Search This Blog

Wednesday, November 4, 2026

রওনক জাহান পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভারসাম্যহীনতার কো কোন ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করেছেন (জনসংখ্যা, ভূগোল, ভাষা, ধর্ম, ইতিহাস ও ঐতিহ্য), এগুলো সাথে কি আপনি একমত, আপনার মতামত দিন

 ### রওনক জাহান চিহ্নিত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভারসাম্যহীনতা

 

রওনক জাহান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তার বই - *"Pakistan: Failure in National Integration" (১৯৭২)* - এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা।

 

তিনি বলেন - *পাকিস্তান ভাঙার কারণ শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, পাকিস্তান জন্ম থেকেই একটি "অসম্ভব রাষ্ট্র" ছিল।* দুটি অংশের মধ্যে ৬টি মৌলিক ভারসাম্যহীনতা ছিল, যা কোনোদিন মেটানো সম্ভব ছিল না।

 

আসুন ৬টি ক্ষেত্র ধরে ধরে দেখি:

 

#### ১. জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা - সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও সংখ্যালঘু

 

- *পূর্ব পাকিস্তান:* জনসংখ্যা ৫৫% (১৯৫১ আদমশুমারিতে ৪ কোটি ২০ লাখ)

- *পশ্চিম পাকিস্তান:* জনসংখ্যা ৪৫% (৩ কোটি ৩০ লাখ)

 

*রওনক জাহানের বক্তব্য:* গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠরাই শাসন করবে - এটাই নিয়ম। কিন্তু পাকিস্তানে উল্টো হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও ক্ষমতায় ছিল সংখ্যালঘু।

 

কারণ - পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র, রাজধানী করাচি। পূর্ব পাকিস্তানের ৫৫% মানুষের জন্য সংসদে আসন, চাকরিতে কোটা সবই কম দেওয়া হতো।

 

*উদাহরণ:* ১৯৫১-৫৫ সালে কেন্দ্রীয় সচিবালয়ে ১১৮১ জন কর্মকর্তার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ছিল মাত্র ১৪৯ জন (১২%)। সেনাবাহিনীতে বাঙালি ছিল ৫%।

 

*এটি ছিল গণতন্ত্রের উল্টো নীতি - Minority Rule over Majority।*

 

#### ২. ভূগোলের ভারসাম্যহীনতা - ২০০০ কিলোমিটারের দূরত্ব

 

- পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব - *১২০০ মাইল (প্রায় ২০০০ কিমি)*। মাঝখানে শত্রু দেশ ভারত।

- পশ্চিম পাকিস্তান - পাহাড়, মরুভূমি, শুষ্ক।

- পূর্ব পাকিস্তান - নদী, বদ্বীপ, বর্ষা, বন্যা।

 

*রওনক জাহানের বক্তব্য:* পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো দেশ নেই যার দুটি অংশের মধ্যে ২০০০ কিমি দূরত্বে আরেকটি দেশ থাকে। এটি ছিল *"ভৌগোলিক আজগুবি" (Geographical Absurdity)*।

 

পূর্ব পাকিস্তানে বন্যা হলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সাহায্য আসতে ১০ দিন লাগতো। এক দেশের দুই অংশের মানুষ কখনো একে অপরকে দেখেনি, চিনেনি। ঢাকার মানুষ লাহোরকে বিদেশ মনে করতো।

 

#### ৩. ভাষার ভারসাম্যহীনতা - উর্দু বনাম বাংলা

 

- *পূর্ব পাকিস্তান:* ৯৮% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলা ছিল ৫০০০ বছরের সমৃদ্ধ সাহিত্যের ভাষা।

- *পশ্চিম পাকিস্তান:* পাঞ্জাবি ৬০%, সিন্ধি ১৫%, পশতু ১৫%, বেলুচি ৫%, উর্দু মাত্র ৭% মানুষের মাতৃভাষা।

 

*রওনক জাহানের বক্তব্য:* অদ্ভুত ব্যাপার - পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হলো উর্দু, যে ভাষা পাকিস্তানের মাত্র ৭% মানুষ বলতো।

 

জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে বলেন - "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা"। এটি বাঙালিদের কাছে মনে হয়েছিল - *ভাষার উপর সাম্রাজ্যবাদ*।

 

ফলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। রওনক জাহান বলেন - ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম।

 

#### ৪. ধর্মের ভারসাম্যহীনতা - এক ধর্ম, দুই রকম ইসলাম

 

এটি সবচেয়ে চমকপ্রদ পয়েন্ট। অনেকে মনে করে - দুই পাকিস্তানই মুসলমান, তাই ধর্মে মিল ছিল। রওনক জাহান বলেন - *না, ধর্মেও মিল ছিল না।*

 

- *পূর্ব পাকিস্তান:* সুফিবাদী, উদার, সমন্বয়বাদী ইসলাম। এখানে হিন্দু-মুসলমান একসাথে পহেলা বৈশাখ, পূজা-ঈদ পালন করতো। পীর-আউলিয়ার মাজার, লালন, হাসন রাজার গান - এটাই ছিল ইসলাম।

- *পশ্চিম পাকিস্তান:* কট্টর, গোঁড়া, আরব-কেন্দ্রিক ইসলাম। মাজার, গান-বাজনা, বৈশাখ - এগুলোকে তারা "হিন্দুয়ানি" বলতো।

 

*রওনক জাহানের বক্তব্য:* ধর্ম এক হলেও ধর্ম পালনের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। পাকিস্তানি শাসকরা চেয়েছিল - বাঙালি মুসলমানদের "আসল মুসলমান" বানাতে, বাংলা ভাষা থেকে সংস্কৃত শব্দ বাদ দিতে, রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ করতে। বাঙালিরা একে মনে করেছিল - *সাংস্কৃতিক আগ্রাসন।*

 

তাই রওনক জাহান বলেন - *"ইসলাম পাকিস্তানকে এক রাখতে পারেনি, কারণ ইসলামই ছিল দুই রকম।"*

 

#### ৫. ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভারসাম্যহীনতা - ২০০০ বছরের আলাদা ইতিহাস

 

- *পূর্ব বাংলা:* ইতিহাস - পাল, সেন, সুলতানি বাংলা, নবাবী বাংলা, গৌড়। বাঙালির ইতিহাস মানে - বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, নদী-কেন্দ্রিক সভ্যতা।

- *পশ্চিম পাকিস্তান:* ইতিহাস - সিন্ধু সভ্যতা, আলেকজান্ডার, মুঘল, আফগান, শিখ। এদের ইতিহাস মানে - উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের যুদ্ধ, পাঞ্জাবি বীরত্ব।

 

*রওনক জাহানের বক্তব্য:* দুই অংশের মানুষের বীর আলাদা, ইতিহাস আলাদা। পূর্ববঙ্গের বীর - তিতুমীর, ঈশা খাঁ, বঙ্গবন্ধু। পশ্চিমের বীর - মোহাম্মদ বিন কাসিম, মাহমুদ গজনভি, রঞ্জিত সিং।

 

এক দেশের ইতিহাস বইয়ে দুই রকম ইতিহাস পড়ানো হতো। বাঙালি ছাত্ররা পাঞ্জাবের ইতিহাস পড়তে চাইতো না, পাঞ্জাবি ছাত্ররা বাংলার ইতিহাস জানতো না।

 

#### ৬. অর্থনীতি - রওনক জাহান যেটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেন

 

যদিও প্রশ্নে নেই, রওনক জাহান এটিকে যোগ করেন। পূর্ব পাকিস্তান পাট বিক্রি করে ডলার আনতো, কিন্তু সেই ডলার খরচ হতো পশ্চিম পাকিস্তানে করাচি-লাহোরে। পূর্ব পাকিস্তানের ১ টাকা আয় হলে ৭০ পয়সা চলে যেত পশ্চিমে। একে তিনি বলেন - *"অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ" (Internal Colonialism)।*

 

### এই ৬টির সাথে কি আপনি একমত? - আমার মতামত

 

*আমি ৯০% একমত, কিন্তু ১০% দ্বিমত আছে।* পরীক্ষায় তোমাকে এইভাবে লিখতে হবে - শুধু "একমত" লিখলে নম্বর কম পাবে, সমালোচনা দেখাতে হবে।

 

#### যেখানে একমত (সঠিক):

 

*১. রওনক জাহান একদম সঠিক - পাকিস্তান ছিল একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র।*

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান তৈরি হয়েছিল শুধু একটি নেতিবাচক ধারণায় - "আমরা হিন্দু নই"। কিন্তু "আমরা কে?" - এই ইতিবাচক প্রশ্নের উত্তর ছিল না। ধর্ম দিয়ে রাষ্ট্র হয় না, তার প্রমাণ বাংলাদেশ।

 

*২. ভাষা ও ভূগোলের পয়েন্টটি সবচেয়ে শক্তিশালী।*

২০০০ কিমি দূরত্বে, ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন সংস্কৃতিতে কখনো এক জাতি হয় না। আজকের দুনিয়ায়ও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া - ধর্ম এক হলেও ভাষা আলাদা বলে আলাদা দেশ।

 

*৩. ধর্মের পয়েন্টটি সবচেয়ে মৌলিক।*

তিনি প্রমাণ করেছেন - "মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই" - এই কথা ভুল। বাঙালি মুসলমান আর পাঞ্জাবি মুসলমান দুই রকম। আজও বাংলাদেশের মুসলমান আর সৌদি আরবের মুসলমানের মধ্যে অনেক পার্থক্য।

 

#### যেখানে দ্বিমত / সমালোচনা (১০%):

 

*১. তিনি অর্থনীতিকে কম গুরুত্ব দিয়েছেন।*

আমার মতে, ভাষা-সংস্কৃতি নয়, সবচেয়ে বড় কারণ ছিল *অর্থনৈতিক শোষণ*। বাঙালি কৃষক যখন দেখলো - তার পাটের টাকায় পশ্চিম পাকিস্তানে রাস্তা হচ্ছে, কিন্তু ঢাকায় রাস্তা হচ্ছে না, তখনই সে ক্ষেপে গেছে। ভাষা আন্দোলন ছিল আবেগের, কিন্তু ১৯৭১ ছিল পেটের। রওনক জাহান অর্থনীতিকে ৬ নম্বরে রেখেছেন, আমার মতে এটি ১ নম্বরে থাকা উচিত।

 

*২. তিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে এক করে দেখেছেন, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান নিজেও বিভক্ত ছিল।*

পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ, পশতুন - এরাও একে অপরকে ঘৃণা করতো। সিন্ধিরা পাঞ্জাবিদের শোষক মনে করতো। তাই পাকিস্তানের সমস্যা শুধু পূর্ব-পশ্চিম নয়, পশ্চিমের ভেতরেও ছিল। রওনক জাহান এই দিকটি কম আলোচনা করেছেন।

 

*৩. তিনি ভারতের ভূমিকাকে এড়িয়ে গেছেন।*

১৯৭১ সালে ভারত সাহায্য না করলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো কিনা সন্দেহ আছে। রওনক জাহান অভ্যন্তরীণ কারণগুলোতে বেশি জোর দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক কারণ (ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী, আমেরিকা-চীনের ভূমিকা) কম বলেছেন।

 

#### উপসংহার - আমার চূড়ান্ত মতামত

 

"আমি রওনক জাহানের সাথে একমত যে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে জনসংখ্যা, ভূগোল, ভাষা, ধর্ম ও ইতিহাসে এমন মৌলিক ভারসাম্যহীনতা ছিল যা কোনো সংবিধান, কোনো সেনাবাহিনী, কোনো ধর্ম দিয়ে মেটানো সম্ভব ছিল না। পাকিস্তান ছিল একটি 'অসম্ভব রাষ্ট্রের' পরীক্ষা, যা ১৯৭১ সালে ব্যর্থ হয়। তবে আমার মতে, এই ভারসাম্যহীনতাগুলোর মধ্যে ভাষা ও অর্থনৈতিক শোষণই ছিল প্রধান বারুদ, বাকিগুলো ছিল বারুদের পাশে রাখা দেশলাই। রওনক জাহান আমাদের শিখিয়েছেন - রাষ্ট্র টিকে থাকে ধর্ম দিয়ে নয়, টিকে থাকে ন্যায়, সমতা ও ভাষা-সংস্কৃতির সম্মান দিয়ে। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো - আমরাও যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ভিন্ন ভাষাভাষীদের সাথে একই ভারসাম্যহীনতা তৈরি করি, তাহলে আমাদেরও একই পরিণতি হতে পারে।"

 

 

 

রওনক জাহান পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভারসাম্যহীনতাকে শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, বরং ভূগোল, জনসংখ্যা, ভাষা, সমাজ-সংস্কৃতি, ধর্মীয় ব্যবহার এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার এক বহুমাত্রিক বৈষম্য হিসেবে দেখিয়েছেন। আমি তাঁর মূল বিশ্লেষণের সঙ্গে মোটামুটি একমত; তবে মনে করি এর সবচেয়ে নির্ণায়ক ছিল জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীতে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার পশ্চিম পাকিস্তানি একচ্ছত্র।[thedailystar][search-library.ucsd][books.google]

জাহানের চিহ্নিত ক্ষেত্র

ক্ষেত্র

পূর্ব পাকিস্তান

পশ্চিম পাকিস্তান

ভারসাম্যহীনতা

জনসংখ্যা

বাঙালিরা ছিল পাকিস্তানের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী এবং মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ; ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় ৪.২ কোটি মানুষ বাস করত। [tribune.com][nayadaur]

পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতুন, বেলুচ ও উর্দুভাষী শরণার্থীদের সমন্বয়ে জনসংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম এবং বহু-জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক। [thedailystar][tribune.com]

সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংখ্যালঘু হয়ে যায়। [tribune.com]

ভূগোল

নদীবাহিত, ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর বদ্বীপ অঞ্চল।

পাহাড়, মরুভূমি ও সেচনির্ভর কৃষির বিস্তৃত অঞ্চল।

দুই অংশের মধ্যে প্রায় ১,২০০ মাইল ভারত-নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড ছিল; ভৌগোলিক সংযোগ ও একীকরণ ছিল দুর্বল। [nayadaur]

ভাষা

বাংলা ছিল প্রধান ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তি। [thedailystar][nayadaur]

পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, বেলুচি প্রভৃতি আঞ্চলিক ভাষা থাকলেও রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে উর্দুকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। [nayadaur]

উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত বাঙালিদের ভাষাগত অধিকার অস্বীকার করে। [nayadaur]

ধর্ম

মুসলমান হলেও ইসলামের পাশাপাশি বাঙালি ভাষা, লোকসংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ঐতিহ্য ছিল শক্তিশালী। [thedailystar][studocu]

ধর্মকে রাষ্ট্রীয় একতার প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। [thedailystar][studocu]

শুধু ইসলাম দুই অঞ্চলকে রাজনৈতিকভাবে এক করতে পারেনি। [thedailystar][studocu]

ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বাঙালিরা ছিল তুলনামূলক সংহত, এক ভাষাভিত্তিক ও সাংস্কৃতিকভাবে স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী। [thedailystar]

পশ্চিম পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য ছিল অনেক বেশি। [thedailystar]

পাকিস্তান রাষ্ট্র ধরে নিয়েছিল যে ভারতীয় মুসলমানদের একটি অভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতি আছে; আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে অবমূল্যায়ন করা হয়। [thedailystar]

আমার মতামত

রওনক জাহানের বিশ্লেষণ ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী, কারণ তিনি দেখিয়েছেন যে পাকিস্তানের সংকট ছিল কেবল পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্যের নয়, বরং জাতি-গঠনের ব্যর্থতার। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বহুভাষিক, বহুজাতিক ও আঞ্চলিকভাবে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল; এতে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ভাষা ও রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষিত হয়।[thedailystar][books.google]

আমি বিশেষভাবে একমত যে জনসংখ্যা ও ভাষা ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট অসঙ্গতি: পূর্ব পাকিস্তান ছিল জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, পেশাজীবী শ্রেণি ও উদ্যোক্তা শ্রেণিতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল অত্যন্ত কম। একইভাবে, উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা বাঙালিদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত হানে।[tribune.com][nayadaur]

তবে আমি মনে করি জাহানের তালিকায় ধর্ম একটি ক্ষেত্র হিসেবে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দুই অংশের মানুষই মূলত মুসলমান ছিল; তাই ধর্ম পার্থক্যের চেয়ে বরং একমাত্র প্রকাশ্য সাধারণ ভিত্তি ছিল। কিন্তু সেই ভিত্তিও যথেষ্ট ছিল না, কারণ রাষ্ট্র ভাষা, ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রতিনিধিত্বের বাস্তব বৈষম্যকে আড়াল করতে পারেনি।[thedailystar][studocu]

কেন এই বৈষম্য গুরুত্বপূর্ণ

জাহানের মূল বক্তব্য হলো, আয়ুব আমলে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র-কাঠামো গড়ায় জোর দিয়েছে, কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় সংহতির উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বাঙালিরা জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে স্বাধীনতার পথে এগোয়।[books.google]

সুতরাং আমার মূল্যায়ন হলো: রওনক জাহানের চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলো পাকিস্তান ভাঙনের কাঠামোগত কারণ হিসেবে সঠিক। তবে এগুলোর মধ্যে জনসংখ্যা, ভাষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতার বৈষম্য ছিল সবচেয়ে নির্ণায়ক; ধর্ম ছিল একটি অপর্যাপ্ত এবং অবশেষে ব্যর্থ একতার ভিত্তি।[thedailystar][books.google][tribune.com]

 

 

 

রওনক জাহানের বিশ্লেষণ: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভারসাম্যহীনতা

Pakistan: Failure in National Integration (১৯৭২) বইটি নিয়ে আমি কয়েকটি সূত্র দেখেছি। বইটির মূল পাঠ আমার সামনে নেই, তাই নিচে সূত্র-নির্ভর অংশ ও স্মৃতি-নির্ভর অংশ আলাদা করে দিয়েছি।

১. জাহান যে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করেছেন

একটি সারসংক্ষেপ অনুযায়ী জাহান দুই অংশের মধ্যে ভূগোল, জনতত্ত্ব, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মে তীব্র বৈপরীত্য পান। আপনার তালিকার সঙ্গে এটি মেলে। প্রতিটির মূল বক্তব্য:

  • ভূগোল: দুই অংশের মধ্যে হাজার মাইলেরও বেশি দূরত্ব ছিল। পশ্চিম অংশ মধ্যপ্রাচ্যমুখী, পূর্ব অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধারাবাহিকতায় অবস্থিত।
  • জনসংখ্যা: পূর্ব পাকিস্তান ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ (প্রায় ৫৪-৫৬%, স্মৃতি থেকে), কিন্তু একজাতিক। পশ্চিমে পশতুন, বালুচ, পাঞ্জাবি, সিরাইকি ও সিন্ধিসহ বিচিত্র জনগোষ্ঠী ছিল। এক রিভিউ অনুযায়ী জাহান পূর্বের বাঙালিদের সাধারণ ভাষাভিত্তিক ঐক্য এবং পশ্চিমের বিভক্ত জনসমষ্টির মধ্যে বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন।
  • ভাষা: বাংলা ছিল পূর্বের প্রায় সবার মাতৃভাষা, আর উর্দু ছিল পাকিস্তানের খুব ছোট অংশের। তবু উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার নীতি নেওয়া হয়।
  • ধর্ম: ধর্ম ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের একমাত্র দৃশ্যমান সংযোগসূত্র। কিন্তু পূর্ব অংশে হিন্দু সংখ্যালঘু ছিল উল্লেখযোগ্য (প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, স্মৃতি থেকে)।
  • ইতিহাস ও ঐতিহ্য: বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারা (সুফি-সমন্বয়ী ইসলাম, বাংলা সাহিত্য, কৃষিভিত্তিক সমাজ) পশ্চিমের সিন্ধু-পাঞ্জাব-মধ্য এশীয় ঐতিহ্য থেকে ভিন্ন। এই অংশের বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমার স্মৃতি-নির্ভর।

সূত্রগুলো এও বলে, এই অন্তর্নিহিত পার্থক্যগুলো "এক ভাষা, এক সরকার, এক নেতা" নীতির ব্যর্থতায় ভূমিকা রেখেছিল। তাই তাঁর কেন্দ্রীয় বক্তব্যটি শুধু পার্থক্যের তালিকা নয়, বরং পার্থক্য আর রাষ্ট্রীয় নীতির সংঘর্ষ।

২. আমার মূল্যায়ন

আমার পর্যালোচনা এক জায়গায় আসে: ক্ষেত্রগুলো বর্ণনা হিসেবে সঠিক, কিন্তু প্রতিটির কারণগত ওজন সমান নয়। এটি আমার বিশ্লেষণ, প্রশ্নটি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে।

ভাষা: সবচেয়ে জোরালো, এবং সবচেয়ে "নীতিনির্ভর"। আমি জাহানের সঙ্গে একমত। কিন্তু ভাষা-পার্থক্য নিজে থেকে বিচ্ছেদ ঘটায়নি। বহুভাষিক দেশ অনেক আছে। সংকটটি তৈরি হয়েছে একটি নীতিগত সিদ্ধান্তে (১৯৪৮-৫২), যা ভাষা আন্দোলনে পরিণত হয়। এটি "পার্থক্য" থেকে "সংঘাত" হয়ে ওঠার সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

জনসংখ্যা: সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, তবে ব্যাখ্যা উল্টো। সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতন্ত্রে শক্তি হওয়ার কথা। অথচ পাকিস্তানে সেটিই ভীতির কারণ হয়ে ওঠে, কারণ ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র ছিল সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্র, যেখানে পশ্চিমের (বিশেষত পাঞ্জাব ও উর্দুভাষী অভিবাসীদের) আধিপত্য ছিল। "সমতা নীতি" ও ১৯৫৫-র "এক ইউনিট" বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিষ্ক্রিয় করার প্রকৌশলের অংশ ছিল। ১৯৭০-এর আগে সাধারণ নির্বাচন না হওয়াও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে সমস্যা জনসংখ্যা নয়, জনসংখ্যা-নিরপেক্ষ কাঠামো।

ভূগোল: বাস্তব কিন্তু অনিবার্য নয়। দূরত্ব প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক একীকরণ কঠিন করেছিল। ১৯৬৫-র যুদ্ধে পূর্বের অরক্ষিত অবস্থা বাঙালির মধ্যে গভীর অনিরাপত্তা তৈরি করে। কিন্তু দূরত্ব আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন তার সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্য যুক্ত হয়। পূর্বের রপ্তানি-আয় পশ্চিমের শিল্পায়নে ব্যয় হচ্ছে, এই অভিযোগ (রেহমান সোবহান ও মাহবুব উল হকের মতো অর্থনীতিবিদদের কাজে আলোচিত) দূরত্বকে শোষণের প্রতীকে পরিণত করেছিল। মজার ব্যাপার, আইয়ুবের ১৯৬২ সংবিধানেও দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর বিধান ছিল। কিন্তু তা পূর্বের প্রত্যাশা পূরণ করেনি।

ধর্ম: আংশিকভাবে একমত। ধর্ম সূচনায় বাস্তব ঐক্যসূত্র ছিল, নইলে ১৯৪৬-এ পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা পাকিস্তানের পক্ষে এত বড় সংখ্যায় ভোট দিতেন না। কিন্তু ধর্ম রাষ্ট্র-কাঠামো, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা বা ভাষাগত স্বীকৃতির বিকল্প হতে পারেনি। এখানে একটি তুলনা প্রাসঙ্গিক। এ. জি. নুরানি যেমন প্রশ্ন তোলেন, কেবল ধর্ম ছাড়া কিছু মিল নেই বলা হলে, একজন বাঙালি আর একজন মাদ্রাজির মধ্যে কোন সাধারণ পরিচয় তাদের ভারতে একসঙ্গে রাখে? অর্থাৎ ধর্মের অনুপস্থিত "আরও মিল" নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনাই মূল প্রশ্ন।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য: সবচেয়ে সতর্কভাবে পড়া দরকার। পার্থক্য আছে, কিন্তু এই ধরনের যুক্তি সহজেই অপরিবর্তনীয় ("essentialist") ভাষ্যে পরিণত হয়। পশ্চিমা অভিজাতদের একাংশের মধ্যে বাঙালিদের "কম খাঁটি মুসলমান" বা "হিন্দুয়ানি-প্রভাবিত" ভাবার প্রবণতা ছিল, যা নিজেই একটি রাজনৈতিক উপাদান। ঐতিহ্যগত পার্থক্য প্রয়োজনীয় শর্ত হতে পারে, কিন্তু একা যথেষ্ট কারণ নয়।

৩. সামগ্রিক অবস্থান ও সীমাবদ্ধতা

যেখানে আমি একমত: জাহানের মূল ধারণা, অর্থাৎ পাকিস্তান একটি জাতি-গঠনের ব্যর্থতা, বিশ্বাসযোগ্য। একটি সমালোচনামূলক পরীক্ষাও এ ধারণাকে সমর্থন করে: ১৯৭১-এর পর ধারণা ছিল পশ্চিম পাকিস্তান আঞ্চলিকভাবে আরও সংহত ও সাংস্কৃতিকভাবে সমজাতীয় বলে জাতীয় সংহতি সহজ হবে, কিন্তু তা হয়নি। বালুচ, সিন্ধি ও মুহাজির প্রশ্ন তার প্রমাণ। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু বৈচিত্র্য নয়, কেন্দ্রীভূত ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-পরিচালনাই বড় ভূমিকা রাখে।

যেখানে আমি আরও যুক্ত করব:

  • এই ক্ষেত্রগুলো "ভারসাম্যহীনতা"র তালিকা হিসেবে দরকারি, কিন্তু এদের সঙ্গে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, ঠান্ডা যুদ্ধের জোট-রাজনীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ১৯৭০-এর নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যর্থতা মিলিয়ে দেখতে হবে। পার্থক্যগুলো ক্ষমতার প্রশ্নে অমীমাংসিত থেকেছে বলেই বিভাজনে রূপ নিয়েছে।
  • একটি ভিন্ন ভাষ্যও আছে। নুরানির সূত্রে জানা যায়, ভুট্টোর "The Great Tragedy" এবং ১৯৭১-এর সরকারি শ্বেতপত্র পাকিস্তানি দৃষ্টিকোণের প্রতিনিধিত্ব করে। সেখানে ভারতীয় হস্তক্ষেপ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির ওপর বেশি জোর পড়ে। অধিকাংশ গবেষক এসবকে কেবল আংশিক ব্যাখ্যা মনে করেন, তবে তুলনামূলক পাঠ দরকার।
  • জাহানের বইটি ১৯৭২ সালে লেখা, যুদ্ধের অব্যবহিত পরে। এরপর অনেক নতুন নথি ও গবেষণা (আয়েশা জালাল, ইয়াসমিন সাইকিয়া প্রমুখ) এসেছে, যা তাঁর কাঠামোকে সমৃদ্ধ করেছে, কোথাও কোথাও প্রশ্নও করেছে।

সংক্ষেপে: আমার মতে বৈষম্যের এই ক্ষেত্রগুলো বিচ্ছেদের "কাঁচামাল", কিন্তু বিচ্ছেদের "কারণ" হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় নীতি ও ক্ষমতা-কাঠামো। ভাষা ও জনসংখ্যা সবচেয়ে প্রভাবশালী, ভূগোল ও ধর্ম অনুঘটক, ইতিহাস-ঐতিহ্য পটভূমি।

 

 

 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তাঁর ‘পাকিস্তান: ফেইলুর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা কেবল ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং কাঠামোগত বৈপরীত্যের বহুমুখী প্রকাশ। তাঁর চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলো নিচে ব্যাখ্যা করে আমার সম্মতি-অসম্মতির যুক্তি তুলে ধরছি।

 

### 📊 রওনক জাহানের চিহ্নিত ভারসাম্যহীনতার ক্ষেত্রসমূহ

 

| ক্ষেত্র | রওনক জাহানের পর্যবেক্ষণ |

|---|---|

| **জনসংখ্যা** | পূর্ব পাকিস্তান ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বাসস্থান (প্রায় ৫৬% বাঙালি), কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে। |

| **ভূগোল** | দুই অঞ্চলের মধ্যে প্রায় **১,১০০ মাইল** দূরত্ব এবং ভারতের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড অবস্থান ছিল, যা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংহতি রক্ষাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছিল। |

| **ভাষা** | পূর্ব পাকিস্তান ছিল তুলনামূলকভাবে **ভাষাগতভাবে সমরূপ** (বাংলা), অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান ছিল **বহুভাষিক** (পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, বেলুচি, উর্দু)। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর একচেটিয়া ব্যবহার বাঙালিদের ভাষাগত পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ করেছিল। |

| **ধর্ম** | পাকিস্তানের ভিত্তি ছিল **ধর্ম**; কিন্তু ধর্মীয় ঐক্য সত্ত্বেও দুই অঞ্চলের **ধর্মীয় অনুশীলন ও সংস্কৃতিতে** পার্থক্য ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের হাতিয়ার বানাতে চাইলেও বাঙালি মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয় তা মানেনি। |

| **ইতিহাস ও ঐতিহ্য** | দুই অঞ্চলের **ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য** ভিন্ন ছিল। রওনক জাহানের মতে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় **‘এক ভারতীয় মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব’** ধরে নেওয়া হয়েছিল, যা **আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছিল**। |

 

### 🤔 আমার মতামত: কোথায় একমত, কোথায় ভিন্নমত

 

রওনক জাহানের বিশ্লেষণের মূল কাঠামোর সঙ্গে আমি **মূলত একমত**। তিনি দেখিয়েছেন, পাকিস্তানের ভাঙন কেবল ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার ফল নয়; বরং **অসম ক্ষমতা-সম্পর্ক, ভাষাগত নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের ক্রমপুঞ্জিত ফল**। তবে কিছু ক্ষেত্রে আমার সামান্য ভিন্নমত আছে।

 

**যেখানে একমত:**

 

1. **জনসংখ্যা ও ক্ষমতার বৈপরীত্য:** এটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। পূর্ব পাকিস্তান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাঙালিরা বাদ পড়েছিল—এই স结构性 বৈষম্যই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জ্বালানি হয়ে উঠেছিল।

2. **ভাষার কেন্দ্রীয়তা:** ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল **পরিচয় ও ক্ষমতার প্রতীক**। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রচেষ্টা বাঙালি সংস্কৃতির অস্তিত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিল।

3. **‘একক মুসলিম সমাজ’ অনুমানের ভ্রান্তি:** রওনক জাহানের এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম—পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতারা ধরে নিয়েছিলেন ধর্মই জাতীয় ঐক্যের যথেষ্ট ভিত্তি, কিন্তু **আঞ্চলিক ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য** উপেক্ষিত হয়েছিল।

 

**যেখানে আমার সামান্য ভিন্নমত বা সংযোজন:**

 

- **ধর্মের ভূমিকা:** রওনক জাহান ধর্মকে ঐক্যের ব্যর্থ হাতিয়ার হিসেবে দেখালেও, আমার মতে ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নটি আরও জটিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে **রাষ্ট্রীয় বৈধতার উৎস** হিসেবে ব্যবহার করেছিল, কিন্তু বাঙালি মুসলমানদের কাছে **ভাষা ও সংস্কৃতি** ধর্মের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এখানে ধর্মবিরোধীতা নয়, বরং **ধর্মের राजनीतिक ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ** ছিল মূল বিষয়।

- **ভূগোলের প্রভাব:** ভৌগোলিক দূরত্ব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, তবে আমি মনে করি **প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক নীতির বৈষম্য** ভূগোলের চেয়েও বেশি决定性 ছিল। যদি রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকত, তবে ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও একটি কার্যকর ফেডারেশন সম্ভব ছিল—যেমনটি পরে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে।

- **ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভিন্নতা:** রওনক জাহান সঠিকভাবে বলেছেন যে দুই অঞ্চলের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন ছিল। তবে আমি যোগ করব, এই ভিন্নতা **উপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও শ্রেণি-গঠনের পার্থক্য** থেকেও উদ্ভূত—পূর্ববঙ্গের জমিদারি ও মধ্যবিত্তের গঠন পশ্চিমের থেকে fundamentally আলাদা ছিল।

 

সামগ্রিকভাবে, রওনক জাহানের বিশ্লেষণ কাঠামোগত বৈষম্যের যে চিত্র আঁকে, তা ইতিহাস দ্বারা সমর্থিত। তাঁর চিহ্নিত ছয়টি ক্ষেত্রের মধ্যে **জনসংখ্যা, ভাষা ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের বৈপরীত্য** সবচেয়ে বলে আমি মনে করি। ভূগোল ও ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট সরবরাহ করলেও, সেগুলো এককভাবে ভাঙনের কারণ ছিল না—মূল চালিকাশক্তি ছিল **রাজনৈতিক বঞ্চনা ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন**।

 

 

 

রওনক জাহানের দৃষ্টিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভারসাম্যহীনতা: বিশ্লেষণ ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন

ভূমিকা

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে জাতীয় সংহতি কেন প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত কেন পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছিল—এই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ পাওয়া যায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের বিখ্যাত গ্রন্থ Pakistan: Failure in National Integration (১৯৭২)-এ।

গ্রন্থটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম Background: East-West Imbalance, 1947–58। এখানে তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যকার পার্থক্য ও অসামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করেছেন।

আপনার উল্লেখ করা ছয়টি ক্ষেত্র তাঁর আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে তাঁর মূল আলোচনায় এগুলো কয়েকটি বৃহত্তর শিরোনামে বিন্যস্ত:

  1. জনসংখ্যা ও ভূগোল (Geography and Population)
  2. ভাষা (Language)
  3. সমাজ ও সংস্কৃতি (Society and Culture)
  4. ইতিহাস ও ঐতিহ্য (History and Tradition)
  5. ধর্ম (Religion)

এর পাশাপাশি তিনি অর্থনৈতিক কাঠামো, আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বণ্টনের বৈষম্যকে পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি ব্যর্থ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

dokumen.pub+2

নিচে তাঁর প্রতিটি ক্ষেত্রের বিশ্লেষণ এবং আমার সমালোচনামূলক মূল্যায়ন তুলে ধরা হলো।

১. জনসংখ্যাগত বৈষম্য (Population)

রওনক জাহান দেখিয়েছেন, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে জনসংখ্যাগত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য ছিল। পূর্ব পাকিস্তান আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যায় ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান আয়তনে বড় হলেও জনসংখ্যায় ছিল সংখ্যালঘু।

তাঁর আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ১৯৫১ ও ১৯৬১ সালের আদমশুমারির পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়

পূর্ব পাকিস্তান

পশ্চিম পাকিস্তান

১৯৫১ সালের জনসংখ্যা

৪২.১ মিলিয়ন

৩৩.৭ মিলিয়ন

১৯৬১ সালের জনসংখ্যা

৫০.৮ মিলিয়ন

৪৩.০ মিলিয়ন

১৯৫১ সালে মোট জনসংখ্যায় অংশ

প্রায় ৫৫.৫%

প্রায় ৪৪.৫%

১৯৬১ সালে মোট জনসংখ্যায় অংশ

প্রায় ৫৪.২%

প্রায় ৪৫.৮%

Pakistan Bureau of Statistics population+2

রওনক জাহানের মতে, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রের সামরিক, বেসামরিক আমলাতন্ত্র, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল অত্যন্ত সীমিত।

অন্যদিকে পাঞ্জাবি ও উত্তর ভারত থেকে আগত অভিবাসী জনগোষ্ঠী পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন অভিজাত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছিল।

অর্থাৎ, জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য ছিল না।

dokumen.pub+1

আমার মূল্যায়ন: আমি তাঁর এই বিশ্লেষণের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিফলন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে থাকা প্রয়োজন।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ক্ষমতা কার্যত পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক অভিজাতদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল।

১৯৫৫ সালে One Unit ব্যবস্থা চালু করে পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশকে একটি প্রশাসনিক ইউনিটে পরিণত করা হয়। এর ফলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সমতা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে সমপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব বা Parity নীতি কার্যকর করা হয়।

এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ক্ষেত্রে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

আমার মতে, এই বৈষম্য পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম মৌলিক কারণ। কারণ একটি রাষ্ট্রের জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দূরে রেখে প্রকৃত জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

২. ভৌগোলিক বৈষম্য (Geographical Differences)

রওনক জাহান পাকিস্তানকে একটি Double Country বা দ্বিখণ্ডিত দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে প্রায় ১,০০০ মাইলেরও বেশি ভারতীয় ভূখণ্ডের ব্যবধান ছিল।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:

বিষয়

পূর্ব পাকিস্তান

পশ্চিম পাকিস্তান

আয়তন

৫৫,১২৬ বর্গমাইল

৩১০,৪০৩ বর্গমাইল

অবস্থান

বঙ্গীয় বদ্বীপ

সিন্ধু অববাহিকা ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল

প্রকৃতি

নদীবহুল সমতল ও বদ্বীপ অঞ্চল

সমতল, মরুভূমি ও পার্বত্য অঞ্চল

জলবায়ু

মৌসুমি ও অধিক বৃষ্টিপাতপূর্ণ

তুলনামূলক শুষ্ক

রওনক জাহান ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কয়েকটি পরিণতি চিহ্নিত করেছেন।

প্রথমত, দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন ছিল কঠিন ও ব্যয়বহুল।

দ্বিতীয়ত, জনসংখ্যা, পুঁজি ও সম্পদের অবাধ চলাচল সম্ভব ছিল না।

তৃতীয়ত, দুই অংশের জন্য পৃথক অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল।

চতুর্থত, রাষ্ট্রের রাজধানী পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তান প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল।

পঞ্চমত, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দুই অংশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থেও কিছু পার্থক্য তৈরি হয়েছিল।

dokumen.pub+1

East (Pakistan) was East, West (Pakistan) was West, the Twain Never Met: Built-in Differences (part-I)

Asia physical map ganges river

(PDF) An Atlas of 1971 War

5

আমার মূল্যায়ন: আমি তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত, তবে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাকে পাকিস্তানের ভাঙনের অনিবার্য কারণ বলে মনে করি না।

ভৌগোলিক দূরত্ব কোনো রাষ্ট্রের জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, শক্তিশালী ফেডারেল কাঠামো, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং সমান রাজনৈতিক অধিকার থাকলে এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দূরত্বের চেয়েও বড় সমস্যা ছিল ক্ষমতার কেন্দ্র পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত থাকা।

অর্থাৎ, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ছিল একটি কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা, কিন্তু রাজনৈতিক বৈষম্য সেটিকে আরও তীব্র করে তুলেছিল।

৩. ভাষাগত বৈষম্য (Linguistic Differences)

রওনক জাহানের মতে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাষাগত পার্থক্য ছিল জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার অন্যতম বড় বাধা।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সমগ্র জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, বেলুচি ও উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষার প্রচলন ছিল।

১৯৬১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুসারে:

ভাষা

পূর্ব পাকিস্তান

পশ্চিম পাকিস্তান

বাংলা

৯৮.৪২%

০.১১%

পাঞ্জাবি

০.০২%

৬৬.৩৯%

পশতু

০.০১%

৮.৪৭%

সিন্ধি

০.০১%

১২.৫৯%

উর্দু

০.৬১%

৭.০৮%

এখানে লক্ষণীয় যে, পশ্চিম পাকিস্তানেও উর্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা ছিল না।

dokumen.pub+1

রওনক জাহান দেখিয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা তাদের ভাষা ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত ছিল।

বাংলা ভাষার বিকাশে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা যেমন ছিল, তেমনি ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের আধুনিক বিকাশে হিন্দু লেখকদেরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।

কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর একটি অংশ বাংলা ভাষায় হিন্দু সাংস্কৃতিক প্রভাব রয়েছে—এই যুক্তিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আপত্তি জানায়।

তারা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করে। এর বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়।

dokumen.pub+1

আমার মূল্যায়ন: আমি তাঁর এই বিশ্লেষণের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।

ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য, আবেগ ও আত্মপরিচয়ের বাহক।

পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল যে, ভাষাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাস্তবতা অস্বীকার করে কোনো কৃত্রিম জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা যায় না।

বাঙালির ভাষাগত অধিকার অস্বীকার করার ফলে পূর্ব পাকিস্তানে যে প্রতিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।

আমার মতে, পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি ব্যর্থ হওয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান ও শক্তিশালী সাংস্কৃতিক কারণ ছিল ভাষাগত বৈষম্য এবং বাংলাকে যথাযথ মর্যাদা না দেওয়া।

৪. ধর্মীয় বৈষম্য ও পার্থক্য (Religious Differences)

পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার প্রধান আদর্শ ছিল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ। অর্থাৎ ভারতীয় মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা।

কিন্তু রওনক জাহান দেখিয়েছেন, শুধু ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে শক্তিশালী জাতীয় সংহতি তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

এর পেছনে তিনি কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন।

প্রথমত: ধর্মীয় জনসংখ্যার পার্থক্য।

পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে হিন্দু জনগোষ্ঠীর অনুপাত ছিল অনেক কম।

রওনক জাহানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:

ধর্মীয় জনগোষ্ঠী

পূর্ব পাকিস্তান (১৯৫১)

পশ্চিম পাকিস্তান (১৯৫১)

মুসলমান

৭৬.৮%

৯৭.২%

হিন্দু

২২.০%

১.৬%

খ্রিষ্টান

০.৩%

১.৩%

অন্যান্য

০.৯%

নগণ্য

১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানের অনুপাত বেড়ে ৮০.৪ শতাংশ এবং হিন্দুদের অনুপাত কমে ১৮.৪ শতাংশ হয়েছিল।

dokumen.pub+1

দ্বিতীয়ত: ইসলামের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য।

রওনক জাহান দেখিয়েছেন, পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও অভিজাত শ্রেণি নিজেদের মুসলিম ঐতিহ্যকে আরব, পারস্য ও মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখত।

অন্যদিকে বাঙালি মুসলমানদের একটি অংশের ইসলামি ঐতিহ্য ছিল বাংলার নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বিকশিত।

পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাতদের একটি অংশের মধ্যে বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় ও ইসলামি সংস্কৃতি নিয়ে অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল।

তাঁর মতে, ইসলাম ধর্ম উভয় অংশের মানুষের মধ্যে একটি সাধারণ সংযোগ সৃষ্টি করলেও সেটি সব সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক পার্থক্য দূর করতে পারেনি।

তৃতীয়ত: ধর্মীয় পরিচয়ের সীমাবদ্ধতা।

পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু জনগোষ্ঠীর কারণে শুধু ইসলামকে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি করলে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন দেখা দিত।

রওনক জাহান আরও দেখিয়েছেন, ইসলামের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়াও ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

dokumen.pub

আমার মূল্যায়ন: আমি তাঁর মূল বক্তব্যের সঙ্গে একমত, তবে ধর্মীয় পার্থক্যের চেয়ে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেব।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্ম একই ছিল। সুতরাং ধর্মীয় পরিচয় একটি সাধারণ রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু একই ধর্মাবলম্বী হওয়া মানেই একই ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার অধিকারী হওয়া নয়।

বিশেষত বাঙালি মুসলমানদের নিজস্ব বাংলা ভাষা, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যকে ইসলামবিরোধী হিসেবে দেখার প্রবণতা তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

আমার মতে, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বড় ভুল ছিল ধর্মীয় অভিন্নতাকে রাজনৈতিক আনুগত্যের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা। ধর্মীয় ঐক্যের নামে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে উপেক্ষা করার ফলেই জাতীয় সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে।

৫. ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পার্থক্য (Historical and Traditional Differences)

রওনক জাহানের বিশ্লেষণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তিনি দেখিয়েছেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ইসলামের ইতিহাস ও মুসলিম ঐতিহ্যের একটি সাধারণ ভিত্তি থাকলেও তাদের আঞ্চলিক ইতিহাস ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন।

পশ্চিম পাকিস্তানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পশ্চিম পাকিস্তানের বিশেষত পাঞ্জাব অঞ্চল বহু শতাব্দী ধরে মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগের পথ হিসেবে কাজ করেছে।

এ অঞ্চলে বিভিন্ন জাতি, সাম্রাজ্য ও সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে।

মধ্য এশীয়, পারস্য ও ভারতীয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে পশ্চিম পাকিস্তানের বিশেষত পাঞ্জাব অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে ওঠে।

পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশ ঘটেছে মূলত বঙ্গীয় বদ্বীপ, নদীনির্ভর কৃষি অর্থনীতি, বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে।

মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতানি ঐতিহ্য, বাংলার মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা, সুফি সাধকদের প্রভাব এবং পরবর্তী সময়ে মুঘল শাসন বাংলার নিজস্ব ঐতিহাসিক পরিচয় গঠনে ভূমিকা পালন করে।

রওনক জাহান উল্লেখ করেছেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের অঞ্চলটি দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রীয় গাঙ্গেয় সমভূমির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে বা অপেক্ষাকৃত স্বতন্ত্র অবস্থায় ছিল। মুঘল আমলেই বর্তমান পূর্ব পাকিস্তানের অঞ্চলগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য কেন্দ্রীয় শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়।

এই ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনপন্থীরা নিজেদের দীর্ঘ আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের ইতিহাস তুলে ধরতেন।

অন্যদিকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দুই অঞ্চলের মধ্যে ঐতিহাসিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের ইতিহাস ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের ইতিহাসকে বেশি গুরুত্ব দিত।

রওনক জাহান আরও উল্লেখ করেছেন, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর জন্য ‘Independent States’ বা স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে প্রস্তাবটি পরিবর্তন করে একক পাকিস্তানের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এটিও প্রমাণ করে যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ধারণা নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম নেতাদের মধ্যে শুরু থেকেই কিছু মতপার্থক্য ছিল।

dokumen.pub

আমার মূল্যায়ন: আমি তাঁর বিশ্লেষণের মূল বক্তব্যের সঙ্গে একমত। তবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পার্থক্যকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখা প্রয়োজন।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে অভিন্ন ধর্মীয় ইতিহাস থাকলেও তাদের আঞ্চলিক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ছিল আলাদা।

বাঙালির আত্মপরিচয় গড়ে উঠেছিল বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ভূখণ্ড, কৃষিভিত্তিক সমাজ, নদীনির্ভর জীবন এবং দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর।

অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ইতিহাসও এক ছিল না। পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতুন ও বেলুচদের নিজস্ব ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন: বাংলার ইতিহাসকে ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তর ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যাবে না। বাংলার সঙ্গে উত্তর ভারত, দিল্লি, মুঘল সাম্রাজ্য এবং ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যজগতের দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল।

একইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানকেও একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক একক হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

আমার মতে, দুই অংশের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য কোনো সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল যখন রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী একটি বিশেষ ধরনের মুসলিম জাতীয় পরিচয়কে সবার ওপর চাপিয়ে দিয়ে আঞ্চলিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছিল।

৬. সমাজ ও সংস্কৃতির পার্থক্য (Society and Culture)

যদিও আপনার উল্লেখ করা ছয়টি বিষয়ের মধ্যে এটি আলাদা করে নেই, রওনক জাহানের বিশ্লেষণে সমাজ ও সংস্কৃতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে কয়েকটি পার্থক্য চিহ্নিত করেছেন।

পূর্ব পাকিস্তান

পশ্চিম পাকিস্তান

তুলনামূলকভাবে সমজাতীয় বাঙালি ভাষাভিত্তিক সমাজ

বিভিন্ন জাতি ও ভাষার সমাজ

গ্রামীণ সমাজে স্থানীয় ও বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব

অনেক অঞ্চলে উপজাতীয় ও ভূস্বামীভিত্তিক নেতৃত্ব

কৃষিনির্ভর অর্থনীতি

কৃষির পাশাপাশি ভূমিভিত্তিক সামন্তীয় কাঠামো ও শহুরে অর্থনীতির ভিন্ন সমন্বয়

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রাধান্য

পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, বেলুচি ও উর্দু ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন সংস্কৃতি

রওনক জাহানের মতে, পশ্চিম পাকিস্তানের সমাজে উপজাতীয় বিভাজন, সামন্তীয় ভূস্বামী কাঠামো এবং আঞ্চলিক পরিচয়ের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের সমাজ ছিল তুলনামূলকভাবে কম স্তরবিন্যস্ত এবং ভাষাগতভাবে বেশি সংহত।

তিনি আরও দেখিয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামীণ সমাজে স্থানীয় নেতৃত্ব ছিল বেশি বিকেন্দ্রীভূত। বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূস্বামী ও স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারগুলোর নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে স্থায়ী ছিল।

dokumen.pub+1

আমার মূল্যায়ন: এই বিশ্লেষণের সঙ্গে আংশিক একমত।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বাস্তব পার্থক্য ছিল। বিশেষ করে পাঞ্জাবের সামন্তীয় ভূস্বামী শ্রেণি, পশতুনদের উপজাতীয় কাঠামো এবং সিন্ধি ও বেলুচদের স্বতন্ত্র সামাজিক ঐতিহ্য পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্যকে প্রকাশ করে।

তবে পূর্ব পাকিস্তানকে পুরোপুরি সমজাতীয় বা শ্রেণিবিভাজনমুক্ত সমাজ হিসেবে দেখা সঠিক নয়। পূর্ব পাকিস্তানেও জমিদার, জোতদার, কৃষক, ভূমিহীন শ্রমিক, আশরাফ-আতরাফ বিভাজন এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সামাজিক বাস্তবতা ছিল।

এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম, সাঁওতাল অঞ্চল ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তাই রওনক জাহানের তুলনাটি সামগ্রিক কাঠামো বোঝার জন্য কার্যকর হলেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমাজকে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ও অভ্যন্তরীণভাবে একক সমাজ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

৭. সামগ্রিকভাবে রওনক জাহানের সঙ্গে আমার মতৈক্য ও মতভেদ

নিচের ছকটি আমার মূল্যায়ন সংক্ষেপে তুলে ধরে।

বিষয়

আমার মূল্যায়ন

প্রধান যুক্তি

জনসংখ্যা

সম্পূর্ণ একমত

সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা কম ছিল

ভূগোল

মূলত একমত

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা যোগাযোগ ও প্রশাসনিক জটিলতা বাড়িয়েছিল

ভাষা

সম্পূর্ণ একমত

বাংলা ভাষার অধিকার অস্বীকার জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল

ধর্ম

মূল বক্তব্যে একমত

অভিন্ন ধর্ম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের জন্য যথেষ্ট ছিল না

ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মূল বক্তব্যে একমত

ভিন্ন আঞ্চলিক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ছিল; তবে তাঁর ব্যাখ্যা কিছুটা সাধারণীকৃত

সমাজ ও সংস্কৃতি

আংশিক একমত

তুলনামূলক পার্থক্য ছিল, তবে দুই অংশের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ

৮. আমার সামগ্রিক বক্তব্য: পার্থক্য নয়, বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাই ছিল মূল সংকট

এখানে আমি রওনক জাহানের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের ওপর বিশেষ জোর দিতে চাই।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে জনসংখ্যা, ভাষা, ভূগোল, ধর্মীয় জনবিন্যাস, ইতিহাস ও সংস্কৃতির পার্থক্য ছিল বাস্তব। কিন্তু শুধু এই পার্থক্যগুলোর কারণে পাকিস্তান ভেঙে যায়নি।

বিশ্বে অনেক রাষ্ট্র আছে, যেখানে একাধিক ভাষা, ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করে এবং তারা সফলভাবে একটি রাষ্ট্রের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখেছে।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল, রাষ্ট্রীয় শাসকগোষ্ঠী এই বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে একটি গণতান্ত্রিক ও বিকেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।

রওনক জাহান তাঁর বইয়ে বিশেষভাবে দেখিয়েছেন, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্র গঠনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিলেও জাতি গঠনের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।

এই ব্যর্থতা কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রকাশ পেয়েছিল।

১. রাজনৈতিক বৈষম্য: জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যথাযথ অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

২. অর্থনৈতিক বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে উন্নয়ন বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি ছিল। ফলে দুই অঞ্চলের মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান বৃদ্ধি পায়।

৩. প্রশাসনিক ও সামরিক বৈষম্য: সামরিক বাহিনী ও কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রে পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রাধান্য ছিল।

৪. সাংস্কৃতিক বৈষম্য: বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

৫. গণতান্ত্রিক সংকট: নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে প্রকৃত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করা সংকটকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়।

dokumen.pub+2

আমার মতে, এই পাঁচটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করলেই পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি ব্যর্থ হওয়ার প্রকৃত কারণ বোঝা যায়।

উপসংহার

রওনক জাহানের Pakistan: Failure in National Integration গ্রন্থে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার জনসংখ্যা, ভূগোল, ভাষা, ধর্ম, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

আমি তাঁর অধিকাংশ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত। বিশেষ করে জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনতা, বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অস্বীকৃতি পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি ব্যর্থ হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

তবে আমার মতে, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পার্থক্যগুলো নিজেরা কোনো রাষ্ট্র ভাঙনের অনিবার্য কারণ নয়। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সব জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার থাকলে এই পার্থক্যগুলো রাষ্ট্রের শক্তিতে পরিণত হতে পারত।

সুতরাং, পাকিস্তানের ভাঙনের মূল কারণ ছিল বৈচিত্র্যের অস্তিত্ব নয়; বরং বৈচিত্র্যকে স্বীকার করতে ব্যর্থ হওয়া, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক অধিকার অস্বীকার করা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদের অসম বণ্টন।

এ কারণেই ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে কেবল ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিজয় হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও গণতান্ত্রিক আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রামের ঐতিহাসিক পরিণতি হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

নির্বাচিত পাঠ ও তথ্যসূত্র

1. Rounaq Jahan, Pakistan: Failure in National Integration (1972), Columbia University Press. বিশেষত দ্বিতীয় অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১০–২৪ এবং অষ্টম অধ্যায়। গ্রন্থের ডিজিটাল পাঠ

2. Willem van Schendel, A History of Bangladesh (2020), Chapter 12: The Pakistan Experiment. পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গের ভাষা ও রাজনৈতিক সংকট বোঝার জন্য। Cambridge University Press

3. Philip Oldenburg, “A Place Insufficiently Imagined: Language, Belief, and the Pakistan Crisis of 1971” (2011). ভাষা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের দ্বন্দ্ব নিয়ে গবেষণা। The Journal of Asian Studies

4. Pakistan Bureau of Statistics — Historical Census Data. ১৯৫১ ও ১৯৬১ সালের জনসংখ্যা সম্পর্কিত তথ্য। Pakistan Population Census

একাডেমিকভাবে পড়ার সময় একটি বিষয় মনে রাখবেন: রওনক জাহানের আলোচনায় পূর্ব-পশ্চিমের সাংস্কৃতিক পার্থক্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁর বইয়ের মূল রাজনৈতিক বক্তব্য হলো—অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণকে জাতীয় সংহতি ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। এই পার্থক্যটি ধরতে পারলে তাঁর বইয়ের মূল যুক্তি আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে।

 

 

 

রওনক জাহান *Pakistan: Failure in National Integration* (১৯৭২)-এ পূর্ব-পশ্চিম ভারসাম্যহীনতাকে জাতীয় সংহতি ভাঙার পটভূমি হিসেবে সাজান। আপনার ছয়টি ক্ষেত্র তাঁর ১৯৪৭–৫৮ অধ্যায়ের মূল কাঠামোর সঙ্গে মেলে। বর্ণনা হিসেবে আমি একমত; ‘এগুলোই ভাঙনের যথেষ্ট কারণ’—এই সিদ্ধান্তে পুরোপুরি নই।

 

## জাহান যা চিহ্নিত করেছেন

 

তিনি পাকিস্তানকে **“double country”** বলেন। মোট আয়তন প্রায় ৩,৬৫,৫০০ বর্গমাইলের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান মাত্র ৫৫,১২৬ বর্গমাইল, পশ্চিম ৩,১০,৪০৩। দুই অংশের মাঝে ভারতের হাজার মাইলের বেশি ভূখণ্ড।

 

| ক্ষেত্র | তাঁর মূল পর্যবেক্ষণ |

|---|---|

| ভূগোল | অসংলগ্ন দুই দেশ; প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও প্রশাসন এককেন্দ্রিক হওয়ার কোনো ভৌগোলিক ভিত্তি নেই |

| জনসংখ্যা | পূর্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতা, কিন্তু আয়তনে প্রায় এক-সপ্তমাংশ; ঘনত্ব পশ্চিমের প্রায় সাত গুণ। ১৯৫১-এ পূর্বে ৪.১৯ কোটি, ১৯৬১-এ ৫.০৮ কোটি; পশ্চিমে যথাক্রমে প্রায় ৩.৪ ও ৪.৩ কোটি। পূর্ব গ্রামীণ, পশ্চিমে নগরায়ণ অনেক বেশি |

| ভাষা | বাংলা সমগ্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা; উর্দু মুহাজিরসহ ছোট অংশের মাতৃভাষা। তবু রাষ্ট্রভাষা, সেনা ও কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের ভাষা উর্দু |

| ধর্ম | রাষ্ট্রের একমাত্র আদর্শিক আঠা ইসলাম। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা **একক ভারতীয় মুসলিম সমাজ-সংস্কৃতি** ধরে নিয়ে আঞ্চলিক ভেদ উপেক্ষা করে |

| ইতিহাস ও ঐতিহ্য | দুই অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্মৃতি আলাদা। পূর্ব ভাষাগত-সাংস্কৃতিকভাবে অনেক বেশি অভিন্ন বাঙালি উপজাতি (*subnation*); পশ্চিম পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ ও মুহাজিরে বিভক্ত |

| সামাজিক কাঠামো | এই ঐতিহ্যগত পার্থক্যের সঙ্গে তিনি জুড়ে দেন অভিজাতের গঠন: ক্ষমতায় থাকে পশ্চিমের সামরিক-আমলা ও অবাঙালি পুঁজি; পূর্বে গড়ে ওঠে এক **ভাষাভিত্তিক বিকল্প অভিজাত** (আওয়ামী লীগ, ১৯৫২, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট) |

 

ধর্ম নিয়ে তাঁর কড়া কথা: ইসলাম রাষ্ট্র গড়তে কাজে লেগেছিল, দুই অঞ্চলকে এক জাতিতে বাঁধতে পারেনি।

 

তাঁর বই কিন্তু এখানে থেমে যায় না। মূল যুক্তি নীতি-বিশ্লেষণ—বিশেষ করে আইয়ুব আমল (১৯৫৮–৬৯)। রাষ্ট্রগঠন ও প্রবৃদ্ধিকে জাতিগঠন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের উপরে রাখা হয়; বাঙালি, বিশেষ করে ভার্নাকুলার অভিজাত, সিদ্ধান্তের কেন্দ্র থেকে বাদ পড়ে। কাঠামোগত পার্থক্য ছিল পটভূমি; ভাঙন সম্পূর্ণ হয় ক্ষমতা ভাগ না করার রাজনীতিতে।

 

## কোথায় একমত

 

**ভূগোল** বাস্তব বাধা। রাজধানী, বন্দর, সেনাসদর ও শিল্প এক ডানায়, জনসংখ্যা অন্য ডানায়—এই দূরত্ব এক অর্থনীতি ও এক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে কৃত্রিম করে তোলে। ১৯৬৫-এর যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান কার্যত অরক্ষিত পড়ে, সেই কৃত্রিমতা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। দূরত্বই বিচ্ছিন্নতার ভাগ্য নয়—অসংলগ্ন রাষ্ট্র টিকেছে অন্যত্র—কিন্তু এখানে দূরত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠকে রাজধানী দখলের শারীরিক ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে। বিচ্ছিন্নতা তাই সম্ভবও হয়, সস্তাও হয়।

 

**জনসংখ্যা** সবচেয়ে বিস্ফোরক অসমতা। গণতন্ত্র মানলে কেন্দ্রে স্থায়ী বাঙালি প্রাধান্য। পশ্চিমা অভিজাত সেই কারণেই গণতন্ত্র আটকে রাখে: যুক্তফ্রন্টের বিজয় খারিজ, ওয়ান ইউনিট (১৯৫৫) দিয়ে পশ্চিমকে এক প্রদেশ বানিয়ে সমতার অঙ্ক বদল, আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্র। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে ক্ষমতাহীনতার এই সংযোগ না থাকলে জনসংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান থাকত। এখানে জাহানের ওপর নির্ভর করা যায়।

 

**ভাষা** প্রথম গণরাজনৈতিক ফাটল। ১৯৪৮-এ জিন্নাহর ঢাকায় উর্দু-ঘোষণা এবং ১৯৫২ দেখিয়ে দেয়, ধর্ম রাষ্ট্রের নাগরিক মর্যাদা নির্ধারণ করছে না। ১৯৫৬-এ বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলেও ক্ষমতার ভাষা উর্দুই থাকে। ভাষা তাই প্রতীক নয়; চাকরি, আদালত ও আত্মসম্মানের প্রশ্ন।

 

**ধর্ম** নিয়ে তাঁর সংশয় সঠিক। দ্বিজাতিতত্ত্ব এক ‘ভারতীয় মুসলিম সংস্কৃতি’ কল্পনা করেছিল। বাংলার ইসলাম ছিল বাংলাভাষী, সুফি-লৌকিক ঐতিহ্যে গাঁথা; রাষ্ট্রীয় ইসলাম ছিল উর্দু-আশরাফ, উত্তর ভারতীয় অভিজাতের সংস্করণ। ধর্ম ১৯৪৭-এ ঐক্যের যুক্তি জুগিয়েছিল, ১৯৫২-এর পর সেই যুক্তি ক্ষয়ে যায়। একমত।

 

**ইতিহাস ও ঐতিহ্য** ব্যাখ্যা করে কেন পূর্ব দ্রুত এক উপজাতি হয়ে ওঠে, পশ্চিম হয় না। বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক স্মৃতিতে প্রজা আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভাষা ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন আছে। পশ্চিমের শাসকগোষ্ঠীর স্মৃতি দিল্লি-পাঞ্জাব-উত্তর ভারতের মুসলিম রাষ্ট্রচেতনা। সমরূপ পূর্ব বনাম বহুজাতি পশ্চিম—এই বৈপরীত্য জাহানের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ। পূর্ব একসঙ্গে দাবি তুলতে পারে; পশ্চিমে পাঞ্জাবি-মুহাজির প্রাধান্য অন্য জাতিসত্তাকে চেপে রাখে, কিন্তু বাঙালিকে চেপে রাখার মতো সাংস্কৃতিক ঐক্য তার নেই।

 

## কোথায় একমত নই, বা রিজার্ভ রাখি

 

এই ছয়টি **অবস্থা**, **কারণ** নয়। ১৯৪৬–৪৭-এ বাঙালি মুসলমান নিজেরাই পাকিস্তান বেছেছিলেন। ইতিহাস-ভাষা-ভূগোল তখনই আলাদা ছিল। ফারাক থাকলেই রাষ্ট্র ভাঙে না; ফারাককে বৈষম্য ও অপমানে পরিণত করলে ভাঙে। জাহান নিজেও আসল দায় রাখেন শাসকগোষ্ঠীর নীতিতে। ছয়টি ক্ষেত্র আলাদা করে ‘জাহানের ব্যাখ্যা’ বললে তাঁর যুক্তির অর্ধেক বাদ পড়ে।

 

বাদ পড়া অংশটুকুই সিদ্ধান্তমূলক:

 

- **অর্থনীতি।** পাটের উদ্বৃত্ত দিয়ে পশ্চিমের শিল্পায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা ও সাহায্যের অসম বণ্টন, আমদানি-প্রতিস্থাপন পশ্চিমকেন্দ্রিক। ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্ব ভূগোল থেকেই আসে, কিন্তু ব্যবধান নীতি-নির্মিত।

- **রাষ্ট্রযন্ত্র।** সেনা ও সিভিল সার্ভিসে বাঙালি প্রায় অনুপস্থিত। আইয়ুবের ‘উন্নয়ন’ পশ্চিমের ২০–৩০ পরিবারের পুঁজিকে আরও শক্তিশালী করে; বাঙালি উদ্যোক্তা সেই শ্রেণিতে ঢোকে না।

- **রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।** ১৯৫৪-এর ম্যান্ডেট অস্বীকার, ১৯৭০-এর নির্বাচন অস্বীকার। সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বীকার করলে ভূগোল সত্ত্বেও এক রাষ্ট্র টিকতে পারত—অন্তত আরও অনেকদিন, অন্য শর্তে।

 

আর একটি সূক্ষ্মতা: পশ্চিমও ঐতিহাসিকভাবে অভিন্ন নয়। জাহান এটা বলেন। কিন্তু পাঠ্যবইয়ের ছক অনেক সময় ‘পশ্চিম = এক ঐতিহ্য’ করে ফেলে। সিন্ধি, বেলুচ ও পাঠান বৈষম্যও পান; তাঁদের হাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা, এক ভাষা ও এক ভূখণ্ড একসঙ্গে ছিল না। বাঙালি বিচ্ছিন্নতা তাই কেবল ‘অত্যাচার’ নয়, **সংখ্যা + সমরূপতা + ভূগোল + বঞ্চনা**—এই চারের যোগফল।

 

ধর্মকে একেবারে অপ্রাসঙ্গিক বলাও বাড়িয়ে বলা। ১৯৪৭-এর রাষ্ট্র সেই আঠা ছাড়া জন্মায়ই না। ব্যর্থতা এই যে, শাসকেরা ধর্মকে ক্ষমতা-বণ্টনের বিকল্প ভাবা শুরু করেন। ধর্ম ঐক্যের অপ্রমাণিত প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকলে বৈষম্য আরও নগ্ন দেখায়।

 

## মোট রায়

 

জাহানের মানচিত্র ঠিক: ভূগোল এক রাষ্ট্রকে কৃত্রিম করে, জনসংখ্যা গণতন্ত্রকে পশ্চিমা অভিজাতের জন্য বিপজ্জনক করে, ভাষা প্রথম ফাটল ধরায়, ধর্ম আঠা হিসেবে অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়, ইতিহাস-ঐতিহ্য পূর্বকে এক বাঙালি উপজাতিতে এবং পশ্চিমকে বহুজাতিক শাসকজোটে ভাগ করে। এই ছয়টি ব্যাখ্যা করে **সংহতি কঠিন ছিল কেন**।

 

এগুলো একা ব্যাখ্যা করে না **সংহতি অসম্ভব ছিল কেন**। অসম্ভব হয়ে ওঠে যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের ভাষা, প্রতিনিধি ও উদ্বৃত্তকে কেন্দ্র নিয়ম করে অস্বীকার করে। জাহানের সঙ্গে আমার একমত তাঁর পূর্ণ যুক্তিতে—কাঠামোগত ফারাক পটভূমি, আর রাষ্ট্রগঠনকে জাতিগঠনের উপরে রাখাই ভাঙনের চালিকাশক্তি। ছয়টি ক্ষেত্রকে নিয়তি বানালে ১৯৪৭-এর পছন্দ এবং ১৯৫৪ বা ১৯৭০-এর অপছন্দের রাজনীতি দুটোই মুছে যায়।

 

 

 

প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান তাঁর বিখ্যাত "Pakistan: Failure in National Integration" (১৯৭২) গ্রন্থে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান বহুমুখী ভারসাম্যহীনতা ও বৈষম্য অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলো এবং সেগুলোর ওপর আমার মূল্যায়ন ও মতামত নিচে তুলে ধরা হলো:



১. রওনক জাহান কর্তৃক চিহ্নিত ভারসাম্যহীনতার ক্ষেত্রসমূহ

ড. রওনক জাহান পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার দূরত্ব ও বৈষম্যকে কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, একে কাঠামোগত ও সমাজতাত্ত্বিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিহ্নিত করেছেন:



  • জনসংখ্যা (Population): ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বেশি ছিল। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ীও পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশ। অথচ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, নীতিনির্ধারণী পরিষদ এবং আইনসভায় সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিদের নামমাত্র প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়েছিল।

 

  • ভূগোল (Geography): দুই অংশের মধ্যে ভৌগোলিক ব্যবধান ছিল প্রায় এক হাজার মাইলেরও বেশি ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন। মাঝখানে একটি শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র থাকায় এই দুই অঞ্চলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বা যাতায়াত ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ ও দুরূহ। এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক সংহতি রক্ষাকে অসম্ভব করে তুলেছিল।

 

  • ভাষা (Language): পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা (যা ছিল সমগ্র পাকিস্তানের সংখ্যাগুরুর ভাষা), আর পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা ছিল পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, বেলুচি ও উর্দু। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সংখ্যাগুরু বাঙালির ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে মাত্র কয়েক শতাংশ মানুষের ভাষা ‘উর্দুকে’ একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, যা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের জন্ম দেয়।

 

  • ধর্ম (Religion): ধর্মীয় দিক থেকে উভয় অঞ্চলেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী হওয়ায় পাকিস্তান সৃষ্টির মূল ভিত্তি ছিল অভিন্ন ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ। কিন্তু রওনক জাহান দেখিয়েছেন যে, কেবল ইসলামি একতার জিগির তুলে ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূগোলের দুটি জনপদকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে একসাথে ধরে রাখা সম্ভব নয়—বাস্তবে ধর্মীয় অভিন্নতা আঞ্চলিক বৈষম্য ও শোষণ ঢাকতে ব্যর্থ হয়েছিল।

 

  • ইতিহাস ও ঐতিহ্য (History & Heritage): পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ঐতিহাসিক বিকাশ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। পূর্ব বাংলার বাঙালি সমাজ হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, নদীমাতৃক জীবনবিকাশ, উদার সুফি সাধনা ও অসাম্প্রদায়িক লোকায়ত ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছিল। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাত শাসকশ্রেণি মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে নিজেদের মেলবন্ধন খুঁজত এবং বাঙালি ঐতিহ্যকে তারা ‘হিন্দুয়ানি প্রভাবে দুষ্ট’ বলে অবমূল্যায়ন করত।

 

  • অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য (Economic & Administrative Disparity): রওনক জাহান তাঁর গবেষণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার কাঠামোগত বৈষম্যের ওপর। বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস (পাট ও চা) পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদিত হলেও সিংহভাগ উন্নয়ন বাজেট, বৈদেশিক সাহায্য ও সামরিক ব্যয় ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। সিভিল সার্ভিস এবং সামরিক বাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের উপস্থিতি ছিল নগণ্য।

 

২. চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলোর সাথে একমত পোষণ এবং আমার মতামত

ড. রওনক জাহানের চিহ্নিত এই ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি একমত পোষণ করা ছাড়া উপায় নেই, কারণ এগুলো কোনো অনুমানমূলক বা আবেগপ্রসূত দাবি নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও ঐতিহাসিক সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ বিষয়ে আমার সুনির্দিষ্ট মতামতগুলো হলো:



  • কৃত্রিম ঐক্যের ভ্রান্তি: পাকিস্তান রাষ্ট্রটি কেবল ধর্মের টানে গঠিত হয়েছিল, যার কোনো সাধারণ ভূখণ্ড বা ভাষা ছিল না। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, একটি টেকসই জাতিরাষ্ট্র গঠনের জন্য যে অভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপাদান প্রয়োজন, তার প্রায় অনুপস্থিতি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রে। রওনক জাহান অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই দেখিয়েছেন যে, শাসকগোষ্ঠী ‘ইসলাম ও ভারতীয় জুজু’র ভয় দেখিয়ে বৈষম্য ঢাকতে চেয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত টেকেনি।

 

  • অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতা (Internal Colonialism): পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্কটি কোনো সুষম ফেডারেশনের ছিল না, বরং এটি ছিল এক ধরণের ‘অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতা’। পশ্চিম পাকিস্তান নিজেদের মেট্রোপলিস (কেন্দ্র) এবং পূর্ব পাকিস্তানকে কাঁচামাল সরবরাহকারী ও পণ্যের বাজার হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

 

  • সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব বনাম আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার: ভাষা এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনোভাব ছিল, তা বাঙালিদের আত্মমর্যাদায় আঘাত হেনেছিল। বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিল যে, পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে রাখা হবে। ফলে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির ৬ দফা এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ ছাড়া বাঙালিদের সামনে আর কোনো বিকল্প খোলা ছিল না।

 

সংক্ষেপে বলতে গেলে, রওনক জাহান তাঁর গবেষণায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, পাকিস্তানের পতনের মূল কারণ রাজনৈতিক ষড়যস্ত্র ছিল না, বরং এর মূলে ছিল দুই অঞ্চলের বহুমুখী ভারসাম্যহীনতা দূর করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম ব্যর্থতা।

 

 

 

বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ Pakistan: Failure in National Integration-এ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার চরম বৈষম্য এবং জাতীয় সংহতি অর্জনে ব্যর্থতার মূল কারণগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। আপনার উল্লেখ করা ক্ষেত্রগুলোর আলোকে রওনক জাহানের চিহ্নিত করা ভারসাম্যহীনতা এবং এ বিষয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো: [1, 2]

রওনক জাহান চিহ্নিত ভারসাম্যহীনতার ক্ষেত্রসমূহ

  • জনসংখ্যা: তৎকালীন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ (প্রায় ৫৬%) বাস করত পূর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু রওনক জাহান দেখিয়েছেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, বাজেট বরাদ্দ এবং নীতি নির্ধারণে পূর্ব পাকিস্তানের কোনো কার্যকর ভূমিকা ছিল না। [1]
  • ভূগোল: দুই অঞ্চলের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল প্রায় এক হাজার মাইল, যার মাঝখানে অবস্থান করছিল ভারত। এই বিশাল ভৌগোলিক দূরত্বকে জয় করে যে ধরনের সুষম যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সংহতি গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল, কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
  • ভাষা: পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। রওনক জাহান একে সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের এবং বাঙালিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে দেওয়ার একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। [1]
  • ধর্ম: দুই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও ধর্মের বন্ধন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ঢাকা দিতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা ধর্মকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলোকে দমন করতে চেয়েছিল। [1]
  • ইতিহাস ও ঐতিহ্য: রওনক জাহান উল্লেখ করেছেন যে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সামাজিক কাঠামো, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পূর্ব পাকিস্তানের সমাজ ছিল অনেক বেশি সমতাবাদী এবং ভাষা ও লোকজ সংস্কৃতি-কেন্দ্রিক। পক্ষান্তরে, পশ্চিম পাকিস্তানের সমাজ ছিল সামন্ততান্ত্রিক এবং আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনী-নির্ভর। [1]

এই বিশ্লেষণের সাথে সহমত পোষণ ও মতামত

ঐতিহাসিক দলিল, অর্থনৈতিক তথ্য এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণার আলোকে রওনক জাহানের এই চিহ্নিতকরণের সাথে সম্পূর্ণ একমত হওয়া যৌক্তিক। এর সপক্ষে সুনির্দিষ্ট কারণ ও মতামত নিচে দেওয়া হলো:

  1. যৌক্তিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য: জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কোনো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিল না। সরকারের সিংহভাগ রাজস্ব আয় হতো পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও সম্পদ থেকে, কিন্তু সেই অর্থ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন ও সামরিক খাতে。 রওনক জাহানের এই তত্ত্বটি ঐতিহাসিক সত্য। [1]
  2. ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব: এক হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব কেবল যাতায়াতের সমস্যা ছিল না, এটি দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা দূরবর্তী এই অঞ্চলকে একটি অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হিসেবে বিবেচনা করত।
  3. সাংস্কৃতিক ও ভাষার আধিপত্য: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে যে, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আপসহীন ছিল。 রওনক জাহান সঠিকভাবে দেখিয়েছেন যে, ভাষার ওপর আঘাত বাঙালিদের মধ্যে প্রথম স্বতন্ত্র জাতীয়তাবোধের জন্ম দেয়। [1]
  4. ধর্মীয় ঐক্যের সীমাবদ্ধতা: পাকিস্তান সৃষ্টির ভিত্তি ধর্ম (দ্বিজাতি তত্ত্ব) হলেও, কেবল ধর্মীয় মিল যে একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে না, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত না করে কেবল ধর্মের নামে শোষণ দীর্ঘস্থায়ী করা অসম্ভব। [1]

চূড়ান্ত মন্তব্য: রওনক জাহানের বিশ্লেষণটি অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার এই ভারসাম্যহীনতাগুলো কোনো কৃত্রিম বা কাল্পনিক বিষয় ছিল না; বরং এটি ছিল তৎকালীন রাষ্ট্র কাঠামোর কাঠামোগত বাস্তব রূপ, যা পরবর্তীতে পাকিস্তানের ভাঙন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে তুলেছিল。 [1]

No comments:

Post a Comment