Search This Blog

Wednesday, October 21, 2026

08 ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ (Secularism) বলতে কি বুঝেন, এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ও ধরণ আলোচনা করুন, বাংলাদেশের পেক্ষাপটে আসলে এটি কোন ধরণের রাষ্ট্র বলা যায়

 ### *ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism) বলতে কি বুঝ?*


*সহজ অর্থে:* Secularism মানে *ধর্মহীনতা নয়, সব ধর্মের স্বাধীনতা।*


ল্যাটিন শব্দ *Saeculum* থেকে Secular এসেছে, যার অর্থ - *ইহজগৎ, এই কাল*। মানে - রাষ্ট্র চলবে এই জগতের যুক্তি দিয়ে, পরকালের ধর্মগ্রন্থ দিয়ে নয়।


*ভুল ধারণা ভাঙো:* বাংলাদেশে অনেকে মনে করে - ধর্মনিরপেক্ষ মানে নাস্তিক, ধর্ম মানে না। এটি ১০০% ভুল।


*সঠিক সংজ্ঞা:*


> ধর্মনিরপেক্ষতা হলো এমন একটি রাষ্ট্রনীতি, যেখানে রাষ্ট্রের কোনো নিজস্ব ধর্ম থাকবে না, রাষ্ট্র সব ধর্মকে সমান চোখে দেখবে, এবং ধর্মকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করবে, রাজনীতির বিষয় হিসেবে নয়।


*৩ জন মনীষীর সংজ্ঞা:*


১. *জর্জ হলিয়ক (শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ১৮৫১):* "ধর্মনিরপেক্ষতা হলো ইহজগতের নৈতিকতা, যা ধর্ম থেকে স্বাধীন।"


২. *জওহরলাল নেহেরু:* "ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মকে বিদ্বেষ নয়, সব ধর্মকে সমান শ্রদ্ধা করা।"


৩. *বাংলাদেশের ব্যাখ্যা:* "ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। এর অর্থ হলো - হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে, মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে, বৌদ্ধ তার ধর্ম পালন করবে, কেউ কাউকে বাধা দেবে না।"


### *ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান বৈশিষ্ট্য - ৬টি*


*১. রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম নেই:* রাষ্ট্র হিন্দুও নয়, মুসলিমও নয়। যেমন - বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকলেও মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা আছে - এটি একটি দ্বৈততা। কিন্তু আদর্শ রাষ্ট্রে রাষ্ট্রধর্ম থাকবে না।


*২. সকল ধর্মের সমান অধিকার ও স্বাধীনতা:* মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা - সবাই সমান নিরাপত্তা পাবে। রাষ্ট্র কাউকে বেশি, কাউকে কম দেবে না।


*৩. ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা:* ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে রাজনীতি করা যাবে না। নির্বাচনে মসজিদ-মন্দির ব্যবহার, ধর্মীয় স্লোগান, ফতোয়া দিয়ে ভোট চাওয়া - ধর্মনিরপেক্ষতায় নিষিদ্ধ।


*৪. আইন হবে যুক্তিভিত্তিক, ধর্মভিত্তিক নয়:* আইন তৈরি হবে সংসদে, মানুষের প্রয়োজনে। কোরআন, বাইবেল বা গীতা থেকে সরাসরি আইন আসবে না। যেমন - বাংলাদেশে উত্তরাধিকার আইন ধর্ম অনুযায়ী চলে, কিন্তু ফৌজদারি আইন চলে রাষ্ট্রীয় আইনে।


*৫. বৈষম্যহীন নাগরিকত্ব:* নাগরিকের পরিচয় হবে - সে বাংলাদেশি, হিন্দু বা মুসলিম নয়। চাকরি, শিক্ষা, বিচারে ধর্ম দেখা হবে না।


*৬. ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষতা, বিদ্বেষ নয়:* রাষ্ট্র ধর্মকে ঘৃণা করবে না, বরং রক্ষা করবে। সরকার হজে ভর্তুকি দেবে, আবার দুর্গাপূজায় নিরাপত্তাও দেবে।


---


### *ধর্মনিরপেক্ষতার ধরণ - ৩টি মডেল - পরীক্ষায় ছক আকারে লিখবে*


পৃথিবীতে এক রকম Secularism নেই, ৩ রকম আছে।

ধরণ | কি? | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য

**১. কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতা (Assertive / French Model)** | রাষ্ট্র ও ধর্মকে দেয়াল দিয়ে আলাদা করা। রাষ্ট্রের ভেতর ধর্মের চিহ্নও থাকবে না। | **ফ্রান্স, তুরস্ক (আতাতুর্ক), সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন** | স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ধর্মীয় দোয়া নিষিদ্ধ। ধর্ম থাকবে শুধু বাড়িতে ও প্রার্থনালয়ে।

**২. নরম / ইতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতা (Positive / Indian Model)** | রাষ্ট্র সব ধর্ম থেকে সমান দূরত্বে থাকবে না, বরং সব ধর্মের সমান কাছে থাকবে। সব ধর্মকে সাহায্য করবে। | **ভারত, বাংলাদেশ, আমেরিকা** | রাষ্ট্র বলে - "আমি সব ধর্মকে শ্রদ্ধা করি (Sarva Dharma Sambhava)"। হজে টাকা, কুম্ভমেলায় টাকা, বড়দিনে ছুটি - সব দেয়।

**৩. ছদ্ম বা নামমাত্র ধর্মনিরপেক্ষতা (Pseudo Secularism)** | মুখে ধর্মনিরপেক্ষ, কাজে একটি ধর্মের পক্ষে। | অনেক দেশে রাজনীতিতে দেখা যায় | ভোটের জন্য এক ধর্মকে তোষণ করা।

আরেকটি ভাগ আছে - 


*৪. পশ্চিমা মডেল বনাম পূর্বাঞ্চলীয় মডেল:*

- পশ্চিমা (আমেরিকা, ইউরোপ): ধর্ম ব্যক্তিগত।

- পূর্বাঞ্চলীয় (ভারত, বাংলাদেশ): ধর্ম সামাজিক ও ব্যক্তিগত দুটোই, তাই রাষ্ট্রকে সব ধর্মকে নিয়ে চলতে হয়।


---


### *বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে - বাংলাদেশ আসলে কোন ধরণের রাষ্ট্র?*


এটি পরীক্ষায় সবচেয়ে বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। উত্তর এক লাইনে হয় না। বাংলাদেশকে বলা হয় - *"সংবিধানগতভাবে দ্বৈত, বাস্তবে ইতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র"*।


*ইতিহাস দেখো - ৪টি পর্যায়:*


*১. ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান - খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষ:*

১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ৪ মূলনীতি - জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা। ১২ অনুচ্ছেদে বলা হলো - ধর্মনিরপেক্ষতা মানে - 

ক) সব ধর্মের স্বাধীনতা

খ) রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দেবে না

গ) ধর্মের অপব্যবহার করে রাজনীতি করা যাবে না

এটি ছিল *ফরাসি-ভারতীয় মিশ্র মডেলের* কাছাকাছি।


*২. ১৯৭৭-১৯৮৮ - ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল ও রাষ্ট্রধর্ম:*

- ১৯৭৭: জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করে "আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস" যোগ করলেন।

- ১৯৮৮: এরশাদ ৮ম সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করলেন - অনুচ্ছেদ ২(ক)।


*৩. ২০১০-২০১১ - আবার ফিরে আসা - কিন্তু দ্বৈততা রয়ে গেল:*

- ২০১০: সুপ্রিম কোর্ট ৫ম সংশোধনী বাতিল করে ১৯৭২ এর ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনে।

- ২০১১: ১৫তম সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনলো, কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও রেখে দিলো। সাথে বিসমিল্লাহ-ও রেখে দিলো।


*ফলে বর্তমান অবস্থা (২০২৬ পর্যন্ত):*

বাংলাদেশের সংবিধানে একই সাথে আছে -

- অনুচ্ছেদ ২(ক): রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম

- অনুচ্ছেদ ৮, ১২: রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা

- অনুচ্ছেদ ৪১: সব ধর্ম পালনের স্বাধীনতা


এটাকে সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা বলেন - *"Contradictory Secularism" বা "বাঙালি মডেলের ধর্মনিরপেক্ষতা"।*


#### *তাহলে বাংলাদেশ কোন ধরণের রাষ্ট্র? - উপসংহারে ৪টি পয়েন্ট লিখবে*


*১. তাত্ত্বিকভাবে - ইতিবাচক / নরম ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (ভারতীয় মডেল):*

কারণ বাংলাদেশ ফ্রান্সের মতো ধর্মকে নিষিদ্ধ করে না। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন চালায়, হজ পাঠায়, আবার হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্ট, বৌদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্ট, খ্রিস্টান কল্যাণ ট্রাস্টও চালায়। ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধ পূর্ণিমা - সবগুলোতে সরকারি ছুটি। এটি ভারতীয় "সর্বধর্ম সমভাব" মডেল।


*২. সাংবিধানিকভাবে - দ্বৈত বা আপোষমূলক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র:*

একদিকে রাষ্ট্রধর্ম, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতা - দুটোই আছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন নেই। এটি রাজনৈতিক আপোষ।


*৩. সামাজিকভাবে - ধর্মপ্রাণ কিন্তু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রাষ্ট্র:*

৯০% মুসলিম, কিন্তু হাজার বছর ধরে হিন্দু-মুসলিম একসাথে থাকে। গ্রামে একই উঠানে ঈদ ও পূজা হয়। মানুষ ধর্ম মানে, কিন্তু উগ্রতা সাধারণত পছন্দ করে না। Pew Research বলে - বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় সহনশীলতায় এগিয়ে।


*৪. রাজনৈতিকভাবে - ব্যবহারিক ধর্মনিরপেক্ষতা:*

রাষ্ট্র আইন চলে ব্রিটিশ-কমন আইনে, শরিয়া আইনে নয়। ফৌজদারি, দেওয়ানি আইন ধর্মনিরপেক্ষ। শুধু পারিবারিক আইন (বিয়ে, তালাক, সম্পত্তি) ধর্ম অনুযায়ী চলে। আবার রাজনীতিতে সব দলই ধর্ম ব্যবহার করে - আওয়ামী লীগও মসজিদে যায়, বিএনপি-জামায়াতও যায়।


> বাংলাদেশকে ফ্রান্সের মতো কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ বলা যাবে না, আবার সৌদি আরবের মতো ধর্মতান্ত্রিকও বলা যাবে না। বাংলাদেশ হলো বঙ্গবন্ধুর ব্যাখ্যায় - *"ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার"* - এই নীতির একটি অনন্য, ইতিবাচক, বাঙালি মডেলের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। যেখানে রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে বাদ দেয় না, আবার কোনো ধর্মকে দিয়ে রাষ্ট্র চালায় না।


*এক লাইনে মুখস্থ:*

ফ্রান্স = ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখে

বাংলাদেশ = সব ধর্মকে রাষ্ট্রের কাছে রাখে




ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism) হলো এমন একটি রাষ্ট্রীয় নীতি, যেখানে রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি আনুগত্য বা বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা দেখায় না; বরং সব নাগরিককে ধর্মীয় বিশ্বাস পালন, অপালন বা পরিবর্তনের সমান অধিকার দেয়। এর মূল সূত্র হলো—“ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।”[bn.wikipedia][en.wikipedia]

ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের ধর্মহীন হওয়া বা ধর্মকে নিষিদ্ধ করা নয়; বরং এর অর্থ হলো রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমন সম্পর্ক স্থাপন, যাতে কোনো ধর্ম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে না পারে এবং রাষ্ট্র কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা না দেয়। একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ধর্মীয় ও অধর্মীয়—উভয় নাগরিকের বিবেকের স্বাধীনতা রক্ষা করে এবং ধর্মভিত্তিক বৈষম্য রোধ করে।[bn.wikipedia][en.wikipedia][shongshoy]

প্রধান বৈশিষ্ট্য

  • রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ: রাষ্ট্রীয় আইন, নীতি ও প্রশাসন কোনো ধর্মীয় শাস্ত্র বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় না।[bn.wikipedia]
  • ধর্মীয় স্বাধীনতা: নাগরিকরা ইচ্ছামতো ধর্ম পালন, ধর্ম পরিবর্তন বা কোনো ধর্ম না মানার অধিকার ভোগ করেন।[bn.wikipedia][shongshoy]
  • সব ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষতা: রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রাধান্য দেয় না এবং সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমান আচরণ করে।[bn.wikipedia][en.wikipedia]
  • নাগরিক সমতা: ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সব নাগরিকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সমান থাকে।[bn.wikipedia][en.wikipedia]
  • সাধারণ আইনের প্রাধান্য: রাষ্ট্র ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের বদলে সবার জন্য প্রযোজ্য অধিকারভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।[bn.wikipedia]
  • রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার প্রতিরোধ: ধর্মকে ভোট আদায়, সাম্প্রদায়িকতা বা রাজনৈতিক বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার রোধ করা।[thedailystar][thedailystar]

ধর্মনিরপেক্ষতার ধরণ

ধরণমূল বৈশিষ্ট্যউদাহরণ
কঠোর বা ফরাসি মডেল (Laïcité)রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে কঠোর বিচ্ছেদ; সরকারি প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় প্রতীক বা অনুশীলন সীমিত করা হয়।ফ্রান্স [scribd]
নমনীয় বা নীতিগত দূরত্ব মডেলরাষ্ট্র কোনো ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে না, কিন্তু ধর্মীয় সমতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করে।ভারত, যুক্তরাষ্ট্র [sathee.iitk.ac][scribd]
ইতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতারাষ্ট্র কেবল নিরপেক্ষ থাকে না, বরং ঐতিহাসিক বৈষম্য কাটিয়ে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নে সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়।ভারতীয় মডেল [sathee.iitk.ac]
নেতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতারাষ্ট্র ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে দূরে থাকে; এতে বৈষম্য থেকে গেলেও তা সংশোধনের দায়িত্ব নেওয়া হয় না।প্রচলিত আমেরিকান ব্যাখ্যার কিছু দিক [sathee.iitk.ac][scribd]

ভারতীয় মডেলে রাষ্ট্র না ধর্মতান্ত্রিক, না কোনো ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করে; বরং ধর্মীয় সমতা অর্জনে নীতিগত দূরত্ব বজায় রাখে।[sathee.iitk.ac][sathee.iitk.ac]

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস টানাপোড়েনপূর্ণ। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির একটি; এর অর্থ ছিল সাম্প্রদায়িকতার অবসান, কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা না দেওয়া, রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার রোধ এবং ধর্মীয় বৈষম্য বা নির্যাতন বন্ধ করা।[thedailystar][bn.wikipedia]

১৯৭৭ সালে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া হয় এবং তার বদলে “পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর” স্থাপন করা হয়। পরে ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। ২০১১ সালের সংবিধান সংশোধনীতে ধর্মনিরপেক্ষতা আবার রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ১২ নং অনুচ্ছেদে সাম্প্রদায়িকতা বিলোপ, কোনো ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা না দেওয়া ও ধর্মভিত্তিক বৈষম্য বন্ধের কথা বলা হয়।[thedailystar][bn.wikipedia]

বাংলাদেশ কোন ধরনের রাষ্ট্র?

বাংলাদেশকে কঠোর অর্থে পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা কঠিন, কারণ সংবিধানে একইসঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে। এই দ্বৈত কাঠামোর কারণে বাংলাদেশকে সাধারণত “আংশিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র”, “সংবিধানগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু রাষ্ট্রধর্মযুক্ত রাষ্ট্র” বা “সমন্বয়বাদী/বহুত্ববাদী রাষ্ট্র” বলা যেতে পারে।[thedailystar][scribd][bn.wikipedia]

এখানে রাষ্ট্র সব ধর্মের নাগরিকের অধিকার ও উপাসনার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলে; কিন্তু ইসলামের রাষ্ট্রধর্ম মর্যাদা সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশেষ স্থান দেয়। তাই বাংলাদেশের বাস্তব চরিত্র হলো ধর্মনিরপেক্ষ মূলনীতি ও রাষ্ট্রধর্মের মধ্যে সমঝোতাভিত্তিক একটি রাষ্ট্র—যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা সাংবিধানিক আদর্শ হিসেবে টিকে আছে, কিন্তু পূর্ণ রাষ্ট্র-ধর্ম বিচ্ছেদ এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়।[thedailystar][bn.wikipedia][dainikshiksha]




ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ: ধারণা, বৈশিষ্ট্য, ধরন এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের চরিত্র

ভূমিকা

আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ধারণাগুলোর একটি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। এটি মূলত রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ধর্মের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণের একটি নীতি। বাংলাদেশে এই আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পায়, কারণ এখানে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ও রাষ্ট্রধর্ম একসঙ্গে বিদ্যমান এবং এর ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মতভেদ আছে।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সংজ্ঞা ও উৎপত্তি

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism) হলো এমন একটি রাষ্ট্রনীতি বা সামাজিক আদর্শ, যেখানে রাষ্ট্র ও সরকারের কার্যক্রম কোনো বিশেষ ধর্মের নির্দেশনা বা কর্তৃত্বের ওপর নির্ভর করে না এবং রাষ্ট্র সব ধর্ম ও ধর্মহীন বিশ্বাসের প্রতি নিরপেক্ষ থাকে। এর লক্ষ্য নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করা।

"সেক্যুলারিজম" শব্দটি ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ চিন্তাবিদ জর্জ জ্যাকব হলিওক প্রথম ব্যবহার করেন। এর ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ইউরোপে রেনেসাঁ, ধর্মসংস্কার আন্দোলন, জ্ঞানদীপ্তি এবং চার্চ ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির পর ধর্মযুদ্ধের অবসানে রাষ্ট্রের স্বাধীন কর্তৃত্বের ধারণা শক্তি পায়।

একটি সাধারণ ভুল ধারণা হলো ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা বা নাস্তিকতা। বাস্তবে এটি ধর্মের বিরোধিতা নয়, বরং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও ধর্মচর্চার স্বাধীনতার নীতি, যদিও কোনো কোনো রাষ্ট্রে ধর্মবিরোধী রূপও দেখা গেছে। বাংলা "ধর্মনিরপেক্ষতা" শব্দটি নিয়েও আলোচনা আছে। কেউ মনে করেন এটি "সেক্যুলারিজম"-এর যথাযথ অনুবাদ, আবার কেউ মনে করেন শব্দটি "ধর্মহীনতা"-র ভ্রান্ত ইঙ্গিত দেয়, তাই "ইহজাগতিকতা" বা "সর্বধর্ম-সমভাব"-এর মতো বিকল্প শব্দ ব্যবহার করেন।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য

১. রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা। রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা বা পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না এবং ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকদের মধ্যে পার্থক্য করে না।

২. ধর্মীয় স্বাধীনতা। প্রত্যেক নাগরিক নিজের ধর্ম পালন, প্রচার, পরিবর্তন বা ধর্মহীন থাকার স্বাধীনতা ভোগ করে।

৩. নাগরিকের সমান অধিকার। আইনের চোখে সবাই সমান। ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধ।

৪. রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পৃথকীকরণ। আইন প্রণয়ন, বিচার ও প্রশাসনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব থাকে না। এই পৃথকীকরণের মাত্রা দেশভেদে ভিন্ন।

৫. যুক্তি ও জনসার্বভৌমত্বভিত্তিক আইন। আইনের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি, সংবিধান ও যুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া থেকে, কোনো ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ থেকে নয়।

৬. ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধ। ক্ষমতা অর্জন বা ধরে রাখতে ধর্মকে হাতিয়ার করার প্রবণতা প্রতিরোধ করা।

৭. বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবতাবাদী মূল্যবোধ। শিক্ষা, গবেষণা ও জনজীবনে মুক্তচিন্তা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির চর্চাকে উৎসাহ দেওয়া।

৮. বহুত্ববাদ ও সহাবস্থান। বহুধর্মী সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক সহনশীলতা গড়ে তোলা।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ধরন

সব দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা একই রূপে চর্চিত হয় না। প্রধান মডেলগুলো হলো:

১. কঠোর বিচ্ছেদ মডেল (যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স)। যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী রাষ্ট্রীয় ধর্ম প্রতিষ্ঠা নিষিদ্ধ করে এবং ধর্মচর্চার স্বাধীনতা দেয়। ফ্রান্সে ১৯০৫ সালের আইন থেকে গড়ে ওঠা লাইসিতে ধর্মকে জনপরিসর থেকে অনেক বেশি দূরে রাখে, যেমন সরকারি স্কুলে ধর্মীয় প্রতীক নিয়ে বিধিনিষেধ।

২. নীতিগত দূরত্ব বা সর্বধর্ম-সমভাব মডেল (ভারত)। রাষ্ট্র সব ধর্মের সঙ্গে সমান দূরত্ব বা সমান সম্মান রেখে চলে এবং প্রয়োজনে সামাজিক সংস্কারে হস্তক্ষেপ করতে পারে। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক ব্যক্তিগত আইনের অস্তিত্ব এ মডেলের একটি বৈশিষ্ট্য।

৩. রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ধর্মনিরপেক্ষতা (তুরস্কের কামালবাদী লাইক্লিক)। এখানে রাষ্ট্র ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা ও নিয়ন্ত্রণ দুটোই করে, যেমন ধর্মীয় বিষয়ক সরকারি দপ্তরের মাধ্যমে।

৪. সমন্বয়মূলক বা অ্যাকোমোডেটিভ মডেল (জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও কিছু ইউরোপীয় দেশ)। রাষ্ট্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কিছু আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রাখে, যেমন চার্চ ট্যাক্স বা সরকারি অনুদান, তবু ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক সমতা বজায় রাখে। যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত চার্চ থাকলেও সমাজ ব্যাপকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ।

৫. ধর্মবিরোধী বা নাস্তিক্যবাদী রূপ (সোভিয়েত ইউনিয়ন, মাও-পরবর্তী কিছু সময়ের চীন)। এখানে রাষ্ট্র ধর্মকে দমন বা নিরুৎসাহিত করেছে। অনেক তাত্ত্বিক একে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা হিসেবে গণ্য করেন না, কারণ এতে ধর্মীয় স্বাধীনতাই সংকুচিত হয়েছে।

বিশ্লেষণের আরেকটি পরিচিত বিভাজন হলো নেতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতা (রাষ্ট্র ধর্ম থেকে সরে থাকে) এবং ইতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতা (রাষ্ট্র সব ধর্মের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সক্রিয় হয়)।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

সাংবিধানিক ইতিহাস

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার অবস্থান বহুবার বদলেছে।

  • ১৯৭২: স্বাধীনতার পর সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, এই চারটি নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে যুক্ত হয়। অনুচ্ছেদ ১২-তে ধর্মনিরপেক্ষতা বাস্তবায়নের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এর অন্তর্ভুক্ত সাম্প্রদায়িকতা বিলোপ, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া নিষিদ্ধকরণ, ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধ এবং ধর্মের কারণে বৈষম্য ও নিপীড়ন বন্ধ করা। এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, তৎকালীন সংবিধান-প্রণেতারা ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও বৈষম্যহীনতার নীতি হিসেবে দেখেছিলেন।
  • ১৯৭৭: জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে সামরিক আদেশের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে "সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস" যুক্ত হয়।
  • ১৯৮৮: হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে সংসদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে। এটি এখন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২ক। ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরলেও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ, দুই সরকারই রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখে।
  • ২০১০-২০১১: ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে অসাংবিধানিক সামরিক শাসনের মাধ্যমে ১৯৭৭ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া অবৈধ ছিল। এরপর ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ধর্মনিরপেক্ষতা মূলনীতি হিসেবে ফিরে আসে, তবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও বহাল থাকে। সংবিধানে ঘোষণা আছে যে রাষ্ট্র অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রে সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করবে।

সাম্প্রতিক অবস্থা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কারের আলোচনায় বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রস্তাব দেয়, বিদ্যমান চার মূলনীতির বদলে "সমতা, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র" মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এই প্রস্তাবে ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র বাদ পড়ে। তবে সমালোচকদের কেউ কেউ লক্ষ করেছেন, প্রস্তাবগুলো দেশের বহুত্ববাদী ও বহুজাতিক চরিত্র স্বীকার করে এবং স্পষ্ট নাম না নিয়েও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেয়, কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে না।

পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ২৬টি রাজনৈতিক দল "জুলাই সনদ" স্বাক্ষর করে, আর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একটি সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের কাঠামো অনুযায়ী, প্রস্তাব অনুমোদিত হলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি "সংবিধান সংস্কার পরিষদ" সংশোধনের কাজ করবে।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮ এখনও ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করে। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর একজন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী "সমাজতন্ত্র" ও "ধর্মনিরপেক্ষতা" বাদ দেওয়ার দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান এবং সংসদের মাধ্যমে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে নোটিশে মিডিয়া-তথ্যের উল্লেখ আছে। অর্থাৎ বিষয়টি এখনও চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি এবং পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে, তাই সর্বশেষ অবস্থা আলাদাভাবে যাচাই করে নেওয়া ভালো।

বাংলাদেশ আসলে কোন ধরনের রাষ্ট্র?

সংবিধানের বর্তমান পাঠ অনুযায়ী বাংলাদেশকে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা যায় না, আবার কঠোর বিচ্ছেদ মডেলের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রও বলা যায় না। এটি একটি মিশ্র বা দ্বৈত চরিত্রের রাষ্ট্র। এর কারণ হলো:

ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য:

  • অনুচ্ছেদ ৮ ও ১২-তে ধর্মনিরপেক্ষতা মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃত।
  • অনুচ্ছেদ ২৮-এ ধর্মের কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধ এবং অনুচ্ছেদ ৪১-এ ধর্মচর্চার স্বাধীনতা নিশ্চিত।
  • রাষ্ট্র ধর্মীয় আইনকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়নি এবং সংসদ-প্রণীত আইনই মূল আইনি কাঠামো।
  • প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান কল্যাণ ট্রাস্ট রয়েছে।

ধর্মভিত্তিক বা ধর্মঘনিষ্ঠ বৈশিষ্ট্য:

  • অনুচ্ছেদ ২ক ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে, একই সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ অন্য ধর্মের জন্য সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে।
  • সংবিধানের প্রস্তাবনায় "বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম" রয়েছে।
  • ধর্ম মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আছে।
  • বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদি পারিবারিক বিষয়ে ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন প্রচলিত।
  • দণ্ডবিধির ২৯৫ক ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া অপরাধ।

এই বিন্যাস নিয়ে বিশ্লেষকরা বলেছেন, তাত্ত্বিকভাবে রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ, কিন্তু বাস্তবে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সীমারেখা বেশ ঝাপসা। আবার সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে বহু নাগরিক ধর্মীয় সহনশীলতা ও সমান অধিকারের পক্ষে থেকেও রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে রাখার পক্ষে।

বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি

এই বিষয়ে প্রধানত তিন ধরনের অবস্থান দেখা যায়।

১. স্ববিরোধিতার যুক্তি। এই মতে রাষ্ট্রধর্ম থাকলে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা সম্ভব নয়, কারণ রাষ্ট্র একটি ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দিলে নাগরিকদের মধ্যে সমতা ক্ষুণ্ণ হয়। অনেক সংখ্যালঘু সংগঠন এবং ১৯৭২-এর চেতনার সমর্থকরা এ অবস্থান নেন।

২. সামঞ্জস্যের যুক্তি। এই মতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, বরং বৈষম্যহীনতা ও সব ধর্মের সমান অধিকার। রাষ্ট্রধর্ম প্রতীকী বা সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি হিসেবে থাকতে পারে, যদি অন্যদের অধিকার সুরক্ষিত থাকে। এ ব্যাখ্যায় ভারতীয় মডেলের সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য আছে। এই মতের সমর্থকরা বলেন, ধর্ম বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে এত গভীর যে কঠোর বিচ্ছেদ বাস্তবসম্মত নয়।

৩. "ধর্মনিরপেক্ষতা" শব্দ বাদ দেওয়ার যুক্তি। এই মতে শব্দটি দেশের ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বা এর ভুল ব্যাখ্যা সমাজে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে। এর বদলে "বহুত্ববাদ", "সমতা" ও "সামাজিক ন্যায়বিচার"-এর মতো ধারণা ব্যবহারের প্রস্তাব এসেছে। সমালোচকরা এ প্রস্তাবে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ গেলে ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক এবং সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক সুরক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। আরেক পক্ষ বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিলেই বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হবে না, কিন্তু ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে সাংবিধানিক ভাষা বদলে যেতে পারে।

এ বিষয়ে রাজনৈতিক দল, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদের মধ্যে মতপার্থক্য এখনও চলছে। তাই "বাংলাদেশ কোন ধরনের রাষ্ট্র" প্রশ্নের উত্তর সংবিধানের পাঠভিত্তিকভাবে একরকম, আবার বাস্তব চর্চা ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ভিন্ন হতে পারে।

উপসংহার

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক সমতার একটি নীতি, যার বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রূপ আছে। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের সংবিধানে এটি মূলনীতি ছিল, পরে সামরিক শাসন ও সংসদীয় সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বদলে গেছে, আবার ২০১১ সালে ফিরে এসেছে। বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম একসঙ্গে থাকায় বাংলাদেশকে ধর্মতান্ত্রিক বা কঠোর অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ, কোনোটাই বলা যায় না। বরং এটি একটি মিশ্র মডেলের রাষ্ট্র, যেখানে ধর্মীয় স্বীকৃতি ও সমান নাগরিক অধিকারের নীতি সহাবস্থান করে। চলমান সংবিধান সংস্কার-প্রক্রিয়া এই কাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তাই সর্বশেষ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।




**ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ (Secularism)** হলো রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে একটি রাজনৈতিক দর্শন, যার মূল কথা হলো—রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাধান্য না দিয়ে সব নাগরিকের ধর্মীয় বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। এটি ধর্মবিরোধিতা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ধর্মকে একটি ব্যক্তিগত ও স্বেচ্ছাধীন বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার একটি কাঠামো।


---


### 📌 ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য


ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদকে সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি মৌলিক নীতির সমন্বয় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়:


- **প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছেদ (Institutional Separation):** রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্পষ্ট পৃথকীকরণ। রাষ্ট্র কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে না, আবার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে অন্য ধর্মকে দমন করতে পারে না।

- **বিশ্বাস ও বিবেকের স্বাধীনতা (Freedom of Belief and Conscience):** প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের ধর্ম বিশ্বাস, পরিবর্তন বা প্রকাশ করার স্বাধীনতা থাকবে—যতক্ষণ না তা জনশৃঙ্খলা ও অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে।

- **ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধকরণ (Non-discrimination):** রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে তার ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে বৈষম্য করতে পারে না; সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান।

- **রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা (State Neutrality):** রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে "সরকারি" বা "রাষ্ট্রীয়" মর্যাদা দিয়ে অন্য ধর্মের অনুসারীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে না।


---


### 🧩 ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের প্রধান ধরণ


ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ কোনো একক রূপ নয়; বিভিন্ন সমাজ ও ইতিহাসে এটি ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ পেয়েছে। প্রধান শ্রেণিবিভাগগুলো নিম্নরূপ:


#### ১. কঠোর/বদ্ধ নিরপেক্ষতা (Closed/Programmatic Secularism)

এই মডেলে ধর্মকে সম্পূর্ণভাবে **সরকারি ক্ষেত্র (public square) থেকে বহিষ্কার** করা হয়। ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত জীবনের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়; রাষ্ট্রীয় নীতি, শিক্ষা ও আইনে ধর্মের কোনো ভূমিকা থাকে না। ফরাসি মডেল (Laïcité) এই ধারার একটি উদাহরণ, যেখানে রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়ে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।


#### ২. নমনীয়/খোলা নিরপেক্ষতা (Open/Procedural Secularism)

এই মডেলে রাষ্ট্র ধর্মকে সরকারি ক্ষেত্র থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কার না করে বরং **সব ধর্মের প্রতি সমান দূরত্ব (principled distance)** বজায় রাখে। রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে প্রাধান্য দেয় না, কিন্তু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সামাজিক ও জনস্বার্থে অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি দেয়। ভারতীয় ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদকে প্রায়ই এই ধারার উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়, যেখানে রাষ্ট্র বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে হস্তক্ষেপ বা সমর্থন দিয়ে সমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।


#### ৩. নিপীড়নমূলক বনাম অনুমতিমূলক নিরপেক্ষতা (Restrictive vs. Permissive Neutrality)

কিছু তাত্ত্বিক ধর্ম নিরপেক্ষতাকে দুটি ভাগে ভাগ করেন—**নিপীড়নমূলক** (যেখানে রাষ্ট্র ধর্মীয় প্রকাশকে কঠোরভাবে সীমিত করে) এবং **অনুমতিমূলক** (যেখানে রাষ্ট্র ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিয়ে সহাবস্থান নিশ্চিত করে)। আধুনিক উদারনৈতিক গণতন্ত্রগুলো সাধারণত অনুমতিমূলক মডেলের দিকে ঝুঁকে থাকে, যেখানে "জনসম্মুখে যুক্তি" (public justification) প্রদানের শর্তে ধর্মীয় মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকে।


---


### 🇧🇩 বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রকৃতি


বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো ধর্ম নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে একটি **অনন্য ও বিতর্কিত মডেল** উপস্থাপন করে—যেখানে একইসঙ্গে "ধর্ম নিরপেক্ষতা" একটি মূলনীতি এবং "ইসলাম" রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃত।


#### 🏛️ সাংবিধানিক দ্বৈততা

১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতির একটি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। তবে ১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসনামলে এই নীতিটি বাদ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্ম নিরপেক্ষতা পুনর্বহাল করা হয়, কিন্তু একইসঙ্গে সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখা হয়। বর্তমানে সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—"প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন"। এই ব্যবস্থাকে অনেকে **"রাষ্ট্রধর্মসহ ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র"** হিসেবে অভিহিত করেন।


#### ⚖️ "দক্ষিণ এশীয় ধর্ম নিরপেক্ষতা" মডেল

বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষতা পাশ্চাত্যের "ধর্মবিযুক্ততা" (religion-free secularism) নয়; বরং এটি **প্রাচ্যদেশীয় ধর্মীয় সমন্বয়** ও সহাবস্থানের ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধর্ম নিরপেক্ষতা ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল, কিন্তু ধর্মকে সমাজজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়নি; বরং সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্য ছিল।


#### ⚠️ বাস্তব বিতর্ক ও মানবাধিকার প্রেক্ষাপট

এই দ্বৈত কাঠামো—ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতি এবং রাষ্ট্রধর্মের অস্তিত্ব—বাস্তবে একটি **অস্পষ্টতা** তৈরি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও অধিকারের ওপর। জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টার হেইনার বিলেফেল্ডট ২০১৫ সালে পর্যবেক্ষণ করেন যে, বাংলাদেশের সংবিধান ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতি ধারণ করলেও রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামের উল্লেখ "মানবাধিকার—বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায়—সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন অস্পষ্টতা" সৃষ্টি করে। তিনি আরও লক্ষ করেন যে, ধর্ম নিরপেক্ষতা রক্ষার নামে গৃহীত কিছু পদক্ষেপ কখনো কখনো **ধর্মের সমালোচনাকে সীমিত করার** দিকে ঠেলে দেয়, যা ধর্ম নিরপেক্ষতার মূল চেতনার বিপরীত।


---


### 🧭 সারসংক্ষেপ


বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য অর্থে "কঠোর ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র" বলা যায় না, আবার "ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র"ও বলা যায় না। এটি একটি **সংকর ও ক্রমবিবর্তনশীল মডেল**—যেখানে সাংবিধানিকভাবে ধর্ম নিরপেক্ষতা একটি মূলনীতি, কিন্তু রাষ্ট্রধর্মের অস্তিত্ব ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বাস্তবে সেই নীতির সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি করে। একে চিহ্নিত করা যায় **"রাষ্ট্রধর্মসহ নমনীয়/অন্তর্ভুক্তিমূলক ধর্ম নিরপেক্ষতা"** হিসেবে—যা দক্ষিণ এশীয় বহুধর্মীয় সমাজের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করে, কিন্তু সংখ্যালঘু অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তার প্রশ্নে এখনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।




ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism): সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, ধরন ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান

ভূমিকা

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। বহুধর্মীয় সমাজে সব নাগরিকের সমান অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার সঙ্গে এ ধারণা সম্পর্কিত। তবে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ সব ক্ষেত্রে ধর্মকে অস্বীকার করা নয়; বরং রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, তা এর মূল আলোচ্য বিষয়।

১. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বলতে কী বোঝায়?

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism) হলো এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক নীতি, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র ধর্মীয় বিষয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখে এবং নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করে।

সহজ কথায়, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার ধর্মীয় পরিচয় বৈষম্যের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।

ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রের সব নাগরিককে ধর্মহীন হতে হবে। বরং ব্যক্তি ধর্ম পালন করতে, ধর্ম পরিবর্তন করতে কিংবা কোনো ধর্ম পালন না করতেও স্বাধীন হতে পারেন—প্রযোজ্য সাংবিধানিক ও আইনি সীমার মধ্যে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিভিন্ন মডেল রয়েছে। কোথাও রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কঠোর পৃথকত্ব বজায় রাখা হয়, আবার কোথাও রাষ্ট্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পৃথক থেকেও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দেয়।

২. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য

১. রাষ্ট্রের ধর্মীয় নিরপেক্ষতা: রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের অন্যদের তুলনায় অধিক নাগরিক মর্যাদা দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

২. ধর্মীয় স্বাধীনতা: প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং আইনসম্মতভাবে নিজের বিশ্বাস অনুসরণের অধিকার থাকে।

৩. সমান নাগরিক অধিকার: ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের পরিচয়ের কারণে নাগরিকদের প্রতি বৈষম্য না করার নীতি ধর্মনিরপেক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

৪. রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের নিয়মতান্ত্রিকতা: রাষ্ট্র পরিচালনা ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের মধ্যে সম্পর্ক সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। এর ধরন সব দেশে এক নয়।

৫. আইনের শাসন: রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক কাঠামোর অধীন থাকে; ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার বা প্রশাসনে বৈষম্য করা উচিত নয়।

৬. ধর্মীয় সহনশীলতা ও বহুত্ববাদ: বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এবং ধর্মহীন ব্যক্তিদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

৭. ধর্মীয় জবরদস্তির বিরোধিতা: কাউকে জোর করে কোনো ধর্ম গ্রহণ, পালন বা পরিত্যাগ করতে বাধ্য না করার নীতি ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

৮. জননীতিতে যুক্তি ও জনস্বার্থের গুরুত্ব: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও প্রশাসনের মতো ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণে প্রমাণ, জনস্বার্থ ও সাংবিধানিক অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ধর্মীয় নাগরিকদের মতামত দেওয়ার অধিকারও বজায় থাকে।

৩. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রধান ধরন

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রধানত কয়েকটি ধরনে আলোচনা করা যায়।

ক. কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Strict Secularism)

এ ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতায় রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্পষ্ট ও কঠোর পৃথকত্ব বজায় রাখা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা ও সরকারি নীতিনির্ধারণে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব সীমিত থাকে।

উদাহরণ হিসেবে ফ্রান্সের Laïcité মডেলের কথা বলা যায়, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় নিরপেক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

খ. উদার বা নিরপেক্ষতাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Liberal Secularism)

এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্র কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাত না করে সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান নাগরিক অধিকার রক্ষা করে। ব্যক্তি ধর্ম পালন করতে পারেন এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক মতামতও প্রকাশ করতে পারেন।

এখানে মূল গুরুত্ব হলো রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও ব্যক্তির স্বাধীনতা।

গ. ইতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Positive Secularism)

এ ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতায় রাষ্ট্র শুধু ধর্মীয় বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে না; বরং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের স্বাধীনতা ও সমান অধিকার বাস্তবায়নের জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

যেমন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ধর্মীয় বৈষম্য প্রতিরোধ করা এবং সব সম্প্রদায়ের সমান নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া।

ঘ. নেতিবাচক বা নিষ্ক্রিয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Negative Secularism)

এ ধারণায় রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো ধর্মীয় বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ না করা এবং কোনো ধর্মকে সরকারি কর্তৃত্বের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করা।

তবে এই পরিভাষার ব্যবহার বিভিন্ন লেখক ও তাত্ত্বিকের কাছে ভিন্ন হতে পারে। তাই একে ইতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সঙ্গে তুলনা করে বুঝতে হয়।

ঙ. ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকত্বভিত্তিক মডেল

এ মডেলে রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক পৃথকত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সরাসরি কর্তৃত্বাধীন থাকে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে ধর্মীয় ব্যক্তিরা জনজীবন বা রাজনীতিতে মত প্রকাশ করতে পারবেন না।

উল্লেখ্য, এসব ধরন সব ক্ষেত্রে পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। বাস্তবে বিভিন্ন রাষ্ট্র একাধিক মডেলের বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারে।

৪. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আসলে কোন ধরনের রাষ্ট্র?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রশ্নটির উত্তর দিতে হলে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশকে সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণকারী, তবে রাষ্ট্রধর্মবিশিষ্ট রাষ্ট্র বলা অধিক যথাযথ। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানে একদিকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

FUNDAMENTAL RIGHTS
+2

ক. সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার স্বীকৃতি

বাংলাদেশের সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতির একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার বাস্তবায়নের জন্য সাম্প্রদায়িকতা দূর করা, কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার এবং ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য বা নিপীড়ন প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে।

Bangladesh Laws
+1

খ. ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম

সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

FUNDAMENTAL RIGHTS
+1

গ. ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা

সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার অধীন প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম পালন, অনুশীলন ও প্রচারের অধিকার রয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার অধিকারও স্বীকৃত।

Bangladesh Laws
+1

ঘ. ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ

সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে শুধু ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে নাগরিকদের প্রতি বৈষম্য না করার বিধান রয়েছে। এটি ধর্মীয় সমতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভিত্তি।

GOV.UK
+1

ঙ. বাংলাদেশের সাংবিধানিক অবস্থানের মূল্যায়ন

বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে:

বিবেচ্য বিষয়

বাংলাদেশের অবস্থান

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি

ধর্মনিরপেক্ষতা স্বীকৃত

রাষ্ট্রধর্ম

ইসলাম

ধর্মীয় স্বাধীনতা

সংবিধানে স্বীকৃত

ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য

সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ

সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার

সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে প্রতিরোধের নীতি রয়েছে

এই ব্যবস্থার ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিতর্ক রয়েছে। কোনো কোনো আইনবিশেষজ্ঞের মতে, রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার সহাবস্থান নীতিগত টানাপোড়েন সৃষ্টি করে; অন্যদের মতে, রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও সব ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।

The Daily Star
+1

সুতরাং, বাংলাদেশকে পুরোপুরি কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কিংবা ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র—কোনোটিই বলা যথাযথ নয়। বরং একে রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সহাবস্থানকারী একটি রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করা অধিক সঠিক।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এমন একটি নীতি, যা ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমান নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দেয়। এর বিভিন্ন ধরন থাকলেও মূল লক্ষ্য হলো ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ না হওয়া। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম—দুটি বিধানই বিদ্যমান। তাই বাংলাদেশের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে হলে ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি—উভয় বিষয়ই বিবেচনায় নিতে হবে।




**ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ** এমন রাষ্ট্রদর্শন, যেখানে রাষ্ট্রের বৈধতা, আইন ও নাগরিক অধিকার কোনো একটি ধর্ম থেকে আসে না। রাষ্ট্র ধর্মীয় বিশ্বাস চাপিয়ে দেয় না, কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক সুবিধাও দেয় না, এবং সব নাগরিককে বিশ্বাস নির্বিশেষে সমান গণ্য করে।


এর অর্থ ধর্মহীনতা বা ধর্মবিরোধিতা নয়। ক্লাসিক অর্থে এটি রাষ্ট্র ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের পৃথকীকরণ: উপাসনা সমাজ ও ব্যক্তির ব্যাপার, শাসনের ভিত্তি সংবিধান ও নাগরিক সমতা। বাংলাদেশের সংবিধানিক ভাষায় এর জোর আরও সুনির্দিষ্ট—সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার ও ধর্মের কারণে বৈষম্য দূর করা।


## প্রধান বৈশিষ্ট্য


1. **রাষ্ট্র ও ধর্মের দূরত্ব** — সরকার কোনো ধর্মপ্রতিষ্ঠানের শাখা নয়; ধর্মনেতা রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস নন।

2. **নিরপেক্ষতা** — রাষ্ট্র একটি ধর্মকে অন্যটির ওপর তুলে ধরে রাজনৈতিক মর্যাদা দেয় না।

3. **বিশ্বাসের স্বাধীনতা** — যেকোনো ধর্ম পালন, প্রচার ও ধর্ম না মানার অধিকার।

4. **সমান নাগরিকত্ব** — চাকরি, ভোট, আইন ও সুরক্ষা ধর্ম দেখে ঠিক হয় না।

5. **আইনের উৎস সংবিধান** — ফৌজদারি ও রাষ্ট্রীয় আইন একক ধর্মগ্রন্থ নয়। পারিবারিক আইন ধর্মভিত্তিক থাকলেও তা সমতার নীতির অধীন থাকার কথা।

6. **সাম্প্রদায়িকতার প্রত্যাখ্যান** — ধর্মকে দল, ভোট বা ঘৃণার হাতিয়ার বানানো এই নীতির পরিপন্থী।

7. **প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য** — রাষ্ট্র সেক্যুলার হতে পারে, অথচ সমাজ ধর্মপরায়ণ থাকে। সেক্যুলারিজম সমাজ থেকে ধর্ম মুছে ফেলার কর্মসূচি নয়।


## ধরন


| ধরন | মূল কথা | উদাহরণ |

|---|---|---|

| কঠোর বা লাইসিতে | ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ও অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্য প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে রাখে; প্রতীকে বিধিনিষেধ | ফ্রান্স |

| উদার বা নরম | রাষ্ট্র কোনো ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে না, কিন্তু ব্যক্তি ও সমাজের ধর্মচর্চায় হস্তক্ষেপ কম | যুক্তরাষ্ট্র |

| সমদূরত্ব বা নীতিগত দূরত্ব | সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা; সাম্য ও স্বাধীনতার জন্য রাষ্ট্র কখনো দূরে থাকে, কখনো সংস্কারে নামে | ভারতের সাংবিধানিক মডেল |

| সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বহুত্ববাদ | ধর্মবিরোধিতা নয়; জোর সমান অধিকার ও ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধে | ১৯৭২-এর বাংলাদেশি ভাষ্য |


পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ফরাসি মডেল ধর্মকে ব্যক্তিগত ঘরে পাঠাতে চায়। দক্ষিণ এশীয় মডেল ধর্মকে সমাজে জীবন্ত রেখে রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ রাখতে চায়।


## বাংলাদেশ আসলে কোন ধরনের রাষ্ট্র


কার্যকর সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ **বিশুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নয়, ধর্মতন্ত্রও নয়**। এটি একটি **মিশ্র বা অর্ধ-ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র**: একদিকে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি, অন্যদিকে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম।


- **অনুচ্ছেদ ৮ ও ১২** — জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা মূলনীতি। ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে সাম্প্রদায়িকতা দূর করা, কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা না দেওয়া, রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করা, এবং ধর্মপালনের কারণে বৈষম্য না করা।

- **অনুচ্ছেদ ২ক** — প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম; তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবে। পঞ্চদশ সংশোধনী (২০১১) রাষ্ট্রধর্ম রেখেই ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনে।

- **অনুচ্ছেদ ২৮ ও ৪১** — ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য নিষিদ্ধ; প্রত্যেকের ধর্ম পালন, প্রচার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার আছে।


এই কাঠামো ফরাসি লাইসিতে নয়। এটি কাছাকাছি **বহুত্ববাদী বা সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ধর্মনিরপেক্ষতা**, কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম থাকায় ভারতীয় সমদূরত্ব মডেলেরও পুরোপুরি সমান নয়। ১২(খ)-তে কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা না দেওয়ার কথা, আর ২ক-তে একটি ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম বলা—এই দুইয়ের মধ্যে টানাপোড়েন স্পষ্ট। আদালতের ব্যাখ্যায় ২ক-কে প্রতীকী মর্যাদা ধরে বাকি ধর্মের সমান অধিকারের সঙ্গে পড়তে বলা হয়েছে; একা রাষ্ট্রধর্ম অন্য নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেয় না। তারপরও নীতিগত অসামঞ্জস্য থেকেই যায়।


সমাজ ও আইনেও মিশ্র রূপ দেখা যায়। ফৌজদারি ও সাংবিধানিক অধিকার সবার জন্য একরকম হওয়ার কথা; বিবাহ, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক আইন অনেকাংশে ধর্মভিত্তিক। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ধর্মীয় প্রতীক থাকে, আবার সংখ্যালঘুর উৎসব ও প্রতিষ্ঠানও স্বীকৃত। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ১২ অনুচ্ছেদের লক্ষ্যের সঙ্গে প্রায়ই মেলে না। তাই **সাংবিধানিক নীতিতে** বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি রাখে, **রূপে** এটি রাষ্ট্রধর্মযুক্ত বহুধর্মীয় রাষ্ট্র, আর **চর্চায়** ধর্ম ও রাজনীতি পুরো আলাদা নয়।


২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সংবিধান সংশোধন কমিটি প্রস্তাব করেছে, মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা সরিয়ে প্রস্তাবনা ও ৮ অনুচ্ছেদে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” ফিরিয়ে আনা হবে। এটি এখনো আইন নয়; ওই অনুচ্ছেদ বদলাতে সংসদের পর গণভোটের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাব আইন হলে রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় আরও স্পষ্টভাবে ধর্মীয় মূলনীতিতে সরবে। ততক্ষণ কার্যকর অবস্থান আগের মিশ্র মডেলই।


## সংক্ষেপে


ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রকে একটি ধর্মের হাতে না দিয়ে সবার সমান নাগরিকত্ব রক্ষা করে। তার কঠোর, উদার ও সমদূরত্ব—এই ভিন্ন রূপ আছে। বাংলাদেশ আজীবন কোনো একটি বিশুদ্ধ ছকে পড়ে না: সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূলনীতি বলে, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম রাখে, এবং অন্য ধর্মের সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেয়। সঠিক নাম তাই **রাষ্ট্রধর্মযুক্ত মিশ্র বা অর্ধ-ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র**, যার নিজস্ব ঐতিহ্য সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বহুত্ববাদ—ধর্মতন্ত্রও নয়, কঠোর সেক্যুলার বিচ্ছেদও নয়।




ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ (Secularism) বলতে কী বোঝায়?

ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ (Secularism) বা সিকিউলারিজম হলো একটি আধুনিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও দার্শনিক তত্ত্ব। এর মূল বক্তব্য হলো—রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে ধর্মের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা।

সহজ কথায়, ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ মানে ধর্মহীনতা বা অনাস্তিকতা নয়; বরং এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে বিশেষ সুবিধা বা পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে না, নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয় এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধর্মীয় বিধানের পরিবর্তে যুক্তি, বিজ্ঞান ও আইনের শাসনকে প্রাধান্য দেয়।

ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

  • রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ (Separation of State and Religion): রাষ্ট্রের কোনো নিজস্ব 'ধর্মীয় মতাদর্শ' থাকবে না। আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় বিশ্বাস মুখ্য হবে না।

  • ধর্মীয় স্বাধীনতা (Freedom of Religion): রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক নিজের পছন্দমতো যেকোনো ধর্ম পালন, প্রচার বা কোনো ধর্ম না মানার (অনাস্তিকতা) সমান সুযোগ পাবে।

  • নাগরিকদের সমান অধিকার ও বৈষম্যহীনতা: ধর্ম, বর্ণ, বা উপাসনা পদ্ধতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করবে না। রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও অধিকার সবার জন্য সমান।

  • রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা: রাজনৈতিক সুবিধা হাসিল বা নির্বাচনী লাভের জন্য ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা।

  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষা: রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রাধান্য বিস্তার বা সাম্প্রদায়িক মনোভাব দমন করে সামাজিক সংহতি বজায় রাখে।

ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের প্রধান ধরণসমূহ

বিভিন্ন দেশের সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদকে প্রধানত তিনটি মডেলে ভাগ করা যায়:

                            ┌─── ১. ফরাসি বা কঠোর মডেল (Laïcité) — রাষ্ট্র থেকে ধর্ম পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন
                            │
ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের ধরণ ───┼─── ২. আমেরিকান বা দূরত্ব বজায় রাখার মডেল (Wall of Separation)
                            │
                            └─── ৩. ভারতীয়/বহুসংস্কৃতিবাদী মডেল (Principled Distance/Sarva Dharma Sambhava)

১. ফরাসি মডেল বা 'লাইসিতে' (Laïcité):

  • এটি ধর্মনিরপেক্ষতার সবচেয়ে কঠোর রূপ।

  • এতে রাষ্ট্র কেবল রাষ্ট্রীয় অঙ্গনেই নিরপেক্ষ থাকে না, বরং সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ বা সরকারি অফিসে কোনো ধর্মীয় প্রতীক প্রদর্শন (যেমন: হিজাব, ক্রস, বা পাগড়ি) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে।

২. আমেরিকান মডেল (Wall of Separation):

  • এখানে রাষ্ট্রীয় বিষয়ে ধর্ম হস্তক্ষেপ করবে না এবং ধর্মীয় বিষয়ে রাষ্ট্র কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাঝে একটি অদৃশ্য "দেয়াল" থাকে।

  • তবে ব্যক্তি জীবনে মানুষ প্রকাশ্যে নিজের ধর্ম পালন বা ধর্মীয় চিহ্ন বহন করতে পারে।

৩. ভারতীয় বা প্রগতিশীল মডেল (Sarva Dharma Sambhava):

  • এটি "সব ধর্মের প্রতি সমভাব" বা ইতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতা।

  • এখানে রাষ্ট্র ধর্মকে বর্জন করে না, বরং সব ধর্মকে সমান মর্যাদা ও আইনি সুরক্ষা প্রদান করে। রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে সামাজিক সংস্কার বা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় ধর্মীয় ক্ষেত্রে ইতিবাচক হস্তক্ষেপও করতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি কোন ধরণের রাষ্ট্র?

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের অবস্থান অত্যন্ত অনন্য, বহুমাত্রিক এবং বৈপরীত্যপূর্ণ। তাই একক কোনো সংজ্ঞায় এটিকে ফেলা কঠিন; বরং আইনি ও সামাজিক বিচারে বাংলাদেশ একটি দ্বৈত রূপের (Dual/Hybrid) বা 'বহুসংস্কৃতিবাদী সমন্বিত' ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।

১. সাংবিধানিক অবস্থান ও বৈচিত্র্য:

  • মূল নীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা: ১৯৭২ সালের সংবিধানে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' ছিল অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি। ২০১১ সালের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে এটি পুনরায় রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় (অনুচ্ছেদ ৮)।

  • অনুচ্ছেদ ১২-এর স্পষ্টতা: সংবিধানে বলা হয়েছে—সাম্প্রদায়িকতা দূর করা, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে বিশেষ রাজনৈতিক মর্যাদা না দেওয়া এবং রাজনীতির উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা বাস্তবায়িত হবে।

  • রাষ্ট্রধর্মের উপস্থিতি: সংবিধানের ২(এ) অনুচ্ছেদে "ইসলাম"-কে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তবে পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে সমমর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

২. আইন ও সামাজিক কাঠামোর প্রয়োগ:

  • পারিবারিক আইনে ধর্মীয় প্রভাব: ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইনের বেশিরভাগ ক্ষেত্র নিরপেক্ষ হলেও বিবাহ, তালাক, ও উত্তরাধিকারের মতো পারিবারিক বিষয়গুলো ধর্মভিত্তিক নিজস্ব পারিবারিক আইনেই (Personal Laws) নিষ্পত্তি হয়।

  • সব ধর্মের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি: বাংলাদেশ সরকার সব প্রধান ধর্মীয় উৎসবে (ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা, বড়দিন) সরকারি ছুটি ঘোষণা করে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে, যা ইতিবাচক বহুসংস্কৃতিবাদের প্রতীক।

সারসংক্ষেপ

তাত্ত্বিকভাবে ফরাসি বা আমেরিকান মডেলে রাষ্ট্রীয় ধর্ম বা পারিবারিক আইনে ধর্মের কোনো স্থান নেই। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি 'ইতিবাচক ও সমন্বিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র' (Inclusive Secular State), যা পশ্চিমা কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে ভারতীয় মহাদেশীয় ধাঁচে 'সকল ধর্মের সমান অধিকার' (Equal Co-existence of all faiths) চর্চা করার চেষ্টা করে।



ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হলো এমন একটি রাষ্ট্রীয় ও দার্শনিক নীতি, যেখানে রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মকে প্রাধান্য বা পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না এবং ধর্মীয় বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে। এর মূল কথা হলো—ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। অর্থাৎ, রাষ্ট্র পরিচালনা ও আইনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসনের পরিবর্তে মানবিকতা, বিজ্ঞান ও সমতা প্রাধান্য পায়। [1, 2, 3, 4]

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য
  • ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ: রাষ্ট্র ও ধর্ম আলাদা থাকবে; রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করবে না (কিছু ব্যতিক্রমী মডেলে ভিন্নতা থাকে)।
  • নাগরিকের সমান অধিকার: ধর্ম, বর্ণ কিংবা গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিক আইনের চোখে সমানাধিকার ও সুযোগ পাবেন।
  • ধর্মীয় স্বাধীনতা: প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালন, প্রচার ও পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন, তবে রাষ্ট্র কারও ওপর কোনো ধর্ম চাপিয়ে দেবে না।
  • রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার রোধ: রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বা উগ্র সাম্প্রদায়িকতার প্রসারে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকে।
  • যুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি: পার্থিব কল্যাণ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। [1, 2, 3]

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ধরণ
তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মূলত কয়েক ভাগে বিভক্ত:
  1. কঠোর বা ফরাসি মডেল (Laïcité): রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা। এখানে প্রকাশ্য স্থানে বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের ধর্মীয় প্রতীক বা নিদর্শন প্রদর্শন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকে। [1]
  2. নমনীয় বা মার্কিন মডেল: রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, তবে নাগরিকরা যাতে স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন সেজন্য রাষ্ট্র নীতিগত দূরত্ব বজায় রাখে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সহায়তা করে। [1]
  3. ভারতীয় ও সমতাভিত্তিক মডেল (Dharmanirapekkhata): রাষ্ট্র কোনো ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না, বরং সব ধর্মকে সমান চোখে দেখে এবং সকল ধর্মের প্রতি সমভাব বজায় রাখে (Principled distance)। [1]

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি কোন ধরণের রাষ্ট্র?
বাংলাদেশের সংবিধান ও রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা পুরোপুরি পশ্চিমা কঠোর ধাঁচের নয়; বরং এটি ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্মের সহাবস্থান’ বা ভারতীয় উপমহাদেশের মতো ‘সকল ধর্মের প্রতি সমভাব’ (Principle of equal respect for all religions) ধরণের। [1]
  • সাংবিধানিক অবস্থান: ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্যতম মূলনীতি হিসেবে যুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পরিবর্তন এলেও ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এটি পুনরায় সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে বহাল হয়। [1, 2]
  • দ্বি-মুখী বাস্তবতা: একদিকে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িকতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, অন্যদিকে ১৯৮৮ সালে সংবিধানে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাষ্ট্রধর্ম থাকা সত্ত্বেও সকল ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে এটিকে একটি ‘অসাম্প্রদায়িক ও ধর্ম নিরপেক্ষ ভাবধারার রাষ্ট্র’ বলা হয়, যা পশ্চিমা সেকুলারিজম থেকে কিছুটা ভিন্ন এবং বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। [1, 2, 3]

No comments:

Post a Comment