### ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি, ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া ও উপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ভূমিকা
এই টপিকটি ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে সেনসিটিভ এবং পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আসা টপিক।
#### ১. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এমনি এমনি হয়নি। এটি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের রাজনৈতিক
ক্ষতিপূরণ হিসেবে এসেছে।
*ধাপ ১: বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)*
লর্ড কার্জন বাংলা ভাগ
করেন। পূর্ববঙ্গ + আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ - রাজধানী ঢাকা। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা
খুব খুশি। কারণ ঢাকায় হাইকোর্ট,
সচিবালয়, বিশ্ববিদ্যালয়
হবে - মুসলমানদের চাকরি হবে, উন্নতি হবে।
*ধাপ ২: বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)*
কলকাতার হিন্দু
ভদ্রলোকদের তীব্র আন্দোলনে ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গ বাতিল করে। বাংলা আবার এক হয়, রাজধানী আবার কলকাতা। পূর্ববঙ্গের
মুসলমানরা ভয়াবহ হতাশ, ক্ষুব্ধ। তারা
মনে করলো - ব্রিটিশরা আমাদের ঠকালো।
*ধাপ ৩: ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় (১৯১২-১৯২১)*
মুসলমানদের ক্ষোভ
থামাতে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালে ঢাকায় আসেন। নবাব স্যার
সলিমুল্লাহ, নবাব খাজা
আহসানউল্লাহ, শেরে বাংলা এ
কে ফজলুল হক দাবি করেন - "বঙ্গভঙ্গ দিলে না, অন্তত ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় দাও।"
লর্ড হার্ডিঞ্জ
প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর:
- *১৯১২:* নাথান কমিশন গঠিত হয় (ভাইস
চ্যান্সেলর ছিলেন রবার্ট নাথান) - বিশ্ববিদ্যালয় হবে কিনা যাচাই করার জন্য।
- *১৯১৩:* নাথান কমিশন রিপোর্ট দেয় - ঢাকায়
বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত।
- *১৯২০:* ব্রিটিশ পার্লামেন্টে *ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯২০* পাশ হয়।
- *১৯২১ সালের ১ জুলাই:* ৮৪৭ জন ছাত্র, ৩টি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান, আইন), ১২টি বিভাগ
নিয়ে যাত্রা শুরু। প্রথম ভিসি - *স্যার পি জে হার্টগ*।
*মূল পটভূমি এক লাইনে:* এটি শুধু শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল
*মুসলমানদের রাজনৈতিক দাবির ফসল এবং ব্রিটিশদের ক্ষতিপূরণ।*
#### ২. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
এটি পরীক্ষায় সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে ভদ্রলোক বলতে কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চবর্ণের হিন্দু শিক্ষিত
শ্রেণিকে বোঝানো হয় - জমিদার,
উকিল, অধ্যাপক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকজন।
তারা কেন বিরোধিতা
করেছিল? ৩টি কারণে:
*ক) কলকাতার একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙার ভয়:*
তখন কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ভারতের একমাত্র বড় বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ববঙ্গের সব ছাত্র
কলকাতায় গিয়ে পড়তো, টাকা খরচ করতো, কলকাতার মেস, বইয়ের দোকান, শিক্ষকরা লাভবান হতো। ঢাকায়
বিশ্ববিদ্যালয় হলে কলকাতার ব্যবসা কমে যাবে।
*খ) মুসলমানরা শিক্ষিত হয়ে যাবে - এই
ভয়:*
ভদ্রলোক হিন্দুরা মনে
করতো - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা শিক্ষিত হবে, চাকরি পাবে, জমিদারদের বিরুদ্ধে কথা বলবে। মুসলমানদের "অশিক্ষিত
প্রজা" হিসেবে রাখাই তাদের স্বার্থ ছিল।
*গ) সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক কারণ:*
তারা মনে করতো ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় হবে "মুসলমানদের বিশ্ববিদ্যালয়", এটি মুসলিম লীগের দাবি।
*তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? - পরীক্ষায় নামসহ লিখবে:*
*১. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা:*
কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি *স্যার আশুতোষ মুখার্জি* প্রকাশ্যে বলেন - "ঢাকায়
বিশ্ববিদ্যালয়ের দরকার নেই। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ই যথেষ্ট। পূর্ববঙ্গের ছাত্ররা
কলকাতায় আসুক।" তিনি নাথান কমিশনের বিরুদ্ধে লবিং করেন।
*২. সংবাদপত্রে অপপ্রচার:*
কলকাতার পত্রিকা
*"অমৃতবাজার পত্রিকা",
"সঞ্জীবনী"* লিখতে থাকে - "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে মক্কা
বিশ্ববিদ্যালয়, মুসলমানদের
মাদ্রাসা"। তারা প্রচার করে - এটি মুসলমানদের জন্য, হিন্দুদের জন্য নয়।
*৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বিতর্ক:*
এটি সবচেয়ে বিতর্কিত
অংশ। বলা হয় - রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালে গড়াই ব্রিজের সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
বিরোধিতা করে বলেছিলেন - *"চাষার ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে চাষ করবে কে?"*
এটি নিয়ে ঐতিহাসিকদের
মধ্যে মতভেদ আছে। অনেকে বলেন - তিনি এই কথা বলেননি, এটি বানানো। তবে এটা সত্য যে - রবীন্দ্রনাথ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে সক্রিয় ছিলেন না, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ছিলেন।
*৪. আইনসভায় বিরোধিতা:*
ভারতীয় আইনসভায় (Imperial Legislative Council) হিন্দু
সদস্যরা *সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি,
রাসবিহারী ঘোষ* ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিলের বিরোধিতা করেন। তারা বলেন -
"এত টাকা খরচ করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার দরকার নেই।"
*৫. "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বয়কট"
আন্দোলন:*
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
চালু হওয়ার পরও কলকাতার ভদ্রলোকরা পূর্ববঙ্গের হিন্দু ছাত্রদের ঢাকায় ভর্তি হতে
নিরুৎসাহিত করেন।
*তবে - সব হিন্দু বিরোধিতা করেননি:*
এটা লিখলে পরীক্ষায়
ভালো নম্বর পাবে। *রমেশচন্দ্র মজুমদার,
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, সত্যেন্দ্রনাথ
বসু* এর মতো হিন্দু পণ্ডিতরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন এবং
বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তুলেছিলেন।
#### ৩. উপনিবেশিক আমলে
পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না,
এটি ছিল পূর্ববঙ্গের *জাগরণের কেন্দ্র*।
*১. মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি:*
আগে পূর্ববঙ্গে
মুসলমানদের মধ্যে মধ্যবিত্ত ছিল না। ছিল শুধু জমিদার (হিন্দু) আর কৃষক (মুসলমান)।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম মুসলিম ডাক্তার,
উকিল, অধ্যাপক, বিসিএস অফিসার তৈরি করে। যেমন - শেরে
বাংলা, হোসেন শহীদ
সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা
ভাসানী, বঙ্গবন্ধু - সবাই এই
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিই পরে পাকিস্তান আন্দোলন ও বাংলাদেশ
আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।
*২. বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদের জন্ম:*
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মুসলমানদের শেখায় - "তুমি শুধু মুসলমান নও, তুমি বাঙালি মুসলমান"। এখানে বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। ১৯২৬ সালে
মুসলিম সাহিত্য সমাজ, বুদ্ধির
মুক্তি আন্দোলন - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু। *কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হোসেন* - এরা এখান থেকে যুক্তিবাদী
আন্দোলন শুরু করেন।
*৩. পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক রাজধানী
হওয়া:*
আগে সবকিছু কলকাতামুখী
ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর ঢাকা নিজেই একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়।
ঢাকায় লাইব্রেরি, পত্রিকা, থিয়েটার, জাদুঘর গড়ে ওঠে।
*৪. হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের পরিবর্তন:*
প্রথমে হিন্দুরা
ভেবেছিল এটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বাস্তবে এটি অসাম্প্রদায়িক হয়।
হিন্দু-মুসলিম ছাত্র একসাথে হলে থাকে,
একসাথে পড়ে। ১৯২১-১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০% ছাত্র ছিল হিন্দু। এটি
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তৈরি করে।
*৫. রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্র:*
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের আঁতুড়ঘর হয়ে ওঠে।
- ১৯৩০-এর দশকে ছাত্ররা কংগ্রেস ও মুসলিম
লীগ দুই দলেই যোগ দেয়।
- ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আন্দোলনের মূল
নেতৃত্ব দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা।
- ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়
এখান থেকে। যদিও ১৯৫২ উপনিবেশিক আমলের পরে,
কিন্তু এর বীজ ১৯২১-৪৭ সময়েই বোনা হয়েছিল।
*৬. নারী শিক্ষার প্রসার:*
১৯২১ সালে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরা ভর্তি হতে পারতো। পূর্ববঙ্গে এটি বিপ্লব ছিল। লীলা নাগ
(প্রথম ছাত্রী) এর মতো মেয়েরা এখান থেকে নারী আন্দোলন শুরু করেন।
#### উপসংহার -
"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠা ছিল কলকাতার ভদ্রলোক হিন্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের মুসলমান
কৃষকের বিদ্রোহ। ভদ্রলোকরা একে ঠেকাতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। উপনিবেশিক আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
পূর্ববঙ্গকে শুধু ডিগ্রি দেয়নি,
দিয়েছে একটি নতুন পরিচয় - 'আমরা ঢাকাইয়া, আমরা পূর্ববঙ্গীয়, আমরা কলকাতার প্রজা নই'। এই পরিচয়ই পরে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান এবং
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় -
*বাংলাদেশের জন্মভূমি*।"
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মূলত বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজের ক্ষোভ ও
উচ্চশিক্ষার বঞ্চনা মোকাবিলার রাজনৈতিক-শিক্ষা উদ্যোগ; এটি পরবর্তীকালে
পূর্ববঙ্গের মুসলিম মধ্যবিত্ত গড়ে তোলা,
জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখে।[bbc][bbc]
প্রতিষ্ঠার
পটভূমি
১৯০৫
সালে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নতুন প্রদেশ হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ
এই অঞ্চলের মানুষ প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক
ও শিক্ষাগত সুবিধা পাবে বলে আশা করেছিল;
কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে তাদের হতাশা তীব্র হয়।[bbc]
তখন
পূর্ববঙ্গে নয়টি কলেজ থাকলেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। উচ্চশিক্ষার জন্য
শিক্ষার্থীদের মূলত কলকাতার ওপর নির্ভর করতে হতো, যেখানে উচ্চবর্ণের হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রাধান্য ছিল।[bbc]
ব্রিটিশ
ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়
স্থাপনের ঘোষণা দেন। ইতিহাসবিদরা একে বঙ্গভঙ্গ রদের “ক্ষতিপূরণ” বা “splendid imperial compensation” হিসেবে
ব্যাখ্যা করেন—অর্থাৎ মুসলিম সমাজকে শান্ত করার একটি ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক ছাড়।[bbc][bbc]
ঢাকার
নবাব স্যার সলিমুল্লাহ এই দাবির অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন; তাঁর মৃত্যুর পর
নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং আবুল কাশেম ফজলুল হক আন্দোলন এগিয়ে নেন।
সলিমুল্লাহর দান করা ৬০০ একর জমির ওপরই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে।[bbc]
১৯২০
সালের ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইনে গভর্নর জেনারেলের সম্মতি আসে এবং ১৯২১
সালের ১ জুলাই ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়।[bn.wikipedia]
ভদ্রলোক
হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
কলকাতার
শিক্ষিত ও প্রভাবশালী হিন্দু ভদ্রলোক সমাজের একটি বড় অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করে। তাঁরা একে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের পর ব্রিটিশদের
“প্রতিশোধ” ও বাংলাকে সাংস্কৃতিকভাবে ভাগ করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন।[bangla.thedailystar]
তাঁদের
প্রতিক্রিয়ার প্রধান দিকগুলো ছিল:
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিপত্যের হুমকি: তাঁরা ভয় পান
যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ বাড়লে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ, শিক্ষক, ছাত্র ও
মর্যাদা কমবে।[bbc]
- সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উদ্বেগ: মুসলিম-প্রধান
পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠাকে অনেকে মুসলিম স্বার্থরক্ষার পদক্ষেপ
হিসেবে দেখেন এবং এতে হিন্দু মধ্যবিত্তের শিক্ষাগত একচ্ছত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে
বলে মনে করেন।[bangla.thedailystar]
- সরকারি স্মারকলিপি ও প্রতিবাদ: ১৯১২ সালের ১২
ফেব্রুয়ারি ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল লর্ড হার্ডিঞ্জের
কাছে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতামূলক স্মারকলিপি পেশ করে।[bbc]
- নেতৃস্তরের বিরোধ: কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও রাজনীতিক
সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি এর বিরোধিতার অন্যতম মুখ ছিলেন। পরে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন অধ্যাপক পদ পাওয়ার পর আশুতোষের বিরোধিতা
কমে আসে এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগেও সহায়তা করেন।[bbc]
তবে এই
বিরোধিতাকে সম্পূর্ণভাবে শুধু “হিন্দু বনাম মুসলমান” হিসেবে দেখা যায় না। এর
সঙ্গে কলকাতা কেন্দ্রিক শিক্ষা-বাণিজ্য ও সামাজিক স্বার্থ, বঙ্গভঙ্গ রদের
রাজনৈতিক ক্ষোভ এবং ঔপনিবেশিক বিভাজন নীতি—সবই জড়িত ছিল।[bangla.thedailystar]
উপনিবেশিক
সমাজে ভূমিকা
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ঔপনিবেশিক স্বার্থ ছিল স্পষ্ট: ব্রিটিশরা
চেয়েছিল অসন্তুষ্ট মুসলিম সমাজকে কিছুটা ছাড় দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ
করতে এবং হিন্দু-মুসলিম মধ্যবিত্তের মধ্যে বিভেদ বজায় রাখতে।[bangla.thedailystar]
কিন্তু
বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি শাসকদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি রূপান্তরমূলক ভূমিকা
পালন করে। এটি পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া অঞ্চল থেকে শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত
তৈরিতে সহায়তা করে, যারা
পরে সরকারি চাকরি, পেশাজীবী
শ্রেণি এবং রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।[eurasiareview]
বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রথম উপাচার্য পি. জে. হার্টগ মেধাবী শিক্ষক নিয়োগে জোর দেন। এতে সত্যেন বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, রমেশচন্দ্র মজুমদার
প্রমুখ শিক্ষক আসেন; এদের
অনেকেই ছিলেন হিন্দু, কিন্তু
তাঁরা শিক্ষাচর্চাকে সাম্প্রদায়িক স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখেন।[bangla.thedailystar]
ফলে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় “মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়” হয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি একটি
আধুনিক, তুলনামূলক
ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। প্রথম ব্যাচের ৮৭৭ জন
শিক্ষার্থীর মধ্যে মুসলমান ছিলেন মাত্র ১৭৮ জন, যা প্রমাণ করে যে প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক মুসলিম-কেন্দ্রিক
উদ্দেশ্য সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হয়নি।[bangla.thedailystar]
রাজনৈতিক
ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
উপনিবেশিক
আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি পূর্ববঙ্গের
নতুন সামাজিক স্তর ও রাজনৈতিক চেতনার উৎস হয়ে ওঠে। এর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি
চেতনা এবং পরবর্তী বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে যুক্ত হন।[bangla.thedailystar]
একই
সঙ্গে এটি পূর্ববঙ্গকে কলকাতার সাংস্কৃতিক একচ্ছত্র থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করে।
ঢাকা ধীরে ধীরে শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য ও রাজনৈতিক
চিন্তার একটি স্বতন্ত্র কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়—যা পরবর্তী বাংলাদেশের
রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের পটভূমি তৈরি করে।[bbc][bangla.thedailystar]
সংক্ষেপে, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় ঔপনিবেশিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে জন্ম নিলেও পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজের
শিক্ষায় উত্তরণ, মধ্যবিত্ত
সৃষ্টি, ব্রিটিশবিরোধী
রাজনীতি এবং পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত
হয়।[bbc][bangla.thedailystar][eurasiareview]
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিষ্ঠা,
বিরোধিতা ও ঔপনিবেশিক সমাজে ভূমিকা
১.
প্রতিষ্ঠার পটভূমি
বঙ্গভঙ্গ
ও তার রদ। ১৯০৫
সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা নতুন প্রদেশ "পূর্ববঙ্গ ও আসাম"-এর রাজধানী
হয়। লর্ড কার্জন ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ভেবেছিলেন বলে বলা হয়। কিন্তু
১৯১১ সালের দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষিত হলে ঢাকার প্রশাসনিক মর্যাদা হারায়।
এতে পূর্ববঙ্গের মুসলমান নেতৃত্ব ক্ষুব্ধ হয়।
ক্ষতিপূরণের
দাবি। ১৯১২
সালের জানুয়ারিতে বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে এলে নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে
একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানায়। হার্ডিঞ্জ আশ্বাস
দেন। এরপর রবার্ট নাথানের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটি অক্সফোর্ড-কেমব্রিজের আদলে একটি
আবাসিক, শিক্ষণভিত্তিক
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব করে।
গভীরতর
কাঠামোগত কারণ।
- বাংলার জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মুসলমান হলেও
উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে তাদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মূলত হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে।
- উপনিবেশিক প্রশাসন মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে
তুলে রাজনৈতিক ভারসাম্য আনতে চেয়েছিল। বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি একই
সঙ্গে শিক্ষাগত বৈষম্য দূর করার প্রচেষ্টা এবং কলকাতাকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী
রাজনীতির পাল্টা শক্তি তৈরির কৌশল।
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে পরিকল্পনা বিলম্বিত হয়।
১৯২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয় এবং ১৯২১ সালের ১ জুলাই ফিলিপ
হার্টগের উপাচার্যত্বে যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে ছিল তিনটি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান, আইন), প্রায় ১২টি
বিভাগ, কয়েক
শ ছাত্র এবং তিনটি আবাসিক হল: সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল
(বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) ও জগন্নাথ হল। রমনা এলাকার প্রায় ছয় শ একর জমি এবং
কার্জন হল ও পুরোনো সচিবালয়ের ভবন এর ভিত্তি হয়।
২.
ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া
ছিল জটিল ও বহুস্তরীয়, একরৈখিক
বিরোধিতা নয়।
বিরোধিতার
যুক্তি ও প্রেরণা:
- বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি। ভদ্রলোক সমাজ
বঙ্গভঙ্গ রদকে নিজেদের বিজয় মনে করেছিল। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকেই
দেখেছিলেন মুসলমানদের জন্য সরকারের "সান্ত্বনা পুরস্কার" হিসেবে, এবং এতে
সাম্প্রদায়িক তোষণের গন্ধ পেয়েছিলেন।
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ। স্যার আশুতোষ
মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মনে করতেন, নতুন
বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতার আধিপত্য,
তহবিল ও এখতিয়ার ক্ষুণ্ণ করবে। অপচয় ও সম্পদের বিভাজনের যুক্তিও
তোলা হয়।
- চাকরির বাজার ও সামাজিক প্রতিপত্তি। মুসলমান
শিক্ষিত শ্রেণির উত্থান হলে সরকারি চাকরি ও পেশায় ভদ্রলোকদের একচেটিয়া
অবস্থান হুমকির মুখে পড়বে,
এমন আশঙ্কা ছিল।
- প্রতিষ্ঠানগত উদ্বেগ। ঢাকার
হিন্দু-পরিচালিত কলেজগুলো (যেমন জগন্নাথ কলেজ) নতুন কাঠামোয় কীভাবে
অন্তর্ভুক্ত হবে, তা
নিয়ে আপত্তি ও দরকষাকষি ছিল। এছাড়া ব্যয়বহুল আবাসিক মডেল সাধারণ ছাত্রদের
নাগালের বাইরে যাবে, এমন
সমালোচনাও ছিল।
- পত্রপত্রিকা,
সভা-সমিতি ও স্মারকলিপির মাধ্যমে এই আপত্তি প্রকাশ পায়।
জটিলতা
ও পাল্টা দিক:
- সব হিন্দু বিরোধী ছিলেন না। পূর্ববঙ্গের হিন্দু
জমিদার ও শিক্ষানুরাগীরা সহায়তা করেছেন (জগন্নাথ হলের নাম সন্তোষের জমিদার
জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে)। আইন পাসের পর হিন্দু শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের
মান গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন,
যেমন সত্যেন্দ্রনাথ বসু,
রমেশচন্দ্র মজুমদার,
সুশীলকুমার দে। প্রথম দিকে শিক্ষার্থীদের বড় অংশও ছিল হিন্দু।
- ঐতিহাসিকরা তাই বিরোধিতাকে কেবল সাম্প্রদায়িকতা
নয়, শ্রেণিস্বার্থ, প্রতিষ্ঠানগত
প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক অবিশ্বাসের মিশ্রণ হিসেবে দেখেন। মুসলমান পক্ষের
ভাষ্যে অবশ্য এই বিরোধিতা ভদ্রলোক সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থরক্ষার প্রয়াস
হিসেবেই প্রধানত চিত্রিত হয়,
আর হিন্দু পক্ষের ভাষ্যে তা সরকারের বিভাজননীতির বিরুদ্ধে বৈধ আপত্তি।
দুই ভাষ্যেই আংশিক সত্য আছে।
৩.
ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ভূমিকার বিশ্লেষণ
ক.
মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ। বিশ্ববিদ্যালয় ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হল পূর্ববঙ্গের
মুসলমান তরুণদের উচ্চশিক্ষার প্রধান প্রবেশপথ হয়ে ওঠে। ফলে চাকরি, আইন, শিক্ষকতা ও
রাজনীতিতে শিক্ষিত মুসলমান নেতৃত্বের একটি স্তর তৈরি হয়, যা পরবর্তী
দশকগুলোর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
খ.
বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ।
১৯২৬ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও তার মুখপত্র শিখা-কে কেন্দ্র করে "বুদ্ধির
মুক্তি" আন্দোলন গড়ে ওঠে। আবুল হুসেন,
কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী
মোতাহার হোসেন প্রমুখ ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী চিন্তার
পক্ষে দাঁড়ান। বিজ্ঞানে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কাজ (১৯২৪ সালের বোস-আইনস্টাইন
পরিসংখ্যান) ঢাকায় থেকেই সম্পন্ন হয়। মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা
বাংলা ভাষা ও পূর্ববঙ্গীয় আত্মপরিচয়ের ভিত্তি দৃঢ় করে।
গ.
রাজনৈতিক চেতনা ও আন্দোলন।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররাজনীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
১৯২০-৩০-এর দশকে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী গোষ্ঠী, আইন অমান্য আন্দোলন ও পরে মুসলিম লীগ-কংগ্রেস রাজনীতিতে
শিক্ষার্থীদের সক্রিয়তা দেখা যায়।
ঘ.
সাম্প্রদায়িক বিভাজনের প্রতিফলন। পরিহাসের বিষয় হলো, যে প্রতিষ্ঠান সমাজকে আধুনিক করতে চেয়েছিল, তা-ই ক্রমে সমাজের
সাম্প্রদায়িক ফাটলের আয়না হয়ে ওঠে। মুসলিম হল ও জগন্নাথ হলকে ঘিরে পরিচিতির
রাজনীতি, ত্রিশ-চল্লিশের
দশকে দাঙ্গা-উত্তেজনা এবং পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলমান শিক্ষার্থীদের জোরালো সমর্থন
তার প্রমাণ।
ঙ.
সীমাবদ্ধতা।
- বিশ্ববিদ্যালয় ছিল অভিজাত ও ক্ষুদ্র পরিসরের
প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ কৃষকসমাজ,
নিম্নবর্ণ ও নারীদের কাছে এর নাগাল ছিল খুবই সীমিত (প্রথম নারী
শিক্ষার্থী লীলা নাগ ভর্তি হন ১৯২৩ সালে)।
- সরকারি তহবিলের টানাটানি ও ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ
(চ্যান্সেলর ছিলেন গভর্নর) স্বাধীন বিকাশে বাধা দিয়েছে।
সামগ্রিক
মূল্যায়ন
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক নীতির ফসল এবং পূর্ববঙ্গের সামাজিক আকাঙ্ক্ষার
প্রকাশ। উপনিবেশবাদী প্রশাসন একে রাজনৈতিক ভারসাম্যের কৌশল হিসেবে দেখেছে, মুসলমান নেতৃত্ব
দেখেছে শিক্ষাগত বঞ্চনার প্রতিকার হিসেবে,
আর ভদ্রলোক সমাজ দেখেছে আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। অথচ বাস্তবে
প্রতিষ্ঠানটি হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মনীষীদের সম্মিলিত কর্মক্ষেত্র
হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালি
জাতীয়তাবাদী চেতনার উৎসভূমিতে পরিণত হয়।
দ্রষ্টব্য:
সংখ্যা ও তারিখের খুঁটিনাটির জন্য সিরাজুল ইসলম সম্পাদিত বাংলাপিডিয়া, সুফিয়া আহমেদের Muslim Community in Bengal*, এবং
রমেশচন্দ্র মজুমদার ও মুনতাসীর মামুনের ঢাকা বিষয়ক গবেষণা দেখা যেতে পারে। চাইলে
আমি কোনো একটি অংশ (যেমন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন বা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের
অবস্থান) আরও বিস্তারিত করতে পারি।*
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রতিষ্ঠা কোনো সরল শিক্ষায়তনিক উদ্যোগ ছিল না; এটি ছিল ঔপনিবেশিক বাংলার সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক
ক্ষমতা-সম্পর্কের এক জটিল ফসল। এর পটভূমি,
বিরোধিতা এবং উপনিবেশিক পূর্ববঙ্গে এর ভূমিকা—এই তিনটি দিক পরস্পর জড়িত।
### 🏛️ প্রতিষ্ঠার পটভূমি: 'ক্ষতিপূরণ' থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
জন্মসূত্র সরাসরি **১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও ১৯১১ সালে তার রদবাদের** সঙ্গে যুক্ত।
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলাকে ভাগ করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠন করেন, যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববঙ্গের
পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ খুলে দেওয়া। কিন্তু
পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু নেতৃত্বের প্রবল বিরোধিতার মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা
হয়। এই রদবাদ পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করে।
এই রাজনৈতিক ক্ষোভ
প্রশমিত করার জন্যই ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার
প্রতিশ্রুতি দেয়। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের ভাষায়, এটি ছিল বঙ্গভঙ্গ রদের **'ক্ষতিপূরণ'**; লর্ড লিটন এটিকে বলেছিলেন **'স্প্লেনডিড ইম্পেরিয়াল কমপেনসেশন'**। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভাইসরয় লর্ড
হার্ডিঞ্জ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেন। এর মাত্র
তিন দিন আগে নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ,
নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী,
এ কে ফজলুল হক প্রমুখ মুসলিম নেতারা ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই দাবি
জানিয়েছিলেন। এরপর ১৯১২ সালে রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে নাথান কমিশন গঠিত হয়, ১৯১৭ সালে স্যাডলার কমিশন ইতিবাচক সুপারিশ
করে, এবং অবশেষে ১৯২০ সালের
১৩ মার্চ **ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট** পাসের মাধ্যমে আইনি পথ প্রশস্ত হয়। ১৯২১
সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
### ⚔️
ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া: বাজেট,
ক্ষমতা ও 'মক্কা
বিশ্ববিদ্যালয়'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার নেতৃত্বে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোক হিন্দু এলিট—বিশেষত
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য **স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়** এবং রাজনীতিক
**সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী**। তাদের বিরোধিতার পেছনে মূলত দুটি ভয় কাজ করেছিল:
1. **আর্থিক ও
প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতি:** তাদের আশঙ্কা ছিল,
ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দকৃত বাজেট কেটে
নেওয়া হবে।
2. **রাজনৈতিক প্রভাব
হারানো:** পূর্ববঙ্গের rising
generation-এর ওপর কলকাতা-কেন্দ্রিক ভদ্রলোক শ্রেণির যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তা খর্ব করবে বলে
তারা মনে করেছিলেন।
শুধু বাজেট ভয় নয়, হিন্দু সমাজের একটি অংশ ঢাকাকে **'মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়'** বা ব্যঙ্গ করে **'মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়'** বলে উপহাস করেছিল। তবে এই বিরোধিতা
সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক ছিল না। কিছু মুসলমানও—যেমন কলকাতার একদল মুসলিম ও
পূর্ববঙ্গের কিছু শিক্ষাবিদ—বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায়
বিনিয়োগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। আবার অন্যদিকে বালিয়াটির জমিদার জগন্নাথ রায়
চৌধুরীর মতো হিন্দু ব্যক্তিত্বও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জমি দান করে সমর্থন জানান।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতার প্রশ্নটি বিতর্কিত; অনেক গবেষক সরাসরি প্রমাণ না পেয়ে এটিকে অতিরঞ্জিত বলে মনে
করেন।
### 🎓 উপনিবেশিক পূর্ববঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আসেনি;
এটি উপনিবেশিক পূর্ববঙ্গের social
fabric-এ গভীর প্রভাব রেখেছিল:
- **মুসলিম মধ্যবিত্তের সৃষ্টি:**
বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ববঙ্গে একটি শিক্ষিত **মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ** গড়ে তুলতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে,
যারা পরবর্তীতে সমাজ, সংস্কৃতি ও
রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব ছিল
অত্যন্ত কম; ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় সেই বৈষম্যের বিকল্প তৈরি করে।
- **জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রজননস্থল:** এটি
পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজে **বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা** বিকাশের একটি
কেন্দ্রীয় পরিসর হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলনসহ berbagai
রাজনৈতিক ধারার সূতিকাগার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সুবিদিত।
- **সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক জাগরণ:** ১৯২০-এর
দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের তরুণ শিক্ষক-ছাত্ররা **'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'** গঠন করেন, যা বাঙালি মুসলিম সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক নতুন
ধারার সূচনা করে।
- **প্রতিষ্ঠানগত মান ও বৈপরীত্য:** প্রথম
যুগে উচ্চমানের শিক্ষকমণ্ডলীর কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় **'প্রাচ্যের অক্সফোর্ড'** নামে পরিচিতি পায়। তবে একই সঙ্গে এর একটি
দ্বৈত চরিত্রও ছিল—এটি ঔপনিবেশিক সরকারের 'ক্ষতিপূরণ' ও নীতি-সমর্থক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেও
দেখা হয়েছে, যেখানে সরকারি
চাকরির জন্য উপযোগী জনশক্তি তৈরির উদ্দেশ্যও নিহিত ছিল।
সামগ্রিকভাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা
ঔপনিবেশিক বাংলার **সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও ক্ষমতা-সংগ্রামের** এক প্রত্যক্ষ। ভদ্রলোক
হিন্দু এলিটের বিরোধিতা সত্ত্বেও এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কালক্রমে পূর্ববঙ্গের
মুসলিম মধ্যবিত্ত ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি,
প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া এবং ঔপনিবেশিক
পূর্ববঙ্গীয় সমাজে এর ভূমিকা
ভূমিকা
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ঘটনা ছিল না; এটি ছিল বিংশ
শতাব্দীর প্রথম দিকের বাংলার রাজনৈতিক,
সাম্প্রদায়িক, অর্থনৈতিক
ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ
রদ, পূর্ববঙ্গের
মুসলমানদের শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা,
কলকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রলোক সমাজের আধিপত্য এবং ব্রিটিশ সরকারের ঔপনিবেশিক
রাজনৈতিক কৌশল—এসব বিষয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশেষ
করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে কলকাতার উচ্চবর্ণীয় শিক্ষিত
হিন্দু ভদ্রলোক সমাজের একাংশের বিরোধিতা তৎকালীন বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক
ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে আসে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ববঙ্গের মুসলিম
মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ, আধুনিক
জ্ঞানচর্চা, সাংস্কৃতিক
পুনর্জাগরণ এবং নতুন রাজনৈতিক চেতনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিষয়টি
তিনটি পর্যায়ে আলোচনা করা যায়।
১. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
ক. ১৯০৫
সালের বঙ্গভঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের শিক্ষাগত বিকাশ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পটভূমি হলো ১৯০৫
সালের বঙ্গভঙ্গ।
১৯০৫
সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের শাসনামলে বাংলাকে বিভক্ত করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম
নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। ঢাকাকে এই নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয়েছিল।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বিহার ও উড়িষ্যা যুক্ত ছিল।
বঙ্গভঙ্গের
ফলে পূর্ববঙ্গের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক
ও শিক্ষাগত বিকাশের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। কারণ ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার উচ্চশিক্ষা, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং
বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের প্রধান কেন্দ্র ছিল কলকাতা।
পূর্ববঙ্গের
জনগোষ্ঠী, বিশেষ
করে মুসলমানরা, দীর্ঘদিন
ধরে উচ্চশিক্ষা ও প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত ছিল। এর পেছনে
অর্থনৈতিক দুর্বলতা, আধুনিক
শিক্ষায় প্রবেশের সীমাবদ্ধতা এবং কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব কাজ
করেছিল।
একটি
পরিসংখ্যান থেকে এই বৈষম্যের ধারণা পাওয়া যায়। বঙ্গভঙ্গের পূর্ববর্তী সময়ে মোট
৪৫টি কলেজের মধ্যে পূর্ববঙ্গ ও আসাম অঞ্চলে ছিল মাত্র ১৫টি। ফলে পূর্ববঙ্গের
শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতামুখী হতে হতো।
bose.res.in+1
১৯০৫
থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে নতুন প্রদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার পরিসর
সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকা কলেজের উন্নতি, প্রকৌশল ও চিকিৎসা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ এবং
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঢাকায় একটি আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠার ভিত্তি
তৈরি হয়েছিল।
ciu.edu.bd+1
খ. ১৯১১
সালের বঙ্গভঙ্গ রদ ও মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া
১৯১১
সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে সম্রাট পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। এর
ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ বিলুপ্ত হয় এবং ঢাকা তার রাজধানীর মর্যাদা হারায়।
বঙ্গভঙ্গ
রদ পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের একটি বড় অংশের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে। কারণ
তাঁরা মনে করেছিলেন, নতুন
প্রদেশ গঠনের ফলে পূর্ববঙ্গের প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে
তা আবার বাধাগ্রস্ত হবে।
বিশেষ
করে মুসলিম জমিদার, নবাব, পেশাজীবী ও শিক্ষিত
মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব মনে করেছিল,
কলকাতাকেন্দ্রিক প্রশাসন ও উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে গেলে পূর্ববঙ্গের
মুসলমানদের স্বার্থ আবার উপেক্ষিত হতে পারে।
এই
পরিস্থিতিতে ঢাকার নবাব
স্যার খাজা সলিমুল্লাহ
পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষাগত উন্নয়নের জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নবাব সৈয়দ নওয়াব
আলী চৌধুরী এবং এ কে ফজলুল হকসহ পূর্ববঙ্গের অন্যান্য মুসলিম নেতা।
বঙ্গভঙ্গ
রদের পর সলিমুল্লাহ ১৯১১ সালের ২০ ডিসেম্বর ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে একটি
চিঠি পাঠান। এতে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষার উন্নয়নের জন্য সরকারি উদ্যোগের
প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়।
গ. লর্ড
হার্ডিঞ্জের সঙ্গে মুসলিম প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ
১৯১২
সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে
পূর্ববঙ্গের ১৯ সদস্যবিশিষ্ট মুসলিম প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করে।
প্রতিনিধিদলটি
পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা দূর করার জন্য বিভিন্ন দাবি উত্থাপন
করে। এর মধ্যে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
লর্ড
হার্ডিঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি সমর্থন করেন এবং ১৯১২ সালের ২
ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করার
সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।
পরবর্তী
সময়ে ২৭ মে ১৯১২ সালে রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
এটি নাথান কমিটি নামে পরিচিত। কমিটির উদ্দেশ্য ছিল ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার
একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করা।
নাথান
কমিটি ১৯১২ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রতিবেদন জমা দেয়। ১৯১৩ সালে প্রতিবেদনটি
অনুমোদিত হলেও কলকাতাকেন্দ্রিক বিরোধিতা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ বিলম্বিত হয়।
Dhaka University+2
ঘ.
স্যাডলার কমিশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন
১৯১৭
সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাবলি এবং বাংলার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার
পুনর্গঠনের জন্য স্যার মাইকেল স্যাডলারের নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন গঠন
করা হয়।
এই
কমিশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটিও পর্যালোচনা করে। ১৯১৯ সালের ১৮
মার্চ কমিশন তার প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং ঢাকায় একটি স্বতন্ত্র, আবাসিক ও
শিক্ষাদানভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দেয়।
অবশেষে
১৯২০ সালের ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন (Dacca University Act, 1920) পাস হয়।
১৯২১
সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠালগ্নে
বিশ্ববিদ্যালয়টির ছিল:
- ৩টি অনুষদ—কলা, বিজ্ঞান ও আইন।
- ১২টি বিভাগ।
- ৬০ জন শিক্ষক।
- ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী।
- ৩টি আবাসিক হল—সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল ও
জগন্নাথ হল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রথম উপাচার্য ছিলেন স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ।
Dhaka University+2
২. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ঘোষিত হওয়ার পর কলকাতার শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোক
সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিরোধিতা শুরু করে।
এখানে
‘ভদ্রলোক’ বলতে মূলত ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বাংলার ইংরেজি-শিক্ষিত উচ্চবর্ণীয়
হিন্দু জমিদার, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও
রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বোঝানো হচ্ছে। কলকাতাকেন্দ্রিক এই শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে বাংলার
প্রশাসন, উচ্চশিক্ষা, সাহিত্য ও
বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল।
তবে মনে
রাখতে হবে, সব
হিন্দু ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেননি। বিরোধিতাটি প্রধানত
কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও শিক্ষিত সমাজের একটি অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
ক.
বঙ্গভঙ্গ রদের পরও বাংলাকে বিভক্ত করার আশঙ্কা
বিরোধিতার
অন্যতম প্রধান যুক্তি ছিল, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও বাংলার মধ্যে নতুন করে একটি
শিক্ষাগত বিভাজন সৃষ্টি হবে।
১৯১২
সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আইনজীবী ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি হিন্দু প্রতিনিধিদল
লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
তারা
আশঙ্কা প্রকাশ করে যে ঢাকায় একটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে তা বাংলার
জাতীয় জীবনে এক ধরনের ‘অভ্যন্তরীণ বিভাজন’ বা Internal Partition of Bengal সৃষ্টি করবে।
তাদের
যুক্তি ছিল, বাংলার
হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে একটি অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগ থাকা
প্রয়োজন। পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে দুই অঞ্চলের মধ্যে শিক্ষাগত ও
সাংস্কৃতিক দূরত্ব বাড়তে পারে।
এই
যুক্তির মধ্যে বঙ্গভঙ্গবিরোধী জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব ছিল।
The Daily Star+1
খ.
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও আধিপত্য রক্ষার চেষ্টা
বিরোধিতার
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একচ্ছত্র প্রভাব ও মর্যাদা
রক্ষার প্রশ্ন।
তৎকালীন
বাংলার উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলার বিভিন্ন
অঞ্চলের কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়টির হাতে উচ্চশিক্ষা
ও ডিগ্রি প্রদানের প্রধান কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত ছিল।
ঢাকায়
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীরা কলকাতার ওপর
নির্ভরশীলতা কমাতে পারবে। এর ফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আর্থিক বরাদ্দ, প্রাতিষ্ঠানিক
ক্ষমতা ও প্রভাব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করেন।
তিনি
মনে করতেন, ঢাকায়
একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, সরকার ঢাকাকে
অতিরিক্ত অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা দিলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে পড়বে।
ব্রিটিশ
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গবেষক জাহেদা আহমদের গবেষণায় দেখা যায়, কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটও নাথান কমিটির প্রস্তাবের সমালোচনা করেছিল। তাদের
বক্তব্যে কলকাতার ঐতিহাসিক শিক্ষাগত গুরুত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাদেশিক ও
জাতীয় মর্যাদা বজায় রাখার প্রশ্নটি বিশেষভাবে উঠে আসে।
SOAS Eprints+1
গ.
পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উপযুক্ত নয়—এমন ধারণা
বিরোধিতার
আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে
অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি।
হিন্দু
প্রতিনিধিদল যুক্তি দিয়েছিল, পূর্ববঙ্গের
অধিকাংশ মুসলমান দরিদ্র কৃষক। তাদের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করা
সম্ভব নয়। ফলে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেও মুসলমান কৃষকসমাজের বাস্তব
কোনো উপকার হবে না।
এ ধরনের
বক্তব্যে পূর্ববঙ্গের কৃষিনির্ভর মুসলমান সমাজের প্রতি তৎকালীন উচ্চবিত্ত শিক্ষিত
শ্রেণির অবজ্ঞা এবং শ্রেণিগত দূরত্ব প্রতিফলিত হয়েছিল।
অর্থাৎ, একদিকে বলা হচ্ছিল
পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা শিক্ষায় পিছিয়ে আছে;
অন্যদিকে তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগকেও অপ্রয়োজনীয় বলে
বিবেচনা করা হচ্ছিল।
এটি ছিল
বিরোধিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ববিরোধিতা।
Jagannath University+1
ঘ.
সরকারি অর্থ ও চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার আশঙ্কা
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অর্থনৈতিক
ও পেশাগত স্বার্থ।
ঔপনিবেশিক
বাংলার প্রশাসন, আইন
পেশা, শিক্ষা
ও বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির
উল্লেখযোগ্য প্রাধান্য ছিল।
ঢাকায়
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষিত পেশাজীবী, শিক্ষক, আইনজীবী ও সরকারি
চাকরিজীবীর সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতো।
ফলে
প্রচলিত পেশাগত কাঠামোয় নতুন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারত।
নওয়াব
আলী চৌধুরী ১৯১২ সালের মার্চ মাসে মুসলিম লীগের সম্মেলনে যুক্তি দিয়েছিলেন যে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতার পেছনে কলকাতার রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ
হারানোর আশঙ্কা কাজ করছিল। কিছু পরবর্তী গবেষণাতেও সরকারি চাকরি ও পেশাগত আধিপত্য
হারানোর আশঙ্কাকে বিরোধিতার একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে এই
আশঙ্কাকে সব বিরোধীর প্রকাশ্য বক্তব্য বা একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা উচিত নয়।
Jagannath University+1
ঙ.
ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক তৎপরতা
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধীরা কেবল মৌখিক আপত্তি জানায়নি। তারা বিভিন্ন সংবাদপত্র, সভা-সমিতি এবং
রাজনৈতিক প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে বিরোধিতা প্রকাশ করে।
১৯১২
সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে ভাইসরয়ের কাছে স্মারকলিপি পেশ ছিল
এই বিরোধিতার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
অন্যদিকে, সলিমুল্লাহ ও নওয়াব
আলী চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে জনমত সংগঠিত করতে থাকেন।
ফলে
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি ক্রমে হিন্দু-মুসলমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের
মধ্যে বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়।
Jagannath University+1
চ.
বিরোধিতা সর্বজনীন ছিল না: একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকে সব হিন্দু সমাজের মনোভাব হিসেবে দেখা
ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়।
প্রথমত, নাথান কমিটিতে
হিন্দু প্রতিনিধিরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
দ্বিতীয়ত, কিছু হিন্দু শিক্ষক
ও বুদ্ধিজীবী ঢাকায় একটি স্বায়ত্তশাসিত,
আবাসিক ও শিক্ষাদানভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
তৃতীয়ত, আশুতোষ
মুখোপাধ্যায়ের অবস্থানও পুরোপুরি সরল ছিল না। তিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার
বিরোধিতা করলেও তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের
বিরোধী নন; বরং
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার
বিরোধিতা করছিলেন।
Jagannath University+2
আরও
একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠার
সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ জন শিক্ষকের মধ্যে ৪৫ জন ছিলেন হিন্দু, ১১ জন মুসলমান এবং
৪ জন ইউরোপীয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির আইনেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষক বা
শিক্ষার্থী গ্রহণে বৈষম্য নিষিদ্ধ করার বিধান ছিল। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠার
রাজনৈতিক পটভূমি মুসলমানদের শিক্ষাগত উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টি
আইনগতভাবে কেবল মুসলমানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত কোনো সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান ছিল না।
ciu.edu.bd+1
সুতরাং, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতার পেছনে বঙ্গভঙ্গবিরোধী জাতীয়তাবাদী অবস্থান, কলকাতার শিক্ষাগত
কর্তৃত্ব রক্ষা, আর্থিক
স্বার্থ এবং সাম্প্রদায়িক ও শ্রেণিগত মনোভাব—সবগুলোই বিভিন্ন মাত্রায় কাজ করেছিল।
৩.
ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
১৯২১
সালে প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গের সমাজে বহুমাত্রিক পরিবর্তনের
সূচনা করে। এর ভূমিকা শুধু শিক্ষার বিস্তারে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি একটি নতুন
সামাজিক শ্রেণি, সাংস্কৃতিক
পরিমণ্ডল এবং রাজনৈতিক চেতনা গঠনে সাহায্য করে।
ক.
পূর্ববঙ্গের মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে
আধুনিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে সহায়তা করা।
ঔপনিবেশিক
আমলে বাংলার মুসলমানদের বড় একটি অংশ ছিল কৃষিনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল।
উচ্চশিক্ষা ও প্রশাসনিক চাকরিতে হিন্দু ভদ্রলোকদের তুলনায় তাদের অংশগ্রহণ কম ছিল।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীরা নিজ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা
লাভের সুযোগ পায়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষিত হয়ে অনেকেই শিক্ষকতা, আইন, প্রশাসন, সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও অন্যান্য
পেশায় প্রবেশ করেন।
এর ফলে
একটি নতুন শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটে।
এই
শ্রেণি পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গের সামাজিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষ
করে বিশ্ববিদ্যালয়টি মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আধুনিক চিন্তাভাবনা এবং সামাজিক মর্যাদাবোধ বৃদ্ধিতে
সহায়তা করে।
Jagannath University+1
খ.
আধুনিক জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার বিকাশ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে পূর্ববঙ্গের উচ্চশিক্ষা মূলত কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয় ও তার
অধিভুক্ত কলেজগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ববঙ্গে প্রথমবারের মতো একটি স্বতন্ত্র আবাসিক ও
শিক্ষাদানভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে।
এখানে
কলা, বিজ্ঞান ও আইন
বিষয়ে সরাসরি উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। বাংলা ও সংস্কৃত, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, আরবি ও ইসলামি
শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে একাডেমিক চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এতে
পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ,
ইতিহাসচর্চা এবং গবেষণার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধ্যাপকদের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ বসু,
রমেশচন্দ্র মজুমদার, মুহম্মদ
শহীদুল্লাহসহ বিভিন্ন জ্ঞানশাখার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি ঢাকার
বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলকে সমৃদ্ধ করে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি
কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং জ্ঞান উৎপাদন ও
গবেষণার একটি নতুন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
University of Dhaka+2
গ.
মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন
ঔপনিবেশিক
পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান
হলো আধুনিক ও যুক্তিবাদী মুসলিম বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বিকাশে সহায়তা করা।
১৯২৬
সালে ঢাকায় মুসলিম
সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠিত
হয়। এর অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেন। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে এই সংগঠনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
এই
সংগঠনের মাধ্যমে যে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে পরিচিত।
এর মূল
বক্তব্য ছিল:
জ্ঞান
যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি
সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি
সেখানে অসম্ভব।
এই
আন্দোলনের মাধ্যমে ধর্মীয় গোঁড়ামি,
অন্ধবিশ্বাস, সামাজিক
কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর চিন্তার বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করা
হয়।
মুসলিম
সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ছিল ‘শিখা’ পত্রিকা। এই পত্রিকায় আধুনিক বিজ্ঞান, সাহিত্য, সমাজ, ধর্ম, দর্শন ও মানবতাবাদী
চিন্তার বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করা হতো।
ইংরেজি
শিক্ষায় শিক্ষিত নতুন মুসলিম বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এই আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের
সমাজের প্রচলিত চিন্তাধারাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ পায়।
ঐতিহাসিক
শাহাদাত এইচ. খানের গবেষণায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের বিকাশের পেছনে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বুদ্ধিজীবীদের যোগাযোগকে একটি
গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ciu.edu.bd+2
ঘ.
হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের
শিক্ষিত মানুষের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করা।
প্রতিষ্ঠার
সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে জগন্নাথ হল,
ঢাকা হল ও মুসলিম হল ছিল। জগন্নাথ হল হিন্দু শিক্ষার্থীদের আবাসনের
ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। এর
ফলে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আলোচনা,
সাহিত্যসভা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগের একটি নতুন পরিসর সৃষ্টি হয়।
বিশেষত
ঢাকা শহরের সাহিত্যিক আড্ডাগুলোতে হিন্দু ও মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণ ছিল
উল্লেখযোগ্য।
উদাহরণস্বরূপ, মুসলিম সাহিত্য
সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের মতো মুসলিম চিন্তাবিদদের
পাশাপাশি রমেশচন্দ্র মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ
বসু, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
এবং অন্যান্য শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।
এমনকি
১৯২০-এর দশকে ঢাকার ‘বিশ্বভারতী সম্মেলনী’ ধরনের সাহিত্যিক আড্ডাগুলোতে উভয়
সম্প্রদায়ের বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণ দেখা যায়।
ciu.edu.bd+1
অতএব, প্রতিষ্ঠার সময়ে
সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব বুদ্ধিবৃত্তিক
পরিবেশে আন্তসম্প্রদায়িক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি
হয়েছিল।
ঙ.
নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারে ভূমিকা
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গের নারীশিক্ষা ও নারী-অধিকারসংক্রান্ত
আলোচনাতেও নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।
ঔপনিবেশিক
সমাজে মুসলিম নারীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে পর্দাপ্রথা, সামাজিক রক্ষণশীলতা
ও পারিবারিক বাধা ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা।
তবে
বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষিত সমাজে নারীশিক্ষা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নগুলো আলোচিত
হতে থাকে।
১৯২৭
সালে ফজিলাতুন্নেসা নামে একজন মুসলিম ছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর
পর্যায়ে অধ্যয়নরত ছিলেন। তিনি মুসলিম নারীশিক্ষার পক্ষে বক্তব্য দেন এবং
পর্দাপ্রথার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘পর্দাবিরোধী সংঘ’ গঠিত হয়েছিল, যা নারীশিক্ষা ও নারীর সামাজিক অগ্রগতির প্রশ্নে সক্রিয়
ছিল।
এ থেকে
বোঝা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টি
শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করেনি,
বরং তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে নারী-অধিকার ও আধুনিকতার প্রশ্নেও নতুন আলোচনা
তৈরি করেছিল। যদিও এই পরিবর্তনের পরিসর তখনো সীমিত ছিল।
ciu.edu.bd+1
চ.
রাজনৈতিক চেতনা ও জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের বিকাশ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক চিন্তা ও নেতৃত্ব গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে আলোচনা, বিতর্ক, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড
এবং সমসাময়িক রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ পায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের উপস্থিতি ছিল। ফলে নতুন
শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি শুধু চাকরির উপযোগী হয়ে ওঠেনি; তারা সমাজ ও
রাষ্ট্র সম্পর্কে চিন্তা করারও সুযোগ পায়।
১৯৩০ ও
১৯৪০-এর দশকে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত সমাজের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।
বিশেষ
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষিত বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত
শ্রেণির রাজনৈতিক চেতনা পরবর্তী সময়ে শুধু মুসলিম পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক অধিকার ও
আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যবোধের প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এখানে
অবশ্য একটি কালগত পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ঔপনিবেশিক
আমলের ঘটনা নয়। কিন্তু ঔপনিবেশিক আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ
ও রাজনৈতিক আলোচনার ভিত্তি তৈরি করেছিল,
তা পরবর্তী ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
ওঠে।
Jagannath University+1
ছ.
ঢাকার নগরায়ণ ও নতুন সামাজিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে ঢাকার নগরজীবনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
আবাসিক ব্যবস্থা, শিক্ষকদের
বসবাস, গ্রন্থাগার, গবেষণা, সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠান এবং ছাত্রদের বিভিন্ন সংগঠনকে কেন্দ্র করে রমনা এলাকায় একটি নতুন শিক্ষিত
সমাজ গড়ে ওঠে।
পূর্ববঙ্গের
বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা ঢাকায় এসে বসবাস করতে শুরু করে। এর ফলে ঢাকার
সঙ্গে আঞ্চলিক শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষিত তরুণদের যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক
বইপড়া, সাহিত্যচর্চা, নাটক, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠান ও রাজনৈতিক আলোচনার বিস্তার ঢাকাকে একটি আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক নগর হিসেবে
গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, ঢাকার সামাজিক ও
সাংস্কৃতিক নগরায়ণেরও অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
ciu.edu.bd+1
৪. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও ঔপনিবেশিক সমাজে এর ভূমিকার কিছু
সীমাবদ্ধতা ছিল।
প্রথমত, শ্রেণিগত
সীমাবদ্ধতা: বিশ্ববিদ্যালয়ে
প্রবেশের সুযোগ প্রধানত শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল শ্রেণির মধ্যে
সীমাবদ্ধ ছিল। পূর্ববঙ্গের বিপুল কৃষক জনগোষ্ঠী সরাসরি উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়নি।
প্রতিষ্ঠালগ্নে মাত্র ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরুর বিষয়টি এর সীমিত
পরিসরের একটি উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ শিক্ষার
সঙ্গে সীমিত সংযোগ:
বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার বিকাশ ঘটালেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার
ব্যাপক প্রসারের সমস্যা দূর করতে পারেনি। ফলে সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত
বৈষম্য বজায় ছিল।
তৃতীয়ত, ঔপনিবেশিক
নিয়ন্ত্রণ: বিশ্ববিদ্যালয়ের
একাডেমিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার কিছু বিধান থাকলেও এটি পুরোপুরি ঔপনিবেশিক
রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। সরকারি অর্থায়ন, উপাচার্য নিয়োগ এবং
গভর্নরের চ্যান্সেলর হওয়ার বিধান এর ঔপনিবেশিক চরিত্র নির্দেশ করে।
University of Dhaka+1
চতুর্থত, সাম্প্রদায়িক
রাজনীতির প্রভাব: বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার পটভূমিতে হিন্দু-মুসলমানের রাজনৈতিক স্বার্থ ও সাম্প্রদায়িক বিতর্ক
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঘিরে একদিকে মুসলিম
শিক্ষাগত অগ্রগতির প্রত্যাশা, অন্যদিকে
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উদ্বেগ—দুই ধরনের প্রবণতা সক্রিয় ছিল।
তবে
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বহুধর্মীয় অংশগ্রহণ এবং মুক্তবুদ্ধির
চর্চা এই সীমাবদ্ধতার বাইরে একটি বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তৈরি করেছিল।
৫.
সামগ্রিক মূল্যায়ন ও উপসংহার
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ছিল ঔপনিবেশিক বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের একটি
গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের সামনে যে শিক্ষাগত
ও প্রশাসনিক উন্নয়নের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল, ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে সেই সম্ভাবনা সংকুচিত
হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃত্ব ঢাকায় একটি
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করে।
অন্যদিকে
কলকাতার ভদ্রলোক হিন্দু সমাজের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে।
তাদের বিরোধিতার মধ্যে ছিল বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী ঐক্য রক্ষার যুক্তি, কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও সম্পদ রক্ষার প্রচেষ্টা এবং পূর্ববঙ্গের শিক্ষিত
মুসলমানদের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ। তবে এই বিরোধিতা সমগ্র হিন্দু সমাজের অবস্থান ছিল
না।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গের সমাজে তিনটি মৌলিক পরিবর্তন বিশেষভাবে
লক্ষ করা যায়:
1. সামাজিক পরিবর্তন: পূর্ববঙ্গের
মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে এবং পেশাগত ও সামাজিক
নেতৃত্বের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।
2. সাংস্কৃতিক
পরিবর্তন: সাহিত্য, বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, আধুনিক চিন্তা এবং
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। হিন্দু-মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নতুন
যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্র তৈরি হয়।
3. রাজনৈতিক পরিবর্তন: পূর্ববঙ্গের
শিক্ষিত সমাজের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মপরিচয়ের বোধ গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী সময়ে
বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সবশেষে
বলা যায়, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ছিল একদিকে বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের
শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন,
অন্যদিকে এর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ পূর্ববঙ্গের সমগ্র সমাজের আধুনিক শিক্ষা, সংস্কৃতি, যুক্তিবাদ ও
জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের পথ তৈরি করেছিল।
এর জন্ম
হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট ঔপনিবেশিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে; কিন্তু পরবর্তী
সময়ে এটি ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজন অতিক্রম করে পূর্ববঙ্গের বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক
ও সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
নির্বাচিত
তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ
এই
বিষয়ে আরও গভীরভাবে পড়ার জন্য নিচের গবেষণা ও ঐতিহাসিক দলিলগুলো বিশেষভাবে
প্রাসঙ্গিক।
1. Zaheda Ahmad, Education in Bengal,
1912–1937, PhD Thesis, SOAS, University of London, 1981.
কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষা,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতি বোঝার
জন্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা।
সম্পূর্ণ গবেষণাপত্র
2. Mohammad Jahangir Hussain, “Making and
Shaping of the Dhaka University: The Role of the Muslim Leaders,” Jagannath
University Journal of Arts, 2019.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সলিমুল্লাহ, নওয়াব আলী চৌধুরী ও অন্যান্য মুসলিম নেতার ভূমিকা নিয়ে
গবেষণা। গবেষণাপত্র
3. Shahadat H. Khan, “Muslim Sahitya Samaj
(1926–1938): The Origin and Evolution of an Intellectual Organization in
Dhaka,” CIU Journal, 2022.
মুসলিম সাহিত্য সমাজ, বুদ্ধির
মুক্তি আন্দোলন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের বিকাশের
জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণাপত্র
4. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বিবরণ।
প্রতিষ্ঠার কালপঞ্জি, নাথান
কমিটি, স্যাডলার
কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক কাঠামো সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস
পরীক্ষা
বা একাডেমিক প্রবন্ধের জন্য বিশেষভাবে মনে রাখার বিষয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু মুসলমানদের
শিক্ষার উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে এর ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আবার এর
প্রতিষ্ঠার পেছনের সাম্প্রদায়িক ও শ্রেণিগত দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করলেও ইতিহাসের
গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে। এর যথার্থ মূল্যায়ন করতে হলে প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক কারণ
এবং প্রতিষ্ঠার পর এর বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবদান—দুটিকে একসঙ্গে বিবেচনা
করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
উপনিবেশিক শিক্ষানীতির একটি ‘রাজনৈতিক উৎস’ থেকে জন্ম নেয়, কিন্তু পূর্ববঙ্গের সমাজে তার প্রভাব কেবল
ক্ষতিপূরণের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নিচের বিশ্লেষণটি ১৯২১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত
সময়কে কেন্দ্রে রেখে লেখা।
## ১. প্রতিষ্ঠার পটভূমি
তিনটি স্তরে পটভূমি
বোঝা যায়: শিক্ষাগত অসমতা, বঙ্গভঙ্গ ও
তার রদ, এবং মুসলিম নেতৃত্বের
দাবি।
**শিক্ষাগত অসমতা।** ১৮৫৭ সালে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর অবিভক্ত বাংলার উচ্চশিক্ষা প্রায় পুরোটাই
কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল। এটি মূলত পরীক্ষামূলক অ্যাফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয়; পূর্ববঙ্গের কলেজগুলো তার অধীনে থাকলেও
শিক্ষার্থীকে কলকাতায় যেতে হতো,
খরচ ও দূরত্ব দুটোই বাধা ছিল। উনিশ শতকের শেষে হিন্দু ভদ্রলোক শিক্ষা, পেশা ও সরকারি চাকরিতে এগিয়ে ছিলেন; পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান
কৃষকসমাজ উচ্চশিক্ষায় প্রায় অনুপস্থিত। মুসলিম অভিযোগের আর এক দিক ছিল
পাঠ্যক্রমে হিন্দু সাংস্কৃতিক প্রাধান্য। ১৯০৬ সালের ঢাকায় অল-ইন্ডিয়া মোহামেডান
এডুকেশনাল কনফারেন্সে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি উঠেছিল—অর্থাৎ দাবিটি কেবল
১৯১১-এর পরের ঘটনা নয়।
**বঙ্গভঙ্গ ও রদ।** ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন
বাংলা ভাগ করে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশ গঠন করেন; রাজধানী হয় ঢাকা। সংক্ষিপ্ত এই সময়টাতে পূর্ববঙ্গে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চাকরি ও
প্রশাসনিক বিনিয়োগ বাড়ে। কলকাতার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন—বিশেষত স্বদেশি—এই
বিভাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ
ঘোষিত হয়। পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃত্ব একে ‘গুরুতর অন্যায়’ হিসেবে দেখে:
প্রাদেশিক রাজধানী ও তার সঙ্গে আসা শিক্ষাগত সুযোগ হারানোর ক্ষোভ জমে।
**দাবি ও সরকারি সিদ্ধান্ত।** ১৯১২ সালের ৩১
জানুয়ারি ঢাকায় ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে দেখা করেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, এ. কে. ফজলুল হকসহ ১৯ সদস্যের একটি মুসলিম
প্রতিনিধিদল। তারা বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি
মুসলিম অসন্তোষের জবাব হিসেবে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় দাবি করেন। **২ ফেব্রুয়ারি
১৯১২** হার্ডিঞ্জ ঘোষণা দেন যে সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ করবে।
তিনি স্পষ্ট করেন, এটি ‘মুসলিম
বিশ্ববিদ্যালয়’ হবে না; সব
ধর্ম-বর্ণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে,
যদিও মুসলিম অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হবে।
**প্রশাসনিক পথ।** ৪ এপ্রিল ১৯১২ ভারত সরকার
বাংলা সরকারকে পরিকল্পনা চাইলে **২৭ মে ১৯১২** ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের
নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের নাথান কমিটি গঠিত হয়। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন রাসবিহারী ঘোষ, নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল ইসলাম, আনন্দচন্দ্র রায়, ললিতমোহন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। কমিটির
নির্দেশ ছিল: বিশ্ববিদ্যালয় হবে **আবাসিক ও শিক্ষণমূলক**, কলকাতার মতো কেবল পরীক্ষামূলক নয়, এবং শহরের বাইরের কলেজকে অন্তর্ভুক্ত করবে
না। প্রতিবেদন ১৯১২-এর শেষে জমা পড়ে;
সেক্রেটারি অব স্টেট ১৯১৩-এর ডিসেম্বরে নীতিগতভাবে অনুমোদন দেন। প্রথম
বিশ্বযুদ্ধ, আমলাতান্ত্রিক
দীর্ঘসূত্রিতা এবং কলকাতাপন্থী বিরোধিতায় বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়। ১৯১৭-এর
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন (স্যাডলার কমিশন) আবাসিক-শিক্ষণমূলক ধারাকে সমর্থন
করে। **ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন,
১৯২০** গভর্নর-জেনারেলের সম্মতি পায় ২৩ মার্চ ১৯২০; শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় **১ জুলাই
১৯২১**। প্রথম উপাচার্য হন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন একাডেমিক রেজিস্ট্রার
**পি. জে. হার্টগ**। তিনটি অনুষদ (কলা,
বিজ্ঞান, আইন), বারোটি বিভাগ, প্রায় ৬০ জন শিক্ষক এবং আট শতাধিক
শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু।
প্রথম উপাচার্য হার্টগ
একে প্রতিষ্ঠানের ‘রাজনৈতিক উৎস’ বলেছিলেন। লর্ড লিটন পরে একে বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য
পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের দেওয়া ‘splendid
imperial compensation’ আখ্যা দেন। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্যে এটি ছিল সাম্রাজ্যিক
ক্ষতিপূরণ; কিন্তু তার
ভিত্তি ছিল বাস্তব শিক্ষাবৈষম্য ও পূর্ববঙ্গের নিজস্ব দাবি।
## ২. ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
বিরোধিতা ছিল প্রধানত
**কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু ভদ্রলোক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান**—সর্বজনীন
হিন্দু অবস্থান নয়। পূর্ববঙ্গের কিছু হিন্দু জমিদার-আইনজীবী প্রতিষ্ঠার পক্ষেও
ছিলেন।
**যাঁরা সামনে ছিলেন।** সবচেয়ে দৃশ্যমান
বিরোধী হিসেবে ইতিহাসে আসেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য **স্যার আশুতোষ
মুখোপাধ্যায়** এবং জাতীয়তাবাদী নেতা **সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়**। ১৯১২
সালের ১২ ফেব্রুয়ারি (কিছু বিবরণে ১৬ ফেব্রুয়ারি) **ড. রাসবিহারী ঘোষের**
নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল হার্ডিঞ্জের কাছে স্মারকলিপি দেয়। ঘোষের বক্তব্য ছিল, ঢাকায় আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলার
‘অভ্যন্তরীণ বিভাজন’ (an
internal partition of Bengal) ঘটাবে। একই মহলের আর একটি যুক্তি—যা পরে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের প্রতিবেদনেও উদ্ধৃত—ছিল: পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা প্রধানত
কৃষক, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে
তাদের কোনো লাভ হবে না। ১৯১২-এর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ,
ফরিদপুর ও ময়মনসিংহে প্রতিবাদসভার খবরও পাওয়া যায়। আইন পরিষদে বাজেট বরাদ্দ
নিয়ে হিন্দু-মুসলিম সদস্যদের তীব্র বিতর্ক পরবর্তী বছরগুলোতেও চলে।
**যুক্তির স্তর।** বিরোধিতা একসূত্রে বাঁধা
ছিল না:
| স্তর | মূল কথা |
|---|---|
| প্রাতিষ্ঠানিক | কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একচেটিয়া অধিকার, বাজেট ও মান ক্ষুণ্ন হবে |
| রাজনৈতিক | বঙ্গভঙ্গ রদের ‘ক্ষতিপূরণ’ আসলে সাম্প্রদায়িক তোষণ; জাতীয় ঐক্য ভাঙবে |
| শ্রেণিস্বার্থ | চাকরি, আইন, শিক্ষকতায়
ভদ্রলোকের প্রাধান্যে প্রতিযোগী একটি মুসলিম মধ্যবিত্ত তৈরি হবে |
| সাংস্কৃতিক অবজ্ঞা | পূর্ববঙ্গ ‘অনগ্রসর’; সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় অপ্রয়োজনীয় বা
নিম্নমানের হবে |
কলকাতা ভদ্রলোকের ভয়
ছিল কেবল ‘মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ নিয়ে নয়। তাঁরা বুঝেছিলেন, আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গকে
উচ্চশিক্ষার নিজস্ব কেন্দ্র বানাবে এবং কলকাতার সাংস্কৃতিক-পেশাগত কর্তৃত্বে ভাঙন
ধরাবে। তাই যুক্তি শিক্ষাগত হলেও স্বার্থ ছিল রাজনৈতিক ও শ্রেণিগত।
**সূক্ষ্মতা।** পূর্ববঙ্গের সব হিন্দু
বিরোধী ছিলেন না। আনন্দচন্দ্র রায় নাথান কমিটিতে ছিলেন; বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর
পরিবারের দানের সূত্রে জগন্নাথ হলের নাম হয়। রবীন্দ্রনাথ যে গোড়ের মাঠের সভায়
বিরোধিতা করেছিলেন—এই প্রচলিত দাবিটি বিতর্কিত। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ অনেকে একে
প্রমাণহীন বলেছেন; নির্ভরযোগ্য
প্রাথমিক সূত্রে এটি প্রতিষ্ঠিত নয়,
তাই ইতিহাস হিসেবে জোর দিয়ে বলা উচিত নয়। আবার পশ্চিমবঙ্গের কিয়দংশ মুসলিম
অভিজাতও কলকাতার প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে সন্দিহান ছিলেন। বিরোধিতাকে শুধু ‘হিন্দু
বনাম মুসলিম’ বললে আঞ্চলিক ক্ষমতা (কলকাতা বনাম পূর্ববঙ্গ) এবং শ্রেণি (ভদ্রলোক
একচেটিয়া বনাম নতুন মধ্যবিত্ত) ঢাকা পড়ে যায়।
## ৩. ঔপনিবেশিক পূর্ববঙ্গে ভূমিকা
১৯২১–১৯৪৭-এ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় একই সঙ্গে সাম্রাজ্যিক প্রকল্প এবং পূর্ববঙ্গের নিজস্ব সামাজিক
শক্তির জন্মস্থান।
**উচ্চশিক্ষার ভৌগোলিক ভাঙন।** পদ্মার
পূর্বে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতার পরীক্ষা-একচেটিয়া ভাঙে।
আবাসিক-শিক্ষণমূলক কাঠামো (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল,
জগন্নাথ হল) জেলাশহর ঢাকাকে পূর্ববঙ্গের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র করে। রমনা
অঞ্চল, শিক্ষকমহল ও নতুন
আবাসিক এলাকা (পুরানা পল্টন, ওয়ারী
ইত্যাদি) এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে শহুরে মধ্যবিত্তের ঘনত্ব বাড়ায়। বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, বাংলা, আরবি-ইসলামি শিক্ষায় যে শিক্ষকগোষ্ঠী
আসেন—সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৯২১–৪৫),
রমেশচন্দ্র মজুমদার, মুহম্মদ
শহীদুল্লাহ, এ. এফ. রহমান—তাঁরা
পূর্ববঙ্গে আধুনিক জ্ঞানচর্চার একটি স্থায়ী ক্ষেত্র তৈরি করেন। সংবাদমাধ্যম একে
‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলে; মুসলিম জনমতের
একাংশ আবার ‘পূর্বের মক্কা’ আশা করেছিল। দুই অভিধাই প্রতিষ্ঠানের দ্বৈত রাজনীতিকে
ধরে।
**অপ্রত্যাশিত সামাজিক গঠন।** প্রতিষ্ঠার
রাজনৈতিক অজুহাত ছিল মুসলিম শিক্ষা,
কিন্তু প্রথম দুই দশকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হিন্দু ছিলেন।
১৯২৯–৩০ সালে মোট প্রায় ১৩০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে মুসলিম ছিলেন ৪২৭ জন; ১৯৩৯–৪০-এ ৬৭৩ জন মুসলিম, মোট ১৫২৭। আরবি-ফারসি-উর্দু বাদ দিলে
অধিকাংশ বিভাগে হিন্দু শিক্ষকই প্রাধান্য পান। অর্থাৎ ভদ্রলোক যাঁরা ‘মান নষ্ট
হবে’ ভেবে বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের
সন্তান-শিক্ষকরাই শুরুতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হন। এটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়; উনিশ শতকের শিক্ষাগত আগাম সুবিধার
ঐতিহাসিক জের।
তবু মুসলিম সমাজের
জন্য ফল ছিল কাঠামোগত। বৃত্তি,
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ইসলামি শিক্ষা
এবং সচেতনভাবে মুসলিম ভর্তি বাড়ানোর নীতি ধীরে ধীরে একটি **নতুন মুসলিম পেশাজীবী
মধ্যবিত্ত** তৈরি করে—আইনজীবী,
শিক্ষক, সাংবাদিক, নিম্ন-মধ্যম সরকারি কর্মচারী। রমেশচন্দ্র
মজুমদার পরে স্মরণ করেছেন, আগে মুসলিম
সমাজে আধুনিক অর্থে মধ্যবিত্ত ছিল না;
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই ভিত্তি গড়ে। এই শ্রেণিই ১৯৩০–৪০-এর প্রাদেশিক
রাজনীতি, পরে পাকিস্তান
আন্দোলনের পূর্ববঙ্গীয় শাখা এবং তারও পরে ভাষা আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি হয়।
ঔপনিবেশিক কালের মধ্যেই তার বীজ পড়ে।
**লিঙ্গ।** ১৯২০-এর আইনের ৫ ধারা
বিশ্ববিদ্যালয়কে সব লিঙ্গ, জাতি ও ধর্মের
জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করে। লীলা নাগ ১৯২৩ সালে ইংরেজিতে প্রথম নারী এম.এ.। কিন্তু
১৯২১–৪৭ পর্যন্ত ভর্তি হওয়া নারী শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯৩ শতাংশই হিন্দু পরিবারের; মুসলিম নারী ছিলেন খুবই কম। পর্দা, বাল্যবিবাহ ও শ্রেণি-বাধা ভাঙতে
প্রতিষ্ঠানটি আইনি সুযোগ দিয়েছিল,
সামাজিক বাস্তবতা বদলাতে সময় নিয়েছিল।
**রাজনৈতিক ক্ষেত্র।** ক্যাম্পাস
উপনিবেশবিরোধী রাজনীতিরও জায়গা হয়;
স্বদেশির উত্তরাধিকার এবং পরে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ উভয় ধারার ছাত্ররাজনীতি
এখানে জেঁকে বসে। প্রথম দশকগুলোতে এ. এফ. রহমানদের মতো উদার শিক্ষকের প্রভাবে
সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা একাডেমিক জীবনকে পুরোপুরি গ্রাস করেনি—মজুমদারের স্মৃতি
অনুসারে হিন্দু শিক্ষকেরা মুসলিম ছাত্র পড়ানোকে প্রায় মিশনারি দায়িত্বের মতো
নিতেন, এবং বিশেষ সুবিধা
নিয়ে খোলাখুলি ঈর্ষা তৈরি হয়নি। তবে ১৯৪০-এর দশকে প্রাদেশিক সাম্প্রদায়িক
রাজনীতি ক্যাম্পাসকেও স্পর্শ করে। বিশ্ববিদ্যালয় ‘অসাম্প্রদায়িক আশ্রম’ও ছিল না, ‘সাম্প্রদায়িক ঘাঁটি’ও নয়; সে ছিল পূর্ববঙ্গের ক্ষমতা-সম্পর্ক যেখানে
প্রতিদিন আলোচিত হতো।
**শ্রেণিসীমা।** প্রতিষ্ঠানের ন্যায্যতা বলা
হয়েছিল কৃষক মুসলমানের নামে, কিন্তু
উপকারভোগী হন ভদ্রলোক ও নবাগত পেশাজীবী মধ্যবিত্ত। গ্রামীণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের
জন্য এটি প্রত্যক্ষ স্কুল ছিল না;
তাদের সন্তানদের একটি পাতলা স্তর বৃত্তি ও হলের মাধ্যমে শহরে উঠে আসে। তাই
ভূমিকা বিশ্লেষণে ‘পূর্ববঙ্গের মুক্তি’র বদলে বলা উচিত: **পূর্ববঙ্গে একটি আধুনিক
শিক্ষিত শ্রেণির প্রাতিষ্ঠানিক জন্ম**,
যার হিন্দু অংশ আগের প্রাধান্য ধরে রাখে এবং মুসলিম অংশ প্রথমবার প্রতিযোগিতার
অবস্থানে আসে।
## সংক্ষেপ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫), তার রদ (১৯১১)
এবং পূর্ববঙ্গের শিক্ষাবৈষম্যের যৌথ ফল। হার্ডিঞ্জের ১৯১২-এর প্রতিশ্রুতি, নাথান কমিটি এবং ১৯২০-এর আইনের মধ্য দিয়ে
১৯২১ সালে এটি আবাসিক-শিক্ষণমূলক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খোলে—সরকারের ভাষায়
সাম্রাজ্যিক ক্ষতিপূরণ, মুসলিম
নেতৃত্বের ভাষায় ন্যায্য দাবি। কলকাতার ভদ্রলোক নেতৃত্ব (আশুতোষ, সুরেন্দ্রনাথ, রাসবিহারী ঘোষ) এতে ‘অভ্যন্তরীণ বঙ্গভঙ্গ’, বাজেট-হানি ও নিজেদের পেশাগত কর্তৃত্বের
সংকট দেখে বিরোধিতা করেন; পূর্ববঙ্গের
সব হিন্দু তাঁদের সঙ্গে ছিলেন না। ১৯৪৭-এর আগে ক্যাম্পাসে সংখ্যায় হিন্দু
প্রাধান্য থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি কলকাতার একচেটিয়া ভাঙে, ঢাকাকে বুদ্ধিবৃত্তিক নগর করে, এবং একটি মুসলিম পেশাজীবী মধ্যবিত্তের
ভিত্তি তৈরি করে—যা উপনিবেশিক পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক পরিণতি।
১৯২১
সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই ছিল না, বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক বাংলার আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও
সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের এক যুগান্তকারী বাঁক। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর আলোকে এর
পটভূমি, তৎকালীন
হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এবং পূর্ববঙ্গীয় সমাজে এর ভূমিকা বিশ্লেষণ করা
হলো:
১. ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে মূলত রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ, প্রশাসনিক রূপরেখা
এবং পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে থাকা মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত অধিকারের প্রশ্ন
ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। এর প্রধান পটভূমিগুলো নিম্নরূপ:
- বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ (১৯০৫-১৯১১): ১৯০৫ সালে
ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ
গঠিত হয় এবং ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানী হয়। এর ফলে পূর্ববঙ্গের অবহেলিত মুসলিম
সমাজ শিক্ষা ও উন্নয়নের সুযোগ পায়। কিন্তু তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা চরম হতাশা ও বঞ্চনাবোধে ভোগেন।
- ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব: বঙ্গভঙ্গ রদের
ফলে মুসলমানদের যে রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত ক্ষতি হয়, তা পুষিয়ে
দেওয়ার আশ্বাস দেন তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। ১৯১২ সালের ঢাকা সফরে
তিনি পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন।
- নাথান কমিশন ও স্যাডলার কমিশন: বিশ্ববিদ্যালয়ের
রূপরেখা প্রণয়নের জন্য ১৯১২ সালে নাথান কমিটি (Nathan Committee) গঠিত
হয়। পরবর্তীতে ১৯১৭-১৯ সালের স্যাডলার কমিশন (Calcutta University Commission)-এর
সুপারিশের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন (১৯২০) পাস হয় এবং ১৯২১ সালে
এটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
২.
ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণায় কলকাতার কেন্দ্রিক এবং উচ্চবর্ণের হিন্দু
"ভদ্রলোক" সমাজ তীব্র অসন্তোষ ও বিরোধিতা প্রকাশ করেছিল। তাদের
প্রতিক্রিয়ার মূল কারণ ও রূপগুলো ছিল:
- কলকাতার বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক একাধিপত্য
হারানোর ভয়:
কোলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ববঙ্গে একটি বিকল্প বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়
তৈরি হবে এবং কলকাতার একপেশে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মোড়লত্ব খর্ব হবে—এই
আশঙ্কা তাদের মধ্যে কাজ করেছিল।
- সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি হিসেবে দেখা: ভদ্রলোক
হিন্দুদের একটি বড় অংশ মনে করেছিল যে,
বঙ্গভঙ্গ রদের পর মুসলিমদের শান্ত করার জন্য ব্রিটিশদের এই উদ্যোগ
মূলত "ভাগ কর ও শাসন কর" (Divide
and Rule) নীতিরই আরেকটি রূপ এবং এটি সমাজে সাম্প্রদায়িক
দূরত্ব বাড়াবে।
- প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক অযুহাত: সুরেন্দ্রনাথ
বন্দ্যোপাধ্যায়, রাসবিহারী
ঘোষ এবং তৎকালীন কিছু সংবাদপত্র (যেমন—দ্য বেঙ্গলি, অমৃতবাজার
পত্রিকা) যুক্তি
দেখিয়েছিল যে, বর্তমান
আর্থিক পরিস্থিতিতে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের ওপর
অপ্রয়োজনীয় আর্থিক বোঝা এবং এর ফলে কলকাতার ওপর অতিরিক্ত ছাত্রচাপ কমে
গেলেও প্রাতিষ্ঠানিক মান ধরে রাখা কঠিন হবে।
- জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি: সেসময়ের
জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ আশঙ্কা করেছিল যে, এই
বিশ্ববিদ্যালয়টি মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদকে উসকে দেবে এবং সামগ্রিক বাঙালি
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে খণ্ডিত করতে পারে।
৩.
ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
প্রতিষ্ঠার
পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গ তথা সমগ্র বাংলার ইতিহাসে একটি
সুদূরপ্রসারী রূপান্তরমূলক ভূমিকা পালন করে:
- মুসলিম মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বিকাশ: পূর্ববঙ্গের
প্রধানত কৃষিনির্ভর ও শিক্ষাবঞ্চিত মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত
শ্রেণির জন্ম দেয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। কাজী মোতাহার হোসেন, ড. মুহম্মদ
শহীদুল্লাহর মতো মনীষী এবং পরবর্তীতে তরুণ প্রজন্মের লেখকরা এখানকার আঙিনাতেই
বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ঘটান।
- সামাজিক গতিশীলতা (Social Mobility): এই
বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গের প্রান্তিক ও গ্রামীণ পরিবারের সন্তানদের জন্য
আধুনিক শিক্ষা, সরকারি
চাকরি, আইন
পেশা এবং রাজনীতিতে প্রবেশের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়, যা পূর্বে
কেবল অভিজাত বা কলকাতার উচ্চবর্ণের মানুষের নাগালে ছিল।
- অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারা: শুরুতে একে
"পূর্ব বাংলার অক্সফোর্ড" বা মুসলিম শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান
হিসেবে দেখা হলেও, কালক্রমে
এটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন,
ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা এবং বাঙালি সংস্কৃতির চর্চার এক উর্বর ক্ষেত্রে
পরিণত হয়। ১৯৪৭-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা ও স্বাধিকার আন্দোলনের
আঁতুড়ঘর হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
- বঙ্গভঙ্গ ও তার রদ (১৯০৫-১৯১১): ১৯০৫ সালে
বঙ্গভঙ্গ হওয়ার ফলে পূর্ববঙ্গে একটি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে তোলার
প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলে পূর্ববঙ্গের
মুসলমানরা চরমভাবে হতাশ হন।
[1,
2]
- ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রস্তাব: এই হতাশা দূর
করতে এবং পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষাগত ও সামাজিক অনগ্রসরতা কাটাতে
ব্রিটিশ সরকারের কাছে বিকল্প ক্ষতিপূরণের দাবি ওঠে। [1]
- নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগ: ১৯১২ সালের ৩১
জানুয়ারি নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে একটি মুসলিম প্রতিনিধিদল
ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করে ঢাকায় একটি
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানান। [1]
- কমিটি ও আইন পাস: ১৯১২ সালের ২৭
মে স্যার রবার্ট নাথানকে প্রধান করে ‘নাথান কমিটি’ গঠিত হয়। পরবর্তীতে
স্যাডলার কমিশনের (১৯১৭-১৯) সুপারিশের পর ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ইম্পেরিয়াল
লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯۲۰’ পাস হয় এবং ২৩ মার্চ তা চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। দীর্ঘ
আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। [1,
2]
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া
- বিভাজনের আশঙ্কা: কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং অ্যাডভোকেট ড.
রাসবিহারী ঘোষসহ কলকাতার প্রভাবশালী উচ্চবর্ণের হিন্দু নেতারা ঢাকায় আলাদা
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করেন। রাসবিহারী ঘোষ ভাইসরয়ের কাছে
দাবি জানান যে, ঢাকায় আলাদা
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বাংলায় ‘আভ্যন্তরীণ বিভাজন’ বা মানসিক দূরত্ব আরও
বাড়িয়ে দেবে।
[1]
- কৃষক ও শিক্ষার অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রচার: কোনো কোনো
হিন্দু নেতা ও বুদ্ধিজীবী এ মর্মে প্রচার চালান যে, পূর্ববঙ্গের
মুসলমানদের বড় অংশই কৃষক এবং এই বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কোনো উপকারে আসবে না। [1]
- নেতৃত্ব ও প্রতিবাদের রূপ: ১৯১২ সালের ১৬
ফেব্রুয়ারি কলকাতার হিন্দু নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে
সাক্ষাৎ করে এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। এছাড়া কেউ কেউ এটিকে
কটাক্ষ করে ‘মেক্কা ইউনিভার্সিটি’ বলেও অভিহিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রত্যক্ষ বা আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার
বিরোধিতা করার বিষয়টি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্নমত ও বিতর্ক রয়েছে। [1,
2,
3]
ঔপনিবেশিক
আমলে পূর্ববঙ্গীয় সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
- মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ: প্রতিষ্ঠার
মূল উদ্দেশ্য সফল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গে একটি শিক্ষিত মুসলিম
মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণী তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। এর আগে
উচ্চশিক্ষার জন্য মূলত কলকাতার ওপর নির্ভর করতে হতো, যা সাধারণ
মুসলিম পরিবারের জন্য কঠিন ছিল।
[1]
- আবাসিক ও আধুনিক শিক্ষার প্রসার: অক্সফোর্ড ও
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠায়
(যেমন ঢাকা হল, জগন্নাথ
হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) এখানে পড়ালেখার পাশাপাশি ছাত্রদের মধ্যে সামাজিক
ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকশিত হয়।
[1]
- সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু: ঔপনিবেশিক
শাসনের শেষ পর্যায়ে এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গের বাঙালি সমাজকে
বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে জাগিয়ে তুলতে এই প্রতিষ্ঠানটি ভিত্তি তৈরি করে দেয়। বিশেষ
করে পরবর্তী ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের সূতিকাগার হিসেবে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। [1]
No comments:
Post a Comment