৯৫২)

 

পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও ১৯৪৮ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে বাঙালিরা রাজপথে নেমে আসে এবং ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেক ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আন্দোলনটি ছিল মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর। [1] (https://www.facebook.com/khan.nadim.3/posts/%E0%A7%A7%E0%A7%AF%E0%A7%AD%E0%A7%A7-%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A6%97%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%96%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE-%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A6%B2-%E0%A7%AD-%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A7%AB%E0%A7%A6/10232219535526184/), [2] (https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AA%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC_%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%87%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B8), [3] (https://www.bbc.com/bengali/news-56562959)

 

২. যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা (১৯৫৪)

 

১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের এই গণতান্ত্রিক বিজয়কে মেনে নিতে পারেনি এবং মাত্র কয়েক মাসের মাথায় কেন্দ্রীয় সরকার এই মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে সেখানে গভর্নরের শাসন জারি করে। [1] (https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A6%BE), [2] (https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AA%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC_%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%87%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B8)

 

৩. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ঔপনিবেশিক শোষণ

 

পূর্ব পাকিস্তানের উৎপাদিত পাট ও অন্যান্য পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো, কিন্তু সেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন এবং সামরিক খাতে। ১৯৪৭ সালে দুই অঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু আয় প্রায় সমান থাকলেও, দুই দশকের শোষণে পূর্ব পাকিস্তান চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। এটি বাঙালিদের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় করে যে তারা পাকিস্তানের অংশ হলেও আসলে একটি অভ্যন্তরীণ উপনিবেশের শিকার। [1] (https://www.facebook.com/khan.nadim.3/posts/%E0%A7%A7%E0%A7%AF%E0%A7%AD%E0%A7%A7-%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A6%97%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%96%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE-%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A6%B2-%E0%A7%AD-%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A7%AB%E0%A7%A6/10232219535526184/)

 

৪. ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি (১৯৬৬)

 

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষামূলক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। এই ছয় দফাকে বাঙালির 'ম্যাগনা কার্টা' বা মুক্তির সনদ বলা হয়। এটি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে তীব্র রূপ দেয়। [1] (https://www.bbc.com/bengali/news-56562959), [2] (https://translate.google.com/translate?u=https://www.studocu.com/row/messages/question/5222658/why-was-the-emergence-of-bangladesh-inevitable-in-1971-explained-with-facts-narratives-and&hl=bn&sl=en&tl=bn&client=sge)

 

৫. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

 

ছয় দফা আন্দোলন নস্যাৎ করতে ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' দায়ের করে আইয়ুব খান সরকার। এর বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে যা ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আন্দোলনের মুখে সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে এবং আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। [1] (https://www.bbc.com/bengali/news-56562959)

 

৬. ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা

 

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে。 নিয়ম অনুযায়ী আওয়ামী লীগের সরকার গঠন করার কথা থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তরে নানা টালবাহানা ও ষড়যন্ত্র শুরু করেন। [1] (https://www.bbc.com/bengali/news-56562959), [2] (https://translate.google.com/translate?u=https://en.wikipedia.org/wiki/Bangladesh_Liberation_War&hl=bn&sl=en&tl=bn&client=sge)

 

৭. বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ও অসহযোগ আন্দোলন

 

ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যেখানে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন: “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই ভাষণ বাঙালিদের সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে। [1] (https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A6%BE)

 

৮. অপারেশন সার্চলাইট ও স্বাধীনতার ঘোষণা (২৫-২৬ মার্চ, ১৯৭১)

 

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে নৃশংস গণহত্যা শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা ও রাজারবাগসহ বিভিন্ন স্থানে এক রাতে হাজার হাজার বাঙালিকে হত্যা করা হয়। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। [1] (https://www.bbc.com/bengali/news-56562959), [2] (https://translate.google.com/translate?u=https://www.nationalarchives.gov.uk/education/teaching-resources/independence-of-bangladesh/&hl=bn&sl=en&tl=bn&client=sge), [3] (https://translate.google.com/translate?u=https://en.wikipedia.org/wiki/Bangladesh_Liberation_War&hl=bn&sl=en&tl=bn&client=sge), [4] (https://translate.google.com/translate?u=https://www.efsas.org/publications/research-dossiers/1971-liberation-war,-birth-of-bangladesh-and-comparison-with-present-day-pakistan/&hl=bn&sl=en&tl=bn&client=sge)

 

৯. ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ ও চূড়ান্ত বিজয় (১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১)

 

স্বাধীনতার ঘোষণার পর গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার এবং গঠিত হয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক ও গেরিলা বাহিনী ‘মুক্তিবাহিনী’। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং ২ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে—অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। [1] (https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A7%A7%E0%A7%AF%E0%A7%AD%E0%A7%A7-%E0%A6%8F_%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87_%E0%A6%97%E0%A6%A3%E0%A6%B9%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE), [2] (https://translate.google.com/translate?u=https://www.nationalarchives.gov.uk/education/teaching-resources/independence-of-bangladesh/&hl=bn&sl=en&tl=bn&client=sge), [3] (https://translate.google.com/translate?u=https://www.efsas.org/publications/research-dossiers/1971-liberation-war,-birth-of-bangladesh-and-comparison-with-present-day-pakistan/&hl=bn&sl=en&tl=bn&client=sge), [4] (https://www.protidinersangbad.com/todays-newspaper/uposompadokio/496189)

No comments:

Post a Comment