### স্বদেশী আন্দোলন (১৯০৫-১৯১১)
স্বদেশী আন্দোলন হলো বাংলার ইতিহাসের প্রথম
*গণআন্দোলন* এবং প্রথম *অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ*।
আগে জাতীয়তাবাদ ছিল শুধু শিক্ষিত ভদ্রলোকদের
ড্রয়িংরুমে। স্বদেশী আন্দোলন জাতীয়তাবাদকে রাস্তায়, বাজারে, স্কুলে, ঘরে ঘরে নিয়ে আসে।
#### ১. পটভূমি - কেন স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলো?
*১৯০৫ সালের ২০ জুলাই:* ভাইসরয় লর্ড কার্জন
বাংলা ভাগের ঘোষণা দেন।
- *পশ্চিম বাংলা:* বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা - রাজধানী কলকাতা (হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ)
- *পূর্ববঙ্গ ও আসাম:* রাজধানী ঢাকা (মুসলমান
সংখ্যাগরিষ্ঠ)
*কার্জনের অজুহাত:* বাংলা অনেক বড়, শাসন করা কঠিন।
*আসল কারণ:* বাঙালিরা শিক্ষায়, চাকরিতে, জাতীয়তাবাদে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলা ভাগ করে
বাঙালিকে দুর্বল করা, হিন্দু-মুসলমানের
মধ্যে ঝগড়া লাগানো - *Divide and Rule*।
*১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর:* বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়।
এই দিনটিকে বাঙালিরা *"শোক দিবস"* হিসেবে পালন করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই দিনে লিখেন - *"আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি"* (পরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত) এবং রাখি বন্ধন
উৎসব চালু করেন - হিন্দু-মুসলমান একে অপরের হাতে রাখি বাঁধে।
*এই দিন থেকেই শুরু হয় স্বদেশী আন্দোলন।*
#### ২. স্বদেশী আন্দোলন মানে কি? - ৩টি অর্থ
*১. স্বদেশী = নিজের দেশের জিনিস কেনা (Positive)*
বিলাতি কাপড়, বিলাতি লবণ, বিলাতি চিনি, বিলাতি সাবান বর্জন করে দেশি তাঁতের কাপড়,
দেশি লবণ, দেশি চিনি কেনা।
*২. বয়কট = বিদেশি জিনিস বর্জন (Negative)*
বিলাতি কাপড় পোড়ানো, বিলাতি দোকানের সামনে পিকেটিং করা, বিলাতি জিনিস না কেনা।
*৩. স্বদেশী শিক্ষা, স্বদেশী বিচার, স্বদেশী শিল্প*
ব্রিটিশ স্কুল-কলেজ বর্জন করে জাতীয় স্কুল
খোলা, ব্রিটিশ আদালত বর্জন করে
সালিশি ব্যবস্থা চালু করা।
*স্লোগান ছিল:* "স্বদেশী গ্রহণ কর, বিলাতি বর্জন কর"
#### ৩. স্বদেশী আন্দোলনের ৪টি ধারা - পরীক্ষায় এই
ছকটি মুখস্ত রাখো
ধারা | নেতা | কাজ | উদাহরণ
**১. নরমপন্থী (Moderate)** | সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, গোপালকৃষ্ণ গোখলে | শান্তিপূর্ণ বয়কট, আবেদন-নিবেদন | টাউন হলে সভা, পত্রিকায় লেখা
**২. চরমপন্থী (Extremist)** | বাল গঙ্গাধর তিলক, অরবিন্দ ঘোষ, বিপিনচন্দ্র পাল (লাল-বাল-পাল) | স্বরাজ চাই, ব্রিটিশদের তাড়াতে হবে | "স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার"
**৩. বিপ্লবী (Revolutionary)** | ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, অরবিন্দ ঘোষ | বোমা মারা, অস্ত্র দিয়ে ব্রিটিশ তাড়ানো | অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর দল, ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের ফাঁসি
**৪. গঠনমূলক (Constructive)** | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু | দেশি শিল্প, দেশি স্কুল, দেশি বিজ্ঞান | জাতীয় শিক্ষা পরিষদ, বেঙ্গল কেমিক্যাল
#### ৪. স্বদেশী আন্দোলনের বাস্তব কাজ - কি কি
হয়েছিল?
*ক) অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে - দেশি শিল্পের বিপ্লব:*
- *বেঙ্গল কেমিক্যাল* - আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র
রায় প্রতিষ্ঠা করেন (আজকের বেঙ্গল কেমিক্যাল)।
- *বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যাংক* - দেশি ব্যাংক।
- *ঢাকায় দেশি তাঁত শিল্প* - ঢাকাই জামদানি,
টাঙ্গাইল শাড়ির চাহিদা
বেড়ে যায়।
- *মোহিনী মিলস, লক্ষ্মী কটন মিলস* - দেশি কাপড়ের কারখানা।
- *সাবান, দিয়াশলাই, চিনি* - সব দেশি
কারখানা তৈরি হয়।
*বাঙালি ব্যবসায়ীরা প্রথমবার বুঝলো -
"দেশি জিনিস বেচেও বড়লোক হওয়া যায়"।*
*খ) শিক্ষা ক্ষেত্রে - জাতীয় শিক্ষা:*
ব্রিটিশ স্কুল বর্জন করে -
- *জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (১৯০৬)* - যা পরে *যাদবপুর
বিশ্ববিদ্যালয়* হয়।
- *বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ* - অধ্যক্ষ অরবিন্দ ঘোষ।
- *ঢাকায় জগন্নাথ কলেজ* - স্বদেশী আন্দোলনের ফসল।
*গ) সংস্কৃতি ক্ষেত্রে - বাংলা সাহিত্যের
স্বর্ণযুগ:*
- রবীন্দ্রনাথ - "আমার সোনার বাংলা"
- দ্বিজেন্দ্রলাল রায় - "ধন ধান্য পুষ্প
ভরা"
- রজনীকান্ত সেন - "মায়ের দেওয়া মোটা
কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই"
- মুকুন্দ দাস - যাত্রাপালা দিয়ে স্বদেশী প্রচার
*ঘ) নারী ও জনগণের অংশগ্রহণ:*
আগে আন্দোলন মানে শুধু পুরুষ ভদ্রলোক। স্বদেশী
আন্দোলনে প্রথমবার -
- মহিলারা মিছিলে আসে, চুরি ভেঙে স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেয়।
- কৃষক, শ্রমিক, মুচি, তাঁতি - সবাই আন্দোলনে যোগ দেয়।
#### ৫. স্বদেশী আন্দোলনে মুসলমানদের ভূমিকা - কেন
মুসলমানরা দূরে ছিল?
এটি পরীক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা।
*১. মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল:*
পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা ভেবেছিল - বঙ্গভঙ্গ হলে
ঢাকা রাজধানী হবে, আমাদের চাকরি হবে,
উন্নতি হবে। তাই তারা
স্বদেশী আন্দোলনের বিরোধিতা করে।
*২. স্বদেশী আন্দোলন হিন্দু ধর্মীয় রূপ নেয়:*
আন্দোলনে বন্দে মাতরম, কালী পূজা, শিবাজি উৎসব, রাখি বন্ধন - এগুলো ছিল হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক।
মুসলমানরা মনে করলো - "এটি হিন্দুদের আন্দোলন, আমাদের নয়"।
*৩. নবাব সলিমুল্লাহর বিরোধিতা:*
ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ বলেন - "স্বদেশী
আন্দোলন মুসলমানদের বিরুদ্ধে, আমরা বঙ্গভঙ্গ
চাই"। ১৯০৬ সালে তিনি *মুসলিম লীগ* প্রতিষ্ঠা করেন - যা স্বদেশী আন্দোলনের
পাল্টা।
*ফলাফল:* স্বদেশী আন্দোলন হিন্দু-মুসলমানকে এক
করতে গিয়ে আরও ভাগ করে দেয়। হিন্দু জাতীয়তাবাদ আর মুসলিম জাতীয়তাবাদ আলাদা
হয়ে যায়। এই বিভাজনই পরে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জন্ম দেয়।
#### ৬. স্বদেশী আন্দোলনের ফলাফল ও পরিণতি
*সফলতা:*
১.
*বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১):* ব্রিটিশরা ভয় পেয়ে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ বাতিল করে।
বাংলা আবার এক হয়। এটি ছিল বাঙালিদের প্রথম বড় জয়।
২.
*জাতীয়তাবাদের জন্ম:* বাঙালিরা বুঝলো - আন্দোলন করলে ব্রিটিশরা ভয় পায়।
৩.
*দেশি শিল্পের ভিত্তি:* বেঙ্গল কেমিক্যাল, জামদানি - আজও টিকে আছে।
৪.
*গান্ধীর আন্দোলনের মডেল:* গান্ধীজি পরে স্বদেশী আন্দোলনের বয়কট, চরকা, খাদি - এই ধারণা নিয়েই অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০) করেন।
*ব্যর্থতা:*
১.
*সাম্প্রদায়িক বিভাজন:* হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ভেঙে যায়।
২.
*সহিংসতা:* বিপ্লবী আন্দোলন ব্রিটিশদের দমন-পীড়ন বাড়ায়।
৩.
*ভদ্রলোকদের আন্দোলন:* গরিব কৃষক, মুসলমান - এরা বেশি দিন থাকেনি।
#### উপসংহার -
"স্বদেশী আন্দোলন ছিল বাংলার প্রথম গণআন্দোলন,
প্রথম অর্থনৈতিক যুদ্ধ।
এটি বঙ্গভঙ্গ রদ করাতে পেরেছিল, কিন্তু বাংলা ভাগ
ঠেকাতে পারেনি। কারণ স্বদেশী আন্দোলন 'স্বদেশী' হতে গিয়ে 'হিন্দু' হয়ে গিয়েছিল, 'বাঙালি' হতে গিয়ে 'হিন্দু বাঙালি' হয়ে গিয়েছিল। পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষককে সে
আপন করতে পারেনি। তাই স্বদেশী আন্দোলনের সাফল্যই তার ব্যর্থতার বীজ বুনে দিয়েছিল
- ১৯০৫ সালে যে হিন্দু-মুসলিম ভাগ হয়েছিল, ১৯৪৭ সালে সেই ভাগই পাকিস্তান হয়ে গেল।
স্বদেশী আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে - দেশি জিনিস কেনা দিয়ে দেশপ্রেম হয়, কিন্তু ধর্মকে বাদ দিয়ে দেশপ্রেম হয়
না।"
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সৃষ্ট একটি বৃহত্তর ভারতীয়
জাতীয়তাবাদী গণআন্দোলন, যার মূল কৌশল ছিল বিদেশি পণ্য বর্জন ও দেশি পণ্য
ব্যবহার। এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং স্বরাজ
বা স্বশাসনের দাবিকে ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।[britannica][en.banglapedia][en.banglapedia]
উদ্ভবের
কারণ
১৯০৫ সালের
১৬ অক্টোবর বড়লাট লর্ড কার্জন বাংলাকে পূর্ববঙ্গ ও আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গে ভাগ
করেন। ব্রিটিশরা একে প্রশাসনিক সুবিধার ব্যাখ্যা দিলেও এর আসল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা এবং হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন
সৃষ্টি করা।[bn.wikipedia][en.banglapedia][en.wikipedia]
বঙ্গভঙ্গের
প্রতিবাদে ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে বিদেশি পণ্য বর্জনের প্রস্তাব
গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে স্বদেশী ও বয়কট একসঙ্গে আন্দোলনের প্রধান অস্ত্রে পরিণত
হয়।[modeldiplomat]
আরও কিছু
দূরবর্তী কারণ ছিল ব্রিটিশ অর্থনৈতিক শোষণ, দুর্ভিক্ষ ও
মহামারির সময় সরকারি উদাসীনতা এবং জনবিরোধী আইন। এসব কারণ বঙ্গভঙ্গের ঘটনাকে একটি
বৃহত্তর জাতীয় আন্দোলনে রূপ দেয়।[studymamu]
মূল
কর্মসূচি
স্বদেশী
আন্দোলনের চারটি প্রধান কর্মসূচি ছিল:
- স্বদেশি: বিদেশি পণ্য বর্জন করে দেশি পণ্য ব্যবহার ও দেশি
শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া।[modeldiplomat]
- বয়কট: ব্রিটিশ কাপড়, লবণ,
চিনি প্রভৃতি পণ্য এবং ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত
প্রতিষ্ঠান বর্জন করা।[en.banglapedia][egyankosh.ac]
- জাতীয় শিক্ষা: সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বদলে স্বদেশি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।[modeldiplomat]
- গ্রামীণ শিল্পের পুনরুজ্জীবন: হাতে বোনা কাপড়, কুটির
শিল্প ও স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়া।[modeldiplomat]
এই আন্দোলনে
রাখি বন্ধন, অরন্ধন, জাতীয় সমাবেশ ও ছাত্র সমাবেশের মতো প্রতীকী
ও গণসম্মুখ কর্মসূচিও ব্যবহৃত হয়।[en.banglapedia]
নেতৃত্ব ও
অংশগ্রহণ
আন্দোলনের
শুরুতে কংগ্রেসের মধ্যপন্থী নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, কিন্তু ধীরে
ধীরে বিপিনচন্দ্র পাল, বালগঙ্গাধর তিলক ও লালা লাজপত রায়ের মতো চরমপন্থী
নেতৃত্ব প্রাধান্য পায়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল শুধু বঙ্গভঙ্গ রদ নয়, বরং স্বরাজ
বা স্বশাসন।[britannica][en.banglapedia]
ছাত্র,
শিক্ষক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত এই
আন্দোলনে বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন। বয়কট আন্দোলনের ফলে ১৯০৬ সালের সেপ্টেম্বরে
কলকাতায় ম্যানচেস্টারের কাপড়ের বিক্রি কমে যায়—যা আন্দোলনের প্রাথমিক সাফল্যের
প্রমাণ।[en.banglapedia][deshbandhucollege.ac]
মুসলিমদের
অবস্থান
স্বদেশী
আন্দোলন মূলত কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির নেতৃত্বে পরিচালিত
হয়। পূর্ববঙ্গের অনেক মুসলমান বঙ্গভঙ্গকে নিজেদের শিক্ষা, চাকরি ও
রাজনৈতিক সুযোগের সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন; তাই তারা
আন্দোলনে যুক্ত হননি।[bn.banglapedia][songramernotebook]
নবাব
সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে এবং ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ
প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে স্বদেশী আন্দোলন যে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সম্ভাবনা নিয়ে শুরু
হয়েছিল, তা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশের কারণে দুর্বল হয়ে
পড়ে।[bn.banglapedia][songramernotebook][mail.gacbe.ac]
ফলাফল
ব্রিটিশ
সরকার গ্রেপ্তার, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে আন্দোলনকে
দমানোর চেষ্টা করে। ১৯০৮ সালের মধ্যে আন্দোলনের প্রাথমিক তেজ কমে আসে।[en.banglapedia][history.org]
১৯১১ সালের
১২ ডিসেম্বর দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেওয়া হয় এবং রাজধানী কলকাতা
থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদের সঙ্গে বিহার-উড়িষ্যাকে
আলাদা করা হয়, ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের অর্জন ছিল আংশিক।[modeldiplomat]
আন্দোলনের
দীর্ঘমেয়াদি ফল ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ:
- ভারতীয় জাতীয়তাবাদ মধ্যবিত্ত থেকে বৃহত্তর
গণআন্দোলনের দিকে এগোয়।[history.org]
- বয়কট ও অহিংস প্রতিরোধের কৌশল পরবর্তী গান্ধীয়
আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করে।[history.org]
- স্বরাজ বা স্বশাসনের দাবি ভারতীয় রাজনীতির প্রধান
লক্ষ্যে পরিণত হয়।[en.banglapedia]
- একই সঙ্গে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন গভীর হয় এবং
মুসলিম লীগের উত্থানের পটভূমি তৈরি হয়।[bn.banglapedia][songramernotebook]
সংক্ষেপে,
স্বদেশী আন্দোলন ছিল বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সৃষ্ট একটি জাতীয়তাবাদী
গণআন্দোলন, যা ব্রিটিশ পণ্য বর্জন ও দেশি শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে
স্বরাজের দাবি তুলে ধরে। এটি ব্রিটিশবিরোধী চেতনাকে শক্তিশালী করলেও হিন্দু-মুসলিম
সম্পর্কে বিভাজনের প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত করে।[britannica][en.banglapedia][songramernotebook]
স্বদেশী
আন্দোলন (১৯০৫-১৯১১)
গঠন: পটভূমি,
পদ্ধতি ও কর্মসূচি, রাজনৈতিক ধারা, সামাজিক
ভিত্তি ও সীমা, মুসলিম প্রতিক্রিয়া, পরিণতি,
ঐতিহাসিক বিতর্ক। তারিখের জন্য কিছু পরীক্ষা-প্রস্তুতির সাইটও দেখেছি,
যেগুলো সুমিত সরকার ও বাংলাপিডিয়ার মতো সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছি।
যেখানে স্মৃতি থেকে বলেছি, সেখানে তা জানিয়ে দিয়েছি।
১. পরিচয়
স্বদেশী
আন্দোলন বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া একটি বহুমুখী গণজাগরণ। বাংলার এই
আন্দোলন (১৯০৫-১৯০৮) "স্বদেশী" ও "বয়কট" পদ্ধতির কার্যকর
ব্যবহারকে ঘিরে সংগঠিত হয়েছিল, চরমপন্থী নেতৃত্বে। ১৯১১ সালে বাংলার পুনর্মিলন একে
আন্দোলনের সাফল্যের চিহ্ন হিসেবে ধরা হয়।
২. পটভূমি:
বঙ্গভঙ্গ
- বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব প্রথম ওঠে ১৯০৩ সালের
ডিসেম্বরে এবং কার্জন ১৯০৪ সালে পূর্ববঙ্গের মুসলিম-প্রধান জেলাগুলো সফর করে
সমর্থন সংগ্রহের চেষ্টা করেন।
- কার্জন ১৯০৫-এর ১৬ জুলাই ঘোষণা দেন; পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ব বাংলায় মুসলিম এবং
পশ্চিমে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়। কার্যকর হয় ১৬ অক্টোবর ১৯০৫,
নতুন প্রদেশ "পূর্ববঙ্গ ও আসাম" (রাজধানী
ঢাকা)।
- সরকারি যুক্তি ছিল প্রশাসনিক দক্ষতা: বিশাল প্রদেশ
একজনের পক্ষে সামলানো কঠিন। জাতীয়তাবাদীদের অভিযোগ ছিল ভিন্ন। তাঁদের সন্দেহ
ছিল কার্জনের স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। সন্দেহের ভিত্তি ছিল
বাংলাভাষীদের সংখ্যালঘু করে দেওয়া এবং কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক শক্তি ভাঙা।
এই উদ্দেশ্য-বিতর্ক নিয়ে ঐতিহাসিক সাহিত্য আছে, যার
কিছু সুমিত সরকারের বইয়ের গ্রন্থপঞ্জিতে (মন্ট্রোজ, ওয়াস্তি, ম্যাকলেন
প্রমুখ) উল্লেখিত।
৩.
আন্দোলনের পর্যায়
ক.
আবেদন-নিবেদন থেকে বয়কট। শুরুতে
নরমপন্থীরা আবেদন, সভা ও পিটিশনে ভরসা করেন। এসব বিশেষ কাজ না করায়
১৯০৫-এর ১৭ জুলাই কলকাতার এক সভায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রিটিশ পণ্য ও
প্রতিষ্ঠান বর্জনের ডাক দেন। জুলাইয়ে কৃষ্ণকুমার মিত্রের
সঞ্জীবনী পত্রিকাতেও
বয়কটের প্রস্তাব আসে। ১৯০৫-এর ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলের বিশাল সভায়
আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ পণ্য বয়কটের ঘোষণা হয়।
খ. ১৬
অক্টোবর ১৯০৫। দিনটি
শোক-দিবস হিসেবে পালিত হয়; রাখিবন্ধন ও উপবাস ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে রাখী-মিছিল হয় (এবং, স্মৃতি থেকে,
"আমার সোনার বাংলা" সহ অনেক স্বদেশী গান এ সময়ে লেখা হয়)।
গ. চারটি
ধারা। সুমিত সরকার আন্দোলনের ভেতরে একাধিক প্রবণতা
চিহ্নিত করেছেন। একটি সারসংক্ষেপে আছে, সেগুলোর মধ্যে নরমপন্থী ধারা, গঠনমূলক
স্বদেশী এবং রাজনৈতিক চরমপন্থা (আর স্মৃতি থেকে চতুর্থটি বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ)।
- গঠনমূলক স্বদেশী বা "আত্মশক্তি": দৈনন্দিন প্রয়োজনের পণ্য উৎপাদন, জাতীয় শিক্ষা, সালিশি
আদালত ও গ্রামসংগঠন। উদাহরণ: প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যাল (১৯০১),
১৯০৬-এর আগস্টে চালু হওয়া বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলস।
বরিশালে অশ্বিনীকুমার দত্তের স্বদেশ বান্ধব সমিতি সালিশি ব্যবস্থা চালায়।
- জাতীয় শিক্ষা: কারলাইল সার্কুলারে আন্দোলনকারী ছাত্রদের শাস্তির
হুমকি এলে ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ও বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ গঠিত হয়,
অরবিন্দ ঘোষ প্রথম অধ্যক্ষ। সতীশচন্দ্র
মুখোপাধ্যায়ের ডন সোসাইটিও প্রভাবশালী ছিল।
- চরমপন্থা: বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ
ঘোষ, তিলক, লালা লাজপত রাই।
লক্ষ্য ছিল নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ ও স্বরাজ।
- বিপ্লবী গোষ্ঠী: অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর।
এখানেই খুদিরামের মতো তরুণরা আসেন (স্মৃতি থেকে)।
৪.
কংগ্রেসের ভেতরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
- ১৯০৫-এর বেনারস অধিবেশনে (সভাপতি গোখলে) কংগ্রেস
বঙ্গভঙ্গ-বিরোধিতা ও স্বদেশী সমর্থন করে। ১৯০৬-এর কলকাতা অধিবেশনে (সভাপতি
দাদাভাই নওরোজি) স্বরাজ লক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয়। সঙ্গে ছিল স্বদেশী, বয়কট ও জাতীয় শিক্ষা, যা
কংগ্রেসের কর্মসূচি করার দাবি চরমপন্থীরা তোলেন।
- নরমপন্থী ও চরমপন্থীর বিরোধ চরমে পৌঁছায় ১৯০৭-এর
সুরাট অধিবেশনে। সুরাট বিভাজন কংগ্রেসকে নরমপন্থী ও চরমপন্থীতে ভাগ করে।
নরমপন্থীরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, চরমপন্থীদের
বহিষ্কার করা হয়, এবং কংগ্রেস প্রায় এক দশক দুর্বল থাকে।
- সরকারি দমনের মুখে ১৯০৮ নাগাদ আন্দোলনের প্রকাশ্য
পর্ব প্রায় শেষ হয়ে যায়। সরকার কঠোর সার্কুলার, গ্রেপ্তার
ও নির্বাসনের পথে যায় (স্মৃতি থেকে), আলিপুর
বোমা মামলা (১৯০৮) এর অংশ।
৫. সামাজিক
ভিত্তি ও সীমাবদ্ধতা
- বাংলাপিডিয়ার সারাংশে বলা হয়েছে, আন্দোলনের ইতিহাস "বুর্জোয়া আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন
কিন্তু প্রকৃত বুর্জোয়া সমর্থনহীন" বুদ্ধিজীবী-আন্দোলনের সীমা স্পষ্ট
করে। মূল শক্তি ছিল শহুরে ভদ্রলোক শ্রেণি, ছাত্র
ও পেশাজীবী।
- জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনায় প্রায়ই পুনরুজ্জীবনবাদী
উপাদান ছিল, আর বয়কট কার্যকর করতে ঐতিহ্যগত জাতিগত
শাস্তি-প্রথার সাহায্য নেওয়া হতো। চাকরির সম্ভাবনা কম থাকায় জাতীয় শিক্ষা
অধিকাংশ ছাত্রকে টানতে পারেনি, তবে বেঙ্গল
ন্যাশনাল কলেজ ও বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান টিকে
থাকে।
- সুমিত সরকারের বইয়ে (সূচিপত্র অনুযায়ী) শ্রমিক
অসন্তোষ ও ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়ও আলাদা অধ্যায়ে আছে। অর্থাৎ আন্দোলনের
আওতায় শ্রমিক-সক্রিয়তাও ছিল, তবে তা সীমিত।
- অর্থনৈতিক প্রভাব: ১৯০৫-০৮ সময়ে বিদেশি আমদানি
উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। স্বদেশী শিল্প (সাবান, কাপড়,
কেমিক্যাল, জাহাজ)
টিকে থাকে কম, কারণ পুঁজি ও কারিগরি দুর্বলতা ছিল (স্মৃতি থেকে)।
৬. মুসলিম
প্রতিক্রিয়া ও পূর্ববঙ্গ
আপনার আগের
প্রশ্নগুলোর সঙ্গে এখানেই যোগসূত্র।
- সমর্থন ও সংগঠন। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ বঙ্গভঙ্গের সমর্থক ছিলেন।
বাংলাপিডিয়ার ভাষ্যে তিনি ছিলেন বঙ্গভঙ্গের সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থক। ১৯০৫-এর ১৬
অক্টোবর সলিমুল্লাহ পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়নের জন্ম
হয়, আর ১৯০৬-এর ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় মুসলিম লীগ
প্রতিষ্ঠিত হয়। নবাবের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য ছিল বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য হিন্দু
আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। কিছু সূত্র বলে, ব্রিটিশরা এই মুসলিম অভিজাতদের সমর্থন উৎসাহিত
করেছিল। বিষয়টি প্রমাণ-নির্ভর আলোচনার দাবি রাখে।
- কিন্তু এক-রঙা চিত্র ভুল। একটি সাম্প্রতিক আলোচনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে,
সব হিন্দুর বিরোধিতা আর সব মুসলমানের সমর্থন,
এমন বর্ণনা অশুদ্ধ। সলিমুল্লাহর সৎভাই খাজা
আতিকুল্লাহ ১৯০৬-এর কলকাতা কংগ্রেসে বঙ্গভঙ্গ নিন্দার প্রস্তাব আনেন। কিছু
মুসলমান নেতা বাঙালি ঐক্য ও পূর্ববঙ্গের স্বার্থ হ্রাসের আশঙ্কা থেকেও
বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে ধারা-সমর্থকদের একটি যুক্তি ছিল, নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গের উন্নয়নের সুযোগ। আগের
আলোচনা অনুযায়ী, কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষা ও চাকরি-ব্যবস্থায়
পূর্ববঙ্গ ছিল পিছিয়ে।
- আন্দোলনের নিজস্ব সীমা। বাংলাপিডিয়ার মূল্যায়ন: স্বদেশী আন্দোলন
পরোক্ষভাবে সাধারণ মুসলিম জনগণকে জাতীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। এর
ধর্মীয় প্রতীক ও ভাষা (কালীপূজা, বন্দেমাতরম,
শিবাজী উৎসবের ধরনের প্রচলন, স্মৃতি থেকে) অনেক মুসলমানের কাছে অন্তর্ভুক্তিমূলক
মনে হয়নি। বয়কটের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ক্রেতারাও ছিলেন
(স্মৃতি থেকে)। ১৯০৬-০৭-এ পূর্ববঙ্গের কয়েকটি জেলায় (ময়মনসিংহ, কুমিল্লা অঞ্চল) সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনা ঘটে
(স্মৃতি থেকে)।
৭. পরিণতি
- বঙ্গভঙ্গ রদ। ১৯১১-র ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ বাতিল হয় এবং রাজধানী
দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। ঢাকা প্রশাসনিক মর্যাদা হারায়, ফলে ক্ষতিপূরণ-দাবির সূত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
আন্দোলন, প্রথম প্রশ্নের পটভূমি।
- সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাঠামো। পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী (মর্লি-মিন্টো সংস্কার ১৯০৯,
স্মৃতি থেকে) ও মুসলিম লীগের উত্থানের সূচনা। দীর্ঘ
রেখা টানলে ১৯৩২-এর সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ, ১৯৩৭-পরবর্তী
ভদ্রলোক রাজনীতি এবং ১৯৪৭-এর বঙ্গবিভাগের আলোচনার সঙ্গে সংযোগ আসে, যদিও সরাসরি কার্যকারণ টানার ব্যাপারে সতর্কতা
দরকার।
- পরবর্তী আন্দোলনের "টেমপ্লেট"। একটি মডেল-উত্তরে বলা হয়েছে, স্বদেশী আন্দোলন জাতীয়তাবাদকে আবেদন থেকে
অংশগ্রহণে নিয়ে যায়, এবং বয়কট, দেশীয়
ভাষার রাজনীতি, নারী-সংহতি ও গঠনমূলক কাজ চালু করে। গান্ধীর অসহযোগ
ও আইন অমান্য আন্দোলন এর অনেক পদ্ধতি নিয়েছে।
৮. ঐতিহাসিক
মূল্যায়ন
- জাতীয়তাবাদী ভাষ্য (যেমন
রমেশচন্দ্র মজুমদার) একে ভারতীয় জাগরণ ও স্বাধীনতা-সংগ্রামের মোড়-বিন্দু
বলে দেখে।
- সুমিত সরকার আন্দোলনের ভেতরের বিভাজন, শ্রেণিস্বার্থ
ও সীমাবদ্ধতা খুঁটিয়ে দেখান। তাঁর বইয়ের একটি মূল প্রশ্ন, ১৯০৫-এর পর ১৯০৮ কেন আসে, অর্থাৎ
প্রকাশ্য গণসংগ্রামের কৌশল কেন থেমে যায়। তাঁর উত্তরে দমন, নেতৃত্বের বিভাজন, সীমিত
সামাজিক ভিত্তি ও কৃষকদের অসংযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ (স্মৃতি থেকে)।
- মুসলিম ও আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চা (যেমন সুফিয়া আহমেদ) পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের
শিক্ষাগত-অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে বঙ্গভঙ্গের সমর্থনকে দেখে, এবং ভদ্রলোক আন্দোলনকে প্রধানত
শ্রেণি-স্বার্থসংরক্ষণের ধারায় পড়ে। বিপরীতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাষ্যে
এটি ব্রিটিশ "বিভাজন নীতি"-র প্রতিরোধ। দুই ভাষ্যেই আংশিক সত্য আছে,
যা আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তরেও দেখা গিয়েছিল।
আমার
সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন (এটি আমার পাঠ): স্বদেশী
আন্দোলন একই সঙ্গে সফল ও সীমিত। সফল, কারণ এটি নতুন রাজনৈতিক পদ্ধতি, সাংস্কৃতিক
আত্মপরিচয় ও বঙ্গভঙ্গ রদ এনেছে। সীমিত, কারণ এর
সামাজিক ভিত্তি ছিল সংকীর্ণ এবং ধর্মীয় প্রতীক-নির্ভর রাজনীতি বহুধর্মের বাংলাকে
সমানভাবে ধারণ করতে পারেনি। এই ব্যর্থতাই পরবর্তী দশকগুলোর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির
একটি পটভূমি।
পড়ার
সূত্র: সুমিত সরকার, The Swadeshi
Movement in Bengal 1903-1908; সুফিয়া আহমেদ, Muslim Community in Bengal
1884-1912; বাংলাপিডিয়ার "স্বদেশী আন্দোলন" ও
"মুসলিম লীগ" ভুক্তি; জে. এইচ. ব্রুমফিল্ড, Elite Conflict in a
Plural Society।
স্বদেশী আন্দোলন ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুতে
ব্রিটিশ ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম বৃহৎ ও সফল গণ-অভ্যুত্থান। এর সূচনা
হয়েছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে, যা পরবর্তীতে ব্রিটিশ পণ্য বর্জন, স্বদেশি শিল্প প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় শিক্ষার
বিস্তারের মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত আন্দোলনে রূপ নেয়।
### 🏛️
পটভূমি ও কারণ:
বঙ্গভঙ্গের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি
স্বদেশী আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল লর্ড
কার্জনের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ। সরকারিভাবে এটিকে প্রশাসনিক সুবিধার কথা বলা হলেও
এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক। তৎকালীন বাংলায় জাতীয় চেতনার যে জাগরণ ঘটছিল,
তাকে দুর্বল করাই ছিল মূল
লক্ষ্য। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ব্রিটিশরা পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের পশ্চিমবঙ্গের
হিন্দুদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি প্রয়োগ করতে
চেয়েছিল।
### 📜
ঘটনাপ্রবাহ: বর্জন থেকে
স্বদেশী পর্যন্ত
বঙ্গভঙ্গের ঘোষণার পর প্রথমে নরমপন্থী নেতৃত্ব
সভা-সমাবেশ, স্মারকলিপি ও
প্রতিবাদী বিবৃতির মাধ্যমে এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু এই পদ্ধতির ব্যর্থতা স্পষ্ট
হলে আন্দোলনের কৌশল বদলে যায়।
- **বর্জন ও স্বদেশী:** ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার
টাউন হলে বিশাল জনসভায় ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই বর্জনই
স্বদেশী আন্দোলনের মূল হাতিয়ার হয়ে ওঠে, কারণ বিলাতি পণ্য বর্জন ছাড়া স্বদেশী শিল্পের বিকাশ সম্ভব ছিল না।
- **গঠনমূলক কর্মসূচি:** আন্দোলনের অন্যতম ধারা ছিল
‘গঠনমূলক স্বদেশী’। এর মাধ্যমে স্বদেশি শিল্পকারখানা স্থাপন, জাতীয় স্কুল ও গ্রাম উন্নয়ন সংগঠন গড়ে তোলার
প্রচেষ্টা চালানো হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, নীলরতন সরকার
প্রমুখ এই ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন。
- **ছাত্রসমাজের সম্পৃক্ততা:** আন্দোলনে
স্কুল-কলেজের ছাত্ররা ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়। ১৯০৬-১৯০৯ সালের মধ্যে পূর্ববঙ্গ ও
আসামে বর্জন ও পিকেটিংয়ের ৫৫৭টি মামলার প্রায় ৭৫ শতাংশেই ছাত্র ও শিক্ষক জড়িত
ছিলেন।
### ⚠️
সরকারি দমন ও আন্দোলনের
রূপান্তর
ব্রিটিশ সরকার আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেয়।
ছাত্রদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ বন্ধ করতে স্কুল-কলেজের অনুদান ও অনুমোদন প্রত্যাহারের
হুমকি দেওয়া হয়। এই দমন-পীড়নের ফলে আন্দোলনের একটি অংশ ক্রমশ চরমপন্থী পথে মোড়
নেয় এবং গুপ্ত সমিতির মাধ্যমে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ঝুঁকে পড়ে。
### 💎
গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক
তাৎপর্য
স্বদেশী আন্দোলন গান্ধী-পূর্ব আন্দোলনগুলোর
মধ্যে সবচেয়ে সফল হিসেবে বিবেচিত হয়। এর প্রধান অবদানগুলো হলো:
- **জাতীয়তাবাদের নতুন ভাষা:** এটি ‘ভারতমাতা’
ধারণার মতো সাংস্কৃতিক প্রতীক তৈরি করে এবং জাতীয়তাবাদকে একটি আবেগপূর্ণ ও
গণভিত্তিক রূপ দেয়।
- **বর্জনের রাজনৈতিক হাতিয়ার:** বিদেশি পণ্য
বর্জনকে রাজনৈতিক প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে,
যা পরবর্তীতে গান্ধীজি
আরও বিস্তৃত পরিসরে ব্যবহার করেন।
- **আত্মনির্ভরতার ধারণা:** ‘স্বদেশী’ বা
আত্মনির্ভরশীলতার ধারণা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় দিক থেকেই জাতীয় আত্মবিশ্বাস
গড়ে তোলে।
সামগ্রিকভাবে, স্বদেশী আন্দোলন বঙ্গভঙ্গ রদের দাবি虽是
সফল না হলেও, এটি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিধারা
চিরতরে বদলে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে গণ-প্রতিরোধ সম্ভব
এবং এই আন্দোলনের চেতনাই পরবর্তী প্রজন্মের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পথ দেখায়।
স্বদেশী
আন্দোলন (Swadeshi Movement), ১৯০৩–১৯১১: পটভূমি, কর্মসূচি,
নেতৃত্ব, হিন্দু-মুসলিম প্রতিক্রিয়া ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১. ভূমিকা
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী
আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের
সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বাংলায় এই আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে।
‘স্বদেশী’
শব্দের অর্থ নিজের দেশ বা স্বদেশের তৈরি পণ্য ব্যবহার করা। এই আন্দোলনের মূল
বক্তব্য ছিল বিদেশি, বিশেষত ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করা এবং দেশীয় পণ্য, শিল্প,
শিক্ষা ও অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো।
তবে স্বদেশী
আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক আন্দোলন ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল রাজনৈতিক
আত্মনির্ভরতা, জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের
বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ।
বাংলার
স্বদেশী আন্দোলনের সময়কাল সাধারণত ১৯০৫–১৯০৮ ধরা হয়। তবে বঙ্গভঙ্গবিরোধী রাজনৈতিক
আন্দোলন ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
Deshbandhu
College+1
২. স্বদেশী
আন্দোলনের পটভূমি
ক.
ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণ
ব্রিটিশ
শাসনামলে ভারতীয় অর্থনীতি ক্রমশ ব্রিটিশ শিল্পপুঁজির অধীনস্থ হয়ে পড়ে।
ব্রিটিশরা
ভারতকে প্রধানত কাঁচামালের উৎস এবং ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের বাজার হিসেবে ব্যবহার করত।
এর ফলে:
- ভারতীয় কুটিরশিল্প ও তাঁতশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- দেশীয় শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
- ভারতীয় বাজার ব্রিটিশ পণ্যে ভরে যায়।
- দেশীয় উৎপাদকরা বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়
সমস্যায় পড়ে।
দাদাভাই
নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত ও মহাদেব গোবিন্দ রানাডের মতো
অর্থনীতিবিদ ও চিন্তাবিদ ব্রিটিশ অর্থনৈতিক শোষণের সমালোচনা করেন।
তাঁরা দেখান,
ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক কাঠামো ভারতের দারিদ্র্য ও শিল্পের পশ্চাৎপদতার অন্যতম
কারণ।
স্বদেশী
আন্দোলন এই অর্থনৈতিক সমালোচনাকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করে।
Deshbandhu
College+1
খ. বঙ্গভঙ্গ
(১৯০৫)
স্বদেশী
আন্দোলনের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত।
১৯০৫ সালের
১৯ জুলাই ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা দেয়। ১৬ অক্টোবর থেকে তা কার্যকর হয়।
এর ফলে
বাংলা প্রদেশকে ভাগ করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। ঢাকাকে
নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের
সঙ্গে বিহার ও উড়িষ্যা যুক্ত ছিল।
ব্রিটিশ
সরকারের প্রকাশ্য যুক্তি ছিল, বিশাল বাংলা প্রদেশকে প্রশাসনিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন।
কিন্তু জাতীয়তাবাদী নেতারা মনে করেছিলেন, বঙ্গভঙ্গের
প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল:
1. বাংলার
ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা।
2. বাংলাভাষী
জনগোষ্ঠীকে প্রশাসনিকভাবে বিভক্ত করা।
3. হিন্দু ও
মুসলমানের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি করা।
4. কলকাতাকেন্দ্রিক
শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণির রাজনৈতিক প্রভাব কমানো।
5. ব্রিটিশবিরোধী
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল করা।
ঐতিহাসিক
গবেষণায় প্রশাসনিক যুক্তির পাশাপাশি এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলোরও গুরুত্ব তুলে ধরা
হয়েছে।
Deshbandhu
College+1
গ.
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকে স্বদেশী আন্দোলন
বঙ্গভঙ্গের
প্রস্তাব প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সভা, সমাবেশ,
সংবাদপত্র ও আবেদনপত্রের মাধ্যমে প্রতিবাদ শুরু হয়।
১৯০৩ সাল
থেকেই বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে।
কিন্তু ১৯০৫
সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার পর প্রতিবাদ আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে।
১৯০৫ সালের
৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিদেশি পণ্য বর্জনের প্রস্তাব গৃহীত
হয়। এটিকে স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
Outlines of
Indian history+1
৩. স্বদেশী
আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচি
Indian
History | Partition of Bengal and Swadeshi Movement | বঙ্গভঙ্গ ও
স্বদেশী আন্দোলন
112
Years Ago, Raksha Bandhan Stood for Hindu-Muslim Unity | NewsClick
8
স্বদেশী
আন্দোলনের কর্মসূচি শুধু বিদেশি পণ্য বর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর বিভিন্ন
রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ছিল।
ক. বিদেশি
পণ্য বর্জন (Boycott of Foreign Goods)
এটি ছিল
আন্দোলনের সবচেয়ে জনপ্রিয় কর্মসূচি।
এর আওতায়:
- ব্রিটিশ কাপড় বর্জন করা হয়।
- বিদেশি লবণ ও চিনি বর্জনের প্রচার করা হয়।
- বিদেশি পণ্যের দোকানের সামনে পিকেটিং করা হয়।
- বিদেশি কাপড় প্রকাশ্যে পোড়ানো হয়।
- দেশীয় পণ্য ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করা হয়।
বিশেষ করে
ম্যানচেস্টারের তৈরি কাপড় বর্জন আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
এর মাধ্যমে
ব্রিটিশ শিল্পপুঁজির অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত হানার চেষ্টা করা হয়েছিল।
Deshbandhu
College+1
খ. স্বদেশী
শিল্পের বিকাশ
বিদেশি পণ্য
বর্জনের পাশাপাশি দেশীয় শিল্প ও বাণিজ্য বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
স্বদেশী
আন্দোলনকারীরা দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা
কোম্পানি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
উল্লেখযোগ্য
উদাহরণ:
|
প্রতিষ্ঠান |
গুরুত্ব |
|
Bengal
Chemicals |
প্রফুল্লচন্দ্র
রায়ের প্রতিষ্ঠিত দেশীয় রাসায়নিক শিল্প; প্রতিষ্ঠার
সূচনা ১৮৯৩ সালে |
|
Swadeshi
Bhandar |
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের উদ্যোগে ১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত স্বদেশী পণ্যের উদ্যোগ |
|
National
Insurance Company |
দেশীয়
বিমা ব্যবসার বিকাশ, ১৯০৬ |
|
Bengal
National Bank |
দেশীয়
ব্যাংকিং উদ্যোগ, ১৯০৮ |
|
Mohini Mills,
Kushtia |
দেশীয়
বস্ত্রশিল্পের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ |
|
Bengal Steam
Navigation Company |
মুসলিম
ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে দেশীয় নৌপরিবহন উদ্যোগ |
এখানে
লক্ষণীয়, কিছু প্রতিষ্ঠান স্বদেশী আন্দোলনের আগেই প্রতিষ্ঠিত
হয়েছিল। আন্দোলন এগুলোর বিকাশ ও জনপ্রিয়তাকে নতুন গতি দেয়।
Deshbandhu
College+2
গ. জাতীয়
শিক্ষা আন্দোলন (National Education Movement)
স্বদেশী
আন্দোলনের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী অবদান ছিল জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন।
আন্দোলনকারীরা
মনে করতেন, ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয়দের মধ্যে
ঔপনিবেশিক মানসিকতা সৃষ্টি করছে।
তাই তাঁরা
একটি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন, যেখানে:
- মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ থাকবে।
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শিক্ষা দেওয়া হবে।
- জাতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দেশীয় নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
১৯০৬ সালে
কলকাতায় National Council of Education প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর অধীনে Bengal
National College and School প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ
ছিলেন।
একই
আন্দোলনের ধারায় Bengal Technical Institute প্রতিষ্ঠিত
হয়। পরবর্তী সময়ে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উত্তরাধিকার জাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের
বিকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়।
Deshbandhu
College+2
এই জাতীয়
শিক্ষা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো, ঔপনিবেশিক
শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দেশীয় উদ্যোগে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিশিক্ষার
প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা।
ঘ. স্বদেশী
সমিতি (Swadeshi Samitis)
আন্দোলন
পরিচালনা ও জনগণকে সংগঠিত করার জন্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে ওঠে।
এগুলোকে
স্বদেশী সমিতি বলা হতো।
এদের
কার্যক্রমের মধ্যে ছিল:
- গ্রামে গ্রামে সভা করা।
- স্বদেশী পণ্যের প্রচার করা।
- দেশীয় পণ্যের দোকান স্থাপন।
- বন্যা, দুর্ভিক্ষ ও
মহামারির সময় সামাজিক কাজ করা।
- দেশীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
- জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি।
বরিশালে
অশ্বিনীকুমার দত্তের প্রতিষ্ঠিত স্বদেশ বান্ধব সমিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি
সামাজিক কাজ ও স্থানীয় সংগঠনের মাধ্যমে স্বদেশী আন্দোলনের শক্তিশালী জনভিত্তি
তৈরির চেষ্টা করেন।
Deshbandhu
College+1
ঙ.
নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ (Passive Resistance)
স্বদেশী
আন্দোলনের একটি উগ্রপন্থী অংশ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের
কর্মসূচি গ্রহণ করে।
এর আওতায়
শুধু বিদেশি পণ্য নয়, ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রম বর্জনের
আহ্বান জানানো হয়।
যেমন:
- সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্জন।
- সরকারি আদালত বর্জন।
- সরকারি চাকরি বর্জন।
- সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে অসহযোগিতা।
- বিকল্প সালিশি ব্যবস্থা ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে
তোলা।
বিপিনচন্দ্র
পাল ও শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ এই রাজনৈতিক ধারার গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা ছিলেন।
Deshbandhu
College+1
চ. বিপ্লবী
জাতীয়তাবাদ
স্বদেশী
আন্দোলনের সময় বাংলায় বিপ্লবী গোপন সংগঠনের বিকাশ ঘটে।
অনেক তরুণ
মনে করতে থাকেন যে, শুধু আবেদন, সভা ও বয়কটের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান
সম্ভব নয়।
এই
পরিস্থিতিতে অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর গোষ্ঠীর মতো সংগঠন সক্রিয় হয়।
এই ধারার
সঙ্গে যুক্ত ছিলেন:
- অরবিন্দ ঘোষ।
- বারীন্দ্রকুমার ঘোষ।
- হেমচন্দ্র কানুনগো।
- ক্ষুদিরাম বসু।
- প্রফুল্ল চাকী।
তাঁরা
ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণসহ সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা
করেন।
১৯০৮ সালে
ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীর মুজফ্ফরপুরে কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে বোমা
নিক্ষেপের ঘটনা বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মনে
রাখতে হবে, সশস্ত্র বিপ্লবী কার্যক্রম ছিল স্বদেশী আন্দোলনের একটি
বিশেষ ধারা; পুরো স্বদেশী আন্দোলনকে সশস্ত্র আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা
করা সঠিক নয়।
Deshbandhu
College+1
৪. স্বদেশী
আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্ব
আন্দোলনের
নেতৃত্বে মধ্যপন্থী, চরমপন্থী ও গঠনমূলক স্বদেশী ধারার বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব
ছিলেন।
|
নেতা |
প্রধান
অবদান |
|
সুরেন্দ্রনাথ
বন্দ্যোপাধ্যায় |
বঙ্গভঙ্গবিরোধী
রাজনৈতিক প্রচারণা, সভা ও আবেদনপত্র |
|
বিপিনচন্দ্র
পাল |
বয়কট,
নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ ও জাতীয়তাবাদ |
|
শ্রীঅরবিন্দ
ঘোষ |
বিপ্লবী
জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় শিক্ষা |
|
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর |
সাংস্কৃতিক
ঐক্য, রাখিবন্ধন ও স্বদেশী গান |
|
অশ্বিনীকুমার
দত্ত |
বরিশালে
স্বদেশী সমিতি ও গ্রামীণ সংগঠন |
|
বাল
গঙ্গাধর তিলক |
আন্দোলনকে
মহারাষ্ট্রসহ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া |
|
লালা
লাজপত রায় |
পাঞ্জাবে
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রসার |
Deshbandhu
College+2
এখানে
মধ্যপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য ছিল।
মধ্যপন্থীরা আবেদন, সংবাদপত্র, সভা-সমিতি ও
সাংবিধানিক প্রতিবাদের মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গ রদের দাবি জানাতেন।
চরমপন্থীরা বয়কট, নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ, জাতীয়
শিক্ষা এবং প্রয়োজনে বিপ্লবী সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন।
এই
মতপার্থক্য পরবর্তী সময়ে ১৯০৭ সালের সুরাট অধিবেশনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের
বিভাজনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
Deshbandhu
College+1
৫. স্বদেশী
আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা
Rabindranath
Tagore | History photos, Rare photos, Funny art history
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর
স্বদেশী
আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল প্রধানত সাংস্কৃতিক ও মানবতাবাদী। তিনি
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বাঙালির ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
১৯০৫ সালের
১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে
রাখিবন্ধন কর্মসূচির আহ্বান জানান।
এই
কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীকী সম্পর্ক
প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
তিনি
স্বদেশী গান রচনা করেন। তাঁর ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’
গানটি বঙ্গভঙ্গবিরোধী ঐক্যের ভাবনা প্রকাশ করে।
পরবর্তীকালে
তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়।
তবে
রবীন্দ্রনাথ স্বদেশী আন্দোলনের নামে জবরদস্তি, অন্ধ
জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করেন।
১৯১৬ সালে
প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ঘরে বাইরে উপন্যাসে স্বদেশী আন্দোলনের আবেগ, নৈতিক সংকট,
রাজনৈতিক জবরদস্তি ও জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে।
Deshbandhu
College+1
৬. স্বদেশী
আন্দোলনে মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া ও অংশগ্রহণ
স্বদেশী
আন্দোলনের ইতিহাসে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
এখানে দুটি
বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন: বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা এবং স্বদেশী আন্দোলনের
কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ।
ক.
বঙ্গভঙ্গের পক্ষে মুসলমানদের একটি অংশ
পূর্ববঙ্গের
মুসলমানদের একটি অংশ বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল।
এর পেছনে
কয়েকটি কারণ ছিল:
1. ঢাকাকে
রাজধানী করে পূর্ববঙ্গে নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র গঠনের সম্ভাবনা।
2. মুসলমানদের
জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ বৃদ্ধির আশা।
3. কলকাতাকেন্দ্রিক
হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত প্রভাব থেকে পূর্ববঙ্গের
কিছুটা স্বাতন্ত্র্য অর্জনের প্রত্যাশা।
4. পূর্ববঙ্গের
মুসলমানদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের বিকাশের সম্ভাবনা।
ঢাকার নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বঙ্গভঙ্গের
একজন উল্লেখযোগ্য সমর্থক ছিলেন।
তবে সমস্ত
মুসলমান বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করেছিলেন—এমন বলা সঠিক নয়। মুসলমানদের মধ্যেও বঙ্গভঙ্গ ও
স্বদেশী নিয়ে ভিন্ন মত ও রাজনৈতিক অবস্থান ছিল।
Banglapedia+1
খ.
মুসলমানদের একটি অংশের স্বদেশী আন্দোলনে অংশগ্রহণ
বঙ্গভঙ্গের
বিরোধিতা ও স্বদেশী অর্থনৈতিক কর্মসূচিকে সমর্থনকারী মুসলমানও ছিলেন।
উল্লেখযোগ্য
ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আবদুর রাসুল, আবদুল হামিদ গজনভী এবং লিয়াকত হোসেন।
১৯০৬ সালে
কলকাতার অ্যালবার্ট হলে আয়োজিত একটি National Dinner-এ প্রায় ৬০০
হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্ম ও খ্রিষ্টান অংশগ্রহণ করেছিলেন।
অর্থাৎ
স্বদেশী আন্দোলনে আন্তঃসম্প্রদায়িক সহযোগিতার উদ্যোগও ছিল।
Sumit Sarkar,
1972+1
এ ছাড়া
দেশীয় অর্থনৈতিক উদ্যোগেও মুসলিম ব্যবসায়ীদের অবদান ছিল। ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত Bengal
Steam Navigation Company তার একটি উদাহরণ।
Deshbandhu
College
গ.
আন্দোলনের হিন্দু প্রতীক ও মুসলমানদের দূরত্ব
স্বদেশী
আন্দোলনের একটি সীমাবদ্ধতা ছিল এর অনেক কর্মসূচিতে হিন্দু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক
প্রতীকের ব্যবহার।
বিশেষত:
- বন্দেমাতরম সংগীতের রাজনৈতিক ব্যবহার।
- শিবাজি উৎসব।
- কালী ও ভবানীকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী প্রতীক।
- মন্দিরে শপথ ও স্বদেশী প্রচার।
- হিন্দু ধর্মীয় আচার ও অনুষ্ঠানের সঙ্গে আন্দোলনের
সংযোগ।
এসব প্রতীক
অনেক মুসলমানের কাছে আন্দোলনটিকে হিন্দু ভদ্রলোকদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্রকল্প
বলে মনে হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
বিশেষত
পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষকদের একটি অংশ আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে
পারেনি।
Deshbandhu
College+1
ঘ. শ্রেণিগত
ও কৃষি-অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব
মুসলমানদের
একাংশের স্বদেশী আন্দোলন থেকে দূরে থাকার কারণ শুধু ধর্মীয় পরিচয় ছিল না।
পূর্ববঙ্গের
কৃষকদের বড় অংশ ছিল মুসলমান এবং জমিদার, মহাজন ও
ঋণদাতাদের একটি বড় অংশ ছিল হিন্দু।
কৃষকদের
সঙ্গে জমিদার ও মহাজনদের খাজনা, সুদ ও অতিরিক্ত আদায় নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ছিল।
১৯০৬–০৭
সালে ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা ও পাবনায় সাম্প্রদায়িক রূপ নেওয়া কয়েকটি
সংঘর্ষের পেছনে এসব কৃষি-অর্থনৈতিক সমস্যাও ভূমিকা রাখে।
কিছু
ক্ষেত্রে স্বদেশী স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা দরিদ্র মুসলমান কৃষকদের তুলনামূলক
ব্যয়বহুল দেশীয় পণ্য কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও ছিল।
ঐতিহাসিক
সুমিত সরকারের The Swadeshi Movement in Bengal, 1903–1908 এবং তাঁর Hindu-Muslim
Relations in Swadeshi Bengal প্রবন্ধে এই শ্রেণিগত ও সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের জটিলতা
বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে।
Deshbandhu
College+1
সুতরাং,
স্বদেশী আন্দোলনে মুসলমানদের সীমিত অংশগ্রহণকে শুধু ধর্মীয় বিরোধিতা দিয়ে
ব্যাখ্যা করা যাবে না। এর পেছনে জমিদারি সম্পর্ক, অর্থনৈতিক
স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও
জড়িত ছিল।
৭. স্বদেশী
আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা
স্বদেশী
আন্দোলন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।
প্রথমত,
শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা
আন্দোলনের
প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবর্ণীয় হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির
প্রতিনিধিরা।
গ্রামীণ
কৃষক ও শ্রমিকদের প্রকৃত অর্থনৈতিক সমস্যা আন্দোলনের কর্মসূচিতে যথেষ্ট গুরুত্ব
পায়নি।
দ্বিতীয়ত,
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা
দেশীয়
পণ্যের উৎপাদন পর্যাপ্ত ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় পণ্য ব্রিটিশ পণ্যের তুলনায়
বেশি ব্যয়বহুল ও নিম্নমানের ছিল।
ফলে দরিদ্র
মানুষের পক্ষে স্বদেশী পণ্য ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত,
হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দুর্বলতা
আন্দোলনের
মধ্যে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকের প্রাধান্য এবং পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক
স্বার্থের প্রশ্ন যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব
হয়নি।
চতুর্থত,
মধ্যপন্থী ও চরমপন্থীদের বিরোধ
আন্দোলনের
রাজনৈতিক পদ্ধতি নিয়ে কংগ্রেসের ভেতরে বিভক্তি সৃষ্টি হয়।
১৯০৭ সালের
সুরাট বিভাজন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করে।
পঞ্চমত,
ব্রিটিশ সরকারের দমননীতি
ব্রিটিশ
সরকার সভা-সমাবেশ, সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ
করে।
বিপ্লবী
নেতাদের গ্রেফতার ও নির্বাসন, সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন সমিতির বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ফলে ১৯০৮
সালের পর আন্দোলনের গণভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
Deshbandhu
College+1
৮. স্বদেশী
আন্দোলনের ফলাফল ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
স্বদেশী
আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ছিল ব্যাপক।
১.
জাতীয়তাবাদের বিকাশ: আন্দোলন
ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে আরও সক্রিয় ও সংগ্রামমুখী করে তোলে।
২. বঙ্গভঙ্গ
রদ: দীর্ঘ আন্দোলন, বিপ্লবী
কার্যক্রম ও জাতীয় কংগ্রেসের প্রচারণার পর ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদের
ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯১২ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়।
৩. দেশীয়
শিল্পের বিকাশ: দেশীয় শিল্প,
ব্যাংক, বিমা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশে নতুন উৎসাহ সৃষ্টি
হয়।
৪. জাতীয়
শিক্ষা আন্দোলন: বিকল্প
শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটে।
৫. রাজনৈতিক
পদ্ধতির পরিবর্তন: বয়কট,
পিকেটিং, নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ ও গণসমাবেশের মতো রাজনৈতিক
কর্মপদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
৬. বিপ্লবী
আন্দোলনের বিকাশ: বিপ্লবী
জাতীয়তাবাদ ও গোপন সংগঠনগুলোর বিস্তার ঘটে।
৭.
সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ: বাংলা
সাহিত্য, গান, নাটক, চিত্রকলা, বিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চায় নতুন প্রাণের সঞ্চার
হয়।
Banglapedia+2
বঙ্গভঙ্গ
রদের পরিণতি: একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
১৯১১ সালের
বঙ্গভঙ্গ রদ হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির কাছে রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে বিবেচিত হলেও
পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
কারণ,
নতুন প্রদেশকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা যে প্রশাসনিক, শিক্ষাগত ও
রাজনৈতিক সুযোগের প্রত্যাশা করেছিল, সেই সম্ভাবনা বিলুপ্ত হয়।
অন্যদিকে
কলকাতা ভারতের রাজধানীর মর্যাদা হারিয়ে দিল্লি নতুন রাজধানী হয়।
বঙ্গভঙ্গ
রদের ফলে মুসলমানদের একটি অংশের মধ্যে এই ধারণা শক্তিশালী হয় যে কংগ্রেসের
নেতৃত্বাধীন বঙ্গভঙ্গবিরোধী রাজনীতি তাদের স্বার্থের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করে না।
পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগের প্রতি তাদের রাজনৈতিক আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
Banglapedia+1
৯. স্বদেশী
আন্দোলনের সামগ্রিক মূল্যায়ন
স্বদেশী
আন্দোলনকে শুধু বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বোঝা যাবে না।
এটি ছিল একই
সঙ্গে:
- ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
- জাতীয় শিল্প ও অর্থনীতির বিকাশের আন্দোলন।
- জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।
- রাজনৈতিক স্বাধিকার ও আত্মনির্ভরতার আন্দোলন।
- সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ।
- বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ
পর্যায়।
তবে এর
রাজনৈতিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতাও ছিল। বিশেষত হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, গ্রামীণ
কৃষকদের অর্থনৈতিক সমস্যা এবং শ্রেণিগত বৈষম্যের প্রশ্নে আন্দোলনটি একটি সর্বজনীন
রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারেনি।
আমার মতে,
স্বদেশী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে
আবেদন-নিবেদনকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে অর্থনৈতিক বয়কট, আত্মনির্ভরতা,
গণপ্রতিবাদ ও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংগ্রামের দিকে এগিয়ে নেওয়া।
উপসংহার
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী
ঘটনা। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হলেও এটি দ্রুত
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের বৃহত্তর আন্দোলনে
রূপ নেয়।
এই
আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয়রা বুঝতে পারে, রাজনৈতিক
স্বাধীনতা অর্জনের জন্য শুধু ব্রিটিশবিরোধী প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়; নিজেদের
শিল্প, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক শক্তিও গড়ে তুলতে হবে।
অন্যদিকে
হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক স্বার্থের পার্থক্য এবং শ্রেণিগত বৈষম্য আন্দোলনের
সর্বজনীন ভিত্তি নির্মাণে বাধা সৃষ্টি করে।
সুতরাং,
স্বদেশী আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য একদিকে যেমন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের
বিকাশে, অন্যদিকে তেমনি বাংলার হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সম্পর্কের
পরিবর্তন এবং পরবর্তী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ।
১০.
নির্বাচিত তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ
|
গবেষক/লেখক |
গ্রন্থ বা
প্রবন্ধ |
|
Sumit Sarkar |
The Swadeshi
Movement in Bengal, 1903–1908 (1973) |
|
Sumit Sarkar |
Hindu-Muslim
Relations in Swadeshi Bengal, 1903–1908 (1972) |
|
Semanti Ghosh |
Different
Nationalisms: Bengal, 1905–1947 (2016) |
|
Peter Heehs |
India's
Freedom Struggle, 1857–1947 |
|
Willem van
Schendel |
A History of
Bangladesh (2020) |
বিশেষভাবে
উপযোগী অনলাইন গবেষণা:
- Sumit
Sarkar — Hindu-Muslim Relations in Swadeshi Bengal, 1903–1908।
- Semanti
Ghosh — Unity and Difference in a Divided Homeland, 1905–11।
- University
of Delhi — The Swadeshi Movement।
- Banglapedia
— Annulment of Bengal Partition।
- National Council of
Education, Bengal — প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস।
আপনার আগের
আলোচনাগুলোর সঙ্গে স্বদেশী আন্দোলনের ঐতিহাসিক সম্পর্কটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলন, ১৯১১ সালের
বঙ্গভঙ্গ রদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি এবং ১৯৩৬–৪৭ সালের
হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক মেরুকরণ—সবগুলোই ঔপনিবেশিক বাংলায় শিক্ষা, অর্থনীতি,
রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্প্রদায়গত পরিচয়ের পরিবর্তনের একটি ধারাবাহিক ইতিহাসের
অংশ।
স্বদেশী আন্দোলন (১৯০৫–০৮, রাজনৈতিক জের ১৯১১ পর্যন্ত) বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী
আন্দোলন। এটি বাঙালি ভদ্রলোকের প্রথম বড় জাতীয়তাবাদী উত্থান, এবং একই সঙ্গে তার শ্রেণিসীমার প্রমাণ।
পূর্ববঙ্গের মুসলমান এতে শামিল হয়নি; সেই ফাটলই পরে পাকিস্তান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি পর্যন্ত গড়ায়।
## কেন শুরু
১৯০৫ সালের জুলাইয়ে লর্ড কার্জন বাংলা ভাগের
সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন; ১৬ অক্টোবর তা
কার্যকর হয়। পশ্চিমে বিহার-উড়িষ্যাসহ ‘বাংলা’, পূর্বে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’,
রাজধানী ঢাকা। সরকারের
কথা প্রশাসনিক সুবিধা। হিন্দু ভদ্রলোকের পড়া অন্যরকম: রাজনৈতিকভাবে সচেতন বাঙালি
হিন্দুকে ভাগ করা, এবং পূর্বে একটি
মুসলিম প্রাদেশিক স্বার্থ তৈরি করা। লেফটেন্যান্ট-গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলারের ‘দুই
স্ত্রী’ মন্তব্য—মুসলমান স্ত্রীটি প্রিয়—এই পড়াকে আরও তিক্ত করে।
৭ আগস্ট ১৯০৫ কলকাতা টাউন হলে বয়কট প্রস্তাব।
১৬ অক্টোবর শোকদিবস: অরন্ধন, রাখী
(রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগ), ‘বন্দে মাতরম’।
দাবি প্রথমে বঙ্গভঙ্গ রদ। দ্রুত তা স্বায়ত্তশাসন ও স্বদেশি অর্থনীতির দাবিতে ওঠে।
## কী ছিল কর্মসূচি
চারটি ধারা একসঙ্গে চলে। সুমিত সরকারের বিভাজন
এখানে পরিষ্কার।
| ধারা | কারা | কী করতেন |
|---|---|---|
| নরমপন্থী | সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কংগ্রেসের পুরনো নেতৃত্ব | সভা, আবেদন, বয়কটকে চাপের
হাতিয়ার |
| চরমপন্থী গঠনমূলক | বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ | স্বদেশি শিল্প, জাতীয় শিক্ষা, সালিশি, বিদেশি দ্রব্য বর্জন |
| বিপ্লবী | অনুশীলন, যুগান্তর | বোমা, Political dacoity, গুপ্ত সমিতি |
| সাংস্কৃতিক | রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গদর্শন-সঞ্জীবনী মহল | রাখী, জাতীয় শিক্ষা, গান; পরে জবরদস্তি বয়কট থেকে সরে আসা |
গঠনমূলক দিকটাই আন্দোলনের নতুনত্ব। বিদেশি
কাপড়-চিনি-লবণ বর্জন; বাংলা কেমিক্যাল,
বয়নশিল্প, স্বদেশি জাহাজ-চেষ্টা; ১৯০৬-এ বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ (অরবিন্দ অধ্যক্ষ);
জাতীয় বিদ্যালয় জেলায়
জেলায়; বিদেশি আদালত এড়িয়ে
স্বদেশি সালিশ। ‘বয়কট’ হলো না-বলা, ‘স্বদেশী’ হলো বিকল্প বানানো। ১৯০৬-এর কলকাতা কংগ্রেসে স্বরাজ লক্ষ্য হিসেবে
ঢোকে। ১৯০৭-এর সুরাট বিভাজনে নরম-চরম ভাঙন সর্বভারতীয় হয়।
## সামাজিক ভিত ও সীমা
বাহক হিন্দু উচ্চবর্ণ ভদ্রলোক—কলকাতার পেশাজীবী,
মফস্বলের
শিক্ষক-আইনজীবী-ছাত্র। জমিদার দ্বিধান্বিত: বয়কটে নাম লেখান, প্রজার খাজনা নিয়ে আন্দোলন চান না। মারোয়ারি
বণিক বস্ত্রবয়কটে কিছুদিন লাভ করেন, তারপর পিছন হন।
ধর্মীয় প্রতীক আন্দোলনকে হিন্দু চেহারা দেয়।
বন্দে মাতরম, কালীপূজা,
শিবাজী-গণপতি উৎসব
মুসলমানকে দূরে ঠেলে। স্বেচ্ছাসেবকদের জবরদস্তি বয়কট—বাজার থেকে বিলাতি কাপড়
ছিনিয়ে নেওয়া, দরিদ্র ক্রেতাকে
শাস্তি—প্রজা ও নিম্নবর্গের কাছে জাতীয়তা নয়, ভদ্রলোকের জুলুম। পূর্ববঙ্গের নমশূদ্রসহ তফসিলি
কৃষক এই ঐক্যের বাইরে থাকেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই পরে এই জবরদস্তি ও হিন্দু প্রতীক
থেকে সরে আসেন।
তাই আন্দোলন ব্যাপক হয়, গণআন্দোলন হয় না। শহর ও শিক্ষিত সমাজ টগবগ করে;
গ্রামের মুসলিম প্রজা
নিজের স্বার্থ দেখে না।
## মুসলিম প্রতিক্রিয়া
পূর্ববঙ্গ ও আসাম মুসলিম নেতৃত্বের কাছে সুযোগ:
ঢাকা রাজধানী, চাকরি, শিক্ষা, প্রশাসনে অংশ। নবাব সলিমুল্লাহ এই প্রাদেশিক
স্বার্থের মুখ। ১৯০৬-এর ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্ম এই প্রেক্ষাপটে।
স্বদেশীকে তাঁরা হিন্দু ভদ্রলোকের আন্দোলন হিসেবে পড়েন—যে আন্দোলন পূর্ববাংলার
নতুন সুবিধা কেড়ে নিতে চায়।
ব্যতিক্রম আছে। আবদুর রসুলের মতো কেউ কেউ
বয়কটে ছিলেন। কিন্তু গণভিত নয়। দাঙ্গাও বাধে: ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, পূর্ববঙ্গের কয়েকটি জেলায় হিন্দু
জমিদার-মহাজন বনাম মুসলিম প্রজার পুরনো খাজনা-ঋণের দ্বন্দ্ব স্বদেশীর হিন্দু
চেহারার সঙ্গে মিশে সাম্প্রদায়িক রূপ পায়। বঙ্গভঙ্গ এখান থেকেই হিন্দু-মুসলিম
রাজনীতিকে আলাদা খাতে নামিয়ে দেয়।
## দমন ও ভাটা
১৯০৭–০৮ সরকার সমিতি নিষিদ্ধ করে, সভার আইন কঠিন করে, সংবাদপত্র আইনে *যুগান্তর*–*বন্দে মাতরম* চাপে,
অশ্বিনীকুমার দত্ত,
কৃষ্ণকুমার মিত্রদের
নির্বাসন দেয়। মুজফফরপুরে ক্ষুদিরাম-প্রফুল্ল চকির বোমায় দুই ইংরেজ নারী নিহত
(১৯০৮); আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায়
অরবিন্দ ধরা পড়েন, পরে খালাস পেয়ে
রাজনীতি ছাড়েন। চরমপন্থী নেতৃত্ব শূন্য, নরমপন্থী আপসের পথে, বিপ্লবীরা
গুপ্তদলে। ১৯০৮ নাগাদ খোলা স্বদেশী আন্দোলন ভাটার মুখে।
## পরিণতি
১৯১১-এর ১২ ডিসেম্বর দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ
রদ। হিন্দু ভদ্রলোকের আংশিক জয়। একই ঘোষণায় রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লি। পূর্বের
মুসলিম নেতৃত্ব রদকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে প্রতিশ্রুতি আসে,
তা ১৯২১-এর ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়।
আরও দীর্ঘ জের:
- বয়কট-স্বদেশী পদ্ধতি পরে গান্ধীর অসহযোগ-আইন
অমান্যে ফিরে আসে; কিন্তু তখন
কৃষক-মুসলিম টানার চেষ্টা অনেক সচেতন।
- কংগ্রেস নরম-চরম ভাঙনে দুর্বল হয়; সশস্ত্র বিপ্লব আলাদা ধারায় চলতে থাকে।
- জাতীয় শিক্ষা ও স্বদেশি শিল্প ছোট কিন্তু
স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে।
- সবচেয়ে ভারী রাজনৈতিক ফল নেতিবাচক। যে আন্দোলন
বাংলাকে অখণ্ড রাখতে চেয়েছিল, তার হিন্দু
ভদ্রলোক-চরিত্র পূর্ববাংলার মুসলমানকে আলাদা রাজনৈতিক জাত বানাতে সাহায্য করে।
১৯০৬-এর লীগ, ১৯১১-এর ক্ষোভ,
১৯৪৭-এর পাকিস্তান—এক সরল
রেখা নয়, কিন্তু স্বদেশীর
সামাজিক সীমা সেই রেখার শুরু।
স্বদেশী তাই দুই অর্থে স্মরণীয়। পদ্ধতিতে এটি
ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রথম আধুনিক গণআহ্বান: বিদেশি পণ্য নয়, নিজের বিদ্যালয়, নিজের সালিশ, নিজের শিল্প। ভিত্তিতে এটি একটি শিক্ষিত হিন্দু
শ্রেণির আন্দোলন, যারা প্রজার
খাজনা কমাতে বা মুসলমানের প্রাদেশিক দাবি মানতে রাজি ছিলেন না। বঙ্গভঙ্গ রদ
হয়েছিল; যে সমাজকে অখণ্ড
করার কথা, সেই সমাজ এই
আন্দোলনের ভেতরেই ভাগ হয়ে গিয়েছিল।
স্বদেশী
আন্দোলন ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী
স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী অধ্যায়। ১৯০৫ সালে
লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ (Partition
of Bengal) ঘোষণার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই আন্দোলনের জন্ম
হয়। মূলত বাংলা থেকে শুরু হলেও পরবর্তীতে এটি সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।
১.
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও সূচনা
- বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক
সুবিধার অজুহাতে বাংলাকে বিভক্ত করে "পূর্ববঙ্গ ও আসাম" এবং
"পশ্চিমবঙ্গ" নামীয় দুটি প্রদেশে ভাগ করে। তবে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য
ছিল রাজনৈতিকভাবে সচেতন বাঙালি সমাজকে ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভক্ত করা এবং
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা।
- আন্দোলনের ডাক: বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার
টাউন হলে আয়োজিত এক ঐতিহাসিক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বদেশী আন্দোলনের ঘোষণা
দেওয়া হয়।
২. মূল
লক্ষ্য ও কৌশল
স্বদেশী
আন্দোলন প্রধানত দুটি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছিল:
- বয়কট (Boycott): ব্রিটিশ
শাসনের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার জন্য সব ধরনের বিলেতি বা বিদেশী
পণ্য—যেমন বিলেতি কাপড়, লবণ, চিনি ও চামড়াজাত
পণ্য ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা হয়।
- স্বদেশী (Self-Reliance): বিদেশী পণ্যের বিকল্প হিসেবে নিজস্ব দেশীয় শিল্প ও
পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো। এর আওতায় তাঁত শিল্প, সাবান,
দিয়াশলাই কারখানা এবং দেশীয় ব্যাংক ও বীমা
প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। (যেমন: প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের 'বেঙ্গল
কেমিক্যালস')।
৩. প্রধান
দিক ও প্রভাব
- শিক্ষা ও সংস্কৃতি: ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বয়কট করে 'জাতীয় শিক্ষা পরিষদ' (National Council of
Education) গঠিত হয় এবং একাধিক জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রজনীকান্ত সেন,
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং মুকুন্দ দাসের লেখা গান ও
কবিতা এই আন্দোলনে অভূতপূর্ব অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
- নারীদের অংশগ্রহণ: এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নারীদের সক্রিয়
অংশগ্রহণ। গৃহকোণ ছেড়ে মহিলারা চড়কায় সুতা কাটা এবং স্বদেশী পণ্যের
ব্যবহারে এগিয়ে আসেন।
- সশস্ত্র বিপ্লববাদের বীজ: অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি এই সময় অনুশীলনী সমিতি ও
যুগান্তর দলের মতো গুপ্ত সমিতিগুলোর মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সশস্ত্র চরমপন্থী
ও বিপ্লবী ধারার বিস্তার ঘটে।
৪. পরিণতি ও
গুরুত্ব
তীব্র
ছাত্র-জনতার আন্দোলন, অর্থনৈতিক বয়কট এবং গণ-অসন্তোষের মুখে শেষ পর্যন্ত
ব্রিটিশ সরকার নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদ (রদ্দ) করা হয়।
স্বদেশী
আন্দোলন কেবল বঙ্গভঙ্গ রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ভারতীয়
জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিকে আবেদন-নিবেদনের পর্যায় থেকে বের করে এনে গণ-আন্দোলনের
ধারায় রূপান্তর করেছিল এবং পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন অসহযোগ ও ভারত
ছাড় আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
স্বদেশী
আন্দোলন হলো ব্রিটিশবিরোধী ভারতের স্বাধীনতা
আন্দোলনের একটি অন্যতম প্রধান ও প্রথম সংগঠিত গণআন্দোলন। [1,
2]
আন্দোলনের
পটভূমি ও সূচনা
- মূল কারণ: ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার প্রতিবাদে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।
- শুরু: ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে এক ঐতিহাসিক
সভার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বদেশী আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং
আন্দোলন শুরু হয়।
- সময়কাল: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়া পর্যন্ত এর মূল প্রভাব ছিল।
[1,
2,
3,
4,
5]
মূল
উদ্দেশ্য ও রণকৌশল
- ব্রিটিশ পণ্য বয়কট: অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে দুর্বল করতে
বিলেতি বা বিদেশি কাপড়, লবণ, চিনিসহ সকল পণ্য
বর্জনের ডাক দেওয়া হয়।
- দেশীয় শিল্পের বিকাশ:
দেশীয় শিল্প-কারখানা, তাঁত ও
হস্তশিল্পের প্রচার এবং আত্মনির্ভরশীলতা বা 'আত্মশক্তি'
অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়।
- সংস্কৃতি ও শিক্ষা: স্বদেশী গান (যেমন— 'বন্দে
মাতরম'), নাটক, সাহিত্য এবং জাতীয়
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনমত গঠন করা হয়।
[1,
2, 3]
প্রধান
নেতৃবৃন্দ
- বাংলায়: অরবিন্দ ঘোষ, বিপিনচন্দ্র
পাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অশ্বিনীকুমার
দত্ত, আবদুর রসুল প্রমুখ।
- ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে: বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা
লাজপত রায়, ভি. ও. চিদাম্বরম পিল্লাই।
[1, 2,
3]
আন্দোলনের
প্রভাব
- এটি ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র
জাতীয়তাবাদী চেতনা ও একতার জন্ম দেয়।
- পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত
অসহযোগ ও সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছিল এই স্বদেশী আন্দোলন।
[1,
2, 3]
বিস্তৃত
তথ্য জানতে আপনি উইকিপিডিয়া স্বদেশী আন্দোলন পাতাটি
দেখতে পারেন। [1]
No comments:
Post a Comment